#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১৬
#জান্নাত_সুলতানা
আভিরাজ যখন নিজের আলমারির একদম নিচে থেকে একটি লাগেজ বের করে আনলো দিয়া তখন ভ্রু কুঁচকে নিলো। এই রাতবিরেত আবার এ-সব কেনো বের করছে তিনি? তার তো ঘুম পাচ্ছে। দিয়া এক পাশে কচ্ছপের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তার অস্বস্তি আর কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। আভিরাজ ভাই তার স্বামী। এই সত্যি টা তাকে মানতে হবে। দিয়ার ফ্রেন্ডই দিয়া কে সেদিন গ্রামে যখন ওর সূর্যোদয় উপভোগ করতে গিয়েছিল সেদিন আভিরাজ ভাইয়ের উপস্থিতি দিয়ার ফ্রেন্ডরা সন্দেহ করেছে। দিয়ার কাছে যদিও এখনো এগুলো মজা আর শুধুই সন্দেহ এর বেশি কিছু না। আভিরাজ ভাই কিছুতেই কোনো পাগলাটে প্রেমিক পুরুষ হতে পারে দিয়ার বিশ্বাস হয় না।
দিয়ার ভাবনার মাঝেই আভিরাজ বিছানায় রাখলো লাগেজ টা। দিয়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
-“এতো রাতে এটা কী?”
-“দেখ।”
আভিরাজ শান্ত স্বরে আদেশ দিলো। দিয়া ধীরে ধীরে লাগেজের জিপার খুলে। সাথে সাথে তার মুখ হা হয়ে যায়, বিস্ময় নিয়ে বলে উঠলো,
-“এত্তো কিছু?”
আভিরাজ কোনো জবাব দেয় না। দিয়া এক এক করে সব নামাতে লাগলো। গহনার বাক্স, ল্যাপটপ, একটা দামী ফোন , চারটা শাড়ী। যেগুলো হাতে নিয়ে দিয়ার মুখ অটোমেটিক হা হয়ে গেলো। শাড়ী গুলো যেমন সুন্দর আর খুব দামী সেটাও বলার অপেক্ষা রাখে না। কসমেটিকস, জুয়েলারি। দিয়া সবকিছু লাগেজ থেকে বের করতে করতে ক্লান্ত হলো। আভিরাজ গালে হাত দিয়ে পাশে বসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দিয়া সব শেষ একটা দোপাট্টা হাতে নিয়ে চমকালো। এটার এক কোণে “আভিরাজের মাহদি” আর্টটা দেখে দিয়া যেমন আশ্চর্য হয়েছে তেমন অবাক। কাপড় টা কোনো সাধারণ কাপড় নয়। কেমন সুন্দর মসৃণ। সে জিজ্ঞেস করলো,
-“এটা?”
-“লন্ডন যাওয়ার পর এটা শিখেছিলাম কোরিয়ান একটা ছেলের থেকে। তখন থেকে এটা বানানো শুরু করি। দুই বছর লেগেছে বানাতে।”
আভিরাজ আস্তে আস্তে বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে৷ কোনো তাড়াহুড়ো নেই পুরুষ টার মধ্যে। যেনো সে অনেকটা কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে। আর সে নিশ্চিত এখান থেকে সে ফিরে যাবে না। দিয়া এরমধ্যে আবারও আচমকাই জিজ্ঞেস করলো,
-“আপনি আমায় আগে থেকে ভালোবাসতেন?”
-“যখন তুই এসবের কিছু বুঝতিই না। ঠিক তখন থেকে। আমি কিশোরী মেয়েটির প্রেমে পড়েছিলাম একটু একটু করে। যেদিন তুই আমায় বিয়ের জন্য প্রপোজাল দিলি ঠিক সেদিন থেকেই আমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দেই তোকে আমার অর্ধাঙ্গিনী করার, যেটা আমি রক্ষা করেছি।”
আভিরাজের প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথে দিয়ার বুকের ভেতর তোলপাড় সৃষ্টি করছিলো। দিয়া অনুভব করলো আভিরাজ ভাইয়ের চোখে-মুখে একরকম মুগ্ধতা। পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি। যেনো সে কোনো কিছু জয় করেছে যুদ্ধ করে। দিয়া হকচকিয়ে গেলো। কিছু টা কৌতূহল কিন্তু ভ্রু জোড়া কুঁচকে সন্দিহান কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“এতোটা ভালোবাসেন? কই কখন তো বোঝাই যায়নি।”
-“তো তোর কী ধারণা আমি তোকে ভালোবাসি এটা জনে-জনে বলে বেড়ানো উচিৎ?”
