Friday, June 5, 2026







প্রনয় পর্ব-৩০+৩১

#প্রনয়
#নুসরাত সুলতানা সেজুতি
পর্ব–৩০
মেয়ের সামনে অসহায় মুখ করে বসে আছেন আমির।হাত কঁচলাচ্ছেন সমানে।সেঁজুতি রেগে একাকার।আর সেজুতির রাগ মানেই মুখে কিছু বলবেনা।সারাটাদিন না খেয়ে চুপচাপ বসে থাকবে ঘরে।আমিরের চিন্তায় মাথা ফেঁটে যাওয়ার জোগাড়।
কে জানালো সেঁজুতিকে বিয়ের ব্যাপারে?তারা দুই বন্ধু ভেবেছিলেন ধীরে সুস্থে জানাবেন।ইশ! সব ঘেটে গেলো এখন!আমির মুখ কাচুমাচু করে বললেন,

“আমি আজকেই জানাতাম তোকে।

চোখ উঠিয়ে বাবাকে একবার দেখলো সেঁজুতি। আবারো মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আমির ব্যাস্ত কন্ঠে বললেন,
” আচ্ছা, এখানে আমার কি দোষ?তোর হোসাইন আঙ্কেল ই তো বললেন তোকে পরে জানাতে।আমি তো তাই___
সেঁজুতি মাঝপথে আটকে দিলো,
-“তাই তুমিও আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেনা। বাহ! হোসাইন আংকেল আমার বাবা নাকি তুমি আমার বাবা?তুমি আমার থেকে কি করে লুকাতে পারলে ব্যাপারটা?
আমির বাচ্চাদের মতো মুখ করে বললেন,
” সময় নিচ্ছিলাম,বিশ্বাস কর!
এখন এসব ছাড় না। অনেকক্ষন না খেয়ে আছিস,খাবার নিয়ে আসি?

” তোমাকে কষ্ট করতে হবেনা।আমি পারবো।এখন থেকে আমি নিজের কাজ নিজে করে নেবো।এমনিতেও আমাকে তাড়ানোর চিন্তা করছো তো, অহেতুক আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কী?
সেঁজুতি রান্নাঘরে ঢুকে গেলো।আমির মাথা নেড়ে বিড়বিড় করলেন,
‘এই মেয়েটা এক্কে বারে ওর দাদির মত হয়েছে। কথা শোনাবে কিন্তু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে।

মায়ের কথা মনে পরতেই মুখ টা কালো হয়ে এলো আমিরের।বাইশ বছর ও বাড়ির দোরগোঁড়ায় পা রাখেনি। কত কিছুই তো বদলে গেলো।শেষ বার বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও অভিমানে চাপা পরে গিয়েছে তার ছটফটে মন।প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যারা মুখ তুলেও দেখলোনা,এখনও কি তাকে তারা মনে রাখবে? পৃথিবীতে ভালোবেসে বিয়ে করা এতোই অপরাধের বুঝি?? যা আপন মানুষকেও দূরে ঠেলে দেয়?
সেঁজুতি ভাতের প্লেট এনে সোফার ওপর বসলো।আমির নিজে থেকেই এগিয়ে গেলেন।আদুরে কন্ঠে বললেন ‘ আমি খাইয়ে দেই?
সেঁজুতি মুখ ফোলালো ঠিকই তবে মানা করলোনা।বাবার দিকে প্লেট এগিয়ে দিলো।আমির হাসলেন।হাত ধুয়ে তরকারিতে ভাত মেখে মেয়ের মুখে দিলেন।সেঁজুতি চুপচাপ খাচ্ছে।আমির ভাবলেন সেঁজুতির মন ভালো হয়েছে হয়ত।সতর্ক কন্ঠে শুধালেন,
“বিয়েতে তোর কোনও আপত্তি নেইতো?
সেঁজুতির খাওয়া থেমে গেলো তাৎক্ষণিক।খাবার গলায় বাঁধলো যেন।চোখের সামনে অকারনেই রুদ্রর মুখটা ভেসে উঠলো।আমির একি কথা আবার জিজ্ঞেস করায় ধ্যান ভাঙলো সেঁজুতির।নিভু কন্ঠে বলল,

“আবিরের সাথে বিয়ের ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছেনা বাবা।আমি ওকে কখনও এভাবে ভাবিনি।,বন্ধুত্ব টাই ঠিক আছে,সেখানে সম্পর্কের এমন পরিনতি দেয়ার কি দরকার বলো?

‘বন্ধু তো কি হয়েছে? বন্ধুকে কি বিয়ে করা যায়না? একজন ভালো বন্ধুই সব থেকে ভালো লাইফ পার্টনার হতে পারে।
সেঁজুতি আর কথা খুঁজে পাচ্ছেনা।রুদ্রর নামটা উগড়ে বের হতে চাইলো খুব।কিন্তু বলার মতোন ভরসা পেলোনা।মিহি আপত্তি জানালো,
‘ ভেবে জানাব বাবা।

‘আচ্ছা বেশ! তুই বরং আবিরের সাথে এ নিয়ে একবার আলাদা ভাবে কথা বল।

‘ আবির কি রাজি এই বিয়েতে?

