Saturday, June 6, 2026







প্রণয়িনী পর্ব-কল১৯

#_প্রণয়িনী_
#_১৯_তম_পর্বে__

বর্ষপঞ্জিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে আশ্বিন, কার্তিক মাস পেরিয়ে গিয়ে অগ্রহায়ণের সবে দিন সাতেক বাকি আছে। এরপর জাকিয়ে বসবে পৌষ। দিনগুলো যেন দ্রুতই কাটল চোখের পলকে! প্রাণের গর্ভকাল নয় মাসে উত্তীর্ণ হয়েছে।

ছোট্ট ঘর আলোকিত করতে কৃত্রিম বাতি জ্বলছে। বাটন ফোনে রেডিও চালু। রোমান্টিক গান ভেসে আসছে যন্ত্র খানা হতে। প্রাণ জানালার পাশে বেডে পা ছড়িয়ে বসা, কোল জুড়ে মেলে রাখা কাথায় সুই-সুতোর বুনন তুলছে সে। অবসর সময় কাটাতে ওর সেলাই করা। তাছাড়া করার মত কাজও নেই।

প্রাণের শরীর মুটিয়ে গেছে। দিন কয়েক আগে ওজন মেপেছে পুরো ‘বিরাশি কেজি। ওর লাবণ্য বেড়েছে বহুগুণ। চলতে- ফিরতে পারে না। কাজের লোক এসে রান্না, ঘর পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। মাঝে-মধ্যে অদ্বিতা এসে থাকে সখীর সঙ্গ দিতে।

সেই কবে প্রাণ শক্ত খোলস ছেড়ে বেরিয়েছিল, হাত ধরতে চেয়েছিল একজনের কিন্তু সে বান্দা আর আসেনি চৌকাঠে। প্রাণ অফিসে গিয়ে শুনেছিল প্রণয়ের নানুর ইন্তেকাল হয়েছে, স্বপরিবারে গ্রামে চলে গিয়েছেন তারা। অবশ্য, প্রাণ ফোন করেছিল কিন্তু যোগাযোগ হয়নি জনাবের সঙ্গে। এরপর সেও আর হিম্মত করেনি পাল্টা কথা বলার। অফিসেও যাওয়া বন্ধ করেছে। অভিমানে নয়! অসুস্থ আর ভারি শরীর নিয়ে প্রাণের পক্ষে যাতায়াত করা কষ্টের। এছাড়াও প্রয়োজন দেখে না সে।

দীর্ঘ এই সময় প্রাণের অদ্বিতা এবং মকবুল সাহেব ছাড়া কারো সাথে সখ্যতা, যোগাযোগ নেই। ওর দিন কাটে সেলাই, কোরআন তেলওয়াত, অদ্বিতার সাথে সন্ধ্যা লগ্নে হাঁটতে বের হয়ে। ভাবে-ভাবনায় বিভোর থাকে বাকি ফুরসত সময়টুকুতে।

প্রাণের কাজ থামল। নক করার শব্দে তাকাল বন্ধ দরজায়। কে আসবে অসময়ে? ছড়িয়ে রাখা কাথা গুটিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল সে। ওড়না গায়ে ভালো ভাবে জড়িয়ে দরজা খুলল। সাহসাই স্তব্ধের ন্যায় জমে গেল ও সামনে দন্ডায়মান মানুষকে দেখে। ওর নির্বাক জবান হেতু উপচে এলো চোখের জল।

প্রাণের সংসারে অতিথি রুপে আচমকা আগমন ঘটল মকবুল সাহেবের। তিনি দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে এই আজ ফিরলেন নিজ দেশে। উনার যাওয়ার জায়গা বলতে আছে এক মেয়ের বাড়ি। সেখানেই এলেন তিনি। মকবুল কাষ্ট হেসে মেয়ের গড়িয়ে পড়া চোখের জল সস্নেহে মুছে দিতে দিতে আদর মাখা গলায় ডেকে উঠলেন,
–”মা রে,

