#_প্রণয়িনী_
#_৭ম_পর্বে__
প্রণয়ের মুখ গম্ভীর! ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ থাকলেও তার মস্তিষ্ক বারবার ডুব দিচ্ছে কিছুক্ষণ আগেকার সেই দৃশ্যে, ‘প্রাণের রক্তাক্ত নিথর শরীর, মোহনের তীব্র চোখ রাঙানি আর সেই হিমশীতল ছোঁয়া। ওরা পশুর চেয়েও কম নয়।
রাস্তা ফুরালো। প্রণয় এলো-মেলো মস্তিষ্কে গাড়ি থেকে নেমে প্রাণকে কোলে তুলল। হসপিটালে প্রবেশ করেই বেশ উঁচু গলায় বলতে লাগল,
–”এমার্জেন্সি গাইনি ডক্টর কই? জলদি পেসেন্টকে দেখুন।
ওয়ার্ড বয় এগিয়ে এলে প্রণয় ওদের দেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–”নার্স ডাকুন।
ভরকে গেল ছেলে দু’জন। নার্স আবার স্ট্রেচার ঠেলবে নাকি? পূর্ণা সামনে এসে আশ্বস্ত করল ওয়ার্ড বয়দের,
–”প্লিজ, কিছু মনে করবেন না! আপনারা আপনাদের কাজ করুন।
–”ভাইয়া, যার যা কাজ তারা তাই করছে। তুমি প্লিজ মাথা ঠান্ডা রাখো। এতে আরও দেরি হচ্ছে।
পূর্ণার কথায় এদফা শমিত হলো প্রণয়। প্রাণকে ওদের দায়িত্বে দিয়ে সে গেল রিসেপশনে সমস্ত ফর্মালিটিস পূরণ করতে।
.
‚প্রাণ অবজারভেশনে রয়েছে। প্রণয় হসপিটালের করিডোরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু। ললাটে গাঢ় চিন্তার রেখা। পূর্ণা চেয়ারে বসে ভাইকে দেখছে। পাভেল পানি আনতে গিয়েছে। কেবিন থেকে ডক্টর বেরিয়ে এলেন। প্রণয় ছুটে গিয়ে অধৈর্য গলায় শুধাল উনাকে,
–”ডক্টর, কেমন আছেন উনি?
–”পেসেন্টের রক্ত শূন্যতা রয়েছে। এখনই জ্ঞান ফেরার আশা নেই, আপনি ব্লাড ব্যাংকে যোগাযোগ করুন। জলদি,
ডক্টরের ব্যস্ত গলা। প্রণয় অনুভূতি শূন্য! নির্জীব বুকে হাহাকার। বোবা কণ্ঠে পুনশ্চ জানতে চাইল,
–”বেবি? বেবি কেমন আছে?
–”বলা যাচ্ছে না।
ডক্টরের আশংকাজনক কথা শেষ হতেই প্রণয়ের মেজাজ চড়াও হলো। খেখিয়ে উঠল সে,
–”বলা যাচ্ছে না মানে কি? বালের ডক্টর আমার,
পূর্ণা এসে তড়িঘড়ি ভাইকে এক হাতে জড়িয়ে নিল। কি বলে সাত্বনা দিবে ভাষা খুঁজে পেল না। প্রণয়ের অস্থিরতা বাড়ল। চিত্ত অচল প্রায়! তাও আঙ্গুল তুলে শাসাতে নিবে ‘ড. ইমন পাল্টা রোষানলে ফেটে পরলেন,
–”বউয়ের খেয়াল রাখতে পারেন না! মারধর করেন আর এখন মামলা খাওয়ার ভয়ে হম্বিতম্বি করছেন। কাপুরুষ কোথাকার! বেশি কথা বললে রোগী সহ বের করে দিব।
পূর্ণা ভাইকে টেনে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসাল। পাভেল মামার ভয়ংকর দশা দেখে আর সাহস পেল না পানির কথা বলার। প্রণয় তাজ্জব বোনে গেছে! বউ? ডাকটা মধুর লাগল কি? তবে তার যে শুনতে হবে বাবুটা ঠিক আছে নাকি? হাসফাস লাগছে বুকের গহীনে। পূর্ণা ভাইয়ের অভিব্যক্তি বুঝে নরম গলায় ইমনকে পিছু ডাকল,
–”ডক্টর, কাইন্ডলি বলুন বাচ্চার ব্যাপারে।
–”আমাদের সময় দিন। টেস্ট করতে হবে। পেসেন্ট কোমড়ের নিম্নাংশে চোট পেয়েছে। তাই আল্ট্রা স্ক্যানের রিপোর্ট আসলে বলতে পারব বেবির কান্ডিশন।
ইমন স্বাভাবিক ভাবেই বললেন। এও বুঝতে পারলেন ছেলে- মেয়ে গুলোর মনের ভিতরের দহন। কি চলছে মনোভাবে। প্রণয়ের দশাসই অবস্থা তীব্রতর হলো। নিচু কণ্ঠে বিরবিবিয়ে বলল,
–”আপনার করুণ পরিণতি আপনি নিজে হাতে ডেকে আনলেন, প্রাণ। খারাপ কিছু হলে এর ভরপাই পুষিয়ে নিবেন কিভাবে?
