#ঝাঁঝ_লবঙ্গ |২|
#লেখনীতে_মুসতারিন_মুসাররাত
কুয়াশাভেজা সকাল। জানালার ফাঁক গলে নরম আলো ঢুকছে ঘরে। দূরে কোথাও পাখির কিচিরমিচির নিস্তব্ধ ভোরটাকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তুলছে। সেই শব্দেই ঘুম ভাঙে বিন্দুর। আজকের ঘুমটা হয়েছে বেশ প্রশান্তিময়। মনে অকারণ ভার নেই। রাতে সিমিটাকে যেভাবে কথাগুলো বলেছিল, তার পর আর একটি শব্দও শোনেনি। ফোনটা ওদিক থেকেই কে*টে গিয়েছিল। তবু বিন্দুর মনে কোনো অনুশোচনা নেই। ওর নীতি একটাই— নায়িকা শাবানা হয়ে সবার চোখে ভালো থাকার চেষ্টা করার চেয়ে, কে কী ভাববে, কী মনে করবে? এই ভেবে নিজেকে গুটিয়ে রাখার চেয়ে, বরং প্রয়োজনে উচিত কথা বলে খারাপ হওয়াও শ্রেয়। তাতে অন্তত মানুষ মাথায় উঠার সাহস পাবে না।
গলা পর্যন্ত টানা কম্বল গা থেকে খানিক নামাল বিন্দু।আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো শক্ত পুরুষালি একটা হাত পেটের উপর। ঠোঁটে মৃদু হাসির ঝিলিক তুলে নিত্যদিনের অভ্যাসে বিন্দু নিজের হাতটা আলতো করে রাখে সেই হাতে। নড়েচড়ে মৃদু গলায় বলে ওঠে,
-” সকাল হয়ে গেছে, সরুন। উঠব।”
বাঁধনটা আরও টানটান হয়। চোখ না খুলেই ঘুমজড়ানো কণ্ঠে রোহান বলে,
-” এত তাড়াতাড়ি? আরেকটু থাকো। আরেকটু পর উঠলে হবে না?”
এই কথাগুলো রোজই শোনে বিন্দু। তবু প্রতিটা সকালেই যেন নতুন করে ভালো লাগার জন্ম দেয়। বুকের ভেতরটা নরম হয়ে আসে। স্বামীর প্রশস্ত বুকে মাথা গুঁজে কয়েক মুহূর্ত বিড়ালছানার মতো চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। হঠাৎ বাস্তবটা মনে উঠতেই বিন্দু ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,
-” রোহান, ছাড়ুন তো। ছটা বাজে। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা বানাতে দেরি হলে কিন্তু আপনার মায়ের ভাঙা ক্যাসেট শুরু হয়ে যাবে।”
বিন্দু প্রায়শই ‘আপনার মা’ এভাবে বলে। যদিও প্রথম প্রথম বলতো না। ইদানিং এই বিষয়টা লক্ষ্যণীয়। রোহানের কাছে দৃষ্টিকটু লাগে। হাতের বাঁধন আলগা করে আলসে ভাবে একটু নড়ে শুয়েই গাম্ভীর্য টেনে বলল রোহান,
-” বিন্দু, একটা কথা বলি? আমার মা মানে তোমারও মা হন। তুমি___”
কথার মাঝেই একদম নির্ভেজাল সত্যিটা সপাটে ছুড়ে দেয় বিন্দু,
-” আপনার মা আমারও মা হন, ওটা খাতা-কলমে ঠিকই আছে। কিন্তু বাস্তবে? না, বাস্তবে নন। মা যদি হতেন, তাহলে রুহি আপুকে যে চোখে দেখেন, আমাকেও সেই চোখেই একটু হলেও দেখতেন। আপনিই বলুন তো, উনি কখনো আমাকে স্নেহ দিয়ে কথা বলেছেন? উনার তো খেয়েবসে কাজই একটা। সারাদিন আমার খুঁত ধরা। তরকারিতে তেল ভাসছে, নুন কম হয়েছে, কাপড় কাচা ভালো হয়নি, দাগ যায়নি। যেন আমি বউ না, কোনো পরীক্ষার খাতা।”
বিন্দুর বলার ভঙিমায় শেষের কথা শুনে ঠোঁটে চাপা হাসি ফুটল রোহানের। মা-বউ দু’জনকে একসাথে সামলাতে রোহানের মুখের হাসিটা অস্ত্রের মতোন কাজ করছে। মা যখন বউয়ের নামে অভিযোগ তোলে, ও তখন হেসে বলে— বাদ দাও না মা। ছোট মানুষ, কতটুকুই বা বুদ্ধি ওর। একটু মানিয়ে, শিখিয়ে পড়িয়ে নিও।
আবার অন্যদিকে বউ যখন রাগ প্রকাশ করে অভিমানী হয়ে বলে, তখনও হেসে ওই একই ভাবেই বোঝানোর চেষ্টা করে— বয়স্ক মানুষ, অতোশতো ধরতে হয় না বিন্দু। বাদ দাও তো। একটু মানিয়ে নিও।
সব সময়ের মতোন হেসেই বলল রোহান,
-” এত অভিযোগ এক নিঃশ্বাসে!”
