#ঝাঁঝ_লবঙ্গ
#লেখনীতে_মুসতারিন_মুসাররাত
|১|
-” শুধু রাতে একসাথে ঘুমানো আর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিলেই স্বামী হয়ে ওঠে না। স্বামী হতে হলে স্ত্রীর মনের ভাষা বুঝতে, জানতে হয়। তার হাসির কারণ, তার নীরবতার ব্যথা। তার ভালো লাগা, খারাপ লাগাকে গুরুত্ব দিতে হয়, সিদ্ধান্তে তাকে পাশে রাখতে হয়। স্বামী মানে শুধু দায়িত্বের মানুষ নয়। একজন আপনজন। যার কাছে নিরাপত্তা আছে, ভরসা আছে। একজন মেয়ের জীবনে স্বামী হওয়া মানে একজন সঙ্গী হওয়া; যে ভালোবাসে, বোঝে, আর সম্মানের সাথে আগলে রাখে।”
মুখস্থ বিদ্যার মতোন গড়গড় করে বলে থামল বিন্দু। রোহান অফিস থেকে ফিরেছে সবে। ক্লান্ত হাতে শার্টের বোতাম খুলছিল সে। সারাদিনে একটু একটু করে
জমানো রাগ-ক্ষোভ একসাথে উগরে দিতে ইচ্ছে করছে বিন্দুর। কথার পসরা পেটে জমে আছে ওর। রোহান বউয়ের মুখপানে চাইল। কণ্ঠে জিজ্ঞাসা নামিয়ে শুধাল,
-” আমি কখনো তোমাকে অসম্মান করেছি, বিন্দু? আজ হঠাৎ কী এমন হলো? এমন করে বলছো?”
বিন্দু দৃঢ় স্বরে বলল,
-” রোহান, মানছি আপনি কিছু বলেননি। কিন্তু আপনার পরিবার যখন আমাকে হেয় করে কথা বলে, তখন আপনি নীরব থাকেন। সেই নীরবতাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত দেয়।”
ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানার ধারে বসল রোহান। কণ্ঠে কিঞ্চিৎ বিরক্তির ছাপ,
-” মায়ের সাথে একটু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো বিন্দু।”
বিন্দু হালকা হাসল। যে হাসিতে আনন্দ নেই, তাতে আছে শুধু অভিমানেরা। কণ্ঠে এক পশলা অভিমান নামল,
-” আমি কতদিন মানিয়ে নিচ্ছি, রোহান? আজ না হয় চুপ থাকলাম, কালও থাকলাম। কিন্তু একদিন তো নিজের সম্মানটাও ফুরিয়ে যায়। আমি আপনার কাছে লড়াই চাইনি, শুধু পাশে দাঁড়ানোটা চেয়েছি।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরো বলল,
-” স্বামী মানে শুধু ছাদের দায়িত্ব নয়, নিরাপত্তারও দায়িত্ব। স্বামী মানে ভরসার আশ্রয়স্থল। আপনার মায়ের সামনে আমার হয়ে দুটো কথা বললে কি আপনার সম্মান কমে যায়?”
রোহান একটু দম নিয়ে বলল,
-” মা কষ্ট পাবে ভেবে কিছু কিছু বিষয় অনুধাবন করেও আমি চুপ থাকি, বিন্দু। তুমি তো জানো মা মাইনর স্ট্রোকের রোগী। তারউপর হাই প্রেশার তো আছেই। বয়স হয়েছে। আর কতদিনই বা বাঁচবেন! একটু মানিয়ে নাও। মা’কে কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে পারি না। তবে__”
বিন্দুর ফর্সা গালে হঠাৎ মেঘ জমল। অভিমানী স্বরে ও বলে উঠল,
-” তাহলে মায়ের কথামতো ডিভোর্স দিন আমাকে। তারপর বিয়ে করে আনুন আপনার খালাতো বোন সিমিকে। সে তো এখনো এক পায়ে খাড়া। আর আপনার মা? উনি তো চার পায়ে নাচছে।”
বিন্দুর রাগের পারদ আজ কেনো চড়া তা এতক্ষণে বোধগম্য হয় রোহানের। খাটের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ওড়নার আঁচল আঙুলে পেচাচ্ছে বিন্দু। রাগে মাথা তুলে তাকাচ্ছে না অবধি।
