#_প্রণয়িনী_
#_৫ম_পর্বে__
প্রাণ শুষ্ক চোখে তাকিয়ে আছে প্রণয়ের মুখে। প্রণয় স্বাভাবিক। বরঞ্চ প্রাণের গভীর অর্থবহ কথার উত্তর দিল ভারিক্কি স্বরে,
–”সুখী হতে কখনো কাছের মানুষ দ্বারা পুড়তেও হয়।
❝–”ভাগ্যের লিখনকে আপনার ব্যর্থতা ভেবে নিজেকে দোষ দিয়েন না। আমরা যা সয়ে নেই তাই তাকদির!❞
একটু থেমে থেকে ফের বলল প্রণয়। আসলেই তো! ব্যর্থতা নিজের দোষ নয়। বরং তাকে ঢাল করে সামনে আগাতে হয়। তাই বলে অপরকে জীবনে না জড়ানোও বোকামি। হাজার বার খারাপ হলেও কে বলতে পারে শেষ বার ভালো হবে না?
প্রাণ ধপ করে বসে পরল নিজের চেয়ারে। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে ওর। মনে হচ্ছে এই পুরুষ তার আগাগোড়াই সর্বস্ব জানে, তাকে কাছ থেকে চেনে। সে কি দ্বিতীয় বার গোলক ধাঁধায় আটকে যাচ্ছে? না, না। সে তো কলুষিত। নিশ্চয় এই পুরুষ, তার রুপে মোহিত হয়েছে। নাহলে দশ মিনিটের কথায় আর আজ সকাল থেকে এই অবধি সময়ে কে একজনের কাছের মানুষ হয়? কিভাবে এতটা অধিকার খাটাতে চাইবে। আর ভাববে না প্রাণ। বিমূর্ষ, বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
মেঝেতে হেলায় পরে রইল পান্তার ডিব্বাটা, প্রণয়ের আনা খাবার গুলো। প্রাণ নিজের ছোট্ট পার্সটা হাতে তুলে নিল। তার কাজের সময়কাল এই অবধি। প্রণয়ের থমথমে আননে চেয়ে তেমনই কণ্ঠে বলল,
–”কাল সকালে রেজিগনেশন লেটার পেয়ে যাবেন।
প্রণয় হাত মুষ্টি বদ্ধ করে নিল। এই ভয়টাই সে পাচ্ছিল। অথচ সামনের রমণির অভিব্যক্তি কতটা শীতল! নিজের ভেতরে দহন পীড়া বাড়ছে ওর। প্রাণ প্রস্থান নিতে পা বাড়াবে পেছন হতে ওর হাত চেপে ধরল প্রণয়। প্রথম স্পর্শে শিহরিত হলো সে। দ্রুত বইতে লাগল হৃদস্পন্দন।
–”হাত ছাড়ুন।
বরফ ঠান্ডা স্বর প্রাণের। ওর মাঝে কোন তাড়াহুড়ো নেই। আর নাতো পিছু মুড়ে চাইল। প্রণয় কিছুটা বিব্রত হলো। হাত ছেড়ে দিয়ে নিজেই প্রাণের সামনে এলো। সে নিজ কর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে কিছু বলতে নিবে প্রাণের ইচ্ছে হলো না সেসব শোনার। সাফাই গাওয়া ছাড়া আর কি করবে ভেবে নিজের মত বলে গেল,
–”মনে রাখবেন, ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়ে নিতে নেই। তা কেবল উপহাসের পাত্র বানায়!
.