প্রাণ হামলে পরল বাবার বুকে। বাচ্চার ন্যায় অঝোরে কেঁদে দিল। সে এই বুক কখনো পায়নি। বলতে মনিরা কখনোই ওকে কাছে ঘেষতে দিত না। প্রাণ কত নিভৃত রাত, দুঃখের ক্ষণে মরণ যন্ত্রণা সয়ে কতই না অভিমানে অভিযোগ জমা করেছিল। আজ সব ভাসিয়ে দিচ্ছে।

মকবুল লজ্জিত হলেন। অদ্ভুত দোলাচল টের পাচ্ছেন। মনে ভাসছে কন্যার হক কভূ আদায় করেননি, বাবার দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন সর্বদা, সন্তানকে কখনো আদুরে বুলিতে কাছে টেনে নেননি। হোক তা অন্যের নাটকীয় প্রহসনের স্বীকার হয়ে। মকবুলের কি জানি কি হলো। নোনাজলে ভরে উঠল শক্ত মানুষটার দু’কূল। নিজের কর্মে বড়ই ব্যথিত তিনি। আজ সম্মুখে এসে মকবুল যেন বুক গহীনে মেয়েকে পেয়ে বেশ প্রশান্ত অনুভব করছেন। ওইযে বেদনার ভিড়ে সুখ দ্বিগুণ!

প্রেগন্যান্সির সময় আবেগ বেশি। বাবার ছায়াতলে প্রাণ খুব করে উগলে দিচ্ছে জমা রাখা রোষাবেশ। নাকের ও চোখের জলের ধারাতে ভিজিয়ে দিচ্ছে বাবার প্রশ্বস্ত বুকের জামা। মকবুল এক হাতে মেয়েকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলেন। ধরা গলায় বললেন,
–”মা রে, এভাবে কেঁদে এই বাপটাকে আর শরম দিস না। অনেক অন্যায় করেছি, পারলে মাফ করে দিস আমাকে।

কিয়ৎপল অতিবাহিত হলো। প্রাণ সরে দাঁড়াল। নত মস্তকে হাতের পিঠে চোখ মুছে নাক টানল। মুখ তুলে মিষ্টি হেসে বাবার বাহু ধরে বলল,
–”বসো, বসো। এসব মাফ-সাফ এর কথা তুলবে না আর। আমি আমারটুকু ভোগ করেছি। এখন আমার মাথার উপর বটবৃক্ষ হয়েছো স্বয়ং রব আগের সাত খু’ন ক্ষমা করবেন।

ভার পরিবেশ কেটে যাচ্ছে। রইল না বাবা-মেয়ের সম্পর্কে কোন নেতিবাচকতা। মকবুল ফেলে আসা অনুশোচনা ভুলে গাম্ভীর্যের রেশে হাসলেন। তবে বসলেন না। বরং মেয়েকে বেডে বসালেন। অতঃপর, ভদ্রলোক কক্ষের বাইরে গিয়ে লাগেজ গুলো ভেতরে আনলেন। রত হলেন মেয়ের জন্য আনা উপহার আনপ্যাক করতে। প্রাণ উৎফুল্ল চিত্তে দেখছে বাবার উচ্ছ্বাস! চোখে পিতৃ মমতা। মকবুল মাথা উঠালেন। মেয়ের চাহনি বুঝে কথা পারলেন,
–”কি দেখিস, মা?

–”অনেক শুকিয়ে গেছো তুমি। আব্বু, ছাড়ো ওসব। গোসল করে নাও আগে। খেয়ে-দেয়ে পরে এসব হবে এখন।
প্রাণ তাগাদা লাগাল। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে গামছা নিয়ে বাবার হাতে দিল। বেজায় খুশি ও। ঝলমলে হয়েছে আদল। এখন আর ওর শরীর খারাপ বোধ হচ্ছে না তেমন। মকবুল তাই মানলেন। প্রাণ উনাকে বাথরুম দেখিয়ে দিয়ে উপর তলায় চলল ফ্রিজে রাখা জিনিস নিতে। তাই রেঁধে এখনকার মত খেতে দিবে। বাবাকে ভালো মন্দ না খাওয়ালে হয়!

