#_ডাকঘর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৬_(রোমান্স এলার্ট)
–” এখানে কেন এনেছো আমাকে?”
শুভ্রর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ওঠে পুষ্পিতা। শুভ্র একটু হেসে জানালার পাশের পর্দাটা সরিয়ে দেয়।
–” এইটা আমার বাগান বাড়ি। ভাবলাম তোমাকে নিয়ে আসি। জায়গাটা আমার খুব পছন্দ। কেন, তোমার পছন্দ হয়নি?”
পুষ্পিতা কোনো উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশে তাকায়। মাঝারি আকৃতির বাড়ি, কিন্তু অসম্ভব পরিপাটি। দেয়ালের রঙ, কাঠের আসবাব, জানালার ধারে রাখা টব, সব মিলিয়ে একটা শান্ত, যত্নের ছাপ।
হালকা হেসে সে বলে,
–” অনেক পছন্দ হয়েছে।”
শুভ্রর চোখে স্বস্তির ঝিলিক খেলে যায়। পুষ্পিতা ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে যায়। বাইরে উঁচু পাঁচিল। পাঁচিলের ভেতর নানা রকম গাছ, আম, পেয়ারা, লেবু, সঙ্গে রঙিন ফুলের গাছ। সবুজে ভরা একটা ছোট পৃথিবী যেন। বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ, দূরে পাখির ডাক। কি সুন্দর পরিবেশ।
শুভ্র ধীরে এগিয়ে এসে পেছন থেকে পুষ্পিতাকে জড়িয়ে ধরে। পুষ্পিতা চমকে ওঠে। শরীরের ভেতর দিয়ে একটা শিরশিরে অনুভূতি বয়ে যায়। শুভ্রর স্পর্শটা দৃঢ়, কিন্তু তাতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বুকের কাছে তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা টের পায় পুষ্পিতা।
–” শুভ্র!”
কণ্ঠটা একটু কেঁপে যায়। শুভ্র কিছু বলে না। শুধু তাকে আরও একটু কাছে টেনে নেয়। তার হাত দুটো পুষ্পিতার পেটের ওপর এসে থামে। পুষ্পিতার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। শুভ্র ঝুঁকে তার কাঁধের কাছে মুখ নেয়। একটা হালকা, স্নিগ্ধ স্পর্শ রেখে আবার সোজা হয়। পুষ্পিতার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনটা হঠাৎ খুব জোরে বাজতে থাকে। শুভ্র ধীরে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। দুই জনের মুখ খুব কাছাকাছি। চোখে চোখ পড়ে। মুহূর্তটা ভারী হয়ে ওঠে। শুভ্র আস্তে করে তার ঠোঁটের দিকে এগোতেই পুষ্পিতা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
–” কি করছো?”
–” ভালোবেসে আদর করছি।”
–” এইসব ঠিক না।”
পুষ্পিতার চোখে দ্বিধা, ভয় আর টান—সব একসাথে।
শুভ্র এক মুহূর্ত থামে। তারপর খুব ধীরে বলে,
–” একটু বেঠিক হলে কিচ্ছু হবে না।”
পুষ্পিতা আর কিছু বলার আগেই শুভ্র পুষ্পিতার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দেয়। পুষ্পিতা কম্পিত হাতে শুভ্রর বাহু চেপে ধরে। বেশ কিছুক্ষণ পরে শুভ্র ধীরে ধীরে সরে আসে পুষ্পিতার ঠোঁট থেকে। তার মুখ নেমে যায় পুষ্পিতার গলার কাছে। হঠাৎ এই ঘনিষ্ঠতায় পুষ্পিতার শরীর শিরশির করে ওঠে। অজান্তেই কাঁপতে থাকে সে। দুই হাত দিয়ে শুভ্রর বুকে ঠেস দিয়ে নিজেকে একটু সরাতে চায়। শুভ্র থমকে যায়। ভ্রু কুঁচকে পুষ্পিতার মুখের দিকে তাকায়। পুষ্পিতা অস্পষ্ট স্বরে বলে,
–” বিয়ের আগে, এইসব ঠিক হবে না শুভ্র।”
শুভ্র একটু হেসে তার মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
–” বিয়ে তো আমি করবই। তাহলে এত ভয় কিসের? আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।”
