Wednesday, June 10, 2026







ইরাবতীর চুপকথা পর্ব-০৮

#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ৮
#কলমে_প্রমা_মজুমদার

ভোরের আলো এসে ইরার মুখে পরছে,অন্যান্য দিনের মতোই আজকের সকাল হচ্ছে, কিন্তু ইরাবতী নামের মেয়েটার জীবনে আজ এক নতুন সকাল।
প্রত্যন্ত গ্রামের সল্প শিক্ষিত মেয়েটা আজ একটা চাকরির সুযাগ পেয়েছে।
সংসারের অভাব দূর করতে যে মেয়েটা রাধুনির কাজ শুরু করেছিলো সেই পরিচয় আজ নতুন দিগন্ত ছুতে চলেছে।

ইরা প্রতিদিনই ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নেয় তারপর বাবাইকে স্কুলের জন্য তৈরি করে, শুভর সকালের খাবার করে দিয়ে কাজে যায়।
আজকেও তার ব্যতিক্রম করছে না তবে শুভ আজ তার সাথে দিয়ার বাড়ি যাবে।বাবাই আর দিশা দোলার সাথে স্কুলে বেরিয়ে যায়।
শুভ ইরার হাত ধরে বলে,তোমার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে ইরা,যদি কাজের যায়গায় কোনো অসুবিধা অনুভব করো তাহলে এক মুহুর্ত না ভেবে চলে আসবে,আমি একটু কষ্ট করে হলেও চালিয়ে নেবো,তুমি কিন্তু বেশি চিন্তা করতে যেয়ো না।

ইরা মুচকি হেসে বলে,তা আর বলতে,দেখে যদি মনে হয় পারবো তবেই শুরু করবো নাহলে দিদির বাড়ির কাজ করেই চলে আসব।

আমার এতো চাহিদা নেই,তোমাকে আর বাবাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে পারলেই আমি খুশি।

দিয়ার বক্সগুলো খালি নিয়ে যেতে ইরার খারাপ লাগছে তাই গত কালের রান্না করা ছোট মাছ চচ্চড়ি টা নিয়ে নেয়,
এতো বড় বক্স ভরে দেয়ার সামর্থ্য ইরার নেই তাই যতটুকু আছে ততটুকুই নিয়ে যায়।

কলিং বেলের শব্দ শুনে দিয়া দরজা খুলে দেয়।
ইরার পাশে একজন যে শুভ এটা বুঝতে দিয়ার বেশি সময় লাগে না।
শুভকে বসার ঘরে বসতে বলে দিয়া ভেতরে চলে যায়।
ইরা এসে সকালের খাবার করলেও দিয়া একটু চা বসায় দুজনের জন্য।
শুভ এসেছে বলে চায়ের জলটা বাড়িয়ে দেয়।
ইরা দিয়ার হাত থেকে কাপ টা নিতে চাইলে দিয়া বলে,
একদম না।
“এখন তুই আমার রান্নার লোক হিসেবে আসিস নি আমরা আগে তোর সাথে মিটিং করবো তারপর তুই রান্নাঘরের কাজে আসবি”

দিয়ার কথা শুনে ইরা ফিক করে হেসে ফেলে।
মানুষ টা এতো মজার কথা বলে যে না হেসে পারা যায় না।

কিন্তু রায়ান দাদাকে দেখে সে সত্যিই অবাক হয়।
অফিসের পোষাক পরে ঘর থেকে বেরিয়েছে।
ইরাকে ডেকে বললো,”আগে তোমার সাথে মিটিং শেষ করে আমি কাজে যাবো তাড়াতাড়ি বসার ঘরে এসো”

দিয়া কাপে চা ঢেলে আর কিছু হালকা খাবার সাজিয়ে নিয়ে বসার ঘরে আসে।
ইরা লক্ষ্য করে চার কাপ চা আছে সেখানে।
এতো কিছু সে কল্পনাও করেনি।

