হারানো ঠিকানা(অষ্টম পর্ব)
একসময় যে মানুষটা নিজের অহংকারে একটা সংসার ভেঙে দিয়েছিল, আজ সে নিঃশব্দে দিন কাটায় সেই সংসারেরই এক কোণে।
তপন বাবুর জীবন এখন খুব ছোট হয়ে গেছে।
বাড়ির বাইরের একতলার ছোট্ট ঘর, সকালে বারান্দায় বসে চা খাওয়া, দুপুরে একটু খবরের কাগজ পড়া—এই নিয়েই কেটে যায় তাঁর দিন।
এই বাড়িতে তিনি আছেন, অথচ নেইও।কেউ তাঁকে অপমান করে না,কিন্তু কেউ তাঁকে আর আগের মতো নিজের মানুষ বলেও মনে করে না।
তরুণ আর গৌরব ভদ্রতা বজায় রাখে, কিন্তু দূরত্বটা স্পষ্ট।সুমনা আর মেঘলা-ও একটা
সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখে, আর গৌরী দেবীর আচরণেও একটা অদৃশ্য সীমারেখা বোঝা যায়।
শুধু ছোট্ট ঋদ্ধির কাছে তপন বাবু এখন উনি “নতুন দাদু”।সেই সম্পর্কটার মধ্যে কোনো হিসাব নেই, কোনো অতীত নেই।
সকালে সবাই কাজে বেরিয়ে যায়।
তরুণ আর গৌরব দোকানে যায়।মেঘলা আর সুহানাও এখন ব্যবসার অনেক কাজ সামলায়।
দুজনেই কয়েক ঘণ্টার জন্য দুপুরবেলা দোকানে যায় , কাস্টমার দেখাশোনা করে,অর্ডারী শাড়িগুলো গুছিয়ে রাখে আলাদা করে।
বাড়িটা তখন একটু ফাঁকা হয়ে যায়।গৌরী দেবী সংসারের কাজ সামলান।
ঠাকুরঘরে ফুল দেন, রান্নাঘরে রান্না করেন, কখনও নাতির জন্য পায়েস বানান।
আর সারাদিন বাড়িটা ভরে থাকে ঋদ্ধির হাসির শব্দে।ছেলেটা এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারে না।
কখনও খেলনা গাড়ি নিয়ে পুরো বাড়ি ঘুরছে, কখনও দৌড়ে এসে ঠাকুমার আঁচল ধরে ঝুলছে।
তপন বাবু দূর থেকে সব দেখেন।
অনেক সময় বারান্দায় বসে চুপচাপ নাতির খেলা দেখেন তিনি।
ঋদ্ধি মাঝেমাঝেই দৌড়ে এসে বলে,”নতুনদাদু , সাহসী রানির গল্প জানো?”
তখন তপন বাবুর বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে,কারণ এই ছোট্ট ছেলেটার চোখে তিনি দেখতে পাননি গল্পের সাহসী রানিকে।
একদিন বিকেলে ঋদ্ধি জোর করেই তপন বাবুর ঘরে ঢুকে পড়ল।তার হাতে রঙ পেন্সিল।জোরে বলে উঠলো,“নতুন দাদু, আঁকতে শিখিয়ে দাও!”
তপন বাবু একটু হেসে বললেন, “আমি তো খুব ভালো আঁকতে পারি না।”
ঋদ্ধি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “পারো! সবাই কিছু না কিছু পারে।”
কথাটা শুনে তপন বাবু থমকে গেলেন।
একটা ছোট্ট বাচ্চা কত সহজে কথা বলে দেয়, অথচ সেই কথার ভিতরে কত গভীর সত্য লুকিয়ে থাকে।
বাচ্ছাটা জানে না এই মানুষটার অতীত,জানে না, একসময় তাঁর সিদ্ধান্তেই একটা সংসার ভেঙে গিয়েছিল।
তপন বাবু ধীরে ধীরে পেন্সিলটা হাতে নিলেন।তারপর একটা ছোট্ট বাড়ির ছবি আঁকলেন।
ছবিটার পাশে গাছ, বারান্দা, আর হাসিমুখ মানুষ।
ঋদ্ধি খুশি হয়ে হাততালি দিয়ে বলে উঠলো,“এটা আমাদের বাড়ি?”
তপন বাবুর হাত হঠাৎ থেমে গেল।কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি খুব আস্তে বললেন, “হ্যাঁ… তোমাদের বাড়ি।”
“তোমাদের।”
শব্দটা বলতে তাঁর বুকের ভিতরটা হালকা ব্যথা করল,কারণ এই বাড়িতে তাঁর কোনো অধিকার নেই,শুধু আশ্রয় আছে।
তপন বাবু মাঝে মাঝেই গভীর রাতে ঘুমোতে পারেন না।তখন বারান্দায় এসে বসে থাকেন।
উপরে তরুণদের ঘর থেকে হাসির শব্দ আসে।
কখনও সবাই মিলে সিনেমা দেখছে, কখনও নাতির দুষ্টুমি নিয়ে গল্প হচ্ছে।
একদিন রাতে সবাই একসাথে খাবার খাচ্ছিল।পুরোনো নিয়ম এখনও বজায় আছে।হাসির শব্দ, গল্প, নাতির দুষ্টুমি—সব মিলিয়ে ডাইনিং টেবিলটা উষ্ণ।
তপন বাবু একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সব দেখছিলেন।একসময় এই জায়গাটাই ছিল তাঁর।
আজ তিনি শুধু দর্শক।
গৌরী দেবী সবকিছু খুব শান্তভাবে দেখতেন।তিনি কখনও তপন বাবুকে অপমান করেননি।খাবার সময় হলে খাবার পাঠিয়ে দেন,শরীর খারাপ হলে ওষুধ খেতে বলেন।
কিন্তু তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক এখন শুধুই আশ্রয় দাতা ও আশ্রিত-র, স্বামী-স্ত্রীর নয়।
একদিন দুপুরে তপন বাবুর জ্বর এসেছিল।
গৌরী দেবী ওষুধ দিয়ে বলে উঠলেন, “সময়মতো খেয়ে নেবেন।”
তপন বাবু তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ।তারপর খুব আস্তে বললেন, “তুমি এখনও আমার এত খেয়াল রাখো কেন?”
