Friday, June 5, 2026







প্রনয় পর্ব-১৪+১৫

#প্রনয়
# নুসরাত সুলতানা সেজুতি 🍁
পর্ব- ১৪

বাড়িতে ঢুকেই কাঁধ ব্যাগটা দূরে ছুড়ে ফেলে, বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পরলো সেজুতি।ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে।শরীর আর কাজ করছেনা যেন।
প্রথম দিনেই এতো এতো কাজ! বাপরে বাপ!এত কাজ তো কোনো পুরোনো এমপ্লয়িকেও দেয়া হয়না।সব যে রুদ্রর ইচ্ছাকৃত সেঁজুতি হাড়েহাড়ে বুঝেছে।পুরো দশটা ঘন্টায় তাকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো লোকটা। চৌদ্দবার কেবিনে ডেকেছে,একবার এই ফাইল চেক করো তো আরেকবার অন্য ফাইল নিয়ে এসো।একবার ওই ডেস্কে এর কাছে যাও তো আরেকবার অন্য ডেস্কে আরেকজনের কাছে যাও।ছুটতে ছুটতে আজ অবস্থা দফারফা। পা গুলোর অবস্থাও করুন।এমনিতেই খুব বেশিক্ষন দাঁড়ানো বা ছোটাছুটি তার ধাতে নেই।ক্লাশ টেনে থাকতেই বাঁতের ব্যাথা শুরু হয়।তারপর থেকেই ছোটাছুটি বন্ধ।যাকে বলে একপ্রকার নিষিদ্ধ।সেঁজুতি বালিশে মুখ গুজে বিড়বিড় করলো ” বদের হাড্ডি, অসভ্য,বদমাশ।
তখনি রুমে ঢুকলেন আমির।মেয়ের ছুড়ে ফেলা কাঁধব্যাগ মাটি থেকে তুলে টেবিলের ওপর রাখলেন।মেয়ের দিকে নরম চোখে তাকালেন তারপর ।সেঁজুতি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছে।আমির প্রশ্ন ছুড়লেন,
” অফিসের প্রথম দিন বোধ হয় খুব খাটুনী গেলো আম্মা?
বাবার স্বর শুনে ফিরে তাকালো সেঁজুতি। উঠে বসতে বসতে বলল ‘ ওই আরকি বাবা! খেয়েছো তুমি?
” না।একসাথে খাবো বলে তোর জন্যে বসে ছিলাম।
সেঁজুতি দেয়াল ঘড়িতে চোখ বোলালো,উৎকন্ঠা নিয়ে বলল
‘সেকি!দশটা বাজে এখনও খাওনি?
সেঁজুতি ব্যাস্ত ভঙ্গিতে নামতে নামতে বলল,
‘আমি এক্ষুনি ফ্রেশ হয়ে আসছি তুমি গিয়ে টেবিলে বসো

” সব হবে।এত তাড়াহুড়ো করিস নাতো।ধীরে সুস্থে যা।
” আচ্ছা।
সেঁজুতি যেতে নিলে আমির পিছু ডেকে বললেন,
” বসের সাথে দেখা হলো? তা কেমন উনি? ভালো নাকী রাগী খুব?
এতক্ষন মেজাজ যেটুকু ভালো ছিলো এবার সেটুকুও উবে গেলো সেঁজুতির।লোকটার কথা মনে করলেও তার রাগে জ্বলে ওঠে শরীর।সেঁজুতি কিড়মিড়িয়ে বলল
— ওই বদ টার কথা আর বলোনা তো বাবা,,
আমিরের চোখ কপালে উঠে এলো মেয়ের সম্বোধন শুনে,
— সেকিরে!বদ? প্রথম দিনেই বসের নামে এমন নিন্দে করছিস?কি করেছেন কি উনি? খুব খাটিয়েছে?

— খাটিয়েছে কী?কি করেন নি তাই বলো,আমাকে দিয়ে এই এত্তগুলো কাজ করিয়েছে( হাত দিয়ে দেখিয়ে)
আমির মৃদূ হেসে বললেন,
— বেতন কি আর এমনি এমনি দেবে রে?কাজ তো করাবেই।

— তাই বলে এত্ত?সব ওই রুদ্র রওশনের ইচ্ছাকৃত, আমি জানি।তুমি জানোনা।
আমির ভ্রু কোঁচকালেন,
— কি নাম বললি?
সেঁজুতি ছাড়া ছাড়া কন্ঠে বলল,
— রুদ্র রওশন চৌধুরী।

“রুদ্র রওশন মানে, ওই বিজনেসম্যান রুদ্র রওশন?

— হু।
আমির মনে করার ভঙ্গিতে বললেন,
— দাড়া দাড়া,এই লোকটা তো,এই লোকটা তো সেদিন আমাদের বাসায় এসেছিলেন।
রীতিমতো তোকে শাসিয়ে গেলেন ওইদিন।

সেঁজুতি সতর্ক চোখে তাকালো।রুদ্রকে আমির চিনবে স্বাভাবিক। কিন্তু রুদ্রর বাড়িতে আসার ব্যাপারটা তো তার জানার কথা নয়।উনিতো পরিচয় লুকিয়ে এসেছেন।সেঁজুতি কৌতুহলী হয়ে বলল,
— আমাকে শাসিয়ে গিয়েছিলো? কবে?

— সেদিন তুই ছিলিনা।ওই যে তুই হাসপাতালে হোসাইনের কাছে ছিলি,তোকে একটা লোক পৌঁছে দিতে এসেছিলেন??