‚পূর্ণা ভাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। ডাক্তার চলে যেতেই পাভেল এসে মামার পাশে দাঁড়াল। নরম স্বর ওর,
–”বাবাই, বাসা থেকে ফোন দিচ্ছে। রিসিভ করে বলব যে ড্রাইভার পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু তুমি বাসায় ফিরবেনা জানলে তো নানু হাজারো প্রশ্ন করবে।
–”আমি আজই কথা বলল এই বিষয়ে, ভয় নেই। যখন সব জেনেই মনে স্থান দিয়েছি তখন মেয়েটা আমার দায়িত্ব।
প্রণয় ব্যথিত গলায় প্রতিত্তোর করল। পূর্ণা চমকে গেল। ভাইয়ের মুখে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থেকে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। পাভেলের মুখশ্রী একটু হাসি হাসি হলো।
.
প্রাণকে হসপিটালে রেখে প্রণয়’রা বসতে ফিরল। লিভিং রুমের সোফায় বসে অপেক্ষারত মাহিমা তেড়ে গেল ভাইয়ের দিকে। জবান ছোটাল,
–”তোর বোধ, বুদ্ধি কি লোভ পাচ্ছে, ছোট? বের হলি মাগরিব ওয়াক্তে আর ফিরলি এই এগারো পেরিয়ে। তার উপর ফোন গুলোও আনরিচেবল ছিল। চিন্তা হয় না আমাদের?
–”তোমাকেও আর ফোন চালাতে হবে না।
মায়ের নিষেধ সুরে পাভেল মুখ কাচুমাচু বানাল। যেচে মামার উপকার করতে চেয়েছিল কিন্তু তার মামা তো এক কাঠি উপরে! প্রণয় নিশ্চুপ। মহিমার দৃষ্টি সরু হলো। ছেলে, ছোট বোনের দিকে থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ফের দৃষ্টি ফেলল ভাইয়ের উপর। এতক্ষণে ওর খেয়াল হলো প্রণয়ের উদ্ভ্রান্ত অবস্থা। পুরো উসখুস! ভাইয়ের বাহুতে আলতো হাতে চেপে রাগ পড়ে গিয়ে উৎকণ্ঠা ভিড়ল ওর চেতনে। মহিমার কণ্ঠ নিভে এলো,
–”ভাই,
বোনের পরম স্ব-স্নেহের ডাকে প্রণয় নত মস্তক উপরে তুলল।ভেজা নেত্র, বেজায় লাল হওয়া চোখ জোড়া বুকে আঘাত হানল মাহিমার। বিমুঢ় হলো বুক। ভাইয়ের হালচাল এ কেমন বেহাল! প্রণয় নিশ্চল স্বরে জিজ্ঞেস করল,
–”আপু, আম্মু কই?
–”ডাইনিং’এ।
মহিমা তেমনই উত্তর দিল। মুহুর্তেই ওর আদলে ভিড়ল প্রশ্ন সূচক ব্যাপ্তি। তবে ভাইকে কোনরুপ কিছু বলল না। নিশ্চয় বড় কোন অঘটন ঘটেছে, নাহলে প্রণয় এত ভেঙ্গে পরত না।
প্রণয় ছুটল উপরে নিজ কামড়ার পানে। মাহিমা পূর্ণাকে প্রশ্ন করল,
–”কোন সমস্যায় পরেছে নাকি? আম্মুর মুখে শুনলাম মেয়ে ঘটিত ব্যাপারে জড়িয়েছে বাদরটা।
–”একটু পরে মাথায় আকাশ ভেঙে পরবে!
পূর্ণার হেয়ালি কথায় মাহিমা তীর্যক নজরে পিষ্ট করল ওকে। রা করল না। ডাইনিং’এ গেল সবাই। লিপি চৌধুরী ডিনারের আয়োজন করছেন। নিজ চেয়ারে বসে বউয়ের সাথে টুকটাক কথা বলছেন মোস্তফা। আঁচলে হাত মুচতে মুচতে লিপির জিজ্ঞাসু স্বর,
–”প্রণয় এখনও ফেরেনি?
–”ভাই, এসেছে। রুমে গেল। হয়তো ফ্রেশ হবে।
মাহিমা বলল। এই কথার ঠিক পরেই প্রণয় হুটোপুটি করে সেথায় এসে মায়ের হাত আঁকড়ে নিল। নিগূঢ় কণ্ঠে আবদার রাখল,
–”আম্মু, আজ পর্যন্ত যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। জীবনের এই দ্বারে এসে একজনকে ভালো লেগেছে। শুধু ভালো লাগা নয় তাকে আমার জীবনে চাই। দয়া করে সব অহংকার, মেয়েটার সাথে হওয়া অন্যায়কে নজরান্দাজ করে আমার চাওয়াকে সম্মান করবে তুমি। আমি উনাকে বিয়ে করতে চাই, আম্মু।
লিপি হুট করে ছেলের হাত ধরা, বিয়ের কথায় বিহ্বল হলেন। বিভ্রান্ত মস্তিকে ছেলের ক্লান্তির ছাপ পরা মুখে চেয়ে রইলেন শুধু। মোস্তফা উঠে এলেন ছেলের দিকে। ভ্রু গুটিয়ে বললেন,
–”তুমি এত হাইপার হচ্ছো কেন? বিয়ে করবে ভালো কথা। আমরাও সেটা চাই। তবে মেয়ের কি অন্যায় রয়েছে?