„‘সময় এখন পরন্ত বিকেল। প্রাণ এলো মেলো পায়ে হাঁটছে ফুটপাতের ধার ঘেসে। সে যেন তার হুশে নেই! প্রচন্ড বিধ্বস্ত রুপে ওর শরীর বলহীন তবুও হেঁটে চলেছে। রাস্তা লাগোয়া পার্ক, সেখানের বেঞ্চে বসে পরল প্রাণ এক পর্যায়ে। ভাবনায় বুদ হলো সে, ‚কই ভাবল চাকরি পেল এবার সে কোন সাবলেটে ভাড়ায় উঠবে। তাহলে আর সৎ মায়ের আক্রোশের স্বীকার হতে হবে না। কথায় কথায় গায়ে হাত দেওয়ার মত কেউ রবে না। কিছু টাকা সঞ্চয় করবে। একটু ভালো থাকবে কিন্তু সব স্বপ্নে পানি পরল ওর। চিত্ত বিবসতায় তলিয়ে গেল।
প্রাণের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার সুতো ছিড়ল বাচ্চাদের কলরবে। সেদিকে তাকাল ও। মুগ্ধ আঁখি দিয়ে দেখতে লাগল ছোট, ছোট ছেলে-মেয়েদের দৌঁড় ঝাপ। তাদের পাহারা দিচ্ছে বাবা অথবা মা, নয়তো অন্য কেউ। মনোরম দৃশ্য! অজান্তেই হাসি ফুটল ওর। ওদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের বাড়ন্ত উদরে দিল। দু’হাতে মৃদু ভাবে বুলিয়ে দিতে দিতে মাথায় ঘুরতে থাকল কথাটা, ‘আমরা যা সয়ে নেই তাই তাকদির!’
–”আব্বু নাকি আম্মু যেই হোন, ধরে নিব আপনি আমার দোষ না, সয়ে নেওয়া তাকদির? তাই হবে। ভাগ্যে না থাকলে তো সেদিনই হারিয়ে ফেলতাম আপনাকে। আমায় খুব করে ভালোবাসিয়েন, এই আমিটা যে বড়ই কাঙ্গাল, নিঃস্ব, রিক্ত!
গুমরে গুমরে কান্নায় কপোল ভিজল প্রাণের। চোখের কর্ণিশ বেয়ে নামল হাজারো অশ্রু কণা।
.
–”দাদুবউ, চলো তোমাদের গাড়িতে তুলে দেই। আমার আর্জেন্ট কাজ পড়ে গিয়েছে। যেতে হবে সেখানে।
–”কিছুই তো খেলে না, বাবাই।
পাভেল চোখ ছোট করে মামার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রণয় উত্তর বিনা বেশ তাড়ার সহিত জাহানারা আর পাভেলকে অফিস থেকে বের করে গাড়িতে তুলে দিল। ওদের থেকে বিদেয় নিয়ে নিজে অন্য গাড়িতে চড়ে তৎক্ষণাত পিছু নিল প্রাণের। মেয়েটিকে এই মুমূর্ষু অবস্থায় একা ছাড়তে মন সায় দিল না।
‚বর্তমানে প্রণয় নির্দিষ্ট দুরত্ব হতে দেখছে প্রাণের কার্যকলাপ। মেয়েটি যখন মুখে হাত চেপে কান্না থামানোর বৃথা প্রয়াশ জারি রেখেছে তখন প্রণয়ের আবরুতে আঁধার ঘনাল। বুকে অসহনীয় চাপ অনুভব করছে সে। তার জন্য মেয়েটা কাঁদছে, গাড়ির স্টেয়ারিং’এ সুতীব্র ভাবে হাত দ্বারা আঘাত করল রাগে।
–”আউচ!
