#মরিচীকা
#অন্তিম_পর্ব
#মাকামে_মারিয়া
গায়ে সেলোয়ার-কামিজ, মাথায় লাল টকটকে ওড়নাতে ঘোমটা দেওয়া। তাযিন পাড়ার মার্কেট থেকে একটা রেডিমেড নাকের ফুল কিনে দিয়েছে। তার নিজের গায়েও টি-শার্ট আর প্যান্ট। দুজনের কাউকেই নতুন বউ আর বর দেখতে লাগছে না। কিন্তু নাজেরার মাথার সেই ওড়নাটার জন্য অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগছে। যে কারো নজরে পড়ে যাবে।
রিক্সা করে দু’জনে বাসায় ফিরছিল, সাথে টিয়ার খাঁচাটাও আছে। তাযিন তো টিয়া আর নাজেরাকে একসাথে পেয়ে মহাখুশি, খুব চিন্তায় ছিল এসে টিয়াকে জীবিত পায় কিনা। অনেক খুশী হলে বোধহয় মানুষ হাসতেও ভুলে যায়, ভেতরে সব খুশী আঁটকে আছে তাযিনের। স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগবে বুঝলো। পাড়াতে ঢুকেই নাজেরা ওড়নাটা খুলে ব্যাগে রেখে দিতে নিলে তাযিন ব্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে? ভালো লাগছে তো দেখতে৷ খুলে ফেলছিস কেনো?”
নাজেরা সাবধানী চোখে চারপাশে তাকিয়ে বললো, “মানুষজন দেখছে।”
“তাতে কি? দেখলে কি হলো? তুই চোর না ডাকাত?”
নাজেরা উত্তেজিত হয়ে বললো, “ওপস বাবা! তুই বুঝবি না। তোর মাথায় শুধু গোবর। মানুষজন নানান কথাবার্তা বলবে।”
তাযিন সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো, “আমরা বিয়ে করেছি নাজেরা! সেটা কতদিন লুকিয়ে রাখবি? মানুষেরা জানবে না? এমন লুকিয়ে রাখার কি হলো? লুকিয়েই যদি রাখবি তাহলে বিয়ে করার কি দরকার ছিল!”
নাজেরা হার মেনে নিলো। ওড়নাটা দু’হাতে নিয়ে তাযিনের দিকে তাকিয়ে আছে। রিকশা ওয়ালা মামাকে তাযিন বললো, “মামা ডানে গিয়ে বামে যান, ছায়ানীড়ের সামনে নামাবেন।”
নাজেরার হাত থেকে ওড়নাটা নিয়ে আবারও মাথায় পড়িয়ে দিলো। সুমধুর স্বরে বললো, “এতো ভয় পেলে চলবে? তুই না সাহসী! আগের তুই আর এখনের তুই তো এক না। এখন তোর সমস্ত দায়িত্ব আমার। কে কি বলে দেখে নিবো আমি।”
নাজেরা মুচকি হেসে বললো, “খুব দায়িত্ব নিতে শিখে গেছিস দেখছি!”
“এখন আর আপনি রুমাইসা নাজেরা আনজুম না, আপনি এখন মিসেস সরওয়ার। দায়িত্ব তো তাযিন সরওয়ারকে নিতেই হবে তাই না?”
নাজেরার ঠোঁট দুটো প্রশস্ত হয়ে আসলো, “হাসি পাচ্ছে লজ্জাও লাগছে কিছুটা। বিয়ে হয়েছে আর লজ্জা পাবে না ব্যাপারটা যেনো খাপছাড়া লাগে। একটু লজ্জা পেতেই হতো।”
বিয়ের মতো এমন চমকপ্রদ খবর বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখা যায় না। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জাহেরা নিহাল জামিনা তাহির আর নূরজাহান বসে আড্ডা দিচ্ছিল। আড্ডা বললে ভুল হবে, জাহেরা আর তার বোনের মুখটাই বেশি চলছে, জামিনা মাঝে মাঝে হা হু করছে। তাহির আর নিহাল নিরব দর্শক। নিহালের তো রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছিল এটা ভেবে যে বাড়ির কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই নাজেরাকে নিয়ে। মেয়েটা যে বাড়িতে নেই কারো হুঁশই নেই। কেবল তাহির একবার জানতে চেয়েছিল মায়ের কাছে, “আম্মু নাজেরাকে দেখছি না তো?”
