#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১৪
#জান্নাত_সুলতানা
-“একা কোথাও যাবি না। যদি দেখেছি।”
ঘরের বাইরে আভিরাজ আর ভেতরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দিয়া। আভিরাজের কথায় দিয়ে আহত হলো। তাকে এভাবে কেনো চোখে চোখে রাখছে? বিয়ে বাড়িতে এসে কী সে পালিয়ে যাবে? কোথাও একটু গেলেই একজন না একজন এসে তাকে শাসিয়ে যাচ্ছে। দিয়া এবার প্রতিবাদ করলো,
-“আপনি আমার স্বাধীনতায় এভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না, আভিরাজ ভাই।”
আভিরাজ ওর দিকে না তাকিয়ে ভারিক্কি আওয়াজে জবাব দিলো,
-“আমি চাইলে সব করতে পারি। হয়তো তুই জানিস না সেটা।”
কথা টা বলে আভিরাজ ওকে রেখে বাইরে চলে গেলো। বিয়ে বাড়ির গিজগিজ দিয়া আর কী করবে সে মায়ের কাছে চলে গেলো আবারও।
—–
-“সবাই এক গাড়িতে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। দুটো গাড়িতে বাইকে। প্রয়োজনে ছেলেরা বাসে করে এসো।”
রাশেদুজ্জামান চৌধুরী বলেন। আভিরাজ ওনার কথায় বলে উঠলো,
-“বড়ো আব্বু তোমরা গাড়িতে যাও। আমরা বাসে করে ফিরছি৷ ছোট আব্বু তুমি বাইক নিয়ে যেতে পারো।”
সবাই আভিরাজের কথায় সহমত পোষণ করলো। একই গাড়িতে পরিবারের সবার ওঠা সঠিক নয়। যদিও দুটো গাড়িতে মহিলা আর বাচ্চাদের দিয়ে রিজার্ভ হয়ে যাবে।
-“আমি এতোকিছু জানি না আলভির বাচ্চা। বাসে যাচ্ছি আমি। আর ওকে আমার স্মুথ জার্নির জন্য হলে-ও সাথে চাই।”
আভিরাজ নিজের বাইকের চাবি টা আলভির হাতে গুঁজে দিয়ে বলে উঠলো। আলভি অসহায় চোখে তাকিয়ে বললো,
-“কিন্তু ম্যানেজ করবো কিভাবে?”
-“তুই বাইকে যাবি। গাড়িতে অলরেডি যায়গা নেই।”
দিয়া এসে তখন ওদের পাশে দাঁড়াল। সে ভাইয়ের সাথে যেতে চাচ্ছে। ছোট আব্বু উপস্থিত তখন। তিনি গাড়িতে ম্যানেজ করে নিয়েছে। তিনি বলেন,
-“আভি তুই বাইকে যা। বাস দিয়ে অনেক পথ ঘুরতে হবে। আমরা শর্টকাট রাস্তা ধরবো।”
-“ওকে।”
আভিরাজ ইসমাইল চৌধুরীর বাইকে বসে। সে নিজের বাইক তো আনেনি। এরমধ্যে দিয়া এসে আলভির পেছনে দাঁড়াল। ইসমাইল চৌধুরী এটা দেখে অবাক হয়ে বলে উঠলো,
-“কি রে? দাঁড়িয়ে আছে যে? যা গাড়িতে বোস।”
-“গাড়িতে যায়গা নেই। সামনের সিটে ড্রাইভার আঙ্কেল।”
দিয়া গাড়িতে সামনে অপরিচিত কারোর পাশে বসতে চায় না। এটা আজ নতুন নয়। ইসমাইল চৌধুরী জানে সেই কথা। তিনি বললেন,
-“তাহলে তুই আলভির সাথে যা। আমি আভিরাজের পেছনে বসে যাচ্ছি।”
-“না ছোট আব্বু। তুমি বরং গাড়িতে চলে যাও। বোনু কে আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
-“ওকে। বি কেয়ার ফুল।”
ছোটখাটো একটা তর্কের মতো শোনা গেলো। আভিরাজের বাবা তখন গলা উঁচিয়ে ইসমাইল চৌধুরী কে ডাকলেন। তিনি তাই ওদের বিদায় দিয়ে চলে গেলো।
-“কাম মাহদি।”
-“কিন্তু আমি ভাইয়ার সাথে যাবো। আপনি চলে যান।”
আভিরাজের আদেশ উপেক্ষা করে দিয়া বললো। আলভি এতো সময় যে ঝামেলা করছিলো তা আভিরাজের ভয়ে। এখন সে বোনের মতামত পেয়ে শয়তানি হাসলো। আভিরাজ রাগে ওদের দিকে তাকিয়ে বাইক স্টার্ট করলো আর দিয়ার হাত ধরে হেঁচকা টানলো। দিয়া কিছু বলার আগেই আভিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
