#অসময়ের_বৃষ্টি
#শেষ_পর্ব
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
আফ্রিদির মুখের চেনা গম্ভীর ভাবটা আজ আর নেই। তার জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে একরাশ স্বস্তি আর প্রাণখোলা হাসি। স্মৃতিকে এভাবে নিজের ওপর ভরসা করতে দেখে তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের অস্বস্তির মেঘগুলো এক নিমিষে উবে গেল।
স্মৃতি মুখ তুলে আফ্রিদির চোখের দিকে তাকাল। তার ডাগর ডাগর চোখ দুটোতে এখন আর ভয় কিংবা ভীতি নেই। তার বদলে তার চোখে খেলা করছে মিষ্টি চপলতা। সে একটু মাথা দুলিয়ে বলল,
“আচ্ছা, আমি পড়ব। আপনার কথা মেনে নিয়ে খন্দকার বাড়ির উপযুক্ত বউও হব। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে!”
আফ্রিদি চমকে ওঠার ভান করে একপাশের ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“কিসের শর্ত, ম্যাডাম? এই বয়সেই এত শর্ত দিলে তো মুশকিল!”
স্মৃতি তার রেশমি কাশ্মীরি চুড়ি পরা হাত দুটো আফ্রিদির বুকের ওপর রাখল। তারপর বেশ গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে বলল,
“শর্ত খুব সোজা! প্রতি মাসে যখন মাইনে পাবেন, তখন বাড়ি ফেরার সময় আমার জন্য এক গোছা টকটকে লাল গোলাপ আর এক গুচ্ছ এমন ঝুনঝুন চুড়ি আনতে হবে। একটা মাসও যেন বাদ না যায়! যদি আনেন, তবেই আমি লক্ষ্মী মেয়ের মতো পড়াশোনা করব, নয়তো একদম না!”
স্মৃতির মিষ্টি আবদার শুনে আফ্রিদি আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে হালকা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। মেয়েটা নাকি বরকে শর্ত দিচ্ছে! আর সেই শর্তও আবার কাচের চুড়ি আর লাল গোলাপের!
আফ্রিদি স্মৃতির চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল,
“স্বীকার করলাম তোমার শর্ত। প্রতি মাসেই নয়, তুমি যখনই চাইবে, তোমার জন্য গোলাপ আর চুড়ির অভাব হবে না। এবার তো আর কোনো অজুহাত চলবে না?”
স্মৃতি লজ্জিত হেসে আফ্রিদির বুকে মাথা গুঁজে দিল। অসময়ের বৃষ্টির টিপটিপ শব্দের মাঝে, দুজনের আলতো হাসি আর চুড়ির রিনরিন আওয়াজ মিশে গিয়ে এক অপূর্ব মধুর মুহূর্তের জন্ম দিল।
কয়েক বছর পর…
সময়ের চাকা গড়িয়ে গেছে বেশ কিছুটা পথ । ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে কেটে গেছে কয়েকটা বছর।
আজকের স্মৃতি আর কয়েক বছর আগের গ্রামের অবুঝ, চঞ্চল মেয়েটির মধ্যে পার্থক্যটা স্পষ্ট। তার বয়স এখন উনিশ। এই অল্প ক’বছরে সে নিজেকে বদলে ফেলেছে সম্পূর্ণ নতুন এক রূপে। শহরের চালচলন, কথাবার্তার মার্জিত ভাষা আর ফ্যাশন–সবটাই সে নিজের করে নিয়েছে দক্ষতায়। গ্রামের উপভাষার ভাঙা রূপ আর তার মুখে নেই, এখন সে স্পষ্ট আর শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে।
শুধু তাই নয়, সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে নিজের পড়াশোনাটাও সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছে। সে এখন কলেজের ছাত্রী।
