Friday, June 5, 2026







ডাকঘর পর্ব-০৭

#_ডাকঘর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৭_

সজ্জাহীন বাসর ঘরে একা বসে আছে পুষ্পিতা। ঘরটা শুভ্রর। আলিশান, প্রশস্ত। দেয়ালের রঙ হালকা অফ-হোয়াইট, জানালায় ভারী পর্দা, এক কোণে দামি ড্রেসিং টেবিল, আরেক পাশে বড়সড় আলমারি।সবকিছুতেই ঐশ্বর্যের ছাপ। কিন্তু, বাসর ঘরের যেটুকু উষ্ণতা থাকার কথা, তা একেবারেই অনুপস্থিত। ফুল নেই। দীপ নেই। কোনো উৎসবের চিহ্ন নেই।

নিজের নামের মধ্যেই যেখানে পুষ্প, সেখানে তার বাসর ঘরটাই পুষ্পশূন্য। কিছুক্ষণ আগেই আবার বিয়ে হয়েছে। অথচ সেই বিয়েতে নেই কোনো হাসি, নেই কোনো স্বপ্ন। বিয়ের পরপরই যেন দায়িত্ব সেরে নেওয়ার মতো করেই শুভ্র তাকে এই ঘরে রেখে চলে গেছে। একটাও কথা না বলে। একটাও প্রশ্ন না করে।
পুষ্পিতা বিছানার এক কোণে বসে আছে। দুই হাত গুটিয়ে নিজের পেটের উপর রেখে। চোখ দিয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। থামানোর কোনো চেষ্টা করছে না সে। আজ আর শক্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আজ সে ক্লান্ত। জীবনটা কীভাবে যেন হঠাৎ উলটে গেছে।

হঠাৎ দরজায় হালকা শব্দ হয়। পুষ্পিতা মাথা তোলে।দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন এক রমণী। হাতে একটি প্লেট। মিলি ইয়াসমিন! পুষ্পিতা তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ঘরে তোলার সময় এক পলক দেখেছিল, আর বিয়ের সময় এক পলক, তখন মাথা নিচু ছিল, চোখে ছিল ভয়। এখন সে স্পষ্ট করে দেখছে। আশ্চর্য লাগে, এই মুখটার সঙ্গে শুভ্রর মুখের কতো মিল। বিশেষ করে চোখ দুটো। সেই একই স্থির দৃষ্টি।

মিলি ইয়াসমিন ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসেন। প্লেটটা বেডসাইড টেবিলের উপর রাখেন। প্লেটে পোলাও আর গরুর মাংস ভুনা। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকেন তিনি। তারপর ধীরে বলেন,
–” তোকে আমি খুব বাজে একটা সময় কয়েক ঝলক দেখেছিলাম, মা! তখন তুই খুব ছোট, বছর পাঁচেক বয়স হবে। ভাইজানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলি।”

পুষ্পিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। চোখের পানি আরও দ্রুত গড়িয়ে পড়ে। মিলি ইয়াসমিন আর কিছু না বলে তার চোখের পানি মুছে দেন। স্পর্শটা মায়ের মতো।
–” কাঁদিস না, মা! এই সময় কাঁদতে নেই। প্রেগন্যান্সির সময় মেয়েদের হাসিখুশি থাকতে হয়। তোর ভিতরে যে প্রাণটা আছে, সে সব অনুভব করে।”

পুষ্পিতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ভাঙা গলায় বলে ওঠে,
–” ফুপুমনি! আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। আমার সাথে কেন এমন হলো?”

কথাটা বলতে বলতে তার গলা ধরে আসে। বুকের ভেতরের জমে থাকা অভিমান, ভ’য়, লজ্জা, সব একসাথে বেরিয়ে আসতে চায়। মিলি ইয়াসমিন গভীর নিশ্বাস ফেলেন। চোখ নামিয়ে বলেন,
–” সত্যি বলছি, মা! শুভ্রর এই কাজ দেখে আমিও হতভম্ব। ও যে এতোটা দূর যাবে, আমি জানতামই না। জানলে আমি নিজেই ওকে আটকাতাম।”

