হারানো ঠিকানা (অন্তিম পর্ব)
ঘরের ভিতর তখন চাপা উত্তেজনা।
তন্ময় আর তপস্যা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে তপন বাবুর।
গৌরী দেবী সোফার পাশে স্থির হয়ে বসে ছিলেন। তাঁর চোখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন আগেই বুঝতে পারছেন—আজ বহুদিনের চাপা সত্য সামনে আসতে চলেছে।
তপন বাবুর মুখ ফ্যাকাসে,কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
তিনি বারবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলেন।
তন্ময় ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।তার গলায় আর আগের উদ্ধত ভাব ছিল না, বরং ছিলো একধরনের তিক্ততা,সে বলে উঠলো,“আমরা এখানে ঝগড়া করতে আসিনি। সত্যিটা বলতে এসেছি।”
তরুণ ঠান্ডা গলায় বলল, “আর কী সত্যি বাকি আছে?”
তন্ময় একবার তপন বাবুর দিকে তাকাল।তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বললো,”আরও অনেক সত্যি আছে,যেটা আপনারা জানেন না,অথচ আপনাদের-ও জানা দরকার”।
তারপর তন্ময় ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।তপন বাবু এই শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর প্রথমদিকে সবকিছু বেশ ভালোই চলছিল।
নতুন শহরে বড় ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি।
তাপসীর গয়না বিক্রি করে, ব্যাংকের টাকা ব্যবহার করে, এমনকি কিছু ধার নিয়েও ব্যবসায় টাকা ঢেলেছিলেন।
প্রথমদিকে তপন বাবুর আত্মবিশ্বাস ছিল প্রচণ্ড।তিনি সবসময়ই বলতেন, “আমি হারতে জানি না।”
কিন্তু খুব দ্রুত সমস্যার শুরু হয়।তপন বাবুর পুরোনো স্বভাব বদলায়নি।কম দামে খারাপ মাল বিক্রি করা, হিসাব লুকোনো, লোকজনের টাকা আটকে রাখা—সবকিছুতেই তিনি সহজ উপায়ে বড়লোক হবার সুযোগ খুঁজতেন।
একজন ব্যবসায়ী একবার প্রতিবাদ করায় তপন বাবু রাগে বলেছিলেন,“ব্যবসায় একটু চালাকি না করলে বড় হওয়া যায় না।”
তন্ময় থেমে তিক্ত হেসে বলল,“সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, উনি কোনোদিনই ভালো মানুষ ছিলেন না।”
ঘরের ভিতর নীরবতা।
তপন বাবু এবার চিৎকার করে বলে উঠলেন,“চুপ কর!”
কিন্তু তন্ময় এবার আর থামল না।সে আবার বলতে শুরু করলো,”ধীরে ধীরে বাবার ব্যবসায় বড় লোকসান শুরু হয়।
যাদের থেকে টাকা ধার করেছিলেন, তারা চাপ দিতে শুরু করে,দেনা বাড়তে থাকে।আর তখনই তপন বাবুর আসল রূপ সামনে আসে।
তপস্যা এবার কথা বলে উঠলো,তার চোখ জলে ভরে গেছিল।সে রাগে বলে উঠলো, “জানেন, দেনা শোধ করতে বাবা মায়ের সব গয়না বিক্রি করে দেয়।”
গৌরী দেবীর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
তপস্যা কাঁপা গলায় বললো, “মা কাঁদতো… কিন্তু বাবা বলতো, ‘এখন সামলে উঠতে পারলে,পরে সব কিনে দেব।’”
কিন্তু কিছুই ফেরত আসেনি।বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
একসময় তাপসীর নামে থাকা জমিও বিক্রি করতে চান তপন বাবু।
তন্ময় এবার ক্লান্ত গলায় বলে উঠলো,“মা তখন খুব অসুস্থ।মা-র কিডনির সমস্যা ধরা পড়েছিল।
ডাক্তার নিয়মিত চিকিৎসা আর ডায়ালিসিসের কথা বলেছিলেন।
কিন্তু তখন বাবার মাথায় শুধু দেনা আর টাকার চিন্তা।হাসপাতালের খরচ বাঁচাতে তিনি চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে থাকেন।
মা, কষ্টে দিন কাটাত।
অনেক রাত আমি মাকে কাঁদতে শুনেছি।
তপস্যা-ও এবার বলে উঠলো, “মা একদিন বলেছিল… ‘আমি ভুল করেছি। অন্যের সংসার ভেঙে সুখ পাওয়া যায় না।’
গৌরী দেবীর চোখ ধীরে ভিজে উঠছিলো।তাপসীকে তিনি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারেননি পুরোপুরি।
তবুও মৃত্যুশয্যায় একজন মানুষের অনুশোচনার কথা শুনে তাঁর বুকটা হালকা ব্যথা করল।
তন্ময় এবার তপন বাবুর দিকে তাকাল।তার চোখে ঘৃণা স্পষ্ট।সে চিৎকার করে বলে উঠলো, “মায়ের চিকিৎসা ঠিকমতো করাও হয়নি। কারণ তোমার কাছে টাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”
তপন বাবু এবার হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন, “মিথ্যে! সব মিথ্যে!”
