ইরাবতীর চুপকথা
পর্ব – ৪
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে,ইরা বাবাই আর দিশাকে দোলার ঘরে বসিয়ে রেখে রান্না করতে যায়।
আজ বেশি কিছু করতে পারবে না,একটা চুলায় ডালের হাড়ি বসিয়েছে আরেক দিকে মাছ ভাজার জন্য কড়াই বসিয়েছে।
সকালেই রুই মাছ গুলো ভিজিয়ে রেখেছিলো।মাছগুলো একটু ছোট ছোট করে কেটে ধুয়ে লবণ হলুদ দিয়ে ভেজে নেয়।
কয়েকটা আলু খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট করে কেটে সেই তেলে একটু সাতলে নেয়।
তারপর একটু জিরা,তেজপাতা আর শুকনা মরিচ ফোড়ন দিয়ে জিরা আর আদা বাটা দিয়ে দেয়।
একটু কসিয়ে নিয়ে হলুদ আর মরিচের গুড়ো দেয়।
মসলা তেল ছাড়া হওয়া পর্যন্ত কসিয়ে নেয় তারপর কিছুটা জল আর কয়েকটা কাচা মরিচ ছিড়ে দেয় ঝোল ফুটে উঠলে মাছ দিয়ে একটু ঢাকা দিয়ে দেয়।
অন্য দিকে পাতলা ডালটাও হয়ে যায়।
চোখের সামনে আলুর খোসা গুলো পরে আছে দেখে আর একটা কিছু করার লোভ সামলাতে পারছে না ইরা।
বেলা প্রায় একটা বাজে।
এক চুলায় ভাত বসিয়ে দিয়ে,অল্প একটু ডাল সিল পাটায় বেটে নেয়।
আলুর খোসাগুলো কুচি করে কেটে নেয় সাথে কিছু পেয়াজ আর মরিচ কুচিয়ে নেয়।
ডাল বাটা ভালো করে ফেটিয়ে এর মধ্যে আলুর খোসা আর পেয়াজ মরিচ কুচি সামান্য হলুদ গুড়ো আর লবণ দিয়ে মাখিয়ে নেয়।
তারপর চেপ্টা চেপ্টা করে তেলের মধ্যে ছেড়ে দেয়।
এই বড়া একবার খেয়ে কেউ বুঝতেই পারবে না এটা কি দিয়ে বানানো।
রান্না শেষ হয়ে এলে দোলা চলে আসে,ও আজ একটা মুরগি কিনে এনেছে।
আজ একটা বিশেষ দিন,ইরা কাজ পেয়েছে তাই একটু ভোজ না হলে চলে?
ইরা মুখে একটা মলিন হাসি এনে বলে,তুই পারিস ও,শুধু শুধু কটা টাকা নষ্ট করলি।
সামনের মাসে বেতন পেলে না হয় কিছু করতাম।
দোলা ওর কথার উত্তর না দিয়ে মুরগি কাটতে বসে যায়।
ইরা আর কথা বারায় না জানে দোলা এই স্বভাবের, নিজে যা মনে করবে তা-ই করবে।
আসলে একা শহরে টিকে থাকতে হলে হয়তো এমনই হতে হয়।
দুপুরের খাওয়া ভালোভাবেই মিটে যায়।
শুভ বিকেলে এসে ইরার কাছে জানতে চায় প্রথম দিন কাজের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে।
ইরা বলে ওর কোনো অসুবিধা হয়নি,কটা মাসেরই তো ব্যাপার,দিদির বাচ্চা হয়ে গেলে আর বেশিদিন কাজ করতে হবে না।
দিয়া অবশ্য এই কথা বলেনি।
শুভ একটা আত্মগ্লানিতে ভুগছে,ইরাকে সে কিছুতেই কাজ করতে দিতে চাইতো না কিন্তু সংসার খরচ এতোটাই বেরে গেছে যে একা কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
ইরা সব বুঝতে পেরেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই শুভকে স্বাভাবিক রাখার জন্যই কথাটা বলেছে।
শুভ খুব খিচুড়ি পছন্দ করে তাই ইরা ভেবেছে আজ রাতে পাঁচমিশালী খিচুড়ি আর মুরগির ঝোল করবে।
বাবাই মায়ের কাছ ঘেসে বসেছে, মায়ের কাছে আবদার আজ দোলা মাসি যে মুরগি এনেছে তার একটা রানের পিস খেতে চায়।
ইরা হাসি মুখে উত্তর দেয়,অবশ্যই দেবো,একটা তোর একটা দিশার আর রাতে “চড়ুইভাতি”হবে।
আমরা একসাথে পাত পেড়ে খাব।
বাবাই জিজ্ঞেস করে চড়ুইভাতি কি মা?
