পরিবার
পর্ব ০১
লেখক The Story Haven
আমার ননদ আমার ৫ বছরের মেয়ের গা’য়ে হা’ত তুলেছে শুনে আমিও সবার সামনে তাকে দুইবার থা*প্পড় দিয়ে বললাম আমার স্বামীর রোজগারের টাকায় এই পরিবার চলে আর আমার মেয়েকেই থা*প্পড় মা*রার অধিকার তোমায় কে দিলো?
এটা দেখে আমার শ্বাশুড়ি রেগে আমাকে বলতাছে তোমার মেয়েকে থা**প্পড় দিয়েছে বলে তোমার কষ্ট লেগেছে তাই তুমি মারিয়াকে থা*প্পড় মা*রলা। সেই একি কষ্ট এখন আমারো লাগতেছে। আমারো মন চাচ্ছে তোমাকে থা*প্পড় মা*রতে
আমি তখন বারান্দায় কাপড় তুলছিলাম। হঠাৎ ভেতর থেকে তীক্ষ্ণ একটা কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
“আম্মু!”
আমি দৌড়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখি আয়রা গাল চেপে ধরে কাঁদছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার ননদ মারিয়া। চোখেমুখে বিরক্তি।
“কি হয়েছে?” আমি হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম।
আয়রা কিছু বলতে পারছিল না, শুধু কাঁদছিল। পাশ থেকে ছোট দেবর বলল, “ভাবি, আয়রা নাকি মারিয়ার ফোন পানিতে ফেলে দিছে। তাই মারিয়া আপু একটা থাপ্প*ড় মা*রছে।”
আমি মেয়ের গালটা হাতে নিয়ে দেখলাম লাল হয়ে আছে। ছোট্ট মুখটা কাঁপছে। সেই মুহূর্তে মাথার ভেতর যেন কিছু ছিঁড়ে গেল।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
“তুমি আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলছো?”
মারিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “বাচ্চা মানুষ করতে জানো না আবার কথা বলতে আসছো? ফোনটা নষ্ট হলে কি তুমি টাকা দিবা?”
আমি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আয়রার ভেজা চোখ বারবার সামনে আসছিল।
“তুমি আমাকে বলতে পারতে। ওকে মা*রার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”
“অধিকার?” মারিয়া এবার হেসে উঠল। “এই বাড়িতে সবাই ওকে মানুষ করে। শুধু তুমি একা ওর মা না আমিও ওর ফুফু।”
কথাটা শুনেই যেন শরীরের র*ক্ত গরম হয়ে উঠল। আমি আর কিছু না ভেবে সবার সামনে মারিয়াকে দুইটা থা*প্পড় দিলাম।
ঘরটা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
টিভির শব্দ পর্যন্ত যেন থেমে গেছে।
মারিয়া অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে পানি চলে এসেছে। গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আমার স্বামীর রোজগারের টাকায় এই পরিবার চলে আর আমার মেয়েকেই থা*প্পড় মা*রার অধিকার তোমায় কে দিলো?”
আমার কথা শেষ হতেই রান্নাঘর থেকে শাশুড়ি বের হয়ে এলেন। মুখ রাগে শক্ত।
“কি হয়েছে এখানে?”
মারিয়া কেঁদে উঠে বলল, “আম্মু, ভাবি আমাকে মা*রছে!”
শাশুড়ি একবার মেয়ের দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে।
“তুমি মারিয়াকে থাপ্প*ড় মা*রছো?”