রায়ান দাদাই কথা শুরু করে,

“আমাদের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে,
সেখানে খাবারের ব্যবস্থা থাকে।আমাদের পরিচিত কিছু রান্নার লোক আছে যারা আলাদা ভাবেও অন্যের সাথে কাজ করে।
কিন্তু আমরা চাচ্ছি নিজেদের আলাদা ক্যাটারিং সার্ভিস চালু করতে যেখানে আমাদের নিজস্ব রান্নার লোক থাকবে আর ইরা সব কিছুর তদারকি করবে। প্রধান দায়িত্বে থাকবে ওর নিজের আইডিয়া আর রেসিপিগুলো ব্যবহার করে আমাদের পাশে থাকবে।
এর জন্য তাকে মাস শেষে একটা বেতন আর প্রতিটি ইভেন্টের লাভের হিসেবে কিছু টাকা দেয়া হবে।

আগে দিয়া এই দিকটা দেখতো কিন্তু এখন একটু অসুস্থ আর পরেও বেশ কিছুদিন বাইরে কাজ করতে পারবে না তাই ও বাড়ি থেকেই সব দেখবে।
ইরা ও এখান থেকেই ওর সাথে কাজ করবে।

তবে যেদিন অনুষ্ঠান থাকবে সেদিন রান্নার যায়গায় যেতে হবে।
চাইলে শুভও যেতে পারে,আমাদের গাড়ি ওর যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে। তবে একটা শর্ত ইরা আগামী এক বছর শুধু আমাদের সাথেই কাজ করবে।তারপর ও যদি চায় নিজের মতো আলাদা কিছু করতে পারবে”

রায়ানের কথাগুলো শুভ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো,একেই হয়তো বলে পারফেক্ট প্রেজেন্টেশন।
কোনো ফাক ফোকড় নেই, সবটাই স্পষ্ট।
আর সবচেয়ে বেশি যেটা স্বস্তির সেটা হলো দিয়ার সাথে এই বাড়িতেই সব মিটিং বা আলাপ আলোচনা হবে।
ইরাকে একা কোথাও যেতে হবে না।
শুভ আড়ালে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
ইরা মনে হয় এই পরীক্ষায় উৎরে যেতে পারবে।

ইরা চুপচাপ বসে শুনলো দাদার কথাগুলো এই বাড়ি থেকেই যদি হয় তাহলে ওর কোনো অসুবিধা হবে না দিদি তো পাশে থাকবে।
কিন্তু শুভ যা বলবে সেটাই হবে,শুভর উপর ইরার অগাধ আস্হা।

“ইরা যদি নিজের রান্নায় সবার মন জয় করে নিতে পারে তাহলে তো খুবই ভালো এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
কিন্তু ওর জন্য যদি কোনো ক্ষতি হয় সেটা আমার খুব খারাপ লাগবে তাই আপনারা সব সময় ওর পাশে থাকবেন,ওকে কাজ টা শিখিয়ে দিবেন এতোটুকুই চাই”

শুভর উত্তর শুনে দিয়ার মুখে হাসি ফুটে ওঠে,ইরা জীবনে একজন সত্যিকারের জীবন সঙ্গী পেয়েছে।
এমন মানুষ পাশে থাকলে কেউ পিছিয়ে থাকে না।

রায়ান শুভর হাত ধরে ওকে আস্বস্ত করে।

চায়ের কাপ শেষ করে ইরা উঠে যায়, এবার মিটিং শেষ আমার কাজের সময় শুরু হয়ে গেছে,আমি যতই অন্য কাজ করি না কেন এই বাড়ির রান্নার কাজ সবার আগে শেষ করবো।
ইরা ভেররের দিকে চলে যায়,রায়ান শুভর সাথে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে।
একটা মাস্টার্স পাশ করা ছেলে ছোট একটা চাকরি করে সংসার চালাচ্ছে, ছেলেটার ভদ্র মার্জিত নম্র স্বভাব সহজেই মানুষের কাছে ওকে আলাদা করে দেয়।
রায়ানের শুভকে ভালো লাগে।
ঘড়িতে সময় প্রায় দশটা,রান্নার কাজ শেষ করে ইরা দিয়ার সাথে বসবে।
অনুষ্ঠানের আর মাত্র চারদিন বাকি,অন্যেরা বাকি কাজ দেখছে তারা দুজন রান্নার দিকটা দেখবে।
টেবিলের উপর ছোট বাটি দেখে দিয়া অবাক হয়।