–” কিন্তু…”
কথাটা শেষ করতে পারে না পুষ্পিতা। শুভ্র তার ঠোঁটে আঙুল রেখে খুব নরম স্বরে বলে,
–” হুশশ! এতো কথা এখন ভালো লাগছে না। একটু আদর করতে চাই, আর তুমি তাতে বাধা দেবে না।”
পুষ্পিতার বুকের ভেতর দ্বন্দ্বটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভয় আছে, আবার অদ্ভুত এক টানও। শুভ্র তাকে ধীরে কোলে তুলে নেয়। খুব সাবধানে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নিজের শার্ট খুলে পাশে রাখতেই পুষ্পিতা আবার বলে ওঠে,
–” শুভ্র, এসব কী করছো? বিয়ের আগে, এটা ঠিক হবে না।”
শুভ্র তার উপর আধশোয়া হয়ে পড়ে, কিন্তু নিজের ভার পুরোটা দেয় না।
–” কিচ্ছু হবে না, জান।বিয়ে তো করবোই। একটু আদর করি, প্লিজ! তুমিও গ্রহন করো। ভালো লাগবে।”
পুষ্পিতা কিছু বলার আগেই শুভ্র আবার তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়। স্পর্শটা আগের মতোই ধীর, কিন্তু গভীর। শুভ্র তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখে, যেন সে আবার নিজেকে সরিয়ে নিতে না পারে। পুষ্পিতা প্রথমে একটু প্রতিরোধ করে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার শরীরের শক্তিটা ঢিলে হয়ে আসে।
মনের ভেতরের সব ভয়, সব দ্বিধা যেন একপাশে সরে যায়। শুভ্রর আলিঙ্গনকে সে আর ঠেকাতে পারে না। বরং নিজেও ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সেই স্পর্শের দিকে, ভরসা আর অনিশ্চয়তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
ঘরের ভেতর তখন শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ, আর বাইরে বাগানের গাছগুলো নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে থাকে।
…
দুই মাস কেটে গেছে!!
বিকেলের আকাশে সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। সূর্যের শেষ আলো নদীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি রেখার মতো। ঢেউয়ের গায়ে সেই আলো ভেঙে ভেঙে ঝিলমিল করছে। অপূর্ব এক সৌন্দর্য।কিন্তু, সেই সৌন্দর্য ছুঁতে পারছে না নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুষ্পিতাকে।
আকাশী রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েটাকে আজ বড় ফ্যাকাশে লাগছে। চোখ দুটো লাল, ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে আছে, কিন্তু তাতেও কাঁপুনি থামছে না। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলেও সে আসলে কিছুই দেখছে না। তার চোখের সামনে শুধু ঘুরছে গত দুই মাসের স্মৃতি, অস্থির, বিভ্রান্ত, ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা।
কিছুক্ষণ পর পায়ের শব্দ শোনা যায়। পুষ্পিতা বুঝে যায়, শুভ্র এসেছে। পেছন থেকে এসে শুভ্র অভ্যাস মতো তাকে জড়িয়ে ধরে। কণ্ঠে হালকা হাসি,
–” কি হয়েছে, ম্যাডাম? এতো জরুরি তলব কেন?”
পুষ্পিতার শরীরটা কেঁপে ওঠে। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। ধীরে ঘুরে শুভ্রর দিকে তাকায়। তার মুখের অবস্থা দেখে শুভ্রর হাসিটা মিলিয়ে যায়। চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়, তারপর উদ্বেগ।
–” কি হয়েছে? এমন লাগছে কেন তোমাকে?”