„বাইরের রাস্তা হতে মাছ ভাজার ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। প্রাণ শারীরিক দশা উপেক্ষা করে বাবার জন্য ইলিশ মাছের লেজ ভর্তা, মাছ ভাজি, পেয়াজ দিয়ে মাছের ডিম ভাজা করল। তাড়াতাড়ি হয়েও গেছে। মেঝেতে খাবার জায়গা করে প্রাণ কক্ষের ফ্যান চালু করে দিল। ওড়না দ্বারা মুখ, গলা, ঘাড় মুছে বিছানায় বসল জিড়িয়ে নিতে। তখনই কেউ হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল। চটপট লাগিয়ে দিল দরজা।

প্রাণ হতভম্ব! ওর ভরকে যাওয়া চিত্ত কাঠ হলো। প্রণয় সোজা গিয়ে প্রাণের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরল। চোখ বুজে বৃহৎ নিশ্বাস টানল। প্রাণ তেমনই তাকাল জনাবের মুখে। অনেক প্রহর কেটে আজ দর্শন হলো সুশ্রী মুখখানি। কিন্তু কেন আসলেন উনি? তার আসার আবশ্যকতাই বা হলো কেন? সে তো প্রায় ভুলতেই বসেছিল। প্রাণের ভাবনা মাঝেই নিজ স্বরে জিজ্ঞেস করল প্রণয়,
–”বাসায় কে এসেছেন?

প্রণয় দিন চারেক হতে ঢাকাতেই ছিল। কিন্তু দেখা দেয়নি প্রাণকে। আজ অফিসে তার বাহক খবর দিল প্রাণের বাড়ি কেউ এসেছে। যদি নিবিড় হয় সে’ভয়ে প্রণয় হন্তদন্ত হয়ে এলো। তথাপি কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না কেন জানি। ওর হার্টবির্ট এখনো দ্রুত চলছে। ভেতরে অস্থিরতা। প্রাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রতিত্তোর করল ছোট্ট বাক্যে,
–”আব্বু এসেছে।

প্রণয় সস্থির হাফ ছাড়ল। ওর উচাটন নামল এতক্ষণে। চোখ খুলে নজর সন্ধির করল প্রাণের সুগভীর নয়নে। জবানে তার নম্রতা,
–”আপনার মনের নিচু চিন্তা দূর হয়েছে? নাকি এখনো আমাকে খেলনার বস্তু মনে করা শেষ হয়নি?

প্রাণের ভ্রু দ্বয় জড়িয়ে গেল। ওর অবুঝ অভিব্যপ্তিতে সন্দিহান ভাবের উদয় হলো। ঠিক কি বিষয়ে ঠেস মারল? কিসের খেলনা? কার চিন্তা? প্রণয়ের ঠোঁটে হাসি ভিড়ল। সাবলীল কণ্ঠ,
–”ভেবেছেন আপনার মন পড়তে জানি না আমি। ঠিকই বুঝেছি আমাকে চাওয়া আপনার কাছে ছেলে খেলা। তারিফ না করে পারা যায় না। কি ভেবেছেন, এক সময় আমার মন উঠে গেলে নিজ পাথেয় জীবনে নামবেন। নিজেকে এত সস্তা ভেবেছেন নাকি আমার চারিত্রিক ত্রুটি রয়েই যাবে আপনার কাছে।

প্রাণ আশ্চর্য হলো! পরিষ্কার বুঝতে পারল এবার। এই লোক তাকে তার চেয়েও অধিক বুঝে যায়। নাহলে না দেখে দূর হতে ওর মনে কি চলছে কেমনে বুঝল। প্রাণ চোখ সরিয়ে নিল। লুকাতে চাইছে স্বয়ী ত্রপিত নজর। তার কি দোষ হয়েছে এটা ভাবা? মোটেও না। বোধহয় প্রাণের বেখেয়ালি শক্ত মন যখন প্রণয়কে ভালোবেসে ফেলবে সেই অবধি তার মনোভাব ঠিক লাগবে নিজের কাছে। কথা হলো রশিদকে দেখে সে ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রণয়কে জায়গা দিচ্ছে জীবনে।

