#মরিচীকা
#পর্ব ১৯
#মাকামে_মারিয়া
তাযিন পাশে এসে বসলো। জিজ্ঞেস করলো, ভালো আছিস?
নাজেরা বললো ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
ভালো আছি।
তুই কি করে জানলি আমি এখানে?
তাযিনের চোখ চারদিকে ঘুরছে। সে আশেপাশে তাকাতে তাকাতে বললো, মন বললো।
তোর মন আর কিছু বলে না?
বলে। আরও অনেক কিছুই তো বলে। কেন বল তো?
নাজেরা কিছু বললো না। চুপ করে বসে রইলো। বাতাসের তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে। এখন ভালো লাগছে। না হয় চোখে মুখে ধুলোময়লা পড়ে।
নিরবতা কাটিয়ে নাজেরা বললো, নিহাল বিয়ে করেছে জানিস!
তাযিন বললো, জানি।
নাজেরা অবাক হলো, কিন্তু বুঝতে দিলো না। তাযিনের দিকে তাকিয়ে বললো, কি ভাবে জানলি?
তাযিন সহজ স্বরে বললো, তোদের বাড়িতে গিয়েছিলাম তোকে খোঁজতে। নিহাল আর তার স্ত্রীকে দেখে আসলাম।
নাজেরা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললো, ওহ!
তাযিন বললো, তুই এখানে কেন?
নাজেরা সরাসরি বলে ফেললো, তুই আসবি বলে!
তুই জানতি আমি আসবো?
তাযিনকে অনুকরণ করেই নাজেরা বললো, মন বললো তুই আসবি।
তাযিন বুঝতে পারলো না মেয়েটার হয়েছে টা কি! নিহালের জন্য কষ্ট পাচ্ছে, কষ্ট পাবে সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু কিছু একটা হয়েছে। কেমন স্থীর হয়ে আছে। নিহালকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু করার মতো সময় এটা না৷ নাজেরার কষ্ট বেড়ে যেতে পারে।
মানুষের আনাগোনা কমছে আবার বাড়ছে। দুজনে চুপ করে বসে আছে। কেউ কিছু বলছে না। তাযিনের মনে হলো সে কিছু বলবে কিন্তু কি বলা উচিৎ বুঝে উঠতে পারলো না।
নিরবতা কাটিয়ে নাজেরা সহজ সরল কন্ঠে জিগ্যেস করলো, বিয়ে করবি আমায়?
তাযিন চমকে উঠলো, কন্ঠের জড়তা লুকিয়ে সহজ হওয়ার চেষ্টা করে বললো, মজা করছিস না তো?
মজা করবো কেনো? চল বিয়ে করবো তোকে।
নাজেরা তাযিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলছে, ব্যস্ত রাস্তা, চারদিকে মানুষ তাতে দুজনের কারোই নজর নেই। একজন তাকিয়ে আছে হাত ধরে রাখা সেই রমনীর দিকে,যাকে বড্ড এলোমেলো লাগছে। মুখশ্রী দেখেই টের পাওয়া যাচ্ছে যার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। তবে কি তাযিনের দায়িত্ব পড়বে সেই হৃদয়ের টুকরো গুলো কুড়িয়ে এনে শিউলি ফুলের মতো যত্ন করা?
প্রথমদিন নাজেরার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে মেয়েটার খিলখিল হাসির শব্দ পেয়েছিল নিহাল। আজও ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কানের মধ্যে সেই হাসির শব্দ তুলকালাম বাঁধিয়ে দিচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল একটু উঁকি মেরে দেখবে,সেদিনের মতো যদি ওই মায়াবী মুখখানা নজরে চলে আসে তাহলে মন্দ হবে না। কিন্তু উঁকি মেরে আশাহত হলো কারণ নাজেরার রুম ফাঁকা। সে নেই। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে ওমন মানুষও এ বাড়িতে নেই। জিজ্ঞেস করলেই দেখা যাবে প্রশ্নের জালে জড়িয়ে ফেলছে। নিহাল চায় তার না পাওয়া ভালোবাসা নাজেরাই ছিল এটা কেউ জানতে না পারুক। জানলে মেয়েটার জীবনে অশান্তি নেমে আসবে এমনিতেই অশান্তির শেষ নেই।
মালেকা ছাঁদ থেকে দুতলা হয়ে নামতে গিয়ে নিহালের সামনে পড়ে গেলো। নিহাল চট করে জিজ্ঞেস করে বসলো, আপনি নাজেরাকে দেখছেন কোথাও?
মালেকা ব্রু কুঁচকে তাকালো, এটা সেই লোক না, যে সেদিন রাতে নাজেরার বন্ধু নাম করে ঘরে এসেছিল! কন্ঠস্বরও তো অনেক মিল।
আপনে নাজেরা আম্ম..
