#_প্রণয়িনী_
#_১৭_তম_পর্বে__
–”আপু, আমি আজ আসি। আমাকে অফিসে যেতে হবে।
প্রাণ অনুরোধ করল তাও হেলদোল দেখা গেল না মাহিমার। সে প্রাণের হাত চেপে ধরে রেখেছে। স্বয়ী কাজে রত মাহিমা কথার পিঠে বলল,
–”অফিসে না গেলে কেউ কিছুই বলবে না।
বটেই তো! লাঞ্চ টাইম শেষ হয়েছে আধা ঘণ্টা হবে। অফিসে উপস্থিত নেই কই কেউ তো প্রাণকে ফোন করে বকা-ঝকা করল না। বোধহয় কারোর খেয়ালই নেই তার অনুপস্থিতির। মাহিমা শুধাল,
–”শুধু কি আমলকি নিবে? আমি নিয়ে দিতে চাইলাম তুমি তো বারন করলে।
প্রাণ ভদ্রতা রক্ষার্থে চাহিদা মত ফল কিনল। দাম মেটালো নিজেই। মাহিমার মনঃক্ষুন্ন হলেও করার কিছু নেই। পাভেল ওর মাথার উপর ছাতা ধরে রেখেছে। এসবের কোন মানে হয়? বেচারা এ পর্যায়ে অসহায় গলায় বলল,
–”আম্মু আর কত? গরমে যে টেকা যাচ্ছে না।
–”এই তো বাবা হয়েছে। ড্রাইভারকে ফোন দাও।
প্রাণ স্বাভাবিক চিত্তে দাঁড়িয়ে রইল। মাহিমা তাকে চৌধুরী বাড়ি নিয়ে যাবে। লিপি বেগম নাকি মর্জি জানিয়েছেন ওকে দেখার। একদিকে ভালোই হলো। আজ নাতে কাল যাওয়াই লাগত। আজকের পর থেকে প্রাণ শান্তির নিশ্বাস ফেলবে।
গাড়ি এলো তাদের সম্মুখে। মাহিমা প্রাণকে নিয়ে ব্যাক সিটে উঠল। পাভেল জিজ্ঞেস করল,
–”আম্মু, আমার সতীনকে জানাব?
প্রাণ লজ্জা পেল একটু। এই ছেলে বয়সের তুলনায় বেশ ইঁচড়েপাকা! মাহিমা চোখ পাকাল। ছেলেটা বড্ড দুষ্টু। বলল,
–”দরকার নেই।
পাভেল যেন চাঁদ হাতে পেল। মুখবিবর উজ্জ্বল করে প্রাণকে অতীব শরমে কুণ্ঠিত করতে বলল,
–”যাক, কোয়ালিটি টাইমটা জমবে ভালো।
–”বাদর!
মায়ের কথায় পাভেল চোখে সানগ্লাস গলিয়ে প্রাণের সামনে চকলেট বাড়িয়ে ধরল। বলল অহং গলায়,
–”এমনিতেই মামা বড্ড অগোছালো ছেলে। তুমি চাইলে আমি তোমার পারফেক্ট ম্যান হতে পারি।
ফ্ল্যাটিং স্কিল লাজবাব। প্রাণ মনে মনে তারিফ না করে পারল না। সে চকোলেট খানা নিল। হায়ায় মরি মরি দশা ওর। মাহিমার অবাক স্বর,
–”তোমার মামা রাগ করে না? সে তো অনেক পজেসিভ।
মাহিমা তুমি ডাকের জন্য বলল উপরোক্ত কথা। পাভেল জবানে ঠাট বজায় রাখল,
–”বাপ হই তোমার ভাইয়ের। আমাকে টক্কর দেওয়া দূর সে হাতে-পায়ে ধরতে অবধি দ্বিধা করে না। সিক্রেট বলি একটা?
মাহিমার ন্যায় প্রাণও উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। জানার বড়ই আগ্রহ দু’জনার মাঝে। পাভেল চুল ব্যাক ব্রাশ করে দাম্ভিক কণ্ঠে বলল,
–”তোমার বেকুব ভাই আমার দেওয়া পরামর্শ প্রয়োগ করে প্রাণকে পটাতে।
পাভেল স্বয়ী দর্পে ফ্রন্ট সিটে উঠে বসল। গাড়ি টান দিতে বলল ড্রাইভারকে। মাহিমা ছেলেকে বাহবা দিল। অবাকের চূড়ান্তে পৌছে গেছে প্রাণ! হা হয়েছে ঠোঁট জোড়া। তার তো ইচ্ছে করছে খুব করে কান মলে দিতে। নাহয় দুই, চার শক্ত কথা বলে মনের রাগ উগলে দিতে। সেও তো ভাবে প্রণয় হলো একটা গাধা। জনাব এত কুবুদ্ধি আর কথার ফুলঝুরি কই শিখে? এই পাভেলেই তাহলে সব ফ্যাসাদের জড়।
পাভেল লুকিং মিররে প্রাণের রাগান্বিত আনন দেখে মিটিমিটি হাসছে। এই মেয়ে তার সুপুরুষ মামার প্রথম প্রেম, এই নারীর জন্য কান্না পর্যন্ত করেছে, সেই স্নিগ্ধ প্রণয় কিভাবে বৃথা যেতে দেয় পাভেল? মেয়েটা আসলেই সুদর্শনা। একবার দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করবে। চোখ সরিয়ে নিল পাভেল। মাহিমা প্রফুল্ল কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে,
–”জানো প্রাণ, পূর্ণা তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ! সম্মুখ সাক্ষাৎ হলো আমারও। আমি না বলে পারছি না, এক আনাও মিথ্যে নহে– আসলেই তুমি রুপে অপরুপা!
প্রাণ নিরব। সে কি এতই সুন্দরী? তাহলে এই লাবণ্য প্রথম পুরুষকে বেঁধে রাখতে পারল না কেন? মাহিমা প্রাণের নিশ্চুপ দশা দেখে বুঝল সে অস্বস্তি বোধ করছে। তাই সেও চুপ রইল।
„গাড়ির গতি ম্যানশনের পোর্চের নিচে রোধ হলো। পাভেল নেমে এসে প্রাণের সাইডের দরজা খুলে হাত এগিয়ে রাখল। প্রাণ সলজ্জ হেসে পাভেলের হাত ধরে নামলো। পূর্ণ নজরে দেখল শান ও শওকতে মোড়া বাড়িটি। যেন ধনাঢ্য এবং আভিজাত্যের প্রতীক!
