Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"দৃষ্টির আলাপনদৃষ্টির আলাপন পর্ব-২৬+২৭

দৃষ্টির আলাপন পর্ব-২৬+২৭

#দৃষ্টির_আলাপন
#পর্বঃ২৬
#আদওয়া_ইবশার

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে এসেছে। এবার শুধু কিছু মুহূর্তের অপেক্ষা। এরপরই দুজন ভালোবাসার মানুষ বাঁধা পরবে পবিত্র বন্ধনে। দুটানা অনুভূতিতে ঠাসা দুরু দুরু বুকে লাল টুকটুকে বউ সেজে প্রণয় পুরুষের অপেক্ষায় ইতি। ভালোবাসার মানুষটাকে চিরসঙ্গী হিসেবে আপন করে পাবে ভেবে যেমন আনন্দের বন্যা বইছে মনে, ঠিক তেমনই ভবিষ্যৎ চিন্তায় বক্ষমাঝে অজানা কিছু ভয় দানা বেঁধেছে আনন্দের পাশাপাশি। কতক্ষণ পরেই বাইরে শোরগোল শোনা যায় ‘বর এসেছে’। কথাটা শোনা মাত্রই অস্থিরতা বেড়ে যায় ইতির। বুকের ধুকপুক শব্দটা দ্বিগুণ হয়। হাজার অনুভূতির মিশেলে পৃষ্ট হৃদয়ে স্বাদ জাগে প্রিয় মানুষটাকে বর বেসে এক নজর দেখে চোখের তৃষ্ণা মিটাতে। নব বধূর লজ্জার আস্তরণে হৃদয়ের চাওয়া টুকু হেরে যায়। চুপচাপ অশান্ত হৃদয়ে প্রহর গুণে যায়, কখন দুজনার তীব্র অপেক্ষার অবসান ঘটবে? কখন দুজন দুজনকে সকলের সম্মতিতে কবুল পড়ে আপন করে নিবে। পরক্ষনে আবার ভাবনারা বদলে গিয়ে বুকে জমে বিষাদ। জন্ম থেকে পাওয়া আপন মানুষ,আপন ভিটে সমস্ত কিছু পর করে চলে যেতে হবে এ বাড়ির মায়া ছেড়ে। এমন ভাবনায় খুশী গুলো মলিন হয়ে তীব্র কষ্টে ছেয়ে যায় নব বধূর মন।

নতুন বরকে দেখার আশায় ইতির পাশে বসে থাকা সকলেই ছুটে যায়। থেকে যায় শুধু দৃষ্টি। চারিদিকে সকলের মনের মাঝে বিয়ে উপলক্ষে আনন্দ উচ্ছ্বাসের ছড়াছড়ি থাকলেও মনের কোণে মেঘ জমেছে দৃষ্টির। সকলের আনন্দ উল্লাস যেন তার কাছে বিষের মতো ঠেকছে। রক্তিমের কথায় দেহে আঘাতের চিহ্ন না হলেও মনে বিশাল আচড় কেটেছে। আঘাতে জর্জরিত মন ভিষণ বাজে ভাবে অসুখে ভোগছে। এমন অসুস্থ মন নিয়ে কি আর আনন্দে মেতে থাকা যায়? তবুও মুখে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে মুখ বোঝে সমস্ত কিছু সহ্য করে যাচ্ছে দৃষ্টি। তবে ভুল করেও গতকালের পর আর রক্তিমের চোখের সামনে পরেনি। পাষাণ পুরুষের প্রেমে পাগল প্রায় দৃষ্টি এবার দাঁতে দাঁত চেপে মনকে শাসিয়েছে। প্রতিজ্ঞা করেছে আর অপমানিত হতে যাবেনা ঐ মানুষটার সামনে। যতদিন পযর্ন্ত পাষাণটা নিজে থেকে দৃষ্টিকে কাছে না ডাকবে ঠিক ততদিন পযর্ন্ত প্রয়োজনে বেহায়া মনকে শিকল পরিয়ে হলেও ঐ পাষান্ডটার থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। এমন একটা শক্ত প্রতিজ্ঞা করার মাঝেও দৃষ্টির বেলাজ,বেহায়া মনটা লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে প্রশ্ন করে বসে, “ঐ পাষাণ শিকদার যদি কখনো তোকে নিজ থেকে কাছে না ডাকে! তবে কি তাকে ছেড়ে যাবি?” বিপরীতে দৃষ্টি নিজেই নিজেকে শাসিয়ে মনের ভাবনা গুলোকে পাত্তা না দেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে বিরবিরিয়ে বলে,
“যদি ঐ পাষাণটা তাকে কখনো না ডাকে,তবে সে বুঝে নিবে ঐ মানুষটা সত্যিকার অর্থেই হৃদয়হীন। হৃদয় নেই দেখেই দৃষ্টি নামক আস্ত এক ভালোবাসার খনিকে সে উপেক্ষা করতে পেরেছে। দৃষ্টিও মস্ত বড় পাপ করেছে এমন হৃদয়হীন পুরুষকে নিজের কোমল মন দিয়ে। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই ধরে নিবে ভালোবাসার মানুষের অবহেলা।সবাই ভালোবেসে সুখ পায়। সে না হয় দুঃখই পেল। এক জনম হাসি মুখে বুকে দুঃখ লুকিয়ে পাড় করে দিল ভালোবাসা নামক পাপের শাস্তি ভোগ করে।”