ব্যথাযুক্ত হাতে আবার ব্যথা পেয়ে মুখ কুঁচকে নিঃসৃত হলো ধ্বনি। প্রণয় তো ভুলেই বসেছিল নিজের বোকামি! আবার চাইলো প্রাণের দিকে। মুহুর্তেই নীলচে মুখের আদল পাল্টে রাগান্বিত রুপ ধারণ করল। কটমটিয়ে উঠল নিরেট শৈল প্রান্ত। তপ্ত স্বরে আওড়াল,
–”নাও, দুঃখের ষোল কলা পূর্ণ হলো এবার।
‚‘প্রাণের সম্মুখে দাঁড়াল নিবিড়। ওর হঠাৎ আগমনে নত মস্তক উপর করল প্রাণ। চড়াও হলো ক্রোধের পারদ। কান্নার দমকে চোখের সাদা অংশ লাল হয়েছে। নিবিড় অবলীলায় হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিবে তখনই কেউ ওর হাত চেপে ধরল। থামিয়ে দিল তার অভিপ্রায়। হতচকিত নয়নে নিবিড় ঘাড় বাঁকাল। প্রাণও চাইল। তাতে কিঞ্চিৎ ভ্যাবাচেকা খেল সে।
নিবিড়ের দশাও একই। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পরল! প্রণয় দাপুটে চিত্তে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে। চোখের অগ্নি ঝরা চাহনি। সেভাবে প্রাণের দিকে তাকিয়ে ঝাড়ি দিল,
–”বেক্কল, মাইয়া! আমি ধরলে ফোস্কা পড়ে আর বাকিরা ছুঁলে মজা লাগে?
কোথাও একটু শান্তি নেই প্রাণের। অসহ্য বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল ওর মন অলিন্দ। বিষাদময় ঠেকছে চারপাশ। সেই স্বরেই পেশ করল,
–”আপনারা দু’জনেই একই। নারী লিপ্সু!
প্রাণ আজ রিকশা নিল। সেই গমন পথে চেয়ে হতবুদ্ধি প্রণয় হা হয়ে গেল। খুইয়ে ফেলল হয়তো জবান। হুশ ফিরল ওর নিবিড়ের হাত ছাড়িয়ে নিতেই। প্রণয় কি এভাবে সামনে আসতো? দূর হতেই তো খেয়াল রাখতো। এই ব্লাডিটার জন্যই তো সামনে আসলো হুট করে।
নিবিড় হাত ছাড়িয়ে নিলেও বা কি! প্রণয় ওর কলার চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে শাসাল,
–”তোর মত লম্বট, মা’গিবাজকে প্রাণের আশেপাশে যেন না দেখি। নাহলে এমন হাশর করব যে কুত্তাও ঘৃণায় তোর মাংস খেতে চাইবে না।
–”হাসালি আমায়।
নিবিড়ও পাল্টা কলার চেপে ধরল প্রণয়ের। ব্যাচ! প্রকান্ড দর ঘুষি বসাল নিবিড়ের নাক বরাবর। বেচারা ছিটকে পরল পিচঢালা রাস্তায়। প্রণয় পা দিয়ে নিবিড়ের বুকে পারা দিল। ক্ষুব্ধ আওয়াজে পুনশ্চ শাসানি ছুড়ল,
–”দেখলি, তুই চুনোপুঁটি রে। বিলিভ মি, একটা শুটেই তোকে জাহান্নাম ঘুরিয়ে আনব।
.
রয়ে-সয়ে রিকশা হতে নামল প্রাণ। ভাড়া হয়েছে পঁয়ত্রিশ টাকা। ছোট্ট পার্স হাতানোর সময় কানে এলো,
–”খুচরো রেখে দিন।
