‘দরদিয়া পাখি’ [পর্ব-৬]
-আফরোজা আঁখি।
সদর দরজার সামনে বর-কনের সাজে দাঁড়িয়ে থাকা আসমান ও পুষ্পিতাকে দেখে অবাক সকলেই। সবার প্রশ্নবোধক চাহনির মানে বুঝতে পেরে খানিকটা এগিয়ে এলো আসমান। পুষ্পিতার দিকে তাকাতেই ও এসে দাঁড়ালো আসমানের পাশে। সকলের চাহনি থেকে বাঁচতে মাথাটা নুইয়ে নিল সে। আসমান সবার উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি আর পুষ্পিতা একে অপরকে ভালোবাসি।আমরা দুজনে বিয়ে করেছি।তোমাদের আর কিছু জানার আছে?”
সবাই চুপ করে রইলেন। আরমান সিকদার আর উনার বড় ভাই একে অপরের দিকে তাকালেন। চোখের ইশারায় কি যেন কথা বললেন উনারা। বাবা-চাচার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে বুঝল আসমান—’তার কাজে উনারা খুব বেশি আনন্দিত না হলেও রাগ করেননি! কেউ কিছু বলল না, তবে সালেহা বেগমের যেন সহ্য হচ্ছিল না এসব। উনি মানতে পারছেন না পুষ্পিতা উনার ছেলের বউ! আসমানের কথা শেষ হওয়ার কিছু মুহূর্ত পরই বলে উঠলেন সালেহা বেগম,
“বিয়ে করেছিস মানে! তুই ভুলে গেছিস, ওর বাবা ছিলেন আমাদের কোম্পানির সামান্য স্টাফ! তুই একটা আভিজাত্য পরিবারের ছেলে হয়ে ওকে বিয়ে করলি,আসমান?”
আজলান সিকদার আর নাফিজা বেগম দুজনেই রেগে তাকালেন সালেহা বেগমের দিকে। পুষ্পিতা সম্পর্কে এহেন কথা শুনে খুবই খারাপ লাগছে উনাদের। নাফিজা বেগম রেগে বলে উঠলেন তখন,
“এসব কি বলছিস, ছোট? পুষ্পিতার পরিচয় ও আমাদের মেয়ে। এ দিকদার বাড়ির মেয়ে!”
“মুখে বললেই সত্যিটা মিথ্যা হয়ে যায় না,ভাবি! সত্যিটা তো এটাই পুষ্পিতার সাথে এ বাড়ির কোনো সম্পর্ক নেই।”
নাফিজা বেগমের রাগ বাড়ছে তরতর করে। উনি আবারও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, থেমে গেলেন আসমানের কথা শুনে,
“তোমার বাবাও গ্রামের সামান্য কৃষক ছিলেন, আম্মু। আব্বু কি তোমায় বিয়ে করেননি?”
“তুই আমার সাথে এই মেয়েকে মেলাচ্ছিস?”
আসমানের চোখ-মুখ কঠোর। আরিয়ানা কিছু বলতে চাইলে ওকে থামিয়ে দিল আসমান। আরহাম সিকদার স্ত্রীকে চোখ রাঙালেও শুনেননি তিনি যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছেন পুষ্পিতাকে। এ দেখে বিরক্ত হয়েই বলল আসমান,
“তুমি কি চাইছিলে, আম্মু? আমি তোমার ওই ভাইজিকে বিয়ে করি? যে মেয়ে টাকা আর সম্পত্তির লোভে এ বাড়ির বউ হতে চেয়েছিল!”
