Tuesday, June 9, 2026







হৃদয়ের টান পর্ব-৫+৬

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৫
​কলমে The Story Haven

​”বাবা…”
​ছোট্ট ঠোঁট দুটো থেকে নিঃসৃত হওয়া ওই একটা শব্দ যেন তীব্র এক ব”জ্রপাতের মতো আমার সমস্ত অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দিল। চার বছর ধরে যে বুকে শুধু কর্পোরেট ফাইলের হিসাব আর মায়ের অহংকারের চাবু ক চলেছে, সেখানে আজ এক নিমিষেই এক মহাসমুদ্রের জোয়ার চলে এল। আমি দরজার চৌকাঠ থেকে ঘুরে তাকালাম। আমার চোখ দুটো তখন আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, বাঁধভাঙা জলের মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
​আমি আবার হাঁটু গেড়ে বসলাম মেঝের ওপর। দুই হাত বাড়িয়ে দিলাম সেই ছোট্ট সোনার দিকে। মারিয়া এতক্ষণ পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে থাকলেও, ছেলের মুখ থেকে ‘বাবা’ ডাক শুনে তার শরীরটাও যেন একবার শিউরে উঠল। সে আড়চোখে আমার প্রসারিত হাত দুটোর দিকে তাকাল। তার চোখের কোণ দিয়ে আবারও জল নামল, তবে এবার সেই জলে মারিয়ার চিরচেনা অভিমান আর য*ন্ত্রণার পাশাপাশি কোথাও যেন একটুখানি দ্বিধাও মিশে ছিল।
​মারিয়া এবার আর সন্তানকে টেনে নিল না, বরং তার বাঁধনটা একটু আলগা হলো। ছোট ছেলেটা মায়ের কোল ছেড়ে গুটিগুটি পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এল। তার ধুলোমাখা ছোট্ট হাত দুটো যখন আমার অশ্রুসিক্ত গালে স্পর্শ করল, আমার মনে হলো—আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। আমি তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। চার বছরের চড়া দামে কেনা শূন্যতা এক মুহূর্তেই পূর্ণতায় রূপ নিল।
​”আমায় মাফ করে দিস বাবা… আমায় মাফ করে দিস,” বাচ্চার কাঁধে মুখ গুঁজে আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। অন্য ছেলেটাও তখন বড় বড় চোখে আমাদের দেখছিল, সেও এবার গুটিগুটি পায়ে এসে আমার পিঠের ওপর ছোট হাতটা রাখল। দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আমি বুঝতে পারলাম, রাবেয়া চৌধুরীর কোটি টাকার রাজপ্রাসাদও এই সুখের কাছে কতখানি তুচ্ছ, কতখানি কাঙাল!
​বেশ কিছুক্ষণ পর মারিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। তার গলার স্বর এখনো ভারী, কিন্তু আগের মতো ধারালো নয়।
​”বাচ্চাদের কান্না থামান। ওদের পেট খালি। কান্না করলে খিদে আরও বাড়বে,” মারিয়া মাটির চুলার দিকে না তাকিয়েই বলল।
​আমি তাড়াহুড়ো করে চোখ মুছলাম। পকেট থেকে ফেলে দেওয়া ওয়ালেটটা কুড়িয়ে নিলাম। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড আজ অচল হতে পারে, কিন্তু ওটার এক কোণে কিছু ক্যাশ টাকা সবসময় গোঁজা থাকে, যা মায়ের দেওয়া নয়—আমার নিজের খাটুনির বোনাসের টাকা। আমি তক্ষুনি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “আমি… আমি এখনই ওদের জন্য খাবার নিয়ে আসছি। মারিয়া, তুমিও সকাল থেকে কিছু খাওনি বোধহয়। আমি সবার জন্যই আসছি।”
​আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। বস্তির সরু গলি দিয়ে যখন প্রায় দৌড়ে বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন আশেপাশের মানুষগুলো আমার দামি শার্ট আর প্যান্টের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কিন্তু আমার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ ছিল না। আমার মাথায় তখন কেবল ঘুরছিল—আমার সন্তানদের ক্ষিদে মেটাতে হবে।
​বাজার থেকে গরম ভাত, ডাল আর ডিম ভাজা নিয়ে যখন ঘরে ফিরলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মারিয়া ততক্ষণে ঘরটা কিছুটা গুছিয়ে নিয়েছে। মেঝেতে একটা ছেঁড়া মাদুর পাতা। আমি খাবারগুলো রাখতেই দুই ভাই খিদের চোটে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল। মারিয়া ওদের মুখে লোকমা তুলে দিতে দিতে আমার দিকে তাকাল।
​”আপনি খাবেন না?” মারিয়ার গলায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত উদাসীনতা।
​”ওরা খাক, তুমি খাও… তারপর যদি বাঁচে, আমি খাব। না বাঁচলেও ক্ষতি নেই, ওদের খাওয়া দেখলেই আমার পেট ভরে যাবে,” আমি মলিন হেসে বললাম।
​মারিয়া আর কিছু বলল না। বাচ্চাদের খাওয়ানো শেষ করে সে নিজেও দুটো মুখে দিল। চার বছর পর আমরা এক ছাদের নিচে, এক ঘরে বসে খাচ্ছি—ভাবতেই আমার বুকটা হালকা হয়ে আসছিল। কিন্তু এই শান্তি কি আসলেই এত সহজে সায়নের ভাগ্যে লেখা আছে?
