#ঝাঁঝ_লবঙ্গ |৩|
#লেখনীতে_মুসতারিন_মুসাররাত
-” আমার ছেলেটা আর আমার নাই রে। মা মরলে বাপ হয় তালই, আর ছেলে বিয়ে দিলে হয় পর। বড় ছেলেটা যেমন বউ নিয়ে বছরের পর বছর দূরে থাকে, আমার বাবুটা আজ এক বাড়িতে থেকেও যেন নেই। এই দিন দেখার জন্যই কি আল্লাহ আমাকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন?”
ছোট বোন আসতে না আসতেই সেই একই ভাঙা ক্যাসেট চালু করেছেন রোকেয়া। ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিল বিন্দু। সব কথা কানে না এলেও আফসোসের সুরটা ঠিকই পৌঁছাচ্ছে। কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। মনেমনে আওড়ালো,
-” ফোনে সেই একই কথা, সামনে পেলেও সেই একই হাহাকার। আল্লাহ! শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার জোগাড় আমার। অথচ এই মহিলার মুখ ব্যথা করে না।”
কাল বিকেলে সিমি এসেছে শুনে সকাল সকাল হাজির সোহানা। মেয়েকে দেখার বাহানা, অবশ্য আসল উদ্দেশ্য অন্য। এসেই দুই বোনের গুজগুজানি, ফিসফিসানি। বিন্দু সব বুঝেও এতক্ষণ চুপ ছিল। কিন্তু আর পারল না। হাতে ঝাড়ু নিয়ে বসার ঘরে ঢুকল সে। ঝাড়ু দিতে দিতে বলে উঠল,
-” এতই যদি ছেলে ছেলে করতেন, তাহলে ছেলেকে বিয়ে দিতে কে বলেছিল? বিয়ে না দিয়ে সারাজীবন আঁচলের তলায় লুকিয়ে রাখলেই তো পারতেন আম্মা।”
রোকেয়ার মুখের আদল বদলে গেল ঝটিতি। মুখ কালো করে কিছু বলার আগেই সোহানা ঝাঁপিয়ে পড়লেন,
-” আপা যে মিথ্যে বলেন না, তা তো আজ নিজের চোখেই দেখছি। বোনের কাছে দুঃখের কথা বলে মন হালকা করছে, সেটাও তোমার সহ্য হয় না! আড়িপেতে কথা শুনে মুখের উপর এমন বড় বড় কথা বলছো মেয়ে! তোমার যে শিক্ষাদীক্ষার অভাব আছে, সেটা স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে। পরের বাড়িতে এসে মানুষকে অনেক কিছু সয়ে সংসার করতে হয়। তুমি একা একটা সংসার পেয়েছো; ননদের বিয়ে হয়েছে, নেই বললেই চলে। দেবর নেই। আছে মাত্র এক বুড়ি শাশুড়ি। তার সাথেই যদি মানিয়ে থাকতে না পারো, তাহলে কেমন বউ তুমি?”
বিন্দু ঝাড়ুটা এক পাশে ঠেস দিয়ে এবার সোজা তাকাল। বলল,
-” মানিয়ে থাকতে না পারাটা যদি দোষ হয়, তবে দোষটা আমার একার নয়। সম্পর্ক শুধু সহ্য করার নাম নয়, বোঝার নামও। আপনার বোন যদি প্রতিদিন আমাকে মনে করিয়ে দেন যে আমি তাঁর ছেলেকে কেড়ে নিয়েছি, তাহলে সেখানে ভালোবাসা জন্মায় কীভাবে? মন থেকে শ্রদ্ধাও বা আসে কী করে? শাশুড়ি যদি আগে মা হন, আর আমি যদি আগে মানুষ হই, তাহলেই সংসার টিকে। নইলে ‘মানিয়ে নেওয়া’ শুধু একপাক্ষিক ত্যাগ হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই ত্যাগ একদিন মানুষকে নীরব করে দেয়, ভালো করে না।”
