“ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব-০৯
শাহাজাদী মাহাপারা ( জোহুরা)
সারা রাস্তায় সাহিল কারো সাথে কথা বলতে পারেনি। এসি গাড়িতে তার দমবন্ধ হয়ে আসছিলো৷ একটু আগেই তাকে বরের জন্য বরাদ্দকৃত স্টেজটায় বসতে দেয়া হয়েছে। সাহিল অস্বস্তি বোধ করছে৷ কথা হয়েছিলো খুব সাধারণ ভাবে বিয়েটা সম্পন্ন হবে। কিন্তু কনের বাবা তো তার মামীর থেকে দুই ডিগ্রী উপরে। তামঝাম করেই বিয়ে দিচ্ছেন মেয়ের৷ বংশের একমাত্র কন্যা। এই নারী বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় নাম লিখালে অবশ্যই বাংলাদেশ প্রথম স্থান অর্জন করতো। হাস্যকর বিষয় হচ্ছে এ কোনো সাধারণ মেয়ে নয়লা, এ হচ্ছে কিরণমালা টাইপ কন্যা৷ তিনি একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার পদে আছেন। কি আশ্চর্য! অথচ বিয়ে করছেন একজন মুদি দোকানদার কে। এ নারী সত্যিই অতুলনীয়। এমন নারীকে বিয়ে করে কেউ ঠকবে না। সাহিল জানে সেও ঠকবে না। অথচ তার মন টা যেনো বরফের চেয়েও শীতল, স্থির হয়ে আছে। হৃদয়টা যেনো ভাবেই রক্ত পারাপার করতে চাইছে না৷
থেকে থেকে এক গভীর বিষাদ তার নিশ্বাস থেকে ছুটে আসছে৷ এই বুঝি হৃৎপিণ্ডটা তার কাজ করা বন্ধ করে দিবে। এতো কষ্ট হয়? বুক ভেঙে যাওয়ার কষ্ট এতোটা? আগেতো উপলব্ধি হয়নি। এ কেমন যন্ত্রণায় পড়লো সে! ভারী মসিবৎ হলো তো। একটু পর পর মেয়েদের মতো কান্না গলায় গিয়ে ঠেকছে। শুধু চিৎকার টুকু বের হচ্ছেনা।
সাহিল এক গ্লাস পানির জন্য হাসফাস করতে লাগলো। রাফি সাহিলের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেলো। চোখের শিরা গুলো বেড়িয়ে আসবে যেনো৷ দ্রুত মাকে ডাকতে যাবে, তার আগেই হট্টগোলের আওয়াজ শোনা গেলো। এর মাঝেই সাহিল পানি বলে ক্ষীণ আওয়াজ করলো৷ রাফি দ্রুত সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাত্রীর বোনদের একগ্লাস পানি আনতে বললো।
সাহিলকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেয়ার আগে যে মিষ্টি খাইয়েছিলো তাতে বোম্বাই মরি ভরে দেয়া ছিলো আগে থেকেই। এ এক অসুস্থ কালচার বরযাত্রী আপ্যায়নের৷ শরবতে মরিচ গোলানো চলে। কিন্তু তাই বলে মিষ্টিতেও? তবুও সাহিল কোনো প্রতি উত্তর ছাড়াই সেই মিষ্টি গলাধঃকরণ করেছে। পানি খেয়ে সাহিল স্থিরতো হলোই না বরং আরও অস্থিরতা বাড়লো। কাওকে বিশ্রী দুটো গালী দিতে পারলে নিশ্চই পরাণ জুড়াতো। কিন্তু বরেরা এটা করতে পারেনা৷ ওদিকে এতো হল্লার আওয়াজ কানে আসছে অথচ সাহিল কিছুই অনুভব করতে পারছে না৷
——————-
মোহনা
I Hate her.
10.06.2004
I hate her.
02.03. 2005
Again I hate her.
25.10.2005
I like her.
20.03.2006
I love her.
