#নতুন_শাড়ি
#অন্তিম_পর্ব
#ইলোরা_ফারদিন
সকাল থেকেই দাদি চিল্লাচিল্লি শুরু করেছেন মা কেনো এখনো রান্না ঘরে যায় নি। তার ক্ষুধা লাগছে। আরো কত কি!
এদিকে বাবা মাথা নিচু করে সোফায় বসে আছেন। শুক্রবার হওয়ায় আজ বাবা বাসাতেই।
জসিম বুঝে উঠতে পারে না যে এতো বছর জবা চুপচাপ সব মেনে নিত,কিন্তু কাল হঠাৎ করে তার কি হলো। সামান্য শাড়ির জন্য এতো কাহিনি! সে যেয়ে বেশ কয়বার জবাকে ডাক দিলেও জবা তার উত্তর দেয় নি। বাধ্য হয়ে জবাকে টেনে তুলে রাগ দেখিয়ে বলেছিল,” এসব তেজ আমাকে দেখাবে না, আম্মার ক্ষুধা লাগছে, তাড়াতাড়ি খাবার বানাও।”
জবাও তাচ্ছিল্য হেসে বলেছিল,” বাহ! রাতে হোটেল থেকে আনা মুরগীর রোস্ট দিয়ে তো সবাই মজা করে ভাত খেয়েছেন। তবু এতো ক্ষুধা।
আর আমি যে সারারাত না খেয়ে আছি, সে খবর কি নিয়েছেন? কালকে যখন খাবার কিনে আনলেন আমার ভাগেরটা কোথায়??
হাহ! যারা আমার ক্ষুধার খোজ রাখে না তাদের জন্য সকাল সকাল আমি নিজের ঘুম নষ্ট করতে পারব না।”
এরপর জসিমের আর বলার কিছুই থাকে না। সে চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে আসে। অবশ্য কাল সে জবার জন্যও রোস্ট এনেছিল। কিন্তু তার মা আর বোন মিলে সেই পিসটা খেয়ে ফেলেছে৷ জসিম তাদের মানা করতে পারে নি।
।।।।।।।।।
একটু আগেই জসিম সবার জন্য হোটেল থেকে পরোটা এনেছে। জবা এখনো ঘরেই বসে আছে।
কিন্তু জসিম সাহস পাচ্ছে না মায়ের সামনে জবাকে ডাকার। বাধ্য হয়ে ছেলেকেই বলল,”যা তা শামিম, তোর মাকে যেয়ে ডেকে আন।”
কিন্তু আমি যেতে না যেতেই দাদি আমাকে থামিয়ে দিল। তারপর হিসহিসিয়ে আব্বাকে বললো,” এতো দরদ বউয়েত জন্য? আর সকাল থেকে যে তোর বউ আমাকে না খাওয়ায় রাখছে, তখন তোর মন পুড়ে নাই? বউয়ের গোলাম হইছিস?”
