#ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ৭
কলমে – প্রমা মজুমদার
দিয়া রান্নাঘরের দিকে যায়,ইরা একপাশে দাড়ানো ছিলো, দিয়া ওকে জড়িয়ে ধরে,
“তুই সত্যিই জিনিয়াস।
আজকে তোর আরেকটা পরীক্ষা আছে।দেখি পাশ করতে পারিস কিনা!”
দিদির কথার মাথামুণ্ডু ইরা কিছুই বুঝলো না।শুধু দেখলো দিদি ওর রান্না করা বিরিয়ানি টা প্লেটে সুন্দর করে সাজিয়ে বসার ঘরে নিয়ে যাচ্ছে।
দিদির মনে হয় মাথার ঠিক নেই এতো গণ্যমান্য অতিথিদের কেউ এই রান্না দেয়?
দিয়া প্লেটটা টেবিলের উপর রেখে বলে,”একটু টেস্ট করে দেখতে পারেন যদি পছন্দ হয় তাহলে এই শেফেকেই রান্নার দায়িত্ব দিব”
ভদ্রমহিলা আগে প্লেট টা তুলে নেয়,
দেখতে বিরিয়ানির মতো হলেও স্বাদটা বেশ অন্যরকম, তেল মসলার পরিমিত ব্যবহার আর সাথে সুন্দর গন্ধ।
আর স্বাদেও দারুণ,বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে তিনি খেয়েছেন কিন্তু এমন খাবার খাওয়া হয়নি।
তিনি তার স্বামীকে চোখে ইশারা করেন নেয়ার জন্য।
তার চোখ মুখেও একই অভিব্যক্তি।
এবার ফলাফলের পালা,দিয়া ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে,
“আমার মেয়ের জন্মদিনে এই আইটেমটাও চাই, আর আপনাদের এই শেফকেই কাজটা দেবেন।”
দিয়া একটা চওড়া হাসি এনে বলে,অবশ্যই।
বেলা প্রায় দুইটা বাজতে চললো,দিয়ার বাড়িতে বিরিয়ানির হাড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি অবস্থা।
কেউ বলছে আমি আর একটু নেবো তো কেউ বলছে আমার কম পরেছে।
সব দোষ ইরার এতো ভালো রান্না কেউ করে?
কিন্তু ইরার মন উশখুশ করছে, বাড়িতে হয়তো সবাই না খেয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে সে দিদিকে খুজছে তাকে বলেই বেড়িয়ে যাবে।
কিন্তু দিয়া কোথায়?
যে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পার্টনারের সঙ্গে আলোচনা করা ব্যাবসার নিয়ম।
দিয়া তাই রায়ানের সাথে দরজা বন্ধ করে কথা বলছে,দিয়ার মনের সঙ্গে যদি রায়ান একমত হয় তাহলেই একটা নতুন কিছু হবে।
দিয়ার বিচক্ষণতার উপর রায়ানের বিশ্বাস আছে আর ইরার গুণের উপর ভরষা তাই রায়ানের সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগলো না, সবটা শুনে হ্যা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
দিয়া নিশ্চিত মনে ইরার সামনে এসে দাঁড়ায়।
“ইরা তুই কি আমাদের সাথে কাজ করবি?”
ইরা অবাক হয় এই কথা শুনে,সে বলে, “আমি তো তোমার সাথেই আছি দিদি”
“এভাবে না কাগজে কলমে আমার অফিসের একজন হয়ে,আমাদের ক্যাটারিং এর হেড হিসেবে তোকে আমার চাই।
আমার কাছে দুজন শেফ আছে কিন্তু তারা তোর মতো গুণী না।ওরা রান্না সম্পর্কে পড়াশোনা করে হাতে কলমে শিখে কাজ করছে কিন্তু তুই এই কাজটা ভালোবেসে করিস এটা সম্পর্কে তোর আগাধ জ্ঞান আছে।
রান্নায় কেউ তোর ধারে কাছে আসতে পারবে না।
আমি চাই তুই আমার অফিসে কাজ করবি,অন্য সবার মতোই মাথা উঁচু করে বাঁচবি।
সপ্তর্ষির মায়ের পরিচয় একজন রাধুনি বা কাজের লোক না একজন অসাধারণ রাধুনি বা শেফ”
কথাগুলো শুনে ইরার গায়ে কাঁটা দেয়,কি বলছে দিদি এসব?
