#আটপৌরে
পর্ব : ০২
আমি একরাশ আশ্চর্য ভাব নিয়ে মায়ের ঘরে গিয়ে বললাম, মা গো জারিয়াহ ভাবী তো বরণ ছাড়াই ঘরে ঢুকে গেছে।
মায়ের কান্না মুহুর্তেই থেমে গেলো।চোখ দুখানিতে দেখা গেলো রাগের ঝলক।
দ্রুততার সঙ্গে উঠে তিনি ওঘরে গেলেন।বাড়িভর্তি আত্মীয় স্বজন।সবাই নতুন বউকে দেখছে মিশ্র অনুভূতি নিয়ে।কেউ কেউ বলছে, এ কেমন বেহায়া মেয়ে!
আবার কেউ বলছে,ঠিকই আছে।এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখবে কেনো? বড়ো বউটার বেলাতেও এমন করেছিলো….
মেঝো ভাবী অবশ্য নির্বিকার। কানাঘুষায় তার মন নেই।তিনি বড়ো ভাইয়ার বাচ্চাদের বেশ সাবলীল ভাবেই আদর করতে লাগলেন।তাদের সাথে খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলেন।
সেই হাসি শুনে তো মায়ের মাথায় প্রকান্ড বাজ পরলো।
এ কি নতুন বউয়ের ব্যবহার?
তিনি রাগে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন।কোনো ক্রমে রাগ কিছুটা চাপা দিয়ে চেঁচিয়ে বললেন,এ কেমন স্পর্ধা? বেয়াদব মেয়ে।বরণ ছাড়াই ঘরে ঢুকে ফেলেছে…
মেঝো ভাবী এগিয়ে এসে মাকে সালাম করলো।এরপর,হাসি মুখে বললো,আপনার বিলাপ করা কান্নাকাটিতে ব্যাগ্রা দিতে চাইনি আম্মা।
একথায় ঘরময় একটা হাসির জোয়ার উঠলো।সবাই একযোগে হেসে উঠলো।
তবে,মায়ের চিৎকারে সে হাসি বিলীন হলো মুহুর্তেই।
মা মেঝো ভাইয়ার দিকে এগিয়ে এসে বললো,তুই এই জংলীকে ঘরে তুলছিস? এই বে/হায়া জানো/য়ার টাকে?
এরপর,রোদনভরা কন্ঠে একশো অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসলেন মেঝো ভাইয়ার বিরুদ্ধে।
ভাইয়া অবশ্য তর্কে গেলো না।বললো,এইসব নিয়ে পরো কথা বলবো।সময় তো ফুরিয়ে যাচ্ছে না।আজকের রাতে খামোখা চেঁচামেচি ভাল্লাগছে না মা।
মা আরো চেঁচিয়ে বললেন,ওহহ এখন তো মায়ের কথা বিষের মতো লাগবেই।মধুর কৌটা আনছে না ঘরে।ধুতরা ফুলের মধু…
মা আরো কিছুক্ষণ একা একাই জাবরকাটার মতো এটা সেটা বলে গেলেন।তবে,পরে নিজ থেকেই থেমে গেলেন।
নিজের ঘরে গিয়ে মনমরা হয়ে বসে রইলেন।আমি আর আপা বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে খাওয়ালাম।মা বললেন,সব শেষ।এই সংসারের ধ্বংস এখন অনিবার্য। কালসাপ চলে এসছে।
কিছুক্ষণ মর্জি করে শেষে বাধ্য হয়েই ঘুমিয়ে পরলেন মা।কারণ,তিনি জানেন তিনি আরো হৈচৈ করলেও বড়ো ভাইয়ার মতো মেঝো ভাইয়া সব ছেড়ে ছুড়ে এসে পরে থাকবেন না।ওটি তার চরিত্রের মধ্যেই নেই।
শেষরাতের দিকে ঘুম ভাঙলে কানে আসে আপা আর মায়ের গুনগুন।কখন ওরা জেগেছে কে জানে!
আপা বললেন,তুমি এভাবে কান্নাকাটি করলে লাভ হবে ভেবেছো? তোমার মেঝো ছেলে কি জাতের? তোমাকে এখন শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে। ঐ মেয়েকে দৌড়ের উপর রাখতে হবে।ওকে খবরদারি করতে দেওয়া যাবেনা।ওর বিষদাঁত ভাংতে হবে….