আমি সরাসরি বললাম, “জি মা*রছি। কারণ ও আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে।”
শাশুড়ি ধীরে ধীরে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“তোমার মেয়েকে থা*প্পড় দিয়েছে বলে তোমার কষ্ট লেগেছে, তাই তুমি মারিয়াকে থা*প্পড় মা*রলা। সেই একই কষ্ট এখন আমারও লাগতেছে। আমারও মন চাচ্ছে তোমাকে থা*প্পড় মা*রতে।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই বাড়িতে বিয়ের পর আট বছর ধরে আছি। কখনো উঁচু গলায় কথা বলিনি। কখনো নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে দিইনি। কিন্তু আজ আমার মেয়ের মুখটা দেখে সব ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে।
আমি শান্ত গলায় বললাম, “আপনার মন চাইতেই পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার আগে কেউ একবারও ভাবেনি ও কতো ছোট।”
“ছোট?” শাশুড়ি কড়া গলায় বললেন। “ছোট মানুষ ভুল করলে শাসন করতেই হয়।”
আমি এবার আর চুপ থাকতে পারলাম না।
“শাসন আর থা*প্পড় এক জিনিস না আম্মা।”
মারিয়া তখনও কাঁদছে। কিন্তু তার চোখে কান্নার চেয়ে রাগ বেশি। সে দাঁত চেপে বলল, “এই বাড়িতে আসার পর থেকেই ভাবি নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবে।”
আমি উত্তর দিলাম না।
কারণ আমি জানতাম, এখন একটা কথাও বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
ঠিক তখন দরজার বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। আমার স্বামী রাফি অফিস থেকে ফিরেছে।
ঘরের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।
রাফি ভেতরে ঢুকেই বুঝে গেল কিছু একটা হয়েছে। সে একবার আমার দিকে তাকাল, তারপর মারিয়ার কান্নাভেজা মুখের দিকে।
“কি হয়েছে?”
কেউ প্রথমে কিছু বলল না।
তারপর শাশুড়ি ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার বউ আজ তোমার বোনের গায়ে হাত তুলছে।”
রাফির মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে আমার দিকে তাকাল।
আমি আয়রাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মেয়েটা তখনও ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
রাফি ধীরে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
আমি মাথা তুললাম।
“হ্যাঁ। কারণ তোমার বোন আগে আমার মেয়েকে মে*রেছে।”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঘরের সবাই তার উত্তরের অপেক্ষা করছে।
আর আমি বুঝতে পারছিলাম, আজকের এই থাপ্প*ড়ের শব্দ শুধু একটা ঝগড়া না।
এটা হয়তো এই পরিবারের বহুদিনের চাপা আগুনে প্রথম বি*স্ফোরণ।
চলবে…
পরিবার
পর্ব ০২
লেখক The Story Haven
রাফির শান্ত চাউনি আর ঘরের ওই ভারী নীরবতা যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। শাশুড়ি মা তখনও মারিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে আগলে রেখেছেন তাকে, যেন আমি কোনো বড় অপরা*ধী। মারিয়া ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “ভাইয়া, দেখ ভাবি কত বড় লোক দেখায়! বলে কি না তোমার টাকায় এই সংসার চলে তাই সে যা খুশি করতে পারে!”
রাফি ব্যাগটা সোফায় রেখে ধীরপায়ে আয়রার কাছে এল। ওর গালের লাল দাগটা দেখে রাফির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আয়রা বাবাকে দেখে আরও জোরে কেঁদে দিয়ে জড়িয়ে ধরল। রাফি ওকে কোলে তুলে নিল, কিন্তু আমার দিকে একবারও তাকাল না।
শাশুড়ি এবার চড়া গলায় বললেন, “রাফি, তুই কি কিছুই বলবি না? তোর সামনে দাঁড়িয়ে তোর বউ আমার মেয়েকে অপমা*ন করল! তুই থাকতে এই বাড়িতে বাইরের একটা মেয়ে এসে আমার কলিজার টুকরার গায়ে হাত তুলবে?”
রাফি মেয়ের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে খুব নিচু স্বরে বলল, “আম্মা, মারিয়া কি আয়রাকে মে*রেছে?”
শাশুড়ি থতমত খেয়ে গেলেন, তবে সামলে নিয়ে বললেন, “মে*রেছে তো শাসনের জন্য! অত দামি ফোনটা পানিতে ফেলল, হাত তো একটু উঠবেই। বড়রা শাসন না করলে তো মাথায় উঠবে।”
রাফি এবার মাথা তুলে মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়া ভাবল ভাইয়া বোধহয় এবার আমার ওপর চড়াও হবে। সে কান্নার বেগ বাড়িয়ে দিল। কিন্তু রাফি শান্ত গলায় বলল, “মারিয়া, ফোনটার দাম কত ছিল?”
মারিয়া অবাক হয়ে বলল, “পঁচিশ হাজার টাকা। কেন?”
