#নোনা_জল #তৃতীয়_পর্ব
রুম সার্ভিসের মৃদু টোকাটা দীপান্বিতার মনের ভেতরের সেই কষ্টের ঘোরটাকে এক ঝটকায় ভেঙে দিল। ও চোখের কোণের জলটা হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিল, তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজাটা খুলল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রিসোর্টের সেই চেনা বয়, যার হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের থালা আর পাতলা মুরগির ঝোল।
“আসুন,” মৃদু গলায় বলল দীপান্বিতা।
ছেলেটি বেশ অমায়িক হেসে ঘরের ভেতর ঢুকল। ঘরের কোণায় রাখা কাঁচের টেবিলটার ওপর খুব গুছিয়ে থালাটা নামিয়ে রাখল সে। গরম ভাতের সুগন্ধ আর লেবুর টুকরোটার তাজা গন্ধ এক মুহূর্তের জন্য ঘরটার গুমোট ভাবটা যেন কাটিয়ে দিল। ছেলেটি খাবারগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে, জলের গ্লাসটা ঢাকা দিয়ে বিনম্রভাবে বলল, “ম্যাম, খাবার দিয়ে দিয়েছি। আর কিছু লাগবে?”
“না, ধন্যবাদ,”
ছেলেটি মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। দীপান্বিতা ওর পিছন পিছন গেল দরজাটা লক করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ও যেমনই দরজার পাল্লাটা ধরে টানতে যাবে, ঠিক তখনই করিডোরের বাঁদিকের মোড় ঘুরে একটা চেনা অবয়বকে এগিয়ে আসতে দেখল।জলপাই রঙের ট্রাউজার পরা প্রমিত!
প্রমিতের হাতে তখন একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট, সম্ভবত কোনো দোকান থেকে কিছু একটা কিনে ফিরছে। দীপান্বিতার দরজার সামনে আসতেই প্রমিত হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তারপর নিজের কপালে আলতো করে একটা চাপড় মেরে বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল।
দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে ও রসিকতার সুরে বলল, “এই দেখুন! আর একবার ভুল করে এই পাশের উইং-এ চলে এসেছি! আমার এই ডান আর বামের গোলমালটা কোনোদিন মিটবে না দেখছি।”
দীপান্বিতা দরজার পাল্লাটা ধরে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। প্রমিতের এই সহজ, সাবলীল কথাবার্তা ওর ভেতরের আড়ষ্টতা যেন নিমেষে কমিয়ে দেয়।প্রমিত হাসির রেশটুকু কাটিয়ে এবার একটু ভালো করে দীপান্বিতার দিকে তাকাল। তারপরে হাতের প্যাকেটটা একটু নাড়িয়ে মৃদু হেসে বলল, “একটা কথা বলব? খাবার দাবার খেয়ে নেওয়ার পরে যদি একটু সৈকতে হাঁটতে যান… মানে রাতের সমুদ্রটা দেখতে চান, তাহলে আমার সাথে চলতেই পারেন। আমি একটু পরেই বেরোব। গৌরব তো অলরেডি বিছানায় ছিটকে গেছে, ও নাক ডেকে ঘুমোবে এখন। একা একা হাঁটার চেয়ে দুজনে হাঁটলে আমি ভাবছি বেশ ভালোই লাগবে…”
দীপান্বিতা একটু লাজুক অথচ শান্ত হেসে বলল, “আপনার প্রস্তাবটা খারাপ নয়। তবে এত রাতে বাইরের সমুদ্রতীরটা কিন্তু বড্ড নির্জন হয়ে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে অতটা দূরে যাওয়া কি ঠিক হবে? বরং রিসোর্টের লনটা সেক্ষেত্রে অনেক বেশি সেফ। ওখানে পর্যাপ্ত আলোও আছে, আর হাওয়া খেতে খেতে হাঁটার জায়গাও বেশ ছড়ানো।”
প্রমিত খুব সহজেই দীপান্বিতার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, প্রশান্ত হাসিটা লেগে রইল। ও হাতের প্যাকেটটা একটু সামলে নিয়ে বলল, “একদম ঠিক বলেছেন। লনই সই। আসলে খোলা আকাশের নিচে নোনা হাওয়া খেতে খেতে হাঁটাটাই আসল, জায়গাটা কোনো ব্যাপার নয়। আপনি বরং আর দেরি করবেন না, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। শান্তিতে ডিনারটা সেরে নিন। আমি নিচে লনেই আছি, আপনি খেয়ে আসুন।”
প্রমিত আর কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। ওর যাওয়ার পথের দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে দীপান্বিতা খুব সন্তর্পণে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
ঘরের ভেতরে তখন ডিনারের গরম ভাতের হালকা সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বারান্দা দিয়ে ভেসে আসা সমুদ্রের গর্জনটা এখন আর ততটা বিষণ্ণ লাগছে না..