বিন্দু বালিশে ঠেস দিয়ে উঠে বসে। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
-” অভিযোগ না, বাস্তব রিপোর্ট।”
বলেই এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে হাত খোপা করতে করতে পুনরায় বলল বিন্দু,
-” জানি এভাবে বলায় আমার উপর রাগ হচ্ছে আপনার। তবে আপনি চতুর মানুষ কী না, তাই তো রাগটা সহজে প্রকাশ না করে সবসময় গলে গিয়ে হেসে উড়িয়ে দেন। তবে আমার কী দোষ জানেন?”
রোহান মুচকি হেসেই ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
-” কীহ?”
-” আমার সবচেয়ে বড় দোষ, নিজের মুখকে কন্ট্রোলে রাখতে পারি না আমি। উচিত কথা ঠাসঠাস করে বলে ফেলি।”
-” ভালো তো। উচিত কথা বলা দোষের কিছু নয়। তবে লক্ষ্য রাখতে হয়, বেয়াদবি যেন না হয়।”
___________
ঘরদোর মোছা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার লোক ঠিক করা আছে। প্রতিদিন এগারোটার দিকে সে এসে কাজ সেরে চলে যায়। কিন্তু রান্নার জন্য বুয়া রাখতে রাজি নন রোকেয়া। তাঁর সোজা কথা— বাড়ির বউ যদি রান্নাটুকুও নিজে না পারে, তাহলে সারাদিন তার কাজটা কী? পরের ঘর করতে এসে পায়ের ওপর পা তুলে পটের বিবি হয়ে বসে থাকবে নাকি!
নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে বিন্দু। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে ছোট। বাবা নেই বহুদিন। মায়ের সংসার আর বিন্দুর দায়িত্ব টেনেছে দুই ভাই। ইন্টার পাশ করার আগেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়। শেষমেশ মাস আড়াই আগে হঠাৎ ভালো সম্বন্ধ আসায় তাড়াহুড়ো করেই বিয়ে দিয়ে দেয়।
সংসারের কাজে বিন্দু কাঁচা নয়। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরকন্নার কাজ সবই জানা। আটটার মধ্যেই ব্যস্ত হাতে নাশতা বানিয়ে ফেলল। ডায়নিং টেবিলে একে একে সাজানো হয় খিচুড়ি, বেগুনের চাক ভাজি, ইলিশ মাছ ভাজা, বেগুন ভর্তা আর ডিম ভাজি। শাশুড়ির ডায়াবেটিস, দু-বেলা রুটি খান তিনি। সেটাও বানিয়েছে।
সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন রোকেয়া। বিন্দুর মনে হয়, হাঁটার চেয়ে আশপাশের মহিলাদের সঙ্গে জোট বেঁধে ছেলের বউদের নিয়ে পরচর্চাই বেশি হয়। ফিরে এসে ঢাকনা তুলে তুলে খাবার দেখছিলেন রোকেয়া। বিন্দু পানির জগটা ভরে টেবিলে রাখছিলো তখন। গম্ভীর গলায় রোকেয়া প্রশ্ন ছুড়লেন,
-” রুটি কী দিয়ে খাবো? রুটির সঙ্গে কোনো সবজি করোনি?”
