“ঘাসফুলের ধ্রুবতারা”
পর্ব-০৮
– শাহাজাদী মাহাপারা ( জোহুরা)
সাহিলের যখন ঘুম ভাঙলো তখন সকাল ৯টারও বেশি বাজে৷ বাহির থেকে হৈহুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসছে। কয়েকবার দরজায় কড়া নাড়লো কেউ।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা ভেঙে চূড়মাড় হয়ে নিচে ছড়িয়ে আছে। বহু কষ্টে নিজেকে টেনে দাঁড় করালো সে। ভেতরে অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে। গতকাল রাতেও আত্মহননের চেষ্টা করেছে সে৷ সফল হয় নি৷ মামীর মুখটা যতবার চোখে ভেসেছে ততবার সে নিজেকে আটকেছে। এর কারণ কি? মায়া কিংবা সাহসের অভাব দুটোই হতে পারে।
কিন্তু এই যে এক্ষুনি তাকে সবাই বর সাজতে বলবে, এটা সে কিভাবে মানবে? মনে একজন আর পাশে অন্যজনকে নিয়ে বাঁচা যায়? যায় হয়তো অনেকেইতো বাঁচে৷ সে কেনো পারবেনা? চেষ্টা করলে সেও পারবে৷ তাছাড়া এখন বিয়ে ভাঙ্গা মানেই তার জন্য অপেক্ষারত আরেকজনকে অসম্মান করা৷ তাকে বাঁচতে হবে, সব সয়ে নিয়েই এগুতে হবে। তার হাতে যে আর কিছু নেই।
সাহিল ভাই বর সেজেছে। রাতের ঝড়ের পর মোহোনা আর ও মুখো হয়নি। নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখার চেষ্টায়। গতকাল রাতে এক ভয়ংকর বিশ্রী স্বপ্ন দেখেছে সে।
রাতে সব কাজিনরা একসাথে হয়েছিলো তাদের ঘরেই, তখন বিদ্ধস্ত মোহনা সাহিলের স্পর্শ নিয়ে ঘরে এসেছে। সবাইকে উপেক্ষা করেই ওয়াশরুমে গিয়ে শরীর ধুয়েছে৷ কাপড় পালটে চুপচাপ বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সবাই সাহিলের বাসর সাজানোর কথা বলায় সে চমকে উঠেছিলো। রুহির স্পষ্ট কথা যে যত সময় থাকবে বাসর সাজাতে তাকে তত সম্মানি দেয়া হবে। এতো স্পষ্ট কথাটা কেনো যেনো তাকে এঁফোড়ওফোঁড় করে দিলো।
তারপর কাথা টেনে চুপ করে রইলো৷ শরীর কাপছে। তার চেয়ে বেশি কাপছে তার বুক। এক সময় ঘুমিয়ে গেলো সে৷ চোখের কোণে অশ্রুধারা শুকিয়ে সাদা ত্বকে আরও সাদা হলো।
মোহনা সাহিলের ঘরে দাঁড়ানো সবাই মিলে সাহিলের বাসর সাজাচ্ছে। মোহনাও কাজ করছে বিছানা, বালিশ ঠিক করে রাখছে, সবার সাথে কি নিয়ে যেনো হাসছে৷
হঠাৎ মনে হলো কারো গোঙানোর আওয়াজ শুনছে সে। ঠিক গোঙাচ্ছে না, এ এক অন্যরকম আওয়াজ। প্রথমে ধীরে এরপর দ্রুতগতি হলো তার হৃদযন্ত্র৷ সাহিলের কন্ঠ শোনা যাচ্ছে তার পাশের ঘর থেকে৷ সে এ ঘরে কি করে এলো? কারো সুখ শীৎকার ভেসে আসছে তার কানে৷ এক্ষুনি যেনো রক্ত বের হবে কান থেকে এত ব্যথা করছে কান। ধীরে ধীরে সেই আনন্দ শব্দ মিলিয়ে যেতে লাগলো।
মোহনার দেহ ঝাকি দিয়ে ঘুম ভাঙলো।