নিহাল থামিয়ে দিয়ে বললো, জ্বি মানে আমি জাহেরার চাচাতো ভাই, মানে বিয়ে করেছি এখন আর ভাই না আর কি! নিহাল গুলিয়ে ফেললো সব কিছু।
নতুন জামাইর সামনে দাঁড়িয়ে আছে টের পেয়ে মালেকা আঁচলে মুখ ঢেকে বললো, ওহ জামাই! জাহেরার জামাই। নাজেরাকে খোঁজেন!
জ্বি! দেখতে পাচ্ছি না তো তাই।
মালেকা চলে যেতে যেতে বললো, আমরাও দেখতে পাচ্ছি না তাকে। আমি যাই কামের তাড়া আছে।
নিহাল কিছু বুঝতে পারলো না। ওনারাও দেখতে পাচ্ছে না মানে? কেউ কি মেয়েটার খোঁজ খবর রাখে না আশ্চর্য!
জাহেরা শাড়ি পড়েছে,সাথে তিন ইঞ্চি লম্বা হিল। হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে নিহালের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো, নিহাল আমাকে সুন্দর লাগছে না?
নিহাল এ বাড়ির মেহমান, তাও জামাই মানুষ। চাইলেই অভদ্রতা করতে পারছে না তাই দাঁত কিড়মিড় করে বললো, এক হাজার বার একই প্রশ্ন করেছিস!
জাহেরা আঁতকে উঠল, কি বলছো! মোটেও এক হাজার বার হয়নি। সবে এগারো বার জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু কোনো বারই তুমি আমার দিকে তাকাওনি। যতক্ষন না তাকিয়ে বলবে সুন্দর লাগছে ততক্ষণ প্রশ্ন করতেই থাকবো।
নিহাল বিরক্ত হলো, ফোনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। এমনিতে মেজাজ খারাপ, নাজেরার দেখা না পেয়েও অস্থির লাগছে আবার দেখা পেলেও অস্থির লাগবে। কি এক পরিস্থিতির মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে বেচারা, এদিকে মাথা খাওয়ার জন্য জাহেরা তো আছেই।
বরিশাল থেকে নাজেরার জন্য পাঠানো সেই লাল ওড়নাটা নাজেরার মাথায়,একটু পর পর ঘোমটা পড়ে যাচ্ছে। কখনো নাজেরাই ঘোমটাটা টেনে নিচ্ছে কখনো আবার তাযিন টেনে দিচ্ছে। কাজী অফিস থেকে বের হয়েই নাজেরা খেয়াল করলো তাযিন কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে ভয় পাচ্ছিস?
তাযিন দু’দিকে ঘাড় নাড়িয়ে বুঝালো ভয় পাচ্ছে না। ছেলেটাকে এখনো বাচ্চাদের মতো দেখাচ্ছে। নাজেরা বুঝতে পারলো হঠাৎ এ ভাবে বিয়ে করে হয়তো শকট হয়ে আছে। তাতে কি নাজেরার কিছু যায় আসে না। ওর তো আরও বড় কোনো শাস্তি প্রাপ্য ছিল, শুধু বিয়ে করাই না।
তাযিন বললো, এখন কোথায় যাবি? ইয়ে মানে যাবে?
নাজেরা ঘোমটা টেনে বললো, আমাকে এখন তুমি করে বলার ট্রাই করছিস নাকি?
তাযিন মাথা চুলকিয়ে বললো, বউকে তুই করে বললে ভালো দেখায় না।
নাজেরা মুখ ভেঙচিয়ে বললো, আমি তুই করেই বলবো, এমন কোনো শর্ত কিন্তু বিয়ের আগে ছিল না যে তুই করে বলা যাবে না। তাছাড়া আমি তোর পাঁচ মাসের বড়।
নাজেরা তাযিনের কয়েক মাসের বড় এটা শুনলেই তাযিনের প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হয়। সে এটা শুনতে চায় না। মনে হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে বাজে কথা এই একটাই।
নাজেরার ফোনটা বেজে উঠল তাযিনের থেকে একটু দূরে সরে এসে রিসিভ করে সালাম দিয়ে বললো, জ্বি আঙ্কেল বলেন।
ওপাশ থেকে হাসোজ্জল কন্ঠ ভেসে আসলো, এখনো আঙ্কেল? বিয়ে কি সম্পন্ন হয়নি?
জ্বি হয়েছে তো আঙ্কেল।
তাহলে পঁচা মেয়েটা আবারও আঙ্কেল বলছে যে? বাড়িতে এসে পিট্টুনি দিতে হবে বুঝতে পারছি।
নাজেরা স্মিথ হেঁসে বললো, আচ্ছা ধীরে ধীরে ঠিক করে নিবো। আব্বুকে সব বুঝিয়ে বলেছেন তো?