“আগামীকাল তোমাকে আমি নতুন একটা ফোন কিনে দেব। আর এই মাসের সংসার খরচ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা আমি কেটে রাখব। কারণ, তোমার যদি মনে হয় টাকার জন্য একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার গায়ে হাত তোলা জায়েজ, তাহলে সেই টাকা শোধ করার দায়িত্বও তোমার হওয়া উচিত।” আয়রার বয়স মাত্র পাচ বছর ওর ভালো মন্দ বুঝার বয়স এখনো হয়নি এটা মনে রেখ।
রাফির কথায় পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। শাশুড়ি চিৎকার করে উঠলেন, “একী বলছিস রাফি? তুই নিজের বোনের চেয়ে একটা ফোনকে বড় করে দেখছিস?”
রাফি এবার আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে একটা অদ্ভুত আক্ষেপ। সে বলল, “আমি ফোনের কথা বলছি না আম্মা। আমি সম্মানের কথা বলছি। এই বাড়িতে আট বছর ধরে মায়া (আমার নাম) মুখ বুজে সব সহ্য করে আসছে। তোমরা ওকে ‘বাইরের মেয়ে’ বলো, কথা কথায় খোঁটা দাও—ও কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু আজ ও মা হিসেবে প্রতিবাদ করেছে। মেয়ের গালের ওই দাগটা আমার কলিজায় লেগেছে আম্মা। মারিয়া যদি শাসনের অধিকার রাখে, তবে মায়ারও অধিকার আছে নিজের সন্তানকে রক্ষা করার।”
আমি অবাক হয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে রইলাম। যে মানুষটা সবসময় ঝগড়া এড়িয়ে চলত, আজ সে আমার পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছে।
শাশুড়ি রাগে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে চলে গেলেন। মারিয়া অপমা*নে গজগজ করতে করতে সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। বসার ঘরে তখন শুধু আমি, রাফি আর আমাদের ছোট মেয়েটা।
রাফি আয়রাকে নিচে নামিয়ে দিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি ঠিক কাজটাই করেছ মায়া। তবে একটা কথা ভুল বলেছ।”
আমি ভয়ার্ত চোখে তাকালাম। রাফি আমার হাত দুটো ধরে বলল, “আমার টাকায় এই সংসার চলে না মায়া, আমাদের ত্যাগে এই সংসার চলে। তুমি যদি আজ প্রতিবাদ না করতে, তবে আয়রা সারাজীবন মাথা নিচু করে থাকতে শিখত। কিন্তু মনে রেখো, আজকের পর এই বাড়িতে তোমার পথ চলা আরও কঠিন হয়ে যাবে।”
আমি জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকালাম। আমি জানি, কাল সকালটা অন্যরকম হবে। শাশুড়ির অবহেলা আর ননদের বিষাক্ত কথা আরও বাড়বে। কিন্তু আমার কোনো আফসোস নেই। আজ আয়রা যখন শান্ত হয়ে আমার বুকে মাথা রাখল, আমি বুঝলাম একজন মায়ের কাছে নিজের আত্মসম্মানের চেয়ে সন্তানের নিরাপত্তা অনেক বড়।
পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। শাশুড়ি রান্নাঘরে হাড়ি-পাতিল সজোরে শব্দ করছেন। আমি চা নিয়ে টেবিলে বসতেই তিনি এসে সামনে দাঁড়ালেন।
“তোর অহংকার তো অনেক বেড়ে গেছে রাফির আশকারা পেয়ে। মনে রাখিস, এই বাড়ির শিকড় আমি। ডালপালা কাটলেও গাছ উপড়ে ফেলা অত সহজ না।”
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বললাম, “গাছ উপড়ানোর ইচ্ছা আমার নেই আম্মা। আমি শুধু ডালপালাগুলোকে একটু ছেঁটে দিতে চাইছি, যাতে আগাছা হয়ে সেগুলো আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করে।”
শাশুড়ির মুখ রাগে নীল হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখি সামনে আমার বড় জা আর ভাসুর দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে ব্যাগ-পত্তর।
বড় জা বাঁকা হেসে বললেন, “শুনলাম ছোট জা তো এই বাড়িতে তুলকালাম ঘটিয়ে দিয়েছে? খবর পেয়েই চলে আসলাম। দেখি কার জোর কত!”
আমি এই কথা শুনে শুধু হেবলার মতো তাকিয়েই ছিলাম ।
চলবে…
