Saturday, June 6, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রণয় প্রত্যাবর্তনপ্রণয় প্রত্যাবর্তন পর্ব-১৫+১৬

প্রণয় প্রত্যাবর্তন পর্ব-১৫+১৬

#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১৫]
~আফিয়া আফরিন

মকবুল রহমানের হৃৎস্পন্দন প্রতিটা সেকেন্ডের সাথে বাড়ছে। ফোনটা তার হাতের তালুতে বারবার কেঁপে উঠছে। সেই অপরিচিত নাম্বার থেকে একের পর এক খুদেবার্তা আসতে শুরু করেছে, ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য মায়াজালে কেউ তাকে আটকে ফেলেছে। নতুন মেসেজ এল: “সামনে যে সরু কালভার্টটা দেখছেন, ওটা পার হয়ে বামে মোড় নিন। খবরদার, পিছু ফিরবেন না। আমার চোখ আপনার ওপরেই আছে।”

মকবুল রহমান ঘামতে ঘামতে কালভার্টটা পার হলেন। চারপাশ এতই নিস্তব্ধ যে নিজের পায়ের শব্দেই তিনি চমকে উঠছেন। কিছুদূর যেতেই আবার ফোনটা বেজে উঠল। এবারের ইন্সট্রাকশন আরও সুনির্দিষ্ট: “ডানদিকের ওই জরাজীর্ণ আমবাগানটার ভেতরে ঢোকেন। বাগানের মাঝখানে একটা ভাঙা ভিটা আছে, সেখানে গিয়া দাঁড়ান।”

জমিদার মনে মনে ভাবছেন, কে এই লোক? সে কি তবে এই অন্ধকারের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে? পিস্তলটা ড্রয়ারে না পেয়ে তার ভেতরটা বারবার কুঁকড়ে যাচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে, কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছেন না তো? কিন্তু খুনি যে শর্ত দিয়েছে, ছেলের জীবন বাঁচাতে হলে তাকে আজ খুনি হতেই হবে। বাগানের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। বুনো লতাপাতা তার পাঞ্জাবিতে আটকে যাচ্ছে। ঠিক তখনই স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল: “থামুন। ভিটার ওপর একটা ছালা দিয়ে ঢাকা বস্তু রাখা আছে। ওটা খোলেন। ওইখানে আপনার আজকের শিকারের নাম আর অস্ত্র আছে। দেরি করবেন না, সময় বয়ে যাচ্ছে।”

মকবুল রহমান থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সেই ছালাটার দিকে হাত বাড়ালেন। তার সারা শরীর কু ডাকছে। এই অদৃশ্য নির্দেশের শেষ কোথায়? কার নাম লেখা আছে ওই কাগজে?
.
হাসপাতালের সাদা দেোয়াল আর ফিনাইলের কটু গন্ধের মাঝে মৃন্ময়ীর যখন জ্ঞান ফিরল, তখন অনেক রাত। জ্ঞান ফিরতেই ও ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে উঠল, “আগুন আগুন!”
বেডের পাশে বসে থাকা অনিন্দিতা রায় দ্রুত মৃন্ময়ীর হাত ধরলেন। তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটোয় কোমলতা। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “শান্ত হও মৃন্ময়ী। আমি অনিন্দিতা রায়, পুলিশ অফিসার। তুমি এখন নিরাপদ।”

মৃন্ময়ী কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর অনিন্দিতার হাত খামচে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। ওর সেই কান্নায় আর্তনাদ আর শিশিরের শেষ স্মৃতিটুকু মিশে ছিল। অনিন্দিতা ওকে কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার সময় দিল, তারপর হাতে একটা নোটবুক নিয়ে বলল, “মৃন্ময়ী, তোমার সাথে যা হয়েছে তা আমি জানি। কিন্তু আমার বয়ান দরকার। ওই ইটভাটায় ঠিক কী ঘটেছিল? তাওহীদ কেন তোমাদের আটকে রেখেছিল?”

মৃন্ময়ী ভেজা গলায় অস্ফুট স্বরে সব বলতে শুরু করল। তাওহীদের কুপ্রস্তাব, শিশিরের উপর অমানুষিক নির্যাতন। শিশিরের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে ও বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। বলল, “উনি নিজের জীবন দিয়া আমারে বাঁচাইছে। ওনার সারা শরীর রক্তে মাখা ছিল, হাতগুলা কাটা ছিল… তাও উনি আমারে জানালার বাইরে ঠেল্লা দিছে। উনি পুইড়া মরছে, আমার চোখের সামনে!”

অনিন্দিতা চোয়াল শক্ত করে সব লিখে নিচ্ছিল। মৃন্ময়ী হঠাৎ করে শিউরে উঠল। বলল, “আরেকটা কথা। তাওহীদ খুব ভয়ঙ্কর। ও ওর নিজের ভাই তাহমিদরেও ছাড়ে নাই। তাহমিদ ভাই আমাদের বাঁচাইতে চাইছিল বইলা তাওহীদ ওনারে মারধর করছে আর একটা ঘরে শক্ত কইরা বাইন্ধা রাখছে। তারপর উনি হঠাৎ উধাও হইয়া গেল।”

অনিন্দিতা রায় উঠে দাঁড়াল। জমিদার বাড়ির ভেতরে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, রীতিমতো একটা টর্চার সেল চলছে। তাহমিদ যদি এখনো বেঁচে থাকে, তবে তাকে উদ্ধার করা আর তাওহীদকে গ্রেফতার করার এটাই মোক্ষম সুযোগ। অনিন্দিতা রায় আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরে দাঁড়ানো সাব-ইন্সপেক্টর রকিবুলকে কড়া গলায় নির্দেশ দিলেন, “রকিবুল, ফোর্স রেডি করো। এখনই আমাদের জমিদার বাড়িতে রেইড দিতে হবে। আমাদের প্রাইমারি টার্গেট তাওহীদ। ওকে যেখান থেকে পারো খুঁজে বের করো। আর হ্যাঁ, তাহমিদ উধাও বলে খবর পেয়েছি। ওকে খুঁজে বের করা চাই-ই চাই। কুইক!”

