#শোধ_প্রতিশোধ
#নুরুন্নাহার_তিথী
সূচনা পর্ব
স্বামীর মুখে দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনে চমকে উঠে রায়ানা। সে বিছানায় বসে কাপড় ভাঁজ করছিল। হাত থেকে ভাঁজ করতে থাকা কাপড়টা মেঝেতে পড়ে যায়। উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠে,
“কী? আপনি আরেকটা বিয়ে করবেন মানে? জামাল, কী বলছেন এসব?”
জামাল ঘামে ভেজা শার্টটা খুলে হ্যাঙ্গারে রাখে। তারপর ফের শান্ত কণ্ঠে বলে,
“সত্যি বলেছি। তোমাকে বলেছিলাম না, প্রমোশন হলে তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দিব। এটাই সারপ্রাইজ।”
রায়ানা হতবাক হয়। এটা সারপ্রাইজ? সে জামালের কাছে এগিয়ে গিয়ে অনুনয়ের স্বরে বলে,
“আপনি মজা করছেন তাই না? আমাদেরই তো বিয়ের মাত্র দুই মাস হলো। আপনি আবার বিয়ে করবেন কেন? গত সপ্তাহেই তো জানতে পারলাম আমাদের সন্তান আসছে।”
জামাল রায়ানার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে খানিক বিরক্তির স্বরে বলল,
“তোমার সাথে মজা করার অতো সময় নেই আমার। সরো তো!”
জামাল একপ্রকার রায়ানাকে ধাক্কা দিয়ে বাথরুমে চলে গেল। সে মেঝেতে বসে কাঁদতে লাগলো।
দরজার আড়াল থেকে একটি নারী ছায়া সরে গেল। আস্তে আস্তে সে ছাদের সিঁড়ির দিকে গেল। সিঁড়ি ডিঙিয়ে ছাদে গেল সে। একতলা বাড়ির এই ছাদটাতে বড়ো বড়ো দুইটা আম গাছের ছায়া এসে পড়েছে। রাস্তার ধারে স্ট্রিট লাইটের আলোয় কিছুটা আলোকিত যা। ঘড়িতে এখন রাত নয়টা। নারীটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। কিছুক্ষণ পর জামাল নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো সেই নারীর পাশে। শুধালো,
“মনি মা, আপনি এখন ছাদে এলেন যে?”
মনি বেগম তাকালো জামালের দিকে। কয়েক সেকেন্ড জামালের মুখমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“জামাল, তোমার মধ্যে আমি রাশেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি।”
মুহূর্তেই জামালের চেহারার রঙ বদলে গেল। চেহারায় ফুটে উঠলো রাগ ও ঘৃণার মেলবন্ধন। সে বলল,
“না, মনি মা। আমি রাশেদ খানের মতো না।”
মনি বেগম মৃদু হাসলেন। বললেন,
“তুমি অস্বীকার করলেও কী হবে? তুমি সেই পথেই তো হাঁটছো।”
“কিন্তু এর পরিণতি আপনার মতো হবে না, মনি মা।”
“পরিণতি প্রতিক্রিয়ারই ফল হয়। তুমি যা করছো, রায়ানার উপর জু-লুম করছো। রায়ানার মধ্যে ২২ বছর আগের আমাকে দেখতে পাচ্ছি আমি। আর তোমার মধ্যে রাশেদ খানকে। করো না এসব। নিজেকে রাশেদ খান বানিও না। মেয়েটা গর্ভবতী।”
জামাল পরোয়া করলো না। নিজের উদ্দেশ্য, মর্জি তার কাছে পরিষ্কার। ছাদ থেকে নেমে গেলো সে। মনি বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আঁধারে নিমজ্জিত আকাশপানে চেয়ে স্বগতোক্তি করলেন,
“এজন্যই আমি চাইনি তুমি রায়ানাকে বিয়ে করো। নিষেধ করেছিলাম বারবার। কিন্তু প্রতিশো-ধের নেশায় মত্ত হয়ে তুমি ও-কে বিয়ে করলেই। ওর তো কোনো দোষ ছিল না।”
মনি বেগম ২২ বছর আগে ডুব দিলেন। মনি বেগম তখন ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বিয়ের মাত্র ৫ মাস। পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয়েছিল তাদের। বিয়ের পর দুই মাস দুজনের মধ্যে ভালোবাসারও কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই তিনি লক্ষ্য করছিলেন, তার স্বামী রাশেদ কেমন যেন তাকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলে। তারপর কিছুদিন যাবত অফিস থেকে ফিরে রাত বারোটা-একটা পর্যন্ত বারান্দায় ফোনে কথা বলে, মেসেজ করে। একদিন মনি বেগম জিজ্ঞাসা করেই বসেন।
“এতো রাত পর্যন্ত বারান্দায় কেন থাকেন?”
