ইরাবতীর চুপকথা
পর্ব ৩
#কলমে_প্রমা_মজুমদার
দোলা সকালে বাবাই আর দিশাকে স্কুলে দিয়ে কাজে বেরিয়ে যায়।
ইরা সেই সময়টা বাড়িতে থাকে,তিনঘন্টা পর ইরা গিয়ে দুজনকে নিয়ে আসে।
ইরা ভেবে দেখে ও চাইলে সেই সময় টা কাজ করতে পারে,যেহেতু স্কুলের কাছেই বাড়িটা তাই ফেরার সময় বাচ্চাদের নিয়ে ফিরে আসবে।
শুভ একটু ইতস্তত করলেও ইরা ওকে রাজি করিয়ে নেয়।
দোলা নিজেও থাকবে ঘন্টা খানিক তাই কোনো অসুবিধা হলে ওর সাথে চলে আসবে।
শুধু রান্নার জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা!
ওর সংসারে এটা অনেক বড় অংক,বাবাইয়ের পড়াশোনায় অনেক সাহায্য হবে।
দোলা ইরাকে নিয়ে আসে একটা এপার্টমেন্টের সামনে স্কুলে আসা যাওয়ার পথে এই বাড়িটা ইরা প্রতিদিন দেখে কিন্তু এই প্রথম ভেতরে ঢুকেছে।
দিয়া দিদিদের বাড়ি ছয় তলায়,ইরা ভেবেছে সিড়ি বেয়ে উঠতে হবে কিন্তু না,লিফট নামের একটা মেশিনে করে এক মিনিটেই ছয় তলায় পৌছে যায়।
দিয়া দিদি বাড়িতেই আছে,আর দাদাবাবুও আছে।
ইরা ভেবেছিলো তাদের স্যার মেডাম ডাকতে হবে কিন্তু দোলা বলেছে দিয়া দিদি ওসব আদবকেতা পছন্দ করে না।সে নিজেই বলেছে দাদা দিদি ডাকতে।
দোলার পাশে আরেকজনকে দেখে দিয়া অবাক হয়।
দোলা বলে,তুমি না কয়েকদিন ধরে একটা রান্নার লোক খুজছিলে তাই ওকে নিয়ে এলাম দিদি!
ও আমার বোনের মতো আমরা একই বাড়িতে থাকি আর ও খুব ভালো রান্না করে।
তোমার সাথে দেখা করাতে নিয়ে এলাম।”
দিয়া ইরার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে,আর পাচটা কাজের মহিলার চেয়ে অনেক আলাদা।পোশাক আশাকও ঠিক ঠাক।কথা বেশি কিছু বলছেনা।
দিয়ার সত্যিই এখন খুব খারাপ অবস্থা, ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট তার উপর ঘরে কেউ নেই।
রান্না করতে গেলে খুব খারাপ লাগে,আর কোনোকিছু খেতে ভালো লাগে না।
নিজের বাবার বাড়িতেও কেউ নেই যে আসবে।
শশুর বাড়িও অনেক দূরে তারা কেউ সাহায্য করবে না।
তাই কাজের লোকেরাই ভরষা।
দোলা দের বছর ধরে কাজ করছে খুব ভালো মেয়েটা।তার ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।
দিয়া ইরাকে বলে,আমি কিছুই খেতে পারি না মুখে কোনো স্বাদ নেই একটু ভালো কিছু রান্না করো।
ইরা মাথা নেড়ে বলে,আমি চেষ্টা করবো দিদি।
ইরা একফাঁকে দেখে নেয় দিয়া একটা বাটিতে দুধের মধ্যে কি সব দিয়ে খাচ্ছে ওর মধ্যে কলা আর খেজুরটা চিনতে পারছে।
দিদি মুখে দিচ্ছে কিন্তু তেমন স্বাদ পাচ্ছে না তা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
বাচ্চা পেটে থাকলে কতো ভালোমন্দ খেতে হয় আর সেখানে দিদি এসব কি খাচ্ছে?
দিয়া বলে এখানে তুমি কোনো লজ্জা পাবে না,স্বাধীন ভাবেই কাজ করবে।
আমার স্বামী সারাদিন বাড়ি থাকে না ওর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর ব্যাবসা তাই খুব ব্যাস্ত থাকে।
আমিও একই কাজ করি কিন্তু এখন বাড়ি থেকেই কাজ করছি।
ইরা একটু সাহস করে বলে আপনি এগুলো কি খাচ্ছেন দিদি?
দিয়া উত্তরে বলে,আমাকে দিদি বলছো আবার আপনিও?