বর বেশে মেহেদী শিকদার মঞ্জিলে পা রাখার পর কিছু নিয়ম পালন শেষেই ধুম পরে যায় খাওয়া-দাওয়ার। বাড়ির সবথেকে ছোট সদস্যের বিয়ে। এই বিয়েতে কি কোনো আয়োজনের কমতি রাখা যায়? একপ্রকার বলা চলে এটাই শিকদার বাড়ির শেষ বিয়ে। নিজের ছেলের প্রতি আজীজ শিকদারের খুব একটা ভরসা নেই। ঐ অনুভূতিহীন রোবট মানব আদও কখনো বাবা ডাক শুনবে কি না কে জানে। সেখানে তার ভবিষ্যৎ ছানাপোনার বিয়ের খাবার আশা করাটা একপ্রকার বিলাশীতা। সেই চিন্তা করেই মনের সবটুকু শখ-আহ্লাদ ঢেলে পুরো শহর জানিয়ে ধুমধাম আয়োজন করেছে ছোট মেয়ের বিয়েতে। ঐ পাথুরে মনের রোবট মানব ছেলেটা যা কির্তী শুরু করেছে, নাতি-নাতনির বিয়ে দূরের কথা, দাদা ডাক শোনার আশায় মনে হয় বাদ দিতে হবে খুব শিগ্রই। মাঝে মাঝে আজীজ শিকদার নিজেকে অপরাধী ভাবতে বাধ্য হয় এই ভেবে, দৃষ্টি নামক মিষ্টি ফুলটাকে তার অনুভূতিহীন ছেলের সাথে জড়িয়ে দিয়ে মেয়েটার জীবনটাই না নষ্ট করে দিল। কিন্তু ওনারই বা আর কি করার আছে? দৃষ্টির বাবা-মায়ের সাথে সৈন্যসমেত একপ্রকার যুদ্ধ করে ছেলেটাকে বিয়ে করিয়ে এনেছিল। ভেবেছিল মেয়েটার সাথে থাকতে থাকতে নিশ্চয়ই ঐ পাষাণের মন গলবে। কিন্তু হচ্ছে তার বিপরীত। তবুও কিছুই করার নেই। বাবা হয়ে তো আর ছেলের বৈবাহিক জীবনে নাক গলাতে পারেনা সর্বক্ষণ।

খাওয়া-দাওয়া শেষে কতক্ষণ খোশগল্পে বিয়ে বাড়ি মাতিয়ে রাখে মুরুব্বিরা। কথায় কথায় জানা যায় আগেভাগে আজীজ শিকদার দেনমোহরের বিষয়টা পরিষ্কার করেননি। বিয়ের মুহূর্তে এসে তিনি বলছেন ছেলে খুশি হয়ে যা দিবেন তাই তারা মেনে নিবে। পরক্ষনেই মেহেদীর বাবা-বড় ভাই জানায় দশ লক্ষ টাকা দেনমোহর দিবেন তারা। কথাটা রক্তিমের কানে পৌঁছাতেই প্রতিবাদ করে ওঠে। সরাসরি মেহেদীর সামনে গিয়ে জানতে চায়,

” স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর ফরজ কাজ। তোর যত টাকা পরিশোধ করার সামর্থ্য আছে তত টাকায় দেনমোহর ধার্য করবি। এর বেশি এক টাকাও না।”

রক্তিমের কথাটা উপস্থিত অধিকাংশ মানুষের পছন্দ হয়নি। প্রায় অর্ধেকেই ভাবছে ছেলের বাবা-ভাই যখন চাচ্ছে তখন মেয়ের ভাই হিসেবে সে কেন বিরোধীতা করবে? মেয়ের ভাই হিসেবে তো তার আরও মোটামুটি বড় একটা অংকের দেনমোহর দাবী করে বোনের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কথা। সেখানে কি না উল্টো সে আরও বাগরা দিচ্ছে। বিষয়টা মেহেদীর বাবা নিয়াজ সাহেবের পছন্দ হয়নি। মনে মনে ভাবেন সারা বছর গুন্ডা মাস্তানি করে নিজের সাথে ওনার ছেলেটার ভবিষ্যৎ ও নষ্ট করেছে। এখন আজ আবার সে নিজেই সামর্থ্য খোঁজতে আসছে। সে কি জানেনা মেহেদী বেকার! নিজেই এখনো বাপের-ভাইয়ের ঘাড়ে বসে খায়।সেখানে বউয়ের দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করবে কিভাবে? রক্তিমের এটা ভাবা উচিৎ ছিল মেহেদীর বাবা-ভাই যখন বলছেন তখন তারাই পরিশোধ করবে দেনমোহরের টাকা। মনে মনে রুষ্ট হলেও মুখে প্রকাশ করেননা নিয়াজ সাহেব। মুখে মেঁকি হাসি ফুটিয়ে বললেন,