–”আব্বু,
প্রণয় বলতে নিবে মাহিমা মাঝপথে শুধাল,
–”কোথায় ছিলে তুমি? পাভেলের শার্টে দেখলাম রক্ত লেগে আছে। খারাপ কিছু হয়নি তো?
প্রণয় নিজের অধীরতা প্রশমন করল। লম্বা দম নিয়ে ধাতস্থ কণ্ঠে জানাল সরাসরি,
–”আমাদের কিছু হয়নি। উনার নাম ‘প্রাণ। উনি বিধবা, আবার প্রেগন্যান্ট। সৎ মায়ের অত্যাচারে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। আমরা হসপিটালেই ছিলাম। আমার মনে জায়গা করে নিয়েছেন উনি।
মোস্তফা চৌধুরীর মুখ গুরু গম্ভীর হলো। সাহসাই নিকষ আঁধার ঘনাল আবরুতে। থমথমে, শক্ত গলা উনার, –”তোমার কি সহানুভূতি হচ্ছে মেয়েটার প্রতি? তাই হবে। না ছাড়া কিভাবে একটা গর্ভবতী মেয়ের উপর মন আসে!
লিপি মেঝেতে পড়ে গেলেন। মধ্য বয়সী ভারি শরীরটা মেঝেতে পরতেই দুম দাম শব্দ হলো। ছেলের অধঃপতনে জ্ঞান খুইয়েছেন তিনি। মাহিমা মুখে হাত চাপা দিয়ে এক প্রকার চিৎকার করে উঠল,
–”মা,
প্রণয় লিপিকে আগলে নিতে ধরলে মোস্তফা হাত উঁচিয়ে ভারিক্কি স্বরে ছেলেকে থামালেন,
–”আপাতত তুমি দূরে থাকো।
শক্তি, সামর্থ্যবান মোস্তফা স্ত্রীকে পাজা কোলে তুলে নিলেন মেঝে থেকে। পূর্ণা কাঁদছে ফ্যাচফ্যাচ করে। সবাই ব্যস্ত হলেন লিপিকে নিয়ে। প্রণয় দাঁড়িয়ে রইল এক দৃষ্টিতে চেয়ে। এটাই হওয়ার ছিল! আত্মঅহমিকা পূর্ণ মানুষ অন্যের অনুভূতির কদর রাখে না।
.
হাসপাতালের করিডোরে পিনপিনে নীরবতা। রাত বারোটা পেরিয়েছে। প্রণয় বাইরে বসে আছে, কপালে ঠেকানো দুই হাত। ওর বুকের ভেতরে বিদ্যমান অনুভূতিগুলো গলা চেপে ধরেছে। মন সায় দিচ্ছে না প্রাণের সামনে যাওয়ার। কেমন একটা লজ্জিত ভাব!
ডিউটি ডাক্তার ধীর পায়ে এসে দাঁড়ালেন প্রণয়ের সামনে। এগিয়ে ধরলেন ফাইল। প্রণয় তা নিয়ে দেখল খুটিয়ে খুটিয়ে। বুঝল না তেমন। ফের চোখ তুলতেই ডক্টর বললেন নিজ হতে,
–“বেবি ঠিক আছে। চিন্তার কারণ নেই। তবে আপনার ওয়াইফের অবস্থা ক্রিটিকাল। এই সময় বাড়তি যত্ন প্রয়োজন অথচ উনার স্বাভাবিক পুষ্টি, রেস্টটুকুও পাচ্ছেন না। এভাবে চললে পেটের বাচ্চা বিকলাঙ্গ বা শারীরিক ভাবে অসুস্থ হবে।
–”আমি উনার দেখাশোনায় সাধ্যমত নিয়োজিত থাকব। শুধু উনার যা যা করণীয় আমাকে বুঝিয়ে দিন।
প্রণয়ের লঘু কণ্ঠ। ওর ধ্যান, দৃষ্টি ফাইলে। সে তো বেবির ছবিতে আঙ্গুল বুলিয়ে দিচ্ছে। একটা অন্যের অংশ! তবুও যেন ওর বুকে প্রশান্তি নামছে। মনে হচ্ছে তারই সত্ত্বা এই মাংসল পিন্ডটা।
প্রণয় একটা রাত ছটফট করে কাটিয়েছে। খুব ভেবেছে। প্রাণের সম্পর্কে সমস্ত তথ্য যোগাড় করেছে। তাদের দেখা হওয়া, তার মনের সুপ্ত বেচাইন ভাব উদয় হওয়া, অস্থির লাগা। প্রাণকে দেখলে ভালো লাগা। সব হিসেব কষে সে স্থির করেছে প্রাণকে তার চাই।
–”এখন দেখা করতে পারেন।
ডক্টর জানালেন। প্রণয় মাথা নাড়ল। সেভাবে থেকেই মৃদু উচ্ছ্বাস গলায় অভিবাদন করল,
–”ধন্যবাদ, ডক্টর।
ডক্টর চলে গেলেন নিজ কর্মে। প্রণয় বিক্ষিপ্ত মনে কেবিনে ঢুকল কিচ্ছুক্ষণ পরে। থমকে গেল যেন! বেসাতি হৃদস্পন্দন বইছে তীব্রতর। প্রাণ ঘুমিয়ে রয়েছে। সেই ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখের দিকে চেয়ে থেকেই এগিয়ে গেল প্রণয়। বেডে বসল প্রাণের পাশে। স্ব-যত্নে আলতো স্পর্শে কপালের বেবি চুলগুলো সরিয়ে দিল। নিজ কনে আঙ্গুল দিলে প্রাণের কনিষ্ঠ আঙ্গুল পেঁচিয়ে নিয়ে চুমু আঁকলো সেথায়। অধিকারহীন সে ছোঁয়া! তাতে নেই কোন কামুকতা, কেবল নিহিত প্রেম পরশ! প্রণয় কণ্ঠনালীতে উগলে দিল মনের যতনা,
–”নিজ ভবিতব্য টলাতে পারে কে? আপনি হলেন আমার সেই ভবিতব্যের প্রিয় অসুখ! সুন্দরীতম ‘প্রণয়িনী।
.