পুষ্পিতা হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে মিলি ইয়াসমিনকে জড়িয়ে ধরে। ঠিক যেভাবে ছোটবেলায় ভয় পেলে কোনো বড় মানুষকে জড়িয়ে ধরা হয়। কাঁধে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে। মিলি ইয়াসমিন কিছু বলেন না। শুধু এক হাতে পুষ্পিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। ধীরে ধীরে। বারবার। কিছুক্ষণ পর মিলি ইয়াসমিন আলতো করে পুষ্পিতাকে নিজের থেকে সরিয়ে নেন। দুই আঙুলে তার ভেজা চোখের কোণ মুছিয়ে দেন খুব যত্ন করে।নরম গলায় বলেন,
–” আর কান্না করিস না, মা! সব ঠিক হয়ে যাবে। এতো কান্না করলে শরীর খারাপ হবে। আর তোর শরীর খারাপ হলে বাবুর কষ্ট হবে, মা।”

বাবু শব্দটায় পুষ্পিতার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলে,
–” ফুপুমনি! তুমি সেই দিন খুব কষ্ট পেয়েছিলে, তাই না? আমার বাবার পাপের ভোগ আমার উপর চেপে গেছে, ফুপুমনি!”

মিলি ইয়াসমিন যেন একটু চমকে ওঠেন। মুখে হালকা কঠিন ভাব আসে, তবে মুহূর্তেই তা নরম হয়ে যায়। তিনি পুষ্পিতার হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরে বলেন,
–” এরকম করে বলছিস কেন, মা? আমি তোর ফুপুমনি আগে, পরে শাশুড়ি। আর আমার ছেলে নিজের যন্ত্রণা মেটাতে এমন করেছে, ঠিকই। কিন্তু, আমার ছেলে মানুষ খুব ভালো। তুই খুব সুখী হবি, মা। আমার কাছে এসে কি তোর খারাপ লাগছে?”

পুষ্পিতা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ায়। চোখে জল টলমল করে ওঠে।
–” কী বলছো তুমি? আমি তো কখনো জানতেই পারিনি আমার এত মিষ্টি একটা ফুপুমনি আছে। কেন যে বাবা এমন করলো।”

কথাটা শেষ করতে পারে না সে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। বাবার কথা ভাবতেই তার ভিতরে রাগ আর কষ্ট একসঙ্গে জমে ওঠে। মিলি ইয়াসমিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। যেন অতীতের কোনো অদৃশ্য দরজা খুলে গেছে তার মনে। চোখের দৃষ্টি স্থির, কিন্তু গভীরে লুকানো দীর্ঘদিনের ক্ষত। তারপর তিনি দীর্ঘ এক নিশ্বাস ছেড়ে বলেন,
–” থাক, আর মন খারাপ করিস না, মা। আমি সব ভুলে গিয়েছি। কিন্তু আমার ছেলেটা মনে মনে সব পুষে রেখেছে। সেই যন্ত্রণাই ওকে এমন পথে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেটা যে এত ভয়ংকর হয়ে যাবে, আমি ভাবিনি।”

একটু থেমে প্লেটের দিকে তাকান মিলি ইয়াসমিন। স্বরটা বদলে যায়, মায়ের মতো আদুরে হয়ে ওঠে,
–” আচ্ছা, এই সব বাদ দে। খেয়ে নে।”

পুষ্পিতা মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে,
–” আমার খেতে ইচ্ছে করছে না, ফুপুমনি!”

মিলি ইয়াসমিন হালকা ধমকের সুরে বললো,
–” খেতে ইচ্ছে করছে না বললে হবে না। খেতেই হবে। এই সময় একদম খালি পেটে থাকা যাবে না। বেশি বেশি খেতে হবে। আমার একটা সুস্থ নাতি চাই, বুঝলি? আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”

এই বলে তিনি নিজ হাতে ভাত তুলে পুষ্পিতার মুখের কাছে ধরেন। পুষ্পিতা কোনো কথা না বলে খেয়ে নেয়। চোখে তখনও জল। সে তাকিয়ে থাকে মিলি ইয়াসমিনের দিকে, এতোটা আপন, এতটা মমতাময় মানুষ যে তার জীবনে হঠাৎ করেই এসে দাঁড়িয়েছে।
পুষ্পিতার মনে হঠাৎ তীব্র রাগ জমে ওঠে তার বাবার উপর। কী করে পারলো? নিজের আপন বোনের সঙ্গে এমন করতে, আর তারই ফল এসে পড়লো তার সন্তানের জীবনে।

খাওয়ানো শেষ হলে মিলি ইয়াসমিন পুষ্পিতার মুখটা ভালো করে মুছিয়ে দেন। প্লেটটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার দরজা খুলে যায়। এইবার মিলি ইয়াসমিনের হাতে একটা মাঝারি সাইজের প্যাকেট। চকচকে কাগজে মোড়া। পুষ্পিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মিলি ইয়াসমিন কাছে এসে বিছানার পাশে বসেন।
–” শাড়ি পরতে পারিস?”