-” শাক ভাজি করেছি। লাল শাক ভেজেছি। কিচেনে আছে, এনে দিচ্ছি।”
শান্ত স্বরেই জবাব দিল বিন্দু। এর মধ্যেই রোহান এসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে মায়ের দিকে তাকাল।
-” মা, শরীর কেমন? কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? কিছু হলে দেরি না করে বলবে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”
এতক্ষণ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রোকেয়া ছেলেকে দেখার সাথে সাথেই ঝিমিয়ে গেল। রাজ্যের দূর্বলতা যেন এখনই শরীরে ভর করল। দূর্বল চিত্তে শ্বাস ফেলে বললেন,
-” ঔষধ আর কী করবে বাবা! সারারাত এপাশ-ওপাশ করি, একফোঁটা ঘুম হয় না।”
বিন্দু কোণা চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করল— বিয়ের পরের দিন থেকেই শুনছি, উনি নাকি ঘুমাতে পারেন না। অথচ কখনো মাঝরাতে পানি নিতে বেরোলেই কানে আসে নাক ডাকার শব্দ।
রোহান জিজ্ঞেস করল,
-” প্রেশারের ঔষধটা ঠিকমতো খাচ্ছো তো মা?”
-” ঔষধের দোষ কী বাবা। এত চিন্তা নিয়ে কি ঘুম হয়। বড় ছেলেটা যে ব্যথা দিয়েছে, সেই শোক আমি ম’রার আগ পর্যন্ত ভুলতে পারবো না। কপালটাই আমার পোড়া। নইলে পেটের ছেলে পরের মেয়ের কথা শোনে!”
শেষ কথাটা বেশ চাপ দিয়েই বললেন রোকেয়া। রোহান বুঝে প্রসঙ্গ বদলাল। প্লেট টেনে নিয়ে বলল,
-” আচ্ছা মা, বসো। আগে খেয়ে নাও। ঔষধ খাওয়ার সময় হয়ে আসছে।”
তারপর বিন্দুর দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
-” বিন্দু, মায়ের ঔষধগুলো একটু ঠিকমতো খেয়াল রেখো, হ্যাঁ।”
বিন্দু কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ল।
রোকেয়া ছেলের পাতে ইলিশ মাছ তুলে দিলেন। এরপর বেগুনের চাক তুলতে গিয়ে নাক সিঁটকিয়ে বললেন,
-” মনে হচ্ছে তেলে ডুবে আছে। এত তেল দেয় কেন।”
শাক ভাজির বাটিটা কাত করে ধরে আরও যোগ করলেন,
-” শাক ভাজিতেও তেল চুপচুপ করছে। কতবার বলেছি, এত তেল দিও না। বয়স হলে সংসারে আর দাম থাকে না বলেই তো আমার কথা কেউ গ্রাহ্য করে না।”
বিন্দুর ভেতর হালকা রাগ জাগল। তবু মুখ বন্ধ রাখল।
রোহান তাকে বসতে ইশারা করল। বিন্দু মাত্র বসেছে এমন সময় রোকেয়া বললেন,
-” ঘিয়ের কৌটাটা আনো তো। আজ আর রুটি খাবো না। একটু খিচুড়ি খাবো, ঘি দিয়ে।”
এইমাত্র তেল নিয়ে এত কথা! আর এখন ঘি? বিন্দু আর নিজেকে চেপে রাখতে পারল না। কৌটা এনে টেবিলে রাখতে রাখতে বলল,
-” চর্বি তো আপনার নিষেধ, আম্মা। সামান্য তেল নিয়ে যেভাবে কাহিনি করেন, এখন আবার ঘি খাবেন?”
রোকেয়ার মুখ কালো হয়ে গেল। কিন্তু ছেলের সামনে আর কিছু বললেন না।
খাবার খেতে খেতে রোহান হঠাৎ বলল,
-” বিন্দু, একটা কথা ভাবছিলাম। তোমাকে কোচিংয়ে ভর্তি করাবো। বাসায় বসে না থেকে ভার্সিটি ভর্তির প্রিপারেশন নেবে।”
বিন্দু কিছু বলার আগেই রোকেয়া চটে উঠলেন,
-” কোচিংয়ে ভর্তি হবে মানে? তুই কী ওকে আরও পড়াবি?”
