#নোনা_জল #চতুর্থ_পর্ব
অনেকক্ষণ একটানা কথা বলার পর দম নেওয়ার জন্য দীপান্বিতা একটু থামলো… তারপরে প্রমিতের দিকে তাকিয়ে বলল, “আসলে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়া খুব সহজ প্রমিত, নিজের বেলায় এই লজিকগুলো কাজ করে না। এই যে আপনাকে এত বড় বড় কথা বললাম, অথচ নিজের ঘরের ডিনারের থালাটা সাজানোই রয়ে গেল, এক গ্রাসও গিলতে পারলাম না সৃজিতের দেওয়া ওই তিন লাইনের মেসেজটার চক্করে।”
প্রমিত এবার বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল। ওর সেই খসখসে, ভারী গলার হাসিটা লনের পরিবেশটাকে এক ধাক্কায় অনেক হালকা করে দিল। ও বলল, “তার মানে দাঁড়াল—আপনি থিওরি ক্লাসে ফার্স্ট, কিন্তু প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার খাতায় গোল্লা! চলুন, অনেক রাত হলো। এবার সত্যিই রুমে ফেরা দরকার।”আর কথা না বাড়িয়ে প্রমিতের পাশাপাশি দীপান্বিতা ও রিসর্টের লবি ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। চারতলার করিডোরে এসে যখন প্রমিত ৪১২ নম্বরের দিকে আর দীপান্বিতা ৪২২ নম্বরের দিকে এগোবে, তখন প্রমিত হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে উঠল, “দীপান্বিতা?”
“হ্যাঁ?” ও ঘুরে তাকাল।
“কাল সকালে যদি গৌরব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে, তবে আমরা ওই বাঁদিকের কোণায় লাল ছাতাওয়ালা দোকানটায় চা খেতে যাব। আপনি আসবেন তো? প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার পরের চ্যাপ্টারটা না হয় ওখানেই আলোচনা করা যাবে… আপনার গল্পটা শোনা পুরোই বাকি থেকে গেছে”
দীপান্বিতা মাথা নেড়ে বলল, “আসব। গুড নাইট প্রমিত।”
“গুড নাইট।”
দীপান্বিতা ঘরে ঢুকে দরজাটা লক করল…আলতো হাতে থালা-বাটিগুলো ঢাকা দিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখল। রাতে আর নতুন করে খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না.. হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিল।
সকালের মন্দারমনি এক অন্য রূপ নিয়ে হাজির হয়..মেঘলা আকাশ কেটে গিয়ে হালকা একটা রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে বালুচরে…একটা হালকা সুতির কুর্তি পরে, চুলটা আলগা করে খোঁপা বেঁধে চটপট নিচে নেমে এলো।
রিসোর্টের গেট থেকে বাঁদিকের মোড়টা ঘুরতেই চোখে পড়ল সেই লাল ছাতাওয়ালা চায়ের দোকান। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে বেঞ্চিতে বসে গৌরব হাত-পা নেড়ে জম্পেশ গল্প করছে, আর প্রমিত একটা মাটির ভাঁড় হাতে নিয়ে শান্ত মুখে ওর কথা শুনছে। গৌরবই প্রথম দীপান্বিতাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল, “আরে ম্যাডাম! আসুন, আসুন! এই প্রমিত ব্যাটা তো সকাল থেকে জপ করছিল আপনি আসবেন কি না। আমি তো বললাম, আমার মতো ঘুমকাতুরেই যখন উঠে পড়েছি, আপনি তো তো আসবেনই!”
