Wednesday, June 24, 2026







কবুল নামা পর্ব-০১

#কবুল_নামা🩷 [সূচনা পর্ব]
~আফিয়া আফরিন

তীব্র ভীতি আর এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে বিছানার এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে নীরু। গায়ের ভারী বেনারসি শাড়িটা এই মুহূর্তে ওর কাছে লোহার বর্মের মতো ভারী ঠেকছে। বয়সটা মাত্র উনিশ পেরিয়ে বিশে পড়েছে। নীরুর বয়সী অন্য মেয়েরা যখন পড়াশোনা, আড্ডা আর স্বপ্নের জাল বুনতে ব্যস্ত, তখন নীরু এক অচেনা ঘরের খাটে নতুন বউ সেজে বসে আছে। বিয়ে! বিয়ে জিনিসটা আসলে কী, সংসার কীভাবে করতে হয়; তার মারপ্যাঁচ বোঝার আগেই হুট করে বিয়েটা হয়ে গেল।
মাঝারি আলোতে নিজের হাতের মেহেদির গাঢ় রঙের দিকে তাকিয়ে নীরুর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। রাফসান মানুষটা কেমন? আজ পর্যন্ত মাত্র দু-একবার সামনাসামনি দেখা হয়েছে। কথাবার্তা একদমই বলে না বললেই চলে। ভীষণ গম্ভীর আর অল্পভাষী একটা মানুষ। এই রকম একটা মানুষের সাথে সারাটা জীবন কীভাবে কাটবে, ভেবেই নীরুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। রাফসান এখনও ঘরে আসেনি, বাইরের আত্মীয়স্বজনদের বিদায় দিতে হয়তো ব্যস্ত। এই অপেক্ষার প্রতিটা সেকেন্ড নীরুর ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেই মুহূর্তে নীরুর মনে পড়ে গেল সবচেয়ে কাছের বান্ধবীর কথা। ওর বিয়েটাও মাস ছয়েক আগে এমন দেখেশুনে, ধুমধাম করেই হয়েছিল। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগেই মেয়েটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। নীরুকে বলছিল, “আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে রে। শাশুড়ি সারাদিন বাপের বাড়ি নিয়ে খোটা দেয়। যার ওপর ভরসা করে এই ঘরে এলাম, সেই মানুষটা পাশে থাকা তো দূরের কথা, উল্টো মায়ের পক্ষ নিয়ে আমাকে চারটে বিশ্রী কথা শুনিয়ে যায়।”

বান্ধবীর কান্নাভেজা কণ্ঠটা নীরুর কানের কাছে অবিরত বাজতে লাগল। নীরু চোখ দুটো বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর নিজের বাপের বাড়ির আর্থিক অবস্থাও তো খুব একটা ভালো না। বাবা অনেক কষ্ট করে বিয়েটা দিয়েছেন। নীরুর শরীরটা ভয়ে শিউরে উঠল। হঠাৎ করেই দরজার লক খোলার মৃদু শব্দ হলো। নীরু চমকে উঠে মাথার ঘোমটাটা আরও একটু টেনে দিল। রাফসান ঘরে ঢুকে দরজাটা আটকে দিল। নীরুর মনে হলো, ওর হৃদস্পন্দন বুঝি এখনই বন্ধ হয়ে যাবে…

রাফসান ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এল। তার পরনে হালকা রঙের পাঞ্জাবি। বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা নীরুর কাছাকাছি এসে সে দাঁড়াল। নীরুর মনে হলো, বুকের ভেতর কেউ যেন ড্রাম বাজাচ্ছে। রাফসান একপাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল, “অনেক রাত হয়েছে। ভারী শাড়ি আর গহনা পরে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে? ওদিকের ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে নাও।”

নীরু ঘোমটার আড়াল থেকেই আলতো করে মাথা নাড়ল। কোনো কথা বলল না। মানুষটা আসলেই কেমন যেন! একদম মেপে মেপে এতটুকু কথা বলছে! রাফসানও আর কথা না বাড়িয়ে আলমারি থেকে নিজের একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। নীরু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, মানুষটা অন্তত জোর জবরদস্তি করার মতো খারাপ নয়। তবে মনের ভেতরের ভয়টা কাটল না। তুলির কথাগুলো বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।

ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে যখন রাফসান বের হলো, নীরু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো বাঁধছিল। আয়নার প্রতিফলনে রাফসানকে দেখে ও একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। রাফসান খাটে এসে বসল। ভেজা তোয়ালেটা পাশে রেখে শান্ত চোখে নীরুর দিকে তাকাল। নীরু কী করবে বুঝতে না পেরে খাটের একদম শেষ মাথায় গিয়ে বসলে রাফসান মৃদু একটু হাসল। তারপর খুব গম্ভীর গলায় বলল, “নীরু, তোমার নাম নীরু তো?”

নীরু মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বলল, “জি।”

রাফসান একটু থামল। তারপর আবার বলতে শুরু করল, “শোনো নীরু, আমি জানি এই মুহূর্তে তোমার মনের ভেতর কী চলছে। চেনা পরিবেশ ছেড়ে, চেনা মানুষদের ছেড়ে হুট করে একটা অচেনা ঘরে এসে মানিয়ে নেওয়াটা কতটা কঠিন, সেটা আমি বুঝি। আমি মানুষটা একটু গম্ভীর, গুছিয়ে বা বানিয়ে কথা বলতে পারি না…” নীরু চোখ তুলে তাকাল না, শুধু কোলের ওপর রাখা নিজের আঙুলগুলো খুঁটতে লাগল। রাফসান ফের বলল, “বিয়ে জিনিসটা আমাদের দুজনের জন্যই নতুন। আমাদের পরিচয় মাত্র কয়েকদিনের। তাই আমি তোমার কাছ থেকে আজকেই অলৌকিক ভালোবাসা বা অধিকার আশা করছি না। আমি তোমাকে শুধু একটা কথাই বলতে চাই, এই বাড়িটাকে খাঁচা মনে করে নিজেকে বন্দী ভেবে বসে থেকো না। এই ঘরটা যতটা আমার, ঠিক ততটাই তোমার। একে অপরকে বুঝতে আমাদের কিছুটা সময় লাগবে, আর আমি সেই সময়টা তোমাকে দিতে রাজি আছি। কোনো কিছু নিয়ে মনে ভয় রেখো না, কেমন?”

নীরু অবাক হয়ে রাফসানের কথাগুলো শুনছিল। তার কথায় ভরসা ছিল। নীরু মুখে কিছু বলল না, আলতো করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রাফসান বালিশ টেনে নিয়ে বলল, “অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমিয়ে পড়ো।” নীরু লাইটটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘরের অন্ধকারটার মতোই ওর ভবিষ্যৎটাও এখন আবছা, কিন্তু রাফসানের ওই কথাগুলো যেন মনের ভেতরের ভয়টা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিল।
.
রাফসান একজন সরকারি কর্মকর্তা। বিয়ের জন্য মাত্র সাতদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে নিজের বাড়িতে এসেছিল। তার কর্মস্থল রাজধানীতে। এমনিতেই সে ভীষণ দায়িত্ববান আর কাজের মানুষ, মাসে একবার হয়তো কোনোমতে বাড়ি আসার সময় পেত।
বিয়ের ধুমধাম শেষ হলো, দিন গড়াল। ছুটি শেষে রাফসান যথারীতি ঢাকা ফেরত চলে গেল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঠিক তার পরের বৃহস্পতিবার বিকেলেই রাফসান আবার বাড়ি ফিরে এলো! যেখানে মাসে একবার আসাই দায়, সেখানে সপ্তাহ ঘুরতেই ছেলের হুট করে বাড়ি ছুটে আসাটা চোখে লাগল মা মাজেদার। ছেলের সামনে তৎক্ষণাৎ মাজেদা বেগম কিছু বললেন না বটে, ওনার পিত্তি জ্বলে গেল। পরদিন সকালে রাফসান যখন একটু বাজারের দিকে গেল, নীরুকে একা পেয়েই মাজেদা কোমরে কাপড় গুঁজে রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুখটা বিকৃত করে, গলার আওয়াজ সপ্তমে চড়িয়ে বললেন, “কী জাদু করছিস শুনি? কী এমন মধু পাইছে এই ড্যাকরা মেয়েটার মধ্যে! আগে পোলা আমার মাসে একবার বাড়িত আসত। আফিসের কাম ফেলে কখোনো নড়ত না। আর এখন? ছ্যাহহহহ! লজ্জা-শরম এক্কেবারে ধুয়ে খাইছিস! কেমন ছেমড়িরে বাবা, বিয়ার কয়দিন যাইতে না যাইতেই জোয়ান পোলাডারে আঁচলে বাইন্ধা রাখছিস? ঢং দেখলেই আমার গা জ্বলে!”