ঘেমে অস্থির হয়ে পানি পানি বলে দুবার চিৎকার করেছে৷ রুহি ধপ করে উঠেই মোহনার এই অবস্থা দেখে দ্রুত এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো ওর সামনে। কোনো মতে পানি পান করেই হাতের উলটো পিঠে গলা মাথায় লেগে থাকা ঘাম মুছলো। স্বপ্নের কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠছে মনে হচ্ছে এতো ভার সহ্য করা যাবে না৷ কান্না গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে আছে৷ উফ কি বিভৎস সেই স্বপ্ন।
অথচ এখন দেখো সত্যিই তাকে এখানে বসে সবার সাহিলের বাসর সাজানো দেখতে হবে৷ রুহি কাঁচা ফুলের অর্ডার দিয়েছে৷ ভাইয়ের বাসর বিছানা সাজাবে তারা রজনীগন্ধ্যা আর গোলাপের বাসর। ফুপুরা বের হয়েছেন কিছুক্ষণ আগেই। দুপুর এখন একটা বাজতে চললো। তারা সেখানেই জুমার নামাজ আদায় করবেন। এবং তার পরই বিয়ে পড়িয়ে সন্ধ্যা নাগাদ বউ নিয়ে আসবেন।
রুহিরা যায়নি বিয়েতে৷ তবে রাফি বরের চেয়েও বেশি সেজে গুজে গিয়েছে বিয়েতে। হুমায়রা তো মুখ বাকিয়ে বলেই ফেলেছিলো, ” বিয়ে সাহিল ভাইয়ের নাকি আপনার? আপনি এতো মাঞ্জা মেরে যাচ্ছেন কেনো?”
হুমায়রার কথায় রাফি রাগ করেনি, হেসে বলেছিলো, ” সেখানে নতুন বেয়ান বানবো না? কনের বোন, বান্ধবীরাও তো আছে। তারা দেখবে না আমায়?”
হুমায়রা মুখ বাকিয়ে বলেছে, ” আপনাকে দেখে কেউ অন্ধ না হলেই হয়।”
রাফি হেসে বলেছে, ” প্রেমে অন্ধ হওয়াতো দোষের কিছু না।” হুমায়রার ইচ্ছে হচ্ছিলো কতগুলো কালি রাফির ফর্সা মুখটায় মেখে দিতে৷ রাফি ঘর থেকে বের হবার আগে এক ধাক্কা দিয়ে বের হলো তাকে৷ হুমায়রা কিছুই বললো না আর। চুপ করে সরে দাঁড়ালো। রাফি গট গট করে বরের সাথে বের হলো কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। হুমায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেললো শব্দ করেই৷ তারপর সাহিলের এগিয়ে গেলো সাহিলের ঘরে৷
খাওয়া দাওয়ার জন্য ডাক পরতেই সবাই তড়িঘড়ি করে ছুটলো। রুহি চিৎকার করে বললো, ” হাভাতের দল গুলো, অর্ধেক কাজ রেখেই খেতে দৌড়েছে৷”
মোহনা রুমে ঢুকে দেখলো ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা ভাঙা৷ মনটা খচ করে উঠলো তার। লোক এসেছে নতুন আয়না লাগাবে। ড্রেসিংটেবিলটা বারান্দায় নিয়ে যাবে, তাই রুহি এক এক করে জিনিস সরাচ্ছে। মোহনা এসেছিলো রুহির কে দেখতে৷ একটু পরই সে বের হয়ে যাবে এ বাড়ি থেকে, আজীবনের জন্য৷ তার আগে খেয়ে যাবে৷ এতো কষ্টে বিয়েতে উপস্থিত যখন হয়েছেই না খেয়ে যাবে কেনো? তাই হাসি মুখেই রুহিকে ডাকতে এসেছিলো।
