Saturday, June 6, 2026







ঝরে_যাওয়া_বেলীফুল পর্ব_৯

ঝরে_যাওয়া_বেলীফুল
পর্ব_৯
লেখিকা : আফরোজা আক্তার

সকাল বেলা মিনু বেলীকে দেখে অনেকটাই অবাক হয়ে যায় । সে ভেবেছিল আজ সকালে এখানে অন্যকিছু হবে । হয়তো সে দেখবে তার বেলী ভাবী আর নেই । তাই রান্নাঘরে বেলীকে দেখে অনেক চমকে যায় মিনু । মিনু এদিক ওদিক তাকিয়ে পা টিপে টিপে বেলীর কাছে যায় ।

– ওই ভাবী , ভাবী,,,,,,,?
– জ্বি , বলো মিনু , ঘুম ভেঙেছে তোমার ?
– আপনে কি বেলী ভাবী ,,,,?
– এটা কি বলো মিনু ?
– একটা চিমুর দেই ?
– এই মিনু কিসব বলো আবলতাবল ?
– ব্যাথা ফাইলে চিক্কুর দিয়েন ,

এইবলে মিনু বেলীর হাতে একটা চিমটি কাটে ৷ চিমটিটা বেশ জোরে কাটে সে আর বেলীও ব্যাথা পেয়ে উফফফ করে উঠে । এইবার মিনুর বিশ্বাস হয় যে এটাই আসল বেলী । এতক্ষণ সে বেলীকে বেলী নয় বেলীর ভূত ভেবেছিল ।

– চিমটি দিলা কেন ?
– আমি ভাবছি আপনে ভূত , যাক আল্লাহ সারাইছে । আপনে মরেন নাই , বাইচা আছেন ।
– কি সব বলো উলটাপালটা । যাও চোখে মুখে পানি দিয়ে আসো ।
– ভাবী ফিডাইছে নি আপনেরে ভাইয়ে ?
– মারবে কেন আমাকে ?
– হেইতে তো কতায় কতায় ফিডায় আপনেরে ।
– হ্যাঁ , তবে কাল মারে নাই ।
– কিয়াচ্ছে তাইলে ,

এইবার বেলী আসলেই বিরক্তবোধ করছে । মিনু উল্টাপাল্টা বলা শুরু করলে করতেই থাকে তো করতেই থাকে । বন্ধ আর হয় না । এদিকে ইরফানের জন্যে সব নাস্তা বানিয়ে টেবিলে সাজিয়ে দেয় বেলী । কিছুক্ষণ পর ইরফান রুম থেকে বেরিয়ে সোজা বেরিয়ে যায় বাসা থেকে । হ্যাঁ আজ ইরফান নাস্তা না করেই অফিসে চলে গেছে । বেলীর উপর থেকে রাগটা এখনও কমাতে পারেনি ইরফান । তার চিন্তা অনুযায়ী বেলী তাকে অপমান করেছে । বেলী তাকে কথা দিয়ে অপমান করেছে । সে জন্যে আজ সে বেলীর দিকে একবারের জন্যে তাকায় নি । ইরফানের এইভাবে না খেয়ে চলে যাওয়াটাও বেলীর সহ্য হয়নি । হয়তো কাল রাতে যা হয়েছিল তা ইরফানের পছন্দ হয়নি । কিন্তু বেলী কি করতে পারে , সে যে অসহায় । কাল ধরা দিলে যন্ত্রণা যে আরও কয়েকগুন বেড়ে যেতো তার । সেই যন্ত্রণা হয়তো বেলীকে একেবারেই শেষ করে দিত । মিনু এসে বেলীকে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেলীর সাথে কথা বলে ,

– ভাবী,,,,,, ও ভাবী,,,,,,?
– হু ,
– ভাইয়ে খাইয়া গেলো না ?
– উহু ,
– কিল্লাই , খাইয়া গেলো না কিল্লাই ?
– হয়তো অভিমান নয়তো রাগ ।
– অভিমান আবার রাগ , বাপুরে বাপু এডি মাতাত ঢুকে না আমার , কি হইছে খুইল্লা কইবেন নি একটু ?
– অভিমান যা প্রিয়জনের সাথে করা যায় , আর রাগ যা অপছন্দের মানুষের সাথে করা যায় । এখন আমি তো তোমার ভাইয়ের প্রিয়জন নই তাই অভিমানটা আমার জন্য প্রযোজ্য না । তাই রাগটাই হয়তো আমার জন্যে বরাদ্দকৃত ।
– কিছুই বুঝি নাই ,
– খেয়ে নেও , খেয়ে একটু হাতে হাতে সাহায্য করো আমাকে ।
– আইচ্ছা ।