রকিবুল স্যালুট দিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। পুরো হাসপাতাল এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বেড়ে গেল। অনিন্দিতা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর কেবিনে ঢুকল ইয়াসিফ। মৃন্ময়ী তখনো ঘোরের মধ্যে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। ইয়াসিফকে দেখে ধরা গলায় বলল, “সব তো হারাইলাম। উনারেও বাঁচাইতে পারলাম না।”

ইয়াসিফ মৃন্ময়ীর বিছানার পাশে রাখা টুলে বসল। তার মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর। নিচুস্বরে বলল, “শান্ত হও মৃন্ময়ী। যে গেছে তারে তো ফেরানো যাবে না, কিন্তু যে অপরাধ করছে তার সাজা তো পেতেই হবে। এই সবকিছুর শেষ আজকেই হবে।”

মৃন্ময়ী তার চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে করতেছে এসব? তাওহীদরে বাঁচায়ে রাখছে কেন?”

ইয়াসিফ জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল, “তাওহীদ তো একটা খুঁটি মাত্র। আমি বোধহয় বুঝতে পারছি কে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। খুন-খারাবি, একের পর এক খেলা সাজানো, সবকিছুই একজনেরই নিখুঁত পরিকল্পনা।”

মৃন্ময়ী অস্থির হয়ে উঠল। ইয়াসিফের হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, “কে সে?”

ইয়াসিফ আলতো করে মৃন্ময়ীর হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগোতে এগোতে শুধু বলল, “এখনই বলব না। সময় খুব কম। আমি আসছি, তুমি সাবধানে থাকো।” কথাটা বলেই ইয়াসিফ দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। মৃন্ময়ী স্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল বিছানায়। ইয়াসিফ তবে কী জানে? কার কথা সে ইঙ্গিত করল? আর সে নিজেই বা এই রাতে কোথায় গেল?
.
চেয়ারম্যান বাড়ি শোকের মাতম শেষে নিস্তব্ধ হাহাকার পাথর হয়ে জমে আছে। উঠোনে একসময় গ্রামের মানুষের আনাগোনা ছিল, আজ সেখানে কেবল কান্নার গোঙানি। চেয়ারম্যান বারান্দার খুঁটি ধরে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন। তার সমস্ত দম্ভ, সমস্ত প্রভাব আজ মাটির সাথে মিশে গেছে। বছরখানেক আগে তার কলিজার টুকরা অরুনিমা গেল। লোকে কইলো অপঘাত, আত্মহত্যা! আর আজ শেষ ভরসা শিশিরও চইলা গেল? বাড়ির কর্ত্রী পাগলের মতো সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর অরুনিমা ও শিশিরের ছোটবেলার জিনিসপত্রগুলো বুকে জড়িয়ে ধরছেন। চিৎকার করে বলছেন, “কার অভিশাপ লাগল আমার ঘরে? আমার বুকের ধনগুলারে কে মারতাছে?”

গ্রামের মহিলারা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কার সাধ্য সেই শোক থামায়? অরুনিমা ছিল এই বাড়ির প্রাণ, ওর অকাল মৃত্যুতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা শিশিরের আদর্শ আর সেবায় কোনোমতে ঢাকা পড়েছিল। কিন্তু বছরখানেকের ব্যবধানে জমিদার বাড়ির পৈশাচিকতায় সেই দুই ভাইবোনই আজ নেই। চেয়ারম্যান সাহেবের আফসোসের সীমা নেই।
.
অরুনিমা আর অরুনিমা নেই, সে এক জ্যান্ত চণ্ডী। রাতের আঁধারে জঙ্গল চিরে ও যখন এগোচ্ছিল তখন চোখেমুখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল প্রতিশোধের আদিম তৃষ্ণা। আজ প্রণয় বাড়িতে নেই, এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছে। শান্তর জ্বরের ঘোরে কান্নার শব্দ তার কানে বাজছিল, কিন্তু অরুনিমা বরাবরই পাষাণ। পাশের বাড়ির মহিলার কাছে শান্তকে গছিয়ে দিয়ে সে যখন ঘর থেকে বের হয়েছে, হাতে ধরা ছিল সেই ধারাল অস্ত্রটা যেটা দিয়ে আজ জমিদার বংশের পাপের চ্যাপ্টার শেষ করবে। অরুনিমার আলুলায়িত চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে, পরনের শাড়িটা কোমরে শক্ত করে গিঁট দেওয়া। তার রণংদেহী রূপ দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে শ্মশানকালী জেগে উঠেছে। বনফুলের কাঁটা তার পায়ে বিঁধছে, শাড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে লতাপাতায়, কিন্তু ওর লক্ষ্য স্থির। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলছে, “তাওহীদ! তুই ভাবছস অরুনিমা মইরা গেছে? আমি মরি নাই রে জানোয়ার! আমি তোর যম হইয়া ফিরছি। আমার ভাইরে যে আগুনে পুড়াইছস, সেই আগুনের শিখা নিয়া তোর বুকে কামড় দিমু আজ। আজ রাইতে তোর পালানোর পথ নাই।”