মা সে কথায় সায় দিলেন।দীর্ঘশ্বাসের শব্দে মনে হলো যেনো আমাদের আটপৌরে জীবনে নেমে এসেছে কোনো কালো ছায়া।
পরদিন সকাল বেলায় স্বাভাবিক ভাবেই মা মেঝো ভাবীকে বললেন, তোমার গয়না গুলো আমার কাছে জমা রাখো।যদিও খুবই কম গয়না দিয়ে পাঠাইছে তোমার বাপ মা।
মেঝো ভাবী হেসে বললেন, না আম্মা।আপনাকে কষ্ট করতে হবেনা।আমিই সামলে রাখবো সমস্যা নেই।
মা হতভম্ব হয়ে বললেন, তুমি নতুন বউ তোমার কাছে গয়না রাখবা? এ আবার কেমন কথা? আমি সাবধানে রাখবো দাও।
মেঝো ভাবী টললেন না মোটেও।বললেন,আমিও সাবধানেই রাখবো।আমি তো আর খুঁকি নই, যে হারিয়ে ফেলবো।নিজের গয়নার ভার নিজের উপর থাকাই তো ভালো।
– তুমি আমার মুখে মুখে কথা বলছো? কোনো শিক্ষা নেই তোমার? তোমার কি মনে হয় তোমার গহনা আমি খেয়ে ফেলবো? চুরি করবো? যখন তোমার ইচ্ছে হবে তুমি তো নিতেই পারবে নাকি?
– তা করবেন কেন….তবে, আমার তো ইচ্ছে হলে যখন তখন চাইতেও পারবো না।দেখা যাবে মাঝরাতে একটু সাজগোছ করতে ইচ্ছে হলো গয়না পরে, তখন কি আমি গিয়ে আপনার ঘুম ভাঙাবো? খামোখা, আপনি কেনো প্রেশার নিচ্ছেন….
কোনোভাবেই গয়না জব্দ করতে না পেরে ঘরে এসে মা ফুঁসতে লাগলেন।বলতে লাগলেন,কতো বড় ফাজিল। কিভাবে মুখে মুখে তর্ক করলো আমার সাথে….
মেঝোভাবীর উপর আমার কি প্রচন্ড রাগ যে হলো বলার মতো না!
আমি ঠিক করলাম এই ডাইনীর সাথে আমি জীবনেও কথা বলবো না।একটা মানুষ এতো খারাপ হয় কি ভাবে?
তবে,মেঝো ভাবী নিজ থেকেই এসে আমার সাথে কথা বললেন।
রাত জেগে পড়ছিলাম পড়ার ঘরে,সামনে এসএসসি পরিক্ষা বলে কথা।বাড়ির সবাই তখন ঘুমিয়ে গেছে।হাঠাৎ, দেখি মেঝো ভাবী।এক কাপ চা নিয়ে এসেছেন।
হেসে বললেন,চা খাও নিতু।তাহলে আর ঘুম পাবেনা।
রাগে আমার গা জ্বলে গেলো।ইশ! কি আমার জ্ঞানদেনেওয়ালী এলেন রে…তোর কাছে চেয়েছি জ্ঞান আমি?তোর চা তুই গিল।ডাইনী…
এসব কথা মনে মনেই বলছিলাম।মুখে বলার সাহস একদমই ছিলো না।
যাইহোক,আমাকে অমন চুপ থাকতে দেখেও তিনি কিন্তু দমলেন না।আমার খাতায় ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলেন।বললেন,ওমা অঙ্ক তো ভুল।দুদিন বাদে এসএসসি আর এখন তুমি লগ-সূচকের অঙ্কও ভুল করছো? হায় খোদা!
আমি মুখ কালো করে বসে রইলাম।লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছিলো।আমি বরাবরই অঙ্কে দূর্বল তা বলে সেই দূর্বলতা এই ডাইনীটার সামনেই প্রকাশিত হতে হলো?
ভাবী বললেন, দাও আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেই।দেখবে জলের মতো লাগছে একদম।
আমি বললাম,থাক লাগবে না।
– ওমা লাগবে না কেনো? দাও বইটা।তুমি ফেইল করলে তো সবাই বলবে, ভাবী অঙ্কে মাস্টার্স পাশ করেছে আর তার ননদ নাকি এসএসসিতে অঙ্কে ফেইল।
বলেই হাসলেন তিনি। আমি অবাক হয়ে বললাম,আপনি বুঝি অঙ্ক নিয়ে পড়েছেন?
মনে মনে অবশ্য ভাবলাম,এই কঠিন বিষয় এর মতো জটিল- প্যাঁচওয়ালা মানুষই পড়বে…যত্তোসব!