​ঠিক তখনই বস্তির বাইরে একটা কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামার শব্দ হলো। বস্তির ভাঙা জানলা দিয়ে উঁকি দিতেই আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। গাড়িটা মায়ের নয়। এটা মিথিলার বাবার পার্সোনাল গাড়ি। গাড়ি থেকে নামল মিথিলার ভাই, রিয়াদ। তার পেছনে চার-পাঁচজন চেনা গু*ন্ডা গোছের ছেলে।
​রিয়াদ সোজা মারিয়ার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে চরম অহংকার আর কদর্য এক হাসি। ঘরে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “বাহ্, সায়ন রহমান! কর্পোরেট কিং আজ বস্তির নোংরায় বসে ডিম-ভাত খাচ্ছে? দৃশ্যটা দেখার মতো বটে!”
​আমি উঠে দাঁড়ালাম, মারিয়া আর বাচ্চাদের নিজের পেছনে আড়াল করে বললাম, “রিয়াদ! ভদ্রভাবে বলছি, এখান থেকে যাও। আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে নিয়েছি। মিথিলাকে গিয়ে বলো, আমি আর ওর লাইফে ফিরছি না।”
​রিয়াদ একটা কুৎসিত শব্দ করে হেসে উঠল। “মিথিলা? আরে, আমার বোন কি তোমার মতো এক কাপড়ের ভিখারির জন্য বসে আছে? রাবেয়া চৌধুরী তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করার পর তোমার ব্যাংকের সব অ্যাকাউন্ট সিজ (Freeze) করার প্রসেস শুরু হয়ে গেছে। তুমি এখন রাস্তার ফকির, সায়ন! আর আমাদের অপ*মান করার শোধ আমরা কীভাবে নিই, জানো?”
​কথাটা শেষ করেই রিয়াদ ঘরের এক কোণে থাকা মারিয়ার মাটির হাড়ি-পাতিলগুলো লা*থি মে*রে ভে*ঙে ফেলল। বাচ্চ দুটো ভ*য়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
​”রিয়াদ!” আমি চিৎকার করে ওর কলার চেপে ধরলাম। কিন্তু ওর সাথে আসা লোকগুলো মুহূর্তের মধ্যে আমাকে চেপে ধরল। রিয়াদ আমার মুখের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “রাবেয়া আন্টি আমাদের বলে দিয়েছেন—তুমি যেন এই শহরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারো। কোনো অফিস তোমাকে চাকরি দেবে না, কোনো ভদ্রলোক তোমাকে ঘর ভাড়া দেবে না। আর এই মা**গী আর তার জা**রজ দুটোকে যদি বাঁচাতে চাও, তবে এই শহর ছেড়ে পালাও। নইলে কপালে অনেক দুঃখ আছে।”
​তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল। মারিয়া তীব্র এক চিৎকারে বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরল। রিয়াদরা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল, যাওয়ার আগে মারিয়ার ঘরের নড়বড়ে দরজাটা লা**থি মে**রে ভে*ঙে দিয়ে গেল।
​ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। শুধু বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আর আমার ভাঙা হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস। আমি মেঝেতে পড়ে রইলাম, অপ**মানে আর ক্ষো*ভে আমার হাত দুটো মুঠো হয়ে আসছিল। রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলারা ভেবেছে তারা আমাকে ভে*ঙে চুরমা*র করে দেবে। কিন্তু তারা জানে না, যে মানুষ একবার তার র”ক্তিমা শিকড় চিনে ফেলে, তাকে উপড়ে ফেলা এত সহজ নয়।
​আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। মারিয়ার দিকে তাকালাম। মারিয়ার চোখে এখন আর ভ*য় নেই, সেখানে এক অদ্ভুত প্রতিবাদের আগু”ন জ্বলছে। সে বাচ্চাদের কান্না থামিয়ে আমার দিকে তাকাল।
​”আপনি বলেছিলেন না, শূন্য থেকে লড়াই শুরু করবেন?” মারিয়ার গলার স্বর এবার ইস্পাতের মতো শক্ত। “আমি চার বছর একা লড়েছি এই ন*রকে। আজ থেকে লড়াইটা আমরা দুজনে করব। ওদের ওই পাপের টাকা আর ক্ষমতার অহংকার আমরা এই ভাঙা টিনের ঘরে বসেই গুঁড়িয়ে দেব। পারবেন তো, সায়ন?”
​মারিয়ার মুখে চার বছর পর নিজের নাম শুনে আমার ভেতরের পুরুষটা যেন নতুন এক শক্তিতে জেগে উঠল। আমি মারিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বললাম, “পারব মারিয়া। সায়ন রহমান হারতে শেখেনি। এবার লড়াইটা শুধু বাঁচার নয়, এবার লড়াইটা আমাদের অধিকারের।”
​কিন্তু রাবেয়া চৌধুরীর পরবর্তী চাল কী হবে? সায়ন কি পারবে এই চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে মারিয়া আর সন্তানদের এক নিরাপদ আকাশ দিতে?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৬
​কলমে The Story Haven

​রিয়াদরা চলে যাওয়ার পর ভা”ঙা দরজাটার দিকে তাকিয়ে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছিল। বস্তির ভা”ঙা টিনের চাল চিরে বিকেলের ম্লান আলোটা এসে পড়েছে মারিয়ার মুখের ওপর। সেখানে এখন আর কোনো দুর্বলতা নেই, বরং এক নতুন যু** দ্ধের প্রস্তুতি স্পষ্ট। যে মেয়েটা এতক্ষণ অপ*মানে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সে-ই এখন আমার সাহসের জ্বালানি।
​”আজকের রাতটা আমাদের এই ভা’ঙা দরজার ঘরেই কাটাতে হবে মারিয়া,” আমি মেঝে থেকে আমার ছেঁড়া ওয়ালেটটা তুলে নিয়ে শান্ত গলায় বললাম। “কাল সকালেই আমি আমাদের একটা নিরাপদ আস্তানার ব্যবস্থা করব। রিয়াদ বা আমার মা ভেবেছে তারা এই শহরের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে, কিন্তু তারা ভুলে গেছে—লড়াই যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের সাথে হয়, তখন নিয়মকানুন সব বদলে যায়।”
​মারিয়া কোনো কথা বলল না। সে বাচ্চাদের কপালে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। তার সেই স্তব্ধতা যেন ঝড়ের আগের পূর্বাভাস।
​পরদিন সকাল। সূর্য ওঠার আগেই আমি বস্তি থেকে বের হয়ে গেলাম। রিয়াদের হু*মকিটা ফাঁকা আওয়াজ ছিল না, সেটা আমি ভালো করেই জানতাম। কর্পোরেট জগতে আমার মা রাবেয়া চৌধুরীর প্রভাব কতটা, তা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
​প্রথমে গেলাম আমার এক পুরনো বন্ধুর কাছে, যার সাথে আমি বেশ কয়েকটা বিজনেস ডিল করিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তার অফিসের রিসেপশনে পা দিতেই বুঝতে পারলাম পরিস্থিতি কতটা ঘোলাটে।
​”সায়ন, স্যরি ভাই। রাবেয়া অ্যান্টারপ্রাইজ থেকে সকাল সকাল কড়া নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তোমাকে কোনো রকম সাহায্য করলে আমাদের সব রানিং প্রজেক্টের ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাবে,” বন্ধুটি আমার দিকে না তাকিয়েই অপরা*ধী গলায় বলল।