অন্ধকারে চোখজোড়া বাঘিনীর মতো জ্বলছে। অরুনিমা জানে, আজ হয়তো ও নিজেও বাঁচবে না কিন্তু তাওহীদকে না মেরে আজ সূর্যোদয় হতে দেবে না। জমিদার বাড়ির সিংহদরজাটা অদূরে আবছা দেখা গেল, অরুনিমার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ক্রুর হাসি। হাতের ছুরিটা চাঁদের আলোয় একবার ঝিলিক দিয়ে উঠল। যেন বলছে, “রক্ত চাই, অনেক রক্ত।”

জমিদার বাড়ির অন্দরমহল যখন পৈশাচিক খেলায় মত্ত, তখন সেই নিস্তব্ধ রাত চিরে সালেহা বেগম এসে পৌঁছালেন থানায়। সারা জীবনের আভিজাত্য আর পর্দার আড়াল সরিয়ে এই মাঝরাতে এসেছেন এক চরম সত্যের বোঝা বইতে না পেরে।
অনিন্দিতা রায় তখন বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সালেহা বেগমকে এই অবস্থায় দেখে তিনি অবাক হলেন। সালেহা বেগম কোনো ভনিতা না করে সরাসরি অনিন্দিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর কাঁপছে। তিনি বললেন, “ম্যাডাম, আপনি বিকেলে যে আংটিটা আমার ছেলেকে দেখাইছিলেন, সেটা আমি আড়াল থেকে দেখছি। ওই আংটিটা আমার। বহু বছর আগে আমার আলমারি থেকে ওটা হারায়া গেছিল। আমি ভেবেছিলাম কোনো কাজের লোক হয়তো অভাবের তাড়নায় চুরি করছে, তাই কাউকে কিছু বলি নাই। কিন্তু আজ বুঝতে পারতেছি, চোর আমার ঘরেই ছিল।”

অনিন্দিতা স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার গুণধর ছেলে তাওহীদ ওইটা সরাইছিল। সে যে অরুনিমার সর্বনাশ করার লাইগা আমারই আংটি ব্যবহার করব, এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না। নিজের পেটের ছেলের পাপ করছে ম্যাডাম। ওই আংটিরে একটা মেয়ের মৃত্যুর কারণ বানাইছে।” তারপর তিনি অনিন্দিতার হাত ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন, “ম্যাডাম, আমার ছেলেরে আপনি শাস্তি দেন। ও মানুষ না, ও একটা জানোয়ার। ওরে না আটকালে এই গ্রাম শ্মশান হইয়া যাইব। আমি আর মা হইয়া ওর পাপের বোঝা বইতে পারতাছি না।”

সালেহা বেগমের এই স্বীকারোক্তি অনিন্দিতার মামলার শেষ খুঁটিটাও গেঁথে দিল। আংটিটা যে তাওহীদেরই ছিল, তার অকাট্য প্রমাণ এখন পুলিশের হাতে। অনিন্দিতা রকিবুলকে ইশারা করে বললেন, “সালেহা বেগমের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো আর আমরা বেরোচ্ছি জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। আজ রাতেই সব মুখোশ খুলবে।”
.
মকবুল রহমান কাঁপাকাঁপা হাতে সেই ময়লা ছালাটা সরিয়ে দিলেন। নিচে রাখা একটি বস্তু দেখে তাঁর রক্ত হিম হয়ে গেল। সেখানে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই বরং পড়ে আছে একটা দীর্ঘ, ধারালো কুড়াল যার ফলাটা চাঁদের আলোয় চকচক করছে। কুড়ালের হাতলে লেগে থাকা কালচে দাগগুলো বলে দিচ্ছে, এটি এর আগেও রক্ত দেখেছে। কুড়ালের ঠিক নিচেই পড়ে আছে একটা চিরকুট। মকবুল রহমান ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে সেই চিরকুটের লেখাগুলোর ওপর চোখ বুলালেন,
“আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে আপনি সেই ব্যক্তিকে শেষ করবেন। দরকার পড়লে আপনার নিজের রক্ত দিয়ে সেই পাপ ধুয়ে ফেলুন। এই কুড়াল দিয়ে তার কলিজা ফালাফালা করবেন ঠিক যেভাবে আপনি একদিন পলাশ তালুকদারের ভিটা দখল করেছিলেন। মনে রাখবেন, কাল সকালে যদি এই ব্যক্তির লাশ না পাওয়া যায়, তবে তার বদলে আপনার কবরের মাটি খোঁড়া হবে।”

মকবুল রহমান নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। চিরকুটের প্রতিটি শব্দ তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। নিজের রক্ত দিয়ে পাপ ধুয়ে ফেলা? পলাশ তালুকদারের ভিটা? তার কথা কেউ কীভাবে জানবে? তিনি তো পলাশ তালুকদারের বংশ নির্বংশ করে ওই জায়গা-জমি, বাড়ি-ঘর দখল করেছিলেন। যাকে খুন করতে বলা হচ্ছে, সে লোক কে? তিনি ওই বিশাল কুড়ালটার দিকে তাকালেন। খুনি এমনভাবে চাল চেলেছে যে, মকবুল রহমান যদি লোকটাকে না মারে, তবে তাকে মরতে হবে। অন্ধকারের মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক তীব্র হয়ে উঠল। মনে হলো যেন কোনো অদৃশ্য আত্মা তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে, “দেরি করবেন না জমিদার মশাই, সময় বয়ে যাচ্ছে।”