ব্যাস, দাদির কথায় আব্বা থেমে গেলেন। সে দাদির উপরে কথা বলতে পারে না আর। তাই চুপচাপ আবার খেতে লাগলেন।
আমাদের খাওয়া শেষ হতে না হতেই বড় ফুপুর আগমন ঘটে। বোঝার বাকি নেই যে দাদি আগেই ফুপুর কানে সব কথা মশলা মিশিয়ে ঢেলে দিয়েছে।
ফুপু কারো সাথে কথা না বলেই মায়ের ঘরে চলে গেল। তারপর মায়ের চুল টেনে ধরে মাকে ঘর থেকে বের করে আনলো। তারপর মাকে ছুড়ে ফেললো মেঝেতে।
একেতো মায়ের শরীর পাতলা, তার উপর কাল রাত থেকে সে না খাওয়া। দুর্বল শরীরে মুখ থুবড়ে পরলো সে। আঘাত পেল ঠোটে আর কপালে। কপাল ফুলে গেল সাথে সাথেই আর ঠোট চুইয়ে পরতে লাগলো র*ক্ত।
আমি দৌড়ে মাকে বাচাতে আসতে চাইলে দাদি আমার হাত ধরে ফেলল। তারপর ফুপুকে বলল, ” মার এই কাল নাগিনীরে মার।”
ফুপুও মাকে নোংরা গালি দিতে দিতে এলোপাতাড়ি মারতে লাগলো।
আম্মা শুধু অসহায় চোখে আব্বার দিকে কয়েকবার তাকালো। সেখানে যেন তার সামনে তেরো বছরে ভঙ্গুর সম্মানহীন সংসারটাই ভেসে উঠলো।
শেষে না পেরে আব্বা ফুপুকে থামাতে গেলে ফুপু চেচিয়ে বলে,” একদম আমাকে থামাতে আসবি না ভাইয়া। তুই হইলো আস্ত একটা কাপুরুষ। তোর বউ আমাকে আমার মাকে হিংসে করে, আর তুই চুপ করে থাকিস? কোন সাহসে তোর বউ আমার মাকে না খাওয়ায় রাখলো? পাখনা গজাইছে ওর? ফকিন্নির বাচ্চা একটা।
আর তুই ভাইয়া। তোর তো উচিত ছিল কালকেই তোর বউয়ের মাজা ভাঙে দেয়া। তুই আসলেই একটা কাপুরুষ। ” বলেই মাকে আবার মারতে শুরু করলো।
এদিকে আব্বা এসবে বিরক্ত হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পরলো।
আম্মা শুধু তাচ্ছিল্য হেসে আব্বার চলে যাওয়া দেখলো।
এদিকে ফুপু ইচ্ছা মতো মাকে পিটিয়ে দাদির রূমে চলে গেল। দাদি আর ছোট ফুপিও তার পিছু পিছু গেল।
দাদি যেতেই আমি মাকে টেনে তুললাম। তারপর মাকে পানি দিলাম। মা কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো। তারপর কিছু না বলেই বাড়ির বাহিরে চলে গেল।
পাক্কা এক ঘন্টা পর মা ফিরলো। কিন্তু একা না, সাথে ছিল এক গাদা পুলিশ। মা সবার নামে নারী নির্যাতনের মামলা করে এসেছে। ফুপিরা তো ভয়ে কেদে কেটে কাহিল। কোনোদিন কল্পনাও করে নি মা এতো বড় সিদ্ধান্ত নিবে।
এদিকে বাসায় পুলিশ এসেছে শুনে আব্বাও দৌড়ে আসলেন। আব্বাকে দেখে দাদি কাদতে কাদতে বললেন,” এই বাপ দেখ না তোর বউ এগ্লা কি পাগলামি করতেছে। এই বয়সে আমাকে জেলে পাঠাবার চায় বাপ। কিছু কর।”
আব্বা মাকে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই সে আব্বাকে থামিয়ে দিল। তারপর বলল,” যে পুরুষ চোখের সামনে তার স্ত্রীকে মার খেতে দেখেও চুপ করে থাকে, তার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই। তালাকের নোটিশ শীঘ্রই পেয়ে যাবেন।”
আব্বা হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,” সামান্য একটা নতুন শাড়ির জন্য তুমি এতো বড় কাহিনী ঘটলে জবা। আমাকে তালাক পর্যন্ত দিতে চাচ্ছ।”
মা ম্লান হেসে উত্তর দিল, ” বিষয়টা নতুন শাড়ির না, বিষয়টা আমার অস্তিত্বের, আমার সম্মানের।”
এরপর পুলিশ দাদি, বাবা, ফুপুদের নিয়ে গেল।
আর আমি মা পা বাড়ালাম নানা বাসার দিকে। যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক নতুন সংগ্রাম। কিন্তু মায়ের বিশ্বাস আমরা পারব!
সমাপ্ত