এইদিকে অফিসে কাজ করে যাচ্ছে ইরফান । প্রমোশন হয়েছে তার , তার এই প্রমোশনে কোথাও না কোথাও বেলীও জড়িত । বেলী তার হয়ে সেম্পল বানিয়েছে তা যে সবার এত পছন্দ হবে ভাবে নি সে । অফিসের সবাই ইরফানকে বাহবা তো দিচ্ছে কিন্তু ইরফান তো জানে এই বাহবার আসল হকদার আসলে কিন্তু বেলী । আবার বেলীর কালকে রাতে বলা কথা গুলোও মনে পড়ে যায় ইরফানের । বেলী তাকে অপমান করেছে , তাই বেলীর উপর রাগও হচ্ছে । এরই মাঝে একটা ফোন আসে । ফোন হাতে নিতেই দেখে রুবির বাবা জাফর সাহেব ফোন দিয়েছেন । ভদ্রলোক আর সময় পেলেন না , না চাইতেও ফোনটা রিসিভ করে ইরফান ।

– আসসালামু আলাইকুম ,
– ওয়ালাইকুম আসসালাম , ইরফান কেমন আছো ?
– ভালোই , আপনি ?
– ভালো , বাসায় আসতা যদি । রুবিকে নিয়ে যাও ।
– রুবি কি ৪/৫ বছরের বাচ্চা যে আমি ও-কে নিয়ে আসবো ।
– ইরফান রাগারাগি তো অনেক হইছে , এইবার আসো ।
– আগেরবার আপনার মেয়েকে ধমক দেয়াতে আমাকে নিয়ে দরবার বসাইছেন , এইবার তো থাপ্পড় দিয়েছি , পারলে কেইস করেন ।
– ইরফান,,,,,,,,,,,,,,?
– আপনি কোন যুক্তিতে আমাকে আপনার বাসায় আসতে বলেন , আপনার মেয়ে রাত ১০ টার পর একা একা বাসা থেকে বের হয়ে গেছে , আপনার মেয়ের বিষ কত খেয়াল করছেন আপনি ? আর ও ১০০ টার মধ্যে ৯০ টা বলে মিথ্যা । ও যখন খুশি বের হয় যখন খুশি বাসায় আসে । ওর ছেলে বন্ধুদের অভাব নেই । মেয়ে বন্ধুদের কথা তো বাদই দিলাম । আমি কষ্ট করে টাকা কামাই করি আর আপনার মেয়ে তা তুষের মত উড়ায় । কেন আমার টাকার কি কোন বরকত নেই ? শুনেন , আপনার মেয়ে আমাকে কি ওর গোলাম পাইছে ? ২৪ ঘন্টা আমাকে বেলীর নামে নানান রকম কথা বলে যার মধ্যে ১০০ টাই মিথ্যা বলে । আর আমিও বলদের মত ওর কথা শুনে ওই মেয়েটাকে মারধর করছি মেয়েটা টু-শব্দ অবদি করে নাই এই পর্যন্ত । এত মিথ্যা কেন , আমি এখন অপরাধী হয়ে গেছি , কেন প্রথম বিয়ে করলাম আর প্রথম বিয়ে করার পর কেনই বা দ্বিতীয় বিয়ে করলাম । আপনার মেয়েকে একটা চড় মারাতে আপনার মেয়ে বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে । একবার কি এটা ভেবে দেখছেন যেই মেয়েটাকে আজকে ৭ টা মাস আমি আপনার মেয়ের কথায় কত গালমন্দ করছি কত মারছি ওই মেয়ে তো চুপ করে পড়ে আছে । এক কাজ করেন , আপনার মেয়েকে কেবিনেটের মধ্যে সাজিয়ে রেখে দিন , দয়া করে আমাকে বিরক্ত করবেন না । রাখতেছি , আসসালামু আলাইকুম ।