পুষ্পিতা কিছু বলতে পারে না। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। সেই জলটা যেন সরাসরি শুভ্রর বুকে গিয়ে আ’ঘা’ত করে। শুভ্র এক পা এগিয়ে আসে।
–” পুষ্প! কি হয়েছে, জান? বলো আমাকে।”
পুষ্পিতা চোখ নামিয়ে নেয়। বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। অনেক কষ্টে, ভাঙা গলায় সে বলে,
–” তোমার অংশ আমি ধারণ করেছি।”
শুভ্র থমকে যায়। ভ্রু দুটো কুঁচকে যায়।
–” মানে? আমি বুঝলাম না।”
পুষ্পিতা এবার চোখ তোলে। সেই চোখে ভয়, অনিশ্চয়তা আর অজস্র প্রশ্ন।
–” আমি তোমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছি।”
মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিঃশব্দ হয়ে যায়। নদীর ঢেউ, বাতাসের শব্দ, সব যেন থেমে গেছে। কিন্তু, শুভ্র চমকায় না। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, নেই আতঙ্ক। বরং ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা বক্র রেখা ফুটে ওঠে। সেই হাসিটা অদ্ভুত, না পুরো আনন্দের, না পুরো স্বস্তির। পুষ্পিতার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে যায়। সে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর মুখের দিকে, একটুখানি আশ্বাসের আশায়। কিন্তু, শুভ্র তখন কী ভাবছে, সেটা তার চোখে ধরা পড়ে না। শুভ্র ভ্রু কুঁচকে পুষ্পিতার দিকে তাকায়।
–” কান্না করছো কেন? এইটা তো খুশির সংবাদ। আমি তো এইদিনের জন্যই বসে ছিলাম।”
পুষ্পিতা ধাক্কা খাওয়ার মতো তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে। সে কি ঠিক শুনছে? নাকি ভয় আর দুশ্চিন্তায় তার কান ভুল শুনছে?
–” মানে? কি বলছো তুমি এইসব? আমাদের এখনও বিয়ে হয়নি, শুভ্র! আর তুমি, তুমি এইসব কী বলছো?”
পুষ্পিতার কণ্ঠটা কাঁপছে। শুভ্র গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
–” ঠিকই বলছি। তুমি ভয় পেয়ো না। আগে আমার কাজ সারি। পরে তোমাকে সুখের সংসার আমি দিবো। কথা দিচ্ছি।”
এই কথাগুলো পুষ্পিতার মাথার ভেতর যেন আছড়ে পড়ে। আগে কাজ সারি? কী কাজ? কীসের অপেক্ষা? এতোদিনের ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি, সব কি তবে কোনো হিসেবের অংশ? সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে। কিছু বলার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে। শুভ্র আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। পুষ্পিতাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় গাড়ির দিকে।
–” শুভ্র! দাঁড়াও। কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
পুষ্পিতা প্রায় কাকুতি মিনতির সুরে প্রশ্ন করে। কিন্তু, শুভ্র কোনো উত্তর দেয় না। মুখ শক্ত, চোখ সামনে স্থির। গাড়ির দরজা খুলে পুষ্পিতাকে বসায়, নিজে চালকের আসনে বসে জোরে গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি ছুটে চলে অচেনা নীরবতায়। পুষ্পিতা বারবার জিজ্ঞেস করে,
–” কোথায় যাচ্ছি, বলো। প্লিজ বলো, শুভ্র!”
কিন্তু তার প্রশ্নগুলো যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। শুভ্র নিরুত্তর। কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামে। জায়গাটা দেখে পুষ্পিতার বুক ধক করে ওঠে। এটা তার নিজের বাড়ি। সে বিস্ময়ে শুভ্রর দিকে তাকায়। শুভ্র গাড়ি থেকে নেমে আসে, তারপর দরজা খুলে পুষ্পিতাকেও নামায়।
–” এখানে কেন এসেছি আমরা?”
পুষ্পিতার কণ্ঠে এখন শুধু ভয়। শুভ্র তার দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে ওঠে, যে হাসিটা পুষ্পিতাকে মোটেও আশ্বস্ত করে না। ধীরে ধীরে বলে শুভ্র,
–” সবটা ফেরত দিতে। যার জন্য আমার এতো অপেক্ষা। সব কিছুর অবসান হবে আজ।”
পুষ্পিতা হতভম্ব।
–” তোমার কথা একটাও আমার মাথায় ঢুকছে না।”
শুভ্র এক মুহূর্ত থামে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
–” ওয়েট করো, জান! সব বুঝতে পারবে। চলো।”
এই বলে সে আবার পুষ্পিতার হাত ধরে। এবার তার ধরাটা আগের চেয়েও শক্ত। পুষ্পিতা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে, এই মানুষটাকে কি সে সত্যিই চিনত? শুভ্রর দৃষ্টি তখন তার দিকে নয়। শক্ত, স্থির চোখে সে তাকিয়ে আছে বাড়িটার দিকে। যেন, সেখানে গিয়েই কোনো হিসেব চুকানো বাকি।
আর পুষ্পিতা, নিজের অজান্তেই, টানতে টানতে এগিয়ে চলে সেই অজানা পরিণতির দিকে।
…
ড্রইংরুমটা বিকেলের আলোয় শান্ত। দেয়ালের ঘড়িটা টিকটিক করে সময় গুনছে। এক কোণে সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন ফিরোজ রহমান। চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ বুলাচ্ছেন শিরোনামগুলোতে। পাশের সোফায় বসে পাখি বেগম ধীরে ধীরে জিকির করছেন। ঠোঁট নড়ছে, চোখ বুজে আছে। আরেক পাশে পিয়াস আধশোয়া হয়ে মোবাইলে ভিডিও গেমে ডুবে আছে, চারপাশের কিছুই তার নজরে নেই। হঠাৎ করেই কলিং বেলের শব্দ। পাখি বেগম চোখ মেলে তাকান। জিকির থামিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়ান।
–” এই সময় কে আবার?”
দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলতেই তিনি একটু থমকে যান। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুভ্র। তার পাশে পুষ্পিতা। এক মুহূর্তের জন্য পাখি বেগমের চোখে বিস্ময় জমে ওঠে। তারপর স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে তিনি বলে ওঠেন,
–” আরে শুভ্র বাবা! এসো এসো, ভেতরে এসো।”
শুভ্র মাথা ঝুঁকিয়ে হালকা হাসে। পুষ্পিতা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাতটা শক্ত করে ধরা শুভ্রর হাতে।
দুই জন ভেতরে ঢুকতেই ড্রইংরুমের পরিবেশ বদলে যায়। ফিরোজ রহমান খবরের কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রাখেন। পিয়াস গেম থামিয়ে উঠে বসে। তিন জনের দৃষ্টিই একসাথে গিয়ে পড়ে শুভ্র আর পুষ্পিতার হাতের দিকে। হাত ধরা। এই দৃশ্যটা অস্বস্তিকরভাবে চোখে লাগে।
ফিরোজ রহমান ভ্রু কুঁচকে তাকান। পাখি বেগমও জিকিরের তসবিহটা শক্ত করে ধরেন। পিয়াস কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকে। শুভ্র ধীরে পুষ্পিতার হাত ছেড়ে দেয়। সেই মুহূর্তে পুষ্পিতার মনে হয়, হাতটা ছেড়ে নয়, যেন সে নিজেই শূন্যে পড়ে গেল। শুভ্র এগিয়ে এসে ফিরোজ রহমানের সামনে দাঁড়ায়।ফিরোজ রহমানও উঠে দাঁড়ান। শুভ্রর মুখে হালকা, অদ্ভুত এক হাসি।
–” কেমন আছেন, মামাজি?”
এক সেকেন্ডের জন্য ঘরটা যেন নিঃশব্দ হয়ে যায়।ফিরোজ রহমান ভ্রু কুঁচকে তাকান।
–” মানে? মামাজি? কীসব বলছো?”
শুভ্র একটুও বিচলিত নয়। বরং আরও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
–” আপনার বোন যদি মিলি ইয়াসমিন হয়, আর তার সন্তান যদি আমি হই, তাহলে সম্পর্কে আপনি তো আমার মামাই হবেন, তাই না?”
পাখি বেগম চমকে ওঠেন। ফিরোজ রহমানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। চোখের ভেতর দিয়ে যেন এক ঝলক পুরনো কোনো স্মৃতি ছুটে যায়। তিনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে যান। আর পুষ্পিতা, সে হতভম্ব হয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে থাকে। মিলি ইয়াসমিন? এই নামটা সে কখনো শোনেনি। তার বাবার কোনো বোন আছে, এই কথাটাই তো কোনোদিন জানা ছিলো না।তার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।
পুষ্পিতা ধীরে ঘুরে ফিরোজ রহমানের দিকে তাকায়।ফিরোজ রহমান চোখ নামিয়ে নেন। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরেন। পাখি বেগম অসহায় দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকান। পিয়াস পুরো ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে একবার শুভ্র, একবার পুষ্পিতার দিকে তাকায়। শুভ্র তখনও নিশ্চিন্ত। যেন বহুদিনের অপেক্ষার পর ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছে। ফিরোজ রহমান ঠোঁট কাঁপে, গলা শুকিয়ে আসে।
–” কি বলছো তুমি? তুমি মিলির সন্তান?”