একটা ড্রয়ারের চাবি খুঁজে পাচ্ছেনা সে। ভিতরে কি আছে তালা বদ্ধ। যা খুশি থাকুক এখন এটা খোলা যাচ্ছে না। এভাবেই নিয়ে যাক বারান্দায়। রুহি লোকগুলোকে ডাকতে নিচে গেলো। মোহনা বেশ কবার ড্রয়ার ধরে টেনে দেখলো খুলছে না। সাহিল চাবি কি সাথে নিয়ে গিয়েছে৷ তার বড্ড কৌতুহল ড্রয়ারে কেউ কি গুপ্ত ধন রাখে তাও আবার ড্রেসিং টেবিলের৷ মোহনা দুয়েক বার এদিক ওদিক খুঁজলো চাবি। এরপর সাহিলের তোষকের নিচেই চাবি পাওয়া গেলো৷ এটা এমন কোনো রকেট সাইন্স না৷ তবে এই চাবি গুলোর মধ্যে ড্রয়ারেরটা কোনটা সেটাই খুঁজতে হবে।
কিছুক্ষণ খোঁজাখুজির পর কট করে ড্রয়ারটা খুলে গেলো৷ ভিতরে কিছু নেই। খালি ড্রয়ার। মোহনা হাসলো এটাকে এভাবে তালাবদ্ধের কি দরকার ছিলো। নিরাশ হলো না সে। ড্রয়ার ফের লাগিয়ে রাখতে গিয়েই দেখলো কিছু একটার সাথে ধাক্কা লেগেছে। মোহনা ভিতরে হাত দিতেই উপরে কিছু একটা বাঁধলো হাতে। টেনে বের করে আনলো সে। পায়ের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দ্রুত ড্রয়ার আটকে। ডায়েরিটা লুকালো সে। চাবিটা হাতের মুঠোয় নিয়ে সরে দাঁড়ালো।
রুহি ঘরে প্রবেশ করতেই জিজ্ঞেস করলো, ” এতোক্ষণ লাগলো ডেকে আনতে?”
” আর বলো না, গিয়ে দেখে তারাও খেতে বসেছেন৷ এখন বিয়ে বাড়ি না খায়িয়ে রাখা যায়? যতই কাজে আসুক।”
” আমি আসছি তুমি এইদিকটা দেখো তাহলে।” বলেই মোহনা দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে এলো।
নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দিলো। ডায়েরিটা হাতে নিয়ে দেখলো। এমন কিছু সে আশা করেনি। এই যুগে কেউ ডায়েরি লিখে? সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন। টেকনোলজির ছোঁয়া। তবুও মোহনা জানতো সাহিল ডায়েরি লিখে। এ অভ্যাস তার ছোট বেলার। এর আগে বেশ কবার দেখেছে সে তাকে কিছু একটা লিখতে ডায়েরিতে। তখন ছোট ছিলো বুঝতো না। নতুন নতুন মলাটের ডায়েরি সাহিলের। কিন্তু এটাতে এমন বিশেষ কি আছে? যা সাহিল এতো যত্নে এবং খুব অবহেলায় লুকিয়ে রেখেছে? এ ডায়েরির অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহুদিন ছুয়ে দেখা হয়নি।
বিয়ের খাওয়া লাটে উঠেছে তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে পুরোনো স্মৃতি হাতড়াতে ডায়েরি খুলে বসলো। এখন এখানে যদি সাহিল ভাই কে কত টাকা ধার নিয়েছে আর কত ধার পরিশোধ করবে লেখা থাকে তাতেও অবাক হবে না সে৷ মোহনা ভালোভাবেই সাহিলের উল্টো পাল্টা কাজের সাথে অবগত৷
প্রথম কয়েক পাতায় কিছুই লেখা নেই৷ হুট করেই চোখে পড়লো গোটাগোটা অক্ষরে লেখা মোহনার নাম। হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে।
চলবে…