‘ হোসাইন তো তাই জানালো।বাকিটা তুই জেনে নিস না হয়?
সেঁজুতি খেয়াল করলো,বিয়ের কথা বলতে গেলেই আমিরের মুখ চকচক করে উঠছে।বোঝাই যাচ্ছে সে কত খুশি!সেঁজুতি বোজা কন্ঠে বলল
“ঠিক আছে।
___
বিকেল চারটায় আসার কথা আবিরের। অথচ এখন চারটা বিশ।আবিরের ছায়াও পরেনি এখনও।
অনেকক্ষন যাবত বসে আছে সেঁজুতি।আবিরই আসতে বলেছে এখানে।বিয়ের ব্যাপারে আবিরের সাথে সেঁজুতিরও সামনা সামনি কথা বলা দরকার।সেঁজুতির কেমন শ্বাস আটকে আসছে।যতবার ভাবছে আবিরকে বিয়ে করতে হবে,ততবারই কোথাও কান্না পাচ্ছে খুব।রুদ্রর কথা মনে পড়ছে বারবার।সেঁজুতি হাতঘড়ি দেখলো।অপেক্ষা করতে করতে সে বিরক্ত।আচ্ছা,রুদ্রও তো এমন অপেক্ষা করতো সিলেটে।উনিও কী এমন বিরক্ত হতেন?সেঁজুতি উদাস চোখে জানলা গলে বাইরে তাকায়।তখনি আবির এসে
ধড়ফড় করে চেয়ারে বসলো।সেঁজুতি খানিক চমকায়।আবির ঘেমে জুবুথুবু। কপাল বেয়ে টপটপ করে পরছে ঘাম।বোতলের ছিপি খুলে ঢকঢক করে অর্ধেক পানি খেয়ে ফেলল।সেঁজুতি ভ্রু কোঁচকালো,

“কি হয়েছে? এভাবে হাপাচ্ছো কেনো?
আবির হাঁপাতে হাঁপাতেই বলল,
‘আরে তোমার ওই বস আছেনা?উনি আমাকে ধাওয়া করেছিলেন?
সেঁজুতি আঁতকে উঠলো,
— কিহ? কেনো?

‘ কোনও ভাবে খবর পেয়েছেন হয়তো আমরা দেখা করছি। আর তাই আমাকে এখানে আসতে বাঁধা দিচ্ছিলেন।
সেঁজুতির যেন বিশ্বাসই হচ্ছেনা।সন্দেহী চোখে চেয়ে থাকতে দেখে আবির হেসে বলল,
” আরে সিরিয়াস হচ্ছো কেনো? মজা করছিলাম।
সেঁজুতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।অন্যদিক চেয়ে বলল,
“এসব ব্যাপারে মজা করা ঠিক নয়।

‘আচ্ছা বাবা স্যরি!এখন এসব ছাড়ো। আমি কি ওসবে ভয় পাই নাকি।আপাতত তুমি এটা ভাবো যে..
আমাদের বিয়ে হচ্ছে সেঁজুতি। তুমি ভাবতে পারবেনা হাউ মাচ আ’ম এক্সাইটেড!
কিছুক্ষন চুপ থাকলো সেঁজুতি। তার মানে সত্যিই আবির রাজী। সেঁজুতি নিচের দিক চেয়ে মিহি কন্ঠে বলল ‘ আমি এই বিয়ে করতে চাইনা আবির।

আবির যেন বিস্মিত,
‘কেনো??

সেঁজুতি উপযুক্ত কোনো কারন খুঁজে পেলোনা।আবির নিজেই বলল,
‘ কাউকে ভালোবাসো?
সেঁজুতির বুকটা কেঁপে উঠলো।সিলেটে রুদ্রর খিলখিল করে হাসির দৃশ্য, ওদের কাছাকাছি যাওয়ার দৃশ্য গুলো স্বচ্ছ জলের মতো ভাসতে থাকলো চোখের সামনে।

” কি হলো?কাউকে ভালোবাসো?
সেঁজুতি সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার মতো নঁড়ে ওঠে।আবিরের প্রশ্নে একটা নামই মাথায় আসছে’ রুদ্র! রুদ্র!রুদ্র!আবির পুনরায় ডাকলো,

“সেঁজুতি? এই সেঁজুতি? কোথায় হারিয়ে গেলে?

‘হু?হ্যা বলো..
” কাউকে ভালোবাসো কীনা এখনও বললেনা।

আবিরের মুখে মিটিমিটি হাসি।খুব করে চাইছে সেঁজুতি কাঙ্ক্ষিত নামটি বলুক।অথচ সেঁজুতি টু শব্দ করলোনা।তার দৃষ্টির মত তার মন ও উদাসীন।আবির নিজেই বলল,

‘ বুঝেছি।কেউ নেই তাইতো?তাহলে সমস্যা কোথায়? বিয়ের পর না হয় আমাকেই ভালোবাসবে।খুব সুখে রাখবো তোমাকে।
আবির সেঁজুতির হাতের ওপর হাত ছোঁয়ায়।সেঁজুতি তড়িৎ গতিতে হাত সরিয়ে নিয়ে কোলের ওপর রাখলো।আবিরের হাসি পেলো ভীষণ।
মেকি সিরিয়াস কন্ঠে বলল,
‘দেখো সেঁজুতি!আমাদের বিয়েটা নিয়ে তোমার আমার আগ্রহের থেকেও আমাদের পরিবারের আগ্রহ অনেক বেশি।তাদের স্বপ্ন তারা তাদের ছেলেমেয়েদের একসাথে দেখতে চায়।এতে ভুল তো কিছু নেই।হ্যা তোমার যদি একটা বয়ফ্রেন্ড থাকতো তবে না হয় মেনে নিতাম,কিন্তু যেখানে পাকাপোক্ত কোনও কারনই দেখাতে পারছোনা, সেখানে বিয়ে তে না করার কোনও মানে হয়?প্লিজ! সেঁজুতি,যেদিন থেকে জেনেছি তোমাকে ঘরের বউ করে আনবে বাবা-মা,সেদিন থেকেই আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি তোমাকে নিয়ে।তাই আর অমত কোরোনা।প্লিজ!

সেঁজুতি তখনও চুপ করে থাকলো।কন্ঠ বুজে আসছে কথা বলতে।কোনো রকমে মাথা দুলিয় নিরব সম্মতি বোঝায়।মুখে বলল ‘এবার তবে উঠি?