পাভেল দৌঁড়ে গেল লিপি চৌধুরীকে খবর দিতে। মাহিমা প্রাণকে লিভিং স্পেসে নিয়ে এলো। বেচারি ভেতরে ভেতরে বিস্মিত হলো। ওর ইহজন্মে এত বড় বাড়ির ভেতরে ঢোকার সৌভাগ্য হয়নি। তাদের থাকার ফ্ল্যাটও এহেন বিশাল হবে না। মাহিমার উচ্চ গলার আওয়াজে মুখর চারিপাশ।
–”এত ব্যস্ত হবেন না, আপু।
প্রাণ মাহিমার তোড়-জোড় দেখে বলল। মাহিমা শরবত আনতে তাগাদা দিয়েছে। তারও গরম থেকে ফিরে তেষ্টা পেয়েছে। সে সোফাতে বসতে ইশারা করে আমুদে গলায় আওড়াল,
–”বা রে, তুমি প্রথম বার এলে বাড়িতে।
প্রাণ বসবে কি পাভেল সেথায় ভিড়ল। জানাল,
–”নানুমা, তেলওয়াত করছে। পারা শেষ হলে উঠবে। প্রাণ, চলো তোমাকে মামুর রুম দেখিয়ে আনি।
–”তাই যাও, আমি খাবারের বন্দোবস্ত করি।
মাহিমা কিচেনে গেল। বাসায় সার্ভেন্ট আছে কিন্তু রান্নার লোক নেই। মোটেই ক’জন সদস্য সংখ্যা, যা রান্না সব মাহিমা আর লিপি চৌধুরী করেন।
প্রাণ অপ্রতিভ হলো। কারো বাড়িতে হুট করে এসে এভাবে ঘোরাঘুরি করা কি শোভা দেখায়? পাভেল হাত পাতলো। প্রাণ প্রশ্ন সূচক চোখে তাকিয়ে আছে। বুঝল না কি করবে। পাভেল বলল,
–”হাত ধরো। তুমি ভাবার থেকেও বেশি লাজুক। আরে বাবা, আমি ইনোসেন্ট ইয়াং বয়, আমার কি দূরত্ব পোষায়?
প্রাণ ফিক করে হেসে দিল। জনাব নাকি ভদ্র আবার তার দূরে দূরে থাকাও কষ্টদায়ক। সে সাহস করে দুঃসাধ্য কাজ করল। পাভেল চমকে গেল যখন প্রাণ তার বাহু জড়িয়ে ধরল। ইশ! হার্ট বির্ট মিস হলো বুঝি! এই মুহুর্তটার একটা ছবি তুলে রাখা উচিত। তার বলদ মামুকে দেখানো যেত।
প্রাণ ধীরে সুস্থে দোতলায় উঠল। পাভেল যথেষ্ট যত্নশীল। সে প্রণয়ের কক্ষে প্রবেশ করল প্রাণকে নিয়ে। প্রাণ অচিরেই নাকে ওড়না চাপলো। রুম জুড়ে গন্ধ করছে। যা ভেবেছিল ঠিক সেরুপ কামড়ার দশা। কোন আবর্জনার স্তুপের চেয়ে কম নয়। লোকটা থাকা কিভাবে এই নোংরা জায়গায়?
–”তোমার বিরহে এই কক্ষের আরও ভয়াবহ অবস্থা ছিল। পরশুই পরিষ্কার করা হয়েছে, এক দিনেই আবার একই।
পাভেলের কথায় প্রাণ ওর মুখের দিকে তাকাল। পাভেল বিলম্ব না করে প্রাণকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। প্রাণ আটকে রাখা নিশ্বাস ছাড়ল এবার। তার তো বমির উদ্বেগ হয়েছে। সার্ভেন্ট জুস নিয়ে এসেছেন। পাভেল গ্লাস নিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গেল প্রাণকে।
প্রাণকে বিছানায় বসালো। হাতের গ্লাস নিতে বলল পাভেল। প্রাণ আর রা করল না। এক চুমুকেই শেষ করল শরবত। ওর ভীষণ পিপাসা পেয়েছিল। পাভেল প্রাণের পায়ের কাছে মেঝেতে বাবু হয়ে বসল। প্রাণ কক্ষে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। যখন দৃষ্টি পরল পাভেলের উপর ব্যতিব্যস্ত গলায় শুধাল,
–”তুমি নিচে বসলে কেন?
পাভেল উত্তর বিনা প্রাণের হাত হতে চকলেটের প্যাক নিল। তা ছিড়ে ভেঙে এক টুকরো ধরল তার মুখের কাছে। প্রাণ পাভেলের নাক টেনে দিয়ে তা খেল। নিরবেই কাটল খাওয়ার দৃশ্যটুকু। পাভেল সম্পূর্ণ চকলেট খাওয়ানো শেষ করে কথা পারল,
–”আমি হয়তো বুঝে গেছি তুমি কি জন্য বাড়িতে এসেছো।
প্রাণ স্থবির হয়ে পরল। ছেলেটার সিক্স সেন্স প্রখর! পাভেল আর ঘাটালো না। যা করতে চায় করুক। অবশ্য তার পরিবার গায়ে মাখবে না। তারা এত নিচু মানষিকতার নয়। নাহলে শুরুতেই ছেলের পায়ে শিকল পড়িয়ে দিত। না জল এতদূর গড়াতো!
পাভেল কৌতূহলী হয়ে প্রাণের হাতের ছোট্ট পার্সটা নিল দেখার জন্য। এটা সেকেলে স্বর্ণকার’রা যে ব্যাগে ক্রেতাকে স্বর্ণের জিনিস দিত তাই। ব্যাগের গায়ে খোদাই করা নাম অবছা রয়েই গেছে। পাভেল চেইন খুলে দেখল কিছু টাকা, বাটন ফোন, আইডি কার্ড আর প্রেসক্রিপশন রয়েছে। জিজ্ঞেস করল,
–”এত টাকা দিয়ে কি করবে? ডক্টরের কাছে যাবে?