গৌরবের এই স্বভাবসুলভ চটপটে কথায় দীপান্বিতার সমস্ত আড়ষ্টতা কেটে গেল… ও হাসিমুখে বেঞ্চির একপাশে এসে বসল।দোকানি ছেলেটি ততক্ষণে তিনটে ধোঁয়া ওঠা গরম এলাচ চায়ের ভাঁড় ওদের সামনে এনে নামিয়ে দিয়েছে। চায়ের সুগন্ধ আর সকালের তাজা বাতাস মিলে এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ তৈরি হলো..দীপান্বিতা চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে একটা ছোট চুমুক দিল.. প্রমিত চায়ের ভাঁড়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে দীপান্বিতা কে বলল “সৃজিতের গল্পটা আমায় কিন্তু বলতে হবে ..”
দীপান্বিতা অন্যমনস্ক হয়ে বললো.. “কি বলবো বলুন তো.. শুরুই বা কোথা থেকে করবো.. আমার গল্পের শুরু শেষ সবটাই কেমন যেন গোলমেলে..”
গৌরব চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে লুজ বিস্কুটটা মুখে পুরে বলল, “আরে সৃজিত কে? একটা দিনই শুধু আগে ঘুমিয়েছি তার মধ্যে আবার নতুন ক্যারেক্টার তৈরি হলো কি করে?”
প্রমিত গৌরবকে একটা হালকা ধমক দিয়ে বলল, “তুই একটু চুপ করবি গৌরব? সবসময় শুধু রেডিওর মতো বাজিস। দীপান্বিতা, আপনি বলুন…আমরা শুনছি.. আর কিছু না হোক আমরা দুজন ছেলে তো, পুরো ঘটনাটা শুনলে যদি কিছুটা হলেও ওনার মানসিকতা বুঝতে পারি”
লাল ছাতার নিচে, সকালের মিঠে রোদে মাটির ভাঁড়ের চায়ে চুমুক দিতে দিতে দীপান্বিতা এবার নিজের সাড়ে তিন বছরের সেই অসমাপ্ত গল্পটা বলতে শুরু করলো..
“সৃজিত মানুষ হিসেবে কিন্তু খারাপ ছিল না, অন্ততঃ ও যেভাবে নিজেকে আমার সামনে রিপ্রেজেন্ট করত, তাতে কোনো খুঁত ধরার জায়গা ছিল না। খুব যত্ন করত, আমার ছোট ছোট ভালো লাগাগুলোর খেয়াল রাখত। আমরা দুজনেই কলকাতায় একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করি…ওর সঙ্গে আলাপ হয় আমাদের এক কমন ফ্রেন্ড এর মাধ্যমে, তারপর কাছাকাছি আসা। আমাদের বিয়ের কথাও প্রায় পাকা.. সবাই অন্তত সেরকমই জানতো.. হঠাৎ যে কি হলো,
একটা তিন লাইনের মেসেজে এতদিনের সম্পর্কে ফুলস্টপ ফেলে ও আমার জীবন থেকে সরে গেল..
গৌরব এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল,এবার সত্যি রেগে গিয়ে বলল, “কী অসভ্য লোক মাইরি! সাড়ে তিন বছরের একটা সম্পর্ককে একটা টেক্সট মেসেজে উড়িয়ে দিল?”
গৌরবকে হাতের ইশারায় থামিয়ে প্রমিত বলল এই মেসেজের আগের দু তিন সপ্তাহের কথা একটু ভালো করে মনে করার চেষ্টা করুন তো.. দুম করে এই তিন লাইনের টেক্সট কিন্তু আসার কথা নয়.. আগে নিশ্চয়ই কিছু ইঙ্গিত ছিল যেটা আপনার চোখ ধরতে পারেনি। বা হয়তো ধরতে পেরেছিল মন মানতে চায়নি।
দীপান্বিতা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল.. তারপর বলল
“এই ঘটনার আগের দু তিন সপ্তাহে তেমন কোন পরিবর্তন আমি টের পাইনি। তবে হ্যাঁ গত প্রায় মাস খানেক ধরে ওর কাজের ব্যস্ততা খুব বেড়ে গেছিল.. অন্যমনস্ক থাকতো, ক্লান্ত হয়ে যেত…সারাদিনে হয়তো প্রায় কথাই হতো না আমাদের.. রাতের দিকে ফোন করলে ওর ঘুমে জড়ানো গলা শুনতে পেতাম বলতো কাজের অস্বাভাবিক প্রেসার বেড়ে গেছে।শরীর খুব ক্লান্ত। কাল সকালে কথা বলছি!