ইরা ছেলেকে বলে এটা গ্রামের পিকনিক।
ছোটবেলায় ইরা আর ওর সমবয়সী বন্ধুরা প্রতি বছর শীতে চড়ুইভাতি করতো।
সবার বাড়ি থেকে এক কৌটো চাল,কিছু ডাল একটা ডিম আর কিছু সবজি নিয়ে আসতো।
একেক জনের ঘরের একেক রকম চাল আর ডাল সব একটা বড় গামলায় রাখা হতো।
ইরার পাশের বাড়ির মালতী দিদি ছিলো এর মাথা সে বয়সে একটু বড় রান্নাটাও জানতো।
বাইরের উঠানের চুলায় সব ডিম সিদ্ধ বসানো হতো,আর অন্যদিকে সব সবজি একসাথে কেটে ধুয়ে নেয়া হতো।
সেই চাল ডালের সাথে সবজি একসাথে মিশিয়ে নরম খিচুড়ি রান্না করতো।
সবাই গোল হয়ে চুলার পাশে বসে দেখতো কতোক্ষণে রান্না শেষ হবে।।ইরা মালতীদি কে বারবার জিজ্ঞেস করতো ও দিদি আর কতোক্ষণ?
রান্না হয়ে এলে মালতী ঘর থেকে একটু ঘী এনে খিচুড়ির হাড়িতে দিয়ে দিতো।
সেই গন্ধ নাকে আসতেই সবাই কলাপাতা নিয়ে বসে পরতো উঠানে।
সবার পাতে একটা করে ডিম সিদ্ধ আর কয়েক হাতা নরম খিচুড়ি।
আহ্ কি স্বাদ ছিলো সেই রান্নায়।
বাবাই দিশাকে নিয়ে ঘরের বাইরে খেলছে,দোলা ঘরে ঠোঙা বানাচ্ছে।
ইরা দোলার হাতে একশো টাকা দিয়ে বলে একটু ঘী এনে দিতে পারবি?রাতে খিচুড়ি রান্না করবো।
দোলা মুরগি টা কেটে ধুয়ে ফ্রিজে রেখেছে।
তখনই মনে হচ্ছিল যদি সাথে পোলাও বা খিচুড়ি হতো তাহলে বেশ হতো।
আসলে তারা তো প্রতিদিন ভালোমন্দ খেতে পারে না তাই যেদিনই খায় সেদিন একটু আয়োজন করেই খেতে চায়।
ওর ঘরে কয়েক কৌটো চাল আর একটু মুসুরের ডাল পরে আছে।
মাসের এখনো দশদিন বাকি তাই মুখে বলার সাহস হয়নি।
যাক ইরা ওর মনের কথাটাই বলে দিয়েছে।
ও বলে, একটু পর বের হবো তখন নিয়ে আসবো।
সন্ধ্যায় শুভ বাচ্চাদের নিয়ে বসেছে, দোলা গেছে ঠোঙা দিতে আর ইরা রান্নাঘরে খিচুড়ির আয়োজন করছে।
ঘরে কিছুটা মুগডাল আছে আর কিছুটা মুসুরের ডাল আছে।
পোলাও এর চাল তো নেই তাই ভাতের চাল দিয়েই রান্না করবে।
মুগ ডালটা আগে ভেজে একটু ভাপ দিয়ে নেয়।বাকি চাল ডাল একসাথে মিশিয়ে ধুয়ে নেয়।
এরপর চুলায় হাড়ি বসায়,
শুকনো মরিচ,জিরা আর গরম মসলা ফোড়ন দেয়।
একটু বেশি পেয়াজ কুচি দিয়ে ভেজে নেয়, পেয়াজ লালচে হয়ে এলে আদা জিরা বাটা হলুদ আর সামান্য মরিচের গুড়ো দিয়ে মসলা কসিয়ে নেয়।
অল্প অল্প জল দিয়ে দুই তিনবার কসায়।
তারপর সব চাল ডাল দিয়ে একটু ভেজে নেয়।তারপর পরিমান মতো গরম জল দিয়ে দেয়।
অন্য কড়াইয়ে মাংস বসিয়ে দেয়।
একটু আলু দিয়ে মাংস রান্না করবে যেনো দুইবেলা চলে যায়।
এখন যেহেতু সকালে সে বাইরে যাবে তাই ঠিক করেছে আগের দিন অল্প কিছু করে রাখবে।