–”না,
প্রাণের ছোট্ট উত্তর। জবাব না দিলে ডক্টরের রেশ ধরে প্রণয় তাকে ত্যক্ত করে ছাড়বে। নিচ হতে তাদের ডাক এলো। পাভেল যার জিনিস তাকে দিয়ে রমণির সুগভীর নয়নে নিজ অক্ষি স্থির করল। বলল,
–”জীবনে সবকিছুর গুরুত্ব সমান। যে সমতা বজায় রাখে সেই সুখের সন্ধান পায়। যেটা হারিয়ে গেছে তা পাওয়া না গেলেও অন্য কারোর মাঝে সমরুপ হারানো জিনিস পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
প্রাণ ছেলেটার বুদ্ধিমত্তায় ক্ষণে ক্ষণে বিস্মিত হচ্ছে। তবে সে মানতে নারাজ। তার ঝুলিয়ে সমতা বলতে কিছু নেই। যা রয়েছে সবটুকুই দুঃখ। পাভেল উঠে দাঁড়াল। প্রাণের হাত ধরে তাকে নিয়ে চলল লিভিং রুমে।
„লিপি চৌধুরী সোফায় বসে আছেন। তিনি প্রাণকে দেখে চোখ ছোট করে নিলেন। প্রাণ সালাম পেশ করল। গুটিয়ে যাচ্ছে সে ভদ্রমহিলার শানিত নজরে। কি ধারাল চাহনি! গায়ের লোম কাটা দিয়ে উঠছে। পিঠের দাড় বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইছে। স্বভাবতই মানুষ অপরিচিতদের সামনে নার্ভাস ফিল করে। লিপি খুটিয়ে খুটিয়ে পরোখ করলেন। এক পর্যায়ে বললেন,
–”বসো।
প্রাণ ভারি শীতল গলায় কেঁপে উঠল। বসল সে। মাথা নুইয়েই রাখল। মাহিমা টি-টেবিল খানা খাবারে ভরিয়ে ফেলেছে। পাভেল মায়ের উপর তাড়াস খেল। সব মেহনত বিফলে যাবে যে! প্রাণ এর এক দানাও গলা দিয়ে নামাবে না।
লিপি চোখের চশমা খুললেন। ছেলের পছন্দ আছে। কিন্তু, ভেবেই নাখুশ হলেন তিনি। কি আর করার? মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে উনার। মেয়েটার ভাগ্যের উপর সহমর্মী হবেন নাকি তার ছেলেকে ফাসিয়েছে জন্য বাঘিনী রুপে পিন্ডি চটকাবেন।
প্রাণ সময় নিল না। কাউকে দোলাচালে রাখা অভদ্রতা। অন্যকে পেরেশানি দেওয়ার মানে হয় না। সে চোখ তুলল। লিপির কপালে ভাজের উদয় হলো। যেই চোখে ভয় ছিল সেখানে এখন সরলতা বিরাজমান। প্রাণ নিজ স্বরে আওড়াল,
–”আপনাদের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ। এই বাড়ির বউ হওয়া সৌভাগ্যের। তবে কি সবাইকে সব স্থানে মানায় না। আপনার ছেলেকে বোঝান এক বাচ্চার মাকে ঘরে তুললে লোক সমাজে আপনারা উপহাসের পাত্র হবেন। তার পাশে উচ্চ বংশীয়, সমকক্ষ বিত্তশালী মেয়েই মানায়। আন্টি, আমাকে মাফ করবেন, ছেলের মা হিসেবে আপনার কাছে মান-মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা গর্বের হওয়া উচিত।
বসার ঘর পিনপিনে নিরবতায় আচ্ছন্ন। সকলে স্তব্ধ। মুখের ভাষা খুইয়ে নির্বাক। কারো চোখের পলক অবধি পরছে না। খাবার গুলো তেমনই পড়ে রইল। প্রাণ তার পলি ব্যাগ হাতে তুলে দাঁড়িয়ে গেল। দ্রুতই প্রস্থান নিল জায়গা। পাভেল পিছু আসতে ধরেছিল প্রাণ এক বাক্যে তাকে থামিয়ে দিয়েছে,
–”এটুকু কষ্ট ওঠানোর প্রয়োজন পরবে না।
প্রাণ রাস্তায় এসে থামল। হাত তুলে রিকশা ডাকল। ইগো হার্ট করেছে, তাদের ভাষায় জবানের স্পর্ধা দেখিয়েছে নিশ্চয় কাজ হবে এতে। ভাবার বিষয় ছেলের বোকামিতে পরিবার এত উদাসীন ছিল কি করে? প্রাণ আর ভাবল না। রিকশা ভিড়ল। সে শেষ বার পিছু মুড়ে দেখে নিল আলিশান বাড়িটা।
প্রাণের মাঝে অনুশোচনার বালাই নেই। বরঞ্চ বেশ খুশি খুশি লাগছে তাকে। একটা বিরাট পাথর যেন সরে গেছে ওর বুক থেকে। মুখটা উজ্জ্বল। প্রাণ ওড়নার প্রান্ত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে রিকশা ভাড়া মেটালো।
„বর্তমানে প্রাণ আছে ফার্নিচার শোরুমে। ঘুরে ঘুরে যা কিনবে সেটা ছাড়াও অন্যান্য জিনিস দেখছে। দাম জানতে চাইছে। মেয়ে’রা একটু শৌখিন। কেনাকাটা করতে জুড়ি নেই তাদের। প্রাণ এভাবেই এক ঘন্টা কাটিয়ে দিল। অবশেষে ওয়্যারড্রব কিনে বাড়ি ফিরল।
প্রাণ জায়গা দেখিয়ে দিলে রিকশাচালক ওয়্যারড্রব যথাস্থানে রেখে চলে গেলেন। প্রাণ জিড়িয়ে নিতে বিছানায় বসল। চোখ রাখা নতুন মেহমানে। র্যাকে কাপড় রাখলে তেলাপোকা কাটে, ময়লা হয়। আর পোশাক রাখা নিয়ে চিন্তা নেই।
„আসরের আযান পড়ছে। আযানের জবাব দিল প্রাণ। চুলায় আমলকির আচার রাঁধতে বসিয়েছে। হয়েও গেছে। কক্ষের ফ্যান অফ তাই ঘেমে গিয়েছে ও। প্রাণ আচার ঠান্ডা হতে রাখল। পরে জারে তোলা যাবে।
