#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব_৫
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
আজ মাসের দুই তারিখ, দিয়ার বাড়িতে ইরা যাচ্ছে আজ দশ দিন।
কাজ টা করে ইরার বেশ ভালো লাগছে,দিদি খুব ভালো,ওর সাথে সুন্দর ব্যবহার করে,ইরার মনে প্রথমে একটু ভয় ছিলো মালিক কেমন হবে না হবে এই নিয়ে কিন্তু দিদি সব ভয় ভাঙিয়ে দিয়েছে।
এইতো কাল তাকে পুরো একমাসের বেতন দিয়ে দিয়েছে ইরা যদিও নিতে চায়নি তবুও জোর করে দিয়েছে।
“আমার এখানে যারা আছে তারা সবাই মাসের এক তারিখেই বেতন পায়। তুইও তাই পেয়েছিস।”
কিন্তু আমি তো সারা মাস কাজ করিনি?
তাতে কী?
আগামী মাস তো সারা মাস করবি।
দিদির হাসিতে একটা মায়া আছে তাই বেশি কিছু বলা যায় না।
আজ ইরা বাবাইকে স্কুল থেকে আনার সময় ওকে একটা দোকানে নিয়ে যায়,ওকে আর দিশাকে কয়েকটা চকলেট কিনে দেয়।
আর শুভর জন্য একটা বডি স্প্রে কেনে।
মানুষটা খুব সৌখিন ছিলো আগে যখন ঢাকা থেকে বাড়ি যেতো,ওর গা থেকে সুন্দর গন্ধ আসতো ব্যাগে সবসময় একটা সেন্ট থাকতো।
এখন কয়েকবছর নিজের জন্য কিছু কেনে না।
কাল রাতে শুভর হাতে দুই হাজার টাকা দিয়ে ইরা বলেছে একটা ব্যাংক একাউন্ট খুলে তার নামে জমা করার জন্য।
বাকি টাকা সে সংসারের কাজে খরচ করবে।
শুভ হাত পেতে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু বলেছে আর কিছুদিন পর আমার প্রমোশন হবে তখন আর তোমাকে কাজ করতে হবে না।
ইরা হাসি মুখে মাথা নাড়ায়।
কাল দিদির বাড়িতে অনেক লোক আসবে তাই আজ বাচ্চাদের স্কুল থেকে নিয়ে আবার দিদির বাড়িতেই যেতে হবে।
ইরা একটু ইতস্তত করছিলো বাচ্চাদের একা ঘরে রাখতে হবে ভেবে।
দিয়া ওর চোখ দেখেই বুঝতে পারে।
আরে পাগলি বাচ্চাদের নিয়ে এখানেই চলে আসবি,পরে দোলা এলে একসাথে চলে যাবি।
ইরা তা-ও চিন্তা করে,দিদির এতো সুন্দর গোছানো ঘরদোর বাচ্চারা এসে যদি কিছু নষ্ট করে ফেলে।
যদিও ওরা খুব একটা দুষ্টু না তবুও ভয় হয় মায়ের মন তো।
বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা ভ্যানে লাউ শাক দেখতে পায় ইরা।
এই সময়ে দিদির বেশি বেশি শাক সবজি খাওয়া দরকার,তাই ইরা নিজের টাকা দিয়েই কিছু শাক কিনে নেয়।
ঘরে ঢুকে ইরা অবাক বসার ঘরে প্রায় ছয় সাতজন ছেলে মেয়ে বসা,রায়ান দাদাও আছে।
দিদি সব কিছুর মধ্যমনি,দিদি জোরে জোরে কি সব বলছে আর বাকিরা কাগজে লিখে নিচ্ছে।
বাচ্চারাও খুব অবাক হয়,ওরা এই বাড়িতে আজই প্রথম এসেছে।
ইরা ওদের নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায়।
দিয়া একটু পর রান্নাঘরে আসে,দুটো বাচ্চাকে এখানে দেখে ইরার উপর রাগ করে।
“এই গরমে ওদের এখানে বসিয়ে রেখেছিস?
তোর বুদ্ধি টা কি হাটুর নিচে থাকে নাকি?”