কথার প্রত্যুত্তরে উপযুক্ত জবাব খুঁজে না পেয়ে সোহানা এক মুহূর্ত থমকে গেলেন। মুখ খুলেও আর শব্দ বেরোল না। রোকেয়া তখন বোনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বললেন,
-” বাদ দে সোহানা, বাদ দে। এই মেয়ের মুখের সাথে পেরে উঠবি না। ছোট ঘরের মেয়েদের আর কিছু থাকুক বা না থাকুক, মুখটাই থাকে শক্ত। সেই মুখের কাছেই কাউকে টিকতে দেয় না।”
কথাগুলো শুনে বিন্দুর ভেতরের সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তবু সে সরাসরি তর্কে গেল না। শান্ত ভঙ্গিতে সোজা হয়ে বসে, সোফার নিচে ঝাড়ু ঢুকিয়ে দিতে দিতে নিঃশব্দ খোঁচা দিয়ে বলল,
-” ময়লা শুধু ঘরের ফাঁকফোকরেই জমে না। কিছু মানুষের মনে এমন ময়লা জমে যে, মনটাই কয়লার মতো কালো হয়ে যায়। চোখে দেখা ময়লা তবুও একদিন না একদিন পরিষ্কার করা যায়। কিন্তু মনের ময়লা পরিষ্কার করার মতো কোনো ঝাড়ু নেই। তাই সেই ময়লা দিনে দিনে পচে কলুষিত হয়ে ওঠে। এক পা কবরে গেলেও, তখনও শয়তানি বুদ্ধি আঁকড়ে ধরতে মানুষের বিবেকে বাধে না।”
শেষের কথাটা বুঝতেই রোকেয়া কিঞ্চিৎ ভড়কে গেল। এই মেয়েটা কি তবে সবকিছু টের পেয়ে গেছে? সিমিকে এই বাড়িতে তোলার উদ্দেশ্যও কি বুঝে ফেলেছে? ছেলেকে যদি আবার কানপড়া দেয়, তাহলেই বিপদ। শেষে না জানি ছেলে মাকেই ভুল বুঝে বসে। হায় হায়, শেষে এমন না হয়— যেমন ছিলাম তেমনই তো ভালোই ছিল। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলাম বুঝি।
সোহানা মুখটা অমাবস্যার রাতের মতো গম্ভীর করে বললেন,
-” সমস্ত বেয়াদবি দেখছি তোমার মধ্যেই আছে মেয়ে। তোমার মা হয়তো আদব-কায়দার খামতি রেখেছেন, কিন্তু বেয়াদবি করার শিক্ষা দিতে ভুল করেননি বুঝি। এটুকুও শেখাননি যে পরের বাড়িতে কথাবার্তা বলার সময় দু’বার ভেবেচিন্তে বলতে হয়? মুখের ওপর এভাবে চটাং চটাং কথা বলা যায় না। তাও আবার খোঁচা দিয়ে।”
বিন্দু নির্বিকার গলায় উত্তর দিল,
-” কী আশ্চর্য খালা! আপনি পরের বাড়ি.. পরের বাড়ি কেন করছেন? স্বামীর বাড়ি আবার পরের বাড়ি কবে থেকে হলো? আমার মা তো এই শিক্ষাই দিয়েছেন খালা; ‘মেয়েদের আসল ঠিকানাই স্বামীর বাড়ি। ওটাই নিজের বাড়ি।’ আর আম্মাকে জিজ্ঞেস করলেই জানবেন। আম্মা নিজেই বলেন, নিজের ভেবে দরদ দিয়ে কাজ করতে। ঝাড়ুটার উপরও নাকি টান থাকতে হয়। যেখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলা যায় না, ঠিক জায়গায় রেখে যত্ন করতে হয়, যেন নষ্ট না হয়। সবকিছু আপন ভেবে যত্ন সহকারে করতে হয়।”
রোকেয়ার মুখটা আমসত্ত্ব হয়ে এলো। সে তো কেবল কাজের কথাই বলেছিল। এই মেয়েটা তো আস্ত একটা চিজ মাইরি। বিন্দু চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল এবারে,
-” যদি কাজগুলো নিজের ভেবেই করি খালা, তাহলে সেই বাড়িতে দাঁড়িয়ে উচিত কথা বলতে দু’বার কেন ভাবতে হবে?”
