#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৭
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে প্রকৃতিতে তখন চারদিকে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা। এটা বসন্তকাল, সবসময় বৃষ্টি না হলেও, হঠাৎ করেই বৃষ্টি আসে আর যায়। এই হালকা বৃষ্টি বসন্তকালকে আরও দ্বিগুণ সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। শিউলির আবার বৃষ্টি ভীষণ প্রিয়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, যা শরীরের ওপর শীতল স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছিল।
বৃষ্টির দিনে বেশিরভাগ মানুষই উষ্ণ বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে। আজ শুক্রবার, তাই শিমুল ভাই হয়তো কাজে যায়নি, বাড়িতেই আছে। তবে সকাল থেকে এখনও শিমুল ভাইয়ের সাথে তার দেখা হয়নি।
শিউলি বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা খেলা করছে, প্রকৃতি শান্ত, কিন্তু শিউলির ভেতরে তখন এক অস্থিরতা। জাবেদা বেগম ঘর থেকে ডেকে বললেন,
“শিউলি, এই সময় বাইরে যাস না। বৃষ্টি ভারি আইতাছে। একটু ঘুমা।”
শিউলি শুধু বলল, “আইচ্ছা।”
কিন্তু শিউলির মনে তখন অন্য কিছু ঘুরছে। এই সময় শিউলির পক্ষে বাইরে না গিয়ে থাকা মুশকিল।
কিছুক্ষণ পরই শিউলি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি যেন একরোখা জেদে প্রচুর বর্ষণ শুরু করল। আকাশ ভেঙে জলধারা নামল। বাতাসের দাপটে শিউলির গায়ের ওড়না উড়ে যেতে চাইল। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
শিউলির পায়ে শিমুল ভাইয়ের দেওয়া সেই নতুন নূপুর দুটো।
শিউলি দ্রুত, ভিজে চুপসে শিমুল ভাইদের বাড়িতে ঢুকল। বারান্দার দিকে তার নজর যেতেই দেখল শিমুল বারান্দায় এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ বাইরে, বৃষ্টির দিকে নিবদ্ধ। লোকটা যেন এই পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে, এক উদাসীন প্রশান্তিতে মগ্ন। বৃষ্টি তার চুল এবং শরীরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর সে গভীর মনোযোগে সেই স্পর্শ অনুভব করছে।
ভেতরে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারল না শিউলি। হৃদয়ের সমস্ত আবেগ মিশিয়ে, কাঁপানো ঠোঁটে সে ডাকল,
“শিমুল ভাই!”
ধুম বৃষ্টির মাঝেও শিউলির কণ্ঠ শিমুলের কানে এসে পৌঁছাল।
শিমুল তাকালো বৃষ্টি ভেজা শিউলির মুখখানার দিকে। চুল লেপ্টে আছে শিউলির মুখের চারদিকে। শিমুল কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, তার আগেই শিউলি শিমুলের হাত ধরে টেনে, বৃষ্টি পড়তে থাকা উঠানে নামিয়ে আনল।
দু’জন হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পুকুর ঘাটে গেল।
শিমুল দাঁড়িয়ে রইলেন আর শিউলি গিয়ে পুকুরের ঘাটে বসে পা পানিতে ফেলে বৃষ্টি বিলাসে মগ্ন। শিমুল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আজও মেয়েটার পরনে সাদা জামা পরিহিত। সাদা জামাতে মেয়েটাকে বেশিই সুন্দর লাগে, একদম বেলিফুলের মতো সুন্দর! ওড়নাটা পেঁচিয়ে থাকার কারণে শরীরের কোনো অংশ বুঝা যাচ্ছে না।
শিমুল ডেকে বললেন,
“শিউলি, তোর জ্বর আইব। চল, বাড়িতে যাই।”
শিউলি চিৎকার করে বলল,
“আসলে আসুক জ্বর! তুমি আছো তো, আমার ঔষধের মতো কাজ করবেন।”
শিমুল আর কথা বললেন না। এতটা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে শিমুল আর কখনো দেখা যায়নি। শিমুলএগিয়ে গিয়ে বসলেন শিউলির পাশে। শিমুলের চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। তাদের মাঝখানে অনেকটা জায়গা ফাঁকা। শিউলি শিমুল ভাইয়ের আরেকটু কাছে গেল।
শিমুলএকটু দূরে সরে গিয়ে বলল,
“শিউলি, তুই কাছে আইগাচ্ছোস ক্যান? দূরে সর।”
“আর কত দূরে সরব? এমনিতেই তো দূরে! শুনো না শিমুল ভাই, আমারে বিয়া কবে করবা?”
