ইরাবতীর_চুপকথা
পর্ব – ৬
কলমে – প্রমা মজুমদার
আজ ছুটির দিন।
অন্যদের ছুটি থাকলেও দোলা আর ইরার ছুটি নেই।
শুভ আজ বাড়ি থাকে তাই ইরা দিদির সাথে আগেই কথা বলে ঠিক করেছিলো,ছুটির দিনে সে নিজের ঘরের কিছু কাজ গুছিয়ে একটু দেরিতে আসবে।
কিন্তু আজ একটু তাড়া আছে,গতকাল যে কাজ টা হয়েছে আজও সেই কাজ দিদির বাড়িতে হবে তাই ইরাকে জলদি যেতে বলেছে দিদি।
শুভ নিজেও চাকরি করে তাই এসব ব্যাপার ভালোই বোঝে,তাই সে কিছু বলেনি।
আর কাল দিদি অনেক খাবার আর মিষ্টি দিয়ে দিয়েছিলো।বাচ্চারা সেগুলো খাবে ঠিকই কিন্তু শুভর ছুটির দিন সকালে একটু গরম গরম ভাত চাই।
ইরা তাই তাড়াতাড়ি হাত চালায়,ভাতের হাড়িতে জল দিয়ে তার মধ্যেই আলু দিয়ে দেয়,আর একই হাড়িতে একটা সুতি কাপড়ের মধ্যে একটু মুসুরের ডাল আর কিছুটা রসুন আর কয়েকটা কাচা মরিচ দিয়ে একটা পোটলা করে দিয়ে দেয়।
কিছুটা পেঁয়াজ আর কাচা মরিচ কুচি করে রাখে একবার ফুটে উঠলে ধুয়ে রাখা চাল দিয়ে দেয়।
গরম ভাত থালায় বেরে দিয়ে পোটলার মধ্যে থেকে ডাল সিদ্ধ নিয়ে নেয় সাথে আলু সিদ্ধ পেঁয়াজ মরিচ আর কিছুটা সরিষার তেল দিয়ে মেখে নেয়।
শুভর সামনে থালাটা দিয়ে ইরা কাপড় বদলে নেয়।
সে যতই রান্নার লোক হোক না কেন,একটু পরিপাটি হয়ে থাকা ওর অভ্যাস।
শুভ ইরার হাত ধরে ওকে পাশে বসায়,ভাত মেখে আগে ইরাকে খাইয়ে দেয়,মেয়েটা নিজের যত্ন নিতে ভুলে গেছে তাই এই খেয়লটা তো তারই রাখতে হবে।
ইরা আড়ালে চোখের জল মুছে,কিছু কিছু মুহূর্তর কোনো নাম হয় না থাকে শুধু আবেশ।
দোলা আরও আগে বেরিয়ে গেছে,তাই দিশা ওর ঘরে আছে।
বাবাই আর দিশা এখনো শুয়ে আছে।গতকালকের আনা খাবার টেবিলের উপর রেখে ইরা বেরিয়ে আসে।
সকাল প্রায় দশটা,বসার ঘরে প্রায় সাত আটজন চলে এসেছে রায়ান দাদা আর দিদি ওদের সাথে কথা বলে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে।
ইরা আগে রান্নাঘরে ঢুকে সবার জন্য চায়ের জল বসায়,দিয়া এসে বলে যায় ও এখনো কিছু খায়নি।
ইরা দিদির উপর একটু কপট রাগ দেখায়,এতো বেলা পর্যন্ত না খেয়ে থাকা তার একটুও ঠিক হয়নি।
তাই ইরা তাড়াতাড়ি একটা বাটিতে কিছুটা চিড়া ধুয়ে দুধ,আম,কলা আর উপর থেকে কয়েকটা খেজুর টুকরো করে দিয়ে মেখে দেয়।
দিদির কলিগরা দেখে বলে এটা নাকি এক বাটি পুষ্টি।
ইরা অবশ্য এতো কিছু বোঝে না,ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় মা এভাবে মেখে খাইয়ে দিতো বলতো সারাদিন আর খিদে লাগবে না।
বাবাইকেও মাঝে মাঝে এভাবে বানিয়ে দেয় তবে সব ফল তো আর দিতে পারে না শুধু কলা আর দুধ দেয়।
ইরা এখন নিজেও এককাপ চা খায়, দিদি অভ্যাসটা খারাপ করে দিয়েছে।
চা নিয়ে টেবিলের একপাশে বসেছে,দিদিও আছে।
তবে হাতে কাগজ পত্র নিয়ে বসেছে,যাদের অনুষ্ঠান তারা নাকি আজ আসবে খাবারের মেন্যু ঠিক করতে।
দিদি একটা বড় লিস্ট করছে খাবারের,মুখে বলে বলে কাগজে লিখে নিচ্ছে।
এত্তগুলো খাবার একটা অনুষ্ঠানের জন্য!