মকবুল রহমান কুড়ালটা শক্ত করে ধরলেন। হাতের তালু ঘামে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আসছে। তিনি টলতে টলতে নির্দেশিত জায়গার দিকে এগোতে লাগলেন। আমবাগানের শেষ প্রান্তে, পুরনো সেই বিশাল জারুল গাছটার নিচে একটা আবছা ছায়া দেখা যাচ্ছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখলেন, সেখানে একটা মোটরসাইকেল দাঁড় করানো, আর তার ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে এক যুবক। যুবকটি অন্ধকারের দিকে মুখ করে বসে কী যেন একটা ভাবছে। এটাই সেই শিকার। একে শেষ করলেই তিনি মুক্তি পাবেন, রক্ষা পাবে তার জীবন। তিনি নিঃশব্দে পা ফেলে এগোতে লাগলেন। হাতের কুড়ালটা উঁচিয়ে ধরলেন। পৈশাচিক উন্মাদনা তার রক্তে খেলা করছে। ঠিক পেছন থেকে কোপটা দেওয়ার জন্য যখন তিনি লক্ষ্যস্থির করলেন, তখনই বাইকে বসা ছেলেটি হঠাৎ ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার জন্য নড়েচড়ে বসল এবং মুখ ঘোরালো। চাঁদের একফালি ম্লান আলো এসে পড়ল ছেলেটির মুখে। মকবুল রহমানের হাতের কুড়ালটা মাঝ আকাশেই থেমে গেল। তার সারা শরীর জমে পাথর হয়ে গেল। বাইকের ওপর বসে থাকা ছেলেটি আর কেউ নয়, তাওহীদ! তাওহীদ নিজের বাবাকে কুড়াল হাতে যমের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। চোখদুটো কপালে উঠে গেছে। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আব্বা! আপনি এখানে? এই রাইতে কুড়াল হাতে এইখানে কী করেন?”

মকবুল রহমানের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। তার চোখের সামনে তখন নিজের রক্ত, নিজের উত্তরাধিকার। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, “তুই? তুই এইখানে কী করস? তোরে মারতে পাঠাইছে আমারে?”

তাওহীদ আরও অবাক হয়ে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল, “মানে? আমারে মারবেন মানে? আমারে তো মেসেজ দিয়া এইখানে ডাকছে আপনারে বাঁচাইতে! কইছে আপনি বিপদে পড়ছেন!”
ওদের বুঝতে অসুবিধা হলো না, অদৃশ্য সেই মাস্টারমাইন্ড এক ভয়ানক মরণফাঁদ পেতেছে। পিতা আর পুত্রকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রক্তক্ষয়ী খেলার শেষ অংকে। বরং খোদ পিতাকেই দিয়েছে নিজের সন্তানকে বলি দেওয়ার হুকুম। তিনি আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন, “পালা পালা, তুই পালা। অনেক দূর চইলা যা।”
.
.
.
চলবে….

#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১৬]
~আফিয়া আফরিন

মৃন্ময়ী বিছানায় শুয়ে থাকলেও দুচোখে ঘুম নেই। পাশের টুলে রওশন আরা ক্লান্তিতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। মাকে ফাঁকি দিয়ে মৃন্ময়ী নিঃশব্দে বিছানা থেকে নামল। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে, ব্যান্ডেজ করা জায়গাগুলো দিয়ে বিরামহীন জ্বালা পোড়া হচ্ছে। সবকিছু পেরিয়ে ওর চেতনার গভীরে অন্য আগুন জ্বলছে। যখনই চোখ বুজছে, শিশিরের সেই যন্ত্রণাদায়ক মুখটা ভেসে উঠছে। আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রক্তাক্ত মানুষটা আর্তনাদ করে বলছে, “তুমি বেঁচে থাকো মৃন্ময়ী, অনেক বছর বেঁচে থাকো।”