শিমুল যেন বিয়ের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল। সে ধীরে কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“বিয়া…!”
“হুম, বিয়া। কেন, আমাকে বিয়া করবা না তুমি? জানো শিমুল ভাই, তোমার সাথে সংসার করার তীব্র ইচ্ছে আমার। তোমার নামে চুড়ি পরার ভীষণ শখ আমার। একদিন লাল টুকটুকে বেনারসী পরে তোমার কুঁড়ে ঘরে প্রবেশ করব।”
শিউলি চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ইচ্ছের কথা জানাল।
শিমুল গভীর জলে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“আমার সাথে তোরে এই সময় দেখলে লোকে মন্দ কইব।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠল, যেন এই বৃষ্টির শব্দে শুধু তার গানই শোনা যাক,
“জানলে জানুক লোকে মন্দ কী হায়!
লুকোচুরি করে কি প্রেম করা যায়?
তুমি ছাড়া, একা-একা যে
বাঁচা দায়।”
শিমুল শিউলির গান শুনে বলল, “বাহ্! তোর গানের গলা চমৎকার! কিন্তু এসব কথা গানেই ভালো মানায়। বাস্তবে ভীষণ ভয়ংকর।”
শিউলি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
“যদি এমন কোনো সময় আসে যে আমাদেরকে বাড়ি থেকে মেনে নিবে না, তখন কী করবা?”
“কিছু করমু না।”
শিমুল ভাইয়ের সোজা-সাপটা জবাবে শিউলি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তারপর অভিমানী স্বরে বলল,
“শিমুল ভাই, তুমি প্রেমিকার মন চুরি করতে পারলেও প্রেমিকাকে খুশি করতে ব্যর্থ।”
শিউলির কথা শুনে শিমুল উচ্চস্বরে হাসতে লাগল। শিউলি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ‘কী অদ্ভুত! আমি হাসার মতো কী বললাম?’
তবে শিমুল ভাইয়ের হাসি দেখে কিছু বলার মতো জায়গা পেল না শিউলি। সে বলল, “জানো শিমুল ভাই, তোমার এই হাসি দিনদিন আমার মরণের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
★★★
সিদ্দিক ইকবাল বসে আছেন। হাতে খবরের কাগজ। এলাকার কয়েকজন এসেছেন, তাদের সাথেই বসে কথা বলছেন তিনি। তামিম এসে দাঁড়াল তার বাবার পাশে। সিদ্দিক ইকবাল ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“কিছু কি বলবে?”
“হ্যাঁ, একটা কথা আছে।”
সিদ্দিক ইকবাল লোকেদের সাথে কথা শেষ করে তামিমকে বললেন, “কী বলবে বলো।”
“আব্বু, আমি বিয়ে করতে চাই।”
সিদ্দিক ইকবাল চক্ষু বড় বড় করে তাকিয়ে বললেন,
“বিয়ে করবে? এতদিন ধরে বলছি বিয়ে করার জন্য, কিন্তু করছো না। আজ হঠাৎ বিয়ের কথা?”