17.08.2006
ব্যাস। প্রথম কয়েক পাতা জুড়ে এ কটা লেখাই রয়েছে সাহিলের।
মোহনার ঠোঁট জুড়ে একটা ম্লান হাসি ছড়ালো। সাহিল কত স্পষ্ট করে তার ভালোবাসা আর ঘৃণার কথা উল্লেখ করেছে৷ অথচ সে তো কাওকে কিছুই ব্যক্ত করতে পারেনি। সামান্য কাগজকেও না। এই যে সাহিল তাকে ভালোবাসে বললো অথচ এখন সে বিয়ের মঞ্চে নিশ্চই। আর কিছুক্ষণ, তারপর আর সে তার থাকবে না৷ অন্যের গোপনীয় যেকোনো কিছুই বিনা অনুমতিতে দেখা নাকি বিরাট বড় অপরাধ৷ ইংরেজিতে যাকে বলে পারসোনাল প্রাইভেসি ইনভেইড করা। কিন্তু মোহনা বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নয় এই ডায়েরি লুকিয়ে পড়া নিয়ে। সে ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল তার কর্মকান্ড নিয়ে৷ সাহিলের ডায়েরি তে সে যেমন গোপনে আছে, সাহিলের ডায়েরির প্রতিটি অক্ষরও তার কাছে গোপনে থাকবে৷ কেউ কখনোই জানতে পারবে না সে সাহিল ভাইকে কত কাছ থেকে জেনেছিলো।
আট বছর আগে যখন এ বাড়ি, নিজের বাড়ি, এ শহর ছেড়েছিলো সে তখন কিশোরী অনুভূতি গুলো একটু একটু করে ডালপালা মেলে যাচ্ছে তার ভেতরে। পুরো পরিবারে মোহনা ছিলো সবচেয়ে আদরের। একমাত্র কন্যা হওয়ার সুবাদে সে আরও বেশি লাই পেতো। পড়াশোনাতেও ছিলো তুখোড়। তারপর হঠাৎ করেই একদিন আগমন হলো সাহিলের। সেই যে ঝড়টা এলো তার পুরো জীবনটা লন্ডভন্ড করে চলে গেলো। সাহিল তখন মা, বাবা দুজনকেই এক সাথে হারিয়ে শোকে কাতর। কিন্তু ফুপুর বাড়াবাড়ি রকমের সাহিল প্রীতি এবং সাহিলের পড়াশোনা নিয়ে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলাটা তার মায়ের কাছে বিষাক্ত মনে হলো। মা তাকে রীতিমতো সাহিলের পা ধোঁয়া পানি খেতে বলতেন। একবারতো সাহিলের রেজাল্ট এতো ভালো হলো সেবার মোহনার খুব জ্বর ছিলো। পরীক্ষা দিয়েছে কোনো একভাবে না দেয়ার মতোই। বাবার সে কি চিন্তা! অথচ রেজাল্টের পর সাহিলের রেজাল্ট দেখে মা তাকে ডেকে এনে তার পা ধোঁয়ালো বালতিতে করে। সাহিল ভাইও সম্ভবত বুঝতে পারেন নি ঘটনা কি হতে চলেছে। এরপর তার মা সে পানি বাটিতে ঢেলে বাবার সামনের রুগ্ন মোহনাকে ডেকে পান করতে বললেন। বাবা কিছুই বলেন নি চুপ ছিলেন। মোহনা যেনো কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিলো। সাহিল ঘটনা বুঝতে পারার সাথে সাথেই মোহনার দিকে তাকিয়ে ছিলো। সে চাহনীই যেনো সাহিলের কাল হলো। আর মোহনা সে তো তারও বহু আগে থেকেই সাহিল সাহিল শুনতে শুনতে অনাগ্রহ থেকে তাকে দেখতে চাওয়ার একটা ছোট চেষ্টা থেকেও ভয় পেতো না। এই যে এত বড় কান্ড ঘটাতে মা তাকে বাড়ি ডেকে আনলেন অথচ তার ভেতরটা তোলপাড় হচ্ছিলো সাহিলকে এক পলক দেখার জন্য।