সেঁজুতি জোরে দুবার মাথা ঝাঁকালো ‘ হু হু

-ওইদিন সকাল বেলা এসেছিলেন।
সেঁজুতি চট করে এসে বিছানায় বাবু হয়ে বসলো।আগ্রহ নিয়ে বলল ‘ পুরোটা বলোতো বাবা।কেন এসেছিলেন উনি?
আমির একটা দমফেলে একে একে পুরো ঘটনাটাই খুলে বলল।সব শুনে ক্ষুব্ধ সেজুতি।রাগ না হয়ে পারলোনা।লোকটা বাড়িতে এসে শাসিয়ে গিয়েছেন।তাও আমার বাবাকে?? কি ভাবেন টা কি নিজেকে?শর্ট টেম্পারড লোক একটা।কোন কুক্ষনে যে ওনার বিপদে সাহায্য করতে গেলাম!
______
মিঃ নেহাল উদ্দিন এর সাথে কাল মিটিং ফিক্সড করবি।দুপুর ১২টা থেকে একেবারে দুটো অব্ধি।
অভ্র অবাক কন্ঠে বলল,
— টানা দু ঘন্টা?? উনি কি রাজী হবেন ভাই??
— টাকার জোরে হবে।
হাতে একটা কালো ব্রিফকেস নিয়ে অভ্রর সামনে রাখলো রুদ্র।ভেতর টা দেখতেই অভ্রর চোখ কোটর ছেড়ে বার হয় যেন।এতগুলো টাকা?রুদ্র গম্ভীর স্বরে বলল
‘ এটা ওনাকে দিবি।
অভ্র জিজ্ঞাসু মুখ চোখে কিছুক্ষন চেয়ে থাকলো।পরে মাথা নেঁড়ে বলল,
— ওকে ভাই।
বরাবরের মতো রুদ্রকে সে কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারেনি।দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্রিফকেস সমেত নিজের রুমে এলো।জানলা গলিয়ে আকাশের দিক চেয়ে ভাবলো,
‘ আর খুব বেশি দেরি নেই।এবার মেন্টাল এসাইলোমে আমার জন্যে একটা সিট বুকিং দিতেই হবে।ভাইয়ের থ্রিলিং ক্যারেক্টরের মানে বুঝতে গেলে আমার আধপাগল হওয়া ছাড়া রাস্তা দেখছিনা।এতো গুলো টাকা দিয়ে একটা লোককে মিটিং এ ব্যস্ত রাখার কারন কী?

করুদ্র কফি মগ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।ঠান্ডা বাতাস আর কফির গরম ধোঁয়ায় মিশ্র অনূভুতি হচ্ছে। নেহালের সাথে মিটিং টা জরুরী।বিদেশী কোম্পানির সাথে অনেক গুলো ডিল ঝুলে আছে।নেহাল উদ্দিনের সই একান্ত প্রয়োজন। ব্যাবসার শুরুর দিকে এই লোকটা পার্টনারশিপে ছিলো।অল্প সময়েই রুদ্র হিসেবে পাকাপোক্ত হলো।তারপর আলাদা করলো কোম্পানি।আর রুদ্রর কোম্পানি এখন নেহাল কেও ছাড়িয়েছে।কিন্তু তাও,বিদেশে তাদের একচ্ছত্র কোম্পানির কথাই সবাই জানে।কারন,নেহাল মাঝবয়েসী, অভিজ্ঞ লোক।রুদ্রর মতো অল্পবয়সী দুদিন মাঠে নামা লোকের সাথে এত বড় বড় ডিল ফাইনাল করতে তাদের ভাবতে হয়।যদিও পরে, পার্ফমেন্সে প্রত্যেকে স্যাটিসফাইড হয়।তাও শুরুর দিকে ঝামেলা করতে মন চায়না রুদ্রর।এখনও কিছু ক্ষেত্রে নেহালের সাইন দরকার পরে।আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহারই করে লোকটি।প্রচন্ড ধূর্ত বলে হিউজ টাকা দাবী করে।কখনও মিটিং রাখতে গড়িমসি করে।রুদ্র অনেকবার অনেক টাকা অফার করেছিলো, কোম্পানি আলাদা হওয়ার একটা প্রমান হিসেবে নেহাল কে সই করতে বলে।নেহাল ইনিয়েবিনিয়ে এড়িয়েছে।রুদ্র ইচ্ছে করলেই করতে পারতো অনেক কিছু।কিন্তু মাঝেমাঝে তার ও আলসেমি লাগে।সব সময় সবাইকে ভয়ে তৎপর রাখতে ভালো লাগে?নেহাল চায়না রুদ্রর কোম্পানি তাকে আরও ছাড়াক।অথচ রুদ্রর ভয়ে মুখ ফুঁটে বলেনা।রুদ্র হাসলো।কফির মগে চুমুক দিলো।ভাগ্যিস আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটা গুপ্ত যোগাযোগ আছে তার।যার দরুন ক্ষমতার সব ব্যাবহারই করে থাকে।আর এই ভয়েই অনেকে তার কোনো ক্ষতি করতে চেয়েও পারেনা।নেহাল অনেক ব্যাস্ততা দেখাবে কাল, রুদ্র জানে।তার পাঠানো কর্মচারীকেও ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করাবে কাজের ছুঁতোয়।কিন্তু তাও না বলতে পারবেনা।আর এই কাজের জন্যে এখন একমাত্র সেঁজুতির নামটাই মাথায় এলো রুদ্রর।মেয়েটির ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়া যাবে এবার!

===
পরেরদিন🍁
সেঁজুতি আজ তিক্ত মেজাজ নিয়ে অফিসে ঢুকেছে।রুদ্রর অফিসে কাজ করতে হচ্ছে ভাবলেই তার গা গুলোয়।নারী সঙ্গে ডুবে থাকা একটি লোকের এসিস্ট্যান্ট সে মনে পড়লেই রাগ আসে।আর সেই রাগ কয়েকশ গুন বৃদ্ধি পেলো ডেস্কে গিয়ে।রীতিমতো চোখ কপালে উঠে এলো।
পুরো ডেস্ক এর টেবিল টা ফাইল দিয়ে ভর্তি।এক ইঞ্চি জায়গা যদি থাকে! হাত রাখাও দ্বায়।চেয়ারে বসার দরকার না পরলে হয়তো চেয়ারেও ফাইল রাখতো।সেঁজুতির মাথা ঘুরে এলো।খেয়াল করতেই দেখলো ফাইলের ওপর ছোট্ট একটা কাগজ লাগানো।এককথায় চিরকুট। সেঁজুতি হাতে নিয়ে পড়লো,
“এক ঘন্টার মধ্যে সব ফাইল জমা চাই।
এবার সেঁজুতির অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়’ এত্তো গুলো? মাত্র এক ঘন্টায়?
সেঁজুতি মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসলো।
— কাল কম ছিলো কিন্তু আজ??এতো কম সময়ে এতো গুলো সলভ কি করে করবো?? হায় আল্লাহ!! কোন দিক থেকে শুরু করবো, কোনটা শেষ করব কিছুইতো বুঝতে পারছিনা।