সালেহা বেগম এবার চুপ করে গেলেন। সত্যিই তো যদি ওই মেয়ের সাথেই আসমানের বিয়ে হতো, তাহলে কত বড় ক্ষতি হতো এ বাড়ি আর উনার আদরের ছেলের! এসব ভেবেই চুপ করে গেলেন সালেহা বেগম। তবে পুষ্পিতাকে ছেলের বউ হিসেবেও মানলেন না তিনি। গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন নিজের রুমে।
_________________
‘রাত প্রায় ১০টার কাছাকাছি,বাড়ির পরিবেশ এখন শান্তই আছে। আসমান ওর বাবা-চাচাদের সাথে কথা বলেছে। ঠান্ডা মাথায় উনাদের বুঝিয়েছে সবটা। বাড়ির সকলেই জানেন আসমান কেমন।ও যখন পুষ্পিতাকে বিয়ে করেছে, নিশ্চয়ই ভেবে-চিন্তে করেছে সবটা!এই ভেবেই সবাই মেনে নিয়েছেন ওদের বিয়ে। পুষ্পিতার আম্মু ভীষণ অভিমান করেছিলেন মেয়ের উপর, কিন্তু পুষ্পিতা সেই অভিমান টিকিয়ে রাখতে দেয়নি। বাচ্চামো করে মায়ের রাগ ভাঙিয়েছে সে।
‘পুষ্পিতা বসে আছে ঘাটপাড়ে।পরনে একটা কালো রঙের শাড়ি। মাথার খোপাটা কেমন আধখোলা হয়ে আছে।আকাশের চাঁদটা চিকচিক করছে আজ,চারিদিক আলোকিত করে রেখেছে যেন। কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুরে তাকাল পুষ্পিতা,দেখল আসমান দাঁড়িয়ে আছে ওর পিছনে। পুষ্পিতার পাশে বসল সে, জিজ্ঞেস করল ওকে,
“এত রাতে এখানে কি করছ?”
“আমি তো প্রতি রাতেই এখানে আসি।অভ্যেস তো!তাই আজও আসলাম।”
আসমান চুপ করে রইলো। চাঁদের আলোতে পুষ্পিতার সুন্দর মুখটা যেন আরও আকর্ষণীয় লাগছে। চোখ ফেরাতে পারছে না আসমান। পুষ্পিতা মাথা রাখল ওর কাঁধে, সুবিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ আকাশটাকে কত সুন্দর লাগছে,দেখুন। ওই চাঁদটা আজ পরিপূর্ণ করেছে আসমানকে।”
সাথে সাথেই মিষ্টি হেসে বলল আসমান,
“আর তুমি পরিপূর্ণ করেছো আমাকে!”
পুষ্পিতা তাকাল আসমানের দিকে।লোকটাকে যেন আজ নতুনভাবে আবিষ্কার করল সে। রাগী, গম্ভীর আসমান সিকদার এত নরম স্বরে কথা বলতে পারে, তা জানা ছিল না পুষ্পিতার। কিছুক্ষণ ওখানে বসে গল্প করার পর আসমান তাড়া দিল রুমে যাওয়ার জন্য। পুষ্পিতা তখন খেয়াল করল,ওর পায়ে ধুলো লেগে আছে। একবার পায়ের দিকে তাকিয়ে আবার পুকুরের পানির দিকে তাকাল পুষ্পিতা।আসমান বিষয়টা খেয়াল করল। ওরা যেখানে বসে আছে সেখানেই ছিল পানির উপস্থিতি। আসমান ওর হাতের সাহায্যে পানি দিয়ে ধুয়ে দিল পুষ্পিতার পা। চরম বিস্ময়ে বলে উঠল পুষ্পিতা,
“আরেহ, করছেন কি? পায়ে হাত দেবেন না প্লিজ! কেউ দেখলে খারাপ ভাববে!”
পুষ্পিতার কথায় মুচকি হেসে উত্তর দিল আসমান,
“এত রাতে এখানে কেউ আসবে না। আর দেখলে দেখুক!আমি তোমাকে ভালোবাসি,পুষ্প!যেখানে তোমার-আমার সম্পর্কে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর যত্ন আছে,সেখানে কে কী ভাবল না ভাবল,তা নিয়ে আমি ভাবি না!”
