আমার মন কেমন করে,
দ্বিতীয় পর্ব
২.
রাশেদের সাথে বিয়েটা অবশ্য শিউলির আগ্রহেই হয়েছিল। এর আগে কত শত বিয়ের প্রস্তাব যে পরিবার থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তার কোনো হিসেব নেই ।
ব্যাপার টা এমন নয় যে, বিয়ে নিয়ে শিউলির পরিবারের বা শিউলির খুব উচ্চাকাংখা ছিল।
এমনও নয় যে মেয়ে সুন্দরী বলে, ওদের মনে অহংকার ছিল। শিউলির বিয়ে নিয়ে বরং পরিবারের সকলেই কিছুটা আতংকে ছিল ।
হবে না কেন? ঠিকঠাক বড় হবার আগেই, বিয়ে বিয়ে করে মাথা খারাপ করে ফেলেছিল চারপাশের লোকজন ।
মফস্বলে সুন্দরী মেয়ে হলে তার বিপদের শেষ থাকে না। চেনা অচেনা সবার কাছেই কেমন করে যেনো দু চার টা বিবাহযোগ্য পাত্রের সন্ধান থাকে।
সুযোগ পেলেই তারা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে চলে আসবে।
এমনকি পাড়ার বখাটে ছেলেপুলেরা উৎপাত করলেও সবাই একটাই পরামর্শ দিবে,
__মানসম্মান নষ্ট হবার আগেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দাও।
সেই কতো আগের কথা… শিউলির পরিষ্কার মনে আছে এখনো , সে তখন মাত্র ক্লাস এইটে উঠেছে ।
এলাকার চেয়ারম্যানের ইটালি প্রবাসী ছেলের জন্য, শিউলির বিয়ের প্রস্তাব এলো। স্কুলে যাবার পথে শিউলিকে দেখে ছেলের এতোটাই পছন্দ হয়েছে যে… পারলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়!
শিউলির আম্মা তো ভয়ে অস্থির, আর আব্বা রেগে পুলিশ টুলিশ খবর দিয়ে ফেলেছে।
এদিকে চেয়ারম্যান তো একেবারে নাছোড়বান্দা । পুলিশকে তারা মোটেও ভয় পায় না।যে করেই হোক, এই মেয়ে তাদের চাই।
পাড়ায় হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল সেইসময়।
শিউলির আব্বা ছিলেন স্কুলের হেডমাস্টার ।
সজ্জন লোক হিসেবে এলাকায় খুব সুনাম ছিল তার। সেই কারণেই, এলাকার গন্যমান্য কিছু লোকজন মিলে, চেয়ারম্যান সাহেবকে বুঝিয়ে ঠান্ডা করেছিলেন।
তখনকার মতো বিয়েটা হয়তো আটকানো গিয়েছিল, তবে অশান্তি কমে নি।
স্কুল কলেজের শিক্ষক থেকে শুরু করে, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন, এমনকি কোথাও দাওয়াতে গেলেও একটা না একটা বিয়ের প্রস্তাব আসবেই।
সবাইকে মানা করে করে বাড়িতে সবাই মোটামুটি ক্লান্ত।
একটা সময়ে তো কোনো রকম লুকোছাপা না করেই, মানুষজন মুখের উপর বাঁকা কথা বলতে শুরু করলো…
__এতো বাছাবাছির ফল কখনো ভালো হয় না। দেখবো, কোন রাজপুত্তুরের কাছে বিয়ে দেন মেয়েকে! এতো ভালো ভালো প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছেন, পরে কিন্তু হায় হায় করবেন। এমনিতেও অতি বড় সুন্দরী ভালো বর পায় না… ইত্যাদি ইত্যাদি।
শিউলির আব্বা মানুষ হিসেবে যেমন সৎ ছিলেন, মনের দিক থেকেও ছিলেন তেমনই শক্ত ধাচের ।
তিনি কারো কথায় কান দেননি।উনার একটাই কথা ছিল,
__শিউলি আমার বড় মেয়ে।কাজেই তাকে লেখাপড়া শেষ করতেই হবে।না হলে, ছোট তিনজনেরও লেখাপড়া হবে না।
কিন্তু কোনরকম অসুস্থতা ছাড়া, হঠাৎ একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তিনি।
চার সন্তান নিয়ে শিউলির আম্মার মাথায় একেবারে আকাশ ভেঙে পড়লো ।
এইবার আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী নতুনভাবে ভয় দেখানো শুরু করলো।,
__ বাপ বেঁচে না থাকলে মেয়েদের কখনো ভালো বিয়ে হয় না । এতো এতো প্রস্তাব আমাদের মুখের উপর ফিরিয়ে দিয়েছে, এখন দেখবো কোন রাজপুত্তুরের সাথে বিয়ে হয়!