তাঁর গলার আতঙ্ক স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল কারণ এতদিনের তার লুকোনো মুখোশ একে একে খুলে যাচ্ছে।
তপস্যা ঠান্ডা গলায় বলল,”তুমি মা-কে বলোনি,তুমি নাকি তোমার প্রথম স্ত্রী আর তোমার দুই ছেলের জন্য বাড়ি,টাকা রেখে এসেছো।
কিন্তু আজ এই বাড়ি দেখে বুঝেছি,তুমি সবসময়ই ,সবটাই মিথ্যা বলেছো। এমনকি মা মারা যাওয়ার দিনও তুমি টাকার হিসাব করছিলে,বারবার আমাদের জিজ্ঞেস করছিলে,
মা-র নামে কেনা এই বাড়িটার দলিল কোথায়?
ভাগ্যিস, তোমাকে দিইনি,নাহলে তো তুমি এখানকার বাড়ির মতো ওটা-ও বিক্রি করে দিতে আমাদের অজান্তেই।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।ঋদ্ধিকে মেঘলা ভিতরের ঘরে নিয়ে গেছে।
গৌরব দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে,তরুণের চোখে ঘৃণা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
আর গৌরী দেবী চুপচাপ বসে শুনছিলেন।একসময় যাকে তিনি নিজের জীবনের ভরসা ভাবতেন, আজ তাঁর সামনে সেই মানুষটার ভিতরের পচন পুরোপুরি প্রকাশ পাচ্ছে।
তন্ময় আবার বলতে শুরু করল,”মা-র মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।দেনাদারেরা বাড়িতে আসতে শুরু করে।
একদিন তন্ময় জানতে পারে, তপন বাবুর নামে পুলিশে অভিযোগ-ও হয়েছে।
কিন্তু সেই অবস্থাতেও তপন বাবু পালানোর পরিকল্পনা করছিলেন এবং সেই মতো
হঠাৎ একদিন কোনো কথা না বলেই তিনি উধাও হয়ে যান।
তন্ময় আর তপস্যা তখনই আন্দাজ করেছিলো,তিনি হয়তো আবার পুরোনো পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন,আবার নতুন কোনো গল্প তৈরি করে হয়তো নিজের বাঁচার রাস্তা খুঁজবেন।
তপস্যা ধীরে ধীরে বলল, “আমরা জানতাম… হয়তো আবার কোনো ক্ষতি করতে এসেছো তুমি।”
তপন বাবু এবার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লেন।
তিনি চিৎকার করতে শুরু করলেন,তিনি উন্মাদের মতো বলে উঠলেন,“সবাই আমাকে দোষ দিচ্ছে! সবাই!”
তাঁর চোখে তখন আতঙ্ক স্পষ্ট, তিনি আবার বলে উঠলেন, “আমি যা করেছি, সংসারের জন্যই করেছি!”
তরুণ তীব্র গলায় বলল, “সংসারের জন্য না, নিজের লোভের জন্য আপনি সব করেছেন।
আর কোন সংসারের কথা বলছেন,দুটো পরিবারকেই তো আপনি ধ্বংস করার কোন ত্রুটি রাখেননি”।
তপন বাবু কাঁপছিলেন।তাঁর মনে হচ্ছিল, চারদিক থেকে সত্যি তাঁকে চেপে ধরছে।
তখনই তন্ময় খুব শান্ত গলায় বলল, “পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে।”
ঘরের সবাই থমকে গেল।তন্ময় ধীরে ধীরে বললো, “তুমি দেনা শোধ না করেই পালিয়েছ। শাস্তি তোমার প্রাপ্য।”
তপন বাবুর চোখ হঠাৎ ভয়ে বড় হয়ে গেল।তিনি অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন,“না… না… আমাকে পুলিশে দিও না…”
তিনি পিছিয়ে যেতে লাগলেন।
তারপর আচমকা দরজার দিকে দৌড় দিলেন।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না।
গৌরব চিৎকার করে উঠলো, “বাবা!”