রিকশা নিজ গন্তব্যে ছুটল। প্রাণ তড়িঘড়ি চাইলো সেথায়। প্রণয় সিনা টানটান করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওর পাশে। সে এতটাই দুশ্চিন্তায় মশগুল ছিল যে পাশে কারোর উপস্থিতি পর্যন্ত টের পায়নি। কয়টা কথা শোনেবে লোকটাকে কিন্তু প্রণয় ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
–”রাস্তা-ঘাটে এত বেখেয়ালি ভাব নিয়ে চললে গাড়ি চাপা পরতে সময় লাগবে না।
–”আপদ বিদায় হবে।
কাটকাট জবাব প্রাণের। এমনই মন-মেজাজের ঠিক নেই। তার উপর আবার এই লোকের সাথে সাক্ষাৎ ভেতরে ভেতরে অসহনীয় করে তুলছে। প্রণয় মাথা ঝুকিয়ে নিল। তেমনই কণ্ঠ ওর,
–”নিজেকে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে রাজি না অথচ ম’রাতে কত আগ্রহ। মহান রব এটাই নিষেধ করেছেন ‘কোন ভাবেই নিজের মৃত্যু কামনা করা যাবে না।’
প্রাণের ভাবাবেগ পরিবর্তন হলো না। নাতো গলার আওয়াজ,
–”আমি আর আপনার কর্মচারী নই, তাই আমাকে নিকৃষ্ট হতে বাধ্য করবেন না। নিজের রাস্তা মাপুন। আপনার আগমন আমার জন্য আরও কষ্টদায়ক হবে। এমনই আমার চরিত্র কলঙ্কিত।
–”বুঝলাম। তবে আমি নিজেকে নিম্ন স্তরে নামাব। কালকের জন্য তৈরি থাকুন। আপনার চোখে এমনই আমি নারীবাজ।
প্রাণের বুক ধক করে উঠল। সাবলীল প্রণয়ের আনন।লোকটার চোখ দু’টো হাসছে। তাড়িয়ে তাড়িয়ে বলছে হয়তো,
–”তোর নিস্তার নেই।
প্রণয় কথা শেষ করে হাতে থাকা খাবারের প্যাকেট প্রাণের হাতে জোর পূর্বক গছিয়ে দিল প্রাণের গরম দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে। হুমকি স্বরুপ বলল,
–”খাবার গুলো নষ্ট হলে আমি নিজেই নষ্টা কাজ করব। সেটা কিন্তু আমার ক্ষুধা মেটাবে।
ত্রস্ত কয়েক পা পিছিয়ে গেল প্রাণ। নিশ্বাসের তোড় জোরালো হয়েছে ওর। থাকলও না আর সেখানে। উদভ্রান্তের মতো ছুটে ঢুকে গেল বাসায়। প্রণয় পকেটে হাত গুজে চেয়ে রইল শুধু।
.
„’প্রাণ চৌকাঠে থেমে গিয়ে দেখল সদর দরজা হাট করে খুলে রাখা। প্রণয়ের কথা মাথা থেকে উধাও হলো এ পর্যায়ে। মনে উদয় হলো শংকা। এমন তো হয় না কখনো। প্রাণ ইতি উতি তাকিয়ে দেখল। না, সবই তো ঠিক ঠাক। কাপা গলায় ডাকল,
–”আম্মা,
না কোন সাড়া নেই কারো। প্রাণ ভীত মন নিয়ে যেই ভেতরে ঢুকল আকস্মিক চড় পরল গজ কাপড়ে বাঁধাই করা ক্ষত গালে। প্রাণ প্রতিক্রিয়া কি দেখাবে থাপ্পড় পরায় মাথার ডান সাইড গিয়ে বারি খেল দরজার কাঠে। মাথা চক্কর কেটে সে লুটিয়ে পরল মেঝেতে পিঠ পাশে।
–”আব্বু!