লাইন কেটে দেয় ইরফান । ইরফান লাইন কাটার পর , জাফর সাহেব গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যান । পরিস্থিতি ঘোলাটে আকার ধারণ করেছে । এখন যতই ঠিক করতে চাইবে ততই আরও সমস্যা বাড়বে । তাই আপাতত চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করছেন জাফর সাহেব । মেয়ে যখন সতীনের ঘর বেছে নিয়েছে তখন তিনি কি করবেন আর । নিজেকে ব্যর্থ বাবা ভাবা ছাড়া আর কিছুই করণীয় নেই তার ।

অন্যদিকে , রুবির বাবার লাইন কাটার পর ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করতে যাবে আবার ফোনটা বেজে ওঠে ইরফানের । এইবার মেজাজ বিগড়ে যায় । কে ফোন করেছে না দেখেই রিসিভ করে চেচিয়ে ওঠে ইরফান ।

– এই কেএএএ ?
– হেলো বাজান আমি , বেলীফুলের মায় ।

কথাটা শুনে থতমত খেয়ে যায় ইরফান । তাড়াতাড়ি কান থেকে মোবাইল সামনে এনে দেখে বেলীর মায়ের নাম্বার । অবশ্য নাম্বার সেভ করে নাই শুধু লাস্টে 359 এই তিনটা ডিজিট দেখে চিনতে পেরেছে যে এটা বেলীর মায়ের নাম্বার । ইরফান মন মনে লজ্জিত তার একবার নাম্বার দেখা উচিত ছিল , এইভাবে চেঁচানো উচিত হয়নি তাও একজন মায়ের বয়সী মহিলার সাথে । ইরফান নিজেকে দমিয়ে নিয়ে কথা বলে ,

– আসসালামু আলাইকুম , জ্বি কেমন আছেন ?
– ভালা আছি বাজান , তোমরা কেমন আছ ?
– জ্বি ভালো , কিছু বলবেন ?
– হ বাজান , বেলীফুলে কই ?
– বেলী তো বাসায় আর আমি অফিসে ।
– বাজান একটা কতা কইবার চাইছিলাম আমি ?
– হ্যাঁ বলেন ,
– আইজ্জা তো বুধবার , শুক্কুরবারে বেলীফুলের বাপের মিত্তুবাসসিকি , তোমার বাবায় মনে অয় ফোন দিবো তোমাগোরে ।
– ওহ আচ্ছা ,
– তই বাজান মাইয়াডারে লইয়া যদি আসতা গেরামে ?
– আমার তো অফিস , কিভাবে আসি ?
– আরে বাজান এমনে কইও না , মাইয়াডার বাপের মিত্তুবাসসিকি মাইয়াডায় না আইলে মনডা ছোড অইয়া যাবে বাজান ।
– আচ্ছা আমি বাসায় গিয়ে বেলীকে বলবো আপনার সাথে কথা বলতে কেমন ?
– আইচ্ছা বাজান , তইলে রাহি এহন ?
– জ্বি আচ্ছা ,
– ভালা থাহো তোমরা ,

বেলীর মায়ের লাইন কাটার পর কিছুক্ষণ ইরফান মাথা নিচু করে রাখে । অনেক কিছুই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার । ইরফান সবটা জানে না তবে তার বাবার কাছে শুনেছিল বেলীর বাবা মারা যাওয়ার দুইমাস পরই বেলীকে তার সাথে বিয়ে দেয়া হয় । বেলীর বাবার সাথে তার বাবা কথা দেয়ার ১৫ দিনের মাথাতেই বেলীর বাবার এক্সিডেন্ট হয় আর সেখানেই spot death ঘটে ।