আমাদের চারপাশে থাকা মানুষগুলো কখনো কখনো কতোটা নিষ্ঠুর হয়ে যায়, তারা নিজেরাও হয়তো জানে না।
শিউলির আব্বা মারা যাবার একমাস পরের কথা, শিউলির তখন ডিগ্রি পরীক্ষা চলছিল।
পাড়ায় কাইয়ুম চাচার ছেলের বিয়ে। তিনি শিউলির আব্বার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
তবে,পরীক্ষার মাঝখানে বিয়েতে যাবার প্রশ্নই আসেনা। তার উপর আব্বা মারা গেছে একমাস আগে, মনের অবস্থাও বেশ খারাপ।
কিন্তু চাচা নিজে এসে শিউলির আম্মাকে বোঝালেন,
“চাচীর ছোটবেলার সই আসবে বিয়েতে।সইয়ের একমাত্র ছেলের জন্য মেয়ে খুঁজছে তারা। ছেলে বিসিএস দিয়ে সরকারি কলেজে ঢুকেছে।সইয়ের মেয়েও একটা, সে থাকে বরের সাথে আমেরিকায়। একদম নিরিবিলি আর ভদ্র পরিবার।”
শিউলির আম্মা তখন মেয়ের বিয়ের জন্য একেবারে উতলা হয়ে আছেন।
শিউলিকে কিছুটা জোর করেই বিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো।
তবে সেখানে গিয়ে, বিয়ে বাড়ির ভীড়ের মধ্যেও রাশেদকে আলাদা ভাবে চোখে পড়লো শিউলির ।
অচেনা এক বাড়িতে এসে, বিয়েবাড়ি পুরো মাতিয়ে রেখেছিল ছেলেটা। বিয়েবাড়ির হাজারটা কাজ হাসিমুখে করছিল সে, মনে হচ্ছিল ওই বিয়েবাড়ির সব কাজের দায়িত্ব বুঝি এক রাশেদের উপর।
আর রাশেদের আম্মাকে দেখে মনে হয়েছিল, তার বুক ভর্তি কেবল স্নেহ আর ভালোবাসা। শিউলির বাবা হঠাৎ মারা গেছেন শুনে, অনেকক্ষণ তাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন।
শিউলিকে দেখে রাশেদেরও পছন্দ হলো বেশ। সেই সাথে নিজের পরোপকারী স্বভাব দিয়ে , সবার মন জয় করে নিলো রাশেদ।
বললো,
__বিয়েতে শিউলির আম্মা একটাকাও খরচ করতে পারবে না। শিউলির তিন ভাইবোনের লেখাপড়া চলছে। ওদের জন্য টাকা রাখাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।কে কি বললো না বললো, তা নিয়ে শিউলির আম্মাকে ভাবতে হবে না।
শিউলির মনে হয়েছিল এমন একটা বর, এমন একটা পরিবারের স্বপ্নই দেখেছে সে।
কাইয়ুম চাচার ছেলের বিয়ের আসরেই, শিউলির বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেল।
স্বপ্নের মতো কয়েকটা দিন কেটেছিল।
পরীক্ষার আগের দিন, রাশেদ এসে কয়েক ঘন্টা সময় নিয়ে শিউলিকে পড়া বুঝিয়ে দিতো। তারপর পরীক্ষা শেষে, ছোটভাইবোনদের সাথে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতো।
পাড়া প্রতিবেশী সবাই তখন রাশেদকে দেখে মুগ্ধ।
শিউলির আম্মাও সৃষ্টিকর্তার কাছে দুহাত তুলে বারবার শুকরিয়া আদায় করতেন , হবু জামাইয়ের আন্তরিকতা দেখে।