পুষ্পিতা অবাক না হয়ে পারছে না। আরিয়ানার কথাই তবে ঠিক!আসমান নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে পুষ্পিতাকে,যেভাবে ভালোবাসে পুষ্পিতা আসমানকে! কথাগুলোই ভাবছিল পুষ্পিতা, এর মধ্যেই আসমান ওকে কোলে তুলে নিল। পড়ে যাওয়ার ভয়ে মেয়েটা জড়িয়ে ধরল আসমানের গলা। আসমান ধীর পায়ে এগোতে শুরু করল বাড়ির দিকে।
____________
‘সময় প্রবহমান।সময় আর স্রোত অপেক্ষা করে না কারোর জন্যই।দেখতে দেখতে কেটে গেছে অনেকগুলো দিন।প্রায় তিন মাসের মতো। সিকদার বাড়িতে যেন আজ মেলা বসেছে, মেহমানদের আনাগোনা চলছে বাড়িতে। সকলেই এসেছেন নতুন বউকে দেখতে। আসমান-পুষ্পিতার বিয়ের আজ তিন মাসের মতো হয়ে গেছে। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান না করায় অনেকেই জানেন না আসমানের বিয়েটা আসলে কার সঙ্গে হয়েছে,তাই উনারা আজ দেখতে এসেছেন সিকদার বাড়ির বড় পুত্রবধূকে।
সালেহা বেগম আর বাড়ির সবাই মেনে নিয়েছেন বিষয়টা। আসমানের জন্য পুষ্পিতার থেকে ভালো পাত্রী উনারা বোধহয় পেতেনও না। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু হুট করেই কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো এলো মেলো হয়ে গেল সবটা। আহান ফিরে এলো বাংলাদেশে।এক বুক আশা নিয়ে ফিরে এল ছেলেটা। কিন্তু বাড়ি ফিরে যা দেখল, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না আহান।
সবাইকে সারপ্রাইজ দেবে বলে কাউকেই বাড়ি ফেরার সংবাদটি জানায়নি আহান। খুশিমনে এসে দাঁড়িয়েছে সদর দরজার সামনে।বাড়ি ভর্তি মেহমানরা তখন ব্যস্ত আসমান আর পুষ্পিতাকে নিয়ে। আহানের কপালে ভাঁজ পড়ল সবটা দেখে।ও যা ভাবছে তাই কি সত্যি?কিন্তু বাড়ির সবার সাথেই তো ওর যোগাযোগ ছিলো।কেউ অন্তত বলতো!আস্তে আস্তে হেঁটে কিছুটা সামনে গেল আহান। তখনও বাড়ির কেউ আহানকে দেখেনি। আসমান আর পুষ্পিতা তখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।পুরো যেন স্বামী-স্ত্রীর মতো লাগছে ওদের।আহান এমনটাই ভাবছিল, তখনই এক আত্মীয় ডেকে বললেন আসমানকে,
“বাহ! আসমান, তোর বউ তো চাঁদের আলো! পুরো সিকদার বাড়ি যেন আলোকিত হয়ে গেছে এই মেয়ের সৌন্দর্যে!”
আসমান আর পুষ্পিতা দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু এ কথা শুনে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আহানের কেমন অনুভূতি হলো? আহান কয়েক পা পিছিয়ে গেল, ওর হাতে থাকা ফুলের জন্য আনা গিফটটা পড়ে গেল মেঝেতে। ছেলেটার মুখটা কেমন হয়ে গেছে।এমন মনে হচ্ছে কেউ বুকে ছুরি চালিয়েছে।আহান যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে,তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে আরিয়ানা ডেকে উঠল ওকে,
“আহান… যাচ্ছিস কোথায়?”