গামছা হাতে নিয়ে প্রাণ ফোন চেক করে দেখল। না, অফিস থেকে কোন বার্তা আসেনি। প্রণয়েরো কোন খোঁজ নেই। বোধহয় বড়লোকদের চোখ খুলে দেওয়া কাজে লেগেছে। সে হাত-মুখ ধুতে রওনা হলো।
প্রাণ দরজা লক করতেই দেখা মিলল অদ্বিতার। ওর কি আজ চাঁদ পাওয়ার দিন নাকি? এত ভালো যাচ্ছে কেন এই দিবস! প্রাণ বিস্তর হেসে বলল,
–”আয়, আয়। ভালো সময়েই এসেছিস।
অদ্বিতা ভ্রু জড়িয়ে প্রাণের সাথে কক্ষে ঢুকল। প্রাণ সখীকে আগে আচার খাওয়াবে তারপর হাত-মুখ ধুবে নাহয়। সে বাটিতে সার্ভ করছে। কণ্ঠে নেমেছে গুণগুণ লয়ের গুঞ্জন। বান্ধুবির খোশ-মেজাজিপনায় অদ্বিতা অবাক রেশে জানতে চাইলো,
–”কি ব্যাপার? আনন্দ যে ধরে না! তা আমাকেও বল খুশির কারণটা।
–”বলছি, বলছি। তার আগে তুই টেস্ট করে দেখ।
অদ্বিতা আচারে ভর্তি বাটি’টা নিল। এক লোকমা খেয়েই তারিফের পুল বাঁধল। প্রাণও সঙ্গে খেল। অদ্বিতা এসেছে কাজে। প্রাণকে অতি উৎফুল্ল দেখে বেচারির আনন্দকে মাটি করতে মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু না বললেই নয়।
এদিকে দরজায় থাবড়ানি শুরু করল কেউ। প্রাণ অগ্নি চোখে চাইলো দরজায়। কোন যে অসভ্য এটা আল্লাহ জানেন! ভেসে এলো,
–”প্রাণ, দরজা খুলুন।
‘প্রণয়, প্রাণ হতবাক হলো। এই ছেলে এখানে কি করছে? সে যা অকাম করে এসেছে তার জন্য আসলো নাকি। এলেই বা কি! অদ্বিতা ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। প্রণয় গমগমে পায়ে এসে প্রাণের সামনে দাঁড়াল। মাহিমার থেকে সব শুনেছে সে। ইচ্ছে তো করছে ঠাটিয়ে থাপ্পড় মারতে। নেহাৎ সে ভদ্রলোক!
ছোট্ট ঘর। তিন জন মানুষেই ঠাসা অনুভব হচ্ছে। অদ্বিতারো সময় নেই। কাজ হতে ব্রেক নিয়ে এসেছে। তাই প্রাণের বাহু ধাক্কা দিয়ে ধ্যান টানল ওর। প্রাণ প্রণয়ের থেকে চোখ সরিয়ে তাকালো সেপানে। অদ্বিতা গড়গড় করে বলল,
–”মোহন তোকে ফোনে না পেয়ে আমাকে কল করেছিল। সে আর আন্টি পুলিশ কাস্টাডিতে। তারা তোর সাথে যোগাযোগ করতে চায়। আমি এসেছি তোর যদি উকিলের প্রয়োজন পড়ে তাই। ভেবে দেখ কি করবি। আমি আসছি।
প্রাণ স্বাভাবিক! ফোনে পাবে কি করে? তারা তো জানেই না প্রাণের ফোন আছে। মিথ্যে বলেছে অদ্বিতাকে। ও দাঁড়িয়ে গিয়ে অদ্বিতার পেছনে গেল। সে প্রণয়ের বাড়ি যাওয়া থেকে কি কি বলে এসেছে সবটা জানাল বান্ধবিকে। এই তাহলে খুশির কারণ। অদ্বিতা রইল প্রতিক্রিয়াহীন।
প্রণয় শুয়ে পরল বেডে। মন-মেজাজের ঠিক নেই। সে এই প্রাণকে নিয়ে কি করবে? কোন ভাবেই, কোন কিছু করেই মন জয় করতে পারছে না। কিন্তু তার পরিবার উল্টো তারিফ করছে প্রাণের। বোকা মেয়ে! শেয়ালকে বলে এসেছে নিজ মুরগী স্বাস্থ্যবান। প্রণয়ের হাসি পেল রমণির নির্বুদ্ধিতার উপর।
প্রাণ রুমে এসে সোজা প্রশ্ন করল,
–”কি জন্য এসেছেন?
প্রণয় শুয়ে থেকেই মাথা ঘোরালো। কিছু বলবে নজর আটকালো চকচকে ফার্নিচারে। ঠেস মেরে বলল,
–”ভালোই সংসার পেতেছেন!
প্রাণ কথা বলল না। মাথায় হিজাব পরিধান করতে লাগল। প্রণয় ফের শুধাল,
–”থানায় যাবেন?
–”জি,
–”কেন?
প্রাণ চিকন চোখে তাকাল। প্রণয়ের মন বাঁধা দিতে চাইছে। যা নরম দিল প্রাণের, মনিরার কান্নার ড্রামা দেখে হয়তো গলে যাবে। ছাড়িয়ে নিব আপদ গুলোকে। পুনরায় আওড়াল,
–”আমিই তাদের জেলে দিয়েছি।
প্রাণ অবাক হলো। সেই রেশে তড়িৎ জিজ্ঞাসু স্বর ওর,
–”আপনি?
–”হ্যাঁ, আমাকে থাপ্পড় মেরেছে।
কেন জানি প্রাণের রাগ উঠল। রোষপরায়ণ হলো। সে আর যাবে না থানায়। ওর সাথে হওয়া অন্যায়, অত্যাচার সবের ক্ষমা করে তুলে রেখেছে রবের নিকট। কিন্তু অন্যের গায়ে হাত তোলার শাস্তি মওকুফ তার হাতে নেই। প্রণয় চোখ বুজে থেকে বলে উঠল,
–”রব আমাকে দিয়েই তাদের কর্মফল ভোগ করাচ্ছেন।
বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে________________________________________
#_প্রণয়িনী_
#_১৮_তম_পর্বে__
প্রণয় পা ঝাকাচ্ছে। যার তোড়ে সিংগেল বেড’টা ক্যাচ ক্যাচ শব্দ তুলেছে। চরম বিরক্তির কারণ তা। প্রাণ অব্যক্তই রাখল সেটা। সে র্যাক হতে সব কাপড় ওয়্যারড্রবে গুছিয়ে রাখছে। প্রণয় তন্মধ্যে বলে উঠল,
–”প্রাণ, বাড়ি যেদিন ছেড়েছেন সে রাত সরকারি হসপিটালে ছিলেন?