কি এক অপার আনন্দে, শিউলির চোখ ভিজে উঠতো বারবার।
এরকম আনন্দ আর চোখভরা স্বপ্ন নিয়েই রাশেদের বউ হয়ে এসেছিল শিউলি।
বিপত্তি শুরু হলো, বৌভাতের রাত থেকে।
সারারাত বন্ধুদের সাথে কাটিয়ে ভোরবেলা বাড়ি ফিরলো রাশেদ। এতটুকু অপরাধবোধ ছিল না তার চোখেমুখে।
আত্মবিশ্বাসী গলায় বললো,
__বিয়ে করলেই যারা বন্ধুদের ভুলে যায়, তাদের দলে রাশেদ পড়ে না।সে কথা আজ প্রমাণ করে দিয়েছে সে।
সেদিন অবশ্য রাশেদের বন্ধুপ্রীতির তীব্রতা আন্দাজ করতে পারেনি শিউলি। সেটা বুঝতে পেরেছিল, হানিমুনের স্বপ্ন ভেঙে যাবার পর।
রাশেদের ছোট বোন রাখী বিয়েতে আসতে পারে নি, তাই পরিবারের সবারই কমবেশি মন খারাপ ছিল । তবে ,সবচেয়ে বেশি মন খারাপ ছিল রাশেদের।
ভাইকে খুশি করতে, ভাই-ভাবীর জন্য মালদ্বীপে হানিমুনের ব্যবস্থা করেছিল রাখী। তাছাড়া, ভাইয়ের স্বভাবও তার ভালোই জানা। সবদিক ভেবেই বিয়ের উপহার হিসেবে, হানিমুন প্যাকেজ উপহার পাঠিয়েছে বোন।
কিন্তু রাশেদ শুনেই মুখ ভেংচি কেটে বললো,
__টাকা খরচ করে নিজেকে হোটেলের রুমে আটকে রাখার মতো বোকামি, দ্বিতীয়টা নেই। তোমার সাথে সময় কাটাতে, ভাড়া করা রুমে থাকতে হবে কেন বলোতো, শিউলি?বউয়ের সাথে সবচেয়ে কমফোর্টেবল জায়গা হলো, নিজের বাড়ির বেডরুম। তুমি কি বলো?আমাদের বাড়িই তো খালি পড়ে আছে, বেস্ট হানিমুন প্লেইস এভার…হাহাহা।
রাশেদের এইসব কথায় শিউলির মন খারাপ হয়েছিল। তবে সে কল্পনাও করতে পারে নি যে, একটা ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে হানিমুনের ফ্লাইট মিস করবে রাশেদ।
খুব কেঁদেছিলো সেদিন শিউলি।
একটা মানুষ এতো বন্ধুপাগল হতে পারে!
শাশুড়ি মা তাকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন , নিজের অসহায়ত্ব আর অপারগতার কথা। রাশেদের খামখেয়ালি স্বভাবের কথা।
তিনি নতমুখে বললেন, শিউলি ই এখন তার একমাত্র ভরসা।
অবশ্য মাস খানেকের মধ্যে শিউলি বুঝে গেলো, শিউলির রূপ কিংবা ভালোবাসা কোন কিছুই রাশেদেকে ঘরে বা সংসারে আটকে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।
সে এক অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ!
এই মানুষের সাথে সংসার করা খুব একটা সহজ হবে না। চাইলে সংসার ভেঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু ছোট তিনটা ভাইবোনের দায়িত্ব নিয়েই শিউলির আম্মা দিশাহারা ।শিউলি কেমন করে
সেই বোঝা আরো ভারী করে দেবে ?