তবে,সেরাতে আসলেও মেঝো ভাবী আমাকে জলের মতো সহজ করেই অঙ্কগুলো বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
এতো সহজ করে,এতো গুছিয়ে এর আগে কখনোই আমি বুঝিনি।
তিনি বললেন,এখন থেকে যে কটা দিন আছে রোজ তুমি আমার কাছে অঙ্ক করবে কেমন?
আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম।তার উপর যে ঘৃণা আর রাগের পাহাড় জমেছিলো তা যেনো খানিকটা কমে গেলো।
এরপর থেকে তাকে ভালো মতো লক্ষ্য করতে লাগলাম।নাহ! এমন নয় যে আমার তাকে খুবই ভালো মেয়ে মনে হচ্ছে। তবে,অতো খারাপও মনে হচ্ছে না।
যেই বড়োভাবী বছরের পর বছর হাসেননি, তিনি মেঝোভাবী আসার পর থেকে মাঝেমাঝেই মৃদু হাসেন।
মেঝো ভাবী কিসব যে বলতে থাকে..! যতক্ষন মানুষ না হাসে ততক্ষণ উনি হাস্যকর কথাবার্তা বলতেই থাকেন।
তাজ আর তিঁথি অর্থাৎ বড়ো ভাইয়ার ছেলেমেয়েরা তো চাচী বলতে অজ্ঞান। সারাক্ষণ চাচীর পিছু পিছু ঘুরে।
স্বাভাবিক ভাবেই কারো সন্তান যার কাছে আদর পায় তার প্রতি মায়ের স্বয়ংক্রিয় ভাবেই ভালোবাসার জন্ম হয়।বড়ো ভাবীর ক্ষেত্রেও বিষয়টার ব্যতিক্রম হলোনা।তিনি মেঝো ভাবীকে ধীরে ধীরে পছন্দ করতে শুরু করলেন।সবসময় নিশ্চুপ থাকা মানুষটাও ধীরে ধীরে নিজের কিছু কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন মেঝো ভাবীকে…
মা এতে ভারী বিরক্ত হতেন।বলতেন,দুই বউ মিলে জোট বেঁধে আমার নামে কুটনামি করে আরকি।স্বামীদের কাছে প্যাঁচ লাগায়।কিভাবে সংসারে অশান্তি আনা যায়,আমাকে কষ্ট দেওয়া যায় সে নিয়েই পরিকল্পনা করে।
আমাকে তাদের ধারে কাছেও ঘেষতে দিতে চাইতেন না মা।কিন্তু,কিছু বলতেও পারতেন না।কারণ,মেঝো ভাবী আমাকে পড়াতো।
মা বলতেন, পড়ালে পড়বি।ব্যাস এর বাইরে কোনো পুতুপুতু করবি না।ও যে কতো বড়ো কালসাপ তা কি আমরা ভুলেছি নাকি? এত দেমাক এই মেয়ের।এক নম্বরের খারাপ।
আমি মায়ের কথায় সাঁয় দিতাম।
তবে,মাঝে মাঝে তা অমান্যও করতাম।দেখা যেতো রোজ সন্ধ্যাতেই যখন মেঝো ভাইয়া ফিরতো কাজ থেকে তখন চায়ের আড্ডা বসতো তাদের ঘরে।মেঝো ভাইয়া,ভাবী,বড়ো ভাবী,বাচ্চারা সবাই মিলে খোশগল্প করতো।
আমিও তখন চলে যেতাম।গল্প মূলত মেঝো ভাইয়া আর তার বউ-ই করতো।ভাইয়াকে কখনোই আগে এতো গল্প করতে দেখিনি।আর,জারিয়াহ ভাবী তো গল্পের ওস্তাদ।মাঝেমাঝে বড়ো ভাইয়াকেও ভিডিও কল দিয়ে যুক্ত করতেন মেঝো ভাইয়া।দারুণ একটা পারিবারিক মিলনমেলা।এভাবে মন খুলে সবাই সবার সাথে কথা বললে অনেক পরিষ্কার হয়ে যায় মন।ঠিক শরতের আকাশের মতো।
কখনো কখনো বাইরে ঘুরতেও চলে যেতাম আমরা সবাই।মেলায় কিংবা কাছাকাছি কোনো জায়গাতে।অথবা,বাচ্চারা উপভোগ করবে এমন কোনো পার্কে।
মা এসব একদম সহ্য করতে পারতেন না।
প্রায়শই ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতেন।বলতেন,,বাড়ির বউদের এতো ঘুরতে বের হওয়ার দরকার কি?