শুভ্রর মুখে তখন কোনো দ্বিধা নেই। বরং ঠোঁটের কোণে জমে থাকা ঠান্ডা হাসিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
–” জি! যাকে একদিন আপনি অবৈধ সন্তানের মা বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন।”
একটু থেমে, চোখ দুটো সরাসরি ফিরোজ রহমানের চোখে রেখে সে যোগ করে,
–” কিন্তু শুধু এটুকুই নয়, আপনার আর আমার আরেকটা সম্পর্কও আছে। বলবো?”
ফিরোজ রহমান কিছু বলতে পারেন না। চোখের সামনে যেন ঝাপসা হয়ে আসে সবকিছু। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাখি বেগমের গলাও শুকিয়ে কাঠ। তসবিহর দানাগুলো হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা।
আর পুষ্পিতা, তার মনে হচ্ছে, সবকিছু মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। শব্দ আছে, দৃশ্য আছে, কিন্তু কিছুই সে ঠিকমতো ধরতে পারছে না। শুধু বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে। পিয়াস অবশ্য এসবের কিছুই বুঝছে না। সে অবাক চোখে একবার শুভ্রর দিকে, একবার বাবার দিকে তাকায়। শুভ্র আবার কথা বলে ওঠে।
–” আপনার কন্যার গর্ভে যে অবৈধ সন্তান ধারণ হয়েছে, তার পিতা আমি।”
মুহূর্তের মধ্যে যেন সবার মাথার ওপর বজ্রপাত হয়।
পুষ্পিতার শরীরটা কেঁপে ওঠে। পা দুটো যেন মাটিতে বসে যেতে চায়। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, থামানোর কোনো চেষ্টা সে করে না। ফিরোজ রহমান আর পাখি বেগমের দৃষ্টি একসাথে গিয়ে পড়ে পুষ্পিতার দিকে। সেই দৃষ্টি ভারী, বিস্ময়ে ভরা, আ’ঘা’তে জর্জরিত। শুভ্র থামে না। এতদিনের জমে থাকা কথাগুলো যেন এক নিঃশ্বাসে বেরিয়ে আসতে চায়।
–” আজ কি আপনার মেয়েকেও বের করে দেবেন না? ঠিক যেভাবে একদিন আমার মাকে বের করে দিয়েছিলেন?”
ফিরোজ রহমানের শরীর কাঁপতে থাকে। সোফার হাতল ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকেন। পাখি বেগমের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে নিঃশব্দে।
শুভ্র এগিয়ে আসে এক ধাপ।
–” মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার মাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন আপনি। অথচ আমি আমার মায়ের বৈধ সন্তান। আমার বাবা শফিক চৌধুরী! যিনি চিকিৎসার অভাবে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু, আপনি আমার মাকে কলঙ্কিত করেছিলেন। বলেন তো, কেন?”
পুষ্পিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে। তার চোখের জল পড়ছে ঠিকই, কিন্তু এই গল্প, এই ভয়াবহ সত্য, সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। শুভ্রর গলা ধারালো হয়।
–” কারণ একটাই। আমার মা আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমার বাবার হাত ধরে এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো। সেই অপরাধেই, তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদের সময়, আপনি তাকে সবচেয়ে বড় অপবাদটা দিয়েছিলেন।”
শুভ্র চারপাশে তাকায়, ঘরের দেয়াল, আসবাব, সবকিছুর দিকে।
–” এই সম্পত্তি আপনি একা ভোগ করতে চেয়েছিলেন। নিজের বোনের সাথেই এই নোংরা খেলা খেলেছিলেন আপনি।”
ফিরোজ রহমান চোখ নামিয়ে নেন। কিছু বলার শক্তি নেই। শুভ্র থামে না।
–” আমার মা বাবাকে বিয়ে করার পর বহুবার আপনার সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলো। কিন্তু, আপনি সবসময় তাকে আপনার যোগাযোগের বাইরে রেখেছেন। কেন? কারণ আপনি ভয় পেতেন, সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে। যেদিন আমার মা স্বামীহারা, সর্বস্ব হারিয়ে আপনার কাছে আশ্রয় চেয়েছিলো, সেদিন আপনি ভাই হয়ে তার শরীরে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। অবৈধ সন্তানের মা, এই তকমা।”
শুভ্র জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে।
–” একটা বৈধ, নিরপরাধ সন্তানকে অবৈধতার খেতাব দিয়েছিলেন শুধু এই সম্পত্তির লোভে। কারণ, আপনার বোন আপনার পছন্দের বাইরে বিয়ে করেছিলো। ছিঃ! আপন ভাই হয়ে এতো বড় নিচ কাজ কিভাবে করতে পারলেন আপনি?”