রোহান শান্ত স্বরেই উত্তর দিল,
-” সবে ইন্টার পাশ করেছে ও। এখনও তো ওর পড়াশোনার অনেক বাকি।”
-” বউকে দিয়ে চাকরি করাবি নাকি যে এত পড়াশোনা দরকার?যেটুকু জানে, সেটুকুই যথেষ্ট। বাচ্চাকাচ্চার হাতে খড়ি দিতে পারলেই হলো। বউয়েরা বেশি পড়াশোনা করলে, চাকরি করলে সংসার সুখের হয় না। তখন তারা স্বামীকে মান্য করা দূর কথাও শোনে না।”
রোহান মায়ের দিকে তাকাল। ঠোঁটে নরম হাসি টেনে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
-” মা, পড়াশোনা মানেই চাকরি না। পড়াশোনা মানুষকে বুঝতে শেখায়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস দেয়। বিন্দু যদি পড়ে, সেটা আমাদের সংসারের ক্ষতি করবে না, বরং ও আরও আত্মবিশ্বাসী হবে।”
রোকেয়া মুখ শক্ত করে বসে রইলেন। রোহান নরম স্বরে বলে গেল,
-” আর পড়াশোনা করলে কেউ খারাপ বউ হয় না মা। ভালো-মন্দটা মানুষের ভেতরে। বিন্দু তো এমনিতেই সংসারের সব কাজ ঠিকঠাক করছে। পড়ালেখা করলে ওর যোগ্যতাটুকু শুধু বাড়বে। ওর জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পাবে।”
বিন্দু চুপ করে বসে ছিল। বুকের ভেতর অজানা একটা সাহস মাথা তুলছিল। কেউ প্রথমবার তার পড়াশোনার কথা এভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলছে। এই অনুভূতিটা সে লুকিয়ে রাখল চোখ নামিয়ে।
রোকেয়া খানিকটা থিতু হয়ে অসন্তুষ্ট মুখেই বলল,
-” পড়াশোনা শিখে তোরা একেকজন লায়েক হয়েছিস। মায়ের কথা কী আর শুনবি? মায়ের কষ্ট করে পেলে বড় করার কোন দামই দিবি না। বিয়ে করেছিস। এখন বউয়ের ইশারায়ই তো নাচবি, উঠবি-বসবি। যা বলবে তাই শুনবি।”
রোহান বিরক্তি নিয়ে ‘চ’ জাতীয় শব্দ উচ্চারণ করল আনমনেই। বিন্দুর গায়ে কথাটা লাগতেই চট করে বলল,
-” আপনার ছেলে তো আমার ইশারাই বোঝে না আম্মা। তাহলে আর নাচাবো কীভাবে?”
এই মেয়ে একটা কথাও মাটিতে পড়তে দেয় না। রোকেয়া অন্ধকার মুখ করে বলল,
-” বিয়ের সময় তো আর এমন কথা ছিলো না। তোমাকে পড়িয়ে ম্যাজিস্ট্রেট বানাতে হবে। নিম্নবিত্ত পরিবার দেখে কী জন্য এনেছি? রান্নাবান্না করবে, ঘর সামলাবে, স্বামী-শাশুড়ির খেদমত করবে। বাচ্চা কাচ্চা হলে মানুষ করবে।”
বিন্দু একপল আড়চোখে রোহানের দিকে চাইল। সে চুপ দেখে বিন্দু নিজেই বলে উঠল,
-” এসবের জন্য একটা বুয়া রাখলেই পারতেন আম্মা। রান্নাবান্না করা, ঘর-গোছগাছের জন্য বাড়ির বউ না এনে মাসিক বেতনে বুয়া রাখতেন।”
রোকেয়ার মুখের আদল বদলে ঘন বর্ষার মেঘ জমেছে। বিন্দু নিচু স্বরেই আরো বলল,
-” পড়ালেখা করে ম্যাজিস্ট্রেট হবো কী না জানি না। তবে পড়ালেখা করা তো খারাপ নয় আম্মা। প্রত্যেকটা মেয়েরই উচিত পড়াশোনা করা। এইযে দেখুন না..”