মেঝো ভাবী হেসেই জবাব দিতেন, ঘুরতে বেরুলে মন ভালো থাকে মা।সংসারের একঘেয়েমি কাটে।আপনিও একদিন চলুন না।
– ছিঃ ছিঃ…আমি তো তোমাদের মতো বেহায়া না। সংসার আমিও করছি।জীবনে কোনোদিন এমন ঘুরাফিরা করিনি।তাতে কি ক্ষতি হয়েছে আমার? যত্তসব…
– ক্ষতি তো হয়েছেই।এই যে আপনি কেমন খিটখিটে হয়ে গেছেন।সংসার করতে করতে হাঁপিয়ে গেছেন।
– তোমাকে বলছে তাইনা? সবজান্তা তুমি?ভদ্র মেয়েমানুষ বাড়ির বাইরে যায়না।
– আচ্ছা মা আপনার কখনো পাহাড়,সমুদ্র এসব দেখতে ইচ্ছে হয়নি? স্রষ্টার এতো সুন্দর অপার লীলা-লাস্যে ভরপুর এ জগতের খানিকটাও কি দুচোখকে দেখাবেন না? এ কি নিজের উপর জুলুম নয়?
– বাবারে কতো বড়ো বড়ো কথা…..সংসার ধ্বংস না করে তুমি ক্ষান্ত হবা না আমি বুঝে ফেলছি ভালো মতোই।
ভাবী আর কথা বাড়ায় না।আর বড়ো ভাবী এরপর থেকে আর যেতো না মায়ের ভয়ে। মা তাকে এও নিষেধ করেছেন যেনো মেঝোভাবীর ঘরেও না যায় তিনি।তার ছায়াও যেন না মাড়ায়।নাহয় দেখা যাবে, বড়ো ভাবীকে মেঝো ভাবী নষ্ট করে ফেলবে।
.
আমার পরিক্ষা শেষ হবার পর হঠাৎ একদিন মেঝো ভাইয়া ঘোষণা করলেন,উনারা ঘুরতে যাবেন।বিয়ের পর তো কোথাও যাওয়া হয়নি উনাদের।
মা শুনে ঠোঁট উল্টালেন তাচ্ছিল্যে।বললেন,ঢং দেখে আর বাঁচিনা।ছেলেটাকে আমার পুরো বশ করে নিয়েছে।
কিন্তু মা তো জানেন ওদের আটকানো যাবেনা।তাই হয়তো,তিনি বললেন,নিতুকেও তোদের সাথে নিয়ে যা।পরিক্ষা দিয়েছে এবার একটু ঘুরে আসুক।
শুনে আমিও উৎফুল্ল হয়ে পরলাম।কারণ, মা আমাকে কখনো ঘুরতে যেতে দেননা।
কিন্তু, তারা জানালো আমাকে তারা নিতে পারবে না।
একথা শুনে আমি ভীষণ কষ্ট পেলাম।
মা রেগে বললেন, ও সাথে গেলে তোদের কি সমস্যা? মানে বিয়ে করে বউ পেয়ে এখন মা-বোন সব পর হয়ে গেছে?
মেঝো ভাইয়া বললেন,বিষয়টা আপন-পরের নয় মা।আমরা বিয়ের পর প্রথমবার ঘুরতে যাচ্ছি সেখানে ও যেয়ে কি করবে?
– তোদের ঘরে তো আর ও ঢুকে বসে থাকবে না রাতের বেলা।এতো হিংসা কেনো তোর বউয়ের? এগুলো তো তোকে ওই শিখাচ্ছে আমি জানি।
– মোটেও না মা।নিতুকে নিয়ে পরে ঘুরতে যাবো আমরা।শুধু নিতু কেনো সবাই মিলে ফ্যামিলি ট্রিপে যাবো।বাট,এটা তো……
– থাম…থাম…আর,বলতে হবেনা।ছিঃ ছিঃ এমন ছেলেই পেটে ধরছিলাম আমি।কই আমার বড়ো ছেলে তো এমন বেহায়া ছিলো না কোনোকালে।কখনো তো নির্লজ্জের মতো বলেনি,বউ নিয়ে ঘুরতে যাবো…
মা একপ্রকার কান্নার ভঙ্গী করতে লাগলেন।
মেঝো ভাইয়া মাকে আরো কিছুক্ষণ বুঝাতে লাগলেন।কিন্তু,মা তার কথায় অনড়।
শেষে আমিই বললাম,আমি যাবোনা।
আমার ভারী অভিমান হয়েছিলো।নিতে যেহেতু চায়না খামোখা জোর করে কেনো যাবো?