প্লেটের ঢাকনাটা একপাশে সরিয়ে রেখে চামচটা হাতে তুলে নিতে গিয়েও থমকে গেল। কেন জানি না, আজ আর চামচ দিয়ে কৃত্রিমভাবে খেতে ইচ্ছে করল না ওর। ডান হাতের আঙুলগুলো দিয়ে ও গরম ভাত আর হালকা সোনালী রঙের মুরগির ঝোলটা এক সাথে মাখতে শুরু করল। পাশে রাখা পাতিলেবুর টুকরোটা তুলে নিয়ে বেশ ভালো করে চেপে রসটা ছড়িয়ে দিল ভাতের ওপর। লেবুর সেই তাজা, টক গন্ধটা ঝোলের সুবাসের সাথে মিশে এক নতুন সুগন্ধ তৈরি করল। কিন্তু প্রথম গ্রাসটা মুখে দিতেই দীপান্বিতার মনে হলো, খাবারটা আজ আর অন্য দিনগুলোর মতোই একদম বিস্বাদ ঠেকছে । গত সাতটা দিন ধরে প্রতিটা দানাকে বিষের মতো মনে হয় ওর, গলার কাছে এসে যেন আটকে যায় সব..
তেল মসলা হীন মুরগির ঝোল,তুলতুলে নরম চিকেন সবকিছুই যেন বিস্বাদ ঠেকতে লাগলো… দীপান্বিতা জানে এখন জোর করে মুখে গ্রাস ঢোকানোর মানে আবার বমি পাওয়া। তাই খাওয়া থামিয়ে জলের গ্লাস তুলে এক নিঃশ্বাসে এক গ্লাস ঠান্ডা জল খেয়ে উঠে পড়ল…
হাত-মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা একটু ঠিক করে নিল ও। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ.. চোখের নিচে কালি.. চেহারাটার উপর দিয়ে মনে হচ্ছে যেন একটা বড় ঝড় বয়ে গেছে… দরজা লক করে ও লনের দিকে পা বাড়ালো.. ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর দিক থেকে ওকে দেখতে পেয়ে প্রমিত এগিয়ে আসলো..
রিসোর্টের সাজানো লনটা রাতে বেশ মনোরম দেখাচ্ছে। চারধারে ছড়ানো মৃদু আলো আর সমুদ্রের দিক থেকে ধেয়ে আসা নোনা বাতাস এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। দীপান্বিতা আর প্রমিত পাশাপাশি হাঁটছে, কিন্তু দুজনের কারও মুখেই কোনো কথা নেই। শুধু ঘাসের ওপর ওদের চারচটি জুতোর মৃদু খসখস শব্দ আর কয়েক হাত দূরের সমুদ্রের অবিরাম গর্জন।কখনো কখনো কোনো মানুষের সাথে চুপচাপ হেঁটে চলাটাও এক বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।
বেশ কিছুটা পথ এভাবে নিরুদ্দেশে চক্কর কাটার পর, প্রমিত হঠাৎ নিজের হাঁটার গতিটা একটু কমিয়ে দিল। তারপর পকেটে হাত রেখে দীপান্বিতার মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “খাননি নিশ্চয়ই কিছু?”
দীপান্বিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ও নিজের ভেতরের দুর্বলতা বা খিদে না পাওয়ার কষ্টটাকে এত সহজে এই অচেনা মানুষের সামনে প্রকাশ করতে চায় না। ও চট করে মুখের ওপর একটা স্বাভাবিকতার মুখোশ টেনে এনে অস্বীকার করার সুরে বলল, “খাবো না কেন? এই তো এক্ষুনি ডিনার সেরেই নিচে নামলাম।”
এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে ছেলেটি দীপান্বিতার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “খেলে সাত মিনিটের মধ্যে কেউ নিচে নেমে আসতে পারে?”