পূর্ব দিগন্তে উন্মোচিত সূর্য ধরায় আগমন ঘটাল নতুন দিনের। প্রাণের টানা ঘুমের সমাপ্তি ঘটল এতক্ষণে। শরীরে বল নেই, ম্যাজ ম্যাজ করছে। লম্বা হাই তুলে হকচকিয়ে উঠল সে। স্মৃতিতে ভিড়তে শুরু করল কালকের ঘটনা। ভীরুকর মস্তিষ্কে চাপ অনুভূত হচ্ছে ওর। অশান্ত লাগছে সব। নার্সও ব্যতিব্যস্ত হয়ে সামলাতে নিল প্রাণকে,
–”ম্যাম, টেক আ ডিপ ব্রেথ. আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছেন। সি, ইউ আর মাচ ফাইন!
প্রাণ ইতি-উতি তাকিয়ে সুস্থির শ্বাস নিল। তেমনই কণ্ঠে বলল,
–”পানি,
নার্স নিজ হাতে পানি পান করিয়ে দিলেন। প্রাণ আপাদমস্তক দেখে নিল নিজেকে। পেটে হাত বুলিয়ে নার্সকে প্রশ্ন করল,
–”আমার সাত রাজার ধন বেঁচে আছে? কিছু হয়নি তো ওর?
–”জি, ম্যাম। একদম ঠিক আছে।
‚অধিক পাথর যেন বুক থেকে নামল প্রাণের। ভিজে উঠেছে চোখ। আননে বিমর্ষ ভাব! বিরবির করে সে কথা বলছে নাড়ীর সাথে। নার্স ওর হাতে মৃদু ধাক্কা দিলেন। প্রাণ তাকাল। পীবর ঠোঁট জোড়া জিভ দ্বারা ভিজিয়ে নিয়ে এক টুকরো হাসি টানতে চাইল সে। বলল নিজ স্বরে,
–”খুব দুষ্টু ও। আমাকে ভেতর থেকে চুষে খাচ্ছে। যা আমার সহ্যতীত!
নার্স ফিরতি হাসলেন শুধু। তাড়া দিলেন,
–”ফ্রেস হবেন চলুন।
প্রাণ অবাক হয়েছে। এত লাক্সারিয়াস কেবিন, পার্সোনাল নার্স, মনে তো হচ্ছে নামি দামি হসপিটাল। তার স্বরে বলল,
–”এটা কোন হসপিটাল? আমাকে এখানে কে এডমিট করিয়েছে?
–”আমি জানি না, ম্যাম। আমার শিফট শুরু হয়েছে সাতটা থেকে। আর এটা অ্যাপেলো হসপিটাল।
নার্সের জবাব। প্রাণের কণ্ঠে ছোট্ট ধ্বনির পাল্টা উত্তর, –”ওহ!
নার্স নিজের কাজে রত। ব্রেকফাস্ট সার্ভ করে দিলেন তিনি। প্রাণ ফ্রেশ হয়ে এসে মন দিল খাওয়ায়। পরে দেখা যাবে কে সেই মহান ব্যক্তি। তবে ওর মনে আসছে একজনের কথা। প্রাণ প্রথম লোকমা মুখে তুলল তখনই করিডোরে সশব্দে বুটের আওয়াজ জোরালো হলো। অনুমতি সাপেক্ষে দুই পুলিশ কেবিনের ভিতরে এলেন। একজন ইনচার্জ, অন্যজন কনস্টেবল। অফিসার গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
–”আপনি মিস. উম্মে প্রাণ?
প্রাণ সাত সকালে পুলিশকে দেখে ভীত হলো। আবার নিজ পরিচয় জানতে চাওয়ায় জড়িয়ে গেল সে। বুকে দুরুদুরু কম্পন উঠেছে। এসি কেবিনেও কপালে ঘামের উপস্থিতি দেখা দিল। নিভন্ত কণ্ঠ ওর,
–”জি, আমি প্রাণ।
–”আপনার বিরুদ্ধে ফাইল চুরির অভিযোগ এসেছে। আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে আপনাকে।
প্রাণ হতবুদ্ধি! নিজের কানকেই সে বিশ্বাস করতে পারছে না।এনারা কি বলছেন? সে কার ফাইল আর কিসের ফাইল চুরি করল? বলল,
–”আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে।
–”আপনার বাসা থেকেই আমরা এই ফাইল উদ্ধার করেছি।
পুলিশ কনস্টেবল প্রাণের সামনে ধরল নীল রঙা ফাইল খানা। প্রাণের জবানে জড়তা,
–”এটা হতে পারে না। আমি চুরি করিনি। আর কার অফিসের ফাইল এটা? কেইবা অভিযোগকারী?