ও মায়ের দিকে একবার তাকাল। শোকাতুর মা ঘুমিয়ে নেই, যেন যন্ত্রণায় মূর্ছা গেছেন। মৃন্ময়ী পা টিপে টিপে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরে দু-একজন নার্সের চোখ ফাঁকি দিতে পারল। পুলিশ কনস্টেবলেরা তন্দ্রাচ্ছন্ন। মৃন্ময়ী জানে না ও কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে তাওহীদকে খুঁজে পাবে। কিন্তু ওর ভেতরের অদৃশ্য শক্তি ওকে চালিত করছে। ও জানে, এই অন্ধকারের কোথাও না কোথাও সেই জানোয়ারটা লুকিয়ে আছে। অবশ পা দুটো আজ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। প্রতিটা পদক্ষেপে ও কেবল শিশিরের পোড়া গন্ধ পাচ্ছে।
হাসপাতালের গেট পার হয়ে সে যখন পিচঢালা অন্ধকার রাস্তায় পা রাখল, তখন ও কোনো সাধারণ গ্রাম্য মেয়ে নয়; ও উদ্দেশ্যহীন অথচ ধাবমান প্রতিহিংসা। হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু চোখে যে ঘৃণা জমা হয়েছে, তা যে কোনো অস্ত্রের চেয়েও ধারালো। মৃন্ময়ী বিড়বিড় করে বলল, “আপনি আমারে বাঁচাইয়া দিয়া গেছেন। এই জীবন দিয়া আমি কী করব যদি ওই পিশাচটা বুক ফুলাইয়া হাঁটে? আজ রাতে ওর নিশ্বাস আমি থামাব, নাইলে আমার নিশ্বাস মিছা হইয়া যাইব।”
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ও ধীরপায়ে জমিদার বাড়ির রাস্তার দিকে এগোতে লাগল। মৃন্ময়ী জানে না অরুনিমাও একই পথে এগোচ্ছে, ও জানে না মকবুল রহমান কুড়াল হাতে নিজের ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল জানে, আজ রাতে হিসেব মেলাতে হবে।
.
তাওহীদ আর একমুহূর্ত দেরি করল না। বাবার হাতের সেই ভয়ংকর কুড়াল আর চোখেমুখের উন্মাদনা দেখে তার মেরুদণ্ড দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই আমবাগান আর জারুল গাছের তলা আজ তাদের কারোর জন্যই নিরাপদ নয়। একটা অদৃশ্য মরণফাঁদ তাদের ঘিরে ধরেছে। সে বাইকটা ওখানেই ফেলে রেখে জঙ্গলের ঝোপঝাড় মাড়িয়ে অন্ধের মতো দৌড়াতে শুরু করল। ডালপালা মুখ আঁচড়ে দিচ্ছে, কাঁটায় পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যাচ্ছে কিন্তু তাওহীদের সেদিকে খেয়াল নেই। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, পালাতে হবে। এই অন্ধকার গ্রাম, পুলিশ-প্রশাসন আর এই রহস্যময় খুনি থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হবে। হন্যে হয়ে ছুটতে ছুটতে সে যখন বাগানের শেষ প্রান্তে একটা পুরনো ভাঙা মন্দিরের কাছে পৌঁছাল, তখন হঠাৎ গতি থমকে গেল। সামনের ছায়া থেকে ধীরপায়ে এক নারী মূর্তি বেরিয়ে এল।
তাওহীদ হাপাচ্ছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে চোখ বড় বড় করে সেই মূর্তির দিকে তাকাল। চাঁদের ম্লান আলো যখন সেই নারীর মুখের ওপর পড়ল, তাওহীদ আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে গেল। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল এই নিমিষেই। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর চুলগুলো আলুলায়িত, পরনের শাড়িটা ধুলো আর কাঁদার মাখামাখি আর হাতে একখানা ধারালো দা। তাওহীদ অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠল, “অ… অরুনিমা? তুমি? তুমি তো মইরা গেছ! তুমি এইখানে কীভাবে?”

সে ভাবল হয়তো অরুনিমার আত্মা হয়ত! কণ্ঠস্বর বুজে এল, তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। সেই নারী মূর্তিটি এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে। অরুনিমার চিরচেনা মায়াবী মুখটা আজ এক রণচণ্ডীর রূপ নিয়েছে। অরুনিমা শীতল গলায় বলল, “মরি নাই। তোর মরণ চাক্ষুষ দেখার লাইগা আমি জ্যান্ত লাশ হইয়া বাঁইচা আছি। আজ আমার ভাইরে তুই যে আগুনে পুড়াইছস, সেই আগুনের বদলা আমি নিতে আসছি।”

তাওহীদ আর্তনাদ করে পেছন ফিরতে চাইল, কিন্তু দেখল তার পালানোর সব পথ বন্ধ। অরুনিমার হাতের অস্ত্রটা অন্ধকারের মাঝে বিষাক্ত সাপের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। তাওহীদের মনে হচ্ছে সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। যে মেয়েটাকে সে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, সেই মেয়েটা আজ তার সামনে সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাওহীদ ঘামতে ঘামতে তোতলা গলায় বলল, “অরুনিমা… তুমি? না না, তুমি তো নাই। তুমি তো ভূত! তুমি আমার সামনে আসলা ক্যামনে?”

ও পৈশাচিক হেসে শান্ত গলায় বলল, “তুই ভাবছিলি নদীতে ঝাঁপ দিলেই অরুনিমা শেষ? নদীর স্রোত আমারে ফিরাইয়া দিছে। তোরে নরকে পাঠানোর আগ পর্যন্ত আমার মরণ নাই।”

তাওহীদ পালানোর জন্য এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। সে মিনতি করার সুরে বলল, “অরুনিমা, আমি ভুল করছি। আমি তোমারে বিয়া করছি না? আমি সব স্বীকার করুম।”

অরুনিমা খিলখিল করে হাসল। তবে সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল হাড়হিম করা ঘৃণা। বলল, “করুণা? তুই এখনও করুণা করোস আমারে? যখন আমার পেটের বাচ্চাডারে মারতে চাইছিলি, তখন তোর দয়া লাগে নাই? যখন আমার ভাইডারে পুড়াইয়া মারলি, তখন তোর বাঁচার কথা মনে ছিল না?”

তাওহীদ চিৎকার করে উঠল, “আমি মারি নাই! শিশির নিজে মরছে!”

অরুনিমা ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল, “চুপ কর জানোয়ার! তোর মুখে আমার ভাইয়ের নাম নিবি না। টাকা আর ক্ষমতা দিয়া তুই সব কিন্না নিবি তাইনা? দেখি, নে। আজ তুই একা তাওহীদ, এক্কেরে একা!” অরুনিমা দা-টা উঁচু করে ধরল। চোখে এখন আগুনের শিখা। হিসহিস করে বলল, “তুই আমারে বিক্রি করতে চাইছিলি না? আজ দেখ, নিজেরে বাঁচানোর লাইগা তুই ভিখারির মতো আমার পায়ে পড়ছস। যে নদীর পাড়ে তুই আমারে মরতে পাঠাইছিলি, আজ সেই নদীর পাড়েই তোর কবর খুঁড়ব আমি।”