আমিও আর ঘাঁটাতাম না, ভাবতাম সত্যিই হয়তো কাজের চাপ.. আমার খারাপ লাগতো.. মনের মধ্যে কথা জমে জমে পাহাড় তৈরি হতো..
দীপান্বিতা চায়ের ভাঁড়টা দুহাতে একটু শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখ দুটো তখন চায়ের ধোঁয়া ভেদ করে সামনের ফাঁকা বালুচরে গিয়ে আটকেছে। ও আবার বলতে শুরু করল, “মনের ভেতর যে অভিমানের পাহাড়টা জমছিল, সেটা আমি একটু একটু করে চেপে রাখতাম। ভাবতাম, ও তো আমার জন্যই খাটছে, আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই তো এই উদয়াস্ত পরিশ্রম। কিন্তু আসল সত্যিটা যে অন্য কিছু ছিল, সেটা এই বোকা মন বিন্দুমাত্র টের পায়নি।”প্রমিত চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চের ওপর নামিয়ে রাখল। ওর মুখটা বেশ গম্ভীর। ও দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “দীপান্বিতা, একটা কথা বলব? এই যে কাজের অস্বাভাবিক প্রেসার, সারাক্ষণ ক্লান্তি আর রাতে ঘুমে জড়ানো গলায় ‘কাল কথা বলছি’ বলে ফোন রেখে দেওয়া—এটা আসলে কাজের চাপ নয়। এটা হলো একটা মানুষকে একটু একটু করে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে পুরোনো আর চেনা স্ক্রিপ্ট। যখন একটা মানুষ সরাসরি ‘আমি আর সম্পর্কে থাকতে চাই না’ বলার সাহস পায় না, তখন সে এই ক্লান্তির আর ব্যস্ততার দেওয়ালটা খাড়া করে। যাতে ওপাশে থাকা মানুষটা নিজেই আস্তে আস্তে দূরে সরে যায় কিংবা মানসিকভাবে তৈরি হয়ে নেয়।”গৌরব এতক্ষণ বিস্কুট চিবোচ্ছিল, ও চট করে বলে উঠল, “একদম ঠিক বলেছিস প্রমিত! ওই ব্যাটা আসলে গিল্ট ফিলিং থেকে পালাচ্ছিল। সামনাসামনি কথা বলার ক্ষমতা ছিল না চোরের!”
দীপান্বিতা একটা ম্লান হাসল..”ওই মেসেজটা আসার আগে পর্যন্ত আমার চোখে সৃজিত ছিল আমার জন্য একদম পারফেক্ট একটা মানুষ.. এখনো আমি ওর কোন ভুল দেখতেই পাই না.. আমার সব সময় মনে হচ্ছে হয়তো আমার মধ্যেই এমন কোন খামতি আছে, আমারই কোন ভুলের জন্য ও আমার সঙ্গে থাকতে পারলো না..”
বলতে বলতে দীপান্বিতার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল চায়ের ভাঁড়ে গিয়ে পড়ল। সকালের মিঠে রোদটাও যেন এক মুহূর্তের জন্য ওর মুখের ওপর ম্লান দেখাল।
গৌরব ঝাঁঝিয়ে উঠলো “আপনি ফোন করে কারণ জানার চেষ্টা করেননি?”
-কতবার করেছি.. শেষে আমাকে ব্লক করে দিয়েছে..
-ইল্লি আর কি! একটা মেয়ের জীবনের সাড়ে তিন বছর বরবাদ করে তিন লাইনে মেসেজ করে হাওয়া হয়ে যাওয়া!! একদম মেনে নেবেন না এটা..