“দেখো বাবা! তুমি তো জানোই আমার ছেলে বেকার। সব জেনেই তোমরা আমার ছেলের সাথে তোমার বোনের বিয়ে দিতে চাইছো। আমার ছেলে বেকার হলেও কখনো তোমার বোনের কোনো চাহিদা অপূর্ণ থাকবেনা। আল্লাহ আমাকে যথেষ্ট অর্থবিত্ত দান করেছেন। আমার ছেলে সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে খেলেও তা কমবেনা। তেমন দেনমোহরের টাকাও দশ লক্ষ কেন বিশ লক্ষ হলেও অপরিশোধ্য থাকবেনা। পুত্রবধূর ভরন-পোষনের দায়িত্ব যেমন আমি নিব। তেমন তার দেনমোহরের টাকাও আমি পরিশোধ করব।”

এমন একটা জবাবে মুহূর্তেই চটে যায় রক্তিম। তবে বোনের বিয়েতে কোনো ঝামেলা হোক চায়না বিধায় শান্ত ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টায় বলে,

“কিন্তু আমি চাই আমার বোনের দেনমোহর তত টাকায় হবে যত টাকা তার স্বামী নিজে পরিশোধ করতে পারবে। ছেলেটা আপনার হলেও তার সম্পর্কে জানার মাঝে অল্প ভুল করেছেন। আমার সাথে থেকে গুন্ডামি করেও ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারটা খুব ভালো করেই আয়ত্ব করে নিয়েছে আপনার ছেলে। যা আপনার অজানা। সুতরাং আমার মনে হয় স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করার মতো সামর্থ্য তার আছে। তাই আমি তার মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছি কত টাকা দিলে সে পরিশোধ করতে পারবে। আর একটা কথা। আমার বোনের ভরন-পোষনের দায়িত্বটাও আপনাকে নিতে হবেনা। এটাও আপনার ছেলে নিতে পারবে। বন্ধু হিসেবে এতোটুকু বিশ্বাস আমার তার উপর আছে।”

ছেলের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হাসেন আজীজ শিকদার। নিয়াজ সাহেবকে মানাতে বিনয়ী স্বরে বলে,

“বিয়াই সাহেব!লোক দেখানো অল্প সু-নামের জন্য লাখ লাখ টাকা দেনমোহর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না। হাদীসেও এটাই বর্নিত। স্বামীর যতটা সামর্থ্য আছে সেই হিসেবেই দেনমোহর ধার্য্য করা। আপনার ছেলের যদি এক টাকা দেওয়ার সামর্থ্য হয় আমি তাতেও খুশী। ঐসব দেনমোহর বড় বিষয় না। বড় বিষয় হলো আমার মেয়ের সুখ। আপনার ছেলের সাথে আমার মেয়ে সুখে থাকলেই হবে। আর কিছুই চাইনা।”

এক কথা, দুই কথায় কখন না জানি বড় কোনো ঝামেলা বেঁধে যায়। সেই ঝামেলার জের ধরে না আবার পেয়ে গিয়েও প্রেয়সীকে হারিয়ে ফেলতে হয় ভয় হয় মেহেদীর। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত বলে ওঠে,

“দেড় লাখ টাকা দিতে পারব আমি। আব্বা প্লিজ! আর কোনো অমত করবেন না। আমিও চাই আমার স্ত্রীর দেনমোহর আমার নিজের টাকায় পরিশোধ করব।”

ছেলের সোজা জবাবে আধার ছেয়ে আসে নিয়াজ সাহেবের মুখে। ভাবে লোক-সমাজে কতটা অসম্মান হবে তার। পাড়া-প্রতিবেশী সবাই বলবে লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েও ফকিরের মতো সামান্য কয়টা টাকা দেনমোহর দিয়ে ছেলের বউ ঘরে তুলেছে। তবে এই মুহূর্তে কিছু বলাও যাবেনা। ছেলেই যেখানে ভরা মজলিসে সম্মতি দিয়ে দিয়েছে। সেখানে নিয়াজ সাহেব অমত পোষণ করলে বিষয়টা বিচ্ছিরি হয়ে যাবে। সেই ভেবেই সম্মতি দিয়ে দেয়।