‘বোকা ফুল! একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝবে হুট করে মত পরিবর্তন করা, অপছন্দের পুরুষকে আঁচলে বাঁধতে চাওয়া নিশ্চয় কোন কারণ ছাড়া হতে পারে না। নাহয় তাকে পরীক্ষা করার জন্যই নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাওয়া। দু’টোই বাজে।

প্রণয় খুব কষ্ট পেয়েছে। তাকে সবসময় এমন পুরুষ মনে করেছে যেন সে চাহিদার জন্য মনরমণিকে সপে নিতে চায়। তবুও সে হাসি মুখে মেনে নিয়ে প্রাণকে বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু রাতারাতি এক ঝড় তাদের সময় থমকে দিয়েছে। দূরত্ব বাড়িয়েছে। সময়ের হালে প্রণয় আবার প্রাণের দুয়ারে। প্রাণ শুকনো কণ্ঠে বলে উঠল,
–”সস্তা মেয়ের কাছে কেন এলেন তবে?

প্রণয় তড়িৎ বেগে উঠে বসল। প্রাণ ভরকে গেল সেই হিংস্র চাহনিতে। শুষ্ক ঢোক গিলল। প্রণয় বিমূঢ় নেত্রে চেয়ে থেকে চোয়াল পিষে আওড়াল,
–”বাজে শব্দ আর একটা উচ্চারণ করুন আপনাকে মেরে তিনজন এক কবরে ঠাঁই নিব।

প্রাণের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বেয়ে গেল। অনেক বার প্রণয়ের রাগী সত্বা দেখেছে কিন্তু আজকে প্রণয়ের ক্রোধের পারদ আন্দাজ করা প্রাণের সাধ্যে নেই। কি ভয়াবহ ভয়ংকর!

–”আম্মা, দরজা খোল।
মকবুলের অধৈর্য আওয়াজ। তিনি অনেকক্ষণ ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। দরজায় কষাঘাত, থাবড় তবুও কোন সাড়া নেই ভেতর হতে। তিনি ফের উদ্বেগ নিয়ে ডাকলেন,
–”প্রাণ মা, কি হলো? তুই আছিস ভেতরে? কথা বল।

প্রণয় চোখের পাতা বন্ধ করে দম ফেলল। নিজেকে শমিত করে উঠে দরজা খুলে দিল। মকবুল থতমত খেলেন। কে এই ছেলে? তার মেয়ের রুমেই বা কি করছে? তিনি বাম থেকে ডান পাশ দেখে নিলেন ভুল দরজার সামনে এসেছেন নাকি বুঝতে। না ঠিক কক্ষের সামনেই তো আছেন। শুধালেন,
–”তুমি কে?

–”আপনার মেয়ে জামাই। আমাদের কোয়ালিটি টাইম চলছে ডিস্টার্ব করবেন না। যত্তসব!
প্রণয় মকবুলের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিল। ফিরে এসে বসল বেডে। এদিকে মকবুল কিংকর্তব্যবিমূঢ়! বড় বড় চোখে বন্ধ দরজা দেখছেন। মেয়ে জামাতা মানে? আর কি টাইম চলছে ভেতরে? যখন বুঝলেন ছিঃ ছিঃ করে উঠলেন তিনি।