আভিরাজ ওঠে দাঁড়াল ওর থেকে দোপাট্টা নিয়ে ওর মাথায় পড়িয়ে দিলো। দিয়া হতভম্ব হয়ে গেলো। অপ্রস্তুত হয়ে সে জবাব দিলো,
-“সেটা বলতে চাইনি।”
-“এখন বল, সেদিন কী বলছিলি? কী বলছিলি, আমি কিপটে? এখনো তাই মনে হচ্ছে?”
দিয়া আশ্চর্য যেমন হয়েছে তেমন চমকেছে। কিভাবে জানলো এটা আভিরাজ ভাই? এই কথা তো সে আভিরাজ ভাই যেদিন দেশে এসছিলো সেদিন রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বলেছিলো সম্ভবত। তাহলে এটা কিভাবে জানতে পারলো আভিরাজ ভাই?
আভিরাজ এবার ওকে নিয়ে নিজের আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। এরপর সেটা খুলে দিতেই দিয়া বিস্ময় মুখে হাত চেপে ধরলো। চোখ বড়ো বড়ো করে সে অস্ফুটে বলে উঠলো,
-“এতো শাড়ী?”
আভিরাজ উত্তর দেয় না। দিয়ার হাত ধরে এগিয়ে যায়। দিয়া শাড়ী গুলো ছুঁয়ে দেখে। সবগুলো শাড়ী খুব বেশি দামী না হলে-ও অনেক শাড়ী ব্র্যান্ডের ও আছে। আর কিছু পুরনো কালেকশন তো আছেই। দিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“এগুলো অনেক আগের।”
-“হুঁ। সাত বছর আগের কালেকশন ও আছে।”
আভিরাজের কথা শুনে দিয়া হতভম্ব হয়ে গেলো। মানে আভিরাজ ভাই তার জন্য এই শাড়ী কিনে রেখেছে।
-“যখন যেটা পছন্দ হতো নিয়ে নিতাম তোর জন্য। আর এগুলো কখন যে এতোগুলা হয়ে গেলে টেরই পেলাম না।”
আভিরাজ ভাইয়ের কথা শুনে দিয়া অবাক হয়ে তাকায় পুরুষ টার পানে। সে একদম শান্ত। আজ যেনো দিয়ার অবাক হওয়ার দিন। সে মনে মনে ভেবেই নিলো আজকের দিন টা সে অবাক ডে পালন করলে খুব বেশি আশ্চর্যের ব্যাপার হবে না। প্রথমে আচমকাই বিয়ে, এরপর যা সে কোনো দিন ও কল্পনা করেনি সেই মানুষ টাই তাকে ভালোবাসে। একটার পর একটা সারপ্রাইজ তাকে হতভম্ব করে দিচ্ছে। সে অস্থির হয়ে দ্রুত বিছানায় এসে বসলো। আভিরাজ পানি ভরতি গ্লাস ওর সামনে দিয়ে বলে উঠলো,
-“রিলাক্স লিটল ওমেন।”
দিয়া কিছু বলতে পারলো না। রাত অনেক। আভিরাজ ওর গায়ে কম্ফর্টার টেনে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। দিয়া সবকিছু ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো। তবে আজকের ঘুমটাও একটু নিশ্চিতের যেনো। কেনো জানি তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি লাগছিলো। হয়তো তাকে কেউ এতোটা যত্ন করে নিজের আত্মার আত্মীয়া বানিয়ে রেখেছে বলেই।
আভিরাজ যখন ফিরে এলো। তখন পুরুষ টার হাতে প্লেট ভরতি খাবার। মূলত সে গিয়েছিল খাবার আনতে। কেননা দিয়া তো আজ রাতে তার সাথে রাগ করেই খাবার খায় নি। তবে সে দিয়া কে ডাকলো না। খাবার প্লেট রেখে ফ্লোরে কার্পেটের ওপর বসলো। বিছানায় থুঁতনি ঠেকিয়ে বসে দিয়া কে দেখতে লাগলো। টানটান সরু ভ্রু। মায়াবী চোখ জোড়া আপাতত বন্ধ আছে। আর হালকা গোলাপি রঙের ঠোঁট। যেগুলো প্রায় ফেটে আগাম শীতের বার্তা দিচ্ছে যেনো।
লম্বা চুলের বিনুনি টা বালিশের ওপর বিছিয়ে আছে। কপালে এলোমেলো কিছু চুল। আভিরাজ আনমনে সেগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে, “মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরীর বউ।”
—–
আভিরাজ কে ফ্লোরে বসে থাকতে দেখে দিয়া অবাক হলো। সে দ্রুত শোয়া থেকে উঠতে গিয়ে আভিরাজ ভাই কেও তুলে ফেললো। আভিরাজের লাল লাল চোখ মেলে তাকাল ওর দিকে। দিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“আপনি ঘুমাননি সারারাত?”