হ্যাঁ সে-সব বলা হয়ে গিয়েছে। নাসির তো মহাখুশি। তার মেয়েকে আমার মেয়ে করে নিয়েছি শুনে বেচারা যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচল। ঠিক যেমন ভাবে ছোট বেলা জামিনা ভাবির কাছ থেকে সোফিয়ার কাছে তোমাকে রেখে গেলে যতটা নিশ্চিন্ত থাকতো ততটাই।
নাজেরা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছনে তাযিনের দিকে তাকালো। তাযিন ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। হয়তো বুঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে! কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না। এই প্রথম শুধু নাজেরার কথা মতো সে তিন কবুল পড়েছে। না হয় আর কোনো কিছুই তার জানা নেই। তাযিনের চুপসে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে নাজেরা মিষ্টি করে হাসলো, যেনো ভীষণ ভাবে আশ্বাস দিয়ে জানান দিলো সব ঠিকঠাক। তাযিনের চোখ মুখ লাল টকটকে হয়ে আছে। নাজেরা এতোক্ষণে বুঝতে পারলো এই ছেলেটা মূলত লজ্জা পাচ্ছে। ঠিক এই মূহুর্তে নাজেরার মনে হচ্ছে বিরাট এই পৃথিবীতে ভালো থাকতে হলে খুব বেশি কাউকে লাগে না, তাযিনের মতো বন্ধু, সোফিয়া আন্টির মতো মায়ের মমতা, নাসির উদ্দীনের মতো বাবা, তাহিরের মতো বড় ভাই আর দানিশ সরওয়ারের মতো বাবা সমতুল্য একটা আঙ্কেল থাকলে সত্যি আর কিছু লাগে না, নাজেরার মনে হলো এরাই ওর কম্ফোর্ট জোন।
দানিশ আঙ্কেল তখনও ফোনের ওপাশে। নাজেরা জিজ্ঞেস করলো, আঙ্কেল আমরা কোথায় যাবো এখন?
দানিশ উচ্চস্বরে বললো, আরেহ! মেয়ে বলে কি! তোমাদের যাওয়ার জায়গার কমতি আছে নাকি! তোমার আন্টির কাছে চলে যাও। আমি কল করে বলে দিচ্ছি সে যেনো ছেলে আর বউমাকে গ্রহণ করে।
নাজেরা বললো, না না আঙ্কেল। আন্টিকে সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়?
দানিশ একটু ভেবে বললো, এতোবড় সারপ্রাইজ পেলে আমার বউটা স্টোক করে ফেলবে মামনি। তুমি কি চাও আমি এই ইয়াং বয়সে এসে বউ হারা হই?
নাজেরা উচ্চস্বরে না হেঁসে পারলো না। এই লোকটা বড্ড খোশমেজাজে। কঠিন পরিস্থিতিতেও হাসিয়ে দেয়। দানিশ বললো, আমি তাকে বলে রাখছি যে তার ছেলে বিয়ে করে ফেলছে। ছেলে ও বউ ঘরে ফিরলে ঝাঁটা পিটা না করে যেনো মেনে নেয়। কিন্তু কাকে বিয়ে করেছে সেটা সারপ্রাইজ থাকুক কেমন?
নাজেরা বললো, আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি এখন।
দানিশ সরওয়ার ওপাশ থেকে কলটা কেটে দিলো। নাজেরা তাযিনের পাশে এসে আবার দাঁড়ালো। বিয়ের সমস্ত বন্দোবস্ত দানিশ সরওয়ার করেছে। তা না হলে নাজেরার পক্ষে এতো কিছু সম্ভব হতো কি ভাবে! কিন্তু তাযিন সে এসবের কিছুই জানে না, সে এখনো ভাবছে এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে গেলো? এতো তাড়াতাড়ি পেয়ে গেলো নাজেরাকে? এটা স্বপ্ন নয়তো!
নাজেরা বললো, “কি ভাবছিস? এতো নার্ভাস কেন?
তাযিন মুচকি হেসে বললো, প্রথম বার বিয়ে করেছি একটু নার্ভাস তো থাকতে দে!
নাজেরা ব্রু কুঁচকে বললো, হ্যাঁ আর আমি তো হাজার বার বিয়ে করেছি তাই আমার মধ্যে নার্ভাস-নেস নেই।
তাযিন নাজেরা হাতটা চেপে ধরে বললো, “তুই আর আমি এক হলাম? তোর জীবন হচ্ছে একটা ট্রাজেডি! তুই বড্ড সাহসী। আমি কিন্তু সেটা না”।
“তুই সাহসী হলে আর আমার এ ভাবে বিয়ে করা লাগতো না। মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাক, ভালো বাসি টাসি বলা লাগবে না।”
নাজেরা কথা গুলো বলতে বলতে সামনে হাঁটা ধরলো। তাযিনের বুক কাঁপছে, এই মেয়ে সত্যি কিছু জেনে গেলো নাকি? না হয় এর মুখে তাযিনের জন্য ভালোবাসার কথা আসে কি ভাবে? এটা তো ভূতের মুখে রাম রাম হয়ে গেলো।
চলবে………!