ইরাকে জিজ্ঞেস করায় বলে,
কাল রাতে একটু ছোট মাছের চচ্চড়ি করেছিলাম তাই তোমার জন্য নিয়ে এসেছি।

দিয়া একটু মুখে দিয়েই বলে আজ অন্য কিছু করতে হবে না আমি এটা দিয়েই খাবো।
ইরা হেসে বলে ঠিক আছে।

রাতের জন্য কিছু করে দিচ্ছি,
দিদির বাড়ির বাজার করে দিয়ে যায় অফিসের একটা ছেলে ইরা একটা কাগজে আগের দিন সব লিখে রেখে যায় সেই মতোই বাজার আসে।
আজকে রান্নাঘরে কাঁঠাল দেখে ইরা খুশি হয়।
একদিন দিদি গল্প করতে করতে বলেছিলো তার নাকি কাঁঠালের তরকারি খেতে ইচ্ছে করছে,অনেক আগে দিদির মা রান্না করে খাইয়েছিলো।
গর্ভবতী মেয়েদের সব খাওয়ার ইচ্ছে পূরণ করতে হয় কথাটা ইরার মাথায় ঘুরছিলো তখন থেকেই তাই কাল বাজারের ফর্দে কাঁচা কাঁঠাল লিখে রেখেছিলো।
তবে ছেলেটা বুদ্ধি করে কেটে রাখা প্যাকেট নিয়ে এসেছে,দোলা বলেছিলো শহরে নাকি
সব সবজি কেটে বিক্রি করে আজ ইরা নিজের চোখে দেখলো।
ইরার হাতে বেশি সময় নেই তাই মনে মনে সব গুছিয়ে নেয়।

এক চুলায় কিছু ছোট আলু সিদ্ধ বসিয়ে দেয়,অন্যদিকে কাঁঠালগুলো ভালোভাবে ধুয়ে একটু তেল আর অল্প লবণ হলুদ দিয়ে ভাপিয়ে নেয়।
নিশ্চিন্তপুরে ইরাদের বাড়িতে দুইটা কাঁঠালের গাছ ছিলো।
বাড়ির উঠানে ছিলো একটা আর ঘরের পেছনে ছিলো একটা,মা বলতো উঠানের গাছটা ইরার ঠাকুমার হাতে লাগানো।
তার খুব গাছ পোতার নেশা ছিলো এই বাড়ির বেশির ভাগ গাছ তার হাতে লাগানো।
কাঁঠাল গাছের মুচি আসার পর থেকেই খাওয়া শুরু হয়ে যেতো।
মুচি হলো একদম ছোট ছোট কাঁঠাল,একটু টক স্বাদ ঝাল লবণ দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে।
স্কুল থেকে ফেরার পথে জামার কোচড় ভর্তি করে বড়ই নিয়ে আসতো ইরা আর চম্পা।
তারপর সেগুলো একটা হামান দিস্তায় নিয়ে কিছুটা লবণ, মরিচ আর কাঠালের মুচি দিয়ে ভর্তা করে নিতো।
মাঝে মাঝে মাও বলতো আমাকে একটু দিস,
বৈশাখ মাসে কাঁঠাল একটু বড় হলে সেটা দিয়ে নিরামিষ তরকারি হতো, কোনোদিন ডালের বড়া দিয়ে তো কোনোদিন সরিষা বাটা দিয়ে।
মাঝে মাঝে কুচোচিংড়ি দিয়েও রান্না করতো।
মায়ের হাতের সেই স্বাদ ইরার হাতে আসে না,কিন্তু তারপরও সে করতে চায়।
নাহলে হয়তো এই রান্নাগুলো হারিয়ে যাবে।