আরিয়ানার কথা শুনে সকলেই তাকাল সদর দরজার দিকে। আসমান চোখ বন্ধ করে বড় একটা শ্বাস ছাড়ল।পরিস্থিতি কতটা অস্বাভাবিক হতে চলেছে, আন্দাজ করতে পারছে সে। আহান এগিয়ে এলো আসমান আর পুষ্পিতার কাছে। হাত বাড়িয়ে পুষ্পিতাকে স্পর্শ করতে চেয়ে বলল,
“ফুল…”
আহানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে নিল আসমান। পুষ্পিতাকে আড়াল করে ওর সামনে এসে দাঁড়াল সে। আহান ভ্রু কুঁচকে রাগী চোখে তাকাতেই বলল আসমান,
“ও আর তোর ফুল নেই, আহান।পুষ্পিতা এখন আমার স্ত্রী! মিসেস আসমান সিকদার।এই বাড়ির বড় বউ,আর তোর ভাবি।ভুলে যা পুরোনো সব!ওর প্রতি আর কোনো অনুভূতি বাঁচিয়ে রাখিস না।”
আহানের চোখ-মুখে প্রচণ্ড রাগ। আসমান তবে সেদিন ইচ্ছা করেই আহানকে আমেরিকা পাঠিয়েছিল! ছেলেটা এতদিন মন দিয়ে কাজ করেছে, অপেক্ষা করেছে বাড়ি ফেরার জন্য। ওর সব স্বপ্ন-আশা এক নিমিষেই যেন শেষ হয়ে গেল। আসমানের মুখের কথাটাই যথেষ্ট আহানকে ভেতর থেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য।
ও যে সত্যিই ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ফুলকে অন্য কারো পাশে দেখে।আহানের বিরক্ত লাগছে সবকিছু ও মানতে পারছে না। ফুলের পাশে অন্য কাউকে ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। পুষ্পিতা তখন ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়েছে আহানের দিকে। আহানের চোখ দুটো কেমন চিকচিক করছে, ফর্সা মুখটা ঢেকে গেছে অন্ধকারে।পুষ্পিতার মায়া হলো।ও ভালো না বাসলেও আহান যে ওকে ভালোবাসে,তা পুষ্পিতা জানে!পুষ্পিতার যেমন কষ্ট হয়েছিল আসমানকে অন্য কারো পাশে দেখে, আহানের নিশ্চয়ই তেমনভাবেই কষ্ট হচ্ছে! আহান নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল আসমানের থেকে।পুষ্পিতার মুখপানে তাকাল সে।পিছুতে পিছুতে বলল,
“তুই কথা রাখিসনি, ফুল! আমার জন্য অপেক্ষা করিসনি তুই। অথচ আমি তোকে কতটা ভালোবাসলাম!আমি নিজের কাছেই নিজে কতটা বেহায়া হলাম তোকে পাওয়ার জন্য!তুই আমার হলেও পারতি!”
আহান বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। পুষ্পিতা সহ বাড়িভর্তি মানুষগুলো সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ছেলেটার যাওয়ার পানে। পুষ্পিতার কষ্ট হলো আহানের কথা শুনে।ইচ্ছে হলো ওকে আটকাবে বুঝাবে পুষ্পিতার মনে তার প্রতি ভালোবাসা ছিলো না।ছিলো কেবল শ্রদ্ধা আর সম্মান! সালেহা বেগম আর আরিয়ানা কত করে ডাকলেন আহানকে,কিন্তু সে শুনল না কারোর ডাক। সবাইকে ভেতরে থাকতে বলে আসমান পিছু নিল ভাইয়ের।
ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“পাগলামি করছিস কেন, আহান? মেনে নে সবটা। তুই পুষ্পিতাকে পছন্দ করলেও, পুষ্পিতা তোকে পছন্দ করত না। কেন বুঝতে পারছিস না?”