তারচেয়ে বড় কথা হলো, বাড়িতে রাশেদ যা ই করুক না কেন, শিউলির ছোটভাইবোন আর আম্মার প্রতি রাশেদ যথেষ্ট দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছিল ।সেই কথা শিউলি কি করে অস্বীকার করবে?
চলার পথে পদে পদে কষ্ট পেয়েছে শিউলি।কতো রাত একা ঘরে কেঁদে কাটিয়েছে , সেই হিসেব কারো কাছে নেই।
বহুবার শিউলি ভেবেছে, রাশেদকে সংসারের বাঁধন থেকে পুরোপুরি মুক্ত করে দিবে ।
কিন্তু, সাহস করে সেই ভাবনাকে সত্যি করে তুলতে পারেনি কখনো ।
শিউলির সবসময় জানতো,
আত্মীয় স্বজন,পাড়া প্রতিবেশীরা তৈরি হয়ে আছে …খুশি মনে শিউলির ব্যর্থ সংসারের গল্প বলার জন্যে।
এরপরও আশা ছিল, সংসারে নতুন অতিথি এলে হয়তো রাশেদ কিছুটা ঘরমুখী, সংসারমুখী হবে।
কিন্তু না, সেরকম কিচ্ছু হয় নি।
ছেলেমেয়েদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও, বন্ধুদের ছাড়তে পারেনি কখনো ।
শিউলিও ততদিনে দুই সন্তান আর শাশুড়ি মাকে নিয়ে নিজের মতো একটা জগৎ তৈরি করে নিতে পেরেছিল।
সেই জগতে রাশেদ অতিথির মতো ।কখন আসে কখন যায়, বোঝার উপায় নেই।
এভাবেই তো কেটে গেলো উনিশটা বছর।
৩.
ডাক্তার এসে যখন জানালেন, রাজিয়া খাতুন আর নেই… হাসপাতালের আশেপাশের সব মসজিদে তখন মাগরিবের আজান হচ্ছে।
ডাক্তার এটাও জানালেন, রাশেদের অবস্থা এখন অনেকটাই ভালো… জ্ঞান ফিরেছে, শিউলি চাইলে দেখা করতে পারে।
হ্যা, রাশেদও এই হাসপাতালেই ভর্তি রয়েছে ।
মায়ের খবরটা শুনে, বিয়ে বাড়িতে কার যেন মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা হয়েছিল রাশেদ ।তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে, রাস্তায় তার ভয়াবহ একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে।
একই হাসপাতালে থেকেও মায়ের সাথে শেষ দেখা হয় নি রাশেদের।
শিউলির কাছ থেকে সবকিছু জেনে, শেষ পর্যন্ত রাখী আপু খবরটা রাশেদের কাছে পৌঁছিয়েছিল।উনার সাথে রাশেদের সব বন্ধুদের যোগাযোগ হয়।
রাখী আপুও যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব রওনা হবেন।
শিউলির ছোট দুই ভাই থাকে অন্য শহরে। রাশেদের এক্সিডেন্টের খবর শুনেই তারা রওনা হয়ে গেছিলো, আর এখন তো কত দায়িত্ব এখন তাদের!
রাশেদের পক্ষে তো মায়ের কবরে একমুঠো মাটি দেওয়াও হয়তো সম্ভব হবে না।
শিউলির মনে হচ্ছে, আজকের আজানের সুরটা ভীষণ করুন ।
যেন শিউলির কষ্ট সবাইকে ছুঁয়ে গেছে।
দিনের সবটা আলো যেমন করে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে, শিউলির জীবনের আলোটাও ঠিক একইরকম ভাবে কোথায় যেন মিলিয়ে যাচ্ছে।
শিউলির চারপাশে এখন শুধু জমাট বাঁধা অন্ধকার।
চলবে…