–”আমি, প্রণয় মেহমিদ চৌধুরী।
কণ্ঠে অহং! স্ব-দর্পে কেবিন প্রবেশ করল প্রণয়। সম্পূর্ণ ফর্মাল গেটআপে, আভিজাত্য পূর্ণ চলন। মুখটায় উপচে পড়া আনন্দের ঢেউ। প্রাণ একটুও অবাক হলো না ওকে দেখে বরং নিজের উপর হাসি পেল ওর। বাঁচলো যার ওসিলায় সেই তাকে চোর উপাধি দেয়। অবশ্য এতে কারণ আছে। প্রণয়ের স্বর ভারি,
-“অফিসার, আপনারা একটু বাইরে অপেক্ষা করুন।
‚কেবিনে এখন দু’জন। প্রাণের কথায় উপহাস,
–”এগুলো আপনারই সাজানো নাটক, তাই না?
–”ভালোবাসায় সব জায়েজ।
প্রণয়ের কথায় প্রাণ মুখ ফিরিয়ে নিল। প্রণয় পকেটে হাত গুজে গলা খাখারি দিল। বলল নিজের মতো,
–”এখন আপনার কাছে দু’টো রাস্তা খোলা আছে। এক,জেলে যাওয়া। দুই, ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমার কোম্পানিতে জয়েন করা।
–”আপনার সবই বৃথা যাবে। আমি ভালো থাকলেও আমাকে পাবেন না।
প্রাণের কথায় প্রণয়ের কণ্ঠে কৌতূক,
–”আপনার মত নরম মনের মেয়ের হৃদয় জয় করা খুব কঠিন নয়! আপনাকে আমিই পাবো।
–”পেয়ে কি করবেন? আমার থেকে কা’ম চাহিদা তো মেটাতে পারবেন না!
–”প্রাণ!
প্রণয়ের সুউচ্চ হুংকার কণ্ঠে কাঁপল প্রাণ সহ চার দেয়াল। ওর হাত উঠে গেছে থাপ্পড় মারার বাসনায়। উষ্মায় থরথর চিত্ত! লালিমায় ছেয়ে গেছে মুখশ্রী। নিরেট চোয়ালে দাঁতে দাঁত পিষল প্রণয়। ক্ষুরধার ক্রোধ মিশ্রিত গলায় বলল,
–”আপনার কথা ফিরিয়ে নিন।
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান________________________________________
#_প্রণয়িনী_
#_৮ম_পর্বে__
‚প্রাণ নিরব। ছোট ছোট চোখ দু’টি তাক করা প্রণয়ের রাগান্বিত আননে। তাকে মারার জন্য হাত উঠিয়েছে এই লোক? তবুও সে বড়ই কঠোর! মুখ-মন্ডলে ভয়ের রেশ মাত্র নেই। ক্লান্তি ঝরা বাক্যে প্রশ্ন করল,
–”স্বার্থ ছাড়া কেন শুধু শুধু অন্যের উপকার করছেন? প্রতিদানে এর সিকি ভাগও তো জুটবে না কপালে।
–”জাস্ট শাট আপ, ননসেন্স গার্ল.
চাপা গর্জন প্রণয়ের গলায়। থাপ্পড় তোলা হাত নামিয়ে নিল সে। বড় বড় শ্বাস টেনে ভেতরের রাগ কমাল। কঠিন মুখ হলো শান্ত। প্রণয় ভুল করেছে ওর অভিব্যক্তিতে তার বিন্দুমাত্র প্রলেপ নেই। বরং পকেটে দু’হাত গুজে মাথা নত করল প্রাণের বরাবর। চোখে চোখ রেখে আওড়াল গুটি কতেক শব্দ,
–”অবশ্য, স্বার্থের ব্যাপার আপনার মোটা মাথায় ঢুকবে না।
প্রাণ ত্যক্ত। মুখে বেজায় রুষ্ট ভাব। কিছু কড়া কথা বলতো কিন্তু গিলে নিল। প্রণয় রুম হতে প্রস্থান করল। অপেক্ষারত পুলিশ আফিসারের সামনে এসে হ্যান্ডশেক করে জানাল,
–”সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত, অফিসার। উনার উপর হতে মামলা তুলে নিলাম। এগেইন, থ্যাংকস.
–”ইটস আওয়ার ডিউটি মি. চৌধুরী.
চলে গেলেন তারা। পূর্ণা বেশ ব্যস্ত ভঙ্গিতে এলো সেথায়। স্ববেগে শুধাল,
–”আপু, ঘুম থেকে উঠেছে কি? কত দেরি হয়ে গেল আমার।
পূর্ণা ওড়নার প্রান্ত দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। প্রণয় বোনের হাত থেকে খাবারের প্যাক গুলো নিজ হাতে নিয়ে উত্তর দিল,
–”জি,
–”ওদিকের কি খবর?