” হ্যালো মিস…
সেঁজুতি যখন মন দিয়ে ফাইল ঘাটছে।পাশ থেকে ভেসে এলো পুরুষালী স্বর।সেঁজুতি ঘাঁড় বাঁকা করে ফিরলো।লম্বাচওড়া একটি ছেলে।মুখে হাসি লেপ্টে রেখেছে যেন।সেঁজুতি একে কশ্মিন কালেও দেখেছে বলে মনে পড়ছেনা।অফিসেরই কেউ হয়তো।সৌজন্যে হেসে বলল,
‘ জ্বি বলুন?

লোকটা ভ্রু নাঁচালো’ অফিসে নতুন??
‘জ্বি।
“আমি রুপক,,আপনার সামনের ডেস্ক টা আমার ডেস্ক।
‘ওহ আচ্ছা।আমি নুসরাত সুলতানা।
রুপকের বাড়ানো হাতে হাত মেলালোনা সেঁজুতি।সে ভীষণ ব্যাস্ত। রুপকের অস্বস্তি লাগলো।হাত গুটিয়ে এনে মেকি হেসে বলল,
‘ সুন্দর নাম।
সেজুতি বেশ ভালো বুঝলো রুপক ছেলেটি তার সাথে ভাব জমাতে এসেছে।অন্য সময় হলে এক কথা।কিন্তু এখন একটা সেকেন্ড তার কাছে অনেক কিছু।দুচার লাইন কথা বলতে গেলেও সময় নষ্ট হবে।
যা আগামী এক ঘন্টাতে একদম ই করা যাবেনা।
কিন্তু রুপক দাঁড়িয়েই আছে।উশখুশ করছে। কিছু বলবে বলবে ভাব।সেঁজুতি আবার তাকালো।মিষ্টি করে হেসে বলল
‘বলছিলাম যে বস আমাকে একটা কাজ দিয়েছেন। উইল ইউ প্লিজ এক্সিকিউজ মি?
একেবারে মুখের ওপর বলে দিলো? রুপকের চেহারায় ঘনিয়ে এলো অন্ধকার।সে বেশ অপমানিত বোধ করেছে।পেছন ফিরে একবার রুদ্রর কেবিন টাকে দেখলো।এরপর আবার সেঁজুতির দিক ফিরে মুখে হাসি টেনে বলল,
‘ নিশ্চয়ই!আপনি কাজ করুন।পরে কথা হবে।
রুপক চলে যেতেই সেঁজুতি মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল।তারপর ডুব দিলো ফাইলের কঠিন কঠিন ইংরেজিতে।
_____
রুদ্র চোখ সরিয়ে ল্যাবটবে রাখলো।ফিচেল হাসি তার ওষ্ঠে।মেয়েটার মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার তো নিশ্চয়ই আছে।মুখের ওপর কথা বলার কি দারুন ক্ষমতা!সেঁজুতিকে কাজের তীব্র চাপে রেখে একই সাথে বিরক্ত করার এক দুষ্টু বুদ্ধি ভর করেছিলো মাথায় ।অফিসের ড্যাশিং বয় হিসেবে আখ্যায়িত
রুপককে সেঁজুতির কাছে পাঠালো তাই।ছেলেটির সাথে খোশগল্প করতে করতে , কাজে ব্যাঘাত ঘটবে সাথে সময় মতো ফাইল জমাও হবেনা। এমনই ভেবেছিলো রুদ্র।আর সেই সুযোগে সেঁজুতি কে আবার কিছু কঁড়া কথা শোনাবে।তেঁজী মেয়েটার চুপসে যাওয়া চেহারাটা উপভোগ করবে মন ভরে।
অথচ তার কিছুই হলোনা। সেজুতি মুখের ওপর এমন ভাবে কথা টা বললো যে বেচারা রুপক থতমত খেলো।সন্মানের ভয়ে আর দাঁড়াতেই পারেনি।

কিন্তু কতক্ষন?
রুদ্র দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো এক ঘন্টা হতে আর কয়েক মিনিট বাকি।বাঁকা হাসলো,
দেখা যাক।কত দূর কি করতে পারেন উনি।
এক ঘন্টা পার হয়েছে অনেকক্ষন।সেঁজুতি ফাইলের মধ্যে নাকানিচুবানি খাচ্ছে তখনও।খানিক পর সব গুছিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলল সেঁজুতি। এসির মধ্যেও চিন্তায় তার ঘাম ছোটার জোগাড়। রুদ্রর কেবিনের দরজায় নক করতেই ভেতরে আসতে বলল সে।সেঁজুতি ডানে বামে না তাকিয়ে সোজা এসে ফাইল গুলো রুদ্রর টেবিলের ওপর রাখলো।নিঁচের দিক চেয়েই বলল ‘ চেকিং শেষ স্যার।
রুদ্র সরু চোখে দেখছে মেয়েটাকে।পিঠ সমান চুল গুলো ঝুঁটি করে বাঁধা।ক্রিম কালারে থ্রি পিস পড়নে।হাতে একটা কালো বেল্টের ঘড়ি,কানে কালকের দুল জোড়াই,আর ঠোঁটে লিপবাম।রুদ্র পরক্ষনেই নঁড়ে উঠলো।এই মেয়েটা সামনে এলে তাকে এত খুঁটিয়ে দেখে কেন? কী আছে এর মধ্যে?কিছু নেই।রুদ্র স্বাভাবিক হলো। কিয়ৎ সময়েও তার সাড়া না পেয়ে মুখ তুলল সেঁজুতি। স্পষ্ট কাটাকাটা অক্ষরে বলল ‘ স্যার!সব গুলো চেক করেছি আমি।
রুদ্র এবার দেয়াল ঘড়িতে চোখ ইশারা করে বলল,
— বাট ইউ আর টুয়েন্টি মিনিটস লেট।আমি এক ঘন্টা বলেছিলাম।