পুষ্পিতা একটু থমকে যায়। এমন প্রশ্নের জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তারপর মাথা নিচু করে আস্তে বলে,
–” মোটামুটি পারি, ফুপুমনি!”

মিলি ইয়াসমিন হালকা করে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ান। দরজার দিকে তাকিয়ে সার্ভেন্টকে ডাক দেন। একজন সার্ভেন্ট তড়িঘড়ি করে এসে দাঁড়ায়।
–” জি, ম্যাম!”

–” বাগান থেকে ফুল ছিঁড়ে আনতে বলেছিলাম, এনেছো?”

–” জি, ম্যাম! এনেছি।”

–” তা হলে বিছানার চাদরটা পাল্টাও। ফুলগুলো সুন্দর করে ছড়িয়ে দাও। টুকটাক সাজিয়ে দিও ঘরটা।”

–” ঠিক আছে, ম্যাম!”

সার্ভেন্টরা কাজে লেগে যায়। নতুন চাদর বিছানো হয়, তাজা ফুলের গন্ধে ধীরে ধীরে ঘরটা ভরে ওঠে।এতোক্ষণ যে বাসর ঘরটা নিষ্প্রাণ ছিল, সে যেন আস্তে আস্তে শ্বাস নিতে শুরু করে। মিলি ইয়াসমিন তখন পুষ্পিতার দিকে ফিরে তাকান। চোখে গভীর মমতা।
–” আমার একমাত্র ছেলের বউকে আজ আমি নিজের হাতে সাজিয়ে দেবো। আয়।”

পুষ্পিতা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারে না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে মিলি ইয়াসমিনের দিকে। এমনটা সে কল্পনাও করেনি। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। মিলি ইয়াসমিন এগিয়ে এসে হালকা হেসে খুব আদর করে তার কপালে একটি চুমু এঁকে দেন। সেই চুমুতে কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো সামাজিক বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু নিখাদ মায়ের ভালোবাসা।পুষ্পিতা চোখ নামিয়ে নেয়। চোখের কোণে জমে থাকা জল আর ধরে রাখতে পারে না। আজ এই অচেনা ঘরেই, এই অপ্রত্যাশিত মানুষটার কাছেই, সে প্রথমবারের মতো একটু আশ্রয় খুঁজে পায়।

শুভ্র ধীরে পা ফেলে ঘরে ঢোকে। শুভ্র হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে যে দৃশ্যটা ফুটে ওঠে, তার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। বিছানায় বসে আছে পুষ্পিতা, তার অর্ধাঙ্গিনী। লাল শাড়িতে ঢাকা শরীর, চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া, হালকা অলংকার আর সামান্য সাজ। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণে আজ তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

শুভ্র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে নেয়। দরজায় লাগিয়ে দেয়। শব্দটা কানে বাজে। পুষ্পিতা ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে ভয় নেই, লজ্জা নেই, শুধু জমে থাকা ক্ষোভ। সোজা শুভ্রর দিকে তাকিয়ে সে কয়েক কদম এগিয়ে আসে। শুভ্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।নীরবতা ভাঙে পুষ্পিতার কণ্ঠ।
–” আমার সাথে কেন এমন করলে?”

শুভ্র কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
পুষ্পিতার বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। সে আচমকা শুভ্রর কলার চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে তোলে।
–” চুপ করে কেন আছো? বলো। কেন করলে এমন? আমার সাথে কেন খেললে এই নোংরা খেলা?”