প্রমিত অবাক চোখে গৌরবের দিকে তাকায়..”মেনে না নিয়ে উপায় কি! জোর করে কি কারো সঙ্গে সম্পর্কে থাকা যায় নাকি!”
-আরে ধুর আপদ ..সম্পর্কে থাকতে হবে কেন.. কিন্তু আমি যে জায়গায় এত বছর ধরে ইনভেস্ট করেছি.. আমার টাইম এফর্ট, এনার্জি,আবেগ সমস্ত ইনভেস্ট করেছি সেইখান থেকে বিনা কারণ দেখিয়ে পুরো ইনভেস্টমেন্ট টাকে তো কেউ নস্যাৎ করে চলে যেতে পারে না.
দীপান্বিতাও তখন অবাক চোখে গৌরবের দিকে তাকিয়ে আছে..প্রমিত চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চের ওপর নামিয়ে রেখে মাথা নেড়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “বাহ্ গৌরববাবু বাহ্! সাড়ে তিন বছরের একটা খাঁটি রিলেশনকে তুই একদম শেয়ার বাজারের মিউচুয়াল ফান্ড বানিয়ে দিলি? ইনভেস্টমেন্ট, এফর্ট, এনার্জি! তোর মাথায় কি সারাক্ষণ ওই চার্ট আর গ্রাফ ঘোরে রে?”
-আরে ধুর, তুই টেকনিক্যাল দিকটা বুঝবি না প্রমিত?গৌরব বেশ উত্তেজিত হয়ে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর চায়ের দোকানের একটা খুঁটি ধরে দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখুন, ও ইঞ্জিনিয়ার হলেও শিল্পী মানুষ, ও শুধু সুর আর কষ্ট বোঝে। আমি প্র্যাক্টিক্যাল জগতের লোক, আমি লাভ-ক্ষতি বুঝি। আপনি সৃজিতকে ভালোবেসেছিলেন, সেটা আপনার আবেগ। কিন্তু ওই সাড়ে তিনটে বছর যে আপনি আপনার জীবনের গোল্ডেন টাইমটা, আপনার মেন্টাল স্পেসটা ওই মানুষটার পেছনে খরচ করলেন—সেটার একটা জাস্টিফিকেশন লাগবে না? আপনি কোনো ভুল করেননি, ছেড়েও যেতে চাননি অথচ ও স্রেফ একটা ‘সরি, কন্টিনিউ করতে পারছি না’ লিখে হাত ধুয়ে চলে গেল! এতে আপনার সেলফ-রেস্পেক্টটা কোথায় গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে ভেবেছেন? আপনার নিজের খামতি খোঁজার চেষ্টার কারণ তো ওই ধাক্কাটা খাওয়ার জন্য.. আজকের দিনে একটা সম্পর্ক যে কোন সময়ে শেষ হতেই পারে.. কিন্তু তার জন্যেও একটা পারফেক্ট ক্লোজার লাগে.. ওটা না পাওয়ার জন্যই আপনি গুমরে মরছেন কারণ আপনার কাছে আপনাদের সম্পর্ক শেষ হওয়ার কোন কারণই জানা নেই.. এটা তো হতে পারে না..
গৌরবের এই অকপট আর খ্যাপাটে যুক্তির সামনে দীপান্বিতা প্রথমে একটু থতমত খেলেও, ধীরে ধীরে ওর মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত জোর ফিরে আসতে লাগল। গত সাত দিন ধরে ও শুধু নিজেকেই অপরাধী ভেবে এসেছে—কখনো বোকার মত ভেবেছে ওর রূপ কম? নয়তো ভেবেছে ও সৃজিতকে যথেষ্ট সময় দিতে পারেনি? হয়তো ছেলেটাকে ঠিক বুঝেই উঠতে পারেনি..কিন্তু গৌরব এক ঝটকায় ওর চোখ খুলে দিল।প্রমিত একটু এগিয়ে এসে দীপান্বিতার চোখের দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটোতে এবার এক চিলতে আলো। ও বলল, “গৌরবের কথা বলার ধরনটা একটু অদ্ভুত হতে পারে দীপান্বিতা, কিন্তু ও খাঁটি কথাটাই বলেছে। আপনি একটু মনে করে দেখুন তো আমি যদি খুব ভুল না করি তবে ল াস্ট দুটো উইকে সৃজিত আপনাকে ঠিক কতবার কল করেছে আপনি হয়তো কর গুনে বলতে পারবেন..