“বিয়ের কথা তো মানুষ হঠাৎই বলে, নাকি প্রতি সেকেন্ডে বলে বেড়ায় আমি বিয়ে করব!” তামিম বিরক্তির স্বরে বলল।
সিদ্দিক ইকবাল ছেলের কথায় কিছুটা অসন্তোষ হলেও তা প্রকাশ করলেন না। তিনি বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আজ থেকে মেয়ে দেখা শুরু করছি।”
তামিম মাথা নেড়ে বলল,
“মেয়ে দেখতে হবে না।”
সিদ্দিক ইকবাল ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“মেয়ে দেখব না তো কী দেখব? ছেলে দেখব নাকি?!”
তামিম বলল, “মেয়ে আমার দেখা আছে।”
“কে?”
“মেম্বারের মেয়ে।”
“মেম্বারের মেয়ে? মেম্বারের মেয়ে তো ছোট।”
“বড় মেয়ের কথা বলছি। তুমি তাকে দেখোনি।”
সিদ্দিক ইকবাল বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি একসময় গিয়ে মেম্বারের মেয়েকে দেখে আসব।”
তামিম বলল,
“তোমার দেখার কী প্রয়োজন? আমার পছন্দ হয়েছে, তোমার পছন্দে কোনো যায় আসে না। আর চাইলে তুমি দেখে আসতেই পারো, তবে তোমার পছন্দ-অপছন্দ আমার কাছে ব্যক্ত করবে না। আমি শিউলিকে বিয়ে করব মানে তাকেই বিয়ে করব।”
সিদ্দিক ইকবাল এবার রেগে গেলেন,
“তুমি এভাবে কেন কথা বলো আমার সাথে? আমি তোমার বাবা হই, তুমি মনে হয় ভুলে গেছো! তুমি একটু মিষ্টি করে কথা বলা শিখতে পারলে না?”
“তোমরা ছোটবেলায় আমার মুখে মধু দাওনি, তাই আমার মুখ দিয়ে মধু বের হয় না। এটাও কি আমার দোষ?”
সিদ্দিক ইকবাল রাগে উঠে চলে গেলেন, কথা না বাড়িয়ে।
★★★
সন্ধ্যা পর প্রতিদিনের মতো পড়তে বসল শিউলি। হঠাৎ রুমে ফুলঝুরি এসে বলল, “আপা, চেয়ারম্যান আইসে।” শিউলির কাছে এটা স্বাভাবিকই মনে হলো, কারণ তার বাবা যেহেতু মেম্বার, তাই সবসময় এই সেই আসতেই থাকে। কিন্তু চেয়ারম্যানকে কখনো এই বাড়িতে আসতে দেখা যায়নি। শিউলি আবারও মনোযোগ দিল নিজের পড়ায়।
কিছুক্ষণ পর জাবেদা বেগম এসে বললেন,
“শিউলি, ওই রুমে আই তো একটু। চেয়ারম্যান সাহেব তোকে দেখতে চাইতেছে।”
শিউলি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“আমারে দেখতে চাচ্ছে মানে? কেন?”
“তা আমি কী করে বলব? চল, ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করেই চলে আসবি।”
শিউলি ‘আচ্ছা’ বলে পাশের রুমে গেল। চেয়ারম্যান বসে আছেন সোফাতে। শিউলি গিয়ে সালাম দিল। চেয়ারম্যান সাহেবও সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
“তোমার নাম কী মা?”