-“সকাল হয়ে গিয়েছে! যা ফ্রেশ হয়ে নে জান।”
আভিরাজ দিয়ার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ওকে তাগাদা দেয়। আর নিজেও ফ্লোর থেকে ওঠে পড়ে। আভিরাজ জানালার পর্দা টেনে দিতে উদ্যত হলো। দিয়া পেছন থেকে আচমকাই ডেকে উঠলো,
-“আভিরাজ ভাই!”
-“আমি তোর ভাই না।”
আভিরাজ নিজের কাজে মনোযোগী। তবে গম্ভীর ভারিক্কী স্বরে দিয়ে কেঁপে ওঠে। আভিরাজ ফিরে এসে ওর হাতে একটা টাওয়াল তুলে দিলো। দিয়া সেটা হাতে নিয়ে ইতস্তত করে বললো,
-“এসব নামে ডাকিয়েন না। আমার কেমন লাগে।”
-“কেমন লাগে?”
আভিরাজ ভ্রু একটা কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো। দিয়া ছোট করে দুই শব্দে জানায়,
-“অস্থির লাগে।”
আভিরাজ শুনলেও তেমন পাত্তা দেয় না৷ দিয়ার একবার মনে হলো শুধু শুধু সে এটা জানাল। আভিরাজ ভাই শুনবে না তার বারণ। দিয়া তপ্ত শ্বাস ফেললো আর ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। আভিরাজ ততক্ষণে নিজের ব্যালকনিতে নিজের ট্রেডমিলে দৌড়ানো শুরু করেছে। গায়ে জিমের পোষাক।
দিয়া ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে আভিরাজ ভাইয়ের দেখা পায়না। সে জানে আভিরাজ ভাই ওয়াকআউট করতে বেরিয়ে গিয়েছে। আটটার মধ্যে ফিরে আসবে এবং অফিসের জন্য রেডি সেডি হয়ে এই পুরুষ পাক্কা বিজনেসম্যান রুপে ফিরে যাবে।
দিয়া যখন আভিরাজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে তখন তার বারবার মনে পড়েছিলো আভিরাজ ভাই তার চাচাতো ভাই। আর সে রাতে ওই মানুষ টার সাথে একঘরে ছিলো। কেমন লজ্জার বিষয়। বাড়িতে বড়োরা কিভাবে দেখবে এটা? দিয়া প্রতিদিনের মতো আজ স্বাভাবিক ভাবে নিচে গিয়ে সবার সাথে হেঁসে হেঁসে মন খুলে কথা বলতে পারলো না। তার কেমন লজ্জা লাগছে। আশ্চর্যের কথা তাদের মধ্যে তেমন লজ্জার কিছু রাতে হয়নি। দিয়ার বাবা প্রতিদিনের মতোই মেয়ে কে নিজের পাশের চেয়ারে বসালেন। এবং খাবার মুখে তুলে খাওয়ালেন।
কিন্তু দিয়া অস্বস্তিতে ঠিকঠাক খাওয়া তো দূর বসতে ও কেমন একটা ফিল করছিলো। এটা খুব হাস্যকর না-কি দুঃখের! দিয়া উত্তর খুঁজে পেলো না। সে কী খুশি হবে চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে বলে নিজের বাবা বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে না এটা ভেবে, না-কি দুঃখ পাবে এটা ভেবে যে তার এখন থেকে সামনের প্রতিটা দিনই এমন অস্বস্তিকর হবে বলে!
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