রোহান ঠোঁটে নরম হাসি টেনে হাত বাড়িয়ে বিন্দুর হাতটা নিজের দিকে টানল। উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত রাখল বউয়ের কাঁধে। শান্ত স্বরে বলল,
-” তাকাও, বিন্দু।”
বিন্দু তাকায় না। আবার বলল রোহান,
-” আমার চোখের দিকে তাকাও বলছি।,
-” পারব না।”
সপাটে জবাব এল। বউয়ের এই শিশুসুলভ জেদে হেসে ফেলল রোহান। আলতো করে আঙুল রেখে বিন্দুর থুতনি তুলে ধরল। বলল,
-” এই ফোলা ফোলা গাল দু’টো জানো খুব আদুরে লাগে।”
বউয়ের রাগ ভাঙাতে চট করে দুগালে দুটো চুমু খেল রোহান। বিন্দু চোখ গরম করে তাকাল। বউয়ের রাগি দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে বলল রোহান,
-” তোমার ফোলা ফোলা গাল দু’টো কিন্তু খুব লোভনীয় বিন্দু। বেশি বেশি অভিমান করে গাল ফুলাবে তুমি। আর আমি___”
বিন্দু কথা টেনে নিল। বলল চট করে,
-” আজ আমি সত্যিই কিন্তু সিরিয়াস। আপনি একটা হেস্তনেস্ত করবেনই আজ। আমি একটা ফয়সালা চাই। আপনার মা আমার পরিবার দেখেশুনে, জেনেই এনেছে। তারপরও কাজে একটু ভুলচুক পেতে না পেতেই আমার পরিবার তুলে অবধি বলে।”
রোকেয়ার শখের পানি খাওয়ার চিনামাটির মগটা মাজতে গিয়ে হাত খসে পড়ে অমনি ভেঙে যায় বিন্দুর কাছ থেকে। সেখানে এক দফা বিন্দুর উপর চোটপাট করে রোকেয়া। বিন্দুর চৌদ্দ পুরুষ অমন মগ দেখেছে নাকি? আরো অনেক কিছুই বলেছেন তিনি। বিন্দু নাক টেনে বলল,
-” এই কথা সেই কথা থেকে এক পর্যায়ে উনি কী বলেছেন জানেন; উনার নাকি ভুল হয়েছে আমাকে বউ করে আনা। বোনের মেয়েকে ছেলের বউ করে আনতে পারেনি জন্য এখন আফসোস করছেন।”
পিঠে হাত পেঁচিয়ে কাছে টেনে নিল রোহান। হেসে বলল,
-” তুমি সত্যিই একটা পাগলী, বিন্দু। কতবার বলেছি, মা যা তা না বলে। তুমি মায়ের কথা ধরবে না। আর আমাকে দেখে তোমার মনে হলো, আমি আবার বিয়ে করব? তাও আবার বিবাহিত সিমিকে?”
-” পুরুষ মানুষের এক পা চিতায় উঠলেও ছুঁকছুঁক স্বভাব যায় না। সেখানে এত অল্প সময়েই আপনাকে এ ব্যাপারে সার্টিফিকেট দেই কীভাবে? আর এইযে…এইযে আপনি মাত্র বললেন বিবাহিত সিমিকে। তারমানে সিমিটা আজ বিবাহিত না হয়ে, অবিবাহিত হলে নিশ্চয় মায়ের কথায় মত দিয়ে বিয়ে করে আনতেন।”
একপল থেমে নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল বিন্দু,
-” আর আমি এ-ও জানি রোহান, আপনার আর সিমির নাকি বিয়ের কথাবার্তা পাকা ছিলো। শাকচুন্নীটা আপনার বাগদত্তা ছিলো একসময়। নিশ্চয় দু’জনে প্রেম-ট্রেম করতেন? পরে শাকচুন্নীটা আপনাকে ছ্যাঁকা দিয়ে পালিয়ে যায় অন্যকারো হাত ধরে। পরবর্তীতে আপনি ছ্যাঁকা-ট্যাকা খেয়ে মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে এক কথায় আমাকে বিয়ে করে এনেছেন। ঠিক বলেছি না?”
-” নাহ, রং বলেছো তুমি।”
-” বলুন, বলুন আপনি… সিমি আপনার বাগদত্তা ছিলো না?”