-“চুপচাপ ওঠে বোস।”
দিয়া আলভির দিকে তাকালো। আলভি ইশারা করলো। দিয়া তাই বসলো আভিরাজ ভাইয়ের পেছনে। আভিরাজ আলভির দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো। আলভি মুখে জোর করে হাসি টানলো। তবে ভয়ে শুঁকনো ঢোক ও গিলে নিলো একবার।
—–
আভিরাজ ভাইয়ের সাথে রাতে দিয়া সেদিন যে ঘুরতে গেলো। এরপর এসে ব্যালকনিতে বসে গান শুনলো। কিন্তু এতোকিছুর মধ্যে সে তার ওড়না টা খুঁজে পাচ্ছে না। সকালে ঘুম ভেঙে নিজে কে তো কম্ফর্টার জড়ানো অবস্থায় পেয়েছে। আর আজ কতদিন হয়ে গেলো সে নিজের পুরো রুম তন্নতন্ন করে খুঁজে যাচ্ছে ওড়না টার হদিস নেই। এখন যেহেতু এটা তার রুমে নেই কোথাও। নিশ্চয়ই সেদিন ঘুমের ঘোরে হয়তো কোথাও পরে গিয়েছে ওড়না। হতে পারে আভিরাজ ভাইয়ের রুমে? ব্যালকনিতে!
দিয়া গুটিগুটি পায়ে আভিরাজ ভাইয়ের রুমের সামনে এলো। দরজা খোলাই ছিলো। ওকে দেখেই আভিরাজ ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি তুলে ভ্রু কুঁচকে নিলো। এবং পরপরই দৃষ্টি আগের অবস্থানে রেখে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-“কী চাই?”
-“আমার একটা ওড়না হয়তো সেদিন ভুল করে আপনার রুমে ফেলে গিয়েছি, আভিরাজ ভাই।”
দিয়া মন খারাপ করে বললো। থ্রি-পিস টা তার ভীষণ পছন্দের। ওড়না টাও খুব সুন্দর। আর তার থ্রি-পিস টাকে এতিম করতে না চাইলে ওড়না টাও খুব প্রয়োজন। আর এটার জন্য যদি তাকে আভিরাজ ভাইয়ের থেকে দুই একটা ধমক খেতে হয় সে খাবে। আভিরাজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে উঠলো,
-“কোনো ওড়না নেই আমার রুমে।”
বলতে বলতে আভিরাজ দরজার কাছে চলে এলো। ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়াল। এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যেনো দিয়াকে সে না বলে নীরবে বাঁধা দিচ্ছে।
-“একবার দেখি। দেখলে তো আর আপনার কিছু চুরি করে নিয়ে যাবো না আমি।”
দিয়া কণ্ঠস্বর নরম করে আবদার করলো। আভিরাজ কী ভেবে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। দিয়ে পাশ দিয়ে সুড়সুড় করে রুমে প্রবেশ করলো। প্রথমেই গেলো ব্যালকনিতে। যদিও এটা আশা করা বোকামি এতোদিন একটা ওড়না ওখানে পড়ে আছে। আর যেখানে প্রতি সপ্তাহে একবার করে বুয়া এসে পুরো বাড়ি ক্লিন করে। আর রোজ আভিরাজ ভাই ও তো ব্যালকনিতে রাতে সকালে প্রায় অনেকটা সময় কাটায়। দিয়া ব্যালকনি, রুমের এদিক-ওদিক খুঁজলো। আভিরাজ ভাই দরজায় বুকে হাত ভাজ করে রেখে দাঁড়িয়ে ওর দিকে শীতল দৃষ্টি তাকিয়ে আছে। গায়ে পুরনো একটি সুতির থ্রি-পিস। গলায় ঝুলছে ওড়না। আর কোমরের নিচে সমান চুলগুলো একটা মোটা শক্ত বেণীগাঁথা। হাঁটার সাথে সাথে এদিক-ওদিক দোলে বিনুনি। আভিরাজ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে বিড়বিড় করলো “চোর। টু বি অনেস্ট, তুই চুরনি মাহদি। মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরীর দেহ থেকে মন, ধ্যান সব চুরি করে নিয়েছিস।”
-“কিছু বলছেন?”