“শিউলি।”
চেয়ারম্যান সাহেব আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। নিজের রুমে ফিরে গেল শিউলি।
চেয়ারম্যান ইদ্রিস খন্দকারকে বলল,
“মেম্বার, আমি আমার ছেলে তামিমের সাথে আপনার মেয়ের বিয়ে দিতে চাই।”
জাবেদা বেগম ও ইদ্রিস খন্দকার দু’জন দু’জনের দিকে তাকাল। জাবেদা বেগম চোখের ইশারায় ‘না’ করে দিলেন।
ইদ্রিস খন্দকার এবার বললেন,
“আমার মেয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তাই আপনার এই প্রস্তাবটা রাখতে পারলাম না।”
চেয়ারম্যান সাহেব চুপ করে রইলেন। তার মুখের ওপর তার প্রস্তাব কেউ নাকচ করল এতে হয়তো তিনি অপমান বোধ করলেন। আবারও চেয়ারম্যান বললেন,
“একবার ভেবে দেখো মেম্বার।”
এবার জাবেদা বেগম বললেন,
“না, এটা সম্ভব না। আমার বোনের ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে, তাই ওইখানে বিয়ে দিব।”
চেয়ারম্যান সাহেব কথা বাড়ালেন না, উঠে গেলেন। অপমানিত বোধ নিয়ে তিনি নীরব পদক্ষেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
#চলবে
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৮
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
আজ চারটি দিন কেটে গেল বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়ে। সেই কী জ্বর! বিছানা থেকেও উঠতে পারল না শিউলি। আজ কিছুটা স্বস্তি বোধ করছে।
এর মাঝে একদিন শিমুল শিউলির সাথে দেখা করতে এসেছিল। শিমুল ঘরে আসতে ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু মা জোর করে ঘরে এনেছিলেন। অবশ্য, শিউলির আবদারেই তার মা শিমুলকে ঘরে এনেছিলেন। ঘোর জ্বরের মাঝেও শিউলি আবদার করেছিল সে শিমুল ভাইকে দেখবে। শিউলির মাথার পাশের জায়গায় শিমুল একটা চেয়ারে এসে বসেছিলেন। শিমুল ভাইয়ের চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা দেখা গিয়েছিল তখন।
শিমুল বুকপকেট থেকে একটা শিমুল ফুল আর কয়েকটি শিউলি মুঠো করে শিউলির হাতে দিয়ে বলেছিলেন,
“আমার শিউলির তো ফুল ভালা লাগে। তাই তোর লাইগা এক মুঠো ফুল নিয়া আইলাম।”
এতটা জ্বরের মাঝেও শিউলি হেসেছিল।
শিউলি ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে বসল। আজ চার দিনের মাথায় জ্বর কমেছে। শুধু মাথাটা ভার ভার লাগছে।
শিউলি মৃদুস্বরে ডাকল,
“আম্মা…”
শিউলির ডাক শুনে ছুটে এলো ফুলঝুরি। বোনের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপা, তুমি ভালা হইয়া গেছো?”
শিউলি ধীর কণ্ঠে বলল, “হুম। আম্মা কই?”
“আম্মা গোসল করতে গেছে। কী লাগব, আমারে কও।”
“ক্ষুধা লাগছে।”
ফুলঝুরি শিউলির কথা শুনে এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, দৌড়ে বেরিয়ে গেল। শিউলি বুঝতে পারল না এভাবে চলে যাওয়ার কারণ। শিউলি কিছুক্ষণ এভাবেই বসে রইল। কিছুক্ষণের মাঝেই ফুলঝুরি আবারও ফিরে এল। হাতে ভাতের প্লেট আর মাছ ভর্তা আর পালংশাক।
শিউলি বিস্মিত স্বরে বলল,
“ভাত কীভাবে নিলি?”
ফুলঝুরি গর্বের সাথে বলল, “নিচে চেয়ারে দাঁড়াইয়া উপর থাইকা ভাত নামাইয়া আনলাম।”
শিউলি ছোট্ট মেয়েটার কথায় হেসে দিল। শিউলি হাত ধৌত করার জন্য পানি নিতে চাইল। ফুলঝুরি বলল,
“আপা, আমি তোমারে খাওয়াইয়া দিই?”