বিয়ের আসল কার্যক্রম শুরু হয়। ইতিকে নিচে নিয়ে আসার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। বিয়ের ভারী ল্যাহেঙ্গার কিছুটা ভার একপাশে উঁচিয়ে ধরে ননদিনীকে সার্পোট দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নিয়ে আসে দৃষ্টি। শিকদার বাড়ির ছোট রাজকন্যার নব রূপে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে উপস্থিত সকলেই।শিকদার বাড়ির মেয়ের পাশাপাশি তার পাশে থাকা বউয়ের রূপের প্রশংসার গুঞ্জন সৃষ্টি হয় গুটিকয়েক আত্মীয়র মাঝে। শত মানুষের ভীরের মাঝেও প্রয়সীর বধূ রূপে থমকায় মেহেদী। তাকে এভাবে মুগ্ধ হয়ে এক নজরে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঠাট্টা-হাসির রোল পরে যায় মুহূর্তে। মেহেদীর সেদিকে কোনো ধ্যান জ্ঞান নেই। পাত্তা দেয়না কারো হাসি ঠাট্টা।তার এতো বছরের প্রেম সাধনা আজ পূর্ণতা পেতে চলেছে। তার প্রেয়সী তার জন্যই আজ নিজের সমস্ত রূপ উজাড় করে সেজেছে। তবে সে দেখবেনা তো কে দেখবে? মেহেদীর এমন নির্লজ্জ চাহনী চোখ তুলে একবার তাকিয়ে দেখেই লজ্জায় নতজানু হয় ইতি।নিচে নেমে রক্তিমকে দেখতে পেয়ে বর কনে দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে দূরে সরে যায় দৃষ্টি। মুহূর্তেই শান্ত হয়ে ওঠে পরিবেশ। সকলের মনযোগ কাজীর কথায়।বিয়ের কার্যক্রম শুরু করে কাজী। মেহেদীর উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বলে ওঠেন,

” দেড় লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনি নিয়াজ উদ্দিন সাহেবের ছোট পুত্র মেহেদী হাসান, এমপি আজীজ শিকদারের ছোট কন্যা ইসরাত ইতিকে বিবাহ করিতে রাজি থাকলে বলুন ‘আলহামদুলিল্লাহ কবুল’।

নিরব পরিবেশে উপস্থিত সকলেই উৎসুক দৃষ্টিতে মেহেদীর দিকে তাকিয়ে। অপেক্ষায় তার মুখ থেকে কবুল শব্দটা শোনার। কারো দিকে না তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে এক পলক রক্তিমের দিকে তাকায় মেহেদী। রক্তিম নির্বাক। কাটকাট ভঙ্গিতে বুকে হাত গুজে বোনের পাশে দাঁড়িয়ে। মেহেদীকে তার দিকে তাকাতে দেখেও কোনো নড়চড় হয়না। বরং আগের থেকেও শাণিত হয় চোখের দৃষ্টি। মেহেদী নিজে থেকেই ভেবে নেয় রক্তিমের ঐ কঠোর দৃষ্টির মানে। চোখের চাহনীতেই গুন্ডা শিকদার তাকে জানিয়ে দিচ্ছে,

“আমার বোনের মুখে আজীবন হাসি ফোটানোর দায়িত্ব নিতে পারলেই কবুল বলবি। নইলে না। বিয়ের পর যদি কোনোদিন বোনকে কাঁদতে দেখি তবে সেদিনই হবে তোর শেষ দিন।”

রক্তিমের চোখের ভাষা বুঝতে পেরে নড়েচড়ে বসে মেহেদী নিজেও আত্মবিশ্বাসের সাথে তাকায় তার চোখে। বুক ফুলিয়ে একটা দম নিয়ে সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বলে ওঠে,

“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”

সাথে সাথে কেঁপে ওঠে ইতি। ভালো লাগার এক শীতল শিহরণ বয়ে যায় পুরো শরীরে। পরপর তিনবার মেহেদীর কবুল পড়া শেষে সকলেই উৎসুক নজরে তাকায় ইতির দিকে। সুখ-দুঃখের অদ্ভূত এক সংমিশ্রনে একটু সময় নিয়ে ইতি নিজেও তিনবার কবুল বলে প্রণয় পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। হাসি ফোটে ওঠে সকলের মুখে। বিদাইয়ের সুর বাজতেই কান্নার রুল পরে শিকদার বাড়িতে। বাবার আদরের রাজকন্যা, মায়ের আদরের দস্যি মেয়ে, ভাইয়ের আদরের ছোট্ট বোনটা সমস্ত সম্পর্ক পিছনে ফেলে স্বামীর হাত ধরে পা বাড়ায় নতুন সংসারে। নিজের বাড়ি নিজের মানুষ গুলোকে ছেড়ে যেতে ফুট ফাঁটে ইতির। কান্নায় মুর্ছা যায়। তবুও সব বন্ধন ছিন্ন করে যেতে হয় নতুন জীবন সাজাতে।