প্রাণ কাপড় ভাজ করা বিরত দিয়ে ভ্রু একত্র করে প্রণয়ের পানে তাকাল। প্রণয় কান খাড়া করে রেখেছে। চোখ বন্ধ। প্রাণ ত্যক্তভূষণে প্রতিত্তোর করল,
–”হঠাৎ পুরনো কাসুন্দি ঘাটার মানে কি?
প্রণয় ঈর্ষান্বিত! যবে থেকে শুনেছে সে ভেতরে ভেতরে তীব্র হিংসাত্মক মনোভাব পুষছে। তার মতো কর্মঠ, পরায়ণ, সক্ষম একজন থাকতে প্রাণ কেন নিজেকে একলা ভাববে! কি জন্য অন্যের দারস্থ হবে? সে এই ব্যাপার মানতে পারছে না। প্রণয় তড়াক করে উঠে বসে চোখ স্থির করল মনরমণির আননে।
প্রাণ ভীত হলো। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। প্রণয়ের চোখের সাদা অংশ রক্তিম হয়েছে। সে মানুষটার অভিব্যপ্তি বুঝতে অক্ষম হলো। উনি কি রেগে আছেন? প্রণয় উঠে এসে ধপ করে হাঁটু ভেঙে বসল প্রাণের সামনে। মাথা নুইয়ে রেখে পরাস্তের ন্যায় নিজেকে সঁপে দিল একেবারে। নিগূঢ় ব্যথিত গলায় বলল,
–”আপনিই বলুন, আমি আর কি কি করলে আপনি আমাকে ভরসা, বিশ্বাস করবেন। এর চেয়ে ভালো হয় আমাকে মেরেই ফেলুন। এমনই আর এই জীবনের ভাড় টানতে পারছি না।
প্রাণ আকুল পাথারে পরল যেন! কিছু ভাবার অবকাশ পেল না তাতেই প্রণয় নত মস্তক তুলল। নয়ন জোড়া ছলছল ওর। আওড়াল বোজা কণ্ঠে,
–”কারো মন ভেঙে কেউ ভালো থাকতে পারে না।
প্রণয় তর্জনি আঙ্গুল দ্বারা চোখের কোণে জমা নোনাপানি মুছে এক মুহূর্ত আর থাকল না এখানে। সে নিজের ভঙ্গুর দশা প্রাণকে দেখতে চায় না। প্রণয় আবেগ ধরে রাখতে পারছে না। দুনিয়া টলে যাচ্ছে তার। একটা মেয়েকে আর কত ভাবে বোঝাবে? এখন শুধু হৃদয় চিড়ে দেখানো বাকি!
প্রাণ টালমাটাল পায়ে দু’কদম এগিয়ে বিছানায় শুয়ে পরল। শরীর নিস্তেজ লাগছে। তার করে আসা কর্ম বিশেষ কাজে দেয়নি। বরঞ্চ নিজের বোকামিকে হয়তো তারা ভালো মানুষি কিংবা নির্লোভী ভেবে নিয়েছে। নাহলে তো ছেলেকে আসতে দিত না। এই যুগেও এমন ভালো মানুষ আদতে পাওয়া যায়?
–”ইয়া আল্লাহ,
প্রাণ উঁচু পেটে হাত বোলাতে বোলাতে হু হু করে কেঁদে উঠল। ওর চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু ভিজিয়ে দিচ্ছে বিছানার চাদর। সে একা হলে কবেই হ্যাঁ বলে দিত। কিন্তু তাকে একটুও বুঝল না। সোজা মুখের উপর বলে দিতে পারল সে কখনোই ভালো থাকবে না। প্রাণ কি বলেছিল তাকে মন দিতে। তাহলে কারোর কষ্টের দায় সে কেন নিবে? তাই যদি হয়, প্রাণ ভালো না থাকলেও তার সন্তানকে সুখে রাখবে। তা একাই নিশ্চিত করবে।
„প্রণয় এক হাতে গাড়ি ড্রাইভ করছে আর অপর হাতে চোখ মুচছে। আজ পুরোপুরি ব্যর্থ সে। আর কোন পথ খোলা নেই। দু’প্রান্তের দুই শালিক স্বয়ী বেদনা ভোগ করছে। যতনা সইছে আপনার। স্ব স্ব হৃদয় নিংড়ানো ব্যর্থতায় তারা নিঃশেষ।
হুট করে প্রণয়ের মাথায় খেলে গেল তখনের প্রাণকে বলা কথা খানি। নিশ্চয় কষ্ট পেয়েছে। খালি মস্তিষ্কে যা নয় তাই বলে দিয়েছে এখন নিজেরই খারাপ লাগছে। প্রণয় ডান হাত দিয়ে স্টেয়ারিং’এ থাবড় মারল। দ্রুতই গাড়ি সাইডে নিয়ে ব্রেক কষলো। ব্যস্ত হস্তে ফোন বের করে কল লাগাল সে।
„বালিশের নিচেই ছিল ফোন। প্রাণের ঝাপসা দৃষ্টি সিলিং’এ বদ্ধ। আপনাই চোখের পানি বইছে। সে তেমনই বাম হাত বালিশের নিচে গলিয়ে দিয়ে ফোন বের করল। দেখলও না কে কল করেছে। রিসিভ করে কানে ধরতেই প্রণয় লজ্জিত কণ্ঠে বলে,
–”প্রাণ, আমি দুঃখিত! আমি,
–”শুনে রাখুন, আমি খুব খুব ভালো থাকব। অনেক সুখে থাকব।
প্রাণ প্রণয়কে শেষ করতে না দিয়েই নিজের অভিমত বলল। ওর কান্নার বেগ বাড়ছে। কল কাটল সে। প্রণয়ের জিভ টেনে ছিড়তে মন চাচ্ছে। রাগে, দুঃখে গাড়ির চাকায় লাথি মারল।
গাড়ি থামল একটা। নেমে এলো পাভেল। ফার্মেসী হয়ে বাসায় ফিরছিল ও। ‘বাবাই, অবাক স্বরে ডেকে প্রণয়ের কাঁধে হাত রাখল। প্রণয় সাহারা পেয়ে ভেঙে গেল পুরোদস্তুর। পাভেল উতলা হলো,
–”আরে, আরে বাবা রিল্যাক্স।
–”চাচা, পানির বোতল নিয়ে আসেন একটা।
পাভেল ড্রাইভারকে তাড়া দিয়ে প্রণয়কে সামলে নিল। বেডা মাইনষে ন্যাকা কান্না জুড়েছে। পাভেল স্বাদে কি গর্দভ বলে মামুকে? কাজই করে তেমন। প্রণয়ের মুখ আর দেখার মতন নেই। ফর্সা বর্ণের আদল ফ্যাকাশে হয়েছে। গালে দাগ পরেছে পানির। মলিনতায় সিক্ত চাহনি। পাভেল মনে মনে হায়, হুতাশ করল। তার এত এত বুদ্ধি খরচের এই মান রাখল?