– বেলী তখন এতিম ছিল , সদ্য বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে আমার উপর ভরসা করে ওর সব দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছিল । আর সেই আমি কিনা বিয়ের রাতেই ও-কে ? আর তারপর একদিন জুতা দিয়ে পর্যন্ত মেরেছিলাম । বাপ মরা এতিম মেয়েটা সেইদিনও চুপ ছিল আর আজও চুপ করেই আছে । কেন বুঝলাম না সেদিন ওর কষ্টটা ? কেন দেখলাম না ওর বাবা হারানোর হাহাকারটা । বেলী আমার কাছে অবহেলিত , আসলেই অবহেলিত সে আমার কাছে । তাকে তার হক দিতে কার্পণ্য করলাম আমি ৷ অথচ এই বেলীই আমার জন্যে আজও ভেবে যাচ্ছে ।

এইসব ভাবছে আর মনে মনে আফসোস করছে ইরফান । ঝোকের বশে রুবির সাথে সম্পর্ক করা আর বিয়েও করে ফেলা । সবটাই ছিল তার ভুল পদক্ষেপ । তবে এখন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে ।

[ বিঃদ্রঃ একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা না থাকা টা যে কতটা কষ্টের তা একমাত্র তারাই বুঝে যাদের বাবা নেই । এবার সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে । সেই পরিবারে যদি ছেলে থাকে তাহলে হয়তো একটু হলেও চিন্তা কম থাকে । কিন্তু যেই পরিবারে ছেলে না থেকে দুই থেকে তিনটা মেয়ে থাকে তাদের অত্যন্ত কষ্টের মাঝে দিন কাটাতে হয় । কেউ একজন বলেছিলেন , বাবা না থাকাটা তেমন কিছু না , ঘুরে দাঁড়ানোটাই প্রয়োজন । হ্যাঁ আমিও মানি তা কিন্তু একবার এটা কি ভেবে দেখেছি আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের কি হয় , তাদের মধ্যেই হয়তো একজন হয় যে বেলী হয়ে জন্মায় । যাদের শিক্ষাটাও ঠিকঠাক মত হয় না । সংসারের দায় সাড়তে গিয়ে মেয়ের ভালোর জন্য দুঃখিনী মা তো বিয়ে দিয়ে দেয় কিন্তু সবার কপালে বর ভালো পড়ে না । কেউ জুয়ারি , কেউ বা মদের নেশায় মাতাল , কেউ বা বউ পিটানোতে ওস্তাদ আর নয়তো কেউ বা নোংরা পল্লীতে যেতে মগ্ন এইসবই কপালে জুটে । ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আমিও একমত , কিন্তু আমরা কতটা নিরাপদ । যেখানে নিজের ঘরেই আমরা নিরাপদ নই । যেখানে বাবার সমতুল্য শিক্ষকের হাতে ধর্ষিত হতে হয় , সেখানে কোথাও চাকরি করাটাও যে ১০০% নিরাপদ তাও কিন্তু নয় । তবুও আমরা নারীরা পিছিয়ে থাকার পাত্রী নই । আলহামদুলিল্লাহ আমরাও সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছি । ১০০% এর মধ্যে হয়তো ৫০% মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান খুজে নিচ্ছি । আর বাকি ৫০% এর মধ্যে ৩০% স্বামীর ঘরে আলহামদুলিল্লাহ হয়তো ভালো থাকি আর বাকি ২০% হয়তো কেউ স্বামীর ঘরে কষ্ট , অনাহার , কিংবা অত্যাচার হয়ে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছি । মাথার উপর বাবার ছায়া থাকাটা অত্যন্ত আবশ্যক । বিশেষ করে মেয়েদের । একজন বাবা আর বড় ভাই থাকলে একবার মেয়েকে চোখের দেখা দেখে তো আসতে পারে । আর যাদের কপাল থেকে আল্লাহ পাক এই দুটো জিনিস কেড়ে নেন তাদের কপাল হয়ে ওঠে বেলীর মত । আবার অনেক জায়গায় বাপ মা মরা এতিম মেয়েও শ্বশুরবাড়িতে রাজরানীর মত দিন কাটাচ্ছে ৷ তারাই সেই ৩০% এর একজন । আল্লাহ পাক সকল মা বোনকে ভালো এবং সুস্থ থাকার তৌফিক দান করুন । সকল মা বাবাকে সুস্থ রাখুন । আল্লাহ পাক সকল মৃত বাবা মাকে জান্নাতবাসী করুন । আমীন ]

বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে আছে ইরফান । আজ বেলীকে একবারের জন্যেও ডাকে নি ইরফান । কফির জন্যেও বলেনি কিছু । বেলী দরজা খুলার পর সেইযে রুমে এসেছে আর বের হয় নি ইরফান । বেলী ইচ্ছা করেই কফি বানিয়ে রুমের সামনে গিয়ে দরজায় নক করে । ইরফানের সাড়া পেয়ে রুমে যায় বেলী । ইরফান তখন বিছানায় শুয়ে আছে । ‘ আপনার কফি ‘ বলে বিছানার পাশে রাখা টেবিলের উপর কফির মগটা রেখে দরজার কাছে যেতেই ইরফান ডাক দেয় বেলীকে ।

– দাঁড়া ,

ইরফানের ডাকে পা জোড়া সেখানেই থেমে যায় বেলীর । পিছনে ফিরে ইরফানের দিকে তাকায় সে । ইরফান তখন মোবাইলে কি যেনো করছিল ।

– জ্বি ,
– তোর মা ফোন করছিল , নেহ কথা বল ।
– মা ফোন দিছিলো , কখন ?
– দুপুরে , নেহ কথা বল ।

রাজ্যের সবটুকু সুখ হয়তো তার কপালে ছিল এই মুহুর্তে তার তেমনটাই মনে হচ্ছে । তখন ইরফান আবার বলা শুরু করে ,

– সেইদিনও একবার ফোন দিছিল , কাজের চাপে বলতেই ভুলে গেছিলাম আমি ।
– সমস্যা নাই , রিসিভ করে না তো ?
– আবার কল ব্যাক কর ।
– কিভাবে করে ?
– কেন তুই টাচ মোবাইল ইউজ কর‍তে পারস না ?
– আমি কখনো চালাই নাই মোবাইল , মায়ের আর বাবার বাটন মোবাইল ছিল ওইগুলাই দেখছি ।
– ওহ , দে আমার কাছে ।
– মোবাইল টা ভালোই বড় ,
– হ্যাঁ , feature 6.5 IPS LCD touch screen .
– ওহ , মায় ধরছে ?
– নাহ ,
– আরেকবার দেন ।

বেলীর কথায় ইরফান আরেকবার ফোন দেয় বেলীর মায়ের নাম্বারে । কিছুক্ষন পর বেলীর মা ফোন রিসিভ করে আর ইরফানও বেলীকে মোবাইলটা এগিয়ে দেয় । হাসি মুখে মায়ের ফোনটা কানে নিয়ে ‘ হ্যালো ‘ বলে ওঠে বেলী ।

– হ্যালো মা ,
– হেলো বেলীফুল ,
– মা কেমন আছ ?
– আমি ভালা আছি , তুই কেমন আছস ?
– আমিও ভালা আছি মা , কি করো মা তুমি ?
– পানি আনতাম গেছিলাম ।
– খাইছো নি মা ?
– হ , তোরা খাইছত নি ?
– এহনও খাই নাই মা , একটু পরেই খামু ।

বেলীর কথা শুনে ইরফান বেলীর দিকে তাকিয়ে আছে । বেলী একই মুখে দুই ধরনের কথা বলতে পারে । মায়ের সাথে কথা বলছে সে তাই আঞ্চলিক ভাষায় আবার এখানে সবার সাথে শুদ্ধ ভাষায় । বেলী যদি তেমন পড়াশোনার সুযোগ পেত তাহলে হয়তো রুবির থেকেও উপরে যেতে পারতো । তারপর হঠাৎ করেই বেলী বলে ওঠে ,

– আমি কেমনে আসমু মা ?
– তুই আইবি না ?
– ওর তো অফিস আছে মা ,
– জামাইরে বল যাতে আফিসের থিকা ছুটি নেয় ।
– দেখি মা , কাইলকা জানামু তোমারে কেমন ?
– আইচ্ছা ,
– রাখি তাইলে , ঘুমাইয়া যাও মা ।
– হু ,