****
বর যাত্রী বিদায় নিতেই খুব কাছের দুই-একজন আত্মীয় ছাড়া অন্যরাও একে একে বিদায় নেয়। মানুষে গমগম করা শিকদার মঞ্জিল আবারও নির্জীব হয়ে ওঠে। চারিদিকে অদ্ভূত নিরবতা গ্রাস করে নেয়। শিকদার বাড়ির প্রতিটা মানুষের জীবনে নেমে আসে মন খারাপের রাত্রি। খেয়েদেয়ে নিজের মতো করে নিশ্চুপ হয়ে ইতির রুমে শুয়ে পরে দৃষ্টি। মাত্র তিনদিনের পরিচয়েও আজ ইতির বিদায়ে অদ্ভূতভাবে মন খারাপ অনুভব করে দৃষ্টি। চোখের তারাই ভেসে ওঠে তার সেই বিদায় মুহূর্তের দৃশ্য। আজ যেভাবে ইতি বিদায় নিল বাড়ি ছেড়ে সেভাবেই তো তার বিদায় হয়েছিল। পরমুহূর্তে মনে পরে, উঁহু এভাবে না। ইতি বধূ বেসে সকলের সম্মতিতে ধুমধাম অনুষ্টানের মধ্য দিয়ে স্বামীর হাত ধরে বিদায় নিয়েছে। আর সে তো মা-বাবা’কে কষ্ট দিয়ে সাধারণ ঘরে পরা থ্রি-পিস পরে শশুরের হাত ধরে বিদায় নিয়েছিল। বউ সাজে স্বামীর হাত ধরে যেমন বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি আসার ভাগ্য হয়নি তার। তেমনই এখনো স্বামীর ভালোবাসা পাবার ভাগ্যটাও হয়নি। আদও হবে কি না সেটাও জানা নেই। অলস মস্তিষ্ক এমন হাজারটা ভাবনা চিন্তার উৎপাত ঘটিয়ে মন খারাপের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় দৃষ্টির। অর্ধরাত পর্যন্ত নির্ঘুম কাটে। আজানের আগ মুহূর্তে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে ভাবনা ঘর বন্ধ করে। ঘুম নামে দুই চোখে। মনে হয় সবেই চোখ দুটো লেগেছে। এর মাঝেই কানে ভাসে নিচে থেকে শোরগোল এর আওয়াজ আসছে। কিছুটা বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেলা দশটা। হুড়মুড়িয়ে ওঠে বসে দৃষ্টি। শশুর বাড়িতে নতুন বউ হয়ে এতো বেলা অব্দি ঘুমাচ্ছে সে! না জানি উপস্থিত গুটিকয়েক আত্মীয় কত মন্দা রটাচ্ছে। কথাটা ভেবেই ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতে উদ্যত হয়। সময় গড়ানোর সাথে সাথে নিচে থেকে আসা আওয়াজ তীব্র হয়। সাথে বাড়ে দৃষ্টির পায়ের গতি। সিঁড়ির কাছে গিয়ে নিচের দৃশ্য দৃষ্টিকোণ হতেই থমকে যায় দৃষ্টি। তিন-চারজন পুলিশ ঘিরে ধরেছে রক্তিমকে। নিশ্চল মস্তিষ্কে কতক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে থেকে আচমকায় ক্রস্ত পায়ে নিচে নামতে নামতে চেঁচিয়ে ওঠে,

“কি হয়েছে এখানে? পুলিশ কেন বাড়িতে?”

দৃষ্টির উপস্থিতি টের পেয়ে শিকদার মঞ্জিলের সকলেই তটস্থ হয়। রেহানা বেগম দ্রুত দৃষ্টির কাছে এসে তাকে ফের উপরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে বলে,

“কিছুই হয়নি। বাড়ির নতুন বউ তুমি। এসব ঝামেলা দেখতে হবেনা। তোমার শশুর আছেন, ওনি সবটা সামলে নিবে। আমার সাথে রুমে চলো তুমি।”

শাশুড়িকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে জোর খাটিয়ে নিচে নেমে আসে দৃষ্টি। রক্তিমের সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত হয়ে প্রশ্ন করে,

“কি হয়েছে বলুন আমাকে। পুলিশ কেন এসেছে? আর আপনাকেই বা এভাবে ঘেরাও করে রেখেছে কেন? কি করেছেন আপনি? আবার কোথাও মারামারি করেছেন?”

দৃষ্টির অস্থিরতা দেখে একজন পুলিশ অফিসার আজীজ শিকদারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “ওনি কে?” উত্তরে চিন্তিত আজীজ শিকদার গম্ভীর স্বরে জানায়,

“আমার ছেলের স্ত্রী।”

একটু থেমে আবারও উদগ্রীব হয়ে বলে,

“দেখুন অফিসার, কেইস রি-ওপেন হয়েছে এর কোনো নোটিশ আমরা পাইনি। এভাবে হুট করে এসে সেই মান্দাতার আমলের ডিসমিস হয়ে যাওয়া কেসের সূত্র ধরে আমার ছেলেকে নিয়ে যেতে পারেন না। কেস যদি রি-ওপেন হয়েও থাকে তবে আমরা কেন নোটিশ পাইনি? এর জবাব আগে দিন আমাদের।”

“তা তো আমরা জানিনা স্যার। উপর মহল থেকে আমরা অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট পেয়েই এসেছি। আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে। আপনি যদি বাঁধা দিতে আসেন তবে হয়তো বিষয়টা আরও জটিল হবে। বুঝতেই পারছেন আপনার ছেলে মার্ডার কেসের আসামি। এই মুহূর্তে আপনি বাঁধা দিয়ে কিছুই করতে পারবেন না। উল্টো আপনি নিজেও একজন খুনিকে সাপোর্ট করার অপরাধে এমপি পদ হারাতে পারেন।”

অফিসারের কথা গুলো শোনা মাত্রই যেন দৃষ্টির মাথায় মস্ত বড় আকাশটা ভেঙ্গে পরে। অনুভূতি শূণ্য নিস্তেজ কন্ঠে জানতে চায়,

“কিসের মার্ডার কেস?”