-” হ্যাঁ, তা ছিলো। তারমানে এই নয়___”
কথা কেড়ে নিয়ে বলল বিন্দু,
-” জানি জানি এখন বউয়ের কাছে বিয়ের আগের প্রেম কাহিনী অস্বীকার তো করবেনই।”
-” এইজন্য অল্প বয়সী মেয়েকে বিয়ে করলে এই এক সমস্যা। তারা বুঝে কম, চিল্লায় বেশি, আর তাদের অভিমানের পাল্লা হয় ভারী।”
রাগত স্বরে বলল বিন্দু,
-” শুনলাম আপনার এক্স নাকি জামাইয়ের ঘর করতে চাইছে না। তাহলে আবার বিয়ে করে আনুন আপনার এক্সকে। সে তো আর আমার মতো অল্প বয়সী নয়, সে উপযুক্ত বয়সীই। আবার দেখতে নাকি ডানাকাটা পরী।”
রোহান ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল,
-” আমার ঘাড়ে কটা মাথা আছে বলো তো? আরেকটা বিয়ে করার দুঃসাহস দেখাব? হোক না সে হুরপরী। তাতেও আমার আগ্রহ নেই। আমি এক বিন্দুতেই স্থির।”
___________
রোকেয়া নিজের কক্ষে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছোটবোনের সাথে ফোনে কথা বলছে। দুই ছেলে এক মেয়ে তার। বড় ছেলের প্রেমের বিয়ে। বিয়ে করে সে বউ নিয়ে আলাদা ভাড়া বাসায় থাকে। এ-মুখো ফিরে-ফুচ্চিও দেয় না আজকাল। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সকলের ছোট রোহান। ছোট ছেলেকে যক্ষের ধনের মতোন আঁচলে বেঁধে রাখার শখ রোকেয়ার। যাতে আর যাইহোক এই ছেলে যেনো বড়টার মতোন বউ পা’গ’ল না হয়। মা’কে ছেড়ে না যায়। অবশ্য রোহান ছোট থেকেই মা ভক্ত। বড় ভাইয়ের জন্য যেদিন মা প্রলাপ করে কেঁদেছিল। আর বলেছিলেন,
-” রোহান তুইও কী বিয়ে করে মা’কে পর করে দিবি? আলাদা থাকবি?”
-” মা তুমিও না। কীসব যা তা বলছো। তুমি মা, তোমার যায়গা তোমারই রবে।”
-” না বাবা তুই আমায় কথা দে। মা’কে কখনো কষ্ট দিবি না।”
সেদিন রোহান মায়ের চোখে চোখ রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিল— জীবনের যত বাঁকই আসুক, সে কখনো মাকে ছেড়ে যাবে না। বড় ভাইয়ের মতো আলাদা পথ বেছে নেবে না। মা-ই থাকবে তার পৃথিবীর কেন্দ্র। আর সে সারাজীবন মায়ের ছায়া হয়ে আগলে রাখবে তাঁকে।
অবশ্য ছোটো ছেলের উপর রোকেয়ার ভরসা বিশ্বাস আছে। কিন্তু বিয়ে হলে ছেলেরা যে পরিবর্তন হয়ে যায়। সেই ভয়ে রোকেয়া তটস্থ থাকতো। ইচ্ছে ছিল বোনের মেয়েকে আনার। কিন্তু সেটা যখন হলো না। ছোট ছেলের বউ যেন কখনো মাথায় চড়ে বসতে না পারে এই ভেবেই রোকেয়া বড় ঘরের, শক্তপোক্ত পরিবারের মেয়ে আনেনি। বয়সে একটু ছোট, গরিব ঘরের মেয়ে হলে নাকি স্বভাবেও নরম হবে। এই বিশ্বাসে সে নিজের মতো করে হিসেব কষেছিল। যেন শাশুড়ির সামনে চোখ তুলে কথা বলার সাহস না পায়। সবকিছু মেনে নিয়ে চুপচাপ সংসার করে।
কিন্তু বিধিবাম। বিয়ে দেওয়ার পরপরই রোকেয়ার মনে হতে লাগল; সে ভ”য়ং*কর এক ভুল করে ফেলেছে। মেয়েটার মুখে কথা ঠাসঠাস করে ভরা, চুন থেকে পান খসার আগেই নালিশ পৌঁছে যায় ছেলের কানে। এক মুহূর্তও দেরি নেই। রোকেয়ার বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধে। এই বুঝি তার ছোট ছেলেটাও বড়টার পথেই হাঁটবে। বউয়ের কথায় মাকে ছেড়ে আলাদা হয়ে যাবে।
রোকেয়ার মনে সবসময় ঘণ্টির মতোন বাজে— আজকালকার মেয়েরা কি আর শাশুড়ির সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকতে চায়? বিয়ে হয়ে ঘরে পা দিয়েই তারা আলাদা সংসার চায়। নিজের মাতব্বরি চায়।
বোনের কাছে সমস্ত দুঃখ বিলাস করতে থাকে রোকেয়া। হতাশ গলায় বললেন,
-” আজ যদি সিমিটা রোহানের বউ হতো, তাহলে কী আর এইদিন দেখতে হতো। বোনের মেয়েও যা নিজের মেয়েও তা। যত যাইহোক সিমি কখনো খালার নামে তার ছেলের কানে কানপড়া দিতে পারতো না। বুড়ো বয়সে একলা হয়ে যাবো। এই ভয়েও থাকতো হতো না।”
সোহানা শুধালো,
-” কেনো কী হয়েছে আপা? রোহানের বউয়ের সাথে ঝামেলা লেগেছে তোমার?”