„সাঁঝের স্নিগ্ধতা আবহে। রাস্তায় বেশি চোখে পড়বে কপোত- কপোতীদের। সন্ধ্যা ক্ষণে ভার্সিটি পড়ুয়া চা আড্ডায় মজেছে। ড্রাইভার পানির বোতল নিয়ে এসে পাভেলকে দিল। পাভেল প্রণয়কে মুখ ধুয়ে নিতে বলল। প্রণয় তাই করল বিনা বাক্যে।
প্রণয় অস্থিরতা সমতে প্রাণকে ফোন করছে। প্রতিবারই ওকে নিরাশ হতে হচ্ছে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেটের শলাকা। এবারও রিসিভ হলো না। প্রণয় সিগারে টান দিয়ে নাম্বার ফের ডায়াল করবে পাভেল বলল,
–”থাক আর ফোন দিয়ে কাজ নেই। কল ধরবে না।
প্রণয় তাকাল ভাগ্নের মুখে। ওর সরু নজর দেখে লজ্জা পেল একটু। পাভেল নিজের পাশে বসতে ইশারা করল। প্রণয় শলাকা পায়ের নিচে পিষে ফেলে বসল বেঞ্চে। চায়ের কাপ হাতে তুলে চুমুক বসাল। নিজের উপর বিদ্রুপ হেসে বলল ক্ষণপলে,
–”আমারও ভালো থাকা উচিত।
পাভেল অতিশয় বিরক্ত। কণ্ঠে ঝাঝ,
–”তোমার বিয়েই করতে হবে না।
–”আব্বু, চটে যাও কেন?
প্রণয় গাল টেনে দিল ভাগ্নের। ছেলেটার উনিশ বছর হলেও বেশ বুদ্ধিমান। পাভেল ফোস করে দম ফেলল। বলল,
–”দু’টো উপায় আছে এখনো।
–”কি?
–”এক– ‘সন্ন্যাস নেওয়া, দুই– ‘প্রাণ সুন্দরীকে তুলে এনে বিয়ে করা।
জঘন্য আইডিয়া! প্রণয় মুখ কুচকে নিল। প্রাণের গলায় দড়ি দেওয়া কেউ আটকাতে পারবে না তাহলে। সন্তানের মুখ চেয়ে প্রাণ নিজেকে মানিয়ে রেখেছিল, মুখ বুজে সহ্য করেছে সব। কিন্তু পায়ের নিচের মাটি শক্ত হওয়ার পরে কাউকেই ছাড় দেয়নি। কুপ্রস্তাবে নিবিড়কে ঠাস-ঠুস বাজিয়ে দিয়েছে। সেও থাপ্পড় খেয়েছে। মোহনকেও ছাড়েনি। মনিরার দুর্দিনে চুপ।
পাভেল মামুকে হ্যাং মেরে যাওয়া দেখে বাহুতে ধাক্কা দিল। প্রণয় ভাবনা ছাড়ল। এখন মাইন্ড ফ্রেশ লাগছে। এসব নিয়ে আর ভাবাভাবি করে লাভ নেই। ভাগ্যে থাকলে আপনাই আসিবে। এতক্ষণে জনাবের হুশ ফিরল। শুধাল,
–”তুমি এসময় কই গিয়েছিলে?
–”বমার ওষুধ নিতে বের হয়েছি। নানুভাই, ছোট মামা বাড়ি নেই। তুমি তো বৈরাগী বোনে ঘুরছো। আমাকেই সব দেখতে হচ্ছে। এক কাজ কর, প্রাণকে আমায় দাও। তুমি তো আবার অকাজের ঢেঁকি!
প্রণয় খুব হাসল। ভাগ্নের গলা জড়িয়ে ধরে গাড়িতে উঠল। বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো তারা৷
.
প্রাণ রাতের রান্না বসাচ্ছে। কেঁদে কুটে চোখ মুখ ফুলে গেছে ওর। তাই বলে কি পেটের অংশকে না খাইয়ে রাখবে! প্রণয়ের চিন্তা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। প্রাণ চাল ধুয়ে কুকারে বসিয়ে দিল। অতঃপর চলল উপর তলায়। সেখানে ফ্রিজে মাছ রেখেছিল তাই আনতে যাচ্ছে।
প্রাণ থানায় যাবে মনিরার সাথে দেখা করতে। যাওয়া উচিত। সে কি সংকীর্ণমনা হয়ে যাচ্ছে? তার তো দুঃখ প্রকাশ করা দরকার। তবে তাদের জন্য সমবেদনা আসছে না ওর। তাহলে যাওয়ার কি প্রয়োজন? প্রাণ জানে না এর উত্তর। মন শুধু চাচ্ছে একবার দেখা করে আসতে। তাই যাবে।
রান্না-বান্না শেষ হলো। প্রাণ টিফিন ক্যারিয়ারে সব বেঁধে নিল। হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পরল গন্তব্যে।
„কয়েদির সাথে সাক্ষাৎ করতে অনুমতি লাগে। প্রাণ বন্দোবস্ত করল সেটার। হাবিলদার নিয়ে গেলেন প্রাণকে। চৌদ্দ শিকের ভেতরে মনিরার জীর্ণ দশা! মুখ শুকিয়ে গেছে। কালি পরেছে চোখের নিচে। চেহারার লাবণ্য ফিকে হয়েছে! হবেই তো। মধ্যবিত্ত হলেও প্রবাসে কামানো টাকায় এসি রুমে থাকতেন। রোজ আমিষ উঠতো পাতে। পড়তেন নামি-দামি পোশাক।
–”মা’রে এসেছিস?