সে তো বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেনি,শুধু কাজ চালানোর মতো জ্ঞান ওর আছে,আর নিত্য নতুন রান্নার কিছুই সে জানেনা।
মায়ের কাছ থেকে পুরোনো দিনের কিছু রান্না শিখেছিলো আর বিয়ের পর বাড়িতে কয়েকজন ছিলো তাদের কাছে কিছু শিখেছে।
রান্না করতে সে ভালোবাসে তাই এটা শিখতেও সে পছন্দ করে কিন্তু তাই বলে হেড শেফ এটা কীভাবে সম্ভব।
ইরা বলে,”তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে দিদি আমি তেমন কিছু পারিনা,তুমি যেহেতু বলছো তোমার অফিসের জন্য রান্না করতে সেটা আমি এমনিতেই করে দেব।
তোমার চিন্তা নেই এর জন্য আমাকে আলাদা চাকরি দিতে হবে না”
কিন্তু দিয়া নাছোড়বান্দা।
“তুই যা পারিস আজকাল অনেকেই তা পারে না,নতুন ধরনের রান্নার জন্য আমার লোক আছে কিন্তু তোর হাতের যাদু তো কেউ এনে দিতে পারবে না
তুই ভেবে দেখ আমার কিন্তু তোকে চাই।”
দিয়ার কথায় কে জেনো ছিলো তাই
ইরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,আমি বাবাইয়ের বাবার সাথে কথা বলে জানাবো দিদি।
ইরার গলায় স্বামীর প্রতি আনুগত্য বা ভয় নেই আছে সম্মান আর শ্রদ্ধা।
দিয়া সামনে থেকে উঠে যায়,ইরাও বাড়ির পথ ধরে।
দরজার সামনে আসতেই পেছন থেকে ডাক, দিয়া একটা বড় ব্যাগ ইরার হাতে ধরিয়ে দেয়।
“আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে এইবেলা এটা দিয়ে চালিয়ে নিস”
ইরা মুখে ধন্যবাদ দিলো না কিন্তু চোখে অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিলো।
বাবাই বারবার ঘর বারান্দা করছে,দোলা মাসী চলে এসেছে কিন্তু মা এখনো আসছে না।
ওর খুব ক্ষিধে পাচ্ছে,দোলা মাসী রান্নার জন্য কিসব নিয়ে বসেছে,মা ছাড়া এতোক্ষণ সে আগে কখনও থাকেনি,বাবাও ঘরে নেই তাই ওর খুব খারাপ লাগছে।
শুভ সামনের কাচা বাজারে এসেছে,এই সময় কিছু সবজি পাওয়া যায়,সে তাই ছুটির দিন দুপুর পরে বাজারে একটু ঘুরে যায়।
ইরাকে আসতে দেখলো শুভ,হাতে একটা বড়সড় ব্যাগ।
ইরার মুখে ক্লান্তি ফুটে উঠেছে, মেয়েটার অনেক খাটুনি পরে যাচ্ছে এখন।
শুভর মাঝে মাঝে মনে হয় ইরাকে কাজ ছেড়ে দিতে বলবে কিন্তু আবার ভাবে ওর যে আয় তাতে তো আর সারা মাস যায় না তাহলে কিভাবে চলবে,নিজেকে নিয়ে খুব হীনমন্যতায় ভোগে শুভ কিন্তু ইরার হাসিমাখা মুখ দেখে খুশি থাকতে চায়।
ইরা কাছাকাছি চলে আসার পর শুভ ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয়,ইরার ইচ্ছে করছে এখনই শুভকে সব খুলে বলে কিন্তু রাস্তায় তো সব বলা যায় না।
বাড়ি ফিরে ইরা ব্যাগ থেকে খাবার গুলো বের করে তাদের পাচজনের ভরপেট খাবার আছে।
দোলা তেমন কিছু রান্না করেনি শুধু ডাল সেদ্ধ বসিয়েছিলো ইরা ওকে বকে সবার থালা নিয়ে ঘরে আসার জন্য।
রাতে ডাল রান্না করবে।
ইরা বাথরুমে ঢুকে যায়, একটু ঠান্ডা জল মাথায় পরতেই শরীর সিরসির করে উঠে। দিদির কথাগুলো কানে বাজে সত্যিই কি সে পারবে বাইরে কাজ করতে?
ইরা বেরিয়ে দেখে সবাই ওর জন্য বসে আছে।
ইরা চুলে একটা গামছা পেঁচিয়ে সবার সাথে খেতে বসে।দোলা বুদ্ধি করে কয়েকটা লেবু,পেঁয়াজ আর মরিচ নিয়ে বসেছে।ইরা হাত দিয়ে গত বছর করা জলপাইয়ের আচার টা নিয়ে নেয়।।শুভ আচার দিয়ে বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসে।
শুভ খেতে খেতেই বলে,আজ কি কোনো বিশেষ দিন নাকি?