আসমান আহানের হাতটা ধরলেই আহান এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়াল আসমানের থেকে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কিছু সময়। ওর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, চেহারার সেই সুন্দর ভাবটা হারিয়ে গেছে। আসমানের দিকে তাকাল আহান।কি যেন ভেবে হেসে উঠল। আসমান বুঝল না আহানের এই হাসির মানে। কিছু বলতে যাবে, তখনই ওকে থামিয়ে দিয়ে আহান বলল,
“তুমি চলচাতুরী করে আমার থেকে ফুলকে কেড়ে নিলে তো, ভাইয়া! ঠিক করোনি তুমি এটা। রুহের অভিশাপ বলেও একটা কথা আছে, জানো তো?আমার রুহ তোমাকে অভিশাপ দেবে তুমি কখনোই সুখী হবে না! তোমাদের বিয়ে হয়েছে, সংসার হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো ঘর আলো করে বাচ্চাও আসবে।
কিন্তু সবকিছুর ভিড়েও ফুলের মনের এক কোণে আমি রয়ে যাব। আহান বেঁচে থাকবে ফুলের ভালোবাসায়,বুক ছিঁড়ে আসা প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসে, আফসোসে।তুমি মিলিয়ে নিও,আমাকে ঠকিয়ে তুমি কখনোই সুখী হতে পারবে না! সব পেলেও তুমি ভালোবাসা পাবে না।”
কথাগুলো বলে এক মিনিটও দেরি করল না আহান। নিজের বাইকটা বের করে ওটা নিয়েই বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। আসমানের কেমন অনুশোচনাবোধ হচ্ছে।মনের মধ্যে একটা খারাপ লাগা কাজ করছে।যতোই হোক আহান ওর ভাই।ওর খুবই স্নেহের ছেলেটা।আহানের কাছে কি ক্ষমা চাওয়া উচিত? সত্যিই তো, আসমান চলচাতুরী করেই পুষ্পিতাকে ওর থেকে কেড়ে নিয়েছে! এই ভেবেই দ্রুত গিয়ে গাড়িটা স্টার্ট দিল আসমান। আহানের বাইকের পিছনে সেও ছুটল।কিছুদুর গিয়েই বাইক থামিয়েছে আহান। বাইকটাকে একপাশে রেখে আনমনে হাঁটছে আর কি যেন ভেবে চলেছে। ওর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। আহান মানতে পারছে না,ফুল আর ওর নেই! যাকে নিয়ে মনে মনে ভালোবাসার চাদর বুনেছে,, কতো স্বপ্ন সাজিয়েছে তাকে ঘিরে সে এখন তারই ভাইয়ের বউ! ফুলকে পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই আহানের কাছে!
আহান তাকাল আকাশ পানে, বিড়বিড় করে আওড়ালো,
“যাকে আমার ভাগ্যে লিখোনি তার প্রতি এতো ভালোবাসা কেন জন্মালে খোদা?সবশেষে ফুল আমার হৃদয়ে থাকবে আর অন্য কারো ভাগ্যে! আমি যে মানতে পারছি না এটা।”
কথাগুলো ভাবলেই কষ্টে বুক ভার হয়ে আসছে আহানের। ও এক মনে এসব ভাবছে আর হেঁটে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে কবে যে যানবাহনপূর্ণ রোডের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল নেই সেদিকে। কিছু দূর থেকে দ্রুতগতিতে একটা ট্রাক ছুটে আসছিল তখন। আসমান পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করে ডাকতে শুরু করল আহানকে, কিন্তু আহান যে নিজের মধ্যে নেই।ভাইয়ের ডাক ওর কানে পৌঁছাচ্ছে না। ট্রাকটা তখন আহানের একদম কাছে এসে গেল,আসমান আর রাস্তার অন্য মানুষদের চিৎকার চেচামেচি আহানের কানে গেলেই ধ্যান ভাঙলো ওর।ঘুরে তাকালেই ওর দিকে ছুটে আসতে থাকা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিল আহান।বুঝল নিজের মৃত্যু অতি সন্নিকটে!
_____________________
সত্যিই সময় প্রবহমান! চোখের পলকেই কেটে গেছে তিনটা বছর। সময় থেমে থাকেনি কারও জন্য। অনেক কিছু বদলে গেছে এই তিন বছরে।তিন বছর সময়টা হয়তো খুব বেশি না,তবু এই তিন বছরেই অনেক কিছু ভেঙেছে, গড়েছে, হারিয়েছে, আবার নতুন করে শুরু হয়েছে!
নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। হাতে থাকা রজনীগন্ধা ফুলগুলো পাশাপাশি দুই কবরের মাঝখানে রেখে দিল সে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আমি এমনটা চাইনি! কখনোই চাইনি!”
‘পেছন থেকে কারোর কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই আহান তাকাল সেদিকে।দেখল নিজের বড় বোন আরিয়ানাকে।চোখ বন্ধ করে বড় একটা শ্বাস ছাড়ল আহান। হেঁটে গিয়ে আরিয়ানার সামনে দাঁড়াতেই সে বলল,
“আর কত সময় থাকবি এখানে?এবার তো চল!”
“আরেকটু থাকি… তুমি যাও।”
“মৃত মানুষের প্রতি মায়া বাড়িয়ে কি হবে আহান?সেই তো কষ্ট পাবি।”
“তুমি ভুলতে পেরেছো ওদের?”
উত্তর খুঁজে পেল না আরিয়ানা। ছলছল চোখ দুটো নিয়ে তাকাল কবর দুটোর দিকে।কত নিশ্চিন্তে ওখানে শুয়ে আছে আসমান আর পুষ্পিতা!ওরা কি জানে,ওদের চলে যাওয়ার পর সবটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে!সিকদার বাড়ি এখন আর আগের মতো নেই, মানুষগুলোও এখন হাসতে ভুলে গেছে।আগের মতো আনন্দ নেই বাড়িটাতে।সব যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেছে।সেদিন আহানের এক্সিডেন্ট হওয়ার কথা হলেও হয়েছিল আসমানের! আহানকে বাঁচাতে ট্রাকের নিচে চাপা পড়েছিল আসমান।ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। আহান মানতে পারছিল না ভাইয়ের মৃত্যু।ও তো এমনটা চায়নি। ওর কথাগুলো এভাবে সত্যি হয়ে যাবে জানলে ও কখনোই এসব বলত না! ও তো কষ্ট সইতে না পেরে ওভাবে বলেছিল।কে জানতো কথা গুলো বাস্তবে রূপ নিবে!আসমানের মৃত্যুর খবরে সিকদার বাড়িতে নেমেছিল শোকের ছায়া। কান্নাকাটিতে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন সবাই।আসমানের মৃতদেহটা বাড়িতে নিয়ে আসা হলো।একে একে সকলেই দেখলেন ওকে।
পুষ্পিতার পরনে তখন আসমানের দেওয়া লাল রঙা শাড়িটা।ও আজ সেজেছিল আসমান ভাইকে দেখাবে বলেই।কিন্তু মানুষটার মুখে নিজের সাজের প্রশংসা শোনার সৌভাগ্য তার হয়নি!
সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুম পরিপূর্ণ লোকজনে।আসমানকে ঘিরে রেখেছেন সকলেই।পুষ্পিতা তখন এগিয়ে এল ওর কাছে। পরনের লাল শাড়িটা এলোমেলো হয়ে আছে, মাথার লম্বা চুল খুলে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পিঠে।পুষ্পিতা আস্তে আস্তে হেঁটে আসমানের লাশের পাশে বসল।কেউ-ই ওকে আটকাল না।সবাই কান্নাকাটি করলেও মেয়েটা কেমন পাথর হয়ে আছে।সবাই চাইছিল ও কাঁদুক,নিজের ভেতরের কষ্টগুলো প্রকাশ করুক।
‘সবাই মানলেও,পুষ্পিতা মানতে পারছিল না।আসমান আর নেই। আসমান তো ওকে কথা দিয়েছিল শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ওর সঙ্গে থাকবে!তাহলে শেষ মুহূর্তে এসে লোকটা এমন বেইমানি করল কেন? আসমানকে ছাড়া পুষ্পিতা বাঁচবে কীভাবে? মানুষটা যে ওর প্রাণভোমরা! কথাগুলো ভেবেই নিজের কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে আসমানের মুখ স্পর্শ করল মেয়েটা।খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বলল আসমানকে,
“শুনছেন… চোখ খুলুন।দেখুন,আমি লাল শাড়ি পরেছি।আপনিই তো বলেছিলেন লাল শাড়ি পরে সাজগোছ করতে।এবার দেখে বলুন তো,কেমন লাগছে আমাকে?”