শুভ্র তার হাত আলতো করে নামাতে চায়, গলা শান্ত রাখার চেষ্টা করে।
–” শান্ত হও, পুষ্প! এই সময় এতো উত্তেজিত হওয়া ভালো না। বাচ্চার ক্ষতি হবে।”

এই একটি শব্দেই পুষ্পিতা যেন পিছিয়ে যায়। হাতটা আলগা হয়ে আসে। সে দুই কদম দূরে সরে দাঁড়ায়।
চোখে তীব্র বিদ্রুপ।
–” বাচ্চা? কিসের বাচ্চা? এই সন্তান তো তোমার প্রতিশোধের গুটি মাত্র। আমাকে আর আমার সন্তানকে গুটি বানিয়ে এই নোংরা খেলা খেলেছো তুমি।”

শুভ্র গভীর নিশ্বাস নেয়। চোখ সরিয়ে নেয়।
–” আমি মানছি, তোমার ক্ষেত্রে অন্যায় করেছি। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না।”

পুষ্পিতার ঠোঁট কেঁপে ওঠে।
–” তাই বলে এইভাবে? আমার ভালোবাসাকে অপমান করে? আমার সন্তানকে অপমান করে?”

শুভ্র গলা শক্ত করে বলে,
–” আমি কোনো কিছুই অপমান করিনি। না তোমার ভালোবাসা, না আমার সন্তান। আমি তোমাকে বিয়ে করেই স্পর্শ করেছি। হ্যাঁ, তোমার গোপনে। কিন্তু এখানে অন্যায়টা কোথায়?”

এই কথাটা পুষ্পিতার বুকে ছুরির মতো বিঁধে যায়।
–” এই বিয়ে কি সমর্থনযোগ্য ছিল?”

শুভ্র এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে, তারপর ধীরে বলে ওঠে,
–” সঠিক ছিলো কিনা জানি না। তাই আবারও সমর্থনযোগ্য হওয়ার মতো বিয়ে করেছি।”

পুষ্পিতার চোখ ভিজে ওঠে। সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে যায়।
–” চলে যাও। আমার সামনে থেকে চলে যাও। তোমার মুখ আমি দেখতে চাই না।”

কথাগুলো শেষ হতে না হতেই তার গলা ভেঙে আসে। চোখের জল আর বাঁধ মানে না। মুখে হাত চাপা দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। শুভ্র এগিয়ে এসে পুষ্পিতাকে তুলতে চাইলে পুষ্পিতা আচমকা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে পিছিয়ে যেতে চায়। কিন্তু শুভ্র তাকে শক্ত করে ধরে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যেই জোর করে তাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়। তারপর নিজের বুকে চেপে ধরে রাখে। শুভ্রর গলা ভারী, কিন্তু চেষ্টা করছে শান্ত রাখতে।
–” শান্ত হও, পুষ্প! কী পাগলামি করছো?”

পুষ্পিতা ছটফট করতে করতে বলে ওঠে,
–” ছাড়ো আমাকে।”

শুভ্রর কণ্ঠস্বর হঠাৎ কঠিন হয়ে যায়।
–” এই মেয়ে! তোমার এইসব পাগলামির জন্য যদি আমার সন্তানের কোনো ক্ষতি হয়, মেরে ফেলবো কিন্তু আমি তোমাকে।”

এই কথায় পুষ্পিতা আর নড়াচড়া করে না। শরীরটা হঠাৎ নিথর হয়ে যায়। সে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে। শুভ্র খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। গলার সুর নরম করে আবার বলে,
–” পাগলামি কেন করছো?”

পুষ্পিতার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। অনেক কষ্টে প্রশ্নটা বেরিয়ে আসে,
–” ভালো কেন বাসলে না আমাকে?”

শুভ্র এক মুহূর্ত থমকে যায়। তারপর ধীরে বলে,
–” কে বলেছে ভালোবাসি না?”