অরুনিমা যে আজ কোনো দয়া দেখাবে না, তা তাওহীদ ভালো করেই বুঝল। সে জানপ্রাণ দিয়ে উল্টো দিকে দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে আরেকজন রক্তমাখা নারী মূর্তি বেরিয়ে এল। সে আর কেউ নয়, মৃন্ময়ী।

অন্ধকারের বুক চিরে মৃন্ময়ী যখন টলতে টলতে সেই জরাজীর্ণ মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন সম্মুখের দৃশ্য দেখে ও পাথরের মতো জমে গেল। একদিকে মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে থাকা তাওহীদ, আর তার সামনে উদ্যত অস্ত্র হাতে এক নারী। চাঁদের আলো যখন সেই নারীর মুখে এসে পড়ল, মৃন্ময়ীর মনে হলো হৃদপিণ্ড থমকে গেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। অস্পষ্ট গলায়, এক বুক বিস্ময় আর হাহাকার নিয়ে ও অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আপা? অরুনিমা আপা? তুমি… তুমি সত্যি?”

অরুনিমা তখন তাওহীদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। মৃন্ময়ীর কণ্ঠস্বর শুনে সামান্য মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ওর সেই রণচণ্ডী চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, কিন্তু হাতের অস্ত্রটা নামল না। মৃন্ময়ী এক পা এক পা করে এগিয়ে এল। সারা শরীরে কাঁপন ধরেছে। ও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “আপা, আমরা তো ভাবছিলাম তুমি আর নাই! ওই নদীর পাড়ে কত খুঁজছি তোমারে। মানুষে কইত তুমি না কি আর ফিরবা না। তুমি সত্যি বাইচ্চা আছো? তুমি জানো, তোমার ভাই তোমারে কত খুঁজছে?”

মৃন্ময়ী ভাইয়ের কথা বলতেই অরুনিমার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ও দাঁতে দাঁত চেপে তাওহীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “বাইচ্চা ছিলাম মৃন্ময়ী, কেবল এই দিনটার লাইগা। কিন্তু দেখ, আমার ভাইডারে এই জানোয়ারটা জ্যান্ত পুড়াইয়া দিল! আমি ওরে খুঁজতে খুঁজতে গ্রামে ফিরলাম, আর ফিরেই পাইলাম আমার ভাইয়ের পোড়া ছাই!”

মৃন্ময়ী অবাক হয়ে দেখছিল সেই শান্ত, মায়াবী অরুনিমা আপাকে, যে একসময় ওদের গান শেখাত, গল্প শোনাত। এই দীর্ঘ কয়েক বছরে অরুনিমা আপা মরেনি ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে থাকা সাধারণ সেই মেয়েটা মরে গিয়ে একটা প্রতিশোধের আগুন জন্ম নিয়েছে। তাওহীদ এই সুযোগে নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে চিৎকার করল, “মৃন্ময়ী! ওরে থামা! ও পাগল হইয়া গেছে! ও আমারে মাইরা ফেলব!”

মৃন্ময়ী তাওহীদের দিকে এক পলক তাকাল। ও অরুনিমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আপা, শিশির মরার আগে আমারে কইছিল বিচারের কথা। এই পিশাচের বিচার কোন আদালত করবে? তাই আজ আমি এসেছি। এই পিশাচের বিচার খোদ খোদা আমার হাতেই লিখে রাখছে।”
মৃন্ময়ী এতক্ষণ চাদরের নিচে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছিল। অরুনিমার তীব্র প্রতিহিংসার আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে ধীরহাতে বের করে আনল ভারী কুড়ালটি। ওটা হাতে নিয়ে মৃন্ময়ী যখন তাওহীদের দিকে এক পা এগোল, তখন তাওহীদের গলার স্বর আটকে গেল। তার সামনে এখন একজন নয়, দুজন প্রতিহিংসাপরায়ণ নারী। একজন যাকে সে মৃত ভেবেছিল, আর অন্যজন যাকে সে ছাই করতে চেয়েছিল। অরুনিমা আর মৃন্ময়ী দুদিক থেকে তাওহীদকে ঘিরে ধরল। তাওহীদ দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “না! আমারে ছাইড়া দাও, আমি সব দিয়া দিমু!”

অরুনিমা দা-টা তাওহীদের গলায় ছোঁয়াতে উদ্যত হতেই মৃন্ময়ী কুড়ালটা উঁচিয়ে ধরল। তৎক্ষণাৎ নিস্তব্ধ রাত চিরে একটা গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। গুলিটা সরাসরি এসে লাগল তাওহীদের হাতে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অরুনিমা আর মৃন্ময়ী চমকে গিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকাল। গাছের ঘন ছায়া মাড়িয়ে ধীরপায়ে বেরিয়ে এল দীর্ঘদেহী যুবক। তার পরনের শার্ট ছিঁড়ে রক্তাক্ত, কপালে চোটের দাগ, হাতে ধরা পিস্তল। সে আর কেউ নয়, তাহমিদ। মৃন্ময়ী বিস্ময়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “তাহমিদ ভাই! আপনে?”

তাহমিদ ধপধপে সাদা দাঁত বের করে এক ক্রুর হাসি হাসল। সে পিস্তলটা তাওহীদের দিকে তাক করে শান্ত গলায় বলল, “আমি উধাও হই নাই। আমি তো কেবল আমার শিকারের জন্য জাল পেতেছিলাম।”

তাওহীদ যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল, “ভাই… তুমি আমারে মারবা? আমি তোমার নিজের ভাই!”