সেঁজুতির মেজাজ এমনিই খারাপ।রুদ্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে মন চাইছে তার।এত গুলো ফাইল যে সে এক ঘন্টা বিশ মিনিটে সলভ করলো সেটা দেখলোনা।সময় টাই বড়? ভদ্র ভাবে বলল
‘অনেক গুলো ফাইল তো তাই একটু সময় লেগে গেলো।

রুদ্র কঁড়া কন্ঠে বলল,
— এটা আপনার স্কুল নয় মিস সেজুতি।যে সর্দি জ্বরের অজুহাত দিয়ে আপনার হোম ওয়ার্ক না করার শাস্তি থেকে বেঁচে যাবেন।ইটস আ অফিস।এখানে প্রত্যেক টা কাজ টাইমলি হতে হবে মানে টাইমলি।গট ইট??

সেঁজুতি বাধ্যমেয়ের মতো মাথা ঝাঁকালো।মানে সে বুঝেছে।রুদ্র অবাক না হয়ে পারলোনা।সাথে ভালোও লাগলো। যে মেয়ে কাল এই কেবিনেই চাকরী করবেনা বলে চিৎকার চেঁচামেচি করলো সেই মেয়েই আজ কতটা নির্লিপ্ত,কতটা শান্ত।নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা সত্যিই অসাধারন।
‘ গুড।
রুদ্রর কথা শেষ হতেই সেজুতি যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালো।পারলোনা।আটকে গেলো রুদ্রর গম্ভীর আওয়াজে,
‘আপনাকে যেতে বলেছি আমি??
সেঁজুতি ঘাঁড় ফেরালো।ভ্রু কুঁচকে বলল ‘ তো কী করব?
রুদ্র ক্ষেপে গেলো যেন,
‘ বসের মুখের ওপরে প্রশ্ন করছেন?ভদ্রতা বলতে কিছুই জানেন না?
সেঁজুতি দাত কপাটি পিষে ধরলো।কটমট করছে তার চোয়াল। বিপাকে ফেলে এখন কথা শোনাচ্ছেন তাইনা মিঃ বস?? কোনও ব্যাপার নয়,,কর্মচারী যখন,তখন সহ্য তো করবই।
আস্তে করে বলল ‘স্যরি!
রুদ্র তুষ্ট হেসে বলল,
— ভেরী গুড।একদিনেই ম্যানার্স শিখে গিয়েছেন দেখছি।এনি ওয়ে আপনাকে এখন এক জায়গায় যেতে হবে।
সেঁজুতি সহজ ভাবেই শুধালো,
‘ কোথায় যাব?
রুদ্র ল্যাবটবে চোখ দিলো।ব্যাস্ততা দেখালো হয়ত।জবাব দিলো ঠান্ডা স্বরে,
‘ উত্তরাতে!মিঃ নেহাল উদ্দিন এর অফিসে,ঠিকানা ম্যানেজারের থেকে নিয়ে যাবেন।
‘ ওখানে গিয়ে আমার কাজ?
রুদ্র চোখা চোখে চাইলো।দৃষ্টি বুঝে চোখ নামালো সেঁজুতি। মিনমিন করে বলল,
‘ স্যরি!
রুদ্র ঠোঁট বাঁকালো,অথচ গলা শক্ত করে বলল,
‘আগামী দু দিন আমাদের বোর্ড মিটিং রয়েছে। আপনাকে সেজন্যে ওনার শিডিউল নিয়ে আসতে হবে এবং সেটা দুপুর একটার মধ্যে।আর হ্যা শিডিউল নিয়ে তবেই আসা চাই।আপনি নিশ্চয়ই বুঝেছেন আমি কী বললাম?
সেঁজুতি ছোট করে বলল ‘ হু।
রুদ্রর দৃঢ় জবাব,
‘হু নয়। বলুন ‘ওকে স্যার।
সেঁজুতি দাঁত চিবিয়ে বলল
‘ ওকে স্যার।
”now go!
______
যানজট পেরিয়ে আসতে আসতে বারোটা বেজে গিয়েছে প্রায়।সহ্য শক্তি যেটুকু ছিলো সেটুকুও অবশিষ্ট রইলোনা এখানে আসার পর।রিসেপশনে গিয়ে জানলো নেহাল উদ্দিন ব্যাস্ত।এক্ষুনি দেখা হবেনা।অপেক্ষা করতে হবে।আগামী এক ঘন্টায়ও সে ব্যাস্ততা শেষ হলোনা।ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে থাকতে সেঁজুতির হাতে পায়ে ঝিম ধরে গেলো।কতক্ষন পায়চারি করলো,কতক্ষন বসলো এভাবেই পার করলো সময় টুকু।আরেকবার,
রিসেপশনে গিয়ে দাড়ালো সেজুথি,,
— এক্সকিউজ মি!ওনার মিটিং আর কতক্ষন??
লোকটি এবার অধৈর্য হলো,ভ্রুয়ে দৃশ্যমান হলো দু তিনটে সূক্ষ্ম ভাঁজ।
— ম্যাম বললাম তো আপনি ওয়েট করুন,মিটিং শেষ হলেই আপনাকে ডাকবো আমি।
সেঁজুতি দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
— ওকে।সেঁজুতি তিতিবিরক্ত।
সেই একই কথা মিটিং এ আছেন,মিটিং এ আছেন।এদিকে যে প্রায় ১ টা বাজতে চললো তার কি হবে? উফফ কি কুক্ষনে যে এই জব টা করতে এসেছিলো সে আল্লাহই জানে।দেরী করলে লোকটা আবার কথা শোনাবে। ব্যাগ থেকে ফোন বার করে বাবার নাম্বার এ ডায়াল করতে যাচ্ছিলো সেঁজুতি।কল ঢুকলোনা।এর আগেই ফোনের স্ক্রিনে অচেনা নম্বর জ্বলে উঠলো।চাপ লেগে রিসিভ ও হলো সঙ্গে সঙ্গে।
‘ আসসালামু আলাইকুম! কে?
ওপাশ থেকে উত্তর এলো সময় নিয়ে।গুমোট স্বরে কেউ বলল,
— কোথায় আপনি?আওয়াজ শুনেই
কান থেকে ফোন নামিয়ে স্ক্রিনে একবার চোখ বোলালো সেঁজুতি।ফোন আবার কানে ধরতেই কেউ ধৈর্য হীন কন্ঠে বলল,
‘শুনতে পাচ্ছেন না?