প্রাণের গগণ বিদারী আর্তচিৎকারে বসতের বাতাস ভারি হলো যেন। হাহাকার ভরা কান্নার ফ্যাচ ফ্যাচে সুর। পিঠের হাড় মনে হয় ভেঙ্গে গেছে। পেটে হাত চেপে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে প্রাণ। কানে আসছে আধো আধো ক্রোধিত মনিরার উচ্চ কণ্ঠের কিছু বুলি,
–”বাপের কাছে নালিশ করেছিস সৎ মায়ের নামে। তাই না? তা কি কি বলেছিস আর? এটা বলিসনি, নাগর জুটিয়েছিস।
–”মা, এরে তো আমি মেরেই ফেলব।
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মোহন লাথি মারতে নিল। প্রাণ নিভু নিভু ঝাপসা চোখে দেখল একটা পা এগিয়ে আসছে ওর পেটের দিকে। অসহায় তার মন, মিনতি করে গেল এক নাগারে। হায়! কণ্ঠনালীতে যে এখন কথা আসছে না। শরীর ভেঙ্গে এসেছে। চোখ উল্টে আসছে। এ নিদারুণ নিষ্ঠুর ব্যথা যে সহ্য করার নয়! হয়তো এক্ষুণি বেহুশ হবে। তা হওয়ার পূর্বে কোন মতে পাশ ফিরল সে। নাড়ি ছেড়া ধনকে বাঁচাতে হয়তো মহান রব শক্তি দিয়েছে ওকে। মুহুর্তেই লাথিটা লাগল প্রাণের কোমড় বরাবর। নাক দিয়ে ফিনকি র’ক্ত ঝড়ে, শেষ গোঙ্গানি ধ্বনি বের করে সে হারাল জ্ঞানহীন নিন্দ্রায়।
#লেখনীতে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান________________________________________
#_প্রণয়িনী_
#_৬ষ্ঠ_পর্বে__
সূর্য তার মুখ লুকিয়েছে পশ্চিম কোণে। মাগরিব ওয়াক্তের আজানের সুমধুর সুর প্রতিধ্বনি হচ্ছে চারিদিকে। বিশাল চৌধুরী ম্যানসন আলোয় আলোকিত। বাড়ির সাদা রঙটা বেশ ফুটে উঠেছে। প্রণয় আজ নিয়ম বহির্ভূত এই ভর সাঁঝ বেলায় বাড়ি ফিরল। হাসি খুশি পুরুষটার মুখ ভার ভার করে রাখা। অবসন্ন ঠেকছে চিত্ত।
ছেলেকে অসময়ে ফিরতে দেখে এগিয়ে এলেন প্রণয়ের মা ‘লিপি চৌধুরী। ছেলের গালে, মাথায় হাত বুলিয়ে উদ্বেগ জনক গলায় শুধালেন,
–”বাবা, মাথা ধরেছে? মুখ-চোখ এমন ফ্যাকাসে পরেছে কেন?
–”ঠিক আছি, মা। একটু ক্লান্ত লাগছে শুধু।
প্রণয় সামান্য হেসে মাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল। উনাকে শান্ত করতে বলল কথাগুলো। ‘মোস্তফা চৌধুরী তখনই সিড়ি ভেঙে নামতে নামতে কথা পারলেন,
–”ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দাও। তাহলে দেখবে ছেলে সব সময় চাঙ্গা থাকবে।
–”যেমন তুমি থাকো। এখন তো দেখি রুম হতেই বের হও না।
প্রণয়ের ঠোঁটকাটা প্রতিত্তোরে খুক খুক করে কেশে ফেললেন মোস্তফা। পর পর নিজেকে সামলে নিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললেন,
–”লিপু, ছেলেকে কফি করে দাও।
লিপি সহ প্রণয় সরু দৃষ্টিতে চাইলো ভদ্রলোকের পানে। মোস্তফা সিনা টানটান করে ফের বললেন,
–”এভাবে দেখে লাভের লাভ কিছুই হবে না। আর প্রণয়, বাবা বেলায় বেলায় বয়স তো আটাশে গিয়ে ঠেকেছে এবার তো বিয়েটা করে নাও।
–”হুম, বিয়ে তো করতেই হবে। তবে আমার পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করব। পটাই আগে উনাকে।
প্রণয়ের কথায় বুড়ো-বুড়ি খানিক টাস্কি খেলেন। তাদের সুপুরুষ গোছের ছেলে যার মুখে হুট-হাট এসব কথা শুনলে তো চমকে যাবেন। এটাই স্বাভাবিক! তবে পরক্ষণে উনাদের মুখ ঈষৎ উজ্জ্বল হলো। মেয়ের ব্যাপার এখনই জানতে আগ্রহী নন তারা। ছেলে আগে সফল হোক। তাদের পুত্র ভাঙ্গা কাঁচে পা মাড়াবে না এতটুকু বিশ্বাস রয়েছে তাদের। মোস্তফা এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন। গদগদ কণ্ঠে বললেন,
–”অবশেষে, ছেলে আমার স্বেচ্ছায় কাল নাগিনী ঘাড়ে চাপাতে চাচ্ছে। শুভকামনা রইল।
–”আম্মু, বাবা তোমাকে সাপ বলল।
কটমট করে উঠলেন লিপি। গাত্রদাহে ঠেস দিয়ে বললেন,
–”আমি সাপ বলেই তোমার মত সাপুড়ের সাথে ঘর করছি!