এর অর্ধেকের বেশি তো ইরা নামই শোনেনি,সত্যি মানুষের সখের দাম ষোল আনা।
যেখানে দুই বেলা সারা মাস খাবার জোগাড় করার জন্য ইরার কাজ করতে হচ্ছে সেখানে প্রায় দুইশো মানুষের একবেলার খাবারের খরচ দাঁড়াবে প্রায় লাখ টাকা।
ইরা একটু সময় নিয়ে দিদিকে জিজ্ঞেস করে আজ কি রান্না করবে?
দিয়া বলে,”আজকে দুপুরেও বাইরের থেকে খাবার আসবে তুই শুধু রাতের জন্য একটা মাছের ঝোল করে রেখে দিবি।
আর কিছুক্ষণ পর একজন গেস্ট আসবে তার জন্য একটু চা মিষ্টি গুছিয়ে দিতে হবে।
আসলে একে তো অনুষ্ঠানটার বেশি দিন বাকি নেই তার উপর তারা খুব ব্যস্ত তাই মিটিং টা বাড়িতের করতে হচ্ছে।
আজকে খাবারের মেন্যু আর বাকি সব আয়োজন তাদের মুখে বলে বা ছবিতে দেখানো হবে,তারপর তাদের পছন্দ হলে বাকি কাজ হবে এর নাম প্রেজেন্টেশন”
ইরা কি বুঝলো জানেনা তবুও মাথা নাড়াল।
কিন্তু একটা কথা না বলে পারলো না,”রোজ রোজ বাইরে থেকে কিনে খেলে তোমার শরীর খারাপ করবে না?
তারচেয়ে ভালো আমি ঘরে বিরিয়ানি রান্না করি”
দিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে ইরার দিকে তাকায়,
তুই বিরিয়ানিও করতে পারিস?
ইরা একটু লজ্জা পেয়ে বলে,হুম বাবাইয়ের বাবার খুব পছন্দের খাবার তাই শিখেছি।
দিয়া ওর কাছে এসে বলে ঠিক আছে, আজ তাহলে আমাদের বিরিয়ানি পার্টি আর কাজটা যদি পেয়ে যাই তাহলে তোকে আমি পিজ্জা পার্টি দেবো।
ইরা হেসে রান্নাঘরে ঢুকে যায়,
মাত্র কয়েকটা দিন কিন্তু মেয়েটা এতো আপন হয়ে গেছে,দিয়ার মনে হাজর স্বপ্ন উঁকি দেয়।
ইরাকে সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারবে না।
ইরা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে যায়,অতিথি আপ্যায়নের জন্য অনেক ধরনের মিষ্টি আর ফল আনা হয়েছে।তাই সে নিয়ে চিন্তা নেই।
রান্না করবে বলে তো দিয়েছে,কিন্তু বিরিয়ানির মসলা তো নেই?