ফের জানতে চাইলো প্রণয়। পূর্ণা পায়ে পেয়ে কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে জবাব দিল,
–”আব্বু, বাসায় নেই। আম্মু, এত বেলা অবধি না খেয়ে ঘরে দোর এটে বসে আছে। দিদুনেরো মুখ গোমড়া।
–”সতীনের ঘর কে করতে চায়?
ভাইয়ের রসিক কথায় পূর্ণা আলতো চাপড় বসাল প্রণয়ের বাহুতে। কিঞ্চিৎ হেসে দিল দুই ভাই-বোন। প্রাণ ওদেরই দেখছে। সন্দিহান আনন ওর। সতীন! এই লোকের বউ আছে? উনার পরিবারের দশা ভাবাচ্ছে ওকে। কিছু হয়েছে নাকি?
প্রাণ অজান্তেই চোখে হাসছে। কত অটুট সম্পর্ক ভাই- বোনের। প্রণয় তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিল প্রাণ। সম্পূর্ণ শরীর এলিয়ে দিল বিছানায়। তখনই কানে এলো পূর্ণার কথা। প্রাণ তড়াক করে পুনরায় দৃষ্টি ফেলল ওদের উপর। কান হলো খাড়া।
–”আব্বু এবার তোমার বিয়ে দিয়েই ছাড়বে। কোন বন্ধুর সাথে কথা বলার সময় শুনলাম সেসব। আট ঘাট বেঁধেই নেমেছে।
পূর্ণার কথায় প্রাণের মুখ উজ্জ্বল হলো এবার। প্রশান্ত দম টানল সে। হাজারো বউ থাক, সব চুলোয় যাক, সে এবার ঝামেলা ছাড়া চলতে পারবে। ওর ভাবনা মাঝে বলল প্রণয়,
–”প্রাণের কথা বললাম তারপরও তারা নিজেদের ঔদ্ধ্যর্ত বজায় রাখছে। আমি অবাধ্য হব এতে। সবার আগে আমার সুখের দায়িত্ব তারপর সন্তানের কর্তব্য।
প্রাণ কিংকর্তব্যবিমুঢ়! চমকে গেছে সে। বুঝল, সেই তাহলে পারিবারিক সমস্যার মূল। এই লোক এতটা এগিয়েছে? কই সে তো ঘুণাক্ষরেও কখনো কিছু করেনি যাতে প্রণয় নিজেকে এমন অধঃপতনে নামিয়ে আনে। সর্বাঙ্গে অচল অবস্থা হলো প্রাণের। তেমনই বিহ্বল গলায় জিজ্ঞেস করল,
–”আপনি এমনটা করেছেন? সত্যি আমার সাথে জুড়তে চেয়েছেন?
–”জি, যতটা তাড়াতাড়ি পারি আপনাকে ঘরে তুলতে চাই। নারীর বাস হলো বসতের মূল সৌন্দর্য। আমি সহ আমার সবটা পরিপূর্ণ করতে হবে আপনাকে।
প্রণয়ের সরল জবাব। সে রত খাবার আনপ্যাক করতে। প্রাণ মূক হয়ে গেল। স্তব্ধ হলো ওর কান। হতবাক ঠোঁট দু’টো প্রসারিত হয়েছে দু’দিকে। নেত্র ছাড়িয়েছে প্রকট! পূর্ণা এগিয়ে এসে বসল প্রাণের পাশে। ওর হা হওয়া মুখটা বন্ধ করে প্রফুল্ল স্বরে বলল,
–”আপনাকে ভাবিজান ডাকব নাকি আপু বলে ডাকব?
ঈষৎ নড়ে উঠল প্রাণ। চোখ ছাপিয়ে গড়িয়ে পরল দু’ফোটা অশ্রু কণা। সে একটু মৃদু কাঁপছে। কণ্ঠনালী দিয়ে বের হচ্ছে না শব্দ তরঙ্গ। শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে। পূর্ণা তা আঁচ করতে পেরে উঠে দাঁড়াল। শালিকদের একলা ছেড়ে দেওয়া নিমিত্তে বলল,
–”আমি ভার্সিটি যাচ্ছি। ভাইয়া, তোমার সুখকে সামলে নিও। সি’জ শকট!
প্রণয় চেয়ে রয়েছে নির্নিমেষ প্রাণের নিস্তেজ বদনে। যে বুঝতে অপারগ, একটা মেয়ের এত আত্মসম্মানবোধ কেন থাকে? তার এক ইশারায় মেয়েরা বেড শেয়ার করতে হুমড়ি খেয়ে পরবে, লুটিয়ে দিবে সম্ভ্রম। সেখানে এই মেয়ে তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। নেহাৎ’ই সে সজ্জন, চরিত্রবান ছেলে। মহান রব কি বলেছে যে তুমি নিজেকে আর দ্বিতীয় সুযোগ দিও না।
প্রণয় এসে বসল পূর্ণার ছেড়ে যাওয়া জায়গায়। স্ব যত্নে মুছে দিল নিজ সুখের চোখের পানি। প্রাণ পিছিয়ে গেল একটু। নিজেকে গুটিয়ে নিল। আওড়াল কাটকাট,
–”শুনুন, আমিও চাই কেউ ভালোবাসুক আমাকে। কেউ আমার সর্বস্ব হয়ে উঠুক। কিন্তু তা আপনি নন,
প্রণয় মাঝপথে হেসে ফেলল। থামিয়ে দিল প্রাণের কথা। বলল নিজে,
–”লেইম চিন্তা-ভাবনা আপনার, প্রাণ। অবিবাহিত ছেলে হয়ে বিধবাকে বিয়ে করা যাবে না কোন হাদিসে আছে?