দু’জনেই উত্তর দেয়ার শব্দ খুঁজে পেলেন না। তবে ভেতরের চাপা রাগ বাড়ল বৈ কমল না। মেয়েটাকে বিদেয় করতে হবেই যেন যেকোন ভাবে। দু’জনেই নীরব ভাষায় চোখেচোখে এই সন্ধিটাই আঁটলেন।
____________
বিকেলে চা নাশতা বানাচ্ছিল বিন্দু। বসার ঘরে সিমি আর তার গুণীয় খালা আর মা বসে সিরিয়াল দেখছে। সিরিয়ালে এখন চলছিল, মেয়েটিকে তার চাচী শাশুড়ি মানতে চাইছে না। মুখের উপর অপমান করে গ্রাম থেকে চলে যেতে বলছে। মেয়েটির বর মাস্টার মশাই; এই শক্ত চরিত্র হতে গিয়ে আবার ভেদা মাছ হয়ে যাচ্ছে। বিন্দুর এমনটিই মনেহয় এই সিরিয়ালটি দেখতে গেলে। মাস্টার মশাইয়ের চাচী তার আবার বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বিন্দু রান্নাঘর থেকে বসার ঘরের দেয়ালে সাঁটানো মনিটরের দিকে একপল চেয়ে ফের শাশুড়ির দিকে চেয়ে ভাবল— শাশুড়ি মা বোধহয় এখান থেকেই শিক্ষা নিচ্ছেন।
মা আর খালা কথা বলছিল। এরমধ্যে সিরিয়ালে জনপ্রিয় গানটা বেজে উঠল। আর বেজে উঠতেই সিমি টিভির রিমোট ধরা হাতটাই উঁচিয়ে সাবধান করে বলল,
-” এই থামো থামো এই গানটা আমার খুব প্রিয়। শুনতে দাও প্লীজ।”
নাগর আমার নিঠুর বড়ো, মনও বোঝে না..!
আমার ভাঙা খাঁচা পড়েই আছে সে তো আসে না
পোড়ামনে ভালোবাসা বাসা বাঁধে না..!
কড়াইয়ে পাস্তা নাড়ছিলো বিন্দু। এরমধ্যে ঘরে থাকা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। আর বেজে উঠতেই চুলোর আঁচ কমিয়ে ফোন আনতে ঘরে যায়। ফোন তুলে সালাম দেয় বিন্দু। রোহান উত্তর দিয়ে বলল,
-” বিন্দু সকালে কী যেনো আনতে বলেছিলে? কাজের চাপে একদম ভুলে গেছি। এখন অফিস থেকে ফিরছি। কী বলেছিলে একটু মনে করিয়ে দিবে, প্লীজ?”
বরটা হয়েছে এক রষকষহীন। কোথায় ফোন তোলার সাথে সাথেই একটু মিষ্টি করে বলবে— জান কী করছো? সারাদিনে আমাকে কতবার মিস করেছো? একবারও ফোন দেওনি কেনো? এইজন্য আমি খুব অভিমান করেছি। এই অভিমান আজ আর ভাঙছে না।
হেসে আরো যোগ করবে— অবশ্য বউয়ের উপর বেশিক্ষণ অভিমান করে থাকা যায় না। আর অভিমান শব্দটা ছেলেদের জন্য মানায়ও না। অভিমান মানায় শুধু আর শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য। কারন বউয়ের মিষ্টি মুখটা দেখলেই তো গলে যেতে হবে।
বিন্দু যখন স্বপ্নে বিভোর। তখন রোহান ওপাশ থেকে বলল,
-” হ্যালো? হ্যালো, বিন্দু? বিন্দু শুনতে পাচ্ছো?”