পুষ্পিতার চোখ ভিজে ওঠে। বুকের ভিতরের জমে থাকা যন্ত্রণা শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসে।
–” আমি তো তোমার প্রতিশোধের অংশ মাত্র।”

শুভ্র গভীর নিশ্বাস নেয়। চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকায়।
–” যদি শুধুই প্রতিশোধ হতো, তাহলে আজ তোমাকে তোমার বাবার কাছেই রেখে চলে আসতাম। সেটাই হতো আমার বেস্ট প্রতিশোধ। কিন্তু আমি পারিনি।”

শুভ্র আবার পুষ্পিতার দিকে তাকায়।
–” কারণ প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ভালোবেসে ফেলেছি। এটা অস্বীকার করতে পারবো না।”

এই কথার পর পুষ্পিতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে শুভ্রর বুকে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। এতোক্ষণ যে কান্না জমে ছিল, তা একসাথে বেরিয়ে আসে। শুভ্র পুষ্পিতাকে আরও কাছে টেনে নেয়। গলা নরম হয়ে আসে।
–” এতো কান্না করা যাবে না, পুষ্পপরি! তোমার উপর অনেক ধকল গেছে। চলো, ঘুমাবে। এই সময় পরিপূর্ণ ঘুম খুব দরকার।”

পুষ্পিতা আর কোনো কথা বলে না। যেন সমস্ত প্রতিবাদ, প্রশ্ন, অভিমান কান্নার সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে গেছে। শুভ্র তাকে শুইয়ে দেয় বিছানায়। তারপর নিজে ফ্রেশ হয়ে আসে। ফিরে এসে পুষ্পিতাকে বুকে টেনে নেয়। এক হাত দিয়ে আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। ধীরে ধীরে পুষ্পিতার শ্বাস প্রশ্বাস সমান হয়ে আসে। সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
পুষ্পিতা ঘুমিয়ে গেলে শুভ্র নীচু হয়ে তার কপালে একটা চুমু এঁকে দেয়। তারপর তাকে আরও একটু কাছে টেনে নেয় নিজের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভ্রর চোখও বন্ধ হয়ে আসে।

–” তুই তাহলে যাবি?”
জেরিনের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে রোহান। সন্ধ্যার নরম আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এক থমথমে ভাব। জেরিন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। রোহানের প্রশ্নে সে ধীরে মুখ ফেরায়।
–” হ্যাঁ! ভাবছি যাবো।”

রোহানের বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সে একটু চুপ করে থাকে, তারপর স্বরটা নামিয়ে বলে,
–” শুভ্রর বউয়ের সাথে দেখা করতে গেলে তোর কষ্ট আরও বাড়বে।”

জেরিন হালকা হাসে।
–” যদি শুভ্র ভালো থাকে, তাহলে কষ্টের থেকে আনন্দই বেশি হবে।”

রোহান তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেক কথা জমে আছে গলায়। অবশেষে সে বলে ওঠে,
–” তোকে একটা কথা বলার ছিলো।”

–” বল।”

এক মুহূর্ত থামে রোহান। তারপর ধীরে বলে,
–” আমি অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছি।”

জেরিন চমকে তাকায় রোহানের দিকে। চোখ দুটো বড় হয়ে যায়।
–” কি?”

রোহান মাথা নাড়ে।
–” হুম!”

জেরিনের বুকের ভেতরটা ধপ করে ওঠে। এতোদিনে যে মানুষটা তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, সেও তবে চলে যাবে? কণ্ঠটা অজান্তেই ভেঙে পড়ে।
–” তুইও আমাকে ছেড়ে চলে যাবি?”

রোহান একটু এগিয়ে আসে।
–” যাবি আমার সাথে?”

এই প্রশ্নটার জন্য জেরিন মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে যেন মুহূর্তে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।
–” মানে?”

রোহান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানে।
–” স্বামী-স্ত্রীর ভিসা নিলে দ্রুত কাজ হবে।”

জেরিন একদম থ হয়ে যায়।
–” কিসব বলছিস?”

হঠাৎ রোহান হাত বাড়িয়ে জেরিনকে টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে। জেরিন চমকে উঠে তার দিকে তাকায়। রোহানের কণ্ঠে তখন আধা-ঠাট্টা, আধা-আবেগ,
–” শুভ্রর তো হিল্লে হয়ে গেলো। তুই আমার হিল্লে হয়ে যা না।”

জেরিন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর হালকা হেসে ওঠে।
–” এইটা প্রপোজ নাকি অন্য কিছু?”

–” প্লিজ!”

জেরিন আর কিছু বলে না। শুধু রোহানের মাথায় একটা ঠুসি মেরে দেয়।
–” পাগল!”

রোহান হেসে ওঠে। জেরিনও হেসে দেয় রোহানের হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