–”আমি বিধবা নই।
প্রাণ মুখে হাত চাপে ধরল। বাকরুদ্ধ সে! রাগের বশে মেজাজের খেই হারিয়ে কি বলে ফেলল এটা। শুকনো ঢোক গিলল প্রাণ। এদিকে বিস্মিত হলো সে। অবিবাহিত হলে সতীন বলে কি বোঝাল? প্রণয়ের হাসি দপ করে নিভে গেল। আবরুতে ঘনাল গুরুগম্ভীর ভাব। বলল তার স্বরে,
–”আমি শুনতে উদগ্রীব। বলুন আপনি। এরপর জানাব আমার করণীয় কি হতে পারে।
–”চলে যান। চলে যান আপনি।
কান্না ভেজা অনুরোধ প্রাণের। সে তার জীবনের জঘন্য কথাগুলো স্মরণ করতে চায় না। প্রণয় নড়ল না একচুল। সিনা টানটান করে একপেশে হাসল। বলে,
–”আমি জানি আপনি কি বলবেন। আপনার অতীত সম্পর্কে অবগত আমি।
প্রাণ চোখ বন্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেই বোকা! এই লোকটা তো তার সবই জানে। আরও একবার স্মৃতির অতলে ডুব দিল সে,
„‘মা মরা মেয়ে বলে প্রাণের বিয়েটাও হয়েছিল অনেকটা তাড়াহুড়ো করে, মাত্র সতেরো বছর বয়সে। পাত্র ছিল রাশেদ নামের এক যুবক। দেখতে সুন্দর, শিক্ষিত। প্রাণের বাবা ভেবেছিলেন মেয়ে উনার নিশ্চয় ভালো থাকবে। কিন্তু সুখের বদলে এক অনন্ত দুর্বিষহ জীবনের শুরু হয়েছিল সেদিন, তা কেউ কল্পনাও করেননি। বিয়ের কিছুদিন না যেতেই শ্বশুর বাড়ির চাপ শুরু হয়। যৌতুকের জন্য নানা ইঙ্গিত, নানান কটাক্ষ। প্রাণের বয়স কম হলেও সে বুঝত কার চোখে লোভ, কার কথায় বিষ। তবু মুখ ফুটে কিছু বলেনি কখনো। সে জানত তার বাবা কিছুতেই পারবেন না অত টাকার ব্যবস্থা করতে।
তবে প্রাণের সব খারাপের মধ্যেও সে ভাবতো রাশেদ তাকে ভালোবাসে। এই বিশ্বাসই ওকে শান্তি দিত। সহ্য করার শক্তি জোগাতো। হঠাৎই প্রাণের দুঃখে ভরা জীবনটাতে একটা সুখের খবর এলো। জানতে পারল সে মা হতে চলেছে। নতুন অতিথির আগমনের খবরে বাড়িতে খুশির ঢেউ বয়ে যায়। প্রাণের মনে আশার আলো জ্বলে ওঠে হয়তো এই শিশুর আগমনে সব কিছু বদলে যাবে। নতুবা শাশুড়ির হৃদয়েও জন্ম নিবে তার প্রতি ভালোবাসা।
প্রথম প্রথম সব কিছু ভালোই চলছিল। সারা দিন বাড়িটা আনন্দে মুখর থাকত। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই প্রাণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। রক্তশূণ্যতা রোগ ছিল ওর। প্রাণ এই অসুখের কারণে যদি সন্তান হারিয়ে ফেলে সেই ভয়ে বহুবার রাশেদকে অনুরোধ করেছে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে কিন্তু রাশেদ ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে বারবার এড়িয়ে গেছে। কারণটা অবশ্য তার মায়ের কুমন্ত্রণা দেওয়া।
প্রাণের আশঙ্কাই সত্যি হলো অবশেষে। রক্তশূন্যতায় নিঃশেষিত মায়ের শরীর আর পারল না ধারণ করতে নতুন অংশ। প্রাণের বুকের গভীরে লুকানো স্বপ্নটা নিঃশব্দেই শেষ হয়ে গেলো। অজস্র ভালোবাসার আগেই ফুরিয়ে গেল অতিথির সময়। প্রাণের ভিতরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট প্রাণটা পৃথিবীর আলো দেখতে পারল না আর।
এরপর থেকে শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও ভয়ানক। প্রাণ শাশুড়ির কটু কথা, নানা রকম অপমান, মানষিক যন্ত্রণা সব কিছু চুপচাপ সহ্য করত। কিন্তু রাশেদের নীরবতা তাকে পোড়াতে শুরু করে। বেশ কিছুদিন গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বদলে আরও যেন বিপর্যয় নেমে আসলো।