বিন্দু ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলল,
-” জ্বি বলুন।”
এরমধ্যে সোফায় বসা শাশুড়ি খালা শাশুড়ির কাছে আফসোস তুললেন,
-” দেখলি দেখলি সোহানা, আমার ছেলেটা সারাদিনে একবারও ফোন দিয়ে মায়ের খোঁজ খবর নিলো না। ঠিকমতো ঔষধটাও অন্তত খেয়েছি কী না শোনে না। অথচ…অথচ বউয়ের কাছে নিরানব্বইবার ঠিকই ফোন করে নিশ্চয়। আমার বাবুটা আর আগের বাবু নেই রে।”
বিন্দু কানখাড়া করে সবটাই শুনল। আর শুনতেই ফিচেল হাসল। পরপর গলা খাঁকারি দিয়ে একটু জোরেজোরে বলল,
-” ও ফিরছেন আপনি! আমার জন্য তেমন কিছুই আনতে হবে না। আপনি দেখেশুনে আসুন। আমি রান্না করছি, এখন রাখছি, হুঁ।”
রোহানের কপালে ভাঁজ পড়ল। বলল,
-” বিন্দু ভুলে গেছো তুমি? আচ্ছা আমিই মনে করার চেষ্টা করছি।”
রান্নাঘরে পা রাখতে রাখতে ঠোঁটে মেকি হাসি এঁটে গদগদ কন্ঠে এবারে বলল বিন্দু,
-” চা নাশতা বানাচ্ছিলাম আমি। আরে রোহান এটুকু ব্যাপার না। এটুকু আমি সামলাতে পারি। কোনো সমস্যা নেই। আপনি ভালোবেসে আমার কথা এতটা ভাবেন এই অনেক। আর নিজের সংসারে একটু কাজবাজ যদি নাইই করি___”
রোহান এতক্ষণে অনুমান করে বাঁশটা বিন্দু ভালোই দিচ্ছে। নিশ্চয় মা আশেপাশেই আছে। রোহানের কপালে ঘাম ছুটল। বাসায় গেলে আজ মা কেঁদেকেটে কতকিছুই যে বলবে আল্লাহ জানে। এইভেবে শুকনো ঢোক গিলল রোহান। বলল,
-” আচ্ছা বিন্দু আমি এখন রাখছি।”
বিন্দু এবারে ফিসফিস করে বলল,
-” এভাবে নয়। সুইট করে বাই বলেন।”
-” মানে?”
-” ওলে ওলে, মাম্মাসবয়! সুইট করে বাই জানাতেও জানেন না বুঝি! আচ্ছা এর শাস্তি এক মাস। আর কী শাস্তি সেটা অনুমান করে নিন। যে ইনোসেন্ট বয় আপনি, একটু ইঙ্গিত দিয়েই রাখি। বিড়ালের সামনে মাছ থাকবে, বিড়াল দেখবে, লোভ জাগবে, অথচ__”
রোহান ঝটপট বলল,
-” বাই জান।”
ফোনটা কাঁধ দিয়ে কানের সাথে ঠেসে খুন্তি নাড়তে নাড়তে মুচকি হেসে বলল বিন্দু,
-” ভালোবেসে আরো ডাকুন। যত গুলো এমন সুইট-কিউট ডাক আছে… ততগুলো।”
মুখস্থ বিদ্যার মতোন ওপাশ থেকে বলল রোহান,
-” সুইটহার্ট, মাইহার্ট, মাইলাভ, মাইজান, ডার্লিং এবারে রাখছি।”
ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত হয় বিন্দুর। বিনিময় মৃদুস্বরে বলল,
-” টেক লাভ। বাই।”
চায়ের পানি চুলোয় দিতে দিতে হঠাৎ ফাজলামি করে সুর তুলল বিন্দু,
জব তাক বেটা মাম্মি বলে,
তব তাক বেটা তেরা হ্যায়।
আব তেরা বেটা ডার্লিং বোলে,
আব তেরা বেটা মেরা হ্যায়।
বেটা বেটা না কর শাশু,
আব তেরা বেটা মেরা হ্যায়।
ওদিকে রোকেয়ার কেনো জানি অস্থির ঠেকছে। সারাদিন গেল ছেলে একবারও তাকে ফোন দেয়নি, অথচ বউকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর ঠিকই নিচ্ছে। আগে তাকে ফোন দিয়ে কিছু আনতে হবে কী না জিজ্ঞাসা করত। এখন বউকে করে। তার ছেলে গেল, তার সংসার গেল। সবই বুঝি এবার চলেই যাবে। এটা ভাবতেই পালপিটিশন বেড়ে যাওয়ার জোগাড় তার। আবার ওদিকে বউ মনের সুখে গান করতে করতে রান্না করছে। হায় কপাল। হায় কপাল। রোকেয়া অদৃশ্য হাতে কপাল চাপড়ালেন। অস্থির শ্বাস ফেলে বললেন,
-” সিমি? ও সিমি… এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দেতো মা।”