জামিনা তাহিরকে উপেক্ষা করতেও চেয়েও পারেনি অস্পষ্ট স্বরে বলেছিল, “হয়তো কোনো বন্ধুর সাথে বেড়িয়েছে”।
তাহিরের বিশেষ পছন্দ হলো না মায়ের কথাটা। নাজেরা বন্ধুদের সাথে বাহিরে বেশিক্ষণ সময় কাটায় না। ওরকম মেয়ে সে নয়। বন্ধু বলতে শুধুই তাযিন, তাছাড়া ইয়া বড় কোনো ফ্রেন্ড সার্কেলও নেই তার।
ড্রয়িং রুমে তড়িঘড়ি করে ঢুকলো মানিক, কিছুটা হাঁপাচ্ছেও বটে। কিছু বলতে চায় বুঝা যাচ্ছে। তাহির একটু হকচকিয়ে গেলো, নিহালও চিন্তিত হলো কারণ দুজনের মনের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে বেশ কিছুক্ষন আগে থেকেই। একটা যুবতী মেয়ে বাড়িতে নেই, কল রিসিভ করছে না চিন্তা হওয়ারই কথা। তার মধ্যে মানিক যে ভাবে হাঁপিয়ে এসেছে বুঝাই যাচ্ছে খবর ভালো না।
জাহেরা শব্দ করে হাসতে হাসতে বলছিল, ” জানো আপু দুলাভাই বলছে তোমার বাচ্চা না হলে আরেকটা বিয়ে করবে।”
কথাটা নুরজাহানের বিশেষ পছন্দ হলো না। তাহিরও কি মনে করে জাহেরাকে মৃদু ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলো। বসা থেকে উঠে জিজ্ঞেস করলো, “মানিক কাকাবাবু কিছু হয়েছে?”
মানিক হাত কচলাতে কচলাতে বললো, “জ্বি বাবু! বাহিরে শুনে আসলাম নাজেরা মামুনি বিয়া করছে।”
তাহির যেনো জানতো এমন কিছু হতে পারে, সে খুব অবাক হলো না। পুনরায় বসে পড়লো সোফায়। যেই জামিনা চিৎকার করে কিছু বলতে যাবে ওমনি তাহির মা’কে থামিয়ে দিয়ে বললো, ” আম্মু! একদম চিৎকার করবেন না। যা করেছে বেশ করেছে। এর থেকে আর কি’বা আশা রাখেন আপনি?
তাহির হয়তো আরও কিছু বলতো কিন্তু সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা নতুন জামাই তাই থেমে গেলো। মানিককে জিজ্ঞেস করলো, “কাকা ছেলে কে বললে না তো? তুমি দেখেছো তাদের?”
মানিক বেশ উৎসাহিত হয়ে বললো, “ছেলে তো আমাগো তাযিন। দেখেছি বাবু,দেখেই তো আসলাম নিজ চোখে।”
তাহির স্মিত হেসে বললো, “যাক ছেলে ভালো।”
জামিনার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো, “আমার জানামতে সবচেয়ে বেশি খুশী হওয়ার কথা আপনার আম্মু। আর তুমি নুরজাহান, তোমারও তো খুশী হওয়া দরকার। তোমরাই তো চাইতে কবে মেয়েটাকে বিদায় করবে। যেনো খুব জ্বালাচ্ছে তোমাদের।”
নুরজাহান স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাহির সব সময় তাকে আদর যত্ন করে, মুখের কথাটুকু অব্দি বলে না। আর আজ কি-না কথা শুনাচ্ছে? বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় খুশী হয়েছে নাকি তার হৃদয়ের কোথাও কষ্ট হচ্ছে? হয়তো কষ্টই হচ্ছে, কিছু রাগ কষ্ট থেকে আসে।
জাহেরা বেশ এক্সাইটেড। নাজেরা বিয়ে করেছে এটা তো খুশীর খবর। তাও এমন হুট করে, একপ্রকার পালিয়ে বিয়ে করা যাকে বলে। জাহেরার এসবে ভীষণ আগ্রহ। তার কাছে এসব নস্টালজিয়া ব্যাপার স্যাপার। তাই তো নিজেও এমন নাটক করে বিয়েটা করলো। শুধু শুধু বেচারা কামরান হায়দারকে ইউজ করলো।