প্রাণ চোখ দিয়ে প্রণয়কে পিষ্ট করল। প্রণয় উল্টো চুমুর ভঙ্গিমা দেখাল। প্রাণ ভারি শরীর টেনে টুনে দাঁড় করিয়ে দরজা খুলল। মকবুল গম্ভীর মুখে ভেতরে এলেন। উনার বুঝতে বাকি নেই কে এই ছেলে। ততক্ষণে প্রণয় আসন গ্রহণ করেছে মেঝেতে পেতে রাখা মাদুরে। পরিপাটি করা খাবার খাওয়া হবে জন্য। সে পাত্রের ঢাকনা সরিয়ে দেখছে কি কি খাবার রান্না হয়েছে।

মকবুল আঁধার ঘনা আদলে প্রণয়ের পাশে বাবু হয়ে বসলেন। কোন রুপ বাক্য বিনিময় হলো না তাদের। ভদ্রলোক প্রণয়কে দেখেননি। শুধু ফোনে কথা হয়েছিল। প্রাণ উঁচু টুল জাতীয় উপবেশনে বসে সার্ভ করে দিল। সংকোচহীন ভাবে প্রণয়ের পাতে রাখা মাছের কাটা বেছে দিতে লাগল।

প্রণয় আড়ালে একপেশে সূক্ষ্ম হাসল। মকবুল খাওয়ার ফাঁকে ছেলেটাকে দেখছেন। সুদর্শন বটে! সুপুরুষ পুরুষালি গড়ন। চাপ দাড়িতে ভদ্র গোছের লাগছে। কিন্তু তা নয়। প্রমাণ এক কথাতেই পেলেন তিনি। প্রণয় মুখ খুলল,
–”অন্যের জিনিস এভাবে দেখতে নেই।

প্রাণ মুখ কুচকে নিল। এনার মুখে কিছু আটকায় না নাকি!মকবুলের আঁধার মুখ আরও গাঢ় হলো। মেয়ের সামনে বেশ বিড়ম্বনায় পরলেন তিনি। বাপ-মেয়ে দু’জনেই হতাশার নিশ্বাস ফেলল। প্রণয় ভেতরে ভেতরে হেসে কুটি কুটি মজা লুটে। তবে প্রাণের মুড বিগড়ে যাওয়ার আগে প্রণয় লোকমা তুলে ধরল মনরমণির সামনে। প্রাণ নিশ্চুপ মুখে নিল। মকবুলের মন ভরে উঠল। মেয়েটা সুখের সাহারা পাচ্ছে অবশেষে।

„প্রণয় উপুড় হয়ে শুয়ে প্রাণের প্রফুল্লতা দেখছে। তার পায়ের কাছে বিছানায় মকবুল বসে আছেন। প্রাণ বাবার আনা সব জিনিস নেড়ে-চেড়ে দেখছে। কত জিনিস এনেছে তার জন্য। জামা-কাপড়, মেকাপ সরঞ্জাম, জুতো’টাও রয়েছে। স্বর্ণের জিনিস পেয়েছে। ওর ঠোঁটে উপচে পড়া হাসির ফোয়ারা। সে শাড়ি গুলো গায়ে চাপিয়ে দেখছে। প্রাণের মনে পরল কিছু। সুন্দর দেখে একটা শাড়ি নিয়ে বলল,
–”আব্বু, পাশের রুমের সখীকে দিয়ে আসি এটা? আমি রোজ তার সাথে হাঁটতে বের হই।

মকবুল মেয়ের আমুদে রেশ বাড়াতে ঘাড় নাড়লেন। প্রাণ প্রাণোচ্ছল মনে হাঁটা ধরল। মেয়েটা তাকে এটা-সেটা খেতে দেয়। অনেক সাহায্য, উপকার করে। প্রণয় বিড়বিড় করল,
–”পাগলি একটা!