নীরু ম্লান মুখে মাথা নিচু করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, “না, আমি তো…”

নীরুকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই মাজেদা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন, “মুখ সামলায়া কথা ক! মুখে মুখে তর্ক করিস না। আমার বাজান ঢাকা থেকে বাড়িত আইলে তুই অত বেশি ওর সামনে জ্যাবজ্যাব করবি না, বুঝছিস? দূর দূর হয়া থাকবি। পোলার সামনে এমুন ঢং করিস যে পোলা লোভ সামলাইতে না পাইরা টানে টানে প্রত্যেক সপ্তাহে ঢাকা থেকে এই অজপাড়াগাঁয়ে ছুটে আসে! তা ঢাকা থেকে এইখানে প্রতি সপ্তাহে আসা-যাওয়ার যে এত টাকা খরচ, এই খরচের টাকা কি তোর হাভাতে বাপের বাড়ি থেকে দিবে? বাপের তো একটা খাট দেওয়ার মুরোদ নাই, আবার আমার পোলার টাকা ওড়ানোর ধান্দা করতাছিস!”

শাশুড়ির বিষাক্ত কথাগুলো তীরের মতো এসে লাগল নীরুর বুকে। বাপের বাড়ির প্রতি শ্বাশুড়ির নির্মম গঞ্জনা শুনতে নীরুর চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে চাইল। কিন্তু ও দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটা আটকে রাখল। চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নীরুকে ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাজেদা বেগম তাচ্ছিল্যের হুংকার ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে হনহনিয়ে চলে গেলেন। শাশুড়ি চলে যেতেই নীরু আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দুই হাঁটু ভেঙে ওখানেই মেঝেতে বসে পড়ল। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। বিয়ে বুঝি এমনই? তুলি ঠিকই বলেছিল। বিয়ে মানেই নরকযন্ত্রণা। একটা মানুষ দেখতে যত ভালোই হোক, দিনশেষে পরনারীর ঘরে নিজের কোনো আত্মসম্মান থাকে না। নিজের জন্মদাতা বাবা-মাকে এভাবে অন্যের মুখে অপমানিত হতে দেখতে হয়।
নীরুর চোখ ফেটে জল নামল। বিয়ের এই অল্প কদিনের মাথায় নিজেকে ওর বড্ড অসহায় আর একা মনে হতে লাগল।

মাজেদা বেগমের কড়া নির্দেশের পর থেকে নীরু নিজেকে গুটিয়ে নিল। রাফসান বাড়ি থাকার দিনগুলোতে ও পারতপক্ষে রাফসানের ছায়াও মাড়াত না। রাফসান যখন ড্রয়িংরুমে বসত, নীরু তখন রান্নাঘরে গিয়ে বসে থাকত। আর রাফসান ঘরে এলে ও কোনো না কোনো বাহানায় ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। শাশুড়ির কথামতো সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলত।
রাফসানও নীরুর নির্লিপ্ততা খেয়াল করে। সে মনে মনে ভাবে, উনিশ-বিশ বছরের একটা মেয়ে! হয়তো এখনো নতুন পরিবেশের সাথে পুরোপুরি সহজ হয়ে উঠতে পারেনি। সেদিন রাতে রাফসান যখন ঘরে এল, দেখল নীরু বিছানার এক কোণে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। রাফসান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে খাটের পাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল, “নীরু, তুমি কি এখনো অস্বস্তি ফিল করছো এই বাসায়? কোনো সমস্যা হচ্ছে তোমার? আমাকে বলতে পারো।”

নীরু ঝট করে উঠে বসল, কিন্তু রাফসানের চোখের দিকে তাকাল না। গায়ের ওড়নাটা টেনে নিচু স্বরে বলল, “না না, কিছু না।”

রাফসান একটু সময় নিয়ে আবার বলল, “তবে কি আমার সাথে কয়েকদিন ঢাকা থেকে ঘুরে আসবে? ওখানে থাকলে হয়তো তোমার মনটা একটু হালকা হতো।”

নীরু শাশুড়ির খরচের খোঁটার কথা মনে করে শিউরে উঠল। দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, “না না।”

রাফসান একটু অবাক হলো। বলল, “তাহলে কি তোমাদের বাসায় যাবে? দু-একদিন থেকে আসবে?”