” হ্যা নিশ্চয়ই, তবে আর একটা কথা…

সেঁজুতি তাকালো,আবির বলল,
“তোমাকে আর রুদ্রর অফিসে কাজ করার দরকার নেই।
আবিরের কন্ঠে অধিকারবোধ।সেঁজুতি চাপা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“এক কথা বারবার কেনো বলছো আবির?সব তো বলেছিলাম তোমাকে।
আবির নিশ্চিন্ত কন্ঠে বলল,
” এগ্রিমেন্টের কথা তো? জানি।আর তাই আমি জরিমানার পাঁচ কোটি টাকা ওনার অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি।
সেঁজুতি বিস্ফোরক দৃষ্টিতে তাকালো,

“কিহ? আমাকে না জানিয়েই?
“জানালে টাকা তুমি নিতেনা আর তাই এরকম করলাম। এসব নিয়ে ভেবোনা এখন।
দুদিন পরে অর্ধাঙ্গিনি হবে আমার।সেটা নিয়েই ভাবো।ওই রুদ্রর মুখ আর দেখতে হবেনা তোমাকে।

সেঁজুতির হৃদয় থমকে যায় কয়েক মুহুর্তের জন্যে।আবিরের মুখে অর্ধাঙ্গিনী শব্দটি পৃথিবীর সব থেকে কুৎসিত মনে হলো।সাথে অজানা কষ্টে হাহুতাশ করে উঠলো বুক।রুদ্রর থেকে ছাড়া পেলো সে?কিন্তু খুশি হতে পারছেনা কেন?হাসি ফুঁটছেনা কেন মুখে?কেন কান্না পাচ্ছে? এতোদিন যার থেকে নিস্তার পেতে চাইলো, আজ এতো সহজে পেয়ে গিয়েও ভেতরটা অস্থির অস্থির লাগছে কেন?যেন অমূল্য কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।আর সে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। আর কোনও দিন দেখতে পাবেনা সেই রাগী বদমেজাজী রুদ্র রওশন কে?রুদ্রর ঝারি না খেলে যে তার সকালই শুরু হয়না।
সেঁজুতির ভাবনা কাটলো আবিরের কথায়
” চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
” আমি যেতে পারব আবির।অন্তত এ ‘কটা দিন নিজের মত চলতে দাও।
আবির আর বাঁধা দিলোনা।সেঁজুতি কাঁপা কাঁপা পায়ে বেরিয়ে এলো।রিক্সা ডেকে উঠে হুড টেনে দিলো।সেই প্রথম দিনের মতো মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো অাজ।কিন্তু শব্দ হলোনা।ওড়নার প্রান্ত মুখে গুঁজে কাঁদলো পুরোটা রাস্তা।পথে কোনো কালো গাড়ি দেখলেই রুদ্রর কথা মনে পড়ছে।মনে হচ্ছে এই বুঝি কাঁচ গলে বেরিয়ে আসবে রুদ্রর শান্ত মুখ।রাগি কন্ঠে বলবে ‘ এটা কান্নার জায়গা নয় সেঁজুতি! বাসায় গিয়ে কাঁদুন।তখন কান্না আরো বেড়ে আসে সেঁজুতির।
বাড়িতে ঢুকে বাবার সঙ্গে দেখা করলোনা সেজুঁতি।আমির তখন নিজের ঘরে থাকায় মেয়ের ফেরা টের পাননি।দরজা সেঁজুতি চাবি দিয়ে খুলেছে।রুমে ঢুকেই সেঁজুতি সিটকিনি টেনে দিলো।ওয়াশরুমে গিয়ে পানির সব গুলো ট্যাব খুলে রেখে বসে পরলো ভেজা মেঝেতে।হাউমাউ করে কাঁদলো। রুদ্রর কথা যত মাথায় আসছে তত দ্বিগুন হচ্ছে কান্না।সেঁজুতি চিৎকার করে বলল

‘ আমি আপনাকে ভালোবাসি রুদ্র।ভালোবাসি আপনাকে।পারলাম না,নিজের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রন করতে।পারলাম না তাদের আটকাতে।সেই আপনাকে ভালোবেসেই ফেলল ওরা।কিন্তু, আমি চাইলেও যেতে পারছিনা আপনার কাছে।চাইলেও বলতে পারছিনা মনের কথা।আপনি একটা চরিত্রহীন।যার প্রত্যেকটা রাত কাটে ভিন্ন ভিন্ন মেয়ে নিয়ে, কোন ভরসায় তার কাছে যাব আমি?কোন ভরসায় তাকে জীবন সঙ্গী বানাব?আমি না খেয়ে থাকব,গাছতলায় ঘর বাঁধব,তবুও একজন চরিত্রহীন লোককে কাছে টানবনা।কিছুতেই না।

____
টি টেবিলের ওপর কাঁচের এস্ট্রে। একটু একটু করে হাতের সিগারেট এর পুড়ে যাওয়া অংশ ফেলছে রুদ্র।ছাদের দিক মাথা তুলে ধোয়া ছাড়ছে।কী আয়েশী ভঙ্গি তার!যেন এই মুহুর্তে এমন সুখকর কাজ দ্বিতীয়ও টি নেই।
রুদ্রর বাম দিকে চিন্তিত মুখ করে বসে আছে এরিকা।কিন্তু রুদ্র ভ্রুক্ষেপহীন। এরিকা নিজেকে অনেকক্ষন সংযত রাখলো।শেষে আর না পেরে বলেই ফেলল ‘আপনার কি মনে হয় এতে কাজ হবে??

রুদ্র নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল,
“হবে বলেই করছি। রুদ্র রওশন কখনও অকাজ করেনা।

“কিন্তু হিতে বিপরীত হলে?