“প্রায় আড়াই বছর আগে আপনার স্বামী ওনার প্রথম স্ত্রী জেরিন এবং ভাই সংগ্রাম শিকদারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। সেই কেসে তখন আপনার শশুর মিথ্যে প্রমাণ দিয়ে ছেলেকে নির্দোষ প্রমাণ করে ছাড়িয়ে এনেছিল। কিন্তু সেটা জেরিনের পরিবার মেনে নেয়নি। ওনারা আবার নতুন করে কেস ওপেন করেছে।”

চলবে…..

#দৃষ্টির_আলাপন
#পর্বঃ২৭
#আদওয়া_ইবশার

মানুষের জীবন কখন কোন দিকে মোড় নেয় কেউ বলতে পারেনা। সুখ, দুঃখ এই দুটো জিনিস মনে হয় একে অপরের পরিপূরক। না হয় কি সুখের মুহূর্ত গুলো শেষ হতে না হতেই মানব জীবনে দুঃখ এসে হাজির হতো? শিকদার মঞ্জিলের বিয়ের সাজ এখনো মুছেনি। চারিদিকে এখনো উৎসবমোখর আমেজ। সেই আনন্দঘন মুহূর্ত শেষ হবার আগেই ঝুমঝুমিয়ে ঝরে পরল দুঃখের বর্ষণ। যেই কালো অতীত মা-ছেলের মাঝে দূরত্বের দেয়াল সৃষ্টি করেছিল। আজ সেই দেয়াল ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতেই সেই কালো অতীত আবারও হানা দিল। সুখের সানাই শেষ হবার আগেই বেজে ওঠল দুঃখের সানাই।

আজীজ শিকদার কোনো যুক্তি, তর্ক দেখিয়েও ছেলেকে আটকে রাখতে পারেননি। বিভীষিকাময় ঘুমিয়ে থাকা সেই অতীত জাগ্রত হয়ে নিয়ে গেল চৌদ্দ শাকের ভিতর। বিবশ চোখে চেয়ে দৃষ্টি শুধু দেখে গেল তার প্রণয় পুরুষ, যে পুরুষের প্রেমে মজে পরিবার ছেড়ে এতোদূর এসেছে, হাজার লাঞ্চনা সহ্য করছে সেই পুরুষের হাতে হায়কড়া পরিয়ে পুলিশ খুনের আসামী হিসেবে নিয়ে গেল। রেহানা বেগম ছেলের এমন বিপদে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। ছেলের শোকে কান্নায় মূর্ছা যাবার অবস্থা। একদিকে পুরোনো কেসের সূত্র ধরে ছেলেকে নিয়ে গেল পুলিশ, অন্যদিকে পুত্রবধূর থমকানো চেহারা, স্ত্রীর কান্না, সব মিলে আজীজ শিকদার দিশাহারা। কি রেখে কি করবে, কাকে সামলাবে মস্তিষ্ক ঘেটে গিয়ে কিছুই ঠাহর করতে পারছেনা। প্রায় আড়াই বছর পর কেনই বা শেষ হয়ে যাওয়া কেস আবার শুরু হলো সেটাও ভেবে পাচ্ছেনা। জেরিনের বাবার বাড়ির লোক বলতে তো একমাত্র জেরিনের মা, মামারা আছেন। ওনারা যদি আড়াই বছর আগের রায়ে সন্তুষ্ট না থাকতেন তবে কি আরও আগেই এই কেস নতুন করে শুরু করার কথা ছিলনা?বছরের পর বছর চলে যাবার পর তারা কেন এটা নিয়ে পরবে? এর পিছনে কি অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে?পেছন থেকে কি অন্য কেউ কলকাঠি নাড়ছে?একের পর এক ভাবনায় মস্তিষ্ক অসাঢ় আজীজ শিকদারের। তবুও কোনো সুরাহা করতে পারছেনা।

“বাবা! ওনি কি সত্যিই খুন করেছিল?”

ভাবনার অতলে ডুবে থাকা আজীজ শিকদার হুট করে পুত্রবধূর মুখে এমন একটা প্রশ্নে থমকে যায়। শীতল চোখে কতক্ষণ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করে মেয়েটার মনে কি চলছে। কিন্তু ব্যর্থ হয় আজীজ শিকদার। কেমন যেন প্রাণহীন হয়ে গেছে মেয়েটা। চোখের সামনে স্বামীকে এভাবে ধরে নিয়ে যেতে দেখেও কান্না দূরের কথা, কোনো নড়চড় পযর্ন্ত করেনি। প্রলম্বিত নিঃশ্বাস ছেড়ে আজীজ শিকদার প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে বললেন,

“যে হাত দেশের জন্য অস্ত্র ধরেছে, অসহায় মানুষের দুঃখ মুছে দিয়েছে,অনাহারীর মুখে খাবার তুলে দিয়েছে,সেই হাত কখনো খুন করতে পারেনা। আমার ছেলে খুনি না।”