__________
কুয়াশামাখা গোধূলি লগ্নে ব্যালকনিতে বসে বিন্দু। বা-হাতের বোলে মরিচ গুঁড়া আর লবণ মাখা, ডান হাতে একটা একটা করে দেশি বরই তুলছে আর তাতে ডুবিয়ে আয়েশ করে গালে তুলছে। ঝালে আর টকে থেকে থেকে চোখ বুঁজে আসছে। তন্মধ্যে কারো পায়ের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইতেই ভ্রুযুগল কুঁচকায় বিন্দুর। সিমি দরজার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। কাল এসেছে থেকে তো হয় খালার সাথেই সময় কাটাছে, নয় ফোন নিয়ে আছে। বিন্দুকে দেখেও না দেখার মতোনই আছে। প্রথম সাক্ষাতে রোবটের মতোন দু’টো কথা বলেছিল এতটুকুই। এখন হঠাৎ এই মানবীর এখানে আসার উদ্দেশ্য বোধগম্য হলো না বিন্দুর। তবে যতই হোক আত্মীয় মানুষ তাই সৌজন্যমূলক হাসি টেনে বলল বিন্দু,
-” ওখানে দাঁড়িয়ে কেনো ভেতরে আসো।”
সিমি জোর করে হাসি টেনে বলল,
-” হুঁউ।”
বিন্দু চেয়ার দেখিয়ে বলল,
-” বোসো।”
সিমি বসল। বিন্দু লবণ ঝালমরিচের বাটি এগিয়ে ধরল। সাথে বরই দেখিয়ে বলল,
-” খাও।”
সিমি গা দুলিয়ে বলল,
-” টক একদম খেতে পারি না।”
বরইয়ে ঝাল মাখাতে মাখাতে বলল বিন্দু,
-” আর ঝাল?”
-” ঝালও একদম নিতে পারি না আমি।”
-” সো স্যাড। তাহলে আমাকে ফেস করবে কীভাবে?”
শেষের কথাটা খুবই আস্তে করে বলল বিন্দু। আর আসতে বলায় সিমি স্পষ্ট শুনতে পায় না। শুধাল,
-” বুঝলাম না, কিছু বললে বোধহয়?”
বিন্দু হেসে বলল,
-” নাথিং।”
সিমি কথা উঠানোর সুযোগ খুঁজছিলো। কীভাবে উঠাবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। অবশেষে বিন্দুর আঙুলে ইশারা করে বলল,
-” ওটা রোহান ভাইয়া দিয়েছে না?”
বিন্দু মাথা নেড়ে বলল,
-” হুম।”
কপালের গাঢ় ভাঁজ মিলিয়ে মুখে সরল হাসি টানল বিন্দু। হাতটা মেলে দেখিয়ে শুধাল,
-” সুন্দর না?”
-” হুম, সুন্দর। রোহান ভাইয়ের পছন্দ সুন্দর! এটা অস্বীকার করা যাবে না।”
মুখে কৃত্রিম আফসোসের ছাপ নিয়ে পুনরায় বলল সিমি,
-” আফসোস রোহান ভাইয়ের সেই পছন্দের ভেতর আমিও ছিলাম। কিন্তু সবটাই কপাল। ভাগ্য খারাপ হলে যা হয়।”
-” আমরা না ভেবে, কিংবা লোভে পড়ে কিছু করে ফেলি। তারপর যখন শিক্ষা পাই, তখন বলি সবই কপাল। নিজের ভুলটা না ধরে, শিক্ষা না নিয়ে..কপাল আর ভাগ্যের উপর দোষারোপ করি।”
সুক্ষ্ম খোঁচা দিয়ে বলে বিন্দু। সিমির মুখটা থমথমে হয়। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল সিমি,
-” হুম সেটাই। তবে এখন আমি টের পাচ্ছি, মানুষটার ভালোবাসা উপেক্ষা করার ফল পাচ্ছি। রোহান ভাইয়ার নিখাদ ভালোবাসা পায়ে মাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আজ আমার এই দুর্দিন।”
বিন্দুর চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে। সিমি অভিনয় করে ধরে আসা গলায় বলতে থাকে,
-” ভাইয়া আমাকে ছোট থেকেই পছন্দ করতেন। তারপর কলেজে পা রাখার পর প্রপোজ করেন। অত সুন্দর মানুষ! আমিও বিলম্ব না করে সাথে সাথে অ্যাকসেপ্ট করি। তারপর আমাদের তুমুল প্রেম চলল দু’বছর। দুই ফ্যামেলিকে লুকিয়ে আমাদের সেকি মাখো মাখো, উথালপাথাল প্রেম! ভাইয়া আমাকে চোখে হারান। ওই ইন্টিমেন্ট ছাড়া আমাদের মাঝে সবকিছুই হয়েছিল। আর জানোই তো প্রেমে আজকাল কিসটিস নরমাল।”
বিন্দুর মুখ থমথমে। বিন্দুর মুখের অবস্থা দেখে সিমি যেন মজা পেল। ঔষধ কাজে লাগছে বুঝি। এইভেবে ভেতরটা খুশিতে ঝুমঝুম করে উঠল সিমির। ওদিকে অফিস থেকে ফিরে সবে ঘরে পা রেখেছে রোহান। সিমির শেষের দিকের কিছু কথা তার কানে যায়। আর যেতেই তার মাথায় চুরমার করে আস্ত ধরণীটাই ভেঙে পড়ল।
বিন্দু থমথমে গলায় জিজ্ঞাসা করল,
-” তোমাদের দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো?”