​আমি হাসলাম। এক অদ্ভুত, তাচ্ছিল্যের হাসি। “ঠিক আছে বন্ধু, অসময়ে চেনা মানুষগুলোর মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
​বিকেল পর্যন্ত আমি শহরের চার-পাঁচটা অফিসে গেলাম। সবখানেই একই দেওয়াল, একই অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা। রাবেয়া চৌধুরী আসলেই এই শহরের বাতাস বিষাক্ত করে তুলেছেন আমার জন্য। ল্যাপটপ বা দামি স্যুট ছাড়া সায়ন রহমান যেন এই শহরের বুকে এক চলমান লা** শ। ক্ষিদে আর ক্লান্তিতে যখন পা দুটো ভে*ঙে আসছিল, তখন ঢাকার একটা ব্যস্ত মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। মাথার ওপর তপ্ত রোদ, আর চারপাশে বিলাসবহুল গাড়ির হর্ন। চার বছর আগে আমিও এই গাড়ির এসি কেবিনে বসে জানালা দিয়ে বাইরের মানুষদের দেখতাম। আজ আমি নিজেই সেই ফুটপাতে।
​পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম মাত্র কয়েকটা টাকা অবশিষ্ট আছে। মায়ের দেওয়া ক্রেডিট কার্ডগুলো কাল রাতেই ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। নিজের জমানো যে পার্সোনাল অ্যাকাউন্টটা ছিল, সেটাও মা আইনি মা*রপ্যাঁচে ফ্রিজ করিয়ে ছেড়েছেন।
​আমি কি তবে হেরে যাব? মারিয়া আর সন্তানদের আবার ওই নরকেই ফেলে রাখব?
​”না, অসম্ভব!” নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠলাম। সায়ন রহমান কর্পোরেট অফিস চালাতে পারলে, নিজের বুদ্ধিকে অন্যভাবেও খাটাতে পারে।
​আমি সোজা চলে গেলাম কারওয়ান বাজারের এক পরিচিত পাইকারি আড়তদারের কাছে। এই লোকটির ব্যবসায়িক মন্দার সময় আমি তাকে একটা লোন পাস করিয়ে দিয়েছিলাম। সে রাবেয়া চৌধুরীর চক্রান্তের খবরের বাইরে ছিল।
​”সায়ন ভাই! আপনি এইখানে?” আড়তদার করিম মিয়া আমাকে দেখে আকাশ থেকে পড়লেন।
​”করিম ভাই, আমার কোনো দয়া লাগবে না, কোনো লোন লাগবে না। আমাকে শুধু কয়েকদিনের জন্য কিছু মাল বাকিতে দাও। আমি তোমার এইখানেই একটা ছোটখাটো সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু করতে চাই। নিজের হাতে খাটব,” আমি সোজা সাপটা বললাম।
​করিম মিয়া আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বড় মানুষেরা যখন সব ছাইড়া মাটিতে নামে, তখন তাদের আটকানো যায় না সায়ন ভাই। যান, পেছনের গোডাউনে মাল আছে, আপনি আজ থেকাই শুরু করেন।”
​সারাটা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলাম। যে হাত শুধু দামি কলম আর ল্যাপটপের কিবোর্ড ছুঁয়েছে, সেই হাতে আজ চটের বস্তা আর হিসাবের খাতা। দিনশেষে যখন করিম ভাই আমার হাতে কিছু পারিশ্রমিক আর সামান্য লাভের টাকা তুলে দিলেন, তখন মনে হলো এই সামান্য কটা টাকার উজ্জ্বলতা আমার মায়ের ওই কোটি টাকার চেয়েও অনেক বেশি।
​সন্ধ্যা নামার আগেই আমি বস্তির কাছাকাছি একটা ছোট পরিবেশের সেমি-পাকা ঘর ভাড়া নিলাম। ঘরটা ছোট হলেও একটা মজবুত কাঠের দরজা আছে, যা অন্তত মাঝরাতে কোনো গু**ন্ডার লা*থিতে ভে*ঙে পড়বে না।
​টাকা চুকিয়ে যখন মারিয়া আর বাচ্চাদের নিতে সেই পুরোনো ভাঙা টিনের ঘরে ফিরলাম, তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকতেই আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