ততক্ষণে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তপন বাবু রাস্তায় নেমে পড়েছেন।বাইরে তখন সন্ধ্যার ভিড়।
হর্ণের শব্দ ,দ্রুতগামী গাড়ির আওয়াজ
আর পরের মুহূর্তেই—
একটা বিকট শব্দ।
সবকিছু থেমে গেল।রাস্তার মাঝখানে ছিটকে পড়ে ছিলেন তপন বাবু।
চারপাশে মানুষ জড়ো হতে শুরু করেছে।
গৌরী দেবী দরজার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।তাঁর চোখে জল ছিল না,ছিলো শুধু গভীর শূন্যতা।
একসময় যে মানুষটা এত অহংকার নিয়ে বেঁচেছিলেন, তাঁর শেষটা হলো এভাবে—একলা,
অসহায়।
পুলিশ এলো।হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই তপন বাবুকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পুলিশ যখন পরিবারের কাউকে দেহ নেওয়ার কথা বলল, তখন ঘরের ভিতর আবার নীরবতা নেমে এল।
তন্ময় ধীরে ধীরে বললো, “আমি কোনো সম্পর্ক রাখি না এই মানুষের সঙ্গে।”
তপস্যার চোখে জল থাকলেও
তার গলায় ছিলো কঠোরতা,সে-ও বলে উঠলো,“যে মানুষ আমাদের মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী, তার মুখাগ্নি আমি করব না।”
পুলিশ অবাক হয়ে এবার তরুণ আর গৌরবদের দিকে তাকাল।
তরুণ অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তিনি আমাদের বাবা ছিলেন। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে যা করেছেন… তার পরে আমরা-ও ওনার শেষ কাজ করতে পারবো না।”
গৌরি দেবী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন,তিনি ভারী অথচ দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন,
“আমি মৃত মানুষকে অসম্মান করছি না। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে,তাই আমাদের কিছুই করার নেই।”
শেষ পর্যন্ত পুলিশের নির্দেশে তপন বাবুর সৎকার হলো এক বেওয়ারিশ মৃতদেহ হিসেবে।
যে মানুষটা সারাজীবন টাকা, সম্পত্তি আর অহংকারের পিছনে ছুটেছিলেন, তাঁর শেষ যাত্রায় পাশে রইল না কেউ।
পরদিন সকালে তন্ময় আর তপস্যা চলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল।বিদায় নেওয়ার আগে তপস্যা ধীরে গৌরী দেবীর সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর হঠাৎ নিচু হয়ে গৌরী দেবীর পায়ে হাত দিল।
তন্ময়ও একইভাবে প্রণাম করল।
গৌরী দেবী অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালেন।
তপস্যার চোখ ভিজে গিয়েছিল।
সে কাঁপা গলায় বলে উঠলো, “মা… মৃত্যুর আগে আমাদের মা,আপনার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল।”
ঘরের ভিতর তখন শুধুই নিস্তব্ধতা।
তন্ময় ধীরে ধীরে বলে উঠলো, “আপনাদের আর একটা কথা বলা হয়নি,মা-এর নামে যে জমিটা ছিলো,আমরা ফিরে গিয়ে বিক্রি করে দেব।ওই লোকটার কোন কৃতকর্মের দায় আমরা রাখবো না।
যারা,ওনাকে টাকা দিয়েছিলেন ধার হিসেবে,উনি সেটা শোধ করেননি। আমার এবং বোনের সঙ্গতি যখন আছে আমরা অন্তত সেই মানুষগুলোর প্রাপ্য টাকাগুলো ফেরত দেবো।
মৃত্যুর সময়ে,মা প্রায়ই বলতেন,অন্যের প্রাপ্য আত্মসাৎ করে,অন্যের কষ্টের ওপর নিজের সুখ তৈরি করলে, তার শাস্তি একদিন ফিরেই আসে।
আমরা নিজেদের জীবনে-ও এবার শান্তি চাই,যদি পারেন আমার মা-কে ক্ষমা করবেন।”
গৌরী দেবীর বুকের ভিতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।এত বছর ধরে জমে থাকা রাগ, অভিমান, অপমান—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
তিনি ধীরে ধীরে তন্ময় আর তপস্যার মাথায় হাত রাখলেন।কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলেন না,কারণ কিছু কষ্টের ভাষা হয় না।
তন্ময় আর তপস্যা ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল।গৌরী দেবী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখছিলেন।
আকাশটা আজ ছিলো মেঘলা,হালকা ঠাণ্ডা বইছিল।
গৌরি দেবীর মনে হলো, তাঁর জীবনের একটা দীর্ঘ অধ্যায় অবশেষে শেষ হলো আজ।
একটা সময় ছিল, যখন তিনি শুধু ভেঙে পড়েছিলেন,তারপর লড়েছেন,সব হারিয়েও আবার সংসার গড়েছেন।
কিন্তু আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে গৌরী দেবী বুঝলেন—
সময় চুপচাপ সব হিসাব লিখে রাখে।
কখনও সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেয় না,বরং মানুষকে তার নিজের ভুলের মধ্যেই ধীরে ধীরে ডুবতে দেয়।
তারপর একদিন জীবন নিজের নীরব নিয়মে হিসেব কষে নেয়।কোনো শব্দ না করে, কোনো ঘোষণা না দিয়ে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে দেয় প্রত্যেক মানুষকে তার প্রাপ্য।
যে মানুষ অন্যের চোখের জলকে গুরুত্ব দেয় না, একদিন সেই মানুষকেই একাকীত্বের দীর্ঘ অন্ধকারে দাঁড়াতে হয়।
যে বিশ্বাস ভাঙে, সে একদিন নিজের ভাঙনের শব্দও শুনতে পায়।
আর তখন মানুষ বুঝতে পারে—
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বিচার আদালতের কাঠগড়ায় নয়, হয় নিজের জীবনের কাছেই।।
সমাপ্ত