“তবে কেন সবাই বলে নিজের স্ত্রী,ভাইকে খুন করেছে রক্তিম শিকদার? কেন খুনি বলে মানুষজন তাকে?খুনের দায়ে আজ কেনই বা পুলিশ ধরে নিয়ে গেল? এতো ধোয়াশার মাঝে আমাকে কেন রাখছেন আপনারা? আমার স্বামীর সম্পর্কে জানার অধিকার কি আমার নেই? কি সেই অতীত, যে অতীতের সূত্র ধরে আজ আমার স্বামী খুনি? সে যদি খুন না করেই থাকে তবে আপনার ছেলে সংগ্রাম কিভাবে মারা গেছে? আর আপনার বড় ছেলের প্রথম স্ত্রী! ওনিই বা কিভাবে মারা গেছে? দয়া করে আমাকে আর ধোয়াশার মাঝে রাখবেন না। আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”

নিস্তেজ কন্ঠস্বর একসময় চওড়া হয় দৃষ্টির। প্রতিটা কথায় তার অতীত জানার প্রবল জেদ। যে অতীতের জন্য রক্তিম শিকদারকে স্বামী হিসেবে পেয়েও পেলনা সেই অতীত আজ যেকোন মূল্যে সে জানবেই। পুত্রবধূর এমন দৃঢ় স্বরের প্রশ্নে একটাও ঘাবড়ায়না আজীজ শিকদার। কন্ঠস্বর আগের থেকেও নরম করে বলে,

“ঠিক সময়ে সব জানতে পারবে মা। একটু ভরসা রাখো এই বাবার উপর। আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে, খুব বেশিদিন আমার ছেলেকে আমি জেল খাটতে দিবনা। সঠিক সময়ে সবার সামনেই সব সত্য প্রকাশ পাবে।”

“কোন সত্য?” জানতে চায় দৃষ্টি। আজীজ শিকদার দৃষ্টির মেঝের দিকে রেখে গম্ভীরভাবে বলে ওঠে,

“যে সত্য এতোদিন নিজের মাঝে চেপে রেখেছি। সেই সত্য।”

****
কোনো ঘটনা ঘটতে দেরি হলেও রটতে দেরি হয়না। ঝড়ের গতিতে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পরেছে পুরোনো কেসের দায়ে রক্তিম শিকদারকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কথাটা পুরো এলাকায় জানাননি হতে হতে একসময় পৌঁছে দৃষ্টির খালা শিউলি বেগমের কানে। সেখান থেকে ময়মনসিংহ খবর পৌঁছাতে খুব একটা সময় লাগেনা। সাদেক সাহেব, দিলশান আরা দুজনেই এমন একটা খবর শুনে স্থির থাকতে পারেনি। সেদিনই ছুটে আসে সাভার মেয়ের কাছে। বাবা-মায়ের দেখা পেয়ে এবার যেন দৃষ্টির ভিতরে চলা ভাংচুর প্রকাশ পায় চোখের জলে। মায়ের পায়ের কাছে বসে করুণ আর্তনাদের সাথে বলতে থাকে,

“তোমার অমতে সেদিন ওনাকে বিয়ে করাই তুমি আমাকে অভিশাপ দিয়েছিলে মা? তোমাকে কাঁদিয়ে আমি একটুও ভালো নেই মা। বিয়ের পর থেকে একটা রাতও আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারিনি। তুমি তো মা! আমি না হয় একটা ভুল করেই ফেললাম। ক্ষমা করে দাওনা আমাকে! আমি আর নিতে পারছিনা এসব। এই অভিশপ্ত জীবনের বোঝা আর বইতে পারবনা। ঐ মানুষটাকে আমি আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। কখন কিভাবে এতোটা ভালোবাসলাম জানিনা আমি। শুধু এটুকুই জানি ঐ মানুষটা ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারিনা। দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। আমার স্বামী খুনের দায়ে জেলে। কথাটা ভাবতেই আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মা। ভিতরটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।মেনে নাও না মা! ক্ষমা করে দাও আমাদের। তুমি ক্ষমা না করলে আমি কখনো শান্তিতে সংসার করতে পারবনা।”

মেয়ের করুণ আর্তনাদে দিলশান আরা’র কঠোর হৃদয় কেঁপে ওঠে। কেঁদে ওঠে মাতৃমন। পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় কান্নারত মেয়ের মুখের দিকে।মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই মেয়েটা শুকিয়ে কি অবস্থা হয়েছে! চোখের নিচের কালো দাগেই প্রমাণ করছে নির্ঘুম রাত কাটানোর। চেহারায় সেই আগের লাবন্যতা আর নেই। আঠারো বছর বয়সেই মনে হয় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের কোনো এক সংসার সামলানো ক্লান্ত নারী। যার দিন শুরু হয় সংসার নামক জাতাকলে পৃষ্ঠ হতে। একমাত্র আদরের মেয়ের এমন করুণ পরিণতি মানতে পারেনা দিলশান আরা। বিয়ে থেকে শুরু করে এখন পযর্ন্ত জমে থাকা সমস্ত রাগ, ক্ষুব বেরিয়ে আসে ঝাঝালো কথার তোরে। দৃষ্টিকে মেঝে থেকে টেনে তুলে দুই বাহু ধরে ঝাকিয়ে বললেন,