কেউ কোনো কথা বলে না। ফিরোজ রহমান স্তব্ধ। পাখি বেগম নিঃশব্দে কাঁদছেন। পিয়াস বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর পুষ্পিতা, সে অনুভব করে, আজ শুধু একটি পরিবারের নয়, একটা মুখোশেরও পতন হচ্ছে। শুভ্র একটু সময় নিয়ে বলে ওঠে,
–” সেইদিনই আমি আপনার ছোট্ট মেয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ঠিক এই একই যন্ত্রণায় একদিন আপনাকে ভরিয়ে দেবো। ঠিক এই জায়গাতেই আপনাকে দাঁড় করাবো, যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি আমার মাকে একদিন ভেঙে দিয়েছিলেন।”
ফিরোজ রহমান মাথা তুলতে পারেন না। শুভ্রর কণ্ঠ আরও ধারালো হয়। সে ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি টেনে নেয়।
–” কাকতালীয়ভাবে, আপনার অসুস্থতার রাত আমাকে ব্যাপারটা অনেক সহজ করে দিয়েছিলো।”
পুষ্পিতা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। কখনো শুভ্রর দিকে, কখনো বাবার দিকে। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, এই মানুষটা কি সে সত্যিই চিনতো? শুভ্র আবার ফিরোজ রহমানের দিকে ফিরে দাঁড়ায়। সে ঠান্ডা গলায় বলে,
–” আজ যদি আমি আপনার মেয়েকে স্বীকৃতি দিই, তাহলে আপনার মেয়ের সন্তান বৈধতার টিকিট পাবে। আর যদি না দিই, এই সন্তান সারাজীবন অবৈধতার তকমা নিয়ে ঘুরবে। কেমন লাগছে, মি. ফিরোজ রহমান? নিজের কন্যাকে অবৈধ সন্তানের জননী হিসেবে দেখতে কেমন লাগছে?”
পুষ্পিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে নিশ্বাস নিতে ভুলে যায়। শুভ্র এক ধাপ এগিয়ে আসে।
–” আজ পিয়াসকে বলুন, আপনার মেয়েকে বের করে দিতে। যেমন একদিন আপনি আমার মাকে বের করে দিয়েছিলেন। আজ আপনি নিজেই বের করে দিন আপনার মেয়েকে।”
ফিরোজ রহমান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। ধপ করে বসে পড়েন সোফার উপর। মুখটা সাদা হয়ে গেছে, চোখ দুটো ফাঁকা। পুষ্পিতা যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শরীর আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। পাখি বেগম আচলে মুখ ঢেকে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকেন।
এই নীরবতার ভেতরেই শুভ্র আবার কথা বলে ওঠে। সে ধীরে বলে,
–” কিন্তু, আমি আপনার মতো কুচুটে মানসিকতার মানুষ নই। আমি পারিনি, নিজের সন্তানকে অসম্মান করতে। পারিনি তাকে অবৈধতার ট্যাগ লাগাতে। আমি শুধু আপনাকে সেই যন্ত্রণাটা বোঝাতে চেয়েছি, যেই যন্ত্রণায় আমি আর আমার মা পুড়ে পুড়ে বেঁচেছি।”
এক মুহূর্ত থেমে শুভ্র স্পষ্ট করে বলে,
–” পুষ্পিতা আমার স্ত্রী!”
শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো নেমে আসে। পুষ্পিতা চমকে ওঠে। স্ত্রী? বিয়ে? কখন? কীভাবে? পাখি বেগম আর ফিরোজ রহমান দুই জনেই একসাথে চমকে তাকান। শুভ্র ধীরে পুষ্পিতার সামনে এসে দাঁড়ায়। সে নরম স্বরে বলে,
–” মনে আছে তোমার? আমি একদিন ভালোবাসার কাগজ বলে কিছু কাগজে তোমার স্বাক্ষর নিয়েছিলাম?”