রুদ্র ঘাড় কাঁত করে তাকালো,
“আপনার ভালোবাসার ওপর আপনার বিশ্বাস নেই এরিকা?
“থাকবেনা কেনো?
এরিকার দৃঢ় কন্ঠ।রুদ্র সামনে ফিরে বলল,
“তবে এমন প্রশ্ন করার যে কোনও মানেই হয়না।আমাকেও তো দেখতে হবে আমার ভালোবাসার জল কত দূর অব্ধি গড়ায়!
ছাড়ুন ওসব।আমার আতিথেয়তা কেমন লাগছে বলুন।
এরিকা হাসলো,
‘খুব ভালো।

____

দু সপ্তাহ কেটে গেলো।এই মাসের শেষ দিকে আবির-সেঁজুতির বিয়ে। মাঝখানে আংটি পরাতে আসেন আবিরের মা মনোরমা।সাথে আবির- হোসাইন ও আসেন।সেঁজুতি নিরস মুখে শাড়ি পরে তাদের পাশে বসলো।একটা বার মুখ তুলে দেখলোনা সামনে হাসি হাসি মুখ করে বসা আবিরকে।আমির হোসাইন কতবার যে একে অন্যের দিকে চেয়ে তৃপ্তির হাসি দিলেন তার হিসেব ছিলোনা।দুজন ভীষণ খুশি।বন্ধুত্ব এবার আরো জোড়ালো হবে।কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো আংটি পরাতে গিয়ে।বাক্স খালি।হীরের আংটিটা হঠাৎই গায়েব দেখে মনোরমা যেন আঁতকে উঠলেন।চিল্লিয়ে বললেন ‘ একী আংটি কই?বাক্স তো খালি।
সবার তখন চোখ বেরিয়ে আসে।মাথায় বাঁজ পরলো প্রত্যেকের।এ আবার কী অলুক্ষনে কথা! আংটি পরাতে এসে আংটিই পাচ্ছেনা?ঠিক হলো আবার একটা আংটি কিনে আনা হবে।এক্ষুনি।কিন্তু বাঁধ সাধলো আবির।আমতা-আমতা করে বলল ” একবার যখন আংটি হারিয়েছে তার মানে বাঁধা পরেছে আম্মু।আংটি বদল বাদ দাও।একবারে বিয়ের দিন পড়িও না হয়?
মনোরমা খুঁতখুঁত করলেন।কিন্তু নিরব সেঁজুতি আগ্রহ দেখালো এবার।জানালো সেও একমত।এমনিতেই আংটি পরা থেকে নিজেকে কীভাবে বাঁচানো যায় সেই কথাই ঘুরছিলো মাথায়।সুযোগ পেয়ে লুফে নিলো। ছেলে মেয়ের দুজনেরই যখন একি মত তখন আর কেউ গাইগুই করলেন না।মেনে নিলেন।তবে মনোরমা গলার চেইনটা খুলে পরিয়ে দিলেন সেঁজুতি কে।মন ভরে দোয়া করলেন দুই স্বামী- স্ত্রী।শেফালি রাতে কাজে এলেও ঐদিন সকাল সকাল চলে এলো।আমির বলেছিলেন,সাথে অন্য একটা কারন।বাটন ফোন চেপে চেপে একটু পরপর রুদ্রকে সব খবরাখবর দিচ্ছে সে।এমনকি কাল রাতে রান্না করার সময় সেঁজুতির কান্নার শব্দ শুনেছে তাও জানালো।তার কাজইতো এটা।সেঁজুতি মাস শেষে বেতন দিলেও রুদ্রর থেকে বাড়তি টাকা পায় শেফালি।তাও সেঁজুতির সব খুঁটিনাটি খবর রুদ্রকে পাঠিয়ে।এই বাড়ির ঠিকানা দিয়ে সেদিন তো রুদ্রই তাকে পাঠালো।

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে আবিররা চলে যায়।আমির মেয়ে জামাইয়ের জন্যে আংটি গড়েছিলেন,কিন্তু ওই কথায় আর পড়াননি।সেঁজুতিও চুপচাপ উঠে রুমে ঢোকে।দরজা আটকেই সাথে সাথে টেনে পড়নের কাপড় খুলে ফেলে।ডুকরে ডুকরে কাঁদে বিছানায় শুয়ে।শেফালী কান সজাগ করে শুনছিলো সে শব্দ।যখন নিশ্চিত হলো সেঁজুতি কাঁদছে তখন চট করে একটা বানান ভুলে ভরা মেসেজ পাঠালো রুদ্রর ফোনে।সেঁজুতি বিছানার চাদর খামছে কাঁদছিলো।রুদ্রকে একটাবার দেখার তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ।কিন্তু রুদ্র তার বিশ্বাসের অযোগ্য বলেই সংবরন করছে নিজেকে।এমন নয় যে রুদ্র লা পাতা।মাঝখানে একদিন গভীর রাতে রুদ্র কল করে সেঁজুতি কে।রুদ্রর কল দেখেই সেঁজুতি ধড়ফড় করে রিসিভ করলো।রুদ্র তখন শীতল কন্ঠে বলল
‘একবার ভালোবাসুন না,সেঁজুতি!