আভিরাজের বিড়বিড় দিয়া শুনে ফেললো কি-না কে জানে। তবে আভিরাজ ভাই ওর প্রশ্ন এড়িয়ে গেলো। উলটো দুই কদম এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করলো,
-“পেয়েছিস?”
-“না। নেই তো।”
দিয়া মন খারাপ করে জানালো। পরপরই কিছু মনে পড়তে আলমারি টার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
-“একবার আলমারি টা,,,
-“তোর কী মনে হচ্ছে আমি আমার আলমারিতে তোর ওই বাজে ওড়না টা ভালোবেসে তুলে রেখেছি? সরি টু সে আমি এতো টাও প্রেমিক পুরুষ নই।”
দিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এই বদমেজাজী আভিরাজ ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক করে রেখেছে তার বাবা? ইশ! কেনো? হোয়াই? হোয়াই ম্যান? দিয়া মন খারাপ হলে-ও সে নিজে কে শক্ত করে অভিমানী মিশ্রিত কণ্ঠে জবাব দিলো,
-“আমি আপনার কথার একটাও ভেবে কিছুই বলিনি।”
-“শেষ হয়েছে? যা এখন। কাজ আছে আমার।”
-“আপনি একটু খুঁজে দেখবেন।”
দিয়া বললো। আভিরাজ এটার বিপরীতে কিছু বললো না। দিয়া মুখ মলিন করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
দিয়া রুম থেকে বেরুনোর পরপর আভিরাজ ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিলো। দিয়া চমকে উঠলো। তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,
-“বদমেজাজী, অহংকারী পুরুষ।”
——–
দিয়ার রেজাল্ট দিবে আজ। সে ভীষণ চিন্তিত। সকালে নাশতার টেবিলে বসে আছে। সবাই আছে এখানে শুধু আভিরাজ ভাই নেই। খাওয়ার মাঝপথে উপস্থিত হলো আভিরাজ ভাই। স্যুট বুট পরে একদম অফিসার হয়ে এসে বসলো৷ দিয়া হা করে তাকিয়ে রইলো। মাথায় চুল পরিপাটি। গালে ট্রিম করা চাপদাড়ি। সাদা শার্ট গ্রে রঙের স্যুট। আর হাতে দামী একটা ওয়াচ। সুদর্শন পুরুষ আরও সুন্দর দেখাচ্ছে এমন পোষাকে। সে না চাই তেও গতকাল সন্ধ্যায় তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা এবং সবসময় খারাপ ব্যবহার করা পুরুষ টার ওপর দুর্বল? হায়। লজ্জা। কোথায় লুকবে সে নিজের থেকে! অবশ্য এটা দিয়ার দোষ না। সে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে। সব দোষ এই মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরীর। তিনি কেনো এতোটা সুন্দর কিন্তু বদমেজাজী! একটু তো দিয়ার সাথে ভালো ব্যবহার করতে পারে। সব সময় ধমকের ওপর না রেখে একটু মিষ্টি করে তো কথা বলতে পারে। দিয়ার ধ্যান ভাঙে নাফিজার কথায়। নাফিজা খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বললো,
-“প্রথম সাক্ষাৎ যাদের থেকে চোখ ফেরানো যায় না তাদের ক্রাশ বলে আপু!”
দিয়া ওর দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো। হতভম্ব সে ঘাড় কাত করে আবার আভিরাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নাফিজার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে রেগে গেলো। রেগে দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিলো,
-“জানি না আমি। এইটুকু মেয়ে কত কিছু জানে। ছোট আম্মু কে বলবো সব।”
-“আপু প্লিজ কিছু বলো না।”
নাফিজা ভয় পেয়ে অনুরোধ করলো। দিয়া খাওয়ায় মনোযোগ দিয়েছে ততক্ষণে। তবে খাবার পেটে যাচ্ছে না। আভিরাজের বাবার কথায়। সবার মনোযোগ আবারও তাদের দিকেই যায়।
-“এতোদিনে তোমার মর্জি হলো তবে।”
-“আহ আপনি আবার রাগিয়ে দিয়েন না আভির বাবা। আব্বা তোমার জন্য শুভকামনা।”
আভিরাজের মা স্বামীর কটাক্ষ কথা পাত্তা না দিয়ে ছেলের সাথে কথা বলতে লাগলো। আভিরাজ মিষ্টি করে হাসলো। আর বললো,
-“থ্যাংক ইউ, মাই সুইটস মাম্মা।”
দিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। এতো সুন্দর এতো সুন্দর। সে কেনো এতোদিন এই মানুষ টাকে দেখলো না। ইশ! কত কিছু মিস হয়ে গেলো। আভিরাজ ভাইয়া নাশতার ফাঁকে ওর দিকে তাকালো। শীতল চাহনি দেখেই দিয়ার ভয়ে গলা শুঁকিয়ে আসে।
—-
আভিরাজ যখন সন্ধ্যায় সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলো তখন বাড়ি জুড়ে রমরমা পরিবেশ। দিয়া সোফায় বসে আছে। আর ওকে ঘিরে বসে আছে বাকিরা। নীলয় আভিরাজ কে দেখেই দৌড়ে গেলো। লাফাতে লাফাতে আভিরাজের হাত একটা টেনে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“জানো ভাইয়া আপু অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে।”
-“কত ভালো?”
আভিরাজ জিজ্ঞেস করলো। নাফিজা এবার উত্তর দিলো,
-“অনেক।”
-“প্লাস পায়নি।”
আভিরাজ দিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো। দিয়ার মন মূহুর্তেই খারাপ হয়। সে ওঠে নিজের রুমে চলে যায়। আভিরাজের মা এবার একটু রাগ দেখালেন।
-“হলো তো, মেয়ে টাকে তুমি দিলে রাগী।”
আভিরাজ মায়ের দিকে তাকিয়ে বোকাবোকা হেঁসে দিলো। এরপর সুড়সুড় করে নিজেও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে এলো। নিজের রুমের দিকে না গিয়ে উলটো পথ ধরলো। শক্ত কাঠের দরজা টায় ঠকঠক করে আওয়াজ করলো দুইবার সাথে গম্ভীর স্বরে আদেশ করলো,
-“দরজা খুল।”
ওপাশ থেকে দরজা খোলার কোনো সাড়াশব্দ নেই। তবে ফোঁপানোর শব্দ হচ্ছে। আভিরাজ অস্থির হলো। তার একটা কথায় এই মেয়ে কেঁদে ফেলেছে? হায়। ঔষধ ভালোই কাজ করেছে।
-“ওপেন দ্য ডোর মাহদি।”
-“খুলবো না। চলে যান আপনি।”
দিয়া নিজের জেদ দেখে নিজেই অবাক। মানুষ টার দুইটা শব্দ। প্লাস পায়নি। তাকে এতোটা ভেঙে দিলো? তার এতো কেনো কষ্ট হচ্ছে? তবে কী সে ভেবেছিলো আভিরাজ ভাই তাকো কংগ্রাচুলেশনস জানাবে? এটার অপেক্ষায় ছিলো? আর ঠিক যখনই তার উলটো টা হলো সে কেনো এতোটা কষ্ট পাচ্ছে!
দিয়া আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে এসব তো ভাব ছিলো ঠিক তখনই বাইরে থেকে আভিরাজ ভাই গমগমে গলায় বলে উঠলো,
-“এখন যাচ্ছি। বাট এরপর আমি এখানে যখনই আসবো, শুধুমাত্র তোকে কোলে তুলে আমার রুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসবো। মাইন্ড ইট লিটল গার্ল।”
দিয়া হতবাক হয়ে যায়। কান্না সাথে সাথে থেমে যায়। শব্দ আসে না। চলে গেলো আভিরাজ ভাই? তবে যাওয়ার আগে কী বলে গেলো এসব? লিটল গার্ল!
#চলবে….