পুষ্পিতা ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে। স্মৃতির ভেতরটা নড়েচড়ে ওঠে। শুভ্র শান্তভাবে বলে,
–” সেই কাগজগুলোর দুই পৃষ্ঠা নিচেই ছিল তোমার আর আমার বিয়ের কাগজ।”
পুষ্পিতার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে। তার ভেতরের পৃথিবীটা তখন ভেঙে নতুন করে গড়ে উঠছে, ঠিক কোন রূপে, সে নিজেও জানে না। শুভ্র আস্তে করে বললো,
–” আজ তোমার আর আমার আবার বিয়ে হবে।”
পুষ্পিতা চমকে তাকায়। শুভ্র থামে না।
–” আমার মায়ের সামনে। সম্পর্কে যে তোমার আপন ফুপুমনি হয়। আর হ্যাঁ, নিজের পরিবারটাকে শেষবারের মতো ভালো করে দেখে নাও।”
পুষ্পিতার বুকটা ধক করে ওঠে। শুভ্র চোখ সরিয়ে নেয় না। কঠিন কণ্ঠে বলে,
–” কারণ, আমার বাড়িতে ঢোকার পর এই মুখগুলো আর কোনোদিন তুমি দেখতে পারবে না।”
পুষ্পিতার চোখে পানি জমে ওঠে। ঠোঁট কাঁপতে থাকে।শুভ্র ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি টানে।
–” আর যদি তুমি এখানে থাকতে চাও, থাকতে পারো। অবৈধ সন্তানের মা হয়ে। পারবে?”
এই কথাটা যেন ছু’রি হয়ে পুষ্পিতার বুকে বসে যায়।সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় মোচড় দেয়। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর শুভ্র আবার বলে ওঠে, আগের চেয়েও কঠিন গলায়,
–” সরি টু সে, তুমি এখানে থাকতে পারবে না।”
পুষ্পিতার চোখ খুলে যায়। শুভ্র বলে,
–” কারণ, আমি আমার সন্তান হারাতে পারবো না। চলো।”
এই এক শব্দে যেন সব শেষ হয়ে যায়। শুভ্র পুষ্পিতার হাত ধরে হাঁটা দিতে চাইলে
–” শুভ্র!”
পুষ্পিতার কণ্ঠটা ভেঙে যায়। শুভ্র থেমে যায়। পুষ্পিতা কান্নায় ভেঙে পড়ে। চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারে না।
–” আমি, আমি ওদের একটু জড়িয়ে ধরে আসি, প্লিজ!”
শুভ্র কিছু বলে না। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ধীরে তার হাত ছেড়ে দেয়। এই সুযোগটুকুই পুষ্পিতার জন্য যথেষ্ট। সে দৌড়ে গিয়ে পাখি বেগমকে জড়িয়ে ধরে। পাখি বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। যেন নিজের বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে। পিয়াসও এগিয়ে আসে। পুষ্পিতা তাকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে থাকে। পিয়াস কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারছে না, শুধু এটুকু বুঝছে, তার আপুনি চলে যাচ্ছে। কাঁপা কণ্ঠে পিয়াস বলে,
–” তুমি আর আসবে না, আপুনি?”
পুষ্পিতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। চোখ ভেজা, কণ্ঠ ভারী।
–” বাবার পাপের বোঝা আমাকে টানতে হবে ভাই। তুই মা-বাবার দিকে খেয়াল রাখিস।”
এই কথা শুনে পিয়াস শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে।
পুষ্পিতা এবার ধীরে ফিরোজ রহমানের দিকে এগোতে চাইলে, শুভ্র তার হাত ধরে টেনে ধরে।
শুভ্রর চোখ কঠিন। কণ্ঠে ঘৃণা স্পষ্ট,
–” আমার সন্তান গর্ভে নিয়ে ঐ লোকটার কাছে যাওয়া যাবে না। অনেক হয়েছে। চলো।”
পুষ্পিতার আর কিছু শোনে না সে। শুভ্র তাকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যায়। পুষ্পিতাকে গাড়িতে বসায়। নিজেও উঠে স্টার্ট দেয়। গাড়ি দ্রুত চলে যায়। ভেতরে তখন আর্তনাদ। পাখি বেগম ফ্লোরে বসে পড়েন। পিয়াসকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। পিয়াসও কাঁদে, কিছু না বুঝেই। আর ফিরোজ রহমান? তিনি বুকে হাত চেপে ধরেন। মুখটা বিবর্ণ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতরের যন্ত্রণা যেন আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