“ভালোবাসার মানুষের কাছে সুখে থাকতে এসে এখন কেন এমন দশা তোমার? স্বাস্থ্যের অবনতি, চোখের নিচে কালি, চেহারায় বয়সের ছাপ এসব কেন? কেন চেহারা থেকে সুখ উপচে পরার বদলে দুঃখ ঝড়ছে অশ্রু হয়ে? কিসের কমতি রেখেছিলাম তোমার? টাকা-পয়সা, খাবার-পোশাক, ভালোবাসা কিসের অভাব ছিল আমার ঘরে তোমার? কোন সুখের আশায় এই জীবন বেছে নিয়েছো?একটু খুনির কাছ থেকে কি সুখ আশা করো তুমি যা আমরা দিতে ব্যর্থ! উত্তর দাও। উত্তর দাও আমার প্রশ্নের।”

কোনো প্রতিত্তোর করতে পারেনা দৃষ্টি। চুপচাপ মাথা নত করে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। কান্না ছাড়া যেন এই মুহূর্তে তার মাঝে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মেয়ের নিরবতায় ক্ষেপে যায় দিলশান আরা। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে দৃষ্টির বাহুতে চাপ প্রয়োগ করে আবারও চেঁচিয়ে বলে ওঠে,

“কথা বলছোনা কেন? উত্তর দাও আমার প্রশ্নের। আর যদি উত্তর না থাকে তোমার কাছে, তবে আজ এই মুহূর্তে ঐ খুনির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আমার সাথে যেতে হবে তোমার। হয় আমাকে তোমার সুখ দেখাও না হয় সম্পর্ক চুকিয়ে নাও।”

সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা শুনে দৃষ্টি সহ আজীজ শিকদার, রেহানা বেগম সকলেই চমকে ওঠে। প্রতিবাদ করে ওঠে আজীজ শিকদার,

“এসব কি ধরনের কথা আপা! সম্পর্ক ছিন্ন করবে মানে কি? বিয়ে কি কোনো ছেলে খেলা, যে ইচ্ছে হলো খেলল আবার ইচ্ছে হলো খেলা শেষ করে দিল? সেই প্রথম দিন থেকে আপনি বারবার আপনার কথায় নিজেকে ভুল প্রমাণ করে আসছেন। একজন সম্মানিত কলেজের প্রভাষক হিসেবে এমন কথা-কাজ আপনার মানায়না।”

“সাধারণ জনতা ভেবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পরিবারের অমতে একটা মেয়েকে জোর করে নিজের খুনি ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়াটা কি একজন এমপি হিসেবে আপনার মানায়? অন্য কারো দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকটা ভেবে নিবেন। না হয় নিজের জালে নিজেই ফাঁসবেন। ভাববেন না আমার সাথে অন্যায় করে পাড় পেয়ে গেছেন দেখে সব জায়গায় পাড় পেয়ে যাবেন।”

চোখ বুজে সবটা হজম করে নেয় আজীজ শিকদার। ভুল সত্যিই আজীজ শিকদার নিজেও করেছে। আসলেই দিলশান আরা’কে প্রশ্নবিদ্ধ করার আগে নিজের দিকে তাকানো উচিৎ ছিল। খুব বড় মুখ করে তো দাপট দেখিয়ে মেয়েটাকে ছেলের বউ করে এনেছিল। কিন্তু দুঃখ ছাড়া কিছুই দিতে পারলনা আজ পযর্ন্ত মেয়েটাকে। অথচ জীবনে প্রথম ক্ষমতার অপব্যবহার করে দাপট দেখিয়ে মেয়েটার ভালোবাসার পূর্ণতা দেবার জন্যই নিজের ছেলের সাথে জড়িয়েছিল। ভেবেছিল মেয়েটাও সুখী হবে পাশাপাশি ছেলেটাও হয়তো এবার বদলে যাবে।

“মনের সুখ সবথেকে বড় সুখ মা। আমার রূপ লাবন্যতা দিয়ে কি হবে, যদি আমার মনেই শান্তি না থাকে? ঐ মানুষটার সাথে আমি সুখে আছি। ভালো আছি। মনের দিক থেকে আমি তৃপ্ত। আত্মতৃপ্তি ছাড়া আমি আর কিছুই চাইনা মা। তুমি দয়া করে আর কখনো এসব কথা বলবেনা। খুনি হোক আর যায় হোক। ঐ খুনি রক্তিম শিকদারটাকেই আমি ভালোবাসি। যেখানে পুরো মানুষটাকেই আমি ভালোবাসি, সেখানে তার খুনের অপবাদে কিভাবে আমার ভালোবাসা বদলে যাবে? একমাত্র মৃত্যু ছাড়া ঐ মানুষটার জীবন থেকে আমি কখনো সরবনা মা। তুমিও দয়া করে আমাদের আলাদা করার বৃথা চেষ্টা করোনা। আমাকে ক্ষমা করতে না পারো, সুখী হবার দোয়া করতে না পারো, কোনো অভিযোগ তলবনা তোমার প্রতি। তবুও দয়া করে দুজনকে আলাদা করার বৃথা চেষ্টা করোনা।”

চলবে…..

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