দীপান্বিতা নিচের ঠোঁটটা কামড়ে পুরনো কথা মনে করার চেষ্টা করে… এর আগে কে ফোন করছে এই বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার আছে বলেই ওর কোনদিন মনে হয়নি.. তবু কেন জানি মনে হলো শেষ দশ পনের দিন হয়তো ও একাই বেশিরভাগ সময় কল করতো… কখনো বেশ কয়েকবার মিসডকল দেখার পর হয়তো বেলার দিকে ও একটা ফোন করে বলতো “বিশেষ কিছু কথা আছে কি”..
চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের ধারে বালির ওপরে গিয়ে বসলো.. দীপান্বিতা তখনো স্মৃতি সাঁতরে যাচ্ছে.. ওকে চুপ করে থাকতে দেখে গৌরব বলল..
“অত আপনার মগজে জোর লাগানোর দরকার নেই ম্যাডাম..
আপনার কল হিস্ট্রি না দেখেই আমি বলতে পারি বেশিরভাগ কল গুলো আপনি করেছেন.. আর কাজের চাপ? আমি অত প্রেম ভালোবাসা বুঝিনা তবে আমি এটুকু জানি আমরা ছেলেরা যতই ব্যস্ত থাকি না কেন নিজের মানুষটার কথা আমাদের ঠিক মনে থাকে… ঠিক ওই জায়গাটাতেই আপনি বুঝতে পারবেন একটা ছেলে তার সম্পর্কে কতখানি খাঁটি.. যে ছেলে নিজের সম্পর্কের প্রতি কমিটেড সে শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের গার্লফ্রেন্ড বা স্ত্রীর জন্য সময় বের করে নেবে।
গৌরবের এই কথার পিঠে আর কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না দীপান্বিতা। সমুদ্রের ঢেউগুলো তখন মৃদু ছন্দে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল ওদের পায়ের কাছের বালুচর। নোনা বাতাসের এক একটা ঝাপটা যেন এতক্ষণের জমে থাকা সমস্ত গ্লানি আর সংশয়কে এক এক করে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ও হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে এনে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে বসল। তারপর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “তোমরা দুজনেই আজ আমার একটা মস্ত বড় ভুল ভেঙে দিলে। আমি এতদিন নিজেকে এক অদ্ভুত অপরাধবোধের খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিলাম। মনে হচ্ছিল, হয়তো আমারই কোনো খামতি ছিল।
-তবে ব্যাটাকে ছাড়বেন না.. সবকিছু নিয়ে ছেলে খেলা যে করা যায় না এটা ওনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে..
-তা কি করে করব!
-সাড়ে তিন বছর প্রেম করছেন.. বাড়ি চেনেন না? অফিস চেনেন না? প্রথমে অন্য একটা নম্বর থেকে ফোন করে বলুন যে সম্পর্কে থাকতে আপনিও চান না কারণ যে ছেলে এত বছরের একটা সম্পর্কের প্রতি মিনিমাম দায়িত্বটুকু পালন করার অবকাশ দেখায় না তার সঙ্গে সম্পর্কে থাকতে আপনার বয়ে গেছে… কিন্তু ওনার দিক থেকে এই সম্পর্ক ভাঙার পারফেক্ট কারণ ওনাকে বলে যেতে হবে.. যেতে হবে মানে বলতেই হবে আর তা না করে যদি উনি এই নম্বরও ব্লক করেন তবে বলে দেবেন আপনি বাড়িতে বা অফিসে গিয়ে হাজির হবেন..
