#মায়ের_লড়াই
#ইলোরা_ফারদিন
#পর্ব_১
আমার বাবা তার নেশাখোর বিবাহিত ভাগিনার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে, শুধুমাত্র নিজের মাকে অর্থাৎ আমার দাদিকে দেয়া কথা রাখতে- বিষয়টা যতবার ভাবছি, ততবার আমার গা গুলিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে আমার আপন বাবা আমার এতো বড় সর্বনাশ করতে পারলো!
ভাবতে লাগলাম গতকাল রাতের কথা,
হুট করে গতকাল রাতে আমার দাদী মাথা ঘুরে পরে যায়। আমার ফুপু সে কথা শুনে ছুটে আসে। অবশ্য আমাদের বাসার দুই বাসা পরেই ফুপুর শ্বশুর বাড়ি।
যাই হোক, বাবা তাড়াতাড়ি পাশের বাসার ফজলে ডাক্তারকে ডেকে আনেন। উনি দাদিকে চেক করে বলেন যে দাদী হয়তোবা ওষুধ ঠিক ভাবে খান নি আজ, তাই এরকম হয়েছে।
বাবা এরজন্য সবার সামনেই মাকে থা*প্পড় মারেন। রাগী কন্ঠে বলে উঠেন,” তোকে বিয়ে করেছি কি সারাদিন পায়ের উপর পা দিয়ে বসে থাকার জন্য? কি করিস বাসায়? আমার মাকে সামান্য ওষুধ দিতে পারিস না। যদি আর কোনোদিন আমার মায়ের প্রতি অবহেলা আমার নজরে আসে তবে সেদিনই হবে এই বাড়িতে তোর শেষ দিন।”
মা একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না, চুপচাপ শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেন।
এদিকে আমার চোখ যায় দাদি আর ফুপি মিটি মিটি হাসছেন। আমার বুঝতে বাকি রইলো না এটা তাদেরি বানানো নাটক। ফজলে ডাক্তারও তাদের সাথে মিলেছে। ফজলে ডাক্তারের সাথে আমার ফুপুর আবার গোপন ইটিস বিটিসও রয়েছে।
সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে আমিই বললাম, ” বাবা আম্মা প্রতিদিনই দাদির হাতে ওষুধ তুলে দেন, বিশ্বাস না হলে আপনি দাদির ওষুধের পাতা দেখেন। ওষুধ তো আপনিই আনেন, আপনার জানার কথা।
আমার কথায় ফুপু রেগে বলে উঠলেন,”তোকে বড়দের মধ্যে এতো কথা বলতে হবে না। তুই কি ফজলে ভাইকে মিথ্যুক বলতে চাচ্ছিস।”
আমি ফুপুর কথায় কান না দিয়ে সরাসরি দাদির ওষুধের বক্স এনে বাবার হাতে ধরিয়ে দিলেন।
অগ্যত বাবা বাধ্য হলেন ওষুধের পাতা চেক করতে। অবাক হয়ে বাবা দাদিকে জিজ্ঞেস করলেন, ” আম্মা নিলুফা তো ওষুধ দেয় নিয়মিত, আপনি খান না কেনো?”
দাদি আমতা আমতা করে বলে উঠলো, “আব্বারে বয়স হচ্ছে, কিন্তু আমার টেনশন যাচ্ছে না রে বাপ। তার উপর তোর বউ আমাকে সহ্য করতে পারে না। ওষুধ খুইলা বিছানায় ফিক দেয়, পানিটাও হাতে দেয় না। মনের কষ্টে আমি ওষুধ খাই না রে বাপ।”
দাদির কথা শুনে আমি এবার বেশ রেগেই বললাম,”আর কত মিথ্যা বলবেন দাদি, কয়দিন পর কবরে যাবা, আল্লাহকে কি জবাব দিবেন, ভেবেছেন?”
আমার মুখ থেকে কথাটা বের হওয়ার সাথে সাথেই বাবা আমার গালে থাপ্প*ড় দিলে। ধমকে বললেন,” আমার সামমেই আমার মায়ের সাথে তোদের মা মেয়ের এই আচরন, আমার অনুপস্থিতিতে কতই না অত্যাচার সহ্য করে আমার নিরীহ মা।”
আমি আর একটা কথাও বললাম না। ছলছল চোখে শুধু তাকিয়েই রইলাম বাবার দিকে। তারপর নিঃশব্দে সেই ঘর ত্যাগ করলাম। আমার মনে হয় আমিই প্রথম মেয়ে যেয়ে তার বাবাকে এতোটা ঘৃণা করে।
এদিকে দাদি তার নেকা কান্না শুরু করলে আবারো। মা আগের মতোই ঠাই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এরপর দাদি হুট করে বলে উঠলেন, “আব্বা তোর কাছে একটা জিনিস চাব, বল দিবি।”
“আপনি বললে আমার জানটাও হাজির আম্মা। বলেন কি চান?”
“না আব্বা, তুই আগে আমার মাথায় হাত রাখে কসম কাট তারপর কমু।”
বাধ্য হয়ে জসিম তার মায়ের মাথায় হাত দিয়ে কস কাটে।
এরপর তারমন বিবি রসিয়ে বলতে থাকে,
“তুই তো জানিস ই তুষার আমার একটাই নাতি। ভুল বশত খারাপ মাইয়ার পাল্লায় পরে একটু খারাপ পথে গেছে। আমার বিশ্বাস ওরে আবার বিয়া দিলে ওয় সংসারী হইবো এবার। তাই আমি তোর মাইয়া নবনীতার লগে তুষারের বিয়া দিবার চাই। আমাগো বাড়ির মাইয়া আমাগো বাড়িতেই থাকবো। এদিকে আমার নাতিটাও নতুন করে জীবনটা শুরু করতে পারব।
পাশের ঘর থেকে দাদির কথা শুনে যতটা না অবাক হয়েছি, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি আমার মায়ের কথা শুনে। আমি দৌড়ে দাদির রূমে যেয়ে দেখি মা থরথর করে রাগে কাপছে, আর সামনে পরে আছে ভাংগা কাচের জগ। মা চিৎকার করে বলছে,
” আমার জীবনটা নষ্ট করেছ, আমি কিছু বলে নি। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ বুজে এতো বছর ধরে সংসার করছি। কিন্তু আমার মেয়ের দিকে নজর দিলে একদম চোখে তুলে ফেলবো। তোমার ওই নেশাখোর চরিত্রহীন ভাগিনার বিয়ে যেখানে ইচ্ছে দেও, কিন্তু ভুলেও আমার নিষ্পাপ পবিত্র মেয়ের দিকে নজর দিবে না।” বলেও হন হন করে চলে গেল মা।
এদিকে ঘরে সবাই অবাক হয়ে আছে। ২০ বছর ধরে যেই মেয়ে তাদের সব অত্যাচার চুপচাপ সহ্য করেছে, আজ সেই মেয়ের মুখে এতো কথা ফুটলো কি করে!
সবার ভাবনার মাঝেই তারমন বিবি বলে উঠলেন, “তুই কিন্তু আমার কসম কাটছিস জসিম। যদি বউয়ের কথায় তুই আমার প্রস্তাব ফিরায় দিস, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি, বলে দিতাছি।”
সবাইকে অবাক করে দিয়ে এবার জসিম বলে উঠলো, পরশুদিন, শুক্রবার আমার মেয়ে নবনীতার সাথে আমার একমাত্র বোনের একমাত্র ছেলে তুষারের বিয়ে হবে। আর এটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এর বাহিরে আমি আর কিছু শুনতে চাই না।”
বাবার কথা শুনে দাদি আর ফুপুর মুখে কুটিল হাসি দেখা দিল।
এভাবেই আমার নিজের বাবাই আমার সর্বনাশের সম্মতি দিলেন….
চলবে….