জবাবে সেঁজুতি লাইন কেটে দেয়।ফোনটাকে দেয়ালের ওপর ছুড়ে মারে।ভেঙে টুকরো হয় সেটি।তারপর আর চাইলেও রুদ্র যোগাযোগ করতে পারেনি।আজ পুরো দশ দিন এক সেকেন্ডের জন্যেও রুদ্রর গলা শোনেনি সেঁজুতি। সেঁজুতিদের সব খরচ এক প্রকার জোর করে আবির চালাচ্ছে।অবশ্য আবির নয়,পেছনে মূলহোতা রুদ্র।সেঁজুতি সেসব জানেনা।
অযৌক্তিক অভিমানে তার বুক ভার হয়ে আছে।রুদ্র কেন যোগাযোগ করছেনা?ফোন ভেঙেছে বলে কী যোগাযোগ করা যায়না?উনি আমাকে আদৌ ভালোবাসেন তো?ভালোনা বাসলে আমার মত সাধারন একটা মেয়ের পেছনে কেন এতো সময় নষ্ট করলেন?কম অপমান তো করিনি ওনাকে।মুখে যা এসেছে তাই বলেছি।যে লোক কখনও কারো থেকে দু কথা হজম করতোনা সে আমার সব অপমান মুখ বুজে মানতেন।হাসতেন।তাহলে এখন কেন গায়েব হয়ে গেলেন উনি?একটা বার নিজেকে শুধরে ফিরতে পারেন না?এসে বলতে পারেন না,সেঁজুতি,তুমিই হবে আমার জীবনের শেষ নারী!যদি নাই বলবেন তবে কেন আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করলেন রুদ্র?এই বিয়ে কী করে করব আমি? কী করে?সেঁজুতি আবার কান্নায় ভেঙে পরলো।এবার আর শব্দ এলোনা বাইরে।
_____
বিয়ের বাকী মাত্র দুই দিন।সেঁজুতি মরা শরীর টা টেনেটুনে হাটছে। কথা বলছে,হাসছে সবার সাথে।
বিছানার ওপর বিছিয়ে রাখা বিয়ের বাজার।আজই আবিরদের ড্রাইভার দিয়ে গেলেন।বিয়ের জন্যে কনভেনশন হল ও ভাড়া করা শেষ। সেঁজুতিদের আত্মীয় স্বজন নেই।যা লোক সব আবিরদের। এক ধ্যানে বিয়ের শাড়ি,গয়নার দিক চেয়ে আছে সেঁজুতি। হাটুতে থুতনী রাখা।রক্তশূন্য চেহারা।তখন রুমে কারো পায়ের শব্দ পেলো।সেঁজুতি বিদ্যুৎ বেগে চোখ মুছে পেছনে তাকালো।আমির হোসাইন দুজনে একসাথে দরজায় দাঁড়িয়ে।সেঁজুতি মেকি হেসে বলল ‘ আরে তোমরা?এসোনা।
হোসাইন- আমির ভেতরে এলেন।সেঁজুতি বলল,

” কেমন আছো আংকেল?

আজ আর হোসাইন হাসলো না।চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ তীব্র।পাশেই নিশ্চুপ আমির।হোসাইন কোনো রকম জিজ্ঞেস করলো,
” তুই কেমন আছিস?

” ভালো। তোমাদের কিছু হয়েছে?এরকম দেখাচ্ছে কেনো?

“কিছু হয়নি।
হবেওনা। যদি তুই আমাদের কথা রাখিস।

সেঁজুতি ভ্রু কোঁচকালো,
“কি কথা?
হোসাইন ইতস্তত করলেন,
” কিভাবে যে তোকে কথা টা বলি?

” সিরিয়াস কিছু হয়েছে নাকি?বলোনা?
বাবা তুমি বলোতো কি হয়েছে?

আমির আর্তনাদ করে বললেন ‘ আমি? না না আমি জানিনা,হোসাইন জানে।
হোসাইন রেগেমেগে তাকালেন,
” আমি জানি? আমাকে ফাসিয়ে দিচ্ছিস তাইনা?? বল তুই-ই বল,আমি পারবোনা বাবা।

সেঁজুতি অধৈর্য,
” উফফ কি হয়েছে বলবে তো??
আমির বললেন,
” আসলে হয়েছে কি…

” কি?
হোসাইন মিনমিন করে বললেন,
“আসলে সেঁজুতি তোর সাথে আবিরের বিয়েটা আমি দিতে পারবোনা মা।

চলবে।

#প্রনয়
#নুসরাত সুলতানা সেজুতি
পর্ব–৩১

সেঁজুতি থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে।মাত্রই কর্নকুহর হলো আবিরের সাথে বিয়েটা হচ্ছেনা।হতভম্ভ হয়ে একবার বাবাকে দেখছে তো আরেক বার হোসাইনকে। দুজনেই মাথা নিঁচু করে রেখেছেন।বিয়ের সিদ্ধান্ত টা যে তাদের যূগল পাঁকামোর ফল তাতো এড়াবার জো নেই।
“তোমরা প্লিজ আমাকে একটু ক্লিয়ার করে বলবে সবটা? কোনও সমস্যা হয়েছে কি?

জবাবে চুপ থাকলো আমির।মেয়ের রাগ কে ভীষণ ভয়।হোসাইনের ওপর দ্বায় দিয়ে চুপ থাকাই শ্রেয় এই মুহুর্তে। ওপর নিচ হালকা মাথা দোলালেন হোসাইন।

সেঁজুতি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি হয়েছে?
” আবির বিয়ে করতে পারবেনা।ও বিবাহিত।
সেঁজুতি চমকে ওঠে।চোখ পিটপিট করে বলল,
“কী বলছো?

“হ্যা। এক বছর আগে সিঙ্গাপুরের এক মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে।আর কালই মেয়েটাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে।মেয়েটা প্রেগন্যান্ট।

সেঁজুতি কিছুই বুঝলোনা,
“এক বছর আগে বিয়ে করেছে? তবে ও বিয়েতে রাজী কেনো হয়েছিলো?