লিপি আর দাঁড়ালেন না। চললেন কিচেনের দিকে। মোস্তফা প্রণয়ের হাসি হাসি মুখটায় চেয়ে নিজের আনন আঁধার বানালেন। বিরস গলা হলো উনার,
–”তোমার মা হয়তো শেখেনি মুখের উপর সত্য কথা বলতে নেই।
প্রণয়ের হাসি চওড়া হলো এবার। তেমনই কণ্ঠ,
–”সময় নষ্ট না করে তোমার উচিত বউয়ের মান ভাঙ্গানো।
–”তোমার মা বুড়ো বয়সেও শুধরাল না।
মোস্তফা ছুটলেন বউয়ের মন গলাতে। প্রণয় পুরো বাড়ি নিরব দেখে ভ্রু গুটিয়ে একত্রে আনলো। মাকে তো জিজ্ঞেস করাই হলো না, সবাই কোথায়? তবে সে জানে কই আছে তারা।
‚প্রণয়’রা চার ভাই-বোন। বড় বোন ‘মাহিমা, ওর হাসবেন্ড আর্মি অফিসার। তাই মা এবং একমাত্র ছেলে ‘পাভেল সহ এ’বাড়িতেই থাকে। প্রণয়ের ছোট ভাই-বোন টুইনস। সবে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে তারা।
প্রণয় ঘাড়ে ঝোলানো ব্লেজার, গলার টাই খুলে সোফায় ছুড়ে দিল। স্বয়ী জায়গায় পায়ের বুট জুতা খুলে রেখে খালি পায়ে গেল ডান দিকের ঘরে। সে বড়ই অগোছালো ছেলে। লিপি ত্যক্ত হয়ে সপ্তাহে একদিন ছেলের ঘর সাফ-সাফাই করেন।
„জাহানারা বিছানায় আধা শোয়া হয়ে বসে রয়েছেন। প্রণয়ের ছোট বোন ‘পূর্ণা, বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে দাদিকে বই পড়ে শোনাচ্ছে। রুমে কারো আগমনে তারা তাকাল সেথায়। প্রণয়কে দেখে লাফিয়ে উঠল পূর্ণা। জাহানারা হাত বাড়িয়ে ধরলেন। উনার মনঃবাঞ্চা হয়তো নাতিকে জড়িয়ে ধরবেন। তাই হলো। প্রণয় দাদির পাশে যেতেই জাহানারা নাতির কোমড় পেঁচিয়ে নিলেন সে’হাতে। প্রণয় উনার কপালের এক পাশে চুম্বন করল। পূর্ণা আবদার রাখল,
–”জলদি গোসল করে নাও। আমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরতে হবে।
–”ওকে।
প্রণয় প্রশান্ত হেসে সম্মতি জানাল। নিমিষেই ক্লান্তি ভাব উবে গেছে ওর। তখনই দরজা হতে ভেসে এলো এক তরুণের পুরুষালি আওয়াজ,
–”আমাকেও তোমার বাইকের চাবি দিতে হবে তাহলে!
প্রণয় পিছে চেয়ে মাথা ঝাকাল। ‘পরাণ রুমে এসে ভাইকে জুসের গ্লাস দিল। নিচে সে মায়ের কাছে শুনল ভাই এসেছে।
.
–”আব্বা, এটা কি করলে?
মনিরার কাঁপা গলার স্বর। পর পর ত্রস্ত হাটু গেড়ে বসলেন উনি। বুক দুরুদুরু করছে উনার। তিনি কষ্ট দেন, কিন্তু এভাবে মারার কথা ভাবেননি কোনদিন। প্রাণের ঠান্ডা হওয়া গালে চাপড় মারতে লাগলেন। উনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। উদ্বেগ জনক গলায় ছেলেকে শুধালেন,
–”কি করব এখন? গা, হাত-পা তো খুব ঠান্ডা হয়েছে!