আলু সিদ্ধ হয়ে গেছে,দিয়ার হাত খালি ফোন দেখছে তাই ইরা দিদিকে বলে, একটু আলুগুলো খোসা ছাড়িয়ে দাও।
আমি ডালের বড়া করবো।
দিয়া বাচ্চাদের মতো বলে,আমাকে কয়েকটা বড়া দিস আমার খুব ভালো লাগে।
ইরা হাসি মুখে রান্নাঘরে ঢুকে যায়,
ইরার মা অবশ্য অন্য ডাল দিয়ে বড়া করতো কিন্তু ইরা মুসুরের ডাল দিয়ে কয়েকটা ছোট ছোট বড়া করে নেয়।
কাঁঠাল ভাপ দেয়া হয়ে গেছে,এবার মুল রান্না।

আলুগুলো আগে একটু হলুদ লবণ দিয়ে ভেজে নেয় তারপর সেই কড়াইয়ে আবার খানিকটা তেল দিয়ে তাতে জিরা,গরম মসলা,তেজপাতা, ফোড়ন দেয়।আদা আর জিরা বাটা দিয়ে একটু কসিয়ে নেয় অন্যদিকে
একটা বাটিতে কিছুটা হলুদ মরিচ আর ধনের গুড়ো কিছুটা গরম জল দিয়ে মিশিয়ে একটা পেস্ট বানিয়ে নেয় তারপর সেটা কড়াইয়ে দিয়ে অল্প আঁচে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কসাতে থাকে।
মসলা কসানো হয়ে গেলে কাঁঠাল আর আলুগুলো দিয়ে একটু নাড়িয়ে নেয়।
তারপর প্রয়োজন মতো গরম জল আর লবণ দিয়ে একটু ঢেকে দেয়।
ঝোল ফুটে উঠলে ডালের বড়া আর কিছু কাচা মরিচ দিয়ে চুলার আঁচ কমিয়ে রাখে একফাঁকে একটু চিনি দিয়ে দেয়।
ঘী আর গরম মসলা দিয়ে চুলা বন্ধ করে ঢেকে রাখে।
আর কিছু করতে হবে কি-না ভাবতে ভাবতে ফ্রিজ খুলে।

ফ্রিজে ডাল রান্না করা আছে আর কয়েকটা বেগুন আছে।
রায়ান দাদা বেগুন খুব পছন্দ করে তাই ইরা একটু “ডিম বেগুন পোড়া”করবে বলে ভাবে।
সময় প্রায় বারোটা বাজছে বাচ্চাদের নিয়ে আসতে হবে,কিন্তু কাজতো শেষ হয়নি?
দিয়া বাইরে থেকে ইরাকে ডাকে।

“বাচ্চাদের নিয়ে এখানেই চলে আয়,একটা বাবুর্চি আসবে কিছুক্ষণ পর তোর সাথে কথা বলতে
রান্নাটা তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নে”
এমন সময় কলিং বেল,দোলা এসেছে, ইরা দৌড়ে গিয়ে ওকে বলে বাচ্চাদের নিয়ে এখানে চলে আয়।
দোলা কিছু না বলে বেরিয়ে যায় ও ইরাকে খুব ভালো ভাবে বোঝে ইরার চোখের ভাষা ওর খুব চেনা তাই অনেক না বলা কথাই ও বুঝে যায়।