ইরা সুযোগ পেয়ে সকাল থেকে যা যা হয়েছে সব বলে যায়।
শুভ আর দোলা খাওয়া ভুলে মগ্ন হয়ে ইরার কথা শোনে,দোলা দেখে এসেছিলো কিছুটা কিন্তু এতো কিছু হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি।
ইরা দিদির বলা কথাগুলো বলে চুপ হয়ে যায়।
দোলা ওর হাত খামচে ধরে বলে, “তুই না করিস না কাজ করবি বলে দে”
কথাটা বলেই চুপ করে যায়।
শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে, শুভ বসে আছে তবে নির্বিকার।
ও কি হ্যা বলবে নাকি না বলবে?
ইরা যেমন মেয়ে স্বামীর উপর একটা কথাও বলবে না কিন্তু এমন সুযোগ ক’জন পায়?
দোলার গলা দিয়ে খাবার নামছে না ওর খুব চিন্তা হচ্ছে।
বাচ্চাদের অবশ্য এই দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই,ওরা খুব তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে উঠলো।
ইরা সব গুছিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে এসেছে,বাবাই দিশার সাথে দোলার ঘরে আছে টিভি দেখছে দুজন।
শুভ বিছানায় শুয়ে আছে,ইরা ওকে কিছু জিজ্ঞেস করছে না।
ইরা পাশ ফিরে শোয় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে তলিয়ে যায়।
ইরার গুণ আছে এটা এই ক’বছরে শুভ খুব ভালো বুঝতে পারছে কিন্তু ও কি পারবে এতো বড় দায়িত্ব নিতে,দিয়া সম্পর্কে শুভ ইরার মুখে যতটুকু শুনেছে এতে মনে হয়েছে সে মানুষ ভালো কিন্তু তার স্বামী বা অফিসের বাকিরা তারা কেমন?
ইরাকে হেনস্তা করবে নাতো?
ইরা একা কাজ করতে গিয়ে কোনো বিপদে পরবে নাতো?
হাজারটা প্রশ্ন আসছে কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা,ইরা সবার জন্য চা আর মুড়ি ভেজে নিয়েছে।
বাচ্চারা মুড়ি খেয়ে পড়তে বসেছে শুভর কাছে।
বাবাই এই মাস থেকে একটা অংকের টিচারের কাছে পড়তে যায়,স্কুল ছুটির পর সেখানেই থাকে,দিশাও সেখানে পড়ে।
এতে করে ইরা একঘন্টা বেশি সময় থাকতে পারে দিয়ার বাড়িতে,ইরা মনে মনে ভাবে দিদির অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য করবে,যদি দরকার হয় রান্না করে দেবে বাড়ি থেকে।
আজ রাতের জন্য কিছু রান্না করা নেই,তাই ইরা সময় নষ্ট না করে রান্নাঘরের দিকে যায়।
বাজারের ব্যাগটা দোলা গুছিয়ে রেখেছে,এসব কাজ সে খুব ভালো পারে,চোখের নিমেষেই মাছ কাটা, মসলা বাটা,সবজি কাটা হয়ে যায়।
ইরা একটা পেপে আর কাচা কলা নিয়ে বসেছে কাটার জন্য।
ইরাকে বাইরে দেখে দোলা বলে আজ ফেরার সময় কিছু ছোট মাছ এনেছিলাম তুই একটু চচ্চড়ি করে দিবি,খুব ভালো হয় তোর হাতের ছোট মাছের চচ্চড়ি।
ইরা হাসি মুখে বলে নিয়ে আয় আর একটু ডাল বেটে দে।
বাড়ির উত্তর দিকে পুকুরের পাশে ছিলো একটা পেপে গাছ, সেই পেপে গুলো পাকলে কেমন যেন পানসে লাগতো তাই মা ওই গাছের পেপে তরকারিতেই ব্যবহার করতো।
ইরা একদম পেপে খেতে পছন্দ করতো না তাই মা কৌরা করে খাওয়াতো ও না জেনে পেপের কৌরা দিয়েই এক থালা ভাত খেয়ে নিতো।
আজ সে এই পদটাই রান্না করবে।
মা অবশ্য ঘরে বানানো ডালের বড়ি দিতো কিন্তু সে বড়ি পাবে কোথায় তাই ডালের বড়া দিয়েই করবে।
ইরা এক চুলায় একটা কাচা কলা আর একটা আলু সিদ্ধ বসায়। পেপে খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে গ্রেটার দিয়ে কুড়িয়ে নেয়।