মনিরা প্রাণকে দেখে বেজায় খুশি। উঠে এসে হাত চেপে ধরল ওর। প্রাণের মন ধক করে উঠল। শিউরে উঠল সর্বাঙ্গ। এমন শ্রুতিমধুর ডাক কবেই বা ঝড়েছিল উনার কণ্ঠনালীতে! প্রাণ খাবারের ব্যাগ বাড়িয়ে ধরে বলল,
–”খেয়ে নিয়েন। মাছ ভাত আছে।
মনিরা আগেই লুটে নিয়েছেন পলিব্যাগ। শুকনা রুটি খেয়ে রুচিই নষ্ট হয়েছে। প্রাণ মনে মনে পরিহাসের হাসি দিল। মনিরা অনুনয় করলেন,
–”আমাকে এখান থেকে বের কর, মা। আমি আর থাকতে পারছি না। এই স্যাত-স্যাতে, গন্ধযুক্ত জায়গায় গা ঘিন ঘিন করে আমার। রাতে মশার উৎপাত, ইঁদুর আসে। ঘুম হয় না।
–”আপনার একাউন্ট ফ্রিজ করেছে। উকিল ধরার টাকা নেই আমার কাছে। আব্বুকে জানিয়েছি। কিছু দিন সময় লাগবে।
প্রাণের কথা মিথ্যে নয়। মনিরা মুখ কালো বানালেন। কোন কুক্ষণে যে হাত উঠিয়েছিলেন বদমাশ’টার গালে! এখন হাড়ে হাড়ে মাশুল গুণতে হচ্ছে। ছেলেটাকে রিমান্ডে নিয়েছে। আধ মরা করে ছাড়বে ওকে। ভাবতেই আঁতকে উঠেন তিনি।
প্রাণ হাত ছাড়াতে নিলে মনিরার ধ্যান ফিরল। করুণ নেত্রে তিনি অনুরক্ত কণ্ঠে অনুরোধ করেন,
–”দুই, এক বেলা খাবার দিয়ে যাস, মা।
ইশ! এই দুর্দশা নামলো আপনার। আগের সেই অত্যাচারী মনোভাব, কথার ধার, তেজ, দাপট কই হারিয়ে গেল? প্রাণ এক মুঠো ভাতের জন্য সারাদিন খেটেছে। খিদের যন্ত্রণায় পেটে গামছা বেঁধে রাত পার করতে হয়েছিল। প্রাণের বলতে ইচ্ছে করল, ‘বেশ্যার হাতে ভাত খাবেন? মনেই দমিয়ে রাখল তা। এতটা হীন, পাশবিক নয় সে। প্রাণ প্রস্থান করল জায়গা।
মনিরা সেই গমন পথে চেয়ে রইলেন। এই মেয়েকে দু’চোখে দেখতে পারতেন না উনি। জেলে আসার আগেও তাকে মারতে গিয়েছিলেন। কত গর্হিত কাজ করে মেয়েটাকে যন্ত্রণা দিতেন। সেই মেয়ে তাকে দয়া দেখিয়ে গেল? কই তার ছেলে বউ তো খোঁজ করল না। যে জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর কুমন্ত্রণায় প্রাণের জীবন দুর্বিসহ করেছেন তাদের ইয়াত্তা নেই। পরিতাপের গ্লানি কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল মনিরাকে। ভীষণ অনুতপ্ত বোধ হচ্ছে ভদ্রমহিলার।
.
প্রণয় বিরক্ত। রুমের কিছুই ঠিক নেই। মাহিমা বোধহয় সাফ করেছে কক্ষ। তাই হাতের নাগালে জিনিস খুঁজে পাচ্ছে না। সে হাক-ডাক শুরু করল,
–”মা, ও আম্মু, আম্মু।
প্রণয় ফের লন্ড-ভন্ড করল পরিপাটি কামড়া। সবেই গোসল দিয়েছে। কোমড়ে তোয়ালে জড়ানো। উদোম গা। চুল মুছবে এদিকে অন্য তোয়ালের হদিস নেই। লিপির বদলে মাহিমা এলো। রুমের হাশর দশা দেখে নাক শিকোয় তুলল,
–”তুই কি শুধরাবি না?
–”তোমাকে কতবার বলেছি আমার রুমে হাত দিবে না।
–”পাভেল জোর করল দেখে রুম পরিষ্কার করলাম। প্রাণ এসেছিল, তার নাকি বমি উঠেছে। তুই থাকিস কিভাবে?
প্রণয় আড়ালে মুখ ভেঙাল। তাকে তো ফেলনাই করেছে। ফের বিষাদ নামলো বক্ষে। মাহিমা কার্বাড খুলে তোয়ালে, পোশাক বের করে দিল ভাইকে। সে বেশ বুঝেছে ছেলেটা ভেতরে ভেতরে গুমরে ম’রছে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
–”খেতে আয়।
„প্রণয় সারাদিন না খাওয়া ছিল। এখন খেতে বসল এশার আযান পড়ছে। টেবিলে লিপি, জাহানারা, মাহিমা, পাভেল উপস্থিত। প্রণয় মজার সুরে বলল,
–”বউ, জামাইয়ের সাথে তুমিও খেয়ে নাও।
জাহানারা বিগলিত হাসি উপহার দিলেন নাতিকে। পাভেল ফোরণ কাটল,
–”বাড়িতে বমার সতীন না আনতেই তো তাকে বাকির খাতায় ফেলেছো।
প্রণয়ের মন খারাপের রেশ বাড়ল। সে আজ দায়িত্ব-জ্ঞানহীন কাজ করেছে। জাহানারা’র প্রেশার সর্বোচ্চ বেড়েছিল। লিপি ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মায়ের মন ঢের বুঝেছে ছেলে ভালো থাকার নাটক করছে। ঠিকই ঝড় চলছে মনে।
.