ছোট্ট মেয়েটার এমন আদুরে কণ্ঠ শুনে কেন জানি শিউলির কান্না পেল। কান্না পাওয়ার কারণ শিউলি বুঝতে পারল না হয়তো এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্যই। শিউলি ফুলঝুরির কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“তোকেই তো আম্মা খাইয়ে দেয়। আজ তুই আমাকে খাইয়ে দিবি? আচ্ছা, খাইয়ে দে।”
ফুলঝুরির চোখে তখন রাজ্যের আনন্দ।
ফুলঝুরি তার ছোট ছোট হাতে ভর্তা দিয়ে এক লোকমা ভাত তুলল। শিউলি মুখে ভরে নিল। শিউলির কাছে আজকের খাবারটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার বলে মনে হলো। এত স্বাদ খাবারের কখনো পায়নি। ফুলঝুরির গালে টোল পড়ে, দেখতে ভীষণ মিষ্টি একটা বাচ্চা।
এরই মাঝে জাবেদা বেগম গোসল করে ঘরে ফিরলেন। শিউলিকে ফুলঝুরি খাইয়ে দিচ্ছে দেখে তিনি অবাক হলেন। জাবেদা বেগম শিউলির কপালে হাত দিয়ে বললেন,
“জ্বরটা কিছুটা কমলো তাহলে?”
“পুরোপুরি কমে গেছে আম্মা।” শিউলি মৃদুস্বরে বলল।
এতক্ষণে খাওয়া শেষ। জাবেদা বেগম বললেন,
“আজ সোহাগ আসব।”
শিউলি খাওয়া বন্ধ করে বলল, “কেন?”
“তোর জ্বরের কথা শুনে। আরো আগে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু কী যেন কাজ পড়ল তাই আসতে পারেনি।”
শিউলি আর কিছু বলল না। একদিকে ভালোই হলো আজ বলে দিতে পারবে সে বিয়েটা করতে চায় না। বিয়ের মাত্র দশ দিন বাকি। এই কয়েকদিনে শিউলির অনেক কাজ বিয়েটা ভাঙতে হবে।
বিকালের দিকে শিমুল ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যেতে চাইল শিউলি, তার মাঝেই সোহাগ চলে এলো। এতটা পথ জার্নি করে আসায় সোহাগকে জাবেদা বেগম খেতে দিলেন। অনেক ধরনের খাবার রান্না করা হয়েছে হবু জামাই বলে কথা! শিউলি অপেক্ষা করতে লাগল
সোহাগের খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত।
খাবার শেষ হলে শিউলি বলল,
“আমার আপনার সাথে কথা আছে।”
সোহাগ বলল,
“চলো, বাড়ির পিছনের দিকে যাই। বাতাস খেতে খেতে না হয় কথা বলা হবে।”
শিউলি মাথা নেড়ে বাইরে চলে গেল। সোহাগ বলল,
“মা বলে দিয়েছে, তোমার চুড়ির মাপ আর আংটির মাপটা দিয়ে দিতে।”
শিউলি বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি আপনাকে কিছু বলতে চাচ্ছি।”
সোহাগ মনে পড়ার মতো অভিনয় করে বলল,
“ওহ্ হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম। হুম, এখন বলো কী বলবে।”
শিউলি দ্বিধা না করে বলল,
“আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না।”
সোহাগ থমকে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণের জন্য ভাষাহীন হয়ে গেল ছেলেটা। সোহাগ হাসার চেষ্টা করে বলল,
“শিউলি, তুমি মজা করছো, তাই না!”
“না, আমি মজা করছি না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। আপনাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব না।ক্ষমা করবেন আমায়।”
সোহাগ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আঙ্কেল জানেন এই বিষয়ে?”
“না, আব্বাকে আমি বুঝিয়ে বলব।” শিউলি ধীর কণ্ঠে উত্তর দিল।
সোহাগ অনেক কিছু বলতে চাইল। বলতে চাইল, আমিও তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু কথাটা বলার মতো সাহস পেল না। সোহাগের মনে ভরসা আছে যে শিউলির এই সিদ্ধান্ত ইদ্রিস খন্দকার কখনোই মানবেন না।
সোহাগ বলল,
“ঠিক আছে, তুমি আঙ্কেলকে বলে দেখো। যদি উনি রাজি হন, তাহলে এই বিয়েটা হবে না। আর যদি তোমার প্রেম উনি না মানেন, তখন কী করবে?”