তাহির জাহেরা আর নিহালকে সাথে নিয়ে তাযিনদের বাসায় এসে উপস্থিত হলো। দরজা খুলে দিয়েছে নাজেরা। সমানেই ভাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চুপসে গেলো। তাহির বোনকে পরখ করলো। নাজেরার গায়ে মেরুন রঙের শাড়ি। সোফিয়া পুত্রবধূকে শাড়ি গয়না পড়িয়ে নতুন বউ সাজিয়ে রেখে দিয়েছে। আশেপাশের সবাইকে খবর পাঠিয়েছে, তার ছেলে বউকে যেনো এসে দেখে যায়, তাযিন একটু পর পর বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, কতক্ষণ নাজেরাকে দেখছে, কতক্ষণ মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। বেচারার এ সমস্ত কিছু ঠিক হজম হচ্ছে না। কি থেকে কি হয়ে গেলো আর তার মা-ও বউ নিয়ে কেমন আনন্দ-ফুর্তি করছে, চোখের।সামনে কি সব ঘটে যাচ্ছে মনে হচ্ছে স্বপ্ন।
আচমকা তাহিরকে আলিঙ্গন করেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো মেয়েটা। তাহির বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, “কান্না করছো কেনো নাজেরা! ভাই তোমাকে বকা দিবো না। যা করেছো ঠিক কাজ করেছো। যেই কাজ বড় ভাই হিসেবে আমার করার কথা ছিল সেটা তুমি করে ফেলছো। কান্না তো আমার করা উচিৎ, ভাই হিসেবে লজ্জিত তো আমি।”
নাজেরা কিছু বলতে পারলো না। মাথা উঠিয়ে খেয়াল করলো পিছনে জাহেরা আর নিহাল দাঁড়িয়ে। অবশেষে এই দৃশ্যটাও দেখতে হলো! মনে হচ্ছে সব ঝড়তুফান একসঙ্গে ঘটছে। কিন্তু জাহেরাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে দেখতে। নিহাল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে কিনা তাতেও সন্দেহ।
সোফিয়া আলাপ করছে তাহিরের সঙ্গে। জাহেরা চঞ্চল মেয়ে, সে সম্পূর্ণ বাসা ঝাপিয়ে বেড়াচ্ছে, এ রুম, সে রুম, বারান্দা ওয়াশরুম দেখছে আর প্রশংসা করে বলছে, “নাজেরা আপু কি সুন্দর তোমার শশুর বাড়ি। আমার তো শশুর বাড়িই নেই বুঝলে?
নাজেরা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বললো, “ভালোবাসার মানুষকে পেয়ে গেলে শশুর বাড়ি লাগে না জাহেরা।”
জাহেরা লজ্জা পেয়ে আবার পাখির মতো ডানাঝাপটে দৌড় দেয় অন্য রুমে। তাযিনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কি ব্যাপার নতুন জামাইয়ের মতো মুখ লুকিয়ে বসে আছো যে?”
তাযিন নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে, “নতুন জামাই তো তাই নতুন জামাইয়ের মতো বসে আছি।”
“নিজের বাসায় জামাইদের লজ্জা পেতে হয় না বুঝলে!”
“নিয়ম উল্টে গেছে, বউয়ের সামনে জামাইকে লজ্জা পেতে হয়। দেখছো না আমার বউকে দেখলেই আমি কেমন লজ্জা পাচ্ছি।”
জাহেরা খিলখিল করে হাসে, এরপর টিয়ার দেখা পেয়ে দৌড়ে যায় টিয়ার কাছে। তাযিনও যায় ওর সাথে, পাগলাটে মেয়ে যদি আদর করতে গিয়ে তাযিনের শখের টিয়ার গলা টিপে দেয় তাই পাহারাদার হিসেবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
নাজেরার ডান হাত কাঁপছে, খুব বেশি নার্ভাস হলে এরকমটা হয় সে খেয়াল করেছে। নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে। নিহালও বসে ছিল না, দক্ষিণের রুমের লম্বা বারান্দাটায় দক্ষিণে হাওয়া আসছিল সে সেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে। সোফিয়া নাজেরাকে পাঠালো ছেলেমেয়ে দুটোকে ডেকে নিয়ে আসতে নাস্তা দিয়েছে।
নাজেরা এসে নিহালকে ডাকলো, “আপনাকে ডাকছে।”
নিহাল একটু ভয় পেয়ে উঠলো, মনে হচ্ছে কোনো ধ্যানে ছিল। সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করলো, “কে ডাকছে?”