বাড়িতে যতবারই সে রান্না করেছে শুভ বাজার থেকে বিরিয়ানির মসলা এনে দিয়েছে। আজ কিভাবে করবে এটা শুধু তার না দিদিরও সম্মানের ব্যাপার, সে আগ বারিয়ে বাইরের খাবার আনতে না করেছে এখন যদি ভালো রান্না না হয় ওর কথার দামটাই থাকবে না।
নিশ্চিন্তপুরে ইরাদের বাড়ির দুই বাড়ি পরে চম্পাদের বাড়ি।চম্পা ইরার সই,একসাথে বড় হয়ে উঠেছে।
চম্পার মা রাহেলা চাচী বিরিয়ানি রান্নায় সারা গ্রামে তার নাম।
ছোট ঈদের সময় চাচী আশে পাশের সব বাচ্চাদের দাওয়াত দিতেন।
দুদিন আগেই চাচী সুবল দার হাতে একটা বড় বাজারের ফর্দ ধরিয়ে দিতেন।কারণ চাচা গ্রামের বাইরে বেশি যেতেন না।
সুবলদা তাই একমাত্র ভরষা,সে প্রায় প্রতিদিন গঞ্জে যায়।
কি নেই সেই ফর্দে,বড় এলাচ,ছোট এলাচ,শাহী জিরা,বাদাম,কিসমিস
গোলমরিচ,তেজপাতা, লবঙ্গ,ধনিয়া,মিঠা আতর,গোলাপ জল কিছুই বাদ নেই।
সুবলদাকে বার বার বলে দেয় কোনোকিছু যেন বাদ না যায়।
চাচী বাইরের উঠানে তোলা আগুনে একটা বড় ডেকচিতে রান্না বসাতো।
তার আগে সব মসলা একটু টেলে নিয়ে একট গুড়া তৈরি করতো আর এক চুলায় বড় বড় আলু সিদ্ধ বসাতো।
ইরা একটু বড় হওয়ার পর চম্পার সাথে হাতে হাত দিতো চাচীকে রান্নায় সাহায্য করতো,সেই রান্নার গন্ধে সারা পাড়া ভরে উঠতো,যে বাড়িতে অন্য রান্না হতো তারাও চাচীর দোরগোড়ায় চলে আসতো।
কলা পাতায় পাত পরতো সবার একসাথে।
গরম গরম ধোয়া উঠা বিরিয়ানি সাথে এক টুকরো লেবু আর কাচা মরিচ।আহ্ কি তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া হতো সকলের।
এখানে তো এতোকিছু নেই তাই প্যাকেট মসলাই ভরশা।
তারপরও সে মূল রান্নায় চলে যায় হাতে যেহেতু বেশি সময় নেই তাই একটু ঝটপট সব গুছিয়ে নেয়।
ফ্রিজ থেকে কয়েকটা মুরগির মাংসের প্যাকেট বেড় করে হালকা গরম জলে ভিজিয়ে দেয়,আরেক দিকে পোলাওয়ের চাল ধুয়ে জলে ভিজিয়ে রাখে।
কলিং বেলের শব্দে আঁতকে উঠে,ইরা অতিথি কি এখনই চলে এসেছে?
না, দোলা এসেছে।
দোলাকে দেখে ইরা স্বস্তি পায়,ইরাকে সব বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য দোলা সবসময় হাজির থাকে, ইরা দোলাকে ডেকে বলে একটা মসলার প্যাকেট এনে দিতে।
দোলা আবার বেরিয়ে যায়।
দিয়া একবার কাজে ঢুকে গেলে আর কোনোদিকে খেয়াল থাকে না আর ৩
রান্নাঘরে যেহেতু ইরা আছে তাই সে একটু বেশি নির্ভার।
ইরা চুলায় একটু বড় সাইজের একটা হাড়ি বসায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে দোলা ফিরে আসে হাতে রোস্টের মসলার প্যাকেট!
ইরা এটা দিয়েই আজ রান্না করবে,নিজের হাতের ওপর ওর ভরষা আছে।
প্রথমে বেশ খানিকটা পেঁয়াজ ভেজে কিছু টা আলাদা করে রাখে তারপর তেজপাতা,এলাচ,দারুচিনি লবঙ্গ দিয়ে আদা রসুন বাটা দিয়ে কিছুক্ষণ ভেজে নেয়।
ঘরে টক দই নেই তাই গরম দুধে লেবুর রস দিয়ে কিছুটা টক দই বানিয়ে নেয় তারপর সেই বাটিতে প্যাকেট মসলা লাল মরিচ গুড়া,জিরা,কিছুটা গরম মসলার গুড়ো আর গোল মরিচের গুড়ো মিশিয়ে একটা পেস্ট বানিয়ে নেয়।
চুলার আঁচ কমিয়ে মসলাটা দিয়ে অল্প গরম জল দিয়ে দুই তিনবার কসিয়ে নেয়।
হাতের কাছে টমেটো সস ছিলো সেটাও দিয়ে দেয়,এরপর মাংসটা দিয়ে দেয়।
একটু সময় ভেজে নিয়ে অল্প একটু জল দিয়ে ঢেকে দেয়, মাংস অল্প সিদ্ধ হওয়ার জন্য।
