হৃদয়ের টান
পর্ব ১০ (শেষ পর্ব)
কলমে The Story Haven
মেঝের ধুলোবালি মেখে আমার জন্মদাত্রী মা রাবেয়া চৌধুরী যখন তার নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন, তখন সেই কান্নায় কোনো আভিজাত্যের দেওয়াল ছিল না, ছিল এক অপরা*ধী দাদীর আ”ত্মশুদ্ধির আকুতি। যে মা সারা জীবন শুধু হুকুম আর ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে এসেছেন, তাকে আজ এভাবে নতজানু হতে দেখে আমার বুকের ভেতর জমে থাকা চার বছরের সমস্ত ক্ষোভের বরফ এক নিমিষেই গলে জল হয়ে গেল।
মারিয়া এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাঁধে হাত রাখল। পরম মমতায় তাকে মেঝে থেকে টেনে তুলে সোফায় বসাল। তারপর আঁচল দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কেঁদে নিজের শরীর খারাপ করবেন না, মা। অতীতকে তো আর বদলে দেওয়া যাবে না, কিন্তু বর্তমানটাকে তো আমরা সুন্দর করে সাজাতে পারি।”
মারিয়ার মুখে ‘মা’ ডাক শুনে রাবেয়া চৌধুরী চমকে উঠলেন। তিনি মারিয়ার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, “তুই আমাকে ক্ষমা করে দিলি মা? যে অন্যায় আমি তোর সাথে করেছি, তার পর তো আমার এই রাজপ্রাসাদে ফেরার কোনো মুখ ছিল না।”
”ক্ষমা আমি করার কে মা?” মারিয়া মৃদু হেসে আমার দিকে তাকাল। “আপনার ছেলে যদি নিজের বাবার র**ক্ত আর শিকড় চিনে নিতে পারে, তবে আমি কেন আমার সন্তানদের তাদের দাদীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করব? র**ক্ত কখনো পর হয় না, মা।”
আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। এই মেয়েটার বিশাল হৃদয়ের কাছে আমি আরও একবার হেরে গেলাম। যে অপার্থিব আলো আজ আমাদের এই ছোট ঘরটাকে মায়ায় ভরিয়ে তুলেছে, তা কোনো আলিশান ঝাড়বাতির পক্ষেও ছড়ানো সম্ভব নয়।
পরের কয়েকটা দিন ঝড়ের বেগে কেটে গেল।
রাবেয়া চৌধুরী নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে মিথিলা আর রিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিলেন। অপহরণের চেষ্টা, জালিয়াতি এবং গু*ন্ডামির অকাট্য প্রমাণ থাকায় পুলিশ মিথিলাকেও তার বাড়ি থেকে গ্রে*ফতার করে। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যারা একসময় একটা পুরো পরিবারকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, আজ তারা নিজেদের কৃতকর্মের মাসুল গুনতে অন্ধকার হাজতের বাসিন্দা।
আইনি ঝামেলা মিটতেই মা আমাদের হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন রাবেয়া ভিলায় ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি আর মারিয়া একমত হয়েছিলাম—আমরা সায়নের বাবার রেখে যাওয়া ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে নিজেদের একটা নতুন চেনা জগৎ গড়ে তুলব।
আমরা ধানমন্ডির এক শান্ত গলিতে একটা সুন্দর, ছিমছাম ফ্ল্যাট ভাড়া নিলাম। যেখানে সকালের আলো এসে ডাইনিং টেবিলে পড়ে, আর বিকেলে বারান্দায় দাঁড়ালে পাখির ডাক শোনা যায়। মা এখন প্রায় প্রতিদিন বিকেলে আমাদের এই নতুন ঘরে আসেন। চৌধুরী সাম্রাজ্যের মিটিং ফেলে তিনি এখন নাতনিদের সাথে মেঝেতে বসে পুতুল খেলেন, গল্প শোনান। মারিয়া রান্নাঘর থেকে চা বানিয়ে যখন মায়ের হাতে দেয়, তখন মায়ের মুখের সেই হাসিতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।
আজ ছুটির দিন।
নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায় একটা আরামকেদারায় বসে আমি আর মারিয়া বিকেলের চা খাচ্ছিলাম। ড্রয়িংরুমে দুই ভাই তখন দাদীর কোলে বসে হাসাহাসি করছে। চারিদিকের এই শান্ত, নিটোল সুখের দিকে তাকিয়ে মারিয়া আমার কাঁধে মাথা রাখল।
”জানেন সায়ন,” মারিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “চারটে বছর যখন আমি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কিংবা কাপড়ের কারখানায় খিদের জ্বালায় ভুগেছি, তখন ভাবিনি কখনো এমন একটা বিকেল আমার জীবনে আসবে।”
আমি ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিলাম। ওর খসখসে আঙুলগুলো আজ আর কষ্টের কথা বলে না, বরং আমাদের বেঁচে থাকার জয়গান গায়।
”কষ্টের রাতগুলো না থাকলে কি এই ভোরের আলোটা এত মিষ্টি লাগতো মারিয়া?” আমি ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বললাম। “আমি কর্পোরেট অফিসের এসি কেবিনে বসে অনেক লাভ-ক্ষতির হিসাব করেছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, জীবনের সবচেয়ে বড় লাভটা হলো নিজের ভালোবাসার মানুষের পাশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারা।”
মারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে মায়াবী হাসল। সেই হাসিতে কোনো অভিমান নেই, কোনো শূন্যতা নেই। আছে কেবল এক আকাশ পরিমাণ অধিকার আর তৃপ্তি।
টাকা আর ক্ষমতার কাছে যে টান একদিন হেরে গিয়েছিল, আজ তা আ*ত্মত্যাগ, সততা আর পরম ক্ষমার মাধ্যমে এক নতুন বিজয়ের ইতিহাস লিখল। অহংকারের রাজপ্রাসাদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে আজ এক ভাঙা টিনের ঘর থেকে শুরু হওয়া গল্পটা এক সুখী নীড়ে এসে পূর্ণতা পেল। আমাদের ‘হৃদয়ের টান’ আজ সব বাধা পেরিয়ে তার নিজস্ব ঠিকানায় পৌঁছে গেছে।
(সমাপ্ত)