আলু ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নেয়।
কড়াইয়ে অল্প তেল দিয়ে পেপে টা অল্প হলুদ আর লবণ দিয়ে ভাপ দিয়ে নেয়।
দোলার ডাল বাটা হয়ে গেছে এবার সে পেয়াজ কাটছে, মুসুর ডাল বাটা টা হলুদ আর লবণ দিয়ে খুব ভালো করে ফেটিয়ে নিয়ে ছোট ছোট কয়েকটা বড়া করে নেয়।
ছোট করে কাটা আলুগুলোও ওই তেলেএকটু ভেজে তুলে রাখে।
এবার কড়াইয়ে আরও একটু তেল দিয়ে মেথি,তেজপাতা আর শুকনা মরিচ ফোড়ন দেয়।
এর পর একে একে সব মসলা দিয়ে দেয় একটু আদা জিরা বাটা,হলুদ আর মরিচের গুড়ো।
অল্প গরম জল দিয়ে কসিয়ে নেয়, তারপর মসলা তেল ছাড়া হয়ে এলে পেপেটা দিয়ে আবার ভালোভাবে কসিয়ে রান্না করে।
আলুটাও এর মধ্যে দিয়ে দেয়,সব সিদ্ধ হওয়ার জন্য অল্প জল আর উপর দিয়ে কয়েকটা কাচা মরিচ আর ডালের বড়াগুলো দিয়ে অল্প আঁচে ঢেকে দেয়।
বাবাই ডালের বড়া খেতে খুব পছন্দ করে তাই একটা বাটিতে কয়েকটা বড়া ওদের ঘরে দিয়ে আসে একটু মুখন্তি হয়ে যায়।
কাচা কলা সিদ্ধ হয়ে গেছে খোসা ছাড়িয়ে আলুর সাথে কলাটা অল্প লবণ দিয়ে ভালোভাবে মেখে একপাশে রেখে দেয়।
“পেপের কৌরা” হয়ে গেছে এবার অল্প একটু ঘী আর গরম মসলা দিয়ে নামিয়ে নেয়।
আবার কড়াই বসায় একটু কালোজিরা আর শুকনা মরিচ ফোড়ন দেয় মেখে রাখা কলা সিদ্ধ টা দিয়ে দেয় অল্প একটু হলুদ ছিটিয়ে দেয় আর একটু সরিষার তেল।
অল্প আঁচে নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নেয় “কাচা কলার ভর্তা”
দোলা ছোট মাছ গুলো ইরার সামনে রেখে পাশে বসে।
পাঁচ মিশালী ছোট মাছ,পুঠি,চিংড়ি, কাচকি,মলা আর টেংরা।
ইরার মনে পরে বাড়ির পাশের পুকুরে সারাবছর এই মাছগুলো পাওয়া যেতো।
মাঝি পাড়ার কালু চাচা প্রতি মাসে একবার জাল ফেলতো আমাদের পুকুরে বাবার খুব মাছ ধরার সখ ছিলো তাই বেশ কিছু মাছের পোনা ছেড়ে দিতেন পুকুরে নিজেই দেখভাল করতেন সেগুলোর।
কালু চাচার জালে একটু ছোট সাইজের পোনা মাছ উঠলে সেগুলো আবার জলে ফেলে দেয়া হতো।
রাখা হতো ছোট মাছগুলো,আর হয়তো কিছু জিওল মাছ সেগুলো দিয়ে পাতলা ঝোল করতো মা।
আর ছোট মাছগুলো ধুয়ে বেছে একটা পদ করতো নাম “পাতা পোড়া চচ্চড়ি”
ছোট মাছগুলোর উপর পেয়াজ কুচি, রসুন কুচি, হলুদ আর শুকনা মরিচের গুড়ো,লবণ আর সরিষার তেল দিয়ে খুব ভালো করে হাতে মাখিয়ে নিতো।
কয়েকটা কাচা মরিচ চিরে দিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখতো।
বাড়ির পেছনের কলা গাছের সারি সেখান থেকে কয়েকটা পাতা এনে ধুয়ে একটু আগুনে তাতিয়ে নিতো তারপর একটা কড়াইয়ে একটা কলা পাতা বিছিয়ে এর উপর মাছগুলো দিয়ে দিতো ওপর থেকে আরও একটা কলাপাতা দিয়ে ঢেকে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিতো।
চুলার নিভু নিভু আগুনে মাছ রান্না হতো,কিছু সময় পর আবার পাতা উল্টে দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখতো কিছুক্ষণ চুলার আচ তখনও নিভু নিভু।
একদম খেতে বসার সময় কড়াইয়ের ঢাকনা খোলা হতো,কলা পাতা পোড়ার গন্ধ সাথে তাজা মাছের ঝাল মিলে মিশে একটা অদ্ভুত স্বাদ হতো।
ইরার কথা শুনে দোলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,কোন ঘরের মেয়ে আজ কি করে খাচ্ছে?