ওদের উপর মারাত্মক রাগ হয়েছিলো আমার।মনে হয়েছিলো কি স্বার্থপর! ভেবেছিলাম আর জীবনে কথাই বলবো না, ভাবীর সাথে।
কিন্তু,অভিমান ধরে রাখতে পারলাম না।ওরা যখন ফিরলো আমার মনটাই ভালো হয়ে গেলো।আমার জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর উপহার নিয়ে ফিরেছে বলে কথা।
রাগ করে কি করে থাকি!
আমি আসলে কিছুটা কনফিউশানে পরে গেছিলাম।
আসলে কি মেঝো ভাবী ভালো না মন্দ – এই দুইয়ের ভিতর।
তবে,মা এর এসব ঠুনকো উপহারে মন ভরলো না।তিনি এমনিতেও খুব চটে ছিলেন।
শুধু সুযোগ খুঁজছিলেন মেঝোভাবীকে হেনস্থা করার।
এবং,তা পেয়েও গেলেন।
এমনিতে, বড়োভাবী আর মেঝোভাবী দু’জন মিলেই রান্নাবান্না করেন।সংসার সামলান।
তবে,সেদিন মেঝোভাবী কোনো কারণে নিজের ঘরেই ছিলেন।সম্ভবত অসুস্থ বোধ করছিলেন।
আর,মা এতেই ক্ষেপলেন।চেঁচিয়ে বললেন,কোন নবাবের বেটি তুই শুনি? সব কাজ খালি বড়ো বউ করবে,আর তুই বসে বসে গিলবি সাথে আমার ছেলের মাথা খাবি? তোর বাপ-মা কি তোকে শুধু এসবই শিখিয়েছে? কিভাবে ভালো ছেলেদের ছলাকলা করে হাত করতে হয়, কিভাবে মা-ছেলের সম্পর্ক ভাঙতে হয়, সাপের মতো সবখানে বিষ ছড়াতে হয়….তোকে ভালো কিছু শেখায় নি? অবশ্য শেখাবেই বা কিভাবে তোর বাপ -মাও তো কুলাঙ্গার,জানোয়ার। জীবনে একটা সুতাও দিলো না।
মায়ের চেঁচামেচিতে মেঝোভাবী বেরিয়ে এলেন।উনি প্রতিত্তোরে চেঁচালেন না।বরং,ঠান্ডা কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন,আমার মা-বাবা সম্পর্কে একটা বাজে কথাও আমি শুনবো না।
তার চোখে আর কন্ঠে এমন কিছু একটা ছিলো যে মা হঠাৎ যেনো থমকে গেলেন।
– কি করবি তুই হ্যাঁ শুনি? তোকে ভয় পাই আমি? এটা কি তোর বাড়ি?
– অবশ্যই মা।আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন আমি এবাড়িরই বউ।কাজেই এটা আমারও বাড়ি।আর,বারবার কিছুই দেয়নি এসব বলবেন না।আমার মা-বাবা তাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিশ অর্থাৎ এই আমাকেই দিয়ে দিয়েছে…. এরপরেও যদি আপনার ভিক্ষা লাগে সেটা ভদ্র ভাবে বলুন।আমি কথা বলবো বাড়িতে।দান করতে আমার মা-বাবা কার্পণ্য করেন না।
– দান মানে? এই অস/ভ্য….দান মানে কি? আমরা কি ফকির? তোরা আমাদের দান করবি? এত্তো সাহস?
– দান তো তবুও ভালো কথা যৌতুকের চেয়ে।কেননা,যৌতুক হলো রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয়ভাবে অপরাধ,অবৈধ ।আর,দান তো বৈধ…
– চোপ… জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো একদম। শেষ করে ফেলবো তোকে আমি….