-আমি ওর বাড়িতে বা অফিসে হানা দেবো?
-কেন নয়? উনি আপনার কনফিডেন্স নিয়ে খিল্লি ওড়াতে পারেন আর আপনি ওনার কনফিডেন্সে একটু ধাক্কা মারতে পারবেন না?
প্রমিত এতক্ষণ চুপচাপ বালির ওপর আঙুল দিয়ে হিজিবিজি কাটছিল। ও গৌরবকে থামানোর জন্য হাতটা তুলল, তারপর দীপান্বিতার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল, “গৌরব যেটা বলছে, সেটা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে দীপান্বিতা। কিন্তু ওর মূল ভাবনাটা ভুল নয়। আমি আপনাকে ওই চোরের বাড়ি বা অফিসে গিয়ে সিন ক্রিয়েট করতে বলব না। কারণ, তাতে ওই মানুষটার চেয়ে আপনার সম্মানটাই বেশি হালকা হবে। তবে… এটাও ঠিক উনি কিন্তু সুকৌশলে আপনাকে নিজেকে অপরাধী,অযোগ্য ভাবতে বাধ্য করেছেন.. তাই উত্তর চাওয়া আপনার অধিকার..”
গৌরব নিজের সিগারেটের শেষ অংশটা বালিতে চেপে নিভিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “একদম! প্রমিত আজ লাইনে এসেছে। ম্যাডাম, আপনি জাস্ট আমার ফোনটা নিন। ও তো এই নম্বরটা চেনে না। এখনই একটা টেক্সট করুন। কোনো কান্নাকাটি নয়, কোনো মিনতি নয়। স্রেফ একটা সলিড স্টেটমেন্ট..”
দীপান্বিতা গৌরবের বাড়িয়ে দেওয়া ফোনটার দিকে তাকাল। স্ক্রিনটা সকালের রোদে চকচক করছে। ওর ডান হাতের আঙুলগুলো একটু কেঁপে উঠল। সাড়ে তিন বছর ধরে যার একটা মেসেজের জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকত—আজ তাকে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ করতে হবে!
প্রমিত মৃদু হাসল, ওর চোখে এখন এক অদ্ভুত রকমের সমীহ। ও নিচু গলায় বলল, “টাইপ করুন দীপান্বিতা… নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মানটা এবার নিজে হাতেই টাইপ করে ফেরত নিন।”
দীপান্বিতা ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। সমুদ্রের হাওয়াটা যেন ওর চুলে আর কুর্তির হাতায় এসে চাবুক মারছিল। ও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে একটা লম্বা শ্বাস নিল। এতদিনের জমে থাকা কান্না, শেষ সাতটা রাতের বিনিদ্র গ্লানি, আর নিজেকে অযোগ্য ভাবার সেই বিষাক্ত যন্ত্রণাটা যেন এক মুহূর্তে একটা শক্ত পাথরে পরিণত হলো। ওর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো এবার স্থির হলো গৌরবের ফোনের কিপ্যাডের ওপর।
“সৃজিত, আমি দীপান্বিতা। অন্য নম্বর থেকে মেসেজ করছি দেখে ঘাবড়ে যেও না, তোমার ভাঙা রিলেশনের অবশিষ্টাংশ কুড়োতে আমি আর আজ আসিনি। তবে সম্পর্ক শেষ করার কারণ যে তোমাকে বলতেই হবে…আমি জানি, এর পর তুমি এই নম্বরটাও ব্লক করতে পারো। তবে মনে রেখো, তোমার এই পালিয়ে যাওয়াটা কিন্তু এত সহজে হবে না। উত্তর তোমাকে দিতেই হবে। নয়তো খুব শিগগিরই তোমার বাড়িতে বা অফিসে এসে এর একটা মুখোমুখি জাস্টিফিকেশন আমি বুঝে নেব—কথা আমাদের হচ্ছেই।”
মেসেজটা শেষ করে দীপান্বিতা এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করল না। ‘সেন্ড’ বোতামটায় একটা তীব্র চাপে আঙুল ছোঁয়াতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল—’মেসেজ ডেলিভার্ড’।
আমার ফোনে ও যদি কোন রিপ্লাই করে আমি সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে জানাবো।
-থ্যাঙ্ক ইউ..