মাংস টা আগে একটু মসলা দিয়ে মাখিয়ে রাখে আলুটা একটু ভেজে নিয়ে তারপর সেই কড়াইয়ে মাংস রান্নাটা বসিয়ে দেয়।
ইরা আবার ফিরে যায় সেই নিশ্চিন্তপুর গ্রামে।
যেদিন মা মুরগির মাংস রান্না করতো সেদিন সকাল থেকেই একটু ব্যস্ততা থাকতো।বাড়িতেই মুরগি কাটাকাটি করতো তারপর বাইরের কল থেকে ধুয়ে রান্নাঘরের বারান্দায় দিয়ে যেতো পাশের বাড়ির সুবল দা,কারণ কাটাকুটির দায়িত্ব টা তার থাকতো,তবে সেদিন সুবল দা এই বাড়িতেই খেয়ে যেতো।মাটির চুলায় কড়াই বসানোর পর আর বেশি সময় হতো না তাই আগেই সব মসলা পাতি কেটে বেটে তৈরী করে রাখতো মা।
মায়ের হাতে হাতে শুকনো মরিচ, জিরা আর গরম মসলা বেটে দিতো কাকলী মাসি।
গরম ধোঁয়া উঠা কড়াইয়ে একের পর এক সব মসলা পরতো আর সারা বাড়ি গন্ধে ম-ম করতো।
সব শেষে গরম মসলা বাটা দিয়ে কড়াই অল্প আচে ঢেকে রেখে মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতো।
ইরা অবশ্য তার আগেই একটা বাটি নিয়ে মায়ের পাশে বসে যেতো ঝাল লবণ পরীক্ষা করার জন্য।
মা তার বাটিতে এক টুকরা মাংস আর এক টুকরো আলু তুলে দিতো।
ইরা বেশ সময় নিয়ে বাটিটা শেষ করতো।
মায়ের রান্নার স্বাদ ইরার মুখে আজও লেগে আছে,সে হাজার চেষ্টা করেও সেই রকম রান্না করতে পারেনা।
তবে এখন বাবাই সেই কাজটা করে,
একটু মাংস পেলেই খুশি হয়ে যায়। মায়ের রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যায়।
দোলা চলে এসেছে, খিচুড়িও প্রায় হয়ে গেছে এবার উপর থেকে একটু ঘী ছড়িয়ে চুলা বন্ধ করে দেয়।
কড়াইয়ে ঝোল একটা বাটিতে ঢেলে রেখে ইরা নিজের ঘরে চলে যায়।ইরা খেয়াল করেনি আজ তার রান্নার গন্ধেও এই ছোট্ট বাড়িটা ম-ম করছে তাই ঘর থেকে শুভ বেরিয়ে এসে দেখে গেছে আর অপেক্ষা করছে আর কতোক্ষণ লাগবে।
রাতের আকাশে একটা বড় চাঁদ উঠেছে আজ ইরা ছেলেকে বুকের সাথে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে,এটাতেই ওর সুখ ছেলে আর স্বামীর মুখে হাসি এর চেয়ে বেশি কিছু তো আর চাহিদা নেই তার।
সকাল আটটায় দিয়ার বাড়ির কলিং বেল বেজে ওঠে।
দোলা আর ইরা একসাথে চলে এসেছে,দোলা দুজনের সাথে কথা বলে সময়টা একটু এদিক সেদিক করে নিয়েছে আজ থেকে।
ইরা সকালেই আসবে কিন্তু দোলা আসবে এগারোটার পর।
দোলা এই বিল্ডিংয়ে আরেক বাড়ি কাজ করে তাদের সাথে কথা বলে সময়টা ঠিক করে নেয়।
আজ অবশ্য কাজ করে চলে যায় কিন্তু কাল থেকে পরে আসবে।
সকালে ইরা রুটি,সবজি আর ডিম ভাজি করেছে।
এটাও দিয়ার কাছে ভালো লাগছে,সবজিটা খুব স্বাদ হয়েছে।