মায়ের চোখ মুখ দিয়ে যেনো রাগের ফুলকি ঝড়ছিলো।
আমি মা’কে সামলানোর চেষ্টা করছিলাম।আর,বড়ো ভাবী মেঝো ভাবীকে টানছিলো সরানোর জন্য।
মা আমাকে সরিয়ে বললেন,,এত কষ্ট করে ছেলে জন্ম দিছি,৯ মাস পেটে ধরছি,এতো কষ্ট করে বড়ো করছি এইসব দিন দেখার জন্য না।যে পরের বাড়ির মেয়ে এসে আমাকে অপমান করবে।দুই পয়সার মেয়ে ….. একশোবার বলবো তোর বাবা মা জোচ্চোর -ছোটলোক।
ভাবীও থেমে থাকলেন না। জবাব দিলেন, শুধু আপনি একাই কষ্ট করে ছেলেকে জন্ম দিয়েছেন, আর আমার মা কি আশ্বিনা ঝড়ে আমায় আমায় কুড়িয়ে পেয়েছিলো?আমি কি হাওয়ায় হাওয়ায় বড়ো হয়েছি? আমার মা-ও আপনার মতোই সমান কষ্ট করেছেন। এখন, কষ্ট করেছেন বলেই তিনি নিশ্চয়ই মেয়ে জামাইকে অপদস্ত করার অধিকার রাখেন না।তেমনভাবেই,ছেলেকে কষ্ট করে বড়ো করেছেন বলে যে তার বউকে ইচ্ছে মতো কথা শোনাবেন সেই অধিকার আপনি পেয়ে যাননি।
মা আর কিছুতেই সামলে রাখতে পারছিলেন না নিজেকে।এতো রাগতে আমি কখনো দেখিনি তাকে আগে।পারছিলেন না ভাবীকে মেরেই ফেলবে।এতো চেঁচামেচি! যে লোকজন এসে ঘরের দুয়ারে নক করছিলো।
– তুই কি ভেবেছিস? দুদিন বিয়ে করে এসেই আমার ছেলেকে পটিয়ে ফেলেছিস? এখন যা ইচ্ছা তাই বলবি? আর,আমার ছেলে তোর কথাতেই নাচবে? এ হবে না। আমার ছেলে যতোই তোকে ভালোবাসুক মনে রাখবি আমি ওর মা।বউ কখনো মায়ের চেয়ে বড়ো হয়না।আর,আমি চাইলে তোকে এ বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারি।আমি ক্রমাগত বললে, কয়দিন ও আমার কথা ফেলবে? মায়ের কথায় এরকম বউ দুই-চারটা ছেড়েও দেওয়া যায়,তাতে অন্যায় হয়না।বউ গেলে বউ পাওয়া যায়,কিন্তু মা হারালে আর পাওয়া যায়না।কাজেই,আমি ওকে বাধ্য করতেই পারবো তোকে তাড়াতে….বেশি উড়ছিস না তুই? এর ফল ভালো হবেনা।
– ফল কেমন হবে তা পরে দেখা যাবে।আপাতত, আপনার কথায় দুটো স্থুল ভুল আছে।তা ধরিয়ে দিচ্ছি।এক হলো,মায়ের কথায় কখনোই বউকে ছেড়ে দেওয়া যায়না।এটা অন্যায়।আর,দুই হলো, মা গেলে যেমন মা পাওয়া যায়না, তেমন বউ গেলেও বউ পাওয়া যায়না।কারণ,প্রতিটা মানুষ এক ও অনন্য।মানুষের কোনো রেপ্লিকা হয়না।আমাকে হারালেও সে আর কখনোই আমাকে পাবেনা।হয়তো,অন্য আরেকজনকে বিয়ে করতে পারবে।তাহলে,তো আমিও বলতে পারি,,বাবা আরেকটা বিয়ে করলে মাও পাওয়া যায়। কিন্তু, আসলে কি যায়?কখনোই না। যদি ধরেও নেই আপনার কথা সত্যি।তবুও, আপনার ছেলে বউ পেলেও তার সন্তান তো মাকে পাবেনা। আপনি যেমন কষ্ট করে আপনার সন্তানকে পেটে ধরেছেন তেমনি আমিও কষ্ট করেই আপনার ছেলের সন্তানকে পেটে ধরেছি।কষ্ট করেই জন্ম দিবো।তাই নয়কি? তাহলে, তার জীবনে আমাকে কেনো এতো ছোট করে দেখছেন? সে যেমন আপনার ছেলে,তেমন আমার স্বামীও। আমার কি কোনো অধিকার নেই? কেমন করে বলেন,সে আমাকে তাড়িয়ে দিবে…..
দীর্ঘক্ষণ ধরে কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে গেলেন মেঝো ভাবী।সম্ভবত,চোখে জলের ঝিলিকও দেখা গেলো।
খুব অদ্ভুত হলেও সত্যি, মেঝো ভাবীর সন্তান হবে এই খবর আমরা পেলাম একটা ঝগড়ার মাধ্যমে।
.
লেখিকা : লিলি