তাহমিদ এক পা এগিয়ে তাওহীদের আহত হাতের ওপর বুট জুতো দিয়ে সজোরে চাপ দিল। তাওহীদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। তাহমিদ বলল, “ভাই?”
অন্ধকার বাগানে তিন জোড়া চোখ তাওহীদের মৃত্যদণ্ড কার্যকর করার জন্য স্থির হয়ে আছে।
.
ইয়াসিফ নিজ মস্তিষ্কে পুরনো স্মৃতির জট খোলার চেষ্টা করছে। ছয় বছর আগে। তখন ইয়াসিফ আর প্রণয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। প্রণয় এই গ্রামের ছিল না তবে যাতায়াত ছিল এখানে। মাস্টার হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ছিল। একবার গ্রামের এক চায়ের দোকানে বসে প্রণয় হুট করেই বলেছিল, “ইয়াসিফ, দুনিয়ায় আসল বিচার আইন করে না রে। আসল বিচার করে প্রকৃতি, আর প্রকৃতির হাত হয়ে মাঝেমাঝে সাধারণ মানুষকেও অস্ত্র ধরতে হয়। কেউ যদি আমার আপনজনের গায়ে হাত দেয়, আমি তারে এমনভাবে মারব যে সে বুঝতেই পারব না কে মারছে। এটাই পারফেক্ট মার্ডার।”

ইয়াসিফ এটাকে নিছক আড্ডা ভেবে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সেই পুরনো কথাগুলো তীরের মতো মাথায় বিঁধছে। হঠাৎ মনে পড়ল, জমিদার বাড়ির এবং এই বংশের প্রতি প্রণয়ের ঘৃণা রয়েছে। ভাসা ভাসা শুনেছিল, জমিদার বাড়ি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল, সেখানে একজন সাক্ষী হিসেবে প্রণয়ের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের নাম জড়িয়েছিল যাকে জমিদাররা গুম করে ফেলেছিল। তারমানে প্রণয়? প্রতিশোধের আগুন বুকে পুষে রেখেছে? প্রণয় নিজে সামনে আসেনি, বরং অদৃশ্য মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জমিদার পরিবারকে ভেতর থেকে টুকরো টুকরো করে ফেলছে। ইয়াসিফ দ্রুত বাইক স্টার্ট দিল।
.
আমবাগানের কিনারে মকবুল রহম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক তখনই অন্ধকারের আড়াল থেকে ধীরলয়ে হেঁটে এল প্রণয়। তার পরনে খুব সাধারণ পোশাক। এই বিভীষিকাময় রাতে তাকে দেখে মকবুল রহমান যেন আকাশ থেকে পড়লেন। চোখ কচলে তাকিয়ে বললেন, “আরে… তুমি? প্রণয় না? কত বছর পর দেখলাম! কই ছিলা বাবা এতদিন?”

প্রণয় ঠোঁটের কোণে চিকন হাসি ফুটিয়ে বলল, “চাচা, আপনাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেই ফিরে এলাম। কিন্তু আপনি এখানে এত রাতে? হাতে কি? কোনো সমস্যা? আপনি তো কাঁপছেন।”

মকবুল রহমান আমতা আমতা করে অস্ত্রটা লুকানোর চেষ্টা করলেন। তিনি কি বলবেন যে তিনি নিজের ছেলেকে খুন করতে এসেছেন? থতমত খেয়ে বললেন, “না মানে বাবা… ওই চোর-ছ্যাঁচোড় ধরতে আসছিলাম। গ্রামটা তো সুবিধার না।”

প্রণয় সব বুঝেও কিছু বোঝেনি এমনভাবে জোর খাটিয়ে বলল, “রাতের বেলা এই শ্মশানঘাটের পথে চোর ধরতে আসা আপনার বয়সে সাজে না চাচা। চলুন, আমি বাইকে করে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।”

মকবুল রহমানের তখন না করার উপায় ছিল না। তিনি কাঁপাকাঁপা শরীরে প্রণয়ের বাইকের পেছনে গিয়ে বসলেন। বাইক স্টার্ট দিয়ে প্রণয় খুব সহজ গলায় বলল, “চাচা, গ্রামে তো আজ অনেক কিছু ঘটে গেল। আপনার বাড়িও নাকি পুলিশ ঘেরাও করছে? এসব কিসের আলামত?”

মকবুল রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সব অভিশাপ বাপু, সব! শকুনের নজর লাগছে আমার সংসারে। বুঝছো বাবা, জহির মোল্লার ওই চরিত্রহীন মাইয়াগুলার জন্যই আজ আমার সোনার সংসারে আগুন লাগছে।”

বাইকের গতি বাড়িয়ে প্রণয় বলল, “তাই? জহির চাচার মেয়েদের দোষ?”

“আরে ওই কুলাঙ্গার মেয়েই তো সব নষ্টের মূল! নিজের ইজ্জত খুয়াইয়া মরছে, আর এখন আমার ছেলেটার পিছে পুলিশ লাগছে। মরা মেয়েমানুষের অভিশাপ বড় বিষ বাবা।”

প্রণয় ঠান্ডা গলায় বলল, “অভিশাপ তো লাগবেই চাচা। একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন ছারখার করে দিলেন। একটা ছেলেকে জ্যান্ত পুড়িয়ে কয়লা বানালেন, প্রকৃতি কি এত সহজে ছেড়ে দেবে? আপনি পলাশ তালুকদারকে যেভাবে শেষ করেছিলেন, আজ ঠিক সেভাবেই আপনার নিজের বংশ প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। হিসাবটা কি মিলছে চাচা?”