বেলী জানালার পাশে এসে কথা বলছিল । খুব আস্তে আস্তেই বলছিল । কিন্তু তবুও কিভাবে জানি ইরফানের কানে পৌঁছে যায় তার কথা গুলো । এইদিকে বেলীর বুক ফেটে কান্না আসছিল , দেখতে দেখতে তার বাবা মারা গেছে একটা বছর হয়ে গেছে । বাবার মুখে বেলীফুল ডাকটা এখনও তার কানে বাজে । চোখের পানি গুলো কোন রকম আটকে ইরফানকে মোবাইলটা দিয়ে রুম থেকে চলে যেতে নেয় বেলী । তখনই ইরফান আবার ডাক দেয় ,

– কিরে , কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিস যে ?
– আসলে ,
– কি ?
– মা বলতেছিল শুক্রবারে বাড়িতে যাইতে । আমার বাবার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী । মিলাদ দিবে মা ।
– তুই কি বললি ?

ইরফানের কথায় মাথা নিচু করে রাখে বেলী ।

– যাবি তুই ?
– আপনার তো অফিস আছে ।
– তুই যেতে চাস ?
– অনেকদিন মারে দেখি না ।
– ঠিকাছে কাল আমি হাফ টাইম করবো অফিসে । বিকালে যাবো আমরা ।

ইরফানের মুখ থেকে এই কথাটা শুনে বেলী যে কত্ত খুশি হয়েছে যা বলার মত না । মুখে প্রকাশ না করলেও চোখের পানি পড়তে তার দুই মিনিটও লাগে নি বেলীর । আজ প্রায় ৭ মাসের উপর হয়েছে সে তার মাকে দেখে নাই । তাই চোখের পানি আটকাতে পারে নি সে । ইরফানকে কি বলবে বুঝতেছে না বেলী । আর ইরফানও বেলীর চোখের পানি গুলো দেখে নেয় ।

– কাঁদিস না , নিয়ে যাবো কাল । কেমন ?
– আচ্ছা ।
– যাহ গিয়ে জামাকাপড় গুছিয়ে নে ।
– হু ,
– বেলী শুন ?
– হু ,

ইরফান কিছুক্ষণ বেলীর দিকে তাকিয়ে আছে । বেলীর মুখের দিকে তাকালে একটা শান্তি আসে মনে । বেলী আসলেই তেমন সুন্দর না তবে ওর মনটা পবিত্র আর এটাই ওর আসল সৌন্দর্য । একটু কাঁদাতেই কেমন মায়া লেগে গেছে চেহারাটায় । আর এতটা দিন যে সে মারতো তখন জানি বেলীর কেমন লাগতো । তবুও কিছুই বলতো না বেলী ।

– কিছু বলবেন ?
– তুই মন খারাপ করিস নাহ ।
– এখন আর মন খারাপ লাগে না । এখন শুধু বাবাকে মনে পড়ে অনেক । বাবার মুখের ‘বেলীফুল ‘ ডাকটা আজও কানে ভাসে । বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে তখন । কান্নাও করি পরে আবার সব ঠিকঠাক । আমার বাবা আমাকে ফাঁকি দিয়ে আর আমার মাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে । এমন জায়গায় গেছে যেখানে বাবা বলে ডাক দিলেও আমার বাবা আর শুনতে পারবে না আর সাড়াও দিবে না । আর বেলীফুল বলে ডাকবে না । বাবা যখন বেলীফুল বলে ডাক দিত তখন আমি সাড়া না দিলে বলতো আমার মা ডায় কইরে , আমার ফুল ডায় কই । এখন আর কেউ বলে না আমাকে আমার মা ডায় কই , আমার ফুল ডায় কই৷

এইসব বলতে বেলী গুমরে কেঁদে ওঠে । এক দৌড়ে ইরফানের রুম থেকে বেরিয়ে যায় সে । ইরফান কিছুই বলার সুযোগ পায় নি । বিছানায় বসে মুখে হাত দিয়ে কিছু একটা ভাবছে সে । কেন জানি আজ নিজের বুকেও হাহাকার লাগছে ইরফানের । চোখ দিয়ে এক ফোটা পানিও পড়ে গেছে । কিন্তু কি যেনো ভেবে তার পর পরই কাকে যেনো একটা ফোন করে সে ।

.
.

চলবে…………….

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