দিয়া ওদের হাত ধরে খাবার টেবিলে নিয়ে বসায়।একটা প্লেটে কিছু মিষ্টি আর ফল দেয়।
দুজনের গ্লাসে জল দিয়ে রান্না ঘরে ঢোকে, ইরা শাক বাছতে শুরু করে দিয়া চা বসাতে বসাতে বলে।
“একটা নতুন ইভেন্ট এর কাজ এসেছে,শহরের একজন নামকরা ব্যাবসায়ীর মেয়ের জন্মদিন।
এতোদিন তো আমি বাড়ি থেকেই কাজ দেখতাম কিন্তু আজ অফিসের সবাই বাড়ি এসেছে।
খুব চাপ আছে রে তুই এদিক টা একটু সামলে নে।”
ইরা বুঝতে পারে বিরাট ব্যাপার।ও জিজ্ঞেস করে, ওরা কি দুপুরে খেয়ে যাবে?
“না,তবে তুই চায়ের সাথে একটা কিছু করে দে।”
দিয়া আবার কাজের ঘরে চলে যায়।
ইরা লাউ শাক দিয়ে কিছু করার চিন্তা করে।একটু অন্য রকম কিছু।
বাড়ির পেছন দিকে একটু খোলা জমি ছিলো মা সেখানে লাউ এর মাঁচা করতো।
বর্ষার সময় সেখানে অল্প জল চলে আসতো কলার ভেলায় করে ইরা সুবল দার সঙ্গে সেখান থেকে কচি লাউ আর পাতা নিয়ে আসতো।
বাড়ির উঠানে তখন জল আসতো না,তারপরও বৃষ্টির জন্য সব ভেজা থাকতো।দুপুরে তাড়াতাড়ি রান্না খাওয়া মিটিয়ে ঘরে চলে আসতো মা।
বাবা বাড়িতেই থাকতো বেশিরভাগ সময়,তার বিকেলে একটা কিছু লাগবেই লাগবে।
মা তার জন্য বর্ষা মৌসুমের আগে থেকেই মুড়ি চিড়া করে কৌটায় ভরে রাখতো।
আর মুড়ির সাথে কখনো বেগুনি, কখনো আলুর বড়া আবার কখনো লাউ পাতার বড়া করে দিতো।
মাঝে মাঝে আবার চাল ভাজা বা আটা ভাজা করে দিতো।
টিনের চালে টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ সাথে মুচমুচে ভাজা বড়া।
ইরা লাউ পাতাটা একটু পরিস্কার করে লবণ জলের মধ্যে ভিজিয়ে রাখে অন্যদিকে বেটে রাখা মুসুর ডালের মধ্যে কিছুটা হলুদ গুড়ো, অল্প শুকনা মরিচের গুড়ো,স্বাদমতো লবণ,কিছুটা পেঁঁয়াজ,আদা আর কাচা মরিচ কুচি দিয়ে খুব ভালোভাবে হাত দিয়ে মেখে নেয়।
লবণ জল থেকে তুলে পাতাগুলো আবার ধুয়ে সমান করে বিছিয়ে নেয়।
তারপর একপাশে ডাল বাটার মিশ্রণটা সুন্দর ভাবে দিয়ে লম্বা করে ঘুরিয়ে নেয় একটা চাকু দিয়ে ছোট ছোট টুকরো কেটে গরম তেলে ভেজে নেয়।
চায়ের সাথে এই মুচমুচে বড়াটা বেশ ভালো লাগে।
ইরা চা আর বড়া নিয়ে বসার ঘরে দিয়ে আসে,সবাই খুব ব্যস্ত দিয়া সবাইকে বলে এখন একটু চা খেয়ে নাও,পরে আবার কাজ শুরু হবে।
ইরা দিদিকে বলে এখন কি করবে?
দিয়া বলে,
“দুপুরের রান্নাটা করতে হবে না,সবাই এখানেই খাবে বাইরে থেকে খাবারের অর্ডার দেয়া হয়েছে,তুই একটু বসে বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে যাবি।”
বসার ঘর থেকে লাউ পাতা বড়ার প্রশংসা ভেসে আসছে।
রায়ান এই কয়দিনে এসব খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে তবুও প্রতিদিন আলাদা কিছু খেতে ওর খুব ভালো লাগে।
দিয়া অবশ্য ইরার কাছ থেকে সব রেসিপি নিয়ে রাখছে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
ইরা বাচ্চাদের পাশে গিয়ে বসে,বাবাই আর দিশা এতোক্ষণ চুপ করে বসে ছিলো কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না, বাড়ি থাকলে এখন টিভিতে কার্টুন দেখতো কিন্তু এখানে তো কিছুই করতে পারছে না।
হঠাৎ এত্তো বড় একটা টিভিতে কার্টুন চালিয়ে দিয়েছে কেউ।
এখান থেকে বসার ঘরের সবকিছু দেখা যায়।
কয়েকজন বড় ছেলে মেয়ে একসাথে বসে কার্টুন দেখছে দেখে দিশা খুব অবাক হয়।
সে আস্তে আস্তে বাবাইকে বলে,
“দেখ দাদা ওরাও আমাদের মতো কার্টুন দেখে,কিন্তু টিভিটা এতো বড় কেন?”