-আরে ধুর সকাল থেকে শুধু চা বিস্কুটের উপর দিয়ে চলছে.. থ্যাংক ইউ দিয়ে কি হবে.. চলুন তিনজনে মিলে জমিয়ে কটা কচুরি খেয়ে আসি.. কাল রাতে আপনি এমনিও কিছু খাননি শুনেছি।ফিরে গেলে কিন্তু ওই প্রাইভেট কোম্পানির বস খাটিয়ে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না.. তাই এবার থেকে নিজের দিকে একটু নজর দিন..
প্রমিত দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে বলে “এবারের মন্দারমনি ঘোরা আমার চিরকাল মনে থাকবে… আমি নিজে যদিও সেভাবে মুভ অন করতে এখনো পারিনি.. তবুও হঠাৎ পাওয়া বন্ধুর জন্য কিছু করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।”
গৌরব প্রমিতের মাথায় চাঁটি মেরে বলে “দিনরাত তনয়ার প্রোফাইল যদি স্টক করতে থাকিস তাহলে মুভ অন করবি কি করে?”
দীপান্বিতা প্রমিতের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকায়.. তারপর বলে “তনয়া আপনাকে ব্লক করেনি তাই না?”
প্রমিত মাথা নাড়ে…
দীপান্বিতা বলে “এবার ব্লকটা আপনি ওকে করবেন..”
-আমি? তবে যে চোখের দেখা হওয়াটাও বন্ধ হয়ে যাবে..
-ওই চোখের দেখাই তো আপনার মধ্যে হতাশা, আফসোস টেনে আনছে.. এর থেকে বেরোতে হবে তো! আর একটা কথা তনয়া আপনাকে কেন ব্লক করেনি বলুন তো?
এবার হো হো করে হেসে ওঠে গৌরব..”আর কেন!! যাতে ওই বড়লোক বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে যে ফানটুশী লাইফ স্টাইল কাটাচ্ছে সেটা ওর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ওর অযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে”
-সেটা তো আছেই..তার সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার আছে.. শুনতে খুব খারাপ লাগলেও আসলে তনয়া চায় না আপনি কোনদিন ওকে ভুলুন.. সম্ভবত ও ধরেই নিয়েছে আপনার যা যোগ্যতা তাতে আপনি সিঙ্গেল হয়ে চিরকাল থেকে যাবেন এবং ওকে নিয়ে আফসোস করতে করতে বাকি জীবনটা কাটাবেন..
গৌরব প্যান্টের বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলে “এবং এই উদ্দেশ্যে তনয়া হান্ড্রেড পার্সেন্ট সফল”
কচুরির দোকানে চারটে করে কচুরি আর আলুর দম অর্ডার দেওয়ার পর দীপান্বিতা প্রমিতকে বলে “ফেসবুকে আজ একটা স্ট্যাটাস দিন.. রিলেশনশিপের জায়গাটায় লিখুন আপনি রিলেশনশিপে আছেন।
-আ্য্য্য্য!!!
-এ্যা নয় মশাই..হ্যাঁ.. এই স্ট্যাটাস টা দিয়ে চুপ করে বসে থাকুন কয়েক ঘন্টা.. কেউ কনগ্রাচুলেট করলে বা শুভেচ্ছা জানালে খুব ভালো করে এমন রিপ্লাই দেবেন যাতে প্রমাণ হয় আপনি ভীষণ হ্যাপি তারপরে তনয়াকে ব্লক করে দেবেন..
ক্রমশ
#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা
