#নারী_জনম (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
আমার মেয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেওয়ায় স্বামী বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। শ্বশুড়বাড়িতে আর আমার জায়গা হবে না বলে দিলো। কারণ আমার মেয়েটা প্রতিবন্ধী, এটা আমার দোষ। আমার জন্যই সে প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিয়েছে। সেদিন স্বামীর ঘরে একটু জায়গা পাওয়ার জন্য অনেক কান্না করছিলাম। কিন্তু লাভ হলো না। স্বামীর এক কথা, এই প্রতিবন্ধী মেয়ের বোঝা সে টানতে পারবে না। অতঃপর আমাকে তালাক দিয়ে দিলো। অসুস্থ মেয়েটাকে নিয়ে বাবার বাড়ি জায়গা হলো। তবে দুই মাসের মধ্যে আমি এবং আমার মেয়ে ভাই, ভাবীর চোখের বিঁষ হয়ে গেলাম। তারা আমাদের বোঝা ভাবতে শুরু করলেন। তাদের ঘরে জায়গা হবে না বুঝতে পেরে তাদের হাতে পায়ে ধরলাম। ভাইয়ের হাত ধরে অনুরোধ করে বলছিলাম,“ভাই আমি আমার অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবো? আমার তো যাওয়ার জায়গা নাই। তুই জায়গা না দিলে কোথায় থাকবো?”
অনেক অনুরোধ করেও কাজ নাহলে এলাকার সবার হাতে পায়ে ধরলাম৷ যাতে তারা ভাইকে বোঝায়। অবশেষে সবার কথায় ভাই আমার জন্য একটু জায়গা ছাড়তে রাজি হলো। এলাকার সবাই সাহায্য সহযোগীতা করে সেই জায়গায় ছোট একটি বাঁশের ঘর তুলে দিলো। মা, মেয়ের জায়গা হলো সেই ঘরে। লোকের বাড়ির টুকটাক কাজ করে চাল ডাল পেতাম সেটা দিয়েই দুই মা মেয়ের জীবন চলে যেতো।
আমার মেয়ের সমস্যা হলো, সে হাত-পা হালকা নাড়াতে পারলেও তা দিয়ে কোন কাজ করতে পারতো না। উঠে দাঁড়াতে পারতো না। হাত দিয়ে কিছু ধরতে পারতো না। কথাও বলতে পারতো না। এত বছরের জীবনে শুধু একটি শব্দই বলতে পারছিলো,“আম্মো।”
এই শব্দটা আজও আমার কানে বাজে। সারা দুনিয়া মেয়েটাকে বোঝা ভাবলেও আমি ভাবতে পারিনি। আমি যে মা। তাই তো দ্বিতীয় বিয়ে না করে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে এর ওর কাজ করে দু’জনে চলতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে সময় কেটে যায়। টাকার অভাবে জীবনে মেয়েটাকে ডাক্তার দেখাতে পারিনি। তাকে বিছানায় ফেলে রেখেই এখানে ওখানে কাজে চলে যেতাম৷ সে বিছানায় পড়ে থাকতো। সেখানেই সারাদিন প্রস্রাব, পায়খানা করতো। সেসবের মাঝেই পড়ে থাকতে হতো। আমি বাসায় ফিরলে সব পরিস্কার করে দিতাম। তার আগে তাকে ওভাবেই পড়তে হতো। তাকে পরিস্কার করা তো দূর, এতটা সময় ঘরে থাকায় যে তার ক্ষুধা লাগতো সেই ক্ষুধার যন্ত্রণা দেখারও কেউ ছিলো না। ভাইয়ের ঘরের পাশেই যেহেতু ঘর তাই ভাবীর কাছে মাঝে সাজেই বলতাম, তাকে দু’মুঠো ভাত দিতে। কিন্তু তারা দিতো না। আসলে সব মাখিয়ে ফেলায় যে দুর্গন্ধ বের হতো। তাই ঘৃণায় তারা কাছে যেতো না। তবে আমি ফিরলে বলতো খাবার দিয়েছে। আমি সব বুঝেও না বোঝার মতো থাকতাম। আমার মেয়েটা নিজের দুঃখ বোঝাতে না পারলেও তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি তার ক্ষুধার যন্ত্রণা ঠিকই অনুভব করতে পারতাম৷ এভাবে দশ বছর কেটে যায়।
যে মেয়ের জন্য এত লড়াই, এত পরিশ্রম, এত কষ্ট করা সেই মেয়েটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। সবাইকে মুক্তি দিয়ে সে চলে গেল। মেয়েটার এই অবস্থার জন্য আমার ঘরের পাশ দিয়েও কেউ যেতে চাইতো না। তাদের ঘৃণা হতো। অথচ আজ আমার সেই ঘরেই এত এত মানুষের আনাগোনা। বেঁচে থাকতে আমার যেই মেয়েটাকে কেউ চোখের দেখা দেখতে আসেনি, আজ ম রে যাওয়ায় শেষ বিদায় দিতে আসলো।
এসব দুঃখের কথা বলে আহাজারি করে কান্নায় ভেঙে পড়েছে সুফিয়া বেগম। মেয়ের মৃ ত্যু শোক নিতে না পেরে হাউমাউ করে কান্না করছে। সেই সঙ্গে অতীতের সব কষ্টের কথা বলছে। তার কথা শুনে ইতিমধ্যে অনেকের চোখ ভিজে এসেছে। কেউ কেউ আবার বলছে,“বাঁচা গেল। মেয়েটা এই অবস্থায় নিজেও কষ্ট পাচ্ছিলো। মায়েরও কষ্ট হচ্ছিলো। মা রা যাওয়ায় অন্তত দু’জনার কষ্টটা দূর হলো। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।”
এটা শুনে অনেকেই সম্মতি জানায়। তবে মায়ের মন কী তা শোনে? মা তো মায়ই হয়। সন্তান যেমনই হোক তার কাছে তার সন্তান ছিলো। একজন সুস্থ সন্তানকে হারালে মায়ের যেমন বুক পুড়ে তেমনই অসুস্থ সন্তানের জন্যও পুড়ে। এসব বুঝে সবাই তাদের থামিয়ে দেয়। যা হওয়ার হয়েছে। এখন এসব নিয়ে কথা বলে মায়ের মনে আর কষ্ট না দিক।
তাদের এসব কথোপকথন মন দিয়ে শুনলো মেঘা। তবে তার চোখে অন্যকিছু ভাসছে। মৃ ত শিউলির মুখের প্রতিচ্ছবি তার চোখে ভাসছে। তার মুখের উপর কেমন একটি দাগ ছিলো। মনে হচ্ছিলে বেশ খানিকটা সময় মুখ চেপে ধরা হয়েছিলো। ঐ দাগটির জন্যই মেঘার মনে সন্দেহের জন্ম হয়। তার মনে হয় শিউলির এই মৃ ত্যু স্বাভাবিক নয়। তবে সবাই এটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নেয়। মেয়েটা অসুস্থ ছিলো, মা রা গিয়েছে। এখানে কোন প্রশ্ন আসতেই পারে না। তবে মেঘা এটাকে স্বাভাবিক নিতে পারছে না। তার ভাবনার মাঝে শিউলির মৃ তদেহ গোসলের জন্য নেওয়ার কথা উঠে। এই সময়ে একজন বলে উঠে,“গোসল করাবে কে?”
“আমি।”
আগ বাড়িয়ে কথাটি বলে শিউলির মামী। অর্থাৎ সুফিয়া বেগমের ভাবী। মেঘা অবাক চোখে তার দিকে তাকায়। একটু আগে সুফিয়া আহাজারি করে বলেছিলো,“দূর্গন্ধ সহ্য হতো না বলে তার ভাবী অর্থাৎ শিউলির মামী তার দিয়ে যাওয়া খাবারটা অব্দি শিউলিকে দিতো না। সেই খাবার হাস মুরগীকে দিয়ে বলতো শিউলিকে দিয়েছে।”
সেই মানুষটি নিজ থেকে মেয়েটার গোসলের দায়িত্ব নেয়। যদিও সঙ্গে আর একজন থাকবে। তবে এই বিষয়টাও মেঘার কাছে স্বাভাবিক লাগে না। তার সন্দেহ হয়। তার মনে হয়, এখানে কিছু একটা রয়েছে যেটা কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
★
শিউলিকে গোসলের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সুফিয়া তার পিছনে যেতে নিলে অন্যরা ধরে। সুফিয়া বলে,“আমার সোনার থেকে আমাকে দূরে করো না। আমাকে একটু তার কাছে যেতে দাও। আমি যত্ন নিয়ে তারে একটু গোসল করিয়ে দেই।”
“তোমার অবস্থা ভালো না আপা।
তুমি পারবে না ওর গোসল সঠিকভাবে করাতে। তুমি এখানে থাকো। যতই হোক তুমি মা। মেয়ের নিথর দেহ দেখে সহ্য করতে পারবে না।”
এটা বলে শিউলির মামী সবাইকে অনুরোধ করে তাকে সামলানোর জন্য। সবাই সেটাই করে। তার কথাই সঠিক। সুফিয়া ঠিক নেই। তার গোসলের স্থানে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু সুফিয়া কারো কথা শুনতে চায় না। সে বলে,“তোমরা আমারে যেতে দাও। ওদের ঘৃণা হবে আমার মেয়েকে দেখে। ওরা আমার মতো যত্ন নিয়ে আমার মেয়েকে গোসল করাতে পারবে না গো। ওদের নাকে গন্ধ লাগবে। গন্ধ লাগবে।”
কথাগুলো বলে সে গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। আশেপাশের সবাই তাকে সামলানোর চেষ্টা করে৷ মেঘার কিছু প্রশ্ন ছিলো তবে সেটা এখন সুফিয়াকে করা সম্ভব নয়। তাই সে দমে যায়। তবে সে তার যে অন্যরকম সন্দেহ হচ্ছে এটা তার স্বামীর সঙ্গে বলে। সে এটা গুরুত্ব না দিয়ে বলে,“ধুর। এই মেয়েটার মুখ আবার কে চেপে ধরবে? যেখানে সে একাই সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকে। হয়তো মা রা গিয়েছে বলে কালচে দাগ ফুটে উঠেছে৷ এমন অনেক সময় হয় তো।”
মেঘা তার স্বামীর কথা শুনে কিছুটা ভাবনায় পড়ে যায়। এটা দেখে তার স্বামী শান্ত গলায় বলে,“এখানে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তুমি বেশি ভেবো না তো। আসলে মেয়েটা অসুস্থ ছিলো, এটা দেখে তোমার খুব মায়া কাজ করছে। তাই তার মৃ ত্যুটা মেনে নিতে পারছো না।”
“তাই হবে হয়তো।”
মেঘা এটা বলে মাথা নাড়ায়। তারও মনে হয় সে হয়তো একটু বেশিই ভাবছে। মামীর বিষয়টাও এটাই। বেঁচে থাকতে মূল্য দিতে পারেনি। তাই এখন ম রে যাওয়ায় মায়া দেখাচ্ছে। এমনই হবে। সে একটু বেশি ভাবছে। তবে আসলেই কী বেশি ভাবছে?
’
’
চলবে,