‘ স্যার,আমি নেহাল উদ্দিনের অফিসেই আছি। আসলে উনি…
রুদ্র থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘আসল নকল রাখুন।১টা বেজে পাঁচ মিনিট অথচ আপনার ছায়াও অফিসে পরেনি।আদৌ কাজ টা করতে পেরেছেন তো?
সেঁজুতি যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে বলল,
‘স্যার উনি মিটিং রুমে রয়েছেন।আমাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।ওনার মিটিং শেষ না হওয়া অব্দি ঢুকতে দেবেনা।মিটিং শেষ হলেই আমি…
” আমি কোনো এক্সকিউজ চাইনি।

সেঁজুতি অন্যদিক তাকিয়ে ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ফেলল।দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো।লোকটাকে তার একদম সহ্য হয়না।রুদ্র কিছু একটা ভেবে বলল,
‘ বেশ ঠিক আছে, আপনাকে সময় দিলাম।শত হলেও আপনি আমার পি..এ, এইটুকু দয়া আপনাকে করাই যায়,,বাট আই ওয়ান্ট হিজ শিডিউল।এ্যাট এনি কস্ট।ওকে?
রুদ্র ফট করে লাইন কাটলো।
সেজুতির ইচ্ছে হলো ফোন টা কে আছাড় মারতে।
অসহ্য!দয়া করছেন আমাকে?? কে চেয়েছে ওনার দয়া?বারবার এসব বলে আমাকে ছোট করার কি আপ্রান চেষ্টা ওনার!এতো বড় একজন বিজনেস ম্যান এভাবে হাত ধুঁয়ে আমার পেছনে কেনো পরলো ?আর এই নেহাল উদ্দিন না বেহাল উদ্দিন?? ওনার মিটিং কি আজকেই পরতে হলো।ইচ্ছে করছে এক ঘুষিতে দুটোর নাক ই ফাটিয়ে দেই।
সেঁজুতির অপেক্ষার অবসান ঘটলো আরো কিছুক্ষন পর। মিটিং শেষ হলো।রিসেপশনিস্ট থেকে এলো কাঙ্ক্ষিত ডাক।সেঁজুতি তিরিক্ষ মেজাজ শীতল হলো মুহুর্তেই।নেহাল উদ্দিনের এসিস্ট্যান্ট এসে নিয়ে গেলেন সেঁজুতি কে।কেবিন দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন উনি।সেঁজুতি আলতো হাতে নক করলো।
— মে আই কাম ইন স্যার?

— ইয়েস,,
সেঁজুতি ভেতরে ঢুকলো।কাঁধে ব্যাগ।অন্য হাতে ফাইল।সামনে তাকিয়ে চেয়ারে বসা নেহাল উদ্দিন কে দেখলো একবার।একটু হেসে সালাম দিলে নেহাল ও হেসে জবাব দেয় সালামের।
একবার পা থেকে মাথা অব্ধি পর্যবেক্ষন করে নেয় সেঁজুতির।এইতো, এই চাউনীই ভয় পায় সেঁজুতি। এতক্ষন ধরে রাখা কনফিডেন্স গুলিয়ে গেলো মুহুর্তেই।এক ঝাঁক ভয়,অস্বস্তি বাসা বাঁধলো মনে।নেহাল সেঁজুতি কে বসতে বললেন।সেঁজুতি বসলো।নেহাল কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে।মনে হলো,মাপঝোঁক করছে শরীরের।সেঁজুতি দু চারবার করে ওড়না টানছে। লোকটা চোখ দিয়ে গিলছে তাকে।পেট ভরছে তো ওনার?

চলবে….

#প্রনয়
#নুসরাত সুলতানা সেজুথী
পর্ব — ১৫

নেহালের কেবিন রুদ্রর মতো নয়।রুদ্রর মতো ফুটবলের মাঠ নিয়ে বসেনি উনি।ঠিক যত টুকু জায়গা দরকার ততটুকুই ব্যাবহার করেছেন কেবিন হিসেবে।সেঁজুতি চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখলো।বিশেষ কিছু চোখে লাগলোনা।এখান থেকে বাইরেটাও দেখা যায়না।সেঁজুতি নেহালের দিকে তাকালো।তিনি এখনও ওর দিকে চেয়ে।কেমন অদ্ভূত দৃষ্টি। টেবিলের মুখোমুখি চেয়ারে বসে আছে সেজুথি আর অপর পাশে নেহাল।নেহাল টুকিটাকি কথা বলছেম।মুখের থেকে লোকটার চোখ চলছে বেশি। শরীরের দিকে তাকাচ্ছেন বারবার।ব্যাপার টা যতবার ই সেজুথি বুঝতে পারছে তত বার ই নঁড়েচড়ে গাট হয়ে বসছে।

— স্যার! তবে কি আপনি মিটিং ফিক্সড করতে রাজি আছেন?
সেঁজুতি মৃদূ কন্ঠে শুধালো।নেহাল বললেন,