-” আর ঝামেলা। আমার ছেলেটা আর আমার নেই রে। বিয়ে করে এখন সে বউয়ের আঁচলের তলায় থাকে। অফিস থেকে ফিরেছে সেই কখন। এখনো একটিবারে জন্যও মায়ের ঘরে ফিরে ফুচ্চিও দেয়নি। অথচ যে ছেলে আমার আগে বাসায় পা রাখতেই হাঁকডাক ছেড়ে মা মা করে ডাকতো।”
সোহানা চুপচাপ হা-হুতাশ করে শুনে যাচ্ছে। রোকেয়া ছেলের বউয়ের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন। এক পর্যায়ে নিজের কথা তুললেন সোহানা,
-” তোমার কাছে মেয়ে দিলে আমার নিজেরও চিন্তা থাকতো না। কী থেকে কী হয়ে গেল! আমার মনেহয় কী আপা, ওই ছেলে আমার মেয়েকে তাবিজ করেছিল। নইলে রোহানের মত সোনার টুকরো ছেলেকে ফেলে, ওমন একটা ভবঘুরে টোটো কোম্পানীর ম্যানেজার ছেলেটার সাথে আমার মেয়ে পালাবে! এতটা রুচি খারাপ আমার মেয়ের হওয়ার কথা নয়। আমার মেয়েটা এখন রোজ কেঁদে কেঁদে ফোন করে। ওর ভুলের জন্য অনুশোচনায় ভুগছে।”
পারিবারিকভাবে রোহান আর সিমির বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছিল। উচ্চাভিলাসী সিমির ফেসবুকে একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক হয় হঠাৎ। একজনের বাগদত্তা থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রতি গলে যায়। শুনেছিল ছেলের পরিবার শুদ্ধ আমেরিকা থাকে। বিয়ে করে সিমিকেও আমেরিকা নিয়ে যাবে। ছেলেটা দেখতে সুদর্শনই ছিলো। ব্যাংকারের সীমিত আয়, ছোট সংসারের গণ্ডি এইসব ভাবলেই সিমির দম বন্ধ হয়ে আসত। ফেসবুকের ওপার থেকে আসা রঙিন স্বপ্ন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল খুব দ্রুতই। আমেরিকা, ডলার, বড় জীবন, স্বাধীনতা। বাগদত্তা, পরিবার, দায়িত্ব সবই তার কাছে তখন ছোট আর গুরুত্বহীন মনে হয়। এক রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। লোভের মোড়কে মোড়া ভবিষ্যৎকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে পেছনে ফেলে আসে প্রতিশ্রুতি। ভোরের আলো ফোটার আগেই সে পালায় চকচকে স্বপ্নের হাত ধরে।
কিন্তু প্রকৃতির মারপ্যাঁচ বোঝা দায়। কিছুদিন যেতেই খুলতে থাকে একের পর এক মুখোশ। যে ছেলেটার কথা ছিল আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার, তার আমেরিকা বলতে ছিল ফেসবুকের প্রোফাইল আর বানানো গল্প। বাস্তবে তার ঠিকানা কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশের বস্তি। কাজ নেই, ভবিষ্যৎ নেই, শুধু মিথ্যে আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। তখনই সিমি বুঝতে পারে; সে শুধু ভুল করেনি, সে ঠকে গেছে। লোভের পেছনে ছুটে নিজের জীবনটাই সে বাজি রেখেছে। তিন মাস না যেতেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়। এখন সেই সিমিই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরার পথ খোঁজে। যে বাড়ি ছেড়ে সে একদিন গর্ব নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