আমাকে তুমিই বলবে।
আর এটা ওটস।
ডাক্তার বলেছে পুষ্টিকর খাবার খেতে, তাই ইচ্ছে না থাকলেও এগুলো খাচ্ছি।
আচ্ছা,তাই হবে।
আগে বলো তোমার রান্নাঘর কোথায়,আমি একটা কিছু বানিয়ে নিয়ে আসি,ইরা বললো।
দোলা এতোক্ষণ সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো এবার ও কাজে যায় এখানে বেশি সময় থাকলে পরের বাড়িগুলোতে যেতে দেরী হয়ে যাবে।
দিয়া ইরাকে নিজের রান্নাঘরে নিয়ে যায়।
ইরা একটু চোখ বুলিয়ে নেয়,একটু অগোছালো কিন্তু সব কিছুই আছে।
দিয়া আবদারের সুরে ইরাকে বলে,
একটা ভালো কিছু বানিয়ে দে,সকাল থেকে একটু ওটস ছাড়া কিছুই খাইনি।
ইরা মনে মনে ভাবে, এটাই তার পরীক্ষা, এখানে পাশ করতেই হবে।
ইরা একটা প্যানে কিছুটা দুধ জ্বাল করতে বসায়।
এখন থেকে এখানে ওর রোজ আসতে হবে তাই একটু গুছিয়ে নেয় নিজের মতো করে।
একটা কৌটোতে পোলাওয়ের চাল আছে দেখে মাথায় একটা চিন্তা আসে।
ইরা ফিরে যায় নিজের ছোট বেলায়,,,
প্রতি বছর জৈষ্ঠ্যমাসে তার মা গ্রামের কয়েকজন মানুষকে ফলাহার করাতো।
সকাল থেকেই তার তোড়জোড় শুরু হয়ে যেতো, মা একটা বড় মালশায় দুধ জাল করতে বসাতো তারপর উত্তরের কাঁঠাল গাছ থেকে দুই তিনটা কাঁঠাল নামানো হতো।
পশ্চিমের আম গাছেটার আম নাকি বেশি মিষ্টি কিন্তু আঁশ নেই তাই সেই গাছের পাকা আম ঝুড়ি ভরে পারা হতো।
দু’দিন আগেই বাড়ির পেছনের কলা গাছগুলোর কয়েক কাঁদী কলা ঘরের কোনায় রেখে দেয়া হতো পাকার জন্য।
আর বাড়ির ধানের চিড়া খই তো ছিলোই।
তারপরও গঞ্জের হাট থেকে বড় বড় রসগোল্লা আনা হতো।
দুপুর পরে সবাই চলে আসতো,বসার ঘরে নিচে সবার জন্য পাত পরতো।
সারাদিন জ্বাল করা দুধে ঘন সর পরে যেতো।
একবাটিতে দুধ আর অন্য বাটিতে আম,কাঁঠাল,কলা আর মিষ্টি।
সাথে বড় গামলায় থাকতো চিড়া আর খই।
সবাই নিজের মতো পেট পুড়ে খেতো।
বাবা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করতেন।
ইরার মনে আছে,সেদিন রাতে বাড়িতে আর ভাত রান্না হতো না সবাই ওই একই খাবার খেতো তার অবশ্য অন্য কিছুতে আকর্ষণ ছিলো না সে শুধু একটা দুটো রসগোল্লা পেলেই খুশি।
মা বুঝতো তাই আগে থেকেই তার জন্য মিষ্টি সড়িয়ে রাখতো।
“কিরে কি ভাবছিস?”
দোলার আওয়াজে ইরার ভাবনার ছন্দ পতন ঘটে।
দুধ ফুটে ওঠেছে,হাতা দিয়ে একটু নাড়িয়ে দেয়।
ভাবছি কি রান্না করবো?