‘আপনার বস এতো ঘনঘন মিটিং কেনো চাচ্ছেন? আমার নিজেরও কিছু কাজ থাকে তাইনা?হূটহাট বললেই তো হয়না।
সেঁজুতি রুদ্র অার নেহালের ব্যাপারে আগামাথা কিছুই জানেনা।এ প্রেক্ষিতে তার উত্তর কী হওয়া উচিত জানেনা সেটাও।চুপ থাকবে নাকী উত্তর দেবে এই নিয়েই দ্বিধাদ্বন্দে ভুগলো।নেহাল জিজ্ঞেস করলেন,

— হ্যালো মিস,,কিছু ভাবছেন??
সেঁজুতি মাথা নেঁড়ে বলল,
— জ্বি? না।
নেহাল চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
“মিটিং ফিক্সড করতে আমার কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু শিডিউল আমি এক্ষুনি দিতে পারছিনা।কোথায় কোন মিটিং আছে চেক করতে হবে। আমি না হয়, শিডিউল আপনাদের অফিসে আমার এসিস্ট্যান্ট কে দিয়ে পাঠিয়ে দেবো।

সেঁজুতি ব্যাস্ত কন্ঠে বলল,
— না,না স্যার,আপনার কষ্ট করে পাঠাতে হবেনা।আমরা ব্যাবস্থা করেই রেখেছি।
সেঁজুতি ফাইল থেকে কাগজ বের করে নেহালের সামনে রাখলো।
” এই দেখুন স্যার,এই পেপার্স এ সমস্ত কিছু উল্লেখ করাই আছে। আপনি শুধু পুরো টা পড়ে সাইন করে দেবেন।তাহলেই হবে।
নেহালের মেজাজ বিগড়ালো।ভাবলো এই সুযোগে রুদ্রকে আরেকটু ঘোরাবে।চতুর লোকটা একটা ফাঁক ও রাখেনা মাছি পালানোর।মেকি হেসে বলল,
— ওহ আই সি,,,

খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজের সব লেখা পড়লো নেহাল।তুষ্ট কন্ঠে বলল,
বাহ! টাইম মেইনটেইন তো বেশ ভালোই করেছেন।এরকম টাইমিং এ আমার কোনও আপত্তি থাকবেনা,। আমি সাইন করে দিচ্ছি…

‘ধন্যবাদ স্যার,

— পেন?

সেঁজুতি কলম এগিয়ে দেয়।নেহাল যেন সুযোগ সন্ধানী । কলম নেয়ার অজুহাতে নিজের হাত দিয়ে সেজুথির হাতে স্পর্শ করলো।ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মেজাজ খারাপ হলেও সেজুথি কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালোনা।বা দেখাতে পারলোনা।

— নিন।

— ধন্যবাদ স্যার,এবার তবে আমি উঠি।
সেঁজুতি সন্তর্পনে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো।এতক্ষন লোকটার সামনে দম আটকে বসে ছিলো যেন।পৃথিবীর সব পুরুষই কী এমন?নারীদের শরীরেই তাদের আকর্ষন।সেঁজুতি উঠে দাড়াতেই ডেকে উঠলো নেহাল,

– শুনুন। আপনার পুরো নাম?

‘নুসরাত সুলতানা স্যার।

‘ ওকে মিস নুসরাত,
চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো নেহাল।নেহাল কে এগোতে দেখে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চাইলো সেজুতি। নেহাল ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। দাঁত বার করে হাসলো।সেঁজুতি এলোমেলো দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকাচ্ছে।কেন যেন গলা শুকিয়ে আসছে।অজানা আসঙ্কায় আড়ষ্ট শরীর। নেহাল সেঁজুতির পা থেকে মাথা অব্দি চোখ দিয়ে মাপলো।সেঁজুতিকে স্তব্ধ করতে দু আঙুল দিয়ে গালে স্লাইড করে বলল
“ইউ আর সো বিউটিফুল লেডি!
প্রসংশা শুনলে খুশি হওয়া উচিত।অথচ নেহালের বলার ভঙ্গিতে খুশির বদলে ফুঁসে উঠলো সেঁজুতি। তার ওপর লোকটা গায়ে হাত দিলো।সেঁজুতি একরকম ঝাঁড়া মেরে গাল থেকে নেহালের হাত টা সরিয়ে দিলো।শান্ত অথচ ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
“আপনি আমার বসের সহকর্মী।বয়সেও আমার বাবার মতোই।তাই আপনার ভদ্রতা বজায় রাখা দরকার স্যার।

সেঁজুতি ভাবলো ব্যাপারটা এখানেই মিটে যাবে।নেহাল হয়তো অতোটাও অভদ্র হবেন না।নেহাল কে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলো।কিন্তু নেহাল তাকে ভুল প্রমান করলো নিমিষেই। খপাৎ করে হাত চেপে ধরলো নেহাল।সেঁজুতি বিস্ফোরিত চোখে তাকালো।নেহাল ভ্রু কুঁচকে বলল

” দেমাগ দেখাচ্ছো? তা ভালো।সুন্দরী মেয়েদের একটুআকটু দেমাগ না থাকলে ঠিক জমেনা।দেমাগী মেয়েদের বশ করতেও আমার খুব আনন্দ লাগে। কিন্তু এত্ত দেমাগ আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই।সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিসের আবার কীসের এত অহংকার!
সেঁজুতির মাথায় যেন বাঁজ পরলো।সেকেন্ড হ্যান্ড দিয়ে কী বোঝালো লোকটা? নেহাল কুটিল হেসে বলল,
” রুদ্র রওশনের বয়স যখন ২২, তখন থেকেই ওকে চিনি আমি।ওর সব খুঁটিনাটি জানি।রাতে ওর নারী সঙ্গের কথা বিজনেস এরিয়ার কে না জানে?আর তুমিতো সেখানে ওর পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট।সব পার্সোনাল কাজেই রুদ্রর তোমাকে দরকার তাইনা?প্লিজ এখন এটা বলোনা যে ওর সাথে বিছানায় যাওনি এখনও।রুদ্রর আশেপাশে যেসব মেয়েরা ঘুরঘুর করে সবাই ওর সাথে বেড শেয়ার করার জন্যে উঠেপরে লাগে।আর সেখানে তুমিতো এত্ত সুন্দরী। তোমাকে কি আর রুদ্র রওশন ছেড়ে দিয়েছে? শুধু শুধু নাটক করছো। আমার কথা মন দিয়ে শোনো,একবার ভেবে দেখো,ওই রুদ্র রওশনের থেকে বেডের টাকা বাড়িয়ে দেবো তোমাকে ,আর সাথে আমার পার্ফমেন্স ও ভালো হবে।চিন্তা নেই।