ওদিকে আফ্রিদি এখন নিজের চাকরিতে বেশ প্রতিষ্ঠিত। প্রতিদিন সকালে সময়মতো অফিসে যাওয়া আর বিকেলে নিবিষ্ট মনে ঘরে ফেরে সে। তার পুরো জগতটাই এখন স্ত্রী আর পরিবারকে কেন্দ্র করে। বিকেলের আড্ডা বা বন্ধুদের পেছনে সময় নষ্ট করা রুক্ষ ছেলেটা আজ অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং যত্নশীল স্বামী।
আজকের বিকেলটা বেশ মিষ্টি। রোদের আলো কমে এসেছে। ঘন্টাখানেক পরেই মাগরিবের আজান দিবে হয়তো। বারান্দায় বসে স্মৃতি তার কিছু বই গুছাচ্ছিল। তার পরনে হালকা আসমানি রঙের একটা সুতির শাড়ি, চুলে আলতো খোঁপা। উপন্যাস পড়তে তার খুব ভালো লাগে। তাই আফ্রিদি একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি স্মৃতিতে নীলক্ষেত থেকে অনেক বই কিনে দিয়েছে। এত এত বই পেয়ে তো স্মৃতি মহাখুশি! কিন্তু সমস্যা হয়েছে ওর একটা বই রাখার শেল্ফ নেই। তাই গতকাল রাতে আফ্রিদিকে বলেছিল সে কথা। আফ্রিদি দ্বিমত পোষণ করেনি৷ বলেছে সামনের শুক্রবার কিনে দিবে। স্মৃতিও তাতে খুব খুশি হয়েছে। বই গুছিয়ে রাখতে রাখতে আফ্রিদির কথা ভেবে মুচকি মুচকি হাসছিল স্মৃতি। এমন সময় আফ্রিদি ঘরে ঢুকল। অফিস থেকে সবেমাত্র ফিরেছে সে। তার হাতে একটা মস্ত বড় কাগজের প্যাকেট আর তার পাশেই উঁকি দিচ্ছে এক গোছা তাজা লাল গোলাপ।
স্মৃতি বই থেকে মুখ তুলে তাকাল। আফ্রিদিকে দেখেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল। রোদঝলমলে হাসি। সে চটপট উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আজ এত জলদি চলে এলেন? আমি তো ভাবলাম আরও দেরি হবে।”
আফ্রিদি হাতের শপিং ব্যাগ আর গোলাপের গোছাটা টেবিলের ওপর রেখে স্মৃতির দিকে এগিয়ে এল। স্মৃতির কপালের ওপর এসে পড়া কয়েকটি চুল আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বলল, “তোমাকে খুব মিস করছিলা। তাই একটু তাড়াতাড়িই আসতে হলো ম্যাডাম! এই নাও, তোমার এ মাসের লাল গোলাপ আর সাথে কিছু নতুন ডিজাইনের রেশমি চুড়ি।”
স্মৃতি সানন্দে গোলাপের গোছাটা হাতে নিল। মিষ্টি সুবাস বুক ভরে নিয়ে একগাল হেসে বলল,
“ধন্যবাদ! গুড বয়। কত্ত ভালো আপনি! আর হ্যাঁ, আপনি তো নিজের দেওয়া কথাও পুরোপুরি রাখছেন।”
“রাখতে তো হবেই! না রাখলে আবার কোনো দিন পড়াশোনা বন্ধ করার হুমকি দিয়ে বসবে, সেই ভয়ে থাকি।” আফ্রিদি টিপ্পনি কাটল।
ঠিক তখনই নিচ থেকে শাশুড়ির ডাক ভেসে এল, “স্মৃতি রে! নিচে আয় একটু। জারার বিয়ের জন্য যে শাড়ির ক্যাটালোগ পাঠিয়েছে, সেগুলো দেখে পছন্দ কর তো।”
স্মৃতি ওপর থেকেই সাড়া দিল, “আসছি মা!”
গত বছরই সারা আপার খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেছে এক ভালো পরিবারে। এখন সে নিজের সংসারে খুব সুখে আছে। আর এ বছর জারার বিয়ের কথা পাকা হচ্ছে। পুরো খন্দকার বাড়ি এখন আনন্দ আর ব্যস্ততায় মুখরিত। জারা আর সারা–দুজনই স্মৃতিকে ছোট বোনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আর স্মৃতিও তাদের পরামর্শ আর ভালোবাসাকে সবসময় সম্মান জানিয়ে এসেছে।
আফ্রিদি স্মৃতিকে নিচে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে দেখে ওর এক হাত আলতো করে ধরে টেনে কাছে আনল।
“কী হলো? মা ডাকছেন তো!”