“সোফিয়া আন্টি।”
” তোমার শাশুড়ী হয় না?”
নাজেরা মাথা নাড়িয়ে অস্পষ্ট স্বরে বললো, ” হ্যাঁ।”
“তাহলে আন্টি কেনো বলছো? আম্মু বলবে না?”
“বলবো।”
“কখন?”
“একটু সময় লাগবে।”
নিহাল এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা তাচ্ছিল্য করেই বললো, “বিয়ে করে নিলে সময় লাগলো না, এখন হাসবেন্ডের মা’কে মা ডাকতে সময়ের প্রয়োজন!”
নাজেরা চোখ তুলে তাকালো নিহালের দিকে, অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করলেও বললো না। তাই এড়িয়ে গিয়ে মুচকি হেঁসে বললো, “জাহেরা কিন্তু মারাত্মক সুন্দরী। শাড়িতে দারুণ লাগছে না বলুন?”
নিহাল অপ্রস্তুত হলো, একটু নড়েচড়ে বললো, “হ্যাঁ সুন্দর লাগছে।”
নাজেরা অনেকটা সাহস যুগিয়ে বললো, “ওরে ভালোবাসতে বেশি সময় আপনারও লাগবে না।”
নাজেরা চলে গেলো, নিহাল তাকিয়ে আছে। সত্যি বলতে নাজেরাকে দেখে রাগ লাগছে। মায়া হয়নি একদমই। কেমন পর পর লাগছে। মনে হচ্ছে মেয়েটা অন্য কারো স্ত্রী। আপন লাগবেই বা কি করে? অথচ অপ্রিয় জাহেরার দিকে তাকালে মুখে যতই বলুক ঘৃণা করে কিন্তু নিজের মনে হয়,আপন আপন লাগে। রাতে যখন মেয়েটা হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গা স্পর্শ করে বাচ্চাদের মতো ঘুমায় তখন নিহাল নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে জাহেরা দিকে। একটু বেশিই পাগলাটে তবে সরল মনের। ফর্সা গালটা ছুঁয়ে দেয়, থাপ্পড় মেরে মেরে গালটা চেপ্টা করে ফেলছে মনে হয় দেখলে। ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে জাহেরা নড়েচড়ে উঠে, নিহালের বুকের উপর এসে মাথা রাখে ঘুম কাতুরে কন্ঠে বলতে থাকে, “তোমাকে ভালোবাসি নিহাল ভাই! তাই তো বিয়ে করেছি। ভালোবাসলে বিয়ে করতে হয় আমাদের ক্লাসের মালিহা বলেছে একথা।”
নিহাল নিজেকে সামলাতে চায়, হয়তো পারে না কিংবা পারেও। প্রথম প্রথম নাজেরা তাড়া করে বেড়াতো। এখন আর তেমন একটা তাড়া করবে না বলেই মনে হচ্ছে। মায়া লাগছে না আর, অন্যের স্ত্রীর জন্য মায়া লাগা উচিত নয়। মায়া লাগতে হবে নিজের স্ত্রীর জন্য যতই হোক বিয়ে করা স্ত্রী বলে কথা।
নিজেকে অনেকক্ষণ বুঝিয়ে নিহাল বিরক্ত হলো।সে জাহেরাকেও ভালোবাসতে চায়না। নাজেরাকেও মনে রাখতে চায়না। কিন্তু মন বলছে অন্য কিছু। মন বলছে ভালোবাসার রং বদলায়।
__________
তাযিন ইনিয়েবিনিয়ে নিহালের টপিক আনতে চায়। আজ সুযোগ পেয়ে আমতাআমতা করে বললো, “আচ্ছা নাজেরা! তুই নিহালকে ভালোবাসতি! হঠাৎ আমাকে বিয়ে করে নিলি যে!”