সাহিল তড়িৎ বেগে হাতের কাচের বাটিটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলেছিলো। লাথি দিয়ে বালতি ফেলে দিয়েছিলো। সে নিজেকে এতো বোকা ভাবছিলো। আন্টি কেনোই বা তার পা ধোঁয়াতে চাইবেন আশ্চর্য তো! সে কি বোকা? ঘোরের মাঝে সে নিজেইবা কি করছিলো। আসার পথে বাবার সাথে দেখা হওয়ায় তার মস্তিষ্ক কাজ করছিলো না এতক্ষণ। মোহনার নিশপ্রাণ চোখ দুটো যেনো তার ভেতর কাঁপিয়ে দিয়েছে। এরপর সে আর কোনোদিন ও বাড়ি মুখো হয় নি। মোহনা হেঁটে কামড়ায় গিয়ে দরজা দিয়েছিলো। তার বাবার ঘর থেকে এরপর কিছু প্রহার আর মায়ের চিৎকারের আওয়াজই শুনেছিলো সে৷ এই প্রথম সম্ভবত তার শান্ত বাবা অশান্ত হয়েছিলেন। এরপর কি সাহিল আর এসেছিলো? এসেছিলো৷ তখন মায়ের চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে ঘর থেকে ” তোমার বোন তার ননদের আশ্রিতা সন্তানকে নিয়ে কথা বলে আমার বাচ্চাদের কেনো ছোট করবে। থাকেতো আশ্রিত হয়ে নিজে ছিলো আঁটকুড়ী আর এখন বাচ্চার মুখ দেখে আমাকে অপমান করে। কি না করেছি তোমাদের সংসার টানতে আমি?”
ব্যস তারপর হয়তো আরও কিছু আর্তনাদের আওয়াজ ভেসে আসে মায়ের ঘর থেকে। এরপর বাবাও আর কোনোদিন ফুপুর বাড়ি যাননি। তারও ক্ষোভ জমেছিলো ফুপুর প্রতি হয়তো। ফুপু এসে মাফ ও চেয়েছিলেন মায়ের কাছে। সবাই জানে ফুপুর দূর্বলতা সাহিল ভাইয়ের প্রতি। সে কাওকে ছোট করে বলেননি তাও জানে। কিন্তু হঠাৎ করে সবার কাছে মায়ের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফুপুর ননদের ছেলেকে প্রতিপালনে যেনো ফুপু অন্যরকম সমাদর পেতে লাগলেন সবার কাছে৷ মায়ের হিংসে হয়েছিলো হয়তো।
দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো মোহনার বুক থেকে।
এরপরের শেষ কয়েক পৃষ্ঠায় এই করুণ কাহিনীগুলোই লেখা ছোট ছোট অক্ষরে। এই যে সাহিল ভাই মায়ের মুখে আশ্রিত শব্দ শুনে কষ্টে রাগে কিংবা মোহনার অনুভূতি বুঝতে পেরেই একটু একটু করে সবার থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন৷ নিজের নেভিতে জয়েন হবার ইচ্ছে দাফন করেছেন যেনো ফুপু আর তার ভাইয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। আরও কত কত লেখা আশ্রিত শব্দ সব জায়গায় একটু একটু করে উল্লেখিত৷ এই যে শেষের পৃষ্ঠায় লেখা, তার পিতা থাকতেও মামীর বাড়িতে আশ্রিত থাকার কথা তার সৎ মা নিজেই বলেছেন। কি আশ্চর্য এক জীবন গিয়েছে সাহিল ভাইয়ের৷ অথচ সবাই তাকে কত ঘৃণা করেছে৷ এই যে মোহনা আট বছর ধরে সাহিলকে সামান্য একটা বিষয়ে ঘৃণা করছে। কোনো একভাবে পুরো মফস্বল ছড়িয়েছিলো সাহিলের পা ধোঁয়া পানি মোহনা খেয়েছে। এই অপমানের ভার না নিতে পেরেইতো মোহনা নিরুদ্দেশ হয়েছিলো বাড়ি থেকে। মোহনা কাঁদেনা৷ চোখের অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। উঠে দাঁড়ায় সে৷ বিকেল হয়ে আসছে প্রায়। বেড়িয়ে পরতে হবে তার। সময় শেষ এখানে৷
চলবে…