একটা বেগুনের গায়ে অল্প একটু সরষের তেল মাখিয়ে পুড়ে নেয় ইরা, অন্য চুলায় একটা কড়াইয়ে অল্প তেল দিয়ে একটা ডিম ঝুড়ি ভাজি করে।
তারপর সেই কড়াইয়ে কিছুটা সরষের তেল দিয়ে পেঁয়াজ আর কাচা মরিচ কুচি হালকা করে ভেজে নেয় তারপর পুড়ে রাখা বেগুন খোসা ছাড়িয়ে কড়াইয়ে দিয়ে দেয় সাথে ঝুড়ি করে রাখা ডিমগুলো।অল্প একটু লবণ আর কিছুটা ধনে পাতা দিয়ে নামিয়ে নেয়।
গরম ভাতের সাথে খুব ভালো লাগে “ডিম বেগুন পোড়া”
ইরা রান্নাঘর পরিস্কার করে বেরিয়ে দেখে বাবাই আর দিশা চলে এসেছে।
দোলার আজ অন্য বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই তাই সে একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছে।
দিয়া স্নান করে একটা সুন্দর সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে।
ইরার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বলে গেস্ট রুম থেকে একটু ফ্রেশ হয়ে এটা পরে নে,
বাইরের লোকের সামনে সব সময় নিজেকে গুছিয়ে রাখতে হবে।
এখন থেকে এটা যেহেতু তোর অন্য কাজের যায়গা তাই নিজেকে একটু সাজিয়ে রাখবি।
ইরা লজ্জা পেয়ে যায়,
সত্যিই তো তার একটুও খেয়াল নেই।
তার শাড়িতে তেল মসলার দাগ লেগে আছে এভাবে কি কারো সামনে যাওয়া যায়?
সে দিদির দেয়া শাড়িটা নিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়।
দিয়া বাচ্চাদের কিছু ফল খেতে দেয়,আর রান্নাঘরে ঢুকে রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে দেয়।
দোলা বসার ঘর মুছে শোয়ার ঘরের দিকে তাকায় একটা গোলাপী রঙের শাড়ি পরে সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইরা,কে বলবে এই মেয়েটা দোলার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
ইরাকে খুব সুন্দর লাগছে, একটা হাত খোপা আর একটা লাল টিপ এতেই অসামান্য লাগছে মেয়েটাকে।

বাবাইও মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার মা’কে,মা এমন শাড়ি আগে পরতো কিন্তু এখন আর পরে না মাকে খুব ভালো লাগছে।
কলিং বেলের শব্দ শুনে সবাই হুরমুড়ি করে উঠে, দিয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে ওদের বসার ঘরে বসতে বল,
আমি আসছি।
দোলা দরজা খুলে দিয়ে ওদের ঘরে বসায়।
দিয়ার খুব খিদে পেয়েছিলো তাই একটা বাটিতে অল্প তরকারি নিয়ে খেয়েছে। বাচ্চাগুলোর সামনে খায়নি ওদের যদি খারাপ লাগে তাই।

দিয়া একটা ফাইল আর ইরাকে সাথে নিয়ে বসার ঘরে যায়।

দোলাকে ডেকে বলে,বাচ্চাদের জন্য ভাত রান্না হয়ে গেছে ওদের একটু ফ্রেশ করিয়ে খেতে দিবি আর গেস্ট রুমে থাকবি ওদের নিয়ে।

ইরা দিয়ার পাশের সোফায় বসে,
সেদিন যারা এসেছিলো তাদের মধ্যে দুজন আছে আর একজন নতুন
দিয়া সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।সুমন ইরাকে সাহায্য করবে রান্নার কাজে আর আদি সব বাজার সদাইয়ের দায়িত্বে থাকবে।
শোভা ফিনানশিয়াল ব্যাপারটা দেখছে, সব দেখে অফিসে বিল দিতে হবে তার।

এবার ওরা লিস্ট মিলিয়ে একটা মোটামুটি রান্নার ধারণা করে নেয়।

যেহেতু মেন্যুটা ইরার করা তাই সে রান্নাটা মুখে বুঝিয়ে দিচ্ছে সুমনকে।
এই যেমন ,সবজির মধ্যে ছোট করে মুরগির মাংস দেয়া হবে,সাদা পোলাও এর সাথে বুটের ডাল এর মধ্যে কিমা করে খাসির মাংস দেয়া যায়।