নাজেরা কিচেনে কাজ করতে করতেই জিজ্ঞেস করলো, “তুই খুশী হোস নাই?
“খুশীতে আমার তো নাচতে মন চাচ্ছিল। কিন্তু আমি ওই মূহুর্তে নাচতে ভুলে গেছি।”
নাজেরা হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করলো। কিন্তু তাযিন ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বউ মুখ লুকিয়ে হাসছে এই দৃশ্য পৃথিবীর প্রতিটি স্বামীর জন্য আরও একটু আহ্লাদ করার ঈঙ্গিত। তাযিনের সাহস একটু বাড়লো। সে আরও কাছে এসে বললো, “বললি না তো? নিহালকে ভুলে গেছিস?”
নাজেরা তাযিনের মুখের দিকে তাকাতেই তাযিন বললো, “আচ্ছা হয়েছে হয়েছে। কিছু বলতে হবে না। ভয় দেখাবি না আমায়।”
নাজেরা ময়দার গামলাটা পাশে রেখে তাযিনের টি-শার্ট টেনে কাছে এনে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো, “পুরুষদের এতো ভীতু হলে মানায় না। অন্তত আমার পছন্দ না। আমি তোর স্ত্রী, তুই আমার উপর অধিকার খাটাবি। তা না করে বিলাই হয়ে সামনে দাড়িয়েআছিস। আই ডোন্ট লাইক দিস মিস্টার সরওয়ার।”
তাযিন লাফিয়ে উঠে বললো, “ওকে ফাইন আমি এখন বিলাই না। আমি এখন বাঘ! মাননীয় স্ত্রী! আপনি এখন বলেন আপনি কি আপনার প্রাক্তন প্রেমিক’কে মন থেকে মুছে ফেলেছেন?”
নাজেরা শান্ত কণ্ঠে বললো, “কিছু বিষয় মন থেকে মুছে ফেলা যায় না কিন্তু আমাদের আগ্রহের কমতি দেখা দেয়।”
তাযিনের হিংসা হলো এটা ভেবে যে এই মেয়ে এখনো নিহাল কে মনে রেখেছে। সে একটু অভিমানী কন্ঠে বললো, তাকে যদি মনেই রাখবি তাহলে আমাকে বিয়ে করলি কেন?
” যার ভালোবাসার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি কেবল সে-ই ভালোবাসাকে নিজের করে পাওয়ার অধিকার রাখে। নিহালের থেকে বেশি আমার প্রতি তোর ভালোবাসা ছিল, আর আমার থেকে বেশি নিহালের প্রতি ভালোবাসা ছিল জাহেরার। বেচারি ইম্যাচিউর তো তাই ঠিকঠাক প্রকাশ করতে পারেনি”। কথাটা বলেই নাজেরা হাসার চেষ্টা করলো।
তাযিন অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে তার বিয়ে করা বউ নাজেরার দিকে। মেয়েটা বলে কি! জাহেরা ওর থেকেও বেশি ভালোবাসতো নিহালকে?
নাজেরা আরেকটু হেঁসে বললো, “আমি পড়েছিলাম অতল গহ্বরে। আমার পরিস্থিতি বুঝার মতো ক্ষমতা কারোই ছিল না বুঝলি! সবশেষে বুঝলাম অন্যায় আসলে আমারই ছিল। ”
তাযিন ব্রু কুঁচকে বললো, “তোর অন্যায় কেনো?”
“এই যে তোর এতো কাছে থেকেও তোকে বুঝতে না পারা অন্যায় না? জাহেরা নিহালকে ভালোবাসে সেটা জেনেও নিহালের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে নেওয়াও কি অন্যায় ছিল না?”
ততক্ষণে রুটি বেলে ছেঁকতে দেওয়া হয়ে গিয়েছে। চায়ের পাতিলে চিনি দেওয়া পানি ফুটছে। নাজেরার কন্ঠস্বর স্বাভাবিকের থেকেও যেনো আরও কয়েকগুণ স্বাভাবিক। তাযিনকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলো, “চা খাবি তো?”