রাশেদের সাথে প্রাণের আগে যাই একটু কথা হতো ইদানীং তাও হয়না। সে বাড়ি ফেরে গভীর রাতে আর সকালে উঠে আবার চলে যায় অফিসে। এভাবে চলছিল তন্মধ্যে প্রাণ জানতে পারে তার স্বামীর পরকিয়ার ব্যাপারে। সে বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদ তার উপর চড়াও হয়, মারধর করে। কোনো অপরাধবোধই ছিল না রাশেদের চোখে। ওর ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হয় সে যা করেছে তাতে কোনো ভুল নেই।
অতঃপর, রাশেদ দ্বিতীয় বিয়ে করে নেয়। সেদিন প্রাণ উপলব্ধি করে সে নিছকই ভোগের বস্তু ছিল। ভালোবাসা বলতে কিছু ছিলই না। তাও ওই রাতে সে রাশেদের পা ধরেছিল। তার যে যাওয়ার জায়গা নেই। সৎ মায়ের সংসারে ঠাই নেওয়ার থেকে স্বামীর বাড়ি থাকাকেই সুখকর মনে করেছিল প্রাণ। কেঁদে কুটে মিনতি করেছিল একটু আশ্রয় দেওয়ার জন্য।
রাশেদ রাজি হয়েছিল। কিন্তু শাশুড়ির জ্বালায়, রাশেদের বউ ‘নিভার কান ভাঙ্গানোতে রাশেদ রোজ মারধর করত। সময় পেলেই প্রাণের দেহ ভোগ করত। প্রাণ বাড়ির সমস্ত কাজ করে, অনাহারে দিন কাটিয়েছে। মুখ বুজে পরেছিল স্বামীর বাড়িতে। কয়েক মাস পর প্রাণ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাশেদ সরকারি হসপিটালে ভর্তি করিয়ে সেই যে চলে গেছে তার খবর পেল যখন প্রাণের হাতে ডির্ভোস পেপার আসলো।
প্রাণ সেদিন ভেঙ্গে পরেছিল। সারা হসপিটালে কান্নার রোল পরেছিল ওর। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখেছিল প্রাণের আহাজারি, আর্তনাদ দেখে।
টানা এক মাসে সুস্থ হলো প্রাণ। তার বাবা প্রবাসী তাই তার দেখভাল করেছে প্রাণপ্রিয় বান্ধুবি। অথচ সে জানত না তার ভিতরে বেড়ে উঠছে একটা প্রাণ। শেষে প্রাণের ঠাই হলো বাপের বাড়িতে। জানলো সে আবার মা হবে। এতেই পেটের সন্তান নাম পেল জারজ বাচ্চা। ডির্ভোস এর পর পেটে বাচ্চা এলে তো সমাজ কলঙ্ক দিবেই। তবে প্রাণ নিজের মত বেঁচেছে। স্বপ্ন বুনছে নাড়ি ছেড়া ধনের সাথে জীবন পাড়ি দেওয়ার। এখন প্রাণের প্রেগন্যান্সির সাড়ে ছয় মাস চলে। টানা পোড়েন, কষ্টের সময় গুলো ফেলে আসার দিনও তো বেশি নয়।
.
আলো-আঁধারির খেলা পুরো কেবিন জুড়ে। প্রাণের হাতে স্যালাইন। শেষ হওয়ার পথে সেটা। ওর চোখে ক্লান্তি। নির্জীব হয়ে শুয়ে আছে সে। নার্স এলো তখন। খুলে দিলেন ক্যানুলা। বললেন,
–”উনাকে এখন কিছু খাইয়ে দিন।
প্রণয় দরজায় হেলান দিয়ে রয়েছিল এগিয়ে এসে প্রাণকে আধাশোয়া করে বসিয়ে দিল। বলল নরম স্বরে,
–”ফেলে আসা সময় বদলাবে না, প্রাণ। আপনি সেটা যত আঁকড়ে পড়ে থাকবেন তার যন্ত্রণা ঠিক ততটাই আপনাকে ভাঙ্গবে।
প্রাণ বলল না কিছু। রইল একই। প্রণয় অতি যত্নে খাবারের চামচ তুলে ধরল প্রাণের মুখের সামনে। তাড়া দিল অনুরোধ ভঙ্গিতে,
–”প্লিজ! খেয়ে নিন।
প্রাণের দৃষ্টি ঝাপসা। প্রণয় আশ্বস্ত কণ্ঠে বলে গেল,
–”আমার স্বার্থ কি তাই তো? ভেবে নিন, আস্ত আপনিটাই তো আমার স্বার্থ। তার উপর উপড়ি পাওনা হলো ছোট্ট প্রাণটা।
দম টানল প্রণয়। খাবারের বাটিটা রেখে দিয়ে প্রাণের হাত মুঠোয় ভরল সে। বলল,
–”আপনার মানষিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে, কথা দিচ্ছি আমি- ‘পরিবারকে রাজি করিয়ে আপনার হাত চাইব। আপনি সুখী হবেন মিস. প্রাণ।’ পুরুষ চরিত্রবান না হলে নারী যা কিছু করুক, তাকে বেঁধে রাখার সাধ্য থাকলেও সে ভাগ্যবতী হতে পারবে না।
প্রণয় ইতি টানল কথার। আদলে নামিয়ে নিল রাগের আভাস। মুখ শক্ত করে চোখে শাসাল প্রাণকে। এতেই প্রাণ ভদ্র মেয়ের মত খেতে লাগল প্রিয় অসুখ নামক পুরুষের হাতে।
#লেখনীতে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান________________________________________
