হারানো ঠিকানা(ষষ্ঠ পর্ব)
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসারে আবার হাসি ফিরেছিল।
যে বাড়িতে একসময় শুধু কান্না, অপমান আর ভাঙনের শব্দ ছিল, সেই বাড়িতেই এখন সন্ধ্যাবেলা হাসির আওয়াজ শোনা যায়।
তরুণ আর গৌরবের বিয়ে হয়েছিল খুব সাধারণভাবে।
গৌরী দেবী ইচ্ছে ছিলো বড় অনুষ্ঠান করার কারণ তাদের ব্যবসা যথেষ্ট ভালো চলছিল। কিন্তু তরুণ আর গৌরব দুজনেই নিজে থেকেই বলেছিলো,“মা,সংসার বড় হয় ভালোবাসায়, লোক দেখানোয় নয়।”
তাই পাড়ার মানুষদের নিয়েই ছোট করে বিয়ে হয়েছিল।
তরুণের স্ত্রী মেঘলা শান্ত স্বভাবের মেয়ে। আর গৌরবের স্ত্রী সুমনা একটু চঞ্চল হলেও ভীষণ মিষ্টি ব্যবহার।
দুজনেই খুব সহজে এই পরিবারে মিশে গিয়েছিল।
গৌরী দেবীর জীবনের সংগ্রামের গল্প তখন শুধু এই পাড়ায় নয়, আশেপাশের অনেক মানুষেরই জানা।অনেকে তাঁকে উদাহরণ হিসেবে দেখত।
যে মহিলা সব হারিয়েও ভেঙে পড়েননি, দুই ছেলেকে নিয়ে আবার নতুন জীবন গড়েছেন—তাঁকে সম্মান না করে উপায় ছিল না।
তাই বউমারাও তাঁকে শুধু শাশুড়ি হিসেবে নয়, নিজের মায়ের মতোই দেখত।
সকালে দোকানে সবাই চলে যাওয়ার পর, মেঘলা এসে জিজ্ঞেস করতো, “মা, দুপুরে কী রান্না করবো?তোমার কি খেতে ইচ্ছে করছে?”
সুমনা নতুন শাড়ির ডিজাইন ফোনে দেখিয়ে গৌরি দেবীর মতামত নিতো।
গৌরী দেবীর মাঝে মাঝে অবাক লাগত,যে জীবন তাঁকে একসময় এত একা করে দিয়েছিল, আর আজ সেই জীবনই আবার ভালোবাসার মানুষে মানুষে ভরে উঠেছে।
বহু ঝড় পেরিয়ে এই বাড়িটায় এখন এক অদ্ভুত শান্তি ছিল।গৌরী দেবীর দিনের বেশিরভাগ সময় এখন কাটতো তরুণের ছোট ছেলে ঋদ্ধিকে নিয়ে।
ছেলেটা যেন পুরো বাড়ির প্রাণ।
সারাদিন বাড়ি মাথায় করে রাখত সে।
কখনও ঠাকুমার আঁচল টেনে দৌড়াচ্ছে, কখনও খেলনা ছুড়ে দিয়ে হাসছে, কখনও দোকানে যাওয়ার বায়না করছে।
গৌরী দেবী তাকে নিয়ে মাঝে মাঝেই বারান্দায় বসতেন।ঋদ্ধি গল্প শুনতে খুব ভালোবাসতো,প্রায়ই বলতো,“ঠাকুমা, ওই সাহসী রানির গল্প বলো!”
গৌরী দেবী হেসে বলতেন,“এক ছিল খুব সাহসী একটা রানি…”
তখন তরুণ মজা করে বলত,“জানিস,ঋদ্ধি,গল্পের ওই রানিটা তোর ঠাকুমা?”
সবাই হেসে উঠত।এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন বাড়ির পুরোনো অন্ধকারগুলো ধীরে ধীরে মুছে দিয়েছিল।
আর একটা জিনিস আজও বদলায়নি।রাতের খাবার সবাই এখনও একসাথে খায়।
যত রাতই হোক, দোকানের কাজ যতই থাকুক, দিনের শেষে সবাই ডাইনিং টেবিলে একসাথে বসে।
এই নিয়মটা গৌরী দেবী ভাঙতে দেননি কখনও।
তিনি বলতেন, “একসাথে খাওয়া মানে শুধু খাবার না, একসাথে থাকা।”
তাই আজও সেই টেবিলে গল্প হয়, হাসি হয়, ব্যবসার আলোচনা হয়।তরুণ নতুন ডিজাইনের কথা বলে।গৌরব হিসাবের খাতা খুলে বসে।
কোন শহর থেকে কাপড় আনানো হবে, নতুন শাখা খোলা উচিত কি না—সব বিষয়ে আজও গৌরী দেবীর মতামত নেওয়া হয়।
একদিন রাতের খাবারের পর গৌরব হেসে বলে উঠলো, “মা, তুমি না থাকলে আমরা কিছুই করতে পারতাম না।”
তরুণ সঙ্গে সঙ্গে বললো, “সত্যি মা। তুমি ভেঙে পড়লে আমরা শেষ হয়ে যেতাম।”
গৌরী দেবী মৃদু হেসেছিলেন।জীবন তাঁকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল—
স্বপ্ন, বিশ্বাস, নিরাপত্তা…
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনই আবার তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে—
সম্মান, ভালোবাসা আর নিজের মানুষদের।
আর এখন তাঁর মনে হতো, এই শান্তিটুকুই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সেদিন সন্ধ্যাটাও অন্য দিনের মতোই ছিল।দোকান থেকে ফিরে সবাই বসার ঘরে একসাথে চা খাচ্ছিল।
মেঘলা রান্নাঘর থেকে গরম গরম খাবার এনে রাখছিল।
সুমনা নতুন একটা খেলনা নিয়ে ঋদ্ধির সঙ্গে খেলছিলো।ঋদ্ধি খেলতে খেলতে কখনও গৌরী দেবীর কোলে উঠছিলো, কখনও আবার দৌড়ে পালাচ্ছিলো গৌরবের কাছে।
বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।
ঘরের ভিতরে উষ্ণ, শান্ত একটা পরিবেশ।ঠিক তখনই দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
গৌরব উঠে দাঁড়িয়ে বললো,“আমি দেখছি।”সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু দরজা খুলতেই তার পা যেন হঠাৎ থেমে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে প্রথমে চিনতেই পারেনি সে।মুখভর্তি সাদা দাড়ি,কাঁধ ঝুঁকে গেছে।
চোখের নীচে গভীর কালি,জামাকাপড় মলিন, শরীর শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে।লোকটার চোখে ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক অসহায়তা।
কয়েক সেকেন্ড পরে গৌরবের মুখ শক্ত হয়ে উঠল।তার গলা ভারী হয়ে এল,অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,
“বাবা…?”
ঘরের ভিতর মুহূর্তে নীরবতা নেমে এল।
ক্রমশ