পুষ্পিতা আরও কত কথা বলে যাচ্ছে আসমানকে, কিন্তু আসমান কি শুনছে ওর কথা?বাড়ি ভর্তি মানুষগুলো কান্না শুরু করলেন ওর প্রলাপ শুনে।ওকে কেমন পাগল পাগল লাগছে দুঃখে দিশেহারা হয়ে যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছে মেয়েটা।আসমান শুনবে না,উত্তর দিবেনা জেনেও কথা বলে যাচ্ছে ওর সাথে।আরিয়ানা এগিয়ে এল পুষ্পিতার কাছে।ওর হাত টেনে নিজের দিকে চাওয়ালো। কান্না করতে করতে পুষ্পিতাকে বলল,
“ভাইয়া তোর কথা শুনছে না,পুষ্পিতা।ভাইয়া আর নেই।তুই বুঝতে পারছিস আমার কথা?ভাইয়া আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।”
পুষ্পিতার রাগ হলো।এক ঝটকায় আরিয়ানার থেকে ছাড়িয়ে নিল নিজের হাত। চোখ-মুখে তীব্র ক্রোধ নিয়ে বলল,
“নেই মানে? কী বলছো পাগলের মতো? এসব ভুলভাল কথা একদম বলবে না।”
পুষ্পিতা আবারও তাকাল আসমানের লাশের দিকে গিয়ে ডেকে বলল ওকে,
“আ… আপনি এভাবে শুয়ে আছেন কেন?শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা?ওরা কি বলছে এসব?আপনি উঠুন একবার,কথা বলুন! ওদেরকে বুঝিয়ে দিন,ওরা মিথ্যে বলছে!”
পুষ্পিতা ডেকে যাচ্ছে আসমানকে, কিন্তু আসমান তো প্রতুত্তর করছে না। সব সধবা মহিলারা নিয়ে যেতে চাইলেন পুষ্পিতাকে,
কিন্তু সে এক চুলও নড়ল না,আসমানকেও দাফনের জন্য নিয়ে যেতে দিল না। কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল।যখন পুষ্পিতা বুঝল সবাই ঠিক,আর সে ভুল। আসমান সারাজীবনের জন্য ছেড়ে চলে গেছে ওকে!তখনই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। আহাজারি করে কত কী বলল সে। উপস্থিত সবাই তখন কেঁদে উঠলেন ওর কান্না দেখে।আচমকাই উঠে দাঁড়াল পুষ্পিতা। দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকাল।পিছু পিছু বাড়ির সবাই গেলেন,আহানও গেল ওর ফুলকে ডাকতে।সবকিছুর জন্য আহানের যে নিজেকেই দায়ী মনে হচ্ছিল!