প্রাণ হসপিটালে এলো। এ সপ্তাহে তার কোন চেক আপ ডেট ছিল না। কিন্তু সেবার ডক্টর কিছু নতুন ওষুধ লিখে দিয়েছিল তা খেলে প্রচুর শরীর খারাপ লাগছে, দূর্বলতা অনুভব করে। খাওয়ায় অরুচি দেখা দিয়েছে। তাই ডক্টর দেখিয়ে নিবে সে।
করিডরে পাতা চেয়ারে বসল প্রাণ। প্রচুর রোগীর ভিড়। তার সিরিয়াল দেরিতে। বসার জায়গাটা একটা ছেলে ছেড়ে দিল তাকে। কৃতজ্ঞা জানিয়ে সামনে তাকাতেই ওর চোখে ধরা দিল বাবা-ছেলের মধুর দৃশ্য। জ্বরে কাতর ছোট্ট ছেলে বাবার বুকে লেপ্টে রয়েছে। উদ্বিগ্ন পিতা হাজার বায়না রাখছেন যাতে কিছু খেতে চায় ছেলে।
প্রাণের চোখ ভরে উঠল। সাহসাই হাত চলে গেল উঁচু পেটে। ওর সন্তান তো পিতার স্নেহ, বটবৃক্ষ ছাড়াই বড় হবে। কখনো জানতে চাইলে বাবার ব্যাপারে প্রাণ কি উত্তর দিবে। সত্যি বললে তো ঘৃণা করবে। বাবাকে ঘৃণা করা যায়? কই সে তো পারেনি। বাবা মুখ ফিরিয়ে রাখলে খানিক অভিমান জমেছিল কিন্তু যখন আবার পিতৃস্নেহে বুকে আগলে নিল সেও তো গলে গিয়েছে। লুটে নিচ্ছে বাবার আদর। কিন্তু তার সন্তানের পিতা তো জানেই না এটা উনার অংশ। প্রাণ কখনো জানতেও দিবে না।
শরীর এলিয়ে দিল আসনে। চোখ বুজে নিল প্রাণ। মানস্পটে ভেসে উঠল প্রণয়ের মুখ। সে কি তার সন্তানকে আপন করে নিতে পারবে? প্রাণ নিজ বাবার দ্বারাই প্রমাণ পেয়েছে পুরুষ বাবা রুপেও স্বার্থপর হয়। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় এসব আরও অহরহ ঘটে। এদেশের পুরুষ’রা মেরুদণ্ডহীন। বউ, সন্তান, মায়ের স্থান, মর্যাদা সম্পূরক রাখতে পারে না।
প্রাণের সর্বাঙ্গ বিষিয়ে গেল। কানে কেউ কথা রুপে যেন গরম পেরেক ঠুকে দিয়েছে। রবের নিকট ফরিয়াদ জানাল কেন তাকে এই দিন দেখতে হলো। সে চকিতেই আঁখি দ্বয় খুলে তাকাল যখন শুনল,
–”দেখছি বিয়েও করেছ?
তীব্র ঘৃণায় প্রাণের চিত্তদাহ শুরু হলো। রি রি করে উঠল শরীর। এরা কি দিয়ে তৈরি? কি অবলীলায় কথা বলছে। সে হলে মুখ অবধি দেখতো না। কালক্রমে আজ প্রাণের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাশেদ। প্রাণের থু থু ছুড়তে ইচ্ছে করল। কিন্তু ভরা লোকারণ্যে তামাশা করে লাভ নেই। কাঠিন্য কণ্ঠে চাপা ভঙ্গিতে হিসহিসিয়ে বলল সে,
–”দূর হ আপদ কোথাকার।
রাশেদ মুখ লটকে নিল। যেই হাড়ির হালে ছেড়েছিল তার কিছুই দেখছে না। সাক্ষাৎ হুর দর্শন হলো আজ। ওর চোখ ধাধিয়ে যাচ্ছে। ইশ! কোথাও সূক্ষ্ম ব্যথা হচ্ছে ওর। তার মায়ের জন্য এই নরম, পতি ভক্ত মেয়েটাকে ভোগ্যবস্তুর ন্যায় ছুড়ে ফেলেছিল সে। আফসোস হচ্ছে এখন। অচিরেই কেউ খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল খানিক দূর হতে,
–”তুই আবার মেয়েদের গিলছিস? কুত্তা, তোর স্বভাব ভালো হবে না কোনদিন?
করিডোরে উপস্থিত সবাই অবাক। প্রাণও চমকেছে।রাশেদ পিছু ঘুরে রাগান্বিত মেয়েটার থেকে কাগজের ব্যাগ, থলে নিল। সাফাই গাইছে রাশেদ।
বউ হবে বোধহয়! ভয়ে হাত কাঁপছে পয়জন’টার। প্রাণ চোখ নামিয়ে নিল। স্ত্রীর কাছে হেনস্তা হলেও সৃষ্টিকর্তা কখনো কখনো জানোয়ারদের ছাড় দিয়ে রাখেন। তারা যতই অন্যায়, অপরাধ এমনকি পরকীয়ার মতো জঘন্য ব্যভিচার করলেও তাদের কিছুই হয় না। বরং বহাল তবিয়তে সুখেই থাকে তারা।
সবাই ভালো আছে। তাহলে তার কেন লোভী হতে বাঁধছে? সেও সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিবে নাকি। হ্যাঁ, কিছুই মন্দ নয়। প্রণয়কে একবার পরোখ করেই দেখা যাক। সবাই তাকে নিয়ে খেলল, প্রণয়কে নিরাশ করে কেন? যেদিন প্রণয়ের মন ভরে যাবে, মোহ ফুরিয়ে গেলে সে এক বস্ত্রে তার সন্তানকে নিয়ে নিজ জীবন সংগ্রামে নামবে। তখন কেউ বলার থাকবে না ‘আমার মন ভেঙ্গে সুখী হয়েছেন। প্রাণ ফোন বের করে কল লাগাল।
প্রণয় পরম আবেশে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। লিভিং রুম জমজমাট। তখনই ভাটা পরল আড্ডায়। রিং বাজল তার স্বরে। প্রণয় রইল তেমনই। লিপি ফোন তুলে স্কিনে নাম দেখে বললেন,
–”আব্বা, তোর মরীচিকা ফোন করেছে।
প্রণয় হুড়মুড়িয়ে উঠে বসল। হ্যাবলা হাসল সে। লুকিয়ে নিল নজর। তড়িঘড়ি ফোন নিল মায়ের থেকে। প্রাণের নাম্বার সেভ করা এই নামে। সকলে মুখ টিপে হাসছে। প্রণয় রিসিভ করল কল,
–”শুনতে পাচ্ছেন?
–”জি,
–”বাসায় আসবেন আজ? মাছ রেঁধেছি।
প্রণয় ব্যাক্কল হলো। ফোন কান হতে সরিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল স্কিনে। এই মেয়ের কি মাথা গেছে? উপস্থিত সবাই হা হয়েছে। তারা ভুল শুনল কি? প্রাণ ফের বলল,
–”আমার শরীর খারাপ লাগছে।
ব্যাচ! প্রণয় সব ফেলে ছুট লাগাল। এবার নিজেই বুঝে গেল ইঙ্গিত পূর্ণ কথা। ওর ঠোঁট ফুটল প্রাপ্তির হাসি। ব্যগ্র কদম মাড়িয়ে যেতে যেতে আওড়াল,
–”আম্মু, আকদের ব্যবস্থা করো। আমি বউ আনছি।
বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে_________________________________________