তাযিন মুখ ফুটে কিছু বললো না কেবল মাথা নাড়ালো, সেই মাথা নাড়ানো নাজেরা দেখলো না। সে রুটি বেলাতে ব্যস্ত। তাযিন একটা ধাক্কা খেলো যেনো। কত কিছু সামলায় মেয়েটা। যার মুখ দেখে কিছু বুঝার উপায় নেই অথচ হৃদয়ে কি ভীষণ যন্ত্রণার আনাগোনা। তাযিনের ইচ্ছে করছে বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে কিন্তু নাজেরা আর আগাবে বলে মনে হচ্ছে না।
গতকাল রাতে দানিশ সরওয়ার বাসায় ফিরেছে, প্রায় ছয় মাস পর বাসায় এসেছে। পুত্রবধূকে দেখতে আসতেই হতো। একা আসেনি সাথে করে খুব কাছের বন্ধু নাসিরকেও নিয়ে এসেছে। আসতে আসতে বলেছে, “চল বন্ধু আমার পুত্রবধূকে দেখবি চল”। নাসির বরাবরের মতোই শান্ত প্রকৃতির মানুষ, দানিশ আর জহিরই ছিল অনেক টা চঞ্চল।
বাবাও সকালের নাস্তা এ বাসায় করবে শুনে নাজেরা বায়না ধরেছে সে নাস্তা বানাবে। সোফিয়া তাই স্বামীর সাথে মর্নিং ওর্য়াকে বের হয়েছে। তারা ফেরার আগেই নাজেরাকে নাস্তা রেডি করতে হবে।
নাজেরা একটু তাড়াহুড়ো করেই কাজ করছিল। তাযিন পাশেই দাঁড়িয়ে। চায়ের কাপ তাকে দেওয়া হয়েছে সে একটু পর পর চায়ে চুমুক দিচ্ছে। নাজেরা কাজের মধ্যেই জিজ্ঞেস করে নিলো, “চা কেমন হলো?
“ভালো হয়েছে।”
“শুধুই ভালো?’
“না অনেক ভালো।”
নাজেরা তাযিনের দিকে তাকিয়ে বললো, ” তোর কি মন খারাপ জিলাপি?”
“না।
নাজেরা অবাক হলো, জিলাপি ডাকলাম রেগে গেলি না তো?”
“আমি এখন আর বাচ্চা না। আর আব্বু বলেছে আমাকে তুমি করে ডাকতে আমি তোর স্বামী। স্বামীকে তুই করা বলা অনুচিত।”
নাজেরা মুচকি হেঁসে বললো, “ঠিকাছে স্বামী।”
তাযিন চায়ের কাপ বেসিনে রেখে উঠে দাঁড়ালো। কেমন আমতাআমতা করছে ছেলেটা। নাজেরা বিরক্ত হয়ে বললো, “এমন ঘুরঘুর করছিস স্যরি করছো কেনো স্বামী?
তাযিন উল্টো হাতে মুখ মুছে বললো, ” ইয়ে মানে একটা আবদার করতাম।”
“করুন শুনি।”
“কাজ শেষ হলে একটু এদিকে আয়, না মানে আসো জারুলতা।”
নাজেরা টেনে টেনে বললো, “আমার কাজ শেষ হয়নি মিস্টার সরওয়ার। কি বলবেন এখানেই বলেন।”
এক মূহুর্তও দেরি না করে পিছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো নাজেরাকে। নাজেরা ভড়কে গিয়ে বললো, ” কি করছিস?
“একটু জড়িয়ে ধরতেই তো চাচ্ছিলাম।”
“কাজ করছি তো আমি।”
“আচ্ছা আরেকটু জড়িয়ে রাখি। এরপর চলে যাবো।”
নাজেরা নিঃশব্দে হাসলো। খুব করে মনে হলো সে সুখী। মনে হচ্ছে এককোটি বছর পর সুখের আলিঙ্গন মিলেছে তার জীবনে। যে সুখ পাওয়ার আশায় সমুদ্রে ঝাপ দিয়েও সুখ মিলেনি সেই সুখ তীরেই ছিল, কাছে ছিল, নিকটে ছিল। কিন্তু দেখতে পায়নি। অবশেষে সুখের দেখা মিললো, খুব করে উপলব্ধি করলো ভালোবাসার রং বদলায়, নাজেরা এখন তাযিনকে ভালোবাসে। কি জানি হয়তো নিহালও তার পাগলাটে বউটাকে ভালোবাসে।
—সমাপ্ত।