“জানি না আমি।” শিউলি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
শিউলি লক্ষ্য করল সোহাগের ঠোঁট কাঁপছে। শিউলি আবারও বলল,
“জিজ্ঞেস করবেন না আমার প্রেমিক কে?”
সোহাগ মিথ্যা হেসে বলল,
“না থাক। সেই ভাগ্যবানকে নাই চিনি। চিনলে হয়তো খারাপটা আরও বেশি লাগবে আমার, হিংসা হতে পারে সেই পুরুষটিকে দেখে। কী ভাগ্যবান তিনি, যিনি তোমার ভালোবাসা পেল।”
শিউলি মুচকি হাসল। সোহাগও সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে পেছন ফিরল। সোহাগের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল ভালোবাসা কেন এত যন্ত্রণাদায়ক!
★★★
বিকালের দিকে ইদ্রিস খন্দকার বাড়ি ফিরে জাবেদা বেগমকে বললেন শিউলির মামা ভীষণ অসুস্থ, এখনি যেতে হবে। জাবেদা বেগমের ভয় হচ্ছে মেয়েকে একা রেখে যেতে, কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। ইদ্রিস খন্দকার স্ত্রীকে বললেন,
“এখন চলো, রাতের মাঝেই ফিরে আসব। সমস্যা হবে না।”
জাবেদা বেগম কাজের মহিলা দিলওয়ারা বেগমকে শিউলির সাথে থাকতে বললেন। শিউলিও দ্বিমত পোষণ করল না। বাবা-মা তারা রওনা দিল। সাথে ফুলঝুরির যাওয়ার বায়না করায় তাকেও নিয়ে যাওয়া হলো। ফুলঝুরির সাথে আবার মামার ভালো সম্পর্ক। শিউলি ভেবেছিল আজ রাতেই সে বিয়েটা করতে পারবে না সেই কথা বাবাকে জানাবে। কিন্তু আজও বলতে পারল না। আর বললে যে শিউলির কপালে দুঃখ আছে, তা শিউলি ভালো করেই জানে।
সারাদিনটা এভাবেই কাটল শিমুল ভাইয়ের সাথে দেখা না করেই। সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। শিউলি রুমে গিয়ে দেখল দিলওয়ারা বেগম ঘুমিয়ে পড়েছেন। এই সুযোগ শিমুল ভাইয়ের সাথে দেখা করার। যেই ভাবা সেই কাজ শিউলি বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।
★★★
শিউলি আর শিমুল প্রত্যেকবারের মতো আজও সেই পুকুর ধারে বসল। তাদের দেখা করার জায়গা দুটো, এক শিমুল গাছের নিচে, আরেকটা এই পুকুর ঘাট। শিউলিকে চিন্তিত দেখে শিমুল বলল,
“কী হইছে তোর? এমনে মন খারাপ কইরা আছোস ক্যান? জ্বরটা কি আবার উঠতাছে?”
শিমুলকে চিন্তিত হতে দেখে শিউলি খুশিই হলো। আজকাল কিছুটা হলেও শিমুল ভাই শিউলির আবেগ বোঝে। এত তাড়াতাড়ি শিমুল ভাই শিউলিকে বুঝবে, তা শিউলির ক্ষণাক্ষরেও ছিল না।
শিউলি হাসি মুখে বলল,
“না, জ্বর ভালো হয়ে গেছে।”
শিউলি কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে বলল,
“শিমুল ভাই, আমার বিয়া চৈত্র মাসের ত্রিশ তারিখে।”
শিউলির মুখ থেকে বিয়ের কথা শুনে শিমুল হকচকিয়ে উঠল। শিমুল ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বললেন,
“তোর বিয়া!” খুবই নিচু স্বরে বললেন।
শিউলি বলল,
“হুম, কী করব এখন আমি?”
শিমুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“করে নে বিয়া।”
শিমুলের কথা শুনে শিউলি বিস্মিত স্বরে বলল,
“কী বলছো! বিয়ে করে নিব? পরে তুমি কষ্ট পাবে না?”
শিমুল ভাইয়ের চোখে মুখে অন্যরকম ভাব ফুটে উঠল এক গভীর অসহায়তা।
“হুম, পামু তো। কিন্তু কী করমু এহন আমি?”
“কী করবা মানে! আমার আব্বার সামনে বুক ফুলিয়ে বলবা ‘মেম্বার সাহেব, আমি আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আমি বিয়ে করতে চাই আপনার মেয়েকে’।” শিউলি হাসতে হাসতে বলল।
“বাহ্ বাহ্! পরে তোর আব্বা আমারে মেরে হাত-পা ভাইঙা দিবো।” শিমুল বলল।
“প্রেম করলে প্রেমিকের ভয়-ডর থাকতে নাই শিমুল ভাই।”
শিমুল শিউলির চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“প্রয়োজনে তোর আব্বার কাছে তোরে ভিক্ষা চাইমু, তবে কি তোরে দিব না?”
শিমুল এই সাধারণ কথাটা শিউলির কাছে পৃথিবীর সকল সুখ এনে দিল। কথাটা ভয়ংকরী সুন্দর শোনাল!
শিউলি ছোট বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলল,
“উফফ শিমুল ভাই, এত ভারি ভারি কথা বলো না। আমি হার্ট অ্যাটাক করে যাব যে!”
শিউলির কথা শুনে শিমুল উচ্চস্বরে হাসতে লাগল। হাসির শব্দে যেন চারপাশের প্রকৃতিও মুহূর্তে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। হঠাৎ বেশকিছু জন মানুষের পায়ের শব্দ এদিকে আসছে শোনা গেল। শিউলি দ্রুত শিমুলকে নিয়ে একটা বড় গাছের পেছনে লুকিয়ে গেল।
পায়ের শব্দগুলো এবার মিলিয়ে গেল। পূর্ণিমার আলো গাছের ফাঁক দিয়ে দু’জন মানব-মানবীর চোখে-মুখে আছড়ে পড়ছে। চাঁদের আলোয় শিমুল ভাইয়ের মুখটা শিউলির কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন মনে হলো। শিউলি এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। তার চোখ যেন এই সৌন্দর্যে ডুবে যেতে চাইল।
শিমুল মানুষের চলে যাওয়ার শব্দ পেয়ে উঠে দাঁড়াতে নিলে শিউলি বলে উঠল,
“উহ্ শিমুল ভাই, নড়ো না। দু’চোখ ভরে দেখতে দাও তোমার এই মুখখানা।”
★★★
শিউলি শিমুলের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির দিকের পথ ধরল। বাড়ির কাছে যেতেই শিউলির মনে হলো বাড়ির চারদিকে বেশসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি। কিন্তু এখানে তো কেউ আসার কথা না। শিউলি চারদিক ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। শিউলি বুঝ দিল, এটা হয়তো তার মনের ভুল।
ভেবে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। দেখল, বারান্দার গ্রিলওয়ালা গেইটটা খোলা। শিউলি মনে করার চেষ্টা করল, যাওয়ার সময় কি গেইট খোলা ছিল? কিন্তু না, শিউলির স্পষ্ট মনে আছে গেইট বন্ধ করেই গিয়েছিল। ‘হয়তো দিলওয়ারা বেগম উঠেছে ঘুম থেকে।’
শিউলি সোজা নিজের রুমে ঢুকে গেল। রুমে ঢুকে যা দেখল, তা দেখে শিউলির শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল। যেন সে সামনে ভূত দেখছে। শিউলি চিৎকার করে বলল,
“এখানে কী করেন আপনি?”
#চলবে…