বড় টুকরার মাছ ভাজার পরিবর্তে রুই বা কাতলা মাছের পেটির টুকরো কাটা ছাড়িয়ে ছোট টুকরো করে ডিম আর কিছু মসলার একটা ব্যাটারে চুবিয়ে মুচমুচে ভাজা করা যায়।
চিকেন ফ্রাই টা একদম শেষে গরম গরম ভাজা হবে।
অনুষ্ঠান যেহেতু রাতে তাই পায়েসটা সবার আগে করে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে।
যেহেতু বাচ্চা থাকবে তাই ঝালের দিকে একটু নজর দিতে হবে আরও অনেক হিসেব নিকেশ আরও কিছু রান্নার টিপস।

সুমন ইরার বলা কথাগুলো মাথায় রাখলেও কাগজে কলমে লিখে নেয়।
রান্নার উপর দুই বছরের কোর্স করে
গত ছয় বছর ধরে একটা হোটেলে রান্না করে।সে এখন এই কোম্পানির সঙ্গে কাজ শুরু করেছে কিন্তু তার এর অনেককিছুই জানা নেই।
অথচ এই মহিলা কি অবলীলায় সব বলে দিচ্ছে।
কতো টা অভিজ্ঞতা থাকলে এভাবে করা যায় এটাই ঘুরছে সুমনের মাথায়।

আদি একটা বড় লিস্ট করে নেয় আজ থেকেই বাজার শুরু করতে হবে।
কিছু জিনিস ফোনে অর্ডার দেওয়া আছে এবার শুধু মিলিয়ে নিতে হবে।
সে এখানে দুই বছর ধরে আছে এসব কাজে সে দক্ষ।
শোভা মুটামুটি একটা এমাউন্ট ঠিক করে অফিসে নিয়ে যায়।
সবাই চলে গেছে,বেলা এখন প্রায় দুইটা।
ইরা এখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে,সে কি সত্যিই জীবনের প্রথম মিটিংটা শেষ করেছে।
কিন্তু কেউ তো তাকে নিয়ে হাসেনি বা তার মতের উপর আঙুল তোলে নি,তারপরও বুকটা ধুকধুক করছে।

বেলা প্রায় দুইটা,দোলা পাশের ঘরে বসে সব শুনছিলো,ইরা সত্যিই সবার থেকে আলাদা।
সব জায়গায় নিজের যোগ্যতার প্রমান দিয়েই ছাড়ে।
বাচ্চারা খেয়ে নিয়েছে,বারান্দায় বসে খেলছে।
ইরা জলদি শাড়িটা পালটে নিয়ে দিয়াকে বলে,আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে তুমি খেয়ে নিও,আমরা এখন আসি।
সত্যিই তাই ইরার রান্না করা একবাটি তরকারি খেয়ে দিয়ার পেট একটু ভরলেও মন ভরেনি।সে রায়ানের জন্য অপেক্ষা না করেই খেতে বসে যায়।
ইরার জন্য অবশ্য কিছুটা বাটিতে করে দিয়ে দেয়।

মেয়েটা তার স্বপ্নের নৌকায় একটু হাওয়ার মতো হয়ে এসেছে।

স্বামী স্ত্রী মিলে যে ব্যাবসা টা শুরু করেছিলো আস্তে আস্তে সেটা বড় হয়ে উঠছে।
ইরার উপর তার আস্থা আছে তাই এতো বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দুইবার ভাবেনি।
মেয়েটাও যদি একটা নতুন পরিচয় খুঁজে পায় তাহলে তো সে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে।

শুভ বাড়ি ফেরে বিকাল পাঁচটায়, অন্যান্য দিন বাবাই দুই একবার ঘর বারান্দা করে বাবার ফেরার অপেক্ষায়।
আজ ইরা এই কাজ করছে,শুভকে সব না বলা পর্যন্ত ইরার মনে শান্তি হবে না।
ইরা আজ একটা বিশেষ খাবার রান্না করবে।এর জন্য দোলাকে দিয়ে দুধ আর কিসমিস কিনিয়েছে।