এতোদিন সে এক ফোটাও শাক সবজি খেতে পারতো না সব কিছুই গন্ধ লাগতো কিন্তু আজ মনে হয় দুটো রুটি বেশি খাবে।
দিয়া একফাঁকে রান্নাঘরে ঢুকে চা বানায়।
রায়ানের আজ একটু তাড়া আছে তাই আগেই বেড়িয়ে গেছে।দুপুরের দিকে এককাপ চা দিয়ার চাই ই চাই,ইরা রান্নার জন্য সবজি কাটছে দিয়া কাজের ফাঁকে ওর সাথে গল্প করছে।
যে মানুষটাকে নিজের ঘরে এনেছে তার সম্পর্কে কিছু জানা থাকা দরকার।
দিয়া দুই কাপে চা ঢেলে একটা ইরার হাতে দিয়ে আরেকটা কাপ নিয়ে খাবার টেবিলের পাশে বসে।
ইরাকে ওর গ্রামের কথা পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করে।
ইরা সব খুলে বলে,শুভর কাজের কথা বলে,সপ্তর্ষির কথা বলে।
ইরাকে আজ বেশি কিছু রান্না করতে হবে না,রাতে দিদির একটা নিমন্ত্রণে যাওয়ার আছে তাই দুপুরের জন্য একটু মাছের মাথা আর সরিষা বাটা দিয়ে পুই শাক আর ছোট চিংড়ি দিয়ে মুসুর ডালের চচ্চড়ি করেছে।
দিদি রাইস কুকারে ভাত রান্না করে নেবে তাই সব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।
ইরার হাতে এখনো বেশ কিছুটা সময় আছে তাই সে দিদিকে জিজ্ঞেস করে আর কিছু করতে হবে কি-না?
দিয়া এতোক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলো, ইরার কথা শোনার পর ওর কিছু বলার ভাষা নেই।
একটা ভদ্র সচ্ছল পরিবারের মেয়ে আজ শুধুমাত্র পরিস্থিতির শিকার!
ইরার কথাবার্তা কাজের ধরন দেখলেই বোঝা যায় ও অন্য কাজের মেয়েদের চেয়ে আলাদা কিন্তু তাই বলে।
আর রান্নার হাত তো অসাধারণ, কাল একটা মাছের ঝোল করেছিলো সেটাই অসম্ভব সুস্বাদু হয়েছিলো আর আম ক্ষীর তো এখনো মুখে লেগে আছে।
ওর জন্য একটা কিছু করতে পারলে নিজের কাছেই ভালো লাগবে।
দিয়া কথাগুলো নিজের মনে ভাবছিলো।
ইরার গলা শুনে বললো,আর কিছু লাগবে না, বোস গল্প করি।
তুই এতো ভালো রান্না কার কাছ থেকে শিখেছিস?
ইরা মিষ্টি হেসে বলে,আমি তো কিছুই পারিনা দিদি।
আজকাল তোমরা কতো আধুনিক রান্না করতে পারো আমি তো এসব পারিনা।
মায়ের কাছ থেকে যতদূর যা শিখেছিলাম।আমার মা শিখেছিলো তার মা আর শাশুড়ির কাছ থেকে তারপর নিজের মতো করেছে।
আমার মায়ের বাবার বাড়ির সঙ্গে শশুর বাড়ির রান্নার মিল ছিলো না,মা এসে দুই জায়গার খাবারকে এক থালায় পরিবেশন করেছে।
আমিও এখন নিজের মতো করি।
আসলে পরিমাপ আর রান্নার ধরন জানা থাকলে সব রান্নাই ভালোভাবে করা যায়।
ইরার কথা শুনে দিয়া আরও অবাক হয় এতো সুন্দর ধারণা যার মনে আছে সে কেন চারদেয়ালে নিজের গুণকে আটকে রাখবে?চলবে,,,,,,
চলবে।