মেয়ের কথা বলতে বলতে ফোনের ওপাশ থেকে কেঁদে উঠলেন সোহানা। রোকেয়া সান্ত্বনা দিয়ে বলে উঠলেন,
-” ছোটো মানুষ এক ভুল না হয় করেই ফেলেছে। তুই মেয়েকে নিয়ে আয়।”
বোনের মেয়ে অমন কান্ড করার পর রাগ করে পনেরো দিনের মধ্যে ছেলের বিয়ে দেয় রোকেয়া। সোহানা বলল,
-” সিমির বাবা রেগে আছে মেয়ের উপর। মেয়ে চলে যাওয়ার পর আর খোঁজ রাখেনি সে। আমিই গোপনে মেয়ের সাথে কথাবার্তা বলি। সিমির বাবা এক কথার লোক, বলেছেন ও মেয়েকে আর বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিবেন না। মেয়ে জাহান্নামে যাক না কেনো।”
রোকেয়া সাহস যোগাতে হঠাৎ বলে উঠলেন,
-” আচ্ছা চিন্তা করিস না। এখন রাগ আছে তাই অমন বলছে। রাগ গললে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই না হয় এক কাজ কর, সিমিকে আমার এখানে উঠতে বল।”
___________
রাত্রি সাড়ে এগারোটা পার। রাতের খাওয়া সেরে ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়েছে সবে রোহান। এরই মধ্যে ফোনের রিংটোন কানে বাজল। ওয়াশ রুমের দরজার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ডাকল ও,
-” বিন্দু, বিন্দু? দ্যাখোতো কে ফোন দিয়েছে।”
বিছানা ঝাড়ছিল বিন্দু। ওয়াড্রবের উপর থেকে ফোনটা হাতে তুলে স্ক্রিনে কলার নাম দেখে বিন্দুর ভ্রু গুটিয়ে এল। কৌতুহলী হয়ে রিসিভ করল। তবে আগেই কিছু বলল না। ওপাশ থেকে মেয়েলি ভেজা কণ্ঠস্বর এল,
-” রোহান ভাই, আমি আমার নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি জানি যা করেছি আপনার সাথে অন্যায় হয়েছিল। তার ফল আমি পেয়েছি। আমি বাজেভাবে ঠকে গেছি রোহান ভাই।”
মেকি কান্নার স্বর ভেসে এল এপারে। বিন্দুর নাকের ডগা রাগে লাল হয়ে উঠল ঈষৎ। দাঁত চেপে শুনতে থাকল চুপচাপ। সিমি নাক টেনে সত্যের সাথে আংশিক মিথ্যে মিশিয়ে বলল,
-” মা ফোন করে বলল খালা অনুরোধ করেছেন আমাকে আপনাদের বাসায় উঠতে। রোহান ভাই আপনার জানাশোনা ভালো কোনো লইয়্যার নেই__”
একহাত কোমরে রেখে অন্যহাতে ফোনটা মুখের সামনে ধরে চ্যাচানো সুরে বলে উঠল বিন্দু,
-” বেশরম, বেলেহাজ মেয়ে মানুষ। একজনের সাথে বিয়ের কথাবার্তা চলছিলো তাকে ছেড়ে অন্যজনকে বিয়ে করে। এখন কোন লজ্জায় তার কাছে ফোন দিয়েছে? আমার স্বামীর কাছে কী চাই, হুহ?”
ওপাশ থেকে তব্দা খায় সিমি। যারা বেহায়া তাদের কোনোকিছুই গায়ে লাগে না সহজে। তারা নিজ স্বার্থে নিচু কাজকারবার করতে দু’বার ভাবে না। তেমনই বিন্দুর দেয়া গালাগাল সিমির গায়ের গণ্ডারের চামড়ায় লাগলো না। উল্টো বলল,
-” ফোনটা রোহান ভাইয়ের তুমি রিসিভ করেছো? রোহান ভাইয়ের কাছে দাও। আমার তাকে দরকার।”
বিন্দুর রাগ এবারে গগনচুম্বী হয়। তেতে উঠে বলল ও,
-” এত রাতে আমার স্বামীকে কী দরকার, হুঁ। নিজের স্বামীর শারীরিক দুর্বলতা আছে নাকি?”
#চলবে