​ঘর পুরো ফাঁকা।
​মেঝেতে মারিয়ার সেই রান্নার হাড়ি-পাতিলগুলো ভা*ঙা অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু মারিয়া বা বাচ্চারা কেউ নেই। বিছানার চাদরটা টেনে মেঝেতে ফেলা।
​”মারিয়া! বাবা! তোরা কোথায়?” আমি পা*গলের মতো চিৎকার করে উঠলাম।
​বাইরে আসতেই পাশের ঘরের এক বৃদ্ধা নারী ভ*য়ার্ত গলায় ফিসফিস করে বললেন, “বাবা, দুপুরের দিকে ওই গু** ন্ডাগুলো আবার আইছিল। ওগো সাথে একটা বড় গাড়িও ছিল। মারিয়া মাইয়াডারে আর বাচ্চা দুইডারে জোর কইরা গাড়িতে তুইলা নিয়া গেছে। মাইয়াডা অনেক চিল্লাইছিল বাবা, আমরা কেউ ভয়ে আগাইতে পারি নাই।”
​আমার মাথার ভেতরটা এক মুহূর্তে শূন্য হয়ে গেল। রিয়াদ আর মিথিলা আমার মারিয়াকে নিয়ে গেছে? নাকি এর পেছনে স্বয়ং রাবেয়া চৌধুরী আছেন?
​আমার ভেতরের শান্ত মানুষটা নিমেষেই এক হিংস্র পশুতুল্য ক্রোধে রূপ নিল। তারা ভেবেছে সায়নকে এভাবে খাঁচায় বন্দি করে রাখা যাবে। তারা আমার ওপর আঘা*ত করেছে, আমি সয়েছি। কিন্তু আমার পরিবার, আমার সন্তানদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস তারা কীভাবে পেল?
​আমি পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। মিথিলার নম্বরে ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে হাসির আওয়াজ ভেসে এল।
​”কী সায়ন? বস্তির জীবন কেমন এনজয় করছ? তোমার ওই সস্তা ভালোবাসা এখন কোথায়, জানো তো?” মিথিলার গলার স্বরে বিষাক্ত আনন্দ।
​”মিথিলা! আমার মারিয়া আর বাচ্চারা কোথায়? যদি ওদের একটা চুলও নষ্ট হয়, আমি ভুলে যাব যে তোমরা কারা। আমি এই শহর জ্বালিয়ে দেব!” আমার গলার আওয়াজে তখন খুনের নেশা।
​”আহা, এত রাগ ভালো না সায়ন। যদি তোমার সন্তানদের আর ওই মা** গীকে জ্যান্ত দেখতে চাও, তবে আজ রাত নয়টায় রাবেয়া ভিলা-য় চলে এসো। তোমার মা আর আমরা তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ রেডি করে রেখেছি। দেখি, তোমার ভালোবাসার জোর কতখানি!”
​খট করে ফোনটা কেটে গেল।
​আমি হাতের মুঠোয় ফোনটা শক্ত করে ধরলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠল মারিয়ার সেই প্রতিবাদের আ*গুনে ভরা চোখ দুটো, আর ছোট ছেলেটার মুখে ‘বাবা’ ডাক। রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলারা বা*ঘের ঘরে ঘোগের বাসা বেঁধেছে। তারা সায়ন রহমানকে চেনে, কিন্তু সন্তান আর স্ত্রীর জন্য লড়তে থাকা এক উন্মাদ বাবাকে এখনো চেনে না।
​রাত ঠিক পৌনে নয়টা। আমি রাবেয়া ভিলার বিশাল রাজকীয় গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আজ কোনো বিলাসবহুল গাড়ি থেকে নয়, সায়ন রহমান আজ পায়ে হেঁটে, শার্ট আর ধুলোবালি মাখানো শরীরে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে এসেছে।
​কিন্তু রাবেয়া ভিলার ভেতরে সায়নের জন্য কী ভয়ানক ফাঁ*দ পেতে রাখা হয়েছে? মারিয়া আর সন্তানদের বাঁচাতে সায়নকে কি কোনো বড় বলিদানের মুখোমুখি হতে হবে?

​(চলবে…)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