রাশেদের জবাব এমন যে,
“অফিসে নতুন টেন্ডার পাশ হয়েছে। অনেক কাজ। ওভারটাইম করেও হচ্ছে না। জানোই তো, এটার পর আমার প্রমোশন হবে।”
“তবে রুমে বসেই তো করতে পারেন।”
রাশেদ সেদিন মনি বেগমকে মানিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু দুই দিন পর শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে যখন রাশেদ গোসলে তখন তার ফোনে পরপর কয়েকটা মেসেজের নোটিফিকেশন আসে। মনি বেগম তখন স্বামীর জন্য পাঞ্জাবি বের করে রাখছিলেন। ফোনের শব্দে ফোনটা হাতে নেয়। এখনকার মতো এন্ড্রয়েড ফোন না। তাই পাসওয়ার্ডও ছিল না। ফোন নিয়ে মেসেজ ওপেন করতেই সে হতবাক। গতকাল রাত থেকে যেসব মেসেজ রাশেদ ডিলেট করেনি, সেসব দেখতে থাকে মনি বেগম। মাত্র এক রাতের মেসেজ পড়েই মনি বেগমের মাথা ঘুরে উঠছে। সে এও বুঝতে পারে, ওই মেয়েটা জানে রাশেদ বিবাহিত।
এদিকে রাশেদ গোসল শেষে বের হয়ে মনি বেগমের হাতে নিজের ফোন দেখে চমকে উঠে। তার মনে পড়ে, সে গতকাল রাতের মেসেজ ডিলেট করেনি। তৎক্ষনাৎ ছোঁ মে-রে মনি বেগমের হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেয়৷ উত্তেজিত জয়ে ধ-মকে উঠেন,
“তোমাকে নিষেধ করেছি না? আমার ফোন ধরবে না। ফোন ধরো কেন আমার?”
মনি বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে রাশেদের দিকে তাকান। রাশেদের চেহারায় লুকানো, চো-রা ভাব। মনি বেগম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেসা করেন,
“কতোদিন ধরে চলছে এসব?”
“কী চলছে? বেশি বুঝো তুমি। যাও তো এখান থেকে!”
রাশেদ খান কথা ঘুরাতে চাইলেন। কিন্তু মনি বেগম আজ জবাব নিয়েই ক্ষান্ত হবেন বলে মনস্থির করেছেন।
“কথা ঘুরাবেন না, রাশেদ। আসমা মেয়েটা কে? কী সম্পর্ক আপনাদের?”
রাশেদ খান তাও ঢাকতে চাইলেন।
“আমার জুনিয়র কলিগ হয়। মেয়েটা খুব রসিকতা পছন্দ করে। মজার ছলে….”
“রসিক? ওই সব কথাবার্তা কেউ কোনো সিনিয়র কলিগকে মজার ছলে বলে?”
“আরে মনি, তুমি এসব বুঝবে না। অফিসে কাজের এতো চাপ! তুমি তো আর চাকরি-বাকরি করো না। কাজের ফাঁকে একটু-আধটু হাসি-তামাশা চলেই।”
রাশেদ এখনও আন্দাজ করার চেষ্টা করছে, মনি কি গতরাতের সব মেসেজ পড়েছে? নাকি শেষের দিকের কিছু? সে ভাবতে ভাবতে পাঞ্জাবি পরছে।
মনি বেগমের সহ্য হলো না এসব মিথ্যাচার। সে রাশেদের পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরে বলল,
“পরনারীর সাথে মেসেজ, কলে কথা বলতেই আপনি বারান্দায় গভীর রাত পর্যন্ত কাটান? আর আমাকে বলেন অফিসের কাজ? কেন? ওই মেয়ের জন্য আপনি আমাকে এড়িয়ে চলেন। তাই না? আপনার লজ্জা করে না? আপনার স্ত্রী গর্ভবতী, আর আপনি পরনারীর সাথে ন-ষ্টামি করেন! আমি আব্বা-আম্মাকে এখনি বলব তাদের পুত্রে কান্ড।”
মনি বেগমের মুখে এসব শুনে রাশেদ খানেরও রাগ উঠে যায়। সে সজোড়ে মনি বেগমকে ধা-ক্কা দেয়। যার দরুণ মনি বেগম মেঝেতে পড়ে যান। এই ধা-ক্কাটা শুধু আজকের রাগে আসেনি। নতুন নারীতে মত্ত হয়ে রাশেদের মনে নিজ স্ত্রীর জন্য বিতৃষ্ণা, বিরক্তি এসেছে। তার ভাষায় রঙিন জীবনের পথে এই মোটামুটি দেখতে মনি বেগমকে আর ভালো লাগছে না। গর্ভবতী হয়ে চেহারায় আরেকটু মুটিয়ে যাওয়া আসাতে আরও ভালো লাগছে না।
মনি বেগমকে ধা-ক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে রাশেদ খান বলেন,
“বেশি কথা বলবি না। তোর কোনো অভাব কি রাখছি? এই কথা যেন এই চার দেওয়ালের বাইরে না যায়। গেলেই তোকে তালাক দিব আমি। কথাটা মাথায় রাখিস।”
এভাবে শা-সিয়ে রাশেদ খান চলে যায়। এদিকে মনি বেগম মেঝেতে পড়ে কাঁদতে থাকে সে। তলপেটে চিনচিন ব্যাথা করছে তার। শরীরও দুর্বল লাগছে। ধীরে ধীরে উঠে সে বিছানায় বসে। নিজের দুর্ভাগ্য ও স্বামীর ব্যা-ভিচারের কথা ভেবে সেখানেই ফের কান্নায় ভেঙে পড়লো।
নামাজ শেষে রাশেদ রুমে আসে না। সরাসরি খাবার টেবিলে বসে। রাশেদ ও তার বাবা খেতে বসলে রাশেদের মা ছেলের বউকে না দেখে নিজের মেয়েকে ডেকে বলেন,
“দেখতো, তোর ভাবি কই? দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেল, কিন্তু তার কোনো খবর নাই।”
রাশেদের বোন রাফা যায় রাশেদের ঘরে। সেখানে গিয়ে সে যা দেখে, চিৎকার করে সবাইকে ডাকে সে।
চলবে,