-” হুম। কেনো রোহান ভাইয়া তোমাকে বলেনি?”
বলে কপালে হাত রেখে নাটকীয় ভঙিতে পুনরায় নিজেই বলল সিমি,
-” ধূর, আমিও না কী প্রশ্ন করছি। কারো এক্স ছিলো, প্রেমের সম্পর্ক ছিলো, এসব আবার বউকে বলে নাকি। বিয়ের পর তো বউয়ের কাছে সব পুরুষই সুবোধ বালক সাজে।”
সিমি চোখমুখে শয়তানি হাসি টেনে আরো বলল,
-” এইযে আমার আঙুলের রিংটা দ্যাখো। এটা রোহান ভাইয়া নিজে ভালোবেসে আমার হাতে পড়িয়েছিল। আজ তুমি যেখানে আছো, সেখানে আমার থাকার কথা ছিলো। কিন্তু… কিন্তু আমার একটা ভুল কাজ সবটা কেমন এলোমেলো করে দিলো। খালা আমার উপর রাগ করে রোহান ভাইয়াকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলেন। রোহান ভাইয়া তো আবার খালা বলতেই অন্ধ। তবে প্রথম ভালোবাসা কখনো ভুলা যায় না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভাইয়া আজও আমাকে পুরোপুরি ভুলতে পারেনি।”
বিন্দুর মুখে হাসি নেই। মুখে যেন গ্রহণ লেগেছে। রোহান ব্যালকনির দরজার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেটা দেখতেই চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ল। তৃতীয় জনের জন্য এখন তাদের সম্পর্কে না ফাটল ধরে। আর মেয়েরা তো খুব আবেগি হয়, সিমির এইসব নোংরা পরিকল্পনা অনুযায়ী বিন্দু রোহানকে ভুল না বোঝে। আর ভুল বুঝে দূরত্ব না তৈরি করে। এই ভয়ে তটস্থ হয় রোহান। সে এগিয়ে গিয়ে সত্য বলবে কী না দ্বিধায় পড়ল। তবে অপেক্ষায় রইল বিন্দু কী বলে? বিশ্বাস করেছি কী?
সিমির দিকে মুখটা নিষ্পাপ মাছুম বানিয়ে তাকাল বিন্দু। বলল মৃদুস্বরে,
-” তুমি খুব সুন্দর মিথ্যে বলতে পারো সিমি। হলিউডে থাকলে অভিনয়ের জন্য অস্কার পেতে নিশ্চিত। সিমি জানো আমার মনে হচ্ছে, তোমার এই সকল গুছানো মিথ্যে যদি আমি বিশ্বাস না করি, তাহলে তোমার সাথে ঘোর অন্যায় করা হবে। এখন তুমিই বলো এই ঘোর অন্যায় করা উচিত হবে কী আমার?”
সিমির মুখটা ফাটা বেলুনের মতোন চুপসে গেল। এই মেয়ে বলে কী! ওদিকে টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে ঠোঁট টিপে হাসল রোহান। আর অপেক্ষায় থাকল তার ঝাঁঝ লবঙ্গের পরবর্তী কথার! তার ঝাঁঝ লবঙ্গের যে ঝাঁঝ, কিছু না শুনিয়ে যে থামবে না, এ নিশ্চিত রোহান।
#চলবে