সেঁজুতি নিজেকে আর সংযত করতে পারলোনা।নেহাল থামতেই ঠাস করে এক চড় বসালো গালে।নেহাল হকচকালো প্রথমে।শরীরের সমস্ত রক্ত টগবগিয়ে ফুটে উঠলো তাৎক্ষণিক।গালে হাত বোলালো নিজের।হাটুর বয়সী মেয়ের থাপ্পড় খেলো সে? নেহাল যেন বিশ্বাসই করতে পারলোনা। ক্রোধে জ্বলে উঠলো চোখ দুটো।আগের থেকেও শক্ত করে চেপে ধরলো সেঁজুতির হাত।দাঁত পিষে বলল

— দুই টাকার মেয়ে!এতবড় সাহস তুই নেহাল উদ্দিন এর গায়ে হাত তুলিস?আজ তো তোকে এখানেই….

সেঁজুতির কপালে সূক্ষ্ণ ঘাম।ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে।নেহাল এগিয়ে আসতেই পেছাতে শুরু করলো।কাঁপা গলায় বলল
” এ…এগোবেন না…দে…দেখুন আ..আমি কিন্তু চিৎকার করবো..লোক জড়ো করবো…
নেহাল তাচ্ছিল্য হাসলো,পৈশাচিক আনন্দে হৈ হৈ করে বলল,
” চেঁচা না,চেঁচা। যত পারিস চেঁচা। রেপ হবি আর না চেঁচালে হয়?আমিওতো মজা পাবোনা।এটা আমার অফিস। এখানে সবাই আমার গোলাম,তোর চিৎকার শুনলেও কেউ কিচ্ছু করতে আসবেনা।অবশ্য শুনবেই বা কিভাবে রুম টাই তো সাউন্ডপ্রুফ।হা হা হা।
নেহাল অট্টহাসিতে ফেঁটে পরলো। সেঁজুতির চোয়াল ঝুলে পরলো ওর কথা শুনে।পেছাতে পেছাতে দেয়ালেও পিঠ ঠেকে এলো।নেহাল তড়িৎ গতিতে সেঁজুতির গাল চেপে ধরলো এক হাতে।অন্য হাতে সেঁজুতির এক হাত শক্ত ভাবে বন্দি।নেহাল ঠোঁট এগিয়ে আনতেই চট করে ওর সারা মুখে পারফিউম স্প্রে করে দিলো সেজুতি।আচমকা হামলায় নেহাল ভঁড়কালো।স্প্রে চোখে নাকে ঢুকে গিয়েছে। জ্বলে যাচ্ছে সব।সেঁজুতি মাথা থেকে বেরিয়ে গেলো নেহালের।হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠলো।
সেঁজুতি বিজয়ের হাসি হাসলো।উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
— এখানে চিৎকার করে কোনও লাভ নেই বেহাল মশাই।সাউন্ড প্রুফ রুম বানানোর মজা বোঝ এবার।
কথাটা বলেই জোরে নিজের পা দিয়ে একটা লাথি বসালো নেহালের পায়ের আঙুলের ওপর।বেচারা একেতো চোখ ডলছিলো।পায়ের ব্যাথায় চিৎকার করে ওঠে আবারো। দৌড়ে টেবিলের কাছে আসে পানির গ্লাস হাতরাতে।বিড়বিড় করে বলল ‘ মা** তোকে মজা দেখাচ্ছি দাঁড়া।

সেঁজুতিকে আর পেলেতো?সেই কখন সে সুযোগ বুঝেই পগারপার।
_______
সি এন জি তে সারাটা রাস্তা কেঁদেছে সেঁজুতি। কাঁদতে কঁদতে হেচকি উঠেছে।বুদ্ধি করে না বাঁচলে আজ তার কী হতো? নেহাল নিশ্চয়ই তাকে ছিড়েখুঁড়ে খেতো।হয় মেরে ফেলে লাশ গুম করতো আর নাহলে ছেড়ে দিতো আশ মিটিয়ে।ওভাবে বাঁচলেও বা কী! ওটাতো মরার মতোই।জীবন্ত লাশ এক কথায়।সেঁজুতির সব রাগ ক্ষোভ গিয়ে পরলো রুদ্রর ওপর। অফিসে ঢুকে সোজা সে রুদ্রর কেবিনের দিকে ছূটলো।রুদ্র তখন গভীর মনোযোগে কাজ করছে। সেঁজুতির আসা টা লক্ষ্য করেনি। সেঁজুতি কোনও কিছুতে তোয়াক্কা করলোনা।রুদ্র অফিসের মালিক রীতিমতো ভুলে বসলো কথাটা।নক না করেই গটগটিয়ে রুদ্রর কেবিনে ঢুকলো।
তীব্র ক্রোধে হাতের ফাইলটাকে ছুড়ে মারলো রুদ্রর মুখের ওপর। অতর্কিত হামলায় রুদ্র হতভম্ব হয়ে সামনে তাকালো।সেঁজুতি শূন্য অভিব্যাক্তি তে চেয়ে আছে।চোখ মুখ ফুলে ফেঁপে একাকার।রুদ্রর সেসবে খেয়াল নেই।একটু আগের ঘটনাটাই ঘুরেফিরে মাথায় ঢুকলো তার।
রাগে চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো, চিৎকার করে বলল,
— হোয়াট দ্যা হেল,,,ইজ দিস?? তোমার সাহস কি করে হয় আমার গায়ে ফাইল ছুড়ে মারার?
রুদ্রর চিৎকারে ঈষৎ কেঁপে ওঠে সেঁজুতি।
অথচ ঘাবড়ায়না।রুদ্রর মতোই পালটা চিৎকার ছুড়ে বলল