প্রমিতের এই মোক্ষম হিসেবটার সামনে দীপান্বিতা একদম থতমত খেয়ে গেল। ও যে মাত্র কয়েকটা গ্রাস মুখে তুলে, থালাটা একপাশে সরিয়ে রেখে নিচে চলে এসেছে—সেটা এই ছেলেটা এত নিখুঁতভাবে ধরে ফেলবে, ও কল্পনাও করতে পারেনি।
প্রমিতের ভাসা ভাসা চোখে তখন একরাশ গভীর সহমর্মিতা মাখানো। দীপান্বিতা আর কোনো মিথ্যে অজুহাত খুঁজে পেল না, ও শুধু একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল…
প্রমিত বলল আমার থেমে যাওয়া গল্পটার নাম তনয়া… আপনার?
-সৃজিত..
-বুঝলাম..
দীপান্বিতা আড় চোখে দেখল প্রমিতের মুখে কোনো বাড়তি কৌতূহলের ছোঁয়া নেই। ও খুব স্বাভাবিকভাবে লনের নরম ঘাসের ওপর দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। ওর দুই হাত তখন ট্রাউজারের পকেটে। ও আকাশের দিকে মুখ তুলে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, ” তা সৃজিতবাবু হঠাৎ ছন্দের পতন ঘটালেন কেন?”
দীপান্বিতা একটু থমকাল। ও প্রমিতের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নিজের হালকা চাদরটা গায়ের সাথে আর একটু জড়িয়ে নিল। সমুদ্রের দিক থেকে আসা হাওয়াটা এখন আরও জোরালো হচ্ছে। ও নিচু গলায়, যেন নিজের মনেই বলল, “কোনো কারণ নেই। সাড়ে তিন বছরের একটা সম্পর্ককে স্রেফ তিন লাইনের একটা টেক্সট মেসেজ দিয়ে ব্লক করে দেওয়া যায়, এটা বোধহয় আমার জানা ছিল না। কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো অশান্তি হয়নি… জাস্ট একটা অদ্ভুত নীরবতা দিয়ে মানুষটা উধাও হয়ে গেল।”
বলতে বলতে দীপান্বিতার গলাটা একটু বুজে এলো। কিন্তু ও নিজেকে সামলে নিল। এই লনের আবছা আলোতেও ও খেয়াল করল প্রমিতের মুখের অবয়বটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছে।
প্রমিত একটা ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে এসে দাঁড়াল। তারপর একটা শুকনো ডাল পায়ে ঠেলে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।তনয়া অবশ্য আমাকে ব্লক করার চেষ্টা করেনি। ও সরাসরি এসে আমার এই গিটারটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল—’প্রমিত, তোমার ওই আদর্শ আর নীতিকথা দিয়ে আর যাই হোক, একটা ফ্যামিলি চালানো যাবে না। আমি অন্য কোথাও সেটল হচ্ছি।’ ব্যস, গল্প শেষ। পরে শুনেছিলাম আমাদেরই গ্রুপের আরেক বন্ধুকে পটিয়ে তার সাথে সম্পর্কের শুরু নাকি আমি থাকতেই করে ফেলেছিল… সাড়ে চার বছর ধরে একটা সম্পর্কে নিজের মন আবেগ উজাড় করে ঢালার পর যদি বোঝেন যেখানে নিজেকে সবটুকু দিয়ে বসে আছেন সেই জায়গাটাই ভুলে ভরা তখন ভেতরের কনফিডেন্সটা কোথায় গিয়ে যেন শূন্য হয়ে যায়”
প্রমিতের শেষ কথাটা যেন এক লহমায় দীপান্বিতার বুকের ভেতরের অবরুদ্ধ কষ্টের বাঁধটা পুরোপুরি ভেঙে দিল। ‘কনফিডেন্স শূন্য হয়ে যাওয়া’—ঠিক এই অনুভূতিটাই তো গত সাত দিন ধরে প্রতিটা মুহূর্তে ও নিজের ভেতরে টের পাচ্ছে! নিজের বিচারবুদ্ধি, নিজের পছন্দ, নিজের আবেগ—সবকিছুর ওপরেই তো একটা মস্ত বড় সংশয়ের দেওয়াল খাড়া হয়ে গেছে। ও যার হাত ধরে জীবনের বাকি পথটা হাঁটার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই মানুষটা আদৌ কোনোদিন ওকে ভালোবেসেছিল, নাকি পুরোটাই একটা নিখুঁত অভিনয় ছিল.. নাকি ও নিতান্তই অযোগ্য একটা মানুষ যাকে কেউ ভালোবেসে দীর্ঘদিন হাত ধরে রাখতেই পারে না—এই ভাবনায় তো ও প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