স্মৃতি একটু মিটিমিটি হেসে বলল।
“যাবে, আগে বলো আজকের পড়া শেষ করেছ? কাল তো তোমার ইন্টারনাল পরীক্ষা আছে।”
আফ্রিদি বেশ সিরিয়াস হওয়ার নাটক করে জিজ্ঞেস করল।
স্মৃতি হাসতে হাসতে বলল,
“সব পড়া শেষ স্যার! আপনার মতো কঠোর টিউটর ঘরে থাকতে কি পড়া বাকি রাখার উপায় আছে?”
আফ্রিদি মুচকি হেসে স্মৃতির কপালে তার পুরুষ্ট ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। বলল,
“আমি সত্যিই খুব গর্বিত তোমাকে নিয়ে স্মৃতি। তুমি নিজেকে যেভাবে সামলে নিয়েছ, যেভাবে এই সংসারটাকে গুছিয়ে রেখেছ তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
স্মৃতি আফ্রিদির বুকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর সেই ছেলেমানুষী নেই, আছে কেবল পরিপক্ব নারীর আত্মবিশ্বাস আর স্বামীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
সে ফিসফিস করে বলল,
“সবটাই আপনার ভালোবাসার জন্য হয়েছে। আপনি যদি আমাকে ভরসা না দিতেন, হাতটা ধরে না রাখতেন, তবে আমি হয়তো কখনোই এতটা পথ আসতে পারতাম না।”
“ আমার দায়িত্ব ছিল। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোমাকে। “
“ অনেক হয়েছে, ভালোবাসার কথা! এবার ছাড়ুন৷ মা ডাকছে। বাড়িতে খুব ব্যস্ততা। “
আফ্রিদি ছাড়তে চাইল না৷ আরও আষ্টেপৃষ্ঠে ধরল স্মৃতিকে।
“ আরেকটু থাকো না!”
“ তাহলে আপনি গিয়ে মা’কে বলে আসুন সেটা।”
আফ্রিদি হেসে ফেলল।
“ বউ আমার বড় হয়ে গেছে। অনেক বুদ্ধি তার। “
স্মৃতি হেসে ওর থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল।
“ একটু চালাক না হলে পৃথিবীতে টেকা মুশকিল। বুঝলেন?”
আফ্রিদি ঠোঁট কামড়ে হাসল। ইশারা করে বলল,
“ রাতে তুমিও বুঝবে, আদর কত প্রকার ও কী কী!”
লজ্জায় লাল হয়ে গেল স্মৃতির গাল। সে কোনোকিছু না বলেই রুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল। ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করল আফ্রিদি। মেয়েদের লজ্জা পেলে অন্য রকম সুন্দর লাগে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা বজায় রেখে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো সে।
*
বাইরে গোধূলির রক্তিম আলো পুরো আকাশটাকে রাঙিয়ে দিয়েছে। বারান্দা দিয়ে ভেসে আসা হিমেল বাতাসে ভেসে আসছে বর্ষায় ফোঁটা কোন এক নাম না জানা ফুলের গন্ধ। একটা অবুঝ, ভয়ার্ত সম্পর্ক যেভাবে অনুভূতির গাঢ়তায়, ভালোবাসায় আর পারস্পরিক শ্রদ্ধায় পূর্ণতা পেল তা যেন এই সংসারের বাতাসে সুখের আবহ তৈরি করেছে। খন্দকার বাড়ির প্রতিটি কোণে আজ হাসিখুশি, সচ্ছল আর নিখাদ ভালোবাসার ছোঁয়া লেগে থাকে সবসময়। স্মৃতির সব সংশয়, সব দূরত্ব ভালোবাসার রঙে রঙিন হয়ে গেছে। আফ্রিদি নামক পুরুষটি তার জীবন বদলে দিয়েছে। স্বামী নামক মানুষটি সঠিক ছিল বলেই আজ স্মৃতি প্রকৃতপক্ষে সুখী। ভালো থাকুক আফ্রিদি ও স্মৃতি।
সমাপ্ত।