নীরু এবারও একই রকম ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না।”
সবকিছুতেই এক রোখা ‘না’ শুনে রাফসান আর কিছু বলল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইটটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। সে ভাবল নীরু হয়তো তাকে এখনো মেনে নিতে পারছে না। আর নীরু অন্ধকারে চোখ মেলে ভাবল, দূরত্ব বজায় রাখাই ভালো নইলে আবার বাপের বাড়ি নিয়ে শাশুড়ির গঞ্জনা শুনতে হবে।
.
এইভাবেই দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। রাফসান ছুটি শেষে আবারও ঢাকায় নিজের কর্মস্থলে ফিরে গেল। তবে আগের মতো সে আর প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসছে না। ঢাকা শহরের ব্যস্ত লজিংয়ে বসে একা একা রাফসান প্রায়ই জানালার বাইরে তাকিয়ে নীরুর নির্লিপ্ত চেহারার কথা ভাবে। ভাবে, “বিয়েটা হুট করেই হলো। মেয়েটার বয়স কম, ওর মাথার ওপর সংসারের কোনো দায় চাপাতে চাইনি। ভেবেছিলাম, বিয়ের শুরুর সময়টায় ওর পাশে থাকা দরকার। মাথার ওপর অফিশিয়াল দায়িত্ব যতই থাকুক, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম শুধু ওর একটু ভরসা হব বলে। কিন্তু নীরু তো আমার উপস্থিতিটাই পছন্দ করছে না! আমাকে দেখলেই কেমন গুটিয়ে যায়, পালিয়ে বেড়ায়। যে মানুষটা আমাকে এখনো মনে-প্রাণে মেনেই নিতে পারছে না, তার সামনে বারবার গিয়ে দাঁড়ালে তো ওর অস্বস্তি আর মানসিক চাপ আরও বাড়বে। তারচেয়ে ওকে আরেকটু সময় দেওয়াই ভালো। জোর করে তো আর সহজ হওয়া যায় না। যখন ও নিজে থেকে চাইবে, তখনই না হয় আবার যাব।”

এই ভেবে রাফসান নিজের যাওয়া-আসা একদম কমিয়ে দিল। মাস পেরিয়ে গেলেও সে আর গ্রামে পা রাখল না। এদিকে রাফসানের এই না আসাটা নীরুর জীবনে নতুন ঝড় নিয়ে এল। মাজেদা বেগম দ্বিগুণ উৎসাহে নীরুকে খোটা দেওয়া শুরু করলেন। একদিন দুপুরে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, “কী অলক্ষ্মী বউ ঘরে আনলাম! বিয়ার এক মাস যাইতে না যাইতেই পোলার মন বিষাইয়া দিছে। পোলা আমার আগে তাও মাসে একবার আইত, আর এখন বাড়িত আসার নামই নেয় না! কেমন অপয়া মাইয়া, জামাইয়ের মন একটুও ধইরা রাখতে পারল না। মুখপুড়ির লাহান সারাদিন গোমড়া মুখ কইরা থাহে, পোলডায় এই রূপ দেইখা ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়া আর এইমুখো হয় না!”