বলেই সামনের পানি ভর্তি গ্লাসটা হাতে তুলল বিন্দু। বলল তারপর,
-” এক গ্লাস পানিতে যদি একটা মাছি পরে, তাহলে আমরা চট করে পানিটুকু ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে পানি নিই। কিন্তু যদি… এই ঘিয়ের কৌটায় মাছি পড়ে, তাহলে আমরা কী করি? মাছিটাকেই ফেলে দেই। ঘি রেখে দিই। কারন ঘি সহজলভ্য নয়। অনেক দামি। ঠিক আমাদেরও উচিত নিজেকে এমন পজিশনে নেয়া, যাতে কেউ অল্পতেই ফেলতে না পারে। আর একটা মেয়ে যদি নিজের ভেতর জ্ঞান, যোগ্যতা আর আত্মসম্মান জমাতে পারে, তাহলে সে আর সহজে ছুঁড়ে ফেলার জিনিস থাকে না আম্মা। তখন তাকে শুধু ‘কারও বউ’ হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও মূল্য দিতে হয়। পড়াশোনা সেই শক্তিটুকুই দেয়। নিজেকে টিকিয়ে রাখার, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি।”
রোহান অবাক হয়ে শুনল। মেয়েটা ছোট হলেও বুদ্ধি আছে অনেক। একটু ঝাঁঝালো তবে মন্দ নয়। রোকেয়া নাখোশ বদনেই অবশেষে সম্মতি দেয়। না দিয়েই আর কী করবেন? ছেলে চুপ থেকে ওদিকের পাল্লা ভারী করছে। রাগি স্বরেই বললেন,
-” যা ভালো হয় করো তোমরা।”
পরপর রোহানের দিকে তাকালেন। অগত্যা বেজার মুখেই বলেন,
-” রোহান তবে বুড়ি মায়ের একটা কথা অন্তত রাখ। কোচিং-টোচিং বাদ দে। পরীক্ষা দিয়ে কোন ভার্সিটিতে চান্স পাবে, কোথায় একলা থাকবে! এখন দিনকাল ভালো না। যুগ পাল্টিয়েছে। আবার কী কান্ড করে না বসে। তাই বলছি, পাশেই ডিগ্রি কলেজ আছে ওখানেই ভর্তি করিয়ে দে। সংসার সামলাবে, কলেজও করবে।”
বিন্দুর দিকে তাকিয়ে আরো বলেন,
-” ভার্সিটিতে ভর্তি হবো করে আমার বাবুর কানের মাথা খেয়ো না আর। পড়ার এত শখ, ডিগ্রিতেই ভর্তি হয়ে নাও। ভাইদের ঘাড়ে থাকলে, এটুকুও তো পারতে না।”
বিন্দু রোহানের দিকে তাকাল। রোহান চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করল। ইশারায় বোঝাল— পরে বুঝিয়ে বলব।
বিন্দু সেটা বুঝতেই বিড়বিড় করে বলল—- মাম্মাস বয় একটা।
____________
দু’দিন পর….
গোধূলি লগ্নে ডোরবেল বাজতেই খুলে দেয় বিন্দু। দরজা খুলতেই দেখে স্যালোয়ার-স্যুট পরিহিত একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। অপরিচিত মুখ দেখে কপালে ভাঁজ পরে ওর, সেই ভাঁজ প্রগাঢ় হয় মেয়েটির হাতে ধরা বড় লাগেজ দেখে।
বসার ঘর থেকে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন রোকেয়া,
-” কে এসেছে?”
এপাশ থেকে মেয়েটি ডেকে উঠল,
-” খালা।”
রোকেয়ার চোখ ঝিলমিল করে উঠল। মেয়েটি বিন্দুকে পাশ কাটিয়ে লাগেজ টেনে ভেতরে ঢুকল। ঢুকেই খালাকে জড়িয়ে ধরল। কেঁদেকেটে বলল,
-” খালা আমি ওই জা*হান্নাম থেকে পালিয়ে এসেছি। আমাকে এখানে কিছুদিন থাকতে দিবে? আমি শীঘ্রই একটা চাকরি যোগার করে, বাসা নেবো। তুমি তো জানোই আব্বু কেমন! তাই যদি দয়া করতে।”
রোকেয়া সিমির মাথায় হাত রেখে বললেন,
-” এভাবে কেনো বলছিস। তোর যতদিন ইচ্ছা এখানে থাকবি। খালা যতদিন বেঁচে আছে, তুই ততদিন নিশ্চিন্তে থাকবি। এটা আমার স্বামীর বাড়ি। রুহি যেমন, আমার কাছে তুইও তেমনই। তোকে নিজের মেয়ের চোখেই দেখি। আজ রুহি আসলে ওকে কী ফিরিয়ে দিতাম আমি? তাহলে তোর বেলায়…”
বিন্দুকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলো বললেন রোকেয়া। খালা বোনঝির আবেগপ্রবণ দৃশ্য দেখে একহাত কোমরে রেখে মনে মনে বলল বিন্দু,
-” ওহ্ বুঝেছি। এটাই তাহলে সেই সিম ভর্তা…মানে সিমি।”
ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড়াল বিন্দু,
-” শাশুড়ি মা, এটা যেমন আপনার স্বামীর বাড়ি। তেমনি আমারও স্বামীর বাড়ি। কথাটা মনে করিয়ে দেব কী?”
#চলবে