–”ওভাবেই ফেলে রাখ। এমনই ঠিক হয়ে যাবে।
মোহন রাগত স্বরে বলল। ওর চোখে-মুখে অপরাধ বোধের লেশ মাত্র নেই। বরং পুনরায় মায়ের আদিক্ষ্যাতা পূর্ণ কথায় ক্ষোভ ঝাড়তে লাথি মারতে উদ্যত হলো। মনিরা উঠে এসে ছেলেকে ঝাপটে ধরলেন। টানতে টানতে সরাতে চাইলেন। মোহন গর্জন করে,
–”ছাড়ো,
–”শান্ত হ, বাপ। ওর কিছু হলে তোর বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিবেন, জেলে যাবি তুই। আমরা সর্ব হারা হবো। একটু বুঝ।
মনিরা বোঝানোর সুরে বলতে থাকলেন। মোহন মায়ের কথা শুনল। হনহনিয়ে রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল। মনিরা প্রাণকে সেভাবে ফেলে রেখে গায়ের শাড়ি ঠিক করে নিলেন। তেমনই চললেন গলির ফার্মেসি হতে ডক্টর নিয়ে আসতে।
.
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। প্রণয় এক মনে ড্রাইভ করছে। বোনের আবদারে সে বের হয়েছে। পূর্ণা ব্যাক সিটে, ফ্রন্ট সিটে পাভেল রয়েছে। দু’টোতে থেমে নেই। বাক যুদ্ধে লিপ্ত! ওদের আজগুবি তর্কে প্রণয় কখনো ঠোঁট টিপে হাসছে। সে অন্য রাস্তা ধরেছে। কারণ অবশ্য প্রাণকে দেখার খোয়াইশ। প্রণয় জানে তা পূরণ হবে না। তাও সে গাড়ি নিল প্রাণের বাড়ির গলিতে।
রব হয়তো সহায়! প্রণয়ের বুক মুষড়ে উঠল। ললাটে ভেসে এলো চিন্তার ছাপ। মনিরা হাতুড়ে ডক্টরকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকছেন। প্রণয় গাড়ি থামাল। আকস্মিক ব্রেক কষায় আঁতকে উঠল পূর্ণা, পাভেল। আঘাত পেতে পেতে বেঁচে গেল তারা। বুকে হাত চেপে প্রলম্বিত শ্বাস নিয়ে চিল্লিয়ে উঠল দু’জনেই,
–”ভাইয়া, ‘বাবাই!
প্রণয় তা শোনার দশায় আছে নাকি? সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দিল গন্তব্য অভিমুখে। পূর্ণা, পাভেল মুখ চাওয়া চাওয়ি করল একে অপরের। হতবিহ্বল হলো ওরা।
„‘চিকিৎসক ‘সাহেব সহ মনিরা যখন প্রাণকে মেঝে থেকে তুলতে নিচ্ছেন দোড় গোড়ায় উপস্থিত হলো প্রণয়। বিমূর্ত হলো সে। মনিরা কপাল কুচকে কণ্ঠ শৃঙ্খে তুললেন অপরিচিতকে দেখে,
–”কি চাই এখানে?
প্রণয় ধপ করে সেখানে বসে প্রাণের মাথা কোলে নিল। ভীত হলো সে হিম ধরা শরীরটার স্পর্শে। মাথা তুলে বোজা গলায় জিজ্ঞেস করল,
–”কি হয়েছে উনার? এত র’ক্ত,
প্রণয় প্রাণের সারা গায়ে চোখ বুলিয়ে নিতে লাগল। মায়ের গলা আর এত কোলাহলে মোহনও বেরিয়ে এলো রুম হতে। মনিরা ফের উচ্চ স্বরে হাকিয়ে উঠলেন,
–”এই ছেলে এই, সরো। ওকে চেক আপ করতে দাও।
প্রণয় কঠোর চাহনি নিক্ষেপ করল। যেন সম্বিৎ ফিরে পেল সে! তড়িঘড়ি প্রাণকে পাজা কোলে তুলে নিল। মোহন রাগে গজগজ করতে করতে পথ রোধ করে ধরল প্রণয়ের। কলার ধরবে প্রণয়ের শীতল গলা,
–”ডোন্ট ডেয়ার টু. সারা জীবন জেলে পঁচিয়ে মা’রব!