বাড়িতে যখনই ভালো কিছু হতো মা এই খাবারটা রান্না করতো,মা বলতো এটা ইরার ঠাকুমার কাছ থেকে শেখা।বাবার খুব প্রিয় ছিলো হাতে বানানো “চসীর পায়েস”।

তখনকার সময় বিনোদন বলতে একটা সাদা কালো টিভিতে বিটিভি দেখা।
পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দিনের বেশির ভাগ সময়ই থাকতো না,ইরার মা সেই সময়টা বসে পিড়ির উপর চসী বানাতো।
চুলায় দুধ জ্বালে বসানো থাকতো দুধ ঘন হয়ে উপরে মোটা লাল সর পরে যেতো চিনি বা গুড় দিয়ে বানাতো মা। ও বানাতে চাইলেই হাত দিতে দিতোনা মা বলতো সব এক মাপের না হলে দেখতে ভালো লাগে না।

ইরা তখন বুঝতো না খাবারের স্বাদের সাথে দেখার কি সম্পর্ক?
কিন্তু এখন সে অনেক কিছুই জানে বোঝে।
শুভ বাড়ি ফিরে এসেছে,ইরার মুখে সব শোনার জন্য সে নিজেও খুব উদগ্রীব।
ইরা শুভকে সব বলে মন থেকে একটা শান্তি পায়।

একটা হাড়িতে বেশ কিছুটা দুধ জ্বাল করতে বসায়।
দুধে বলক এলে চুলার আঁচ কমিয়ে দেয়,কয়েকটা এলাচি আর দুটো তেজপাতা আর কিসমিস দিয়ে দেয়।
এবার এটা ঘন্টা খানেকের জন্য কম আঁচে জ্বাল হবে।

অন্য চুলায় একটা পরিস্কার কড়াইয়ে কিছুটা লবণ দিয়ে জল গরম করে নেয়।
তারপর কিছুটা আটা এর মধ্যে দিয়ে নারিয়ে একটা খামির বানিয়ে নেয়।
একটু গরম থাকা অবস্থায় ময়াম দিয়ে রুটি বানানোর মতো ডো মেখে নেয়।কিছুক্ষণ নরম ভিজে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাচ্চারা নিয়মমাফিক পড়তে বসেছে ইরা আর দোলা একটু টিভির সামনে বসেছে।

সেই আটার ডো থেকে হাতের তালুর সাহায্যে ছোট ছোট চসী বানিয়ে নেয়।
একটা একটা চসী যেন আলাদা থাকে তার জন্য উপর থেকে একটু আটা ছড়িয়ে দেয়।
সবগুলো বানানো হয়ে গেলে ইরা চুলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
দুধটা জাল হয়ে ঘন হয়ে এসেছে,দুধের ওপর একটা মোটা সর পরে আছে, ইরা এবার সব চসী এর মধ্যে দিয়ে চুলার আচ বাড়িয়ে দেয় এরপর স্বাদমতো চিনি দেয়।
বেশি সময় জ্বাল করতে হয় না,দুই একটা বলক উঠে গেলে চুলা নিভিয়ে দেয়, হয়ে গেছে “চসীর পায়েস”

রাতে আর বেশি কিছু করবে না একটু বুটের ডাল আর লুচি ভেজে নেবে।
আজকের দিনটাকে একটু অন্যরকম করে রাখার চেষ্টা।
বাবাই এর মধ্যে একবার একটু টেস্ট করে গেছে।
ওর এই অভ্যাস টা একদম ইরার মতো ছোট বেলায় মা যখন ভালো কিছু করতো ও নানা বাহানা করে রান্নাঘরের আসে পাশে ঘুর ঘুর করতো আর চেখে দেখার জন্য উশখুশ করতো সেই মায়ের ছেলে তো মায়ের মতোই হবে।
ইরা মনে মনে হাসে।
ওর সামনে আরও বড় পরীক্ষা আছে, সেই প্রস্তুতি নিতে হবে তাকে।
চলবে,,,,

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