— এসব কি হচ্ছে সেটাতো আপনি আমাকে বলবেন। ইচ্ছে করে আমাকে এতো টা অসন্মান করিয়েছেন আপনি তাইনা?আপনার শিখিয়ে দেয়া কাজ ই করেছে ওই নেহাল তাইতো?
সেঁজুতির গলা বুজে এলো।
চোখদুটো আবার ভিজলো টলটলে পানিতে।রুদ্র ভ্রু কোঁচকালো।মেয়েটা কাঁদছে কেন? নরম স্বরে বলল,

— মানে?
সেঁজুতি চেয়ারে বসে পরলো।টেবিলে দুহাত রেখে মাথা গুজে হুহু করে কেঁদে উঠলো।রুদ্র চমকালো।উঠে এসে সেঁজুতির পাশে দাঁড়ালো।উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
— কি হয়েছে মিস সেজুতি? আপনি কাঁদছেন কেন?আমাকে বলুন….
সেঁজুতির কান্না থামলোনা।পিঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে।রুদ্র একবার ছুঁতে গিয়েও হাত গুটিয়ে আনলো।মোলায়েম কন্ঠে বলল

— কি হলো,, আমাকে বলুন…কাঁদছেন কেনো আপনি??
সেঁজুতি চোখ তুলল।নাকের ডগা টা টকটকে লাল।ভেজা চোখের পাঁপড়ি।আর কেঁপে ওঠা ঠোঁট দুটোতে রুদ্র কিয়ৎ সময় গুলিয়ে যায়।তাল কাটে সেঁজুতির কথায়। নাক টেনে টেনে কাঁদতে কাঁদতে পুরো ঘটনাটাই রুদ্রকে বলল সেঁজুতি।
রুদ্র যেন বাকরুদ্ধ,বিস্মিত। নেহাল লোকটা খারাপ সে জানে কিন্তু এত দূর এগোবে সেটা ভাবেনি।ভাবলে সেঁজুতি কে কখনওই পাঠাতোনা।ক্ষুব্ধ রুদ্রর হাত মুঠো হয়ে এলো তাৎক্ষনিক।কপালের নীলাভ রগ দৃশ্যমান হলো। জ্বলন্ত চোখে আগুন দাউদাউ করছে যেন।
সেঁজুতি তখনও কাঁদছে।ফর্সা গালে অশ্রু কনা শিশিরের মতো লাগছে।রুদ্র জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলো।ঘুরে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসে বরফ কন্ঠে বলল

— মিস সেজুথি,এটা অফিস, আপনার কান্নার জায়গা নয়।
সেঁজুতির চেহারা রক্তশূন্য হয়ে এলো।অবাক চোখে তাকাতেই রুদ্র না চেয়েই বলল
‘এভাবে তাকানোর কিছু নেই।এসব আজকাল অহরহ ঘটছে।এগুলো ভুলে গিয়ে নিজের কাজে মন দিন।বড় বড় বিজনেসম্যান দের চরিত্রে এরকম একটু আকটু দোষ থাকে।
রুদ্র ল্যাবটবে কাজের ব্যাস্ততা দেখালো।

— হ্যা যেমন আপনার আছে।তাইনা…?
সেঁজুতি উত্তেজিত হয়ে পরলো রাগে।রুদ্রর প্রতি যেটুকু আস্থা অবশিষ্ট রইলো ধামাচাপা পরলো সেটুকুও।দাঁত চেপে কথা গুলো বলে উঠে দাড়ালো সেজুতি।পরমুহূর্তেই রাগে ফুঁসে বলল,
“ভেবেছিলাম আপনি যেমন ই হোন না কেনো একটা মেয়ের সন্মান হানি করতে চাওয়ার বিচার টা অন্তত করবেন।কিন্তু আমি ভুল ছিলাম,,আপনারা সব এক।সব।সেঁজুতি হনহন করে কেবিন ছেড়ে বের হয়। রুদ্রর মাঝে হেলদোল দেখা গেলোনা।ভাব এমন সেঁজুতির কথা কানেই ঢোকেনি তার।সে ব্যাস্ত।মহাব্যাস্ত।
___
সেঁজুতি অফিস থেকে ফিরেছে অনেকক্ষন।সারাটা অফিস মন মরা হয়ে থাকলেও বাড়ি এসেই মন ভালো হয়েছে মোটামুটি। আমির তিন রঙের সেমাই রেঁধেছে সেঁজুতির জন্যে।যেটা দেখতেই মুখে হাসি ফুটেছে। ছোট থেকেই এই সেমাই টা তার ভীষণ প্রিয়।কত গুলো রং একসাথে দেখা যায়।রঙিন সেমাই বেশ আনন্দ নিয়ে খেতো সে।আজ ও তাই।সব মন খারাপ ঝেরে ফেলে সেঁজুতি ফ্রেশ হলো।এক বাটিতে বাবার জন্যে আরেকটায় নিজের জন্যে সেমাই বেড়ে বাবার পাশে এসে বসলো ।আমির তখন টিভিতে চ্যানেল পাল্টাচ্ছেন।সেঁজুতি এক চামচ সেমাই মুখে তুলতে তুলতে টিভির দিকে তাকালো।হঠাৎ একটা চ্যানেলে চোখ আটকালো তার।তড়িঘড়ি করে বলল
‘বাবা দাঁড়াও দাঁড়াও,,আগের চ্যানেল টাতে দাও
তো,,
সেজুথির কথায় চ্যানেল পালটে আগের চ্যানেল ধরলো আমির।

-ব্রেকিং নিউজ……

“””””””””উত্তরার বিজনেসম্যান নেহাল উদ্দিনের মরদেহ উদ্ধার….”””””””””””””””””””
সেঁজুতির খাবার গলায় আটকে এলো।চোখ যেন কোটর ছেড়ে লাফিয়ে আসে।এটাতো সেই নেহাল উদ্দিন।

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