শাশুড়ির নতুন গঞ্জনা শুনে নীরুর বুকটা ভেঙে যেতে চাইল। ও রান্নাঘরের এককোণে জলচৌকির ওপর বসে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল। বুক চিরে শুধু একটা প্রশ্নই বারবার উঁকি দিচ্ছিল, আমি এখন কী করব? কাকে বলব আমার মনপোড়ানির কথা? হুট করেই নীরুর মনে হলো, রাফসানকে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়? খাম আর পোস্টকার্ড তো পড়ার ঘরের ড্রয়ারেই আছে। কিন্তু চিঠিটা পাঠাবে কিসের মাধ্যমে? এই অজপাড়াগাঁয়ে ডাকপিয়ন তো সপ্তাহে মাত্র দুদিন আসে। তাও যদি চিঠির খবর মাজেদা বেগম জেনে যান, তবে তো রক্ষে নেই! আর সবচেয়ে বড় কথা, চিঠি দিলেই কি রাফসান আসবে? সে তো ভেবে বসে আছে নীরুই তাকে পছন্দ করে না। একটা সামান্য চিঠির কথা শুনে মানুষটা কেনই বা এতদূর থেকে ছুটে আসবে?
দিনকাল বড্ড অদ্ভুত। না আছে হুট করে কথা বলার মতো কোনো কিছু, না আছে নিজের মনের কথা পলকে পৌঁছে দেওয়ার কোনো উপায়। পরবাসে থাকা স্বামীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র সুতো চারকোনা কাগজের টুকরো, যা পৌঁছাতেও সপ্তাহ পার হয়ে যায়। চোখের পানি আড়াল করে নীরু ভাবল, কি করে ও ভাঙা সংসারটাকে জোড়া লাগাতে পারবে? নাকি ভুল বোঝাবুঝির দেয়ালটা আরও উঁচু হবে?

সেদিন ছিল পরের মাসের মাঝামাঝি বৃহস্পতিবার। ঘড়িতে তখন বিকেল চারটে কি সাড়ে চারটে। রান্নাঘরে দুপুরের বাসি পাতিলগুলো ধুয়ে রাতের রান্নার জোগাড় করছিল নীরু। তরকারিতে ভুলবশত লবণের পরিমাণটা একটু বেশি পড়ে গিয়েছিল, আর তাতেই মাজেদা বেগম যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। রান্নাঘরের দরজায় এসে দুই হাত নেড়ে কড়া গলায় চিৎকার শুরু করলেন, “কী লো নবাবের বেটি! তরকারিতে একসের লবণ ঢালছিস কোন আক্কেলে? বাপের বাড়িতে বুঝি কোনোদিন নুন জোটে নাই? খাইতে বসলেই তো গোগ্রাসে গিলিস, অথচ রান্নার বেলায় আক্কেল নাই!”

নীরু উনুন থেকে ডেকচিটা নামাতে নামাতে ভাঙা গলায় বলল, “মা, ভুল করে একটু বেশি পড়ে গেছে। আমি চালের গুঁড়ো দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছি…”

মাজেদা বেগম মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন, “তোর বাপের বাড়ির যে হাল, তাতে নুন-ভাত জুটাই তো দায়! একটা খাট-পালঙ্ক দেওয়ার মুরোদ নাই, অথচ আমার পোলার উপার্জনের অন্ন ধ্বংস করার মুরোদ তো ষোলো আনা আছে! বাপের জন্মে এমন রাজভোগ খাইছিস কোনোদিন?”

ঠিক তখনই সদর দরজার কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মাজেদা বেগম গজগজ করতে করতে বসার ঘরের দিকে গেলেন দরজা খুলতে। কিন্তু বসার ঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই দরজা খুলে ভেতরে পা রাখল রাফসান। ঘরটা পেরোনোর সময়ই মায়ের উথলে ওঠা প্রতিটা বিষাক্ত শব্দ রাফসানের কানে এসে ঠেকেছিল। ছেলেকে দেখে মাজেদা বেগমের মুখের কথা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “আরে বাজান! তুই হুট কইরা? চিঠিও দিলি না, কিছু জানাইলিও না…”

রাফসান কোনো কথা বলল না। তার গম্ভীর ফর্সা মুখটা রাগে আর অপরাধবোধে থমথম করছে। সে হাতের ব্যাগটা সোফার ওপর রেখে শান্ত কিন্তু অসম্ভব দৃঢ় চোখে মায়ের দিকে তাকাল।
ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে উঠে এসেছে নীরু। দরজায় রাফসানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। রাফসানের থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বুকের ভেতরটা আবার অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। রাফসান মায়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি নীরুর ম্লান মুখের দিকে তাকাল। অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, “নীরু, ঘরে এসো।”
.
.
.
চলবে…

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