মকবুল রহমানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পলাশ তালুকদারের কথা এই ছেলে জানল কীভাবে? তিনি ভয়ে ভয়ে বললেন, “তুমি… তুমি এসব কী বলতেছ বাবা? আমি তো ভালো চাউর দিছি তোমারে।”

প্রণয় বাইকটা এক ঝটকায় বনের নির্জন প্রান্তে থামিয়ে দিল। ঘাড় ঘুরিয়ে মকবুল রহমানের চোখের দিকে তাকাল। ফিসফিস করে বলল, “পলাশ তালুকদার আমার বাবা। তার ভিটা দখল করতে গিয়ে তাকে সপরিবারে পুড়িয়েছিলেন, মনে আছে? প্রতীক তালুকদার আর আমি কেবল আমি বেঁচে গিয়েছিলাম। হা হা হা।”

মকবুল রহমান বাইক থেকে পড়ে গিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পেছাতে লাগলেন। প্রণয় বাইক থেকে নেমে ধীর পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে যাওয়া মকবুল রহমানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বনের নিস্তব্ধতা চিরে তার প্রতিটি কদমের শব্দ তার কানে যমদূতের ঘণ্টার মতো বাজছে। তিনি দুহাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “বাবা… আমারে ছাইড়া দাও… আমি তোমারে সব জমি ফিরাইয়া দিমু। আমারে মারিও না বাবা!”

প্রণয় কোনো কথা না বলে নিচু হয়ে মকবুল রহমানের কলার খামচে ধরল। হ্যাঁচকা টানে তাকে মাটি থেকে তুলে সোজা করে দাঁড় করাল। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে খুব যত্ন নিয়ে মকবুল রহমানের ঘামে ভেজা কপাল মুছে দিল, ঠিক যেভাবে কেউ তার প্রিয় পোষা প্রাণীকে আদর করে। ফিসফিস করে বলল, “উঠুন চাচা। এত তাড়াতাড়ি হাঁপিয়ে পড়লে চলবে? আপনার জন্য আমি অনেকগুলো দিন অপেক্ষা করছি। অত সহজে মারব কেন? আপনি তো আমার তৈরি করা এই বিশাল থিয়েটারের প্রধান দর্শক।”

মকবুল রহমান দাঁত কপাটি লেগে অস্ফুট স্বরে বললেন, “খু… খু… খুনগুলো কি তুমি করছো?”

প্রণয় শব্দ করে হাসল। মকবুল রহমানের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “হুম। আমিই করেছি। আপনার নাট্যমঞ্চে নাটক করেছি। আপনার কি আনন্দ হচ্ছে না চাচা?”

মকবুল রহমান ডুকরে কেঁদে উঠলেন। প্রণয় তার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে তিনি নড়তে না পারেন। বলল, “কাঁদবেন না চাচা, সিনেমা তো সবে শুরু। আপনার ড্রয়ার থেকে পিস্তলটা কে সরিয়েছিল জানেন? আপনার নিজের ছোট ছেলে তাহমিদ। সে আপনার পাপের সাক্ষী হতে চায়নি, সে চেয়েছে আপনার পাপের অন্ত করতে। আমি ওকে শিখিয়েছি, পিতাকে বাঁচাতে হলে পিতাকেই ধ্বংস করতে হয়।”

প্রণয় মকবুল রহমানের পিঠে হাত রেখে তাকে ঠেলতে ঠেলতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। বনবিড়ালের ডাক আর ঝিঁঝিঁ পোকার গুঞ্জনের মাঝে প্রণয়ের কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। বলতে লাগল, “যে আগুনের শিখায় আমার বাবা-মা পুড়েছিল, সেই আগুন আমি আজ আপনার কলিজায় জ্বালাব। আপনি ভাবছেন আমি আপনাকে এখনই মেরে ফেলব? না। আমি আপনাকে টেনে নিয়ে যাব সেই ভাঙা মন্দিরের সামনে, যেখানে আপনার ছেলে তাওহীদ এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। আপনি নিজের চোখে দেখবেন আপনার বংশের সূর্য কীভাবে অস্ত যায়।”

মকবুল রহমান অবশ হয়ে গেলেন। তার সামনে অন্ধকার বনটা যেন বিশাল একটা হাঁ করা মুখ, যা তাকে গিলে খাওয়ার জন্য তৈরি। প্রণয় তাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল সেই বধ্যভূমির দিকে, যেখানে অরুনিমা, মৃন্ময়ী আর তাহমিদ তাদের চূড়ান্ত শিকারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অথচ তিনি বারবার বলছেন, “আমারে ছাইড়া দাও! আমি তোর পায়ে পড়ি বাবা, আমারে ছাইড়া দাও!”

প্রণয় বরফশীতল গলায় বলল, “ছাড়ার জন্য তো আপনারে ধরি নাই চাচা। পলাশ তালুকদারও আপনার পায়ে ধইরা ওইদিন আর্তনাদ করছিল, মনে আছে? আপনি তো ছাড়েন নাই। আগুনে পোড়ার সময় মানুষ যখন চিৎকার করে, সেই শব্দটা যে কত করুণ, সেটা তো আপনি ভালোই জানেন।”

মকবুল রহমান এবার হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়লেন, “ওইডা একটা ভুল ছিল বাবা।”

“চলুন চাচা। দেরি করা যাবে না। সূর্য ওঠার আগেই আপনার সোনার ছেলের সাথে আপনার দেখা হওয়া দরকার। বাপ-বেটায় মিলে আজ নরকের টিকিট কাটবেন, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হইতে পারে?”
.
.
.
চলবে….

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