গৌরী দেবী শান্ত গলায় বলেছিলেন, “অভ্যাস নয়। মানবিকতা।”
এই একটা কথার মধ্যে এত দূরত্ব ছিল যে তপন বাবু আর কিছু বলতে পারেননি।
গৌরি দেবী একটু চুপ করে থেকে আবার বলে উঠলেন,”এই শান্তিটা একসময় আপনার হাতেই ছিল।কিন্তু আপনি নিজের অহংকার আর লোভে সেটা নষ্ট করেছিলেন।
জীবন আপনাকে দ্বিতীয়বার সেই সংসারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আগের জায়গাটা আর দেয়নি,দেবেও-না।
আর এটাই হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় শাস্তি”।
সেদিন দুপুরটাও খুব সাধারণ ছিল।তরুণ আর গৌরব দোকানে থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসবে বলেছে।মেঘলা,সুমনা রান্নাঘরে মুখোরোচক কিছু বানাতে ব্যস্ত।
গৌরী দেবী ঋদ্ধিকে নিয়ে বারান্দায় বসেছিলেন।
তপন বাবু নিজের ঘরে চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
সুমনা দরজা খুলতে গেল।কিন্তু দরজা খুলেই সে থমকে দাঁড়াল।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানুষ।
একজন যুবক, আর একজন যুবতী।দুজনের মুখেই অস্বস্তি, কিন্তু চোখে স্পষ্ট হিসাবি দৃষ্টি।
গৌরি দেবী-ও এসে দাঁড়ালেন, কয়েক সেকেন্ড পরেই চিনতে পারলেন ওদের—।।
তন্ময় আর তপস্যা।
ঘরের ভিতর মুহূর্তে একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
গৌরী দেবীর মুখে বিস্ময় থাকলেও অস্থিরতা ছিল না।
কিন্তু তপন বাবুর প্রতিক্রিয়া অন্যরকম ছিল।
নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওদের দেখামাত্র তাঁর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।চোখেমুখে হঠাৎ স্পষ্ট আতঙ্ক ফুটে উঠল।
এমনকি মনে হচ্ছিল, তিনি যেন কোথাও পালিয়ে যেতে চাইছেন।তাঁর হাত কাঁপতে শুরু করল।
ঋদ্ধি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “নতুন দাদু, তুমি ভয় পাচ্ছো কেন?”
তপন বাবু কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু স্থির চোখে তন্ময়দের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তন্ময় ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকল।
আগের সেই উদ্ধত ভাবটা এখনও আছে, কিন্তু মুখে ক্লান্তির ছাপও স্পষ্ট।
তপস্যা চারদিকে তাকিয়ে বাড়িটা দেখছিল।তার চোখেও কেমন যেন অদ্ভুত অস্বস্তি।
গৌরব -ও ঠিক তখনই দোকান থেকে ফিরছিল।ঘরে ঢুকে ওদের দেখে সে থেমে গেল।
গৌরবের চোখ মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল।সে বলে উঠল, “তোমরা এখানে কেন?”
তন্ময় ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, “আমরা বাবার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।”
“বাবা” শব্দটা শুনে তপন বাবুর চোখ নীচু হয়ে গেল।কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠছিল।তরুণও কিছুক্ষণ পরে বাড়ি ফিরল।পরিস্থিতি বুঝতে তার সময় লাগল না।
সে সরাসরি তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এতদিন পরে হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল?”
তন্ময় মুখ ঘুরিয়ে নিল।তপস্যা এবার ধীরে ধীরে বললো,“আমরা ঝগড়া করতে আসিনি।”
গৌরব তীক্ষ্ণ গলায় বললো, “তাহলে?”
তন্ময় এবার প্রথমবার তপন বাবুর দিকে তাকাল।
সেই চোখে আগের মতো আত্মবিশ্বাস ছিল না।
বরং ছিল চাপা রাগ।
তপন বাবুর দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠলো, “আমাদের কিছু সমস্যা হচ্ছে,সমাধান চাই …”
কথাটা শুনেই তপন বাবুর মুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।মনে হচ্ছিল, তিনি আগেই বুঝতে পারছেন—ওরা কেন এসেছে।
আর সেই মুহূর্তে গৌরী দেবী হঠাৎ উপলব্ধি করলেন,অতীত কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না।
কিছু সম্পর্ক ভেঙে গেলেও তাদের ছায়া ও তার প্রভাব,পরিণাম বহু বছর পরেও মানুষের জীবনের উপর বজায় থাকে।
ক্রমশ