মনিরা ছেলের বাহু চেপে ধরলেন। মোহন দমে গেল। সাহেব নিরব দর্শক। প্রণয় যেভাবে এসেছিল তার থেকেও দ্রুত হলো ওর পায়ের চালন।
„পাভেল বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমেছে। ডোর লক, জালানার গ্লাস নামানো। সেথায় হেলান দিয়ে সে পূর্ণার সাথে টুকটাক কথা বলছে প্রণয়ের হঠাৎ এমন কাজ করা নিয়ে। কিন্তু নিজের ভাই, মামাকে দেখে দু’জন নির্বাক বোনে গেল। প্রণয় গাড়ির কাছে এসে তাড়া লাগাল,
–”আব্বু, দরজা খুলে দাও।
পাভেল তাই করল। প্রণয় প্রাণকে পূর্ণার কোলে মাথা রেখে শুইয়ে দিল। ড্রাইভিং সিটে উঠে গাড়ি টান দিল ক্ষিপ্র গতিতে।
‘পূর্ণা প্রাণের মৃতপ্রায় অবস্থা দেখে নিজের আগত কৌতূহল দমিয়ে রাখল। ভাইয়ের দশা দেখে নরম গলায় সাবধান করল,
–”অন্তত গাড়ির স্প্রিড স্বাভাবিক রাখো।
–”উনি আমার অফিসের ওয়ার্কার। ‘উম্মে প্রাণ হাসান।
প্রণয়ের ফ্যাকাসে গলা। পূর্ণা মনে মনে হাসল। এতটাও অবুঝ নয় সে। স্রেফ কর্মী? তাহলে এই টান, না দেখেও এত উতলা ভাব তার মানে কি? অজান্তেই পূর্ণার মুখ দিয়ে লাখ টাকার প্রশ্ন বের হলো,
–”এই ঝড় চৌধুরীদের ভালো থাকতে দিবে কি?
প্রণয়ের উত্তর নেই। সে শুধু চাইছে যেন রাস্তা ফুরিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। পাভেল টি-শার্টের উপর পড়া বোতাম খোলা শার্ট খুলে ওড়না বিহীন প্রাণের গা ঢেকে দিল। স্ব প্রশংসিত স্বর ওর,
–”সি’জ ভেরি বিউটিফুল!
–”রেসপেক্ট হার।
প্রণয় চিবিয়ে উঠল। ভাগ্নের মুখে তুমি ডাকটা কেন যেন সহ্য হলো না। পাভেল বিষাদের মাঝেও ভ্রু নাচিয়ে ভুল ভাঙ্গাল মামার,
–”আমি তুমি ডাকার অনুমতি প্রাপ্ত। কাশ, সে যদি আমার বয়সী হতো। তোমার ভাগ্নে বউ করতাম।
প্রণয়েরই ভুল হয়েছে কথা বলা। পূর্ণাও এবার পূর্ণ চাহনি দিল প্রাণের নির্জীব আদলে। গালে থাপ্পড়ের দাগ বসা। ঠোঁট ফেটেছে, মুখের চারপাশে র’ক্ত শুকিয়ে গেছে। তবুও এক চুল ভাটা পড়েনি রমণির সৌন্দর্যে। ভাগ্নের প্রতিত্তোর করল,
-“ঈর্ষান্বিত রুপ!
প্রণয় লুকিং গ্লাসে দেখল একপল। রাগ নাকি বিষণ্ণতা! ভিন্ন অনুভূতিতে জর্জরিত হয়ে আছে মন অলিন্দ।
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান________________________________________