কক্ষ নিরব। পাখার শো শো আওয়াজ তুঙ্গে। মকবুল দুই হস্তে মুখ মুছে ভারি গলায় জবান খুললেন,
–”আমি একবার তোমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।

–”প্রয়োজন নেই।
প্রণয়ের গুরুগম্ভীর স্বর। সে উঠে বসল। কোলে রাখল মাথায় দেওয়া বালিশ। মকবুল প্রণয়ের হাত ধরলেন। প্রণয় ভ্যাবাচেকা খেল। মকবুল নমিত নজরে নিজ স্বরে বললেন,
–”প্রাণের মা মারা যায় তখন মেয়েটার বয়স ছয়, ওর দেখা শোনার জন্য পরিবারের প্ররোচনায় বিয়ে করলাম। কিন্তু রবের কি ইচ্ছা, মেয়েটা আর ভালো রইল না। মনিরা ওকে দেখতেই পারতো না। ওটুকু মেয়েটাকে না খাইয়ে রাখত, মারধর করত। না পেরে প্রাণকে মামার বাড়ি নিয়ে গেলাম। ওর নানা-নানি নেই। মামাও রাখতে অস্বীকার করল। আকুল দরিয়ায় পরলাম। পরে অনেক ভেবে স্বার্থপর হয়ে সেদিনেই প্রাণকে এতিমখানায় রেখে আসলাম। মেয়েটা আমার পা ধরে খুব কেঁদেছিল। পাষাণ, লোভি হয়ে ওকে তার হালে ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। তারপর আর কখনো মেয়ের কথা মনেই করেনি। আমিও বাপের জমিজমা বেচে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছি।

অনেক বছর পর, একদিন ফোন এলো। মেয়ে নিজে ফোন করে নালিশ জানাল কোন ছেলে তাকে বিরক্ত করে। তখন প্রাণের সতেরো বছর। আমি শকে চলে গিয়েছিলাম। সেই কণ্ঠে রাগ, ক্ষোভ, কষ্ট কিছুই ছিল না। মেয়ে আমার পাথর হয়ে গেছে। আমিও দেশে ছিলাম। গেলাম প্রাণের সামনে। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে। কিন্তু ছেলের ব্যাপারে খোজ নিয়ে দেখলাম ছেলে ভালোই। মধ্যবিত্ত সম্পদশালী। সাত-পাঁচ না ভেবে দিলাম বিয়ে। পরিহাসে সেখানেও মেয়ের দিন গেল না।

চোখের জল গড়িয়ে পরল। মকবুলের নত মাথা আরও নুইয়ে গেছে। প্রণয় হাত ছাড়িয়ে নিল। বুকে তীব্র ব্যথা দহন হচ্ছে। তার প্রাণ প্রণয়িনী কত কঠোর ছিল চরিত্র সংযমে। জালিম দুনিয়া কিনা তাতেই কলঙ্ক লাগাল। ভারিক্কি গলায় আওড়াল,
–”আজ বিশ্বাস হলো আপনার মতো বাবাও আছে দুনিয়ায়।

–”আমার মেয়েটার দেওয়ার মতো কিছুই নেই। তুমি,
মকবুলের ফ্যাচফ্যাচে কান্নারত কথা শেষ হলো না প্রণয় মাঝপথে উচ্চ রবে হেসে দিল। সে জানে ওই পুরনো ডায়লগ ঝাড়বে। শোনার ইচ্ছে নেই। তবে ওর কণ্ঠে প্রকাশ পেল সর্বোচ্চ অধিকার,
–”আপনার মেয়ে সম্পূর্ণ আমার। আমি আমাকেই দিয়ে দিয়েছি উনাকে। ভাববেন না, এই অধম মাথার তাজ করে রাখবে প্রাণকে।

–”আব্বু,
চটক কাটার ন্যায় মকবুল, প্রণয় তটস্থ হলো। শিউরে উঠল দু’জন। তারা লাফিয়ে নেমে বাইরে গেল কক্ষের। প্রাণ করিডরে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। নিদারুণ ঘামছে সেই সাথে। ছটফট করে গলা ফাটাচ্ছে। মেয়ের ব্যথাতুর ক্রোন্দনে তাল হারালেন মকবুল। প্রণয় সোজা গিয়ে প্রাণকে কোলে তুলে নিল। এক প্রকার দৌড়ের মতো হাঁটতে লাগল। চিবিয়ে উঠল,
–”তাড়াতাড়ি আসুন। গাড়ির দরজা খুলে দিন।