তবে দিদির কথাটা যদি সত্যি হয় তাহলে হয়তো ওর ভাগ্য ফিরবে।
দোলা ইরাকে তাড়া দেয়,এখন সেই সময় নেই রে,যা পারিস একটা কিছু করে নে,রাত হয়ে যাচ্ছে।
ছেলে মেয়েগুলো বসে আছে।
দোলা এক চুলায় ভাতের হাড়ি বসায়।
ইরা মাছগুলোতে মায়ের মতোই সব মসলা মাখিয়ে সরাসরি কড়াইয়ে একটু তেল দিয়ে বসিয়ে দেয় আর যে বাটিতে মেখেছিলো সেই বাটি ধোয়া একটু জল দিয়ে কড়াইয়ের ঢাকনা দিয়ে দেয়।
চুলার আঁচ কমিয়ে দেয়।
পনেরো বিশ মিনিট পর কড়াই নামিয়ে নেয় এর মধ্যে অবশ্য একবার নাড়িয়ে দিয়েছিলো আর একটু সরিষার তেল দিয়ে ঢেকে রেখেছিলো।
বাবাই হু হা করছে ঠিকই কিন্তু সেই ঝাল চচ্চড়িই খাচ্ছে।
দিশা অবশ্য পেপের কৌরা দিয়েই খেয়ে নিয়েছে।
শুভ অন্যান্য দিন খেতে বসে অনেক কথা বলে আজ তেমন কিছু বলছে না।
দোলা ইরা দুজনেই ব্যাপার টা বুঝতে পারছে কিন্তু কিছু বলছে না।
যেহেতু ওরা নিচে বসে খায় তাই খাওয়ার পাট চুকে গেলে ইরা ঘরটা একবার মুছে নেয় শুভ শোয়ার ব্যবস্থা করছে।
দোলা ইরাকে ইশারায় ডেকে নেয় বলে,”একবার জিজ্ঞেস করিস কি করবি?
দিদিকে তো জানাতে হবে।মানুষটা নিশ্চয়ই অনেক আশা নিয়ে বসে আছে”
ইরা মাথা নাড়িয়ে ঘরে চলে আসে।
বাবাই ঘুমিয়ে পরেছে,শুভ একটা কাগজে কি যেনো লিখছে।
ইরা সাহস করে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তো কিছু বললে না?
কাল দিদিকে কি বলবো?
যদি অফিসে কাজের কথা বলে আমি কি করবো?”
এতো গুলো প্রশ্ন একসাথে শুনে শুভ ইরার দিকে তাকায়।
মেয়েটা কি ভাবছে সে বুঝতে পারে,
দিয়াকে সে পছন্দ করে তাই মুখের উপর না বলে দিতে পারবে না।
শুভ একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
“দিয়া দিদি তোমার গুণের কদর করতে চাইছে,তোমাকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার একটা সুযোগ করে দিয়েছে আমার মনে হয় তুমি পারবে।
আমি তোমাকে না করবো না,তোমাকে সাহায্য করতে না পারলেও তোমাকে আঁটকে রাখবো না।
কিন্তু তাদের সাথে একবার কথা বলে দেখতে চাই”
শুভর গলায় কোনো প্রভুত্ব ফলানোর আভাস নেই উল্টো স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস স্পষ্ট।আবার কপালে চিন্তার ভাঁজ।
ইরার বুকের উপর থেকে একটা ভারী পাথর নেমে যায়।
সে একবার চেষ্টা করার সুযোগ পাচ্ছে এতেই সে খুশি।
এই খবরটার জন্য আরেক জন খুব আগ্রহ নিয়ে বসে আছে সে এক মুহুর্তও সে অপেক্ষা করলো না।
দোলার ঘরের কড়া নাড়া দিতেই দোলা দরজা খুলে দিলো।ইরার মুখের হাসিই সব বলে দিচ্ছে, তারপরও মুখে কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ানো দেখেই দোলা বুঝে যায়।
ইরার জীবনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
চলবে।