বাবাইও কিছু বুঝতে পারছে না।কিন্তু ভালোই হলো এই ফাঁকে ওরা কার্টুন দেখতে পারছে।
যেহেতু একটা বাচ্চা মেয়ের জন্মদিন তাই প্রিন্সেস আইল্যান্ড থীম করা হবে।
কেউ বলছে সিন্ড্রেলা তো কেউ বলছে র্যাপাঞ্জেল। তাই কার্টুন দেখে রঙ আর ডেকোরেশনের জিনিস ঠিক করা হচ্ছে।
খাবারেও কতো নতুনত্ব,কয়েক রকম কেক,চকলেট থাকবে।আবার বড়দের জন্য নান রুটি, মাংস আবার বিরিয়ানির ব্যবস্থা,কয়েক রকম মিষ্টি আর আইসক্রিম।
ইরা সব শুনছে কিন্তু ওর মনে আসছে নিজের ছোটবেলা।
জন্মদিন মানে পায়েস আর লুচি।
প্রতিবছর ওর জন্মদিনে মা সকাল বেলা মন্দিরে পূজা দিতে যেতো।
সেখান থেকে ফিরে রান্নাঘরে ঢুকে যেতো,সেদিন দুপুরে ইরার জন্য থালা সাজাতো মা।
বাড়ির কালোজিরা চালের ভাত,পাঁচ রকম ভাজা,যেখানে মাছ থাকবেই।
একটা সবজি,বুটের ডাল,নদীর ছোট মাছ চচ্চড়ি,মাছের মাথার মুড়িঘণ্ট,সরষে বাটায় ইলিশ মাছ,
খাসির মাংস,আচার দিয়ে টমেটোর টক,আর পায়েস।
ইরার সেদিন নিজেকে রাজকন্যা মনে হতো।
বিকেলে ইরার বন্ধুরা আসতো তাদের জন্য মা আলাদা আয়োজন করতো।
ছোট আলু দিয়ে আলুর দম,বুটের ডাল,পায়েস আর লুচি।
সেগুলো এখন আর হয় না,বাবাইয়ের প্রথম জন্মদিনেও শুভ বাবুর্চি দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করিয়েছিল কিন্তু ইরা ঠিকই ছেলের জন্য পায়েস করে দিয়েছিল।ওর কাছে এটাই নিয়ম।
বেলা প্রায় একটা।
দোলা এই বাড়িতে প্রায়ই এতো লোক দেখে কিন্তু ও সবচেয়ে অবাক হয় বাবাই আর দিশাকে সেখানে বসা দেখে।ইরা এখনো রান্নাঘরে কাজ করছে।
রাতের জন্য একটু হালকা করে মাছের ঝোল আর একটু ডাটা দিয়ে ছোট মাছ রান্না করেছে।
কয়েকটা লাউ শাক ছিলো সেগুলো দিয়ে একটু পাতা বাটা করেছে।
এখন সে মিক্সার চালানো শিখে গেছে তাই আর সমস্যা হয়না।
সবার জন্য বার্গার আর স্যান্ডউইচ এসেছে।
বাবাই আর দিশাও একপাশে বসে খাচ্ছে,ওরা এমন খাবার আগে কখনও খায়নি তাই খুব মজা পাচ্ছে।
ইরাকেও দিয়েছে কিন্তু সে খায়নি,শুভর জন্য নিয়ে যাবে।
কিন্তু ভর দুপুরে এসব খেয়ে কি পেট ভরে?
ইরা দিদিকে আলাদা করে ডেকে এনে বলে,”তুমি এগুলো খেয়ে সারাক্ষণ থেকোনা,তোমার জন্য ছোট মাছ আর লাউ পাতার ভর্তা করেছি একফাঁকে একটু ভাত খেয়ে নিও।”
যে মানুষটা দিয়ার এতো খেয়াল রাখে তার জন্য তো দিয়ার চিন্তা করতেই হবে।
ইরাকে নিয়ে দিয়ার অন্য ভাবনা আছে, সেই গল্প হবে অন্য আরেক পর্বে।
চলবে।