মকবুল পেছনের সিটে উঠতেই প্রণয় প্রাণকে সেথায় শুইয়ে দিল। নিজে গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। দুই অজ্ঞ পুরুষ ভারি বিপদ অনুভব করছে। পুরো গাড়ি চিৎকারে দরদরিয়ে ঘামচে তারা। প্রণয় বলল,
–”হাত মালিশ করে দিন।

মকবুল তাই করলেন। প্রণয় ব্যাক মিররে দেখছে প্রাণ পুরোই দশাসই! কাছেই হসপিটাল ছিল সেখানেই পৌছল। কিন্তু ভেতরে কেবিন অবধি নেওয়া গেল না আর। প্রাণের ওয়াটার ব্রেক করেছে। প্রণয় ডক্টর টিমকে গাড়িতেই কাজ দেখতে বললেন। নরমাল ডেলিভারি হবে তাই অসুবিধা হলো না।

সময়টা স্নিগ্ধ বিকেল। স্থির বাতাস বইছে। সহনীয় গরম পবনের মিশেলে সৌম রুপ করেছে আবহকে। সাথে যোগ হয়েছে প্রাণের প্রসব বেদনার হাহাকার। প্রণয়, মকবুল অস্থির। তখনই নিরব হলো প্রাণ। এক নতুন অতিথি আগমনী বার্তা দিল তার। সরব কান্নায় ভরিয়ে তুলল পরিবেশ।

ধরে প্রাণ ফিরল যেন পুরুষ দু’জনের। গাড়ির দরজা খুলল। নার্স বেরিয়ে এলেন। হাতে তোয়ালেতে পেচানো ফুটফুটে শিশু। কান্না থামিয়েছে এখন। ওপাশ হতে ডক্টর সাজিদা বেরিয়ে আসলেন। নিজের মতো বললেন,
–”এভরিথিং ইস ফাইন. ছেলে বাবু হয়েছে। অভিনন্দন!

–”শুকরিয়া।

ওয়ার্ড বয়’রা প্রাণকে স্ট্রেচারে উঠাল। কেবিনে শিফট করা হবে। প্রণয় হাসি মুখে নার্সের সামনে হাত পাতলো। কোলে নিতে চায় সে। নার্স নাকোচ করলেন,
–”ম্যাম, বার বার বলে দিয়েছেন কারো কোলে না দিতে।

–”বারন করলেই হলো। আমি বাবা হই।
প্রণয় জোর করেই কোলে নিল। নাকের ডগায় চুমু খেল। কেঁপে উঠল নবজাতক। চোখ খুলে প্রথমেই দেখল একজন কাঙ্গাল মানুষকে। প্রণয় আলতো হাসল। আওড়াল,
–”আমার প্রাণের প্রাণ।

প্রণয় প্রাণের পাশে বাবুকে শুইয়ে দিল। নিজ প্রাণহরণীর কপালে চুম্বন বসাল। সটান দাঁড়িয়ে হুকুম করল,
–”এক সেকেন্ড চোখের আড়াল করবেন না।

নার্স মাথা নাড়লো। প্রণয় প্রস্থান নিল কেবিন। মকবুল চেয়ারে বসে আছেন। প্রণয় ‘আসছি বলে রওনা হলো বাড়ির পথে।

„–”আম্মু, আম্মু,
প্রণয়ের হাক-ডাকে দ্রুতই রুম হতে বেরিয়ে এলেন লিপি। চিন্তিত হয়ে বললেন,
–”কি হয়েছে, আব্বা?
–”তৈরি হয়ে নাও। বের হব আমরা। আমি গোসল দিয়ে আসছি।
–”কেন? কোথায় যাব?
লিপির প্রশ্নে প্রণয় সিড়ি বইতে বইতে উত্তর পারল,
–”প্রাণকে আমার নামে লিখে নিতে।

বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে_________________________________________

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