তোর হাতের ভর্তা ভাতও অমৃত,যাই করবি দিদি ঠিক পছন্দ করবে,আমি এবার যাই,নয়টা বেজে যাচ্ছে,তুই এগারোটার মধ্যে বেড়িয়ে যাস কেমন।
দাদাবাবু আর একঘন্টা পরে খাবার খাবে তারপর বেরিয়ে যাবে তাই একটু তাড়াতাড়ি করে নে।
কথাগুলো বলে দোলা চলে যায়।
দিয়া দিদি বসার ঘরে বসে ছোট কম্পিউটার কোলে নিয়ে কাজ করছে।
ইরা আবার রান্নায় মন দেয়।
দুধে কিছু ছোট এলাচ আর তেজপাতা দেয়।
কিছুটা পোলাওয়ের চাল ধুয়ে হাত দিয়ে আধভাঙ্গা করে জল ঝরিয়ে রাখে একটা আম কেটে রস বের করে নেয়,আর কিছু আম ছোট টুকরো করে রাখে
কিছুটা কিসমিস আর কাজু বাদাম সামনে রাখে।
দুধটা ঘন হয়ে এলে চালটা দুধে দিয়ে দেয়,অন্যদিকে কয়েকটা আলু ছোট ছোট করে কেটে কম ঝাল দিয়ে আলুর তরকারি করে।
এর মধ্যে দিদি একটা ফ্রোজেন পরোটার প্যাকেট বের করে দিয়ে গেছে।আজ এটা দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে হবে কাল থেকে হাতে রুটি করতে হবে।
চাল ফুটে গেছে,এবার স্বাদমতো চিনি আর কিসমিস টা দিয়ে দেয়,চিনি দিয়ে কিছুক্ষণ জাল করে নেয় তারপর আমের রসটা দিয়ে ভালোভাবে নেরে আরো কিছু কিসমিস আর কাজু দিয়ে চুলা বন্ধ করে দেয়।ঠান্ডা হলে
কয়েক টুকরো আম উপর থেকে দিয়ে দুই বাটিতে পরিবেশন করে।
হয়ে গেলো “আমের ক্ষীর”
দশটা বাজার আগেই টেবিলে খাবার তুলে দেয়।
দিয়া আর ওর স্বামী একসাথেই খেতে বসে।
কিন্তু তার আগে সে ইরাকে একটা প্লেট সাজিয়ে দেয়।
ইরা রান্না ঘরে বসে খাবার নিয়ে তবে ওর মন পরে থাকে খাওয়ার টেবিলে। যদি তাদের পছন্দ না হয় তাহলে আজই তার চাকরি শেষ।
দিয়া পরোটার ছোট ছোট টুকরো আলুর তরকারি দিয়ে মুখে দিচ্ছে।
বেশ ভালো হয়েছে খেতে কিন্তু হলুদ রঙের পায়েস টা কিসের বুঝতে পারছে না।
প্রথম দিন না জানি কি করেছে?
রায়ান হয়তো মুখেই দিতে পারবে না।
রায়ান দিয়ার স্বামী।
প্লেট দেখে অবাক হয়ে আছে,পায়েসের মতো দেখতে কিন্তু উপরে ফল দেয়া জিনিসটার প্রতি তার নজর।
সকালে শুনেছে নতুন রান্নার লোক রাখা হয়েছে সে-ই নিশ্চয়ই এই এক্সপেরিমেন্ট করেছে কিন্তু অফিস যাওয়ার আগে এসব তার একটুও পছন্দ না। সে দিয়াকে বলে একটা ডিম ভাজি করে দিতে
তারপরও কৌতুহলে এক চামচ ক্ষীর মুখে তুলে।
রায়ান কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে বসে থাকে,অমৃত হয়তো এমন স্বাদেরই
হয়।
দিয়াকে আবার টেবিলে ডেকে নেয়,নিজের হাতে ওর মুখে এক চামচ তুলে দেয়।
দিয়ারও একই অনুভূতি।
দিয়া ইরাকে বলে, “এটা কি রান্না করেছো আমি তো পাগল হয়ে গেছি এক বাটিতে আমার মন ভরবে না
আমি রোজ এমন খাবার খেতে চাই।”
ইরা হেসে বলে, ঠিক আছে।
এই এক রান্নাতেই ইরার চাকরি পাকা হয়ে যায়, দিয়ার বাড়িতে।
দিয়া ইরার জন্য একটা বাটিতে ক্ষীর তুলে দেয় কিন্তু ইরা বলে আমার পেট ভরা খেতে পারবো না।
দিয়া বুঝতে পারে মায়ের মন সন্তানকে রেখে ভালো কিছু মুখে রুচবে না।
ইরা দুপুরের জন্য রান্না করে এগারোটার দিকে বেরিয়ে আসে,
বাবাই আর দিশার ছুটি হয়ে যাবে তাই।
আসার আগে দিয়া ইরাকে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয় বলে,এখানে কিছু ফল আছে বাড়িতে নিয়ে যা,আর এই বক্সে আম ক্ষীর আছে ছেলেকে দিবি।
ইরার চোখে কৃতজ্ঞতা।
যে মেয়েটা অন্যের হাত ভরিয়ে দিতো আজ সে অন্যের হাত থেকে নিচ্ছে,
নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে আসে।
ইরার জীবনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
বাসায় ফিরে ইরা বাচ্চাদের ক্ষীর খেতে দেয়,ওরা খুব পছন্দ করে খায় এমন খাবার ওরা কখনো খায়নি তাই এতো মজা পেয়েছে।
ইরা বাচ্চাদের মুখে হাসি দেখে নিজের কষ্ট ভুলে যায়।
চলবে।