দীপান্বিতা আর হাঁটতে পারল না। ও ইউক্যালিপটাস গাছের মায়াবী আলো-আঁধারিতে ওভাবেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। নোনা হাওয়া ওর গায়ের হালকা চাদরটাকে প্রবল শক্তিতে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ওর সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না। ও প্রমিতের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “একদম ঠিক বলেছেন… নিজের ওপর থেকে বিশ্বাসটাই হারিয়ে যায়। মনে হয়, আমি বোধহয় কোনোদিন এই মানুষের যোগ্যই ছিলাম না। সাড়ে তিন বছর কম সময় নয় প্রমিত… একটা মানুষের অভ্যাস, তার কথা বলার ধরন, তার রাগ-ভালোবাসা সবটা আপনার মুখস্থ হয়ে যায়। তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ আবিষ্কার করবেন, যাকে আপনি নিজের চেয়েও বেশি জানতেন বলে ভাবতেন, তাকে আসলে আপনি মোটেই চেনেন নি।”
প্রমিত দীপান্বিতার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ওর ভাসা ভাসা বড় চোখ দুটোতে তখন গভীর এক সমবেদনা। ও পকেট থেকে হাত দুটো বের করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “জানি। এই ধাক্কাটা সহ্য করা সত্যিই কঠিন। চারপাশের মানুষগুলো তখন খুব সহজে এসে জ্ঞান দিয়ে যায়—‘ধুর, একটা মেয়ের জন্য বা একটা ছেলের জন্য জীবন আটকে থাকে নাকি? মুভ অন করো!’ কিন্তু তারা তো জানে না, মুভ অন করাটা কোনো সুইচ টেপার মতো সহজ কাজ নয়। সাড়ে চার বছর আমি তনয়ার প্রতিটা ভালো লাগা, খারাপ লাগাকে নিজের করে নিয়েছিলাম। ওর একটা সামান্য মন খারাপ আমার গোটা দিনটাকে ওলটপালট করে দিত। অথচ তার কাছে আমার এই আবেগটার কোনো মূল্যই ছিল না… ও স্রেফ একটা সাজানো কেরিয়ার আর অনেক টাকার কাছে আমার ভালোবাসাকে বিক্রি করে দিল।”
প্রমিত একটু থামল। সমুদ্রের একটা জোরালো ঢেউয়ের গর্জন লনের বাতাসকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। প্রমিত আবার আলতো হেসে বলল, “তবে জানেন তো, এই যে গৌরব আমার ‘পার্মানেন্ট ড্রাইভার উইদাউট স্যালারি’ বলে খ্যাপায়, ও কিন্তু ভুল বলে না। ও জানে, আমি যদি কলকাতায় চার দেওয়ালের মধ্যে বন্ধ থাকতাম, তবে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম। এই মন্দারমনির সমুদ্র, এই নোনা হাওয়া আর আমার হাতের গিটারটা… এরা আমাকে আস্তে আস্তে বেঁচে থাকতে শেখাচ্ছে। সমুদ্রের এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে যখন নিজের কষ্টটাকে মেলাবেন, তখন দেখবেন আপনার সাড়ে বুকের হাহাকারটা কেমন যেন একটু ছোট হয়ে আসছে..
দীপান্বিতা প্রমিতের কথার কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু ও অনুভব করল, ওর চোখের কোণ ঘেঁষে আবার একটা নোনা জলের ধারা নেমে আসছে। তবে এবারের কান্নাটায় কোনো তীব্র যন্ত্রণা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত হালকা হওয়ার অনুভূতি। এই বিশাল পৃথিবীতে ও যে একা নয়, ওর মতোই আরেকটা ভেঙে যাওয়া মন ও যে এই বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে—এই ভাবনাটুকুই যেন ওকে এক লহমায় অনেক বড় একটা আশ্রয় দিল..
একটু ইতস্তত করে দীপান্বিতা বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব প্রমিত? কিছু মনে করবেন না… কিন্তু আপনার তনয়া তো আপনার সঙ্গে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা করল। সাড়ে চার বছর একসাথে থাকার পর আপনাকে না জানিয়ে অন্য একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়াল, আপনার আবেগটাকে স্রেফ টাকার কাছে বিক্রি করে দিল… তারপরেও সেই মানুষটার জন্য আপনি এতদিন ধরে মনের মধ্যে এত কষ্ট পুষে রেখেছেন কেন?”