‘বাড়ির সবাই অনেক ডাকাডাকি করলেন পুষ্পিতাকে,সে দরজা খুলল না।উপায় না পেয়ে দরজা ভেঙেই ঢোকা হলো ওর রুমে, পুষ্পিতা তখন খাটের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে।পুরো রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে জিনিসপত্র।পুষ্পিতা নিজের বুকে আগলে রেখেছে আসমানের ছবি।পুষ্পিতা ঠিকঠাক আছে ভেবে নিশ্চিত মনে চলে যাচ্ছিলেন সবাই।কিন্তু আহানের মন মানল না,ওর কেমন অস্বাভাবিক লাগলো সবটা।মেঝেতে বসে থাকা পুষ্পিতাকে কেমন প্রাণহীন মনে হলো ওর কাছে।আহান এগিয়ে যেতে চাইলে আরিয়ানা থামালো ওকে।ওর নিজেরও স্বাভাবিক মনে হচ্ছেনা সবটা! আরিয়ানা এগিয়ে গেলো পুষ্পিতার কাছে কাধে আলতো করে ধাক্কা দিলেই মেয়েটা সমস্ত ভর ছেড়ে ওর উপরে।আরিয়ানার চিন্তা হলো,ওর মা চাচিরা এসে ডাকলেন পুষ্পিতাকে। কিন্তু মেয়ের কোনো সাড়াশব্দ নেই। দেরি না করে বাড়িতে ডাক্তার ডাকা হলো।হসপিটালের থেকে ওদের বাড়ির দূরত্ব বেশি না হওয়ায় ডাক্তারের আসতে তেমন সময় লাগলো না।পুষ্পিতাকে চেক করে ডাক্তার জানালেন—ও আর বেঁচে নেই। কথাটা শোনা মাত্রই মেয়েকে বুকে আগলে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন নাফিজা বেগম।পুষ্পিতার হার্টে সমস্যা সেই ছোট বেলা থেকেই ও নিতে পারেনি এতো বড় শক! আসমানের মৃত্যু ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে মেয়েটাকে।যার ফলস্বরূপ হৃদযন্ত্রের চলাচল বন্ধ হয়ে মারা গেছে সে। পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে সে চলে গেছে আসমানের কাছে।সবাই মিলে ব্যস্ত হলো পুষ্পিতাকে নিয়ে।আহান দেখল বিছানায় পড়ে থাকা ফুলের নিথর দেহ।দপ করে মেঝেতে বসে পড়ল আহান। দুই হাত দিয়ে খামচে ধরল মাথার চুল। ফুল আর বেঁচে নেই! প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনায় সে নিজেও চলে গেলো!কতটা ভালোবাসলে…ঠিক কতটা ভালোবাসলে মানুষ এমন হতে পারে!আহান নিজের ভুল বুঝল।সে বুঝল,তার মনে ফুল থাকলেও ফুলের মনে কেবল আসমানই ছিল।ফুল আসমানকে ভালোবেসেছে তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত!
সিকদার বাড়ি থেকে সেদিন দুটো লাশ বেরোলো। পাশাপাশি কবর দেওয়া হলো দুজনকে।অথচ আজ কবরে থাকার কথা ছিল আহানের!
নিয়তি এত নিষ্ঠুর কেন? কেন এমনটা হলো? আহান যে তার ফুলের মৃত্যু চায়নি,ভাইয়ের এমন পরিণতিও চায়নি আহান।তবে সবটা এমন এলোমেলো হয়ে গেল কেন?আহানের যে আজও নিজেকে অপরাধী মনে হয়। বারবার মনে হয় ওর ফুল আর আসমান ভাইয়ের একটা সুন্দর,সাজানো-গোছানো সংসার হতো। ওরা ভালো থাকত সারাজীবন। এসব হয়নি কেবল আহানের জন্যই!
পুষ্পিতা আর আসমানের কবরের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভেবে চোখের পানি ফেলছিল আহান।আরিয়ানা ওর ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“সবই আল্লাহর ইচ্ছেতে হয়েছে আহান। আল্লাহ ওদের ভাগ্যে যেমনটা লিখেছিলেন, তেমনটাই হয়েছে। এখানে তোর, আমার বা অন্য কারোর কোনো হাত নেই।”
আহান কথা বলল না,নিশ্চুপ সে। কবর দুটোর দিকে তাকিয়ে কি যেন ভেবে চলেছে।আরিয়ানা জানে,ওর ভাইয়ের ভাবনা পুষ্পিতা আর আসমানের মৃত্যুর জন্য আহান নিজেকেই দোষী মনে করে। কিন্তু সত্যিটা তো এটাই আল্লাহ ওদের আয়ুই লিখেছিলেন ওতোটুকু।আরিয়ানা প্রতিবার আহানকে বোঝায়। আজও বুঝিয়ে-সুজিয়ে বাড়ি নিয়ে গেল ওকে।
-সমাপ্ত।