” সেসব বলছেনা।জিজ্ঞেস করলে বলেছে তোকেই বলবে।জানিস, মেয়েটা অন্যান্য বিদেশী মেয়েদের মতো নয়।বেশ ভদ্র,আর আবিরের জন্য মুসলিম হয়েছে।এরপরেও কি করে না মেনে নিয়ে থাকতে পারি বল??

হোসাইনের চোখেমুখে অসহায়ত্ব। সেঁজুতির রাগ হচ্ছে আবিরের ওপর।বিয়ে করবেনা আগে বলতে পারলোনা?শুধু শুধু এত কষ্ট পেলো সে।আবার খুশিও লাগছে বিয়ে হবেনা ভেবে।এটাইতো চাইছিল ও।কিন্তু ভেতরের খুশিটা ধরা দিলোনা কাউকে।মেকি দুঃখি ভাব নিয়ে বলল,

“বিয়ে যখন করেছে মেয়েটা তোমার বাড়ির বউ।মেনে না নিয়ে যাবে কোথায়?আর সব থেকে বড় কথা, ভালোবাসে ওরা দুজন দুজন কে।

“কিন্তু আমি তো চেয়েছিলাম তুই আমার পুত্র বধু হবি। হোসাইন মন খারাপ করে বললেন।
সেঁজুতি বিড়বিড় করলো ‘ খুব বাঁচা বেচেছি। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করা যে কী কঠিন! তুমি জানবেনা আঙ্কেল।মুখে বলল,
“আল্লাহ হয়তো চাননি,,ওনার মর্জিই তো সব।
আমির পাশ থেকে বললেন,
” হ্যারে মা, তোর রাগ হচ্ছেনা আমাদের ওপর?

সেঁজুতি সোজাসাপটা বলল,
— না।তোমাদের ওপর হচ্ছেনা।তবে আবিরের ওপর মারাত্মক রাগ লাগছে।এক বছর আগেই বিয়ে করে এত নাটক করলো কেন?আর আগেই বা এসব জানালো না কেনো?

হোসাইনও মেজাজ নিয়ে বললেন,
‘হতচ্ছাড়াটাকে তো মারতেও পারিনি নতুন বউয়ের সামনে।তবে আমি ওর সাথে কথা বলা একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছি।ঠিকই তো, বিয়ে করেছিস তো বাসায় জানাবিনা?,তোর সাথে ওর বিয়ে নিয়ে আমরা আগাতাম তাহলে? সমস্ত আত্মীয় স্বজনরা জেনে গিয়েছেন।আমাদের সন্মান থাকলো কই?

“বাদ দাও।যা হবার হয়েছে।

“আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলবি?

” বলো!
হোসাইন আশাবাদী কন্ঠে বললেন,
“তুই তো আমাকে তোর বাবার মতোই ভাবিস তাইনা?
সেঁজুতি হেসে ফেলল,

“বাবার মতো ভাবিইনা।বরং ভালো ও বাসি।
হোসাইন মুগ্ধ হাসলেন।আমিরের দিক তাকালেন।আমির ও হাসছেন খুশিতে।হোসাইন সেঁজুতির দিক ফিরলেন,ওর হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“আমার একটা অনুরোধ রাখবি?

” এভাবে বলার কী আছে আঙ্কেল?বলোনা কি বলবে!
হোসাইন খানিক সময় নিয়ে বললেন,
“ওই তারিখেই তোর বিয়েটা দিতে চাই আমরা।

সেঁজুতি চকিতে তাকালো। স্তব্ধ সে।হোসাইনের মুঠো থেকে হাত দুটো বিদ্যুৎ বেগে বার করে আনলো।অস্পষ্ট আওয়াজে বলল
“কি!
হোসাইন আশা ছাড়লেন না।জ্বিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন,

“আমার কলিগ মিস্টার মেহরাব।যিনি তোর বাবার ট্রিটমেন্ট করিয়েছিলেন? ওনার ছেলে রাফসানকে আমি ছোট বেলা থেকে চিনি।প্রতিষ্ঠিত, দেখতে ভালো,ভদ্র।তোকে সব দিক থেকে সুখে রাখবে।

সেঁজুতি বাকরুদ্ধ।একবার বাবার দিক তাকালো।আমির আশা নিয়ে চেয়ে আছেন।অপেক্ষা করছেন মেয়ের উত্তরের।সেঁজুতি ক্ষীন স্বরে বলল,

” কি বলছো এসব আংকেল?চেনা নেই জানা নেই৷ কে না কে?

হোসাইন ব্যাস্ত কন্ঠে বললেন,
” চেনা নেই তো চিনে নিবি।বিশ্বাস রাখ মা,রাফসান খারাপ ছেলে নয়।ও সত্যিই ভালো।খারাপ হলে কী আমি তোর সাথে ওর বিয়ে ঠিক করতাম?
আমি নিজে কথা বলেছি ওর সাথে।

সেঁজুতি গলায় দলা পাঁকানো কান্না কোনো রকম রোধ করে বলল ‘
” এটা হয়না।

“কেনো হয়না রে মা?আমারও ইচ্ছে আর তোর বাবারও!
সেঁজুতি বাবার দিক চেয়ে বলল ‘ তুমিও তাই চাও?
আমির নরম কন্ঠে বললেন
” এছাড়া এখন আর উপায় নেই রে সেঁজুতি। তোর আঙ্কেল কার্ড বিলিয়েছেন।ওর সন্মান জড়িয়ে এখানে।তাছাড়া ওর ওপর আমার আস্থা রয়েছে।ও নিশ্চয়ই তোর যোগ্য কাউকে বেছে আনবে।

সেঁজুতির খুব বলতে মন চাইলো,’ আর আমার ইচ্ছে?তার কোনো দাম নেই?যাকে জীবনে কোন দিন দেখিনি তাকে বিয়ে করব?আর যাকে ভালোবাসি ভুলে যাব তাকে?কী করে পারব?
কিন্তু বলা হলোনা।জ্বিভ অসাড় হয়ে এলো ।রুদ্র ঠিক থাকলে হয়ত বিয়ের বিষয় এতদূর গড়াতোইনা।প্রথম দিনই বাবাকে জানাতো, সে অন্য কাউকে মন দিয়ে বসেছে।

আমির মেয়েকে নিরুত্তর দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
” তোকেতো আমি কতবার জিজ্ঞেস করেছি,কাউকে পছন্দ কীনা।তুই কোনো উত্তর দিলিনা।তাহলে বিয়ে তুই আমার ইচ্ছেতেই করতে চাচ্ছিস,আমি এরকমই ধরে নিয়েছি।তবে আপত্তি কোথায়?যদি তোর জীবনে অন্য কেউ থাকতো আমি কখনওই এমন সিদ্ধান্ত তোর ওপর চাপাতাম না। নেই যখন,কেন অমত করছিস মা?কত লোক জেনে গিয়েছে কাল বাদেই তোর বিয়ে।সেখানে বিয়েটা না হলে যে আমাদের দুজনার সন্মানই শেষ।
সবই এখন তোর হাতে।

সেঁজুতি পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো।ফর্সা চেহারা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।জ্বিভ ঠেলে বের হতে চাইছে রুদ্রর নাম।কিন্তু পারছেনা।ওই যে,ভরসার খাতা শূন্য।আবেগের বশে জীবনে এমন কাউকে জায়গা দেবেনা যার মধ্যে চরিত্রের ছিটেফোঁটাও নেই।
আমির হোসাইন একে অন্যকে দেখছেন।মেয়ে কী রাজি হবে?হোসাইন নম্র কন্ঠে শুধালেন,
” কিরে মা! কিছুতো বল।তুই কী রাজি?

সেঁজুতির উত্তর এলো সময় নিয়ে।কোনও রকম বলল,
” যা খুশি করো।
সেঁজুতি আর দাঁড়ালোনা।কাউকে কিছু বলার সূযোগ ও দিলোনা।দৌড়ে বেরিয়ে গেলো ছাদের উদ্দেশ্যে।

একটু পরপর পায়ের ওপরে ওঠানো পা টা নাড়াচ্ছে রুদ্র।নীঁচের ঠোঁট চেপে ধরে গভীর চিন্তায় মগ্ন সে।একীরকম চিন্তিত উপস্থিত প্রত্যেকে। আবির শুধালো,
“এই রাফসানের চ্যাপ্টার টা মাঝখানে কিভাবে এলো বলুন তো!
রুদ্র গম্ভীর কন্ঠে জবাব দেয়

” নো আইডিয়া।

“কি করবেন এখন?আপনার কথা মতো সবই তো করলাম।আর প্ল্যান অনুযায়ী সব পার্ফেক্টলি এগোচ্ছিলোও।মাঝখানে বাবা সব ঘেটে দিলো একেবারে।
কথাটা বলে একটু দম নিলো আবির।বেশ উতলা সে।রুদ্র তার এত বড় উপকার করলো আর সে কীনা কিছুই করতে পারছেনা ওর জন্যে?

“আচ্ছা মি:রুদ্র এক কাজ করলে হয়না?
রুদ্র সরু চোখে তাকালো, আবির উদ্বগ নিয়ে বলল,
আবির গমগমে কন্ঠে বলল,
” আমরা যদি রাফসান ব্যাটাকে হুমকি -ধামকি দেই?সিলেটে আমাকে যেমন মারতে লোক পাঠিয়েছেন ওরকম।লোক দিয়ে ওকেও যদি মারি?বিয়েটা না করতে বলি?ব্যাটা নিশ্চয়ই ভয় পেয়ে পালাবে?কি কেমন আইডিয়া দিলাম বলুন?

“ভেরী ব্যাড আইডিয়া মিঃআবির।

হঠাৎ পাশ থেকে বলে উঠলো অভ্র।দুহাতে দুটো কফির মগ। মাত্রই এসে দাঁড়িয়েছে।একটা মগ আবিরের দিকে বাড়িয়ে বলল,

“কফি চলবে?

“নো থ্যাংকস!
“কষ্ট করে এনেছি যখন নিয়েই নিন।
আবির রুদ্রকে দেখিয়ে বলল,
‘ ওনাকে দিন।

“ভাই এই সময় কফি খায়না।এটা আপনার জন্যেই এনেছিলাম আমি,নিন।

আবির নিলো।ছোট একটা চুমুক দিয়ে অভ্রর দিকে তাকালো।হেসে বলল,

” বাহ! ভালো বানিয়েছেন।
অভ্র পাশে বসতে বসতে জবাব দেয়,
-“থ্যাংক ইউ!তবে আমি বানাইনি,সার্ভেন্ট বানিয়েছে,,আমি নিয়ে এসেছি মাত্র।

আবির হেসে উঠলো স্বশব্দে।পরক্ষনে রুদ্রর চিন্তিত মুখ দেখে হাসি থামিয়ে ফেলল।অভ্রকে শুধালো,

“,আমার আইডিয়া টা খারাপ কেনো? বললেন না যে…
অভ্র কপালের পাশ চুলকে বলল,
” খারাপ এই জন্যে, রাফসান কে আপনি হুমকি দিয়ে বিয়ে করতে আটকাবেন।দুনিয়াতে আরো অনেক ছেলে আছে আবির,কতোজন কে আর ধরে রাখতে পারবেন আপনি?

আবির মাথা নেড়ে সহমত পোষণ করলো। ঠিক কথা।
“তাহলে আমাদের কি করা উচিত এখন?

‘ আপাতত কিছুই করবোনা।সব টাই সেঁজুতির ওপর ছেড়ে দেবো।
এ পর্যায়ে রুদ্র মুখ খুলল,ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘পরিষ্কার করে বল।
রুদ্রর আগ্রহে অভ্র উৎসাহ পেলো।মুখে রাখা কফিটুকু গিলে বলল,

” লিসেন ভাই!তুমি হয়তো সেঁজুতির জন্যে ঠিক করা প্রত্যেক টা ছেলেকে সরিয়ে বিয়ে আটকাতে পারবে।সে ক্ষমতা তোমার রয়েছে।অথবা চাইলে সেঁজুতিকে তুলে এনে জোর করে হলেও ওকে নিজের করতে পারবে। কিন্তু এতে কি সেঁজুতির ভালোবাসা পাবে তুমি?? পাবেনা।বরং ওনার থেকে তোমার দুরুত্ব আরো বাড়বে

রুদ্রর মুখে ঘন কালো আঁধার নামলো।অভ্রর প্রত্যেকটা কথাই ঠিক।মৃদূ কন্ঠে বলল,
‘ তাহলে কি করতে বলছিস?
রুদ্রর গলাটা অভ্রর কাছে কেমন অসহায় শোনালো।ভালোবাসলে মানুষ এতটা অসহায় হয় বুঝি?অভ্র উঠে এসে রুদ্রর কাঁধে হাত রাখলো।

‘ ওনাকে সময় দাও ভাই।আবিরের ধারনা সত্যি হলে সেঁজুতি তোমাকে ভালোবাসে।আর ভালোবাসলে উনি নিশ্চয়ই সব ছেড়েছুড়ে ফিরবেন।
কি মিস্টার আবির, ঠিক বলছি তো?

আবির মাথা দোলালো,
— হ্যা। একদম,সত্যি বলছি। এ কদিনে সেঁজুতিকে দেখলে বুঝতে পারতেন।যতবার আমার সাথে বেরিয়েছে,রাস্তায় কাউকে দুর থেকে দেখলেও ভাবতো ওটা আপনি।ইনফ্যাক্ট আমাকে ডাকতে গিয়ে স্যার ডেকে ফেলতো।কতো টা কষ্টে যে
হাসি চাপিয়ে রাখতাম তখন।

রুদ্র সূক্ষ্ণ হাসলো।শান্তি পেলেও স্বস্তি মিললোনা।আবিরের ধারনা যদি ভুল হয়?সেঁজুতি যদি না ফেরে?কিন্তু শেফালি যে বলেছে সেঁজুতি কাঁদছিলো?কেন কাঁদছিলো মেয়েটা?আমার জন্যে?নাকী বাবাকে ছেড়ে যাবে সেজন্যে?রুদ্রর চিন্তার ধ্যান কাটে অভ্রর কথায়,
” ইয়েস! এই জন্যেই বলেছি সেঁজুতির ওপর ব্যাপারটা ছেড়ে দিতে।দেখা যাক না উনি কি করেন?

আবির সন্দেহী কন্ঠে বলল,
” কিন্তু দেখতে গিয়ে যদি বিয়ে টা হয়ে যায়?

‘ হবেনা।শেষ সময়েও যদি দেখি অপেক্ষার ফল শূন্য। তবে আপনার পদ্ধতিই কাজে লাগাবো না হয়।
অভ্রর কন্ঠ দৃঢ়,আবির উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,

-” আরে এতো সময় আপনি পাচ্ছেন কই?কাল বাদে পরশুই বিয়ে।

‘ ব্যাপার না।সময় মতো সব সেট করে ফেলব।
কি ভাই ভালোবাসায় ভরসা আছে না তোমার?

রুদ্র উঠে দাঁড়ায়।চুল গুলো পেছনের দিক ঠেলে গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,

” আমি দেখতে চাই সেঁজুতি ঠিক কি করেন?উনি চাইলে বিয়ে করে নেবেন।আমি জোড় করে ওনাকে পেতে চাইনা।ভালোবেসে পেতে চাই।অবশ্য আমার ভালোবাসার মানুষ গুলো আমার থেকে সব সময়ই দূরে চলে যায়।এটাতো নতুন নয়।অন্যান্যবারের মতোন এবারো হজম করে নেবো না হয়!বিগড়ে যাওয়া রুদ্রটাই আবার ফেরত আসবে।ক্ষতি কি?

শেষ কথাগুলোয় রুদ্রর গলা ভেঙে এলো।অভ্র আবির দুজনেই মুখ কালো করে দেখলো রুদ্রর চলে যাওয়া।দুজনেরই খারাপ লাগছে।অভ্রর কষ্ট হচ্ছে।ভাইয়ের জন্যে কী কিছুই করতে পারবেনা ও?মনে মনে দৃঢ় সংকল্প নিলো,

‘ তোমার ভালোবাসাকে ব্যার্থ হতে আমি দেবনা ভাই।একবার যে অন্ধকার,নারীসঙ্গ থেকে তুমি বেরিয়েছ কিছুতেই ও পথে ফিরতে দেবনা।সেঁজুতি তোমাকে অনেক বদলেছে।তোমার গম্ভীরতা ঠেলে ভেতর থেকে প্রানচ্ছ্বল তুমিটাকে টেনে বের করেছে।কী করে আবার আগের মতো হতে দেই তোমাকে?জীবনে প্রথম বার কাউকে ভালোবেসেছো তুমি।ব্যার্থ হবেনা।আমি যেটুকু বুঝছি তাতে সেঁজুতি তোমাকে ভুল ভাবছে।আর ওনার সেই ভুল টাই ভাঙাতে হবে আমাকে।আমার জন্যে অনেক করেছো ভাই ,,আর তোমার জন্যে যদি এইটুকু করতে না পারলাম,তবে কেমন ভাই মেনেছি তোমাকে আমি?

চলবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