প্রমিত করিডোরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একটু ম্লান হাসল। ওর ভাসা ভাসা চোখে এক লহমায় যেন এক সমুদ্র ক্লান্তি নেমে এলো। ও শান্ত গলায় বলল, “অনেক ভেবেছি জানেন, তারপরে মনে হয়েছে কষ্টটা আসলে হয়তো তনয়ার জন্য নয় দীপান্বিতা, কষ্টটা আমার নিজের জন্য। ও হয়তো সেভাবে কোনোদিন আমাকে ভালোবাসেইনি, পুরোটাই ওর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমার দিক থেকে আমার ভালোবাসার তো কোনো খামতি ছিল না। আমি তো ওকে আমার সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিলাম। সেই খাঁটি অনুভূতিটাকে, সেই সাড়ে চার বছরের নিজেকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না।”দীপান্বিতা প্রমিতের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে খুব পরিণত এক অদ্ভুত দার্শনিকতার সুরে বলল, “একবার অন্যভাবে ভেবে দেখুন তো প্রমিত… প্রেমের যে স্মৃতিগুলো আজ আপনাকে এত কষ্ট দিচ্ছে, সেই স্মৃতিগুলোর নাটকে আপনি আসলে দুটো চরিত্রের মধ্যে একটা চরিত্র হয়ে অভিনয় করে গেছেন মাত্র। আপনি শুধু নিজের দৃশ্যটাকে সত্যি ভেবে, নিজের সবটুকু আবেগ ঢেলে অভিনয়টা করেছেন। কিন্তু ওপাশে থাকা অন্য চরিত্রটা… সে তো খুব ভালো করেই জানত যে এই দৃশ্যগুলো কতটা মেকি, কতটা সাজানো! সে স্রেফ একটা স্ক্রিপ্ট মেনে পার্ট প্লে করে গেছে। একটা মানুষ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার অভিনয় করছে, আর আপনি সেটাকে পরম সত্যি জেনে নিজের মন উজাড় করে দিচ্ছেন—এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? একবার ভেবে দেখেছেন, যে স্মৃতিগুলোকে আগলে আপনি কাঁদছেন, তার অন্য পিঠটা কতটা ফাঁপা ছিল?”
লনের আলোয় দীপান্বিতা দেখতে পেল প্রমিতের চোখের কোন চিক চিক করে উঠছে..
“আসলে কি বলুন তো ম্যাডাম.. শেষ ছ মাস ও আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল ঠিকই কিন্তু তার আগের সময়টুকু তো আমার কাছে ও আমার হয়েই ছিল.. ওই সময়ের কথাগুলো আমি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না..
দীপান্বিতা মৃদু হাসলো.. তারপর বলল.. “একটা মেয়ে যদি সত্যি কাউকে মন থেকে ভালোবাসে তাহলে সে ওই সম্পর্কে থাকাকালীন অন্য কোন দিকে তাকাতেই পারে না.. একটি মেয়ে সম্পর্কে থাকাকালীন দ্বিতীয় জনের দিকে তাকাতে পারছে, তার সম্পদ.. ক্যারিয়ার তাকে আকর্ষণ করছে যখন তখন তার মানে আপনার থেকে তার মন অনেক আগেই উঠে গেছে। সে এস্কেপের একটা রুট খুজছিল শুধু, সেই রাস্তাটা এবার সে দেখতে পেয়ে গেছে। ভাববেন না ওই বন্ধুটিই তার প্রার্থিত পুরুষ…. ওই বন্ধুর জায়গায় অন্য কোন ছেলে যদি তার লোভনীয় অর্থ বা ক্যারিয়ার নিয়ে সামনে আসতো তাহলে সে হয়তো তাকেও গ্রহণ করত। কারণ তার তখন মূল উদ্দেশ্য আপনার সাথে সম্পর্ক শেষ করে বেটার লাইফস্টাইল দিতে পারে এমন কাউকে পছন্দ করা মাত্র..
-“তার মানে আমি অযোগ্য এটাই আসল কথা তাই না?”
-না প্রমিত.. আপনাকে আপনার মত করে গ্রহণ করার যোগ্যতা তনয়ার ছিল না.. ভালোবাসা শুধুমাত্র সুখের সাগর হতে পারে না বলেই আমি বিশ্বাস করি… ভালোবাসা একটা জার্নি…একটা মানুষকে তার দোষগুণ খামতি সমেত জানার পরেও তার হাতটাই শক্ত করে ধরে রাখার নাম ভালোবাসা। সেই কঠিন পথ অতিক্রম করার যোগ্যতা সকলের থাকে?…
ক্রমশ
✍️#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা
