#অসময়ের_বৃষ্টি
#পর্ব_৮
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
আফ্রিদি কয়েক সেকেন্ড একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। স্মৃতির সরলতা আর এমন অকপট প্রশ্ন তাকে একই সাথে বিস্মিত আর অপ্রস্তুত করে তুলেছে। সে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“এসব কথা কোথা থেকে শুনছ তুমি? কার কাছে শুনলে?”
স্মৃতি বিছানায় রাখা গোলাপ আর চকলেটের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিল। তার চোখের চঞ্চলতা এক নিমেষে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক বুক সরল আকুতি ভেসে উঠল। সে মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে খুব নিচু গলায় বলল,
“আমি অনেক কিছু জানি না, বুঝি না। ছোট থেকে আমাকে তো কেউ এসব কিছু শেখায়নি, কোনোদিন বোঝায়ওনি। আপনি তো আমার স্বামী, আপনিই আমাকে বুঝায় বলেন। দাম্পত্য জীবন আসলে কী?”
স্মৃতির নিষ্পাপ স্বীকারোক্তি আফ্রিদির বুকের ভেতরটায় এক মস্ত বড় নাড়া দিল। বিকেলের অপরাধবোধ, রাগ আর দূরত্বের দেয়ালটা এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটা কোনো রাগ বা ঘৃণা থেকে বিকেলে ওমন করেনি, শুধুমাত্র না জানার অবুঝ ভয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল।
আফ্রিদি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে স্মৃতির আরও এক ধাপ কাছে এগিয়ে এল। এবার আর তার মনে কোনো দ্বিধা রইল না। সে অত্যন্ত যত্ন করে স্মৃতির চিবুকটা ধরে মুখটা একটু ওপরে তুলল, যাতে স্মৃতি সোজাসুজি তার চোখের দিকে তাকাতে পারে।
আফ্রিদির চোখের চেনা গম্ভীর ভাবটা এখন মায়া আর ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। সে স্মৃতির ভেজা ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বলল,
“দাম্পত্য জীবন মানে হচ্ছে একটা অধিকারের নাম, স্মৃতি। যেখানে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে শুধু এক ঘরে থাকে না, বরং তারা একে অপরের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ সবকিছুর ভাগীদার হয়। আর স্বামী-স্ত্রীর এই সম্পর্কে… ভালোবাসার মানুষকে একটু ছুঁয়ে দেখা, তাকে আগলে রাখা বা নিজের বুকের ভেতর জড়িয়ে নেওয়াটা কোনো অপরাধ না। ওটা হলো এই পবিত্র সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর আর স্বাভাবিক নিয়ম। যেখানে কোনো ভয় থাকে না, শুধু থাকে ভরসা।”
আফ্রিদি স্মৃতির একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে চাপ দিল। তার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল,
“বিকেলে আমি তোমাকে কষ্ট দিতে বা ভয় দেখাতে ওমন করিনি। ওটা ছিল তোমাকে নিজের করে পাওয়ার একটা অধিকার। এবার বুঝতে পেরেছ, নাকি আরও সহজ করে বোঝাতে হবে?”
আফ্রিদির এত কাছ থেকে বলা কথাগুলো আর হাতের উষ্ণ ছোঁয়া স্মৃতির মনের ভেতর নতুন শিহরণ জাগিয়ে তুলল। জারা আর সারার কথাগুলোর সাথে এখন আফ্রিদির কথাগুলো মিলে গিয়ে তার মনের সব মেঘ কেটে গেল। সে লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলল, কিন্তু এবার আর হাতটা সরিয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করল না। স্মৃতির দৃঢ়তা দেখে আফ্রিদি একটু হকচকিয়ে গেল। সে তো ভেবেছিল স্মৃতি হয়তো লজ্জা পেয়ে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাবে। কিন্তু মেয়েটা যে এভাবে জেদ ধরে বসবে, তা সে কল্পনাও করেনি।
স্মৃতি তার হাত দুটো আফ্রিদির বুক থেকে সরালো না, বরং আরও একটু কাছে ঘেঁষে বসল। তার গলায় কোনো দ্বিধা নেই, বরং তৃষ্ণা আছে জানার, বোঝার। সে আবার বলল,
“হু, আমি সব বুঝতে চাই। কোনো কিছু অজানা রাখতে চাই না। আমার মনে হয়, এসব জানলে আমাদের মাঝের দূরত্বটা একদম কমে যাবে। আপনি বুঝান আমাকে, প্লিজ?”
আফ্রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখজোড়া একটু অন্ধকার হয়ে এল। সেখানে গভীর চিন্তার ছাপ। সে জানে স্মৃতির বয়স কম, তার মনের দুয়ার এখনও অনেকখানি অবুঝ। তাড়াহুড়ো করে সবকিছু তাকে জানিয়ে দেওয়া বা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা কি ঠিক হবে?
আফ্রিদি আলতো করে স্মৃতিকে নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। এক হাত দিয়ে ওর এলোমেলো চুলগুলোতে বিলি কেটে দিতে দিতে খুব ধীর স্বরে বলল,
“শোনো স্মৃতি, বিয়ের সম্পর্কটা কেবল এক রাতের ব্যাপার না। এটা একটা দীর্ঘ পথ। আমি চাই না হুট করে কোনো কিছু করতে গিয়ে তোমার ওপর কোনো জোর খাটুক বা তোমার মনে কোনো ভয়ের সৃষ্টি হোক। শুরুর সময়টায় হয়তো… হয়তো তোমার কিছুটা অস্বস্তি বা খারাপ লাগতে পারে।”
আফ্রিদির গলায় উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। সে ভয় পাচ্ছে, স্মৃতি যদি ব্যথা পায় বা মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকে, তবে তাদের সম্পর্কের সুন্দর মোড়টা নষ্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু স্মৃতি নড়ল না। সে আফ্রিদির বুকে মুখ গুঁজে শান্ত গলায় দৃঢ়তার সাথে বলল,
“লাগবে না। জারা আপা বলেছে, আপনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন। আর ভালোবাসার মানুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিলে নাকি কষ্ট লাগে না, শান্তি লাগে। আমি সেই শান্তিটাই বুঝতে চাই।”
স্মৃতি যেন হঠাৎ করে বড় হয়ে গেছে। জারার কথার মানে সে পুরোপুরি না বুঝতে পারলেও যথেষ্ট বুঝতে পেরেছে। আফ্রিদি দ্বিধা নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কী করবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু স্মৃতিকে সে-ও চায়, নিজের করে চায়৷ তবে এভাবে তাড়াহুড়ো করে নয়।
“ কী হলো? “
স্মৃতি বলল।
“ কিছু না। ভাবছি হুট করে তোমার কী হলো?”
“ অতকিছু বুঝি না। জা…না মানে আপনি ভালোবাসুন।”
জারার নামে কিছু বলতেই যাচ্ছিল স্মৃতি কিন্তু পরক্ষণেই কথা থামিয়ে দেওয়াত আফ্রিদি কিছু বুঝতে পারেনি। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতির জেদ মেনে নিবে ভাবল।
আফ্রিদি স্মৃতির কপালের ওপর জমে থাকা ছোট চুলগুলোকে সরিয়ে দিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসল। ওর হাসিতে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, আছে কেবল আশ্বাস আর ভালোবাসা।
আফ্রিদি ফিসফিস করে বলল,
“তুমি সত্যিই অনেক সাহসী হয়ে গেছ দেখছি।”
স্মৃতি লজ্জিত হয়ে মাথাটা নামিয়ে নিল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে তার মুচকি হাসি। আর সেই হাসিতে
আফ্রিদির মনের সব দ্বিধা, সব আগল এক নিমেষে ভেঙে গেল। সে স্মৃতিকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। ঘরের মৃদু আলোয় স্মৃতির হাতের রেশমি কাশ্মীরি চুড়িগুলো আরও একবার রিনরিন করে ডেকে উঠল। আফ্রিদি অত্যন্ত সতর্কতায়, ভালোবাসায় স্মৃতিকে নিজের করে নিতে শুরু করল।
কিন্তু তীব্র ভালোবাসার চেনা ওষ্ঠাগত মুহূর্তে, স্মৃতির অবুঝ শরীর আর মন এমন অচেনা অনুভূতির তীব্রতা সহ্য করতে পারল না। এক অজানা ভীতি আর শারীরিক অবশতায় হুট করেই স্মৃতির চোখের পাতা দুটো বুজে এল। সে আফ্রিদির বুকেই পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল।
“ স্মৃতি! কী হলো তোমার? “
স্মৃতির এমন অবস্থা দেখে আফ্রিদি যেন এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরে এল। সে আতঙ্কে শিউরে উঠল। দ্রুত স্মৃতিকে সোজা করে বসিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিতেই স্মৃতির জ্ঞান ফিরল। স্মৃতি নিজের দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো একবার।
“ কোথায় কষ্ট হচ্ছে? “
আফ্রিদি উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলো। স্মৃতি ম্লান গলায় বলল,
“ বলা যাবে না। “
বলে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। আর মনে মনে ভাবল, এটাই কি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক? জারা আপা এসবই বলেছিলেন! এমন বিশ্রী কাজকর্ম কে করে! শরীরের ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে গেল সে।
আফ্রিদির নিজের মনের ভেতর তীব্র আত্মগ্লানি আর অপরাধবোধ জাঁকিয়ে বসল। সে বিছানার এক কোণে বসে ঘুমন্ত স্মৃতির মাথায় হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, সে একটা মস্ত বড় অন্যায় করে ফেলেছে। এই অবুঝ মেয়েটার ওপর জোর না করলেও, তার আবদারের সামনে নিয়ে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এই অপরাধবোধ আফ্রিদিকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল।
পরদিন সকাল হতেই আফ্রিদি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আর সেই যে গেল, টানা দুটো দিন সে আর বাড়ি ফিরল না। এই দুদিন আফ্রিদি নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলার এক অমানুষিক লড়াইয়ে নামল। সে বুঝতে পারল, শুধু মুখে ভালোবাসার কথা বলা বা ঘরে বসে থাকা পুরুষ মানুষের কাজ নয়। স্মৃতির দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে নিতে হলে তাকে স্বাবলম্বী হতে হবে। সে পাগলের মতো ঘুরে অবশেষে সপ্তাহখানেকের মধ্যে নিজের যোগ্যতায় একটা ভালো চাকরি জুটিয়ে ফেলল। কিন্তু মনের ভেতরের অনুতাপের কারণে সে বাড়ি ফেরার মুখ তুলতে পারছিল না। অবশ্য মা’কে কল করে বলেছিল সে কিছু কাজে বিজি সে। আফ্রিদির মা অভিজ্ঞ মানুষ। সে যা বোঝবার বুঝতে পেরেছেন।
এদিকে এই ক’দিনে স্মৃতির দুনিয়াটা যেন থমকে গেছে। সে ঘরের কোণে বসে সারাক্ষণ ডুকরে কেঁদেছে। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, সেদিন জ্ঞান হারিয়ে সে মস্ত বড় ভুল করেছে। আফ্রিদি বোধহয় তার ওপর চরম রাগ করেছে, হয়তো তাকে অপছন্দ করে চিরতরে দূরে সরে গেছে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল স্মৃতি। এমন সময় ওর শ্বাশুড়ি এলেন রুমে। তিনি স্মৃতিকে সংসার, বিবাহিত জীবন, স্বামীর হক সম্পর্কে বুঝিয়ে বললেন। পাশাপাশি নারী বা স্ত্রীর প্রতি স্বামী আচরণ কেমন হওয়া উচিত সেসব বললেন। দু’জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কীভাবে সংসার সুখের হবে সেসবও জানালেন। সবকিছু শুনে স্মৃতি মনে মনে ঠিক করল, এরপর সে-ও সুন্দর করে সংসার করবে।
চাকরি পাওয়ার পরের দিন সন্ধ্যায় আফ্রিদি বাড়ি ফিরল। তার হাতে ছিল স্মৃতির প্রিয় চকলেটের একটা বড় বাক্স আর এক গোছা লাল গোলাপ, শাড়ি।
রুমে ঢুকে সে দেখল, স্মৃতি বিছানার এক পাশে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। আফ্রিদির পায়ের আওয়াজ পেয়ে স্মৃতি যখন চোখ তুলল, তখন তার চোখ দুটো কান্নায় জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। সে এক ছুটে এসে আফ্রিদির পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল,
“আমাকে মাফ করে দেন। আমি আর কোনোদিন অমন করব না। আপনি রাগ করে আমাকে ছেড়ে যাবেন না, প্লিজ!”
আফ্রিদির বুকটা এক নিমিষে হু হু করে উঠল। সে দ্রুত স্মৃতিকে মেঝে থেকে তুলে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার নিজের চোখও তখন পানিতে টলমল করছে। আফ্রিদি স্মৃতির কপালে গভীর একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পাগলী মেয়ে, আমি তোমার ওপর রাগ করিনি, নিজের ওপর রাগ করেছিলাম। আর কখনো পায়ে হাত দিবে না। স্ত্রী মাথায় রাখার জিনিস, পায়ে নয়! “
স্মৃতি ফুঁপিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কোথায় ছিলেন এতদিন? “
“তোমাকে একটা সুন্দর জীবন দেওয়ার জন্য চাকরি খুঁজতে গিয়েছিলাম। এই দেখো, তোমার বরের চাকরি হয়ে গেছে।”
আফ্রিদির কথা শুনে স্মৃতির কান্না এক লহমায় থেমে গেল। সে ভেজা চোখে আফ্রিদির মুখের দিকে তাকাল। আফ্রিদি হেসে তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
“আজ থেকে আমাদের একটা নতুন শুরু হলো স্মৃতি। যেখানে কোনো ভয় থাকবে না, শুধু থাকবে ভরসা আর ভালোবাসা। আমি খুব ভালো হাসবেন্ড হওয়ার চেষ্টা করব। “
“ হাস… হাসিবেন্ট?”
আফ্রিদি হেসে ফেলল এবার। স্মৃতি ভেংচি কাটলো।
“ হাসবেন্ড মানে বর। দাঁড়াও আগামীকাল থেকে তোমার পড়াশোনা শুরু হবে৷ খন্দকার বাড়ির বউ তুমি, সবার সাথে তালে তাল মিলিয়ে চলবে৷ পড়াশোনা শিখবে। “
স্মৃতি দ্বিধা নিয়ে বলল,
“ আমি পারব?”
“ অবশ্যই পারবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। “
স্মৃতি হেসে বলল,
“ হ্যাঁ আমি পারব। “
দু’জনেই হাসল। স্মৃতি আফ্রিদির বুকে মাথা রেখে তার হাতের চুড়িগুলোর দিকে তাকাল। রেশমি চুড়ির রিনরিন শব্দ যেন আজ তাদের জীবনে এক মধুর এবং চিরস্থায়ী সুখের সমাপ্তির বার্তা বয়ে নিয়ে এল।
চলবে……