তারপর জল ঝরিয়ে রাখা চাল দিয়ে আরও কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে পরিমাণ মতো গরম জল আর দুধ দিয়ে দেয়।
উপর থেকে কয়েকটা কাচা মরিচ, লবণ আর চিনি দেয়।
মাংস আর চাল ফুটে এলে চুলা বন্ধ করে দেয়,এর মধ্যে একে একে ঘী পেঁয়াজ বেরেস্তা,কিসমিস আর কয়েকটা চেরা কাচা মরিচ দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দেয়। অন্য পাশের চুলায় আগে থেকে একটা তাওয়া গরমে বসিয়েছিলো তার উপর হাড়িটা তুলে দেয়।
এবার প্রায় আধঘন্টা অল্প আঁচে দমে থাকবে,ইরা ঘামে ভেজা মুখ মুছে ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়ায়।
বাড়িতে খুব তোর জোড় চলছে,কেউ ঘর গুছিয়ে রাখছে তো কেউ কাগজ পত্র গুছিয়ে নিচ্ছে।
কয়েকজন ভেতরের ঘরে বসে আছে,দিদি একটা হালকা নীল রঙের শাড়ি পরে আছে খুব মিষ্টি লাগছে দিদিকে।
আজকের প্রেজেন্টেশন দিদি আর দাদা দেবে।
অতিথি চলে এসেছে একজন ভদ্রলোক আর একজন সুশ্রী ভদ্রমহিলা।
তাদের মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান।
দিয়া তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বসার ঘরে বসায়,
ইরা তাড়াতাড়ি একটু লেবুর শরবত আর বাকি সব কিছু সুন্দর করে প্লেটে সাজিয়ে দেয়।
দিদির একজন সহকারী ট্রে টা বসার ঘরে দিয়ে আসে,সবাই পাশের ঘরে বসে আছে,দোলা কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে।
ইরা এক কোণায় বসে আছে,বসার ঘরের সব কথা তার কানে আসছে।
ভদ্রলোকের সাজানোর থীম টা খুব পছন্দ হয়েছে,অনুষ্ঠানের জায়গাটাও
ভালো লেগেছে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে খাবারের মেন্যু নিয়ে।
দিয়া প্রায় দশ বারো রকমের খাবারের নাম বলেছে কিন্তু তারা বলছে নতুনত্ব কিছু চাই।
রায়ান দাদা,ইন্ডিয়ান, চাইনিজ কতো ধরনের খাবারের নাম বলেছে।
ভদ্র মহিলা তো বলেই দিলেন,সবাই এক রকম করে আমরা আলাদা কিছু করতে চাইছি।
ইরার সামনে কাগজ কলম রাখা আছে সে গোটা গোটা হাতে কয়েকটা খাবারের নাম লেখে, ওর কাছে মনে হচ্ছে সবাই যখানে বিদেশি খাবার করে তারা সেখানে দেশি খাবার করতে পারে।
দিয়া খাবারের জল নিতে এই ঘরে আসে,ইরা দিদির হাতে কাগজটা তুলে দেয়।
ইরা কাগজে চোখ বুলিয়ে নিয়ে হা হয়ে যায়।
এই মেয়েটার আর কি গুণ আছে?
দিয়া এবার আত্মবিশ্বাসী হয়ে বসার ঘরে যায়।
“আমরা বসে খাবারের আয়োজন করবো।
প্রথমে গরম গরম লুচি,সবজি সাথে চিকেন ঝাল ফ্রাই।
পরে সাদা পোলাও চিকেন ফ্রাই অথবা ফিস ফ্রাই, মাটন কষা আর চাটনি।
যেহেতু জন্মদিন তাই শেষ পাতে পায়েস।
আর বাচ্চাদের জন্য আইসক্রিম আর চকলেট কাউন্টার থাকবে।
কেমন হবে?”
দিয়া শুধু ইরার বলা বাংলা নামগুলো ইংরেজিতে বলেছে আর কিছু না।
রায়ান দিয়ার কথাগুলো শুনে চুপ হয়ে যায়,এই গুলো তো তাদের লিস্টে ছিলো না।
তবে খুব ভালো আইডিয়া।
তারা এককথায় হ্যা বলেছে এই খাবারই হবে তাদের মেয়ের জন্মদিনে।
দিয়া আর রায়ানের মুখে প্রাপ্তির হাসি।
এতোক্ষণ কেউ খেয়াল করেনি,সারা বাড়ি বিরিয়ানির গন্ধে ভরে আছে।
ইরা হাড়ির মুখ খুলে একটু লবণ চেক করছিলো আর তাতেই এই অবস্থা।
ভদ্রলোক নিজে থেকেই প্রশ্ন করে, “আপনাদের কি নিজস্ব ক্যাটারিং সার্ভিস আছে?
আমার কিন্তু সবচেয়ে বেস্ট খাবার চাই।”
দিয়া বলে আপনারা একটু বসুন আমি আসছি।
দিয়ার মাথায় আবার কি ঘুরছে রায়ানের কপালে চিন্তার ছাপ।
চলবে।
