Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"তৈমাত্রিক পর্ব-০৮

তৈমাত্রিক পর্ব-০৮

#তৈমাত্রিক
#লেখিকা; Tamanna Islam
#পর্বঃ ০৮

✨🧚‍♀️
.
.
.
.

“তনু কখনো মা হতে পারবে না”

আয়ুশের সামনে যেন এখন এই একই কথা বারবার ঘুড়ছে। মানে কি এইসবের?! আয়ুশের হাত থেকে রিপোর্ট কার্ড টা নিচে পরে যায়। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এমন কিছু হয়েছে। আয়ুশের হাত ক্রমাগত ভাবে কেপেই যাচ্ছে। সে মাথা তুলে কপাল কুচকে ডাক্তারের দিকে তাকায়। ডাক্তার একজন মহিলা। আর এখন এই অবস্থায় আয়ুশের মনে কেমন লাগছে তা তিনি ভালোই আন্দাজ করতে পেরেছেন। ডাক্তারের চোখে থাকা মোটা ফ্রেমের চশমা টা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। কিন্তু আয়ুশ আর এবার চুপ করে বসে থাকতে পারলো না।

আয়ুশ;; ডক্টর হুয়াট ডু ইউ মিন? তনুর হয়েছে কি আর সে কেন মা হতে পারবে না? (তড়িঘড়ি করে ডাক্তার কে জিজ্ঞেস করলো)

ডাক্তার;; দেখুন মিস্টার আয়ুশ মিসেস তনু অনেক উঁচু একটা সিড়ি থেকে গড়িয়ে নিচে পরেছে। মাথায় আঘাত পেয়েছ ইন ফ্যাক্ট তিনটে সেলাই পর্যন্ত দিতে হয়েছে। পায়ের অবস্থা ভালো না বেশি। আর উনি তার পেটের নিচের অংশে অস্বাভাবিক ব্যাথা পেয়েছেন। এতে আমাদের মহিলার বডিতে অর্থাৎ যে স্থানে বেবি কনসিভ করা হয় সেই স্থানে গভীর যখম হয়েছে। আর সাধারণত সেই জায়গা টা অনেক বেশি কোমল হয়। এছাড়াও প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। বডিতে ব্লাড সাপ্লাই করতে হবে।

আয়ুশ;; আমি এবার সবাইকে কি বলবো। জানি এতে তনুর কোন দোষই নেই কিন্তু…

ডাক্তার;; আমি বুঝতে পারছি এখন আপনার ওপর দিয়ে কি যাচ্ছে কিন্তু কি আর করার।

আয়ুশ;; তততনু এখন কেমন আছে?

ডাক্তার;; তেমন একটা ভালো না, জ্ঞান ফিরে নি এখনো। বেশ টাইম লাগবে, এখনো আমরা কিছু বলতে পারি না। ব্লাড উনার বডিতে পুশ করা হয়েছে। ভাবলাম বেপার টা সেন্সেটিভ তাই আপনাকে বলে ফেললাম।

আয়ুশ হাল্কা মাথা নাড়িয়ে বের হয়ে পরে কেবিন থেকে। আয়ুশ বাইরে বের হতেই সবাই যেন ঝাপটে ধরে তাকে। সাথে সাথে রিপোর্ট টা লুকিয়ে ফেলে। তবে আয়ুশ শুধু সবাইকে শান্ত থাকতে বলছে। কাউকেই কিছুই টের পেতে দিচ্ছে না। সবাইকে শুধু বলছে “তনু ঠিক আছে জ্ঞান ফিরবে একটু পরেই”। আয়ুশ তখন সামনের দিকে তাকায় দেখে যে মেহরাম তার দিকে তাকিয়ে আছে এক নয়নে। আয়ুশ চোখ নামিয়ে ফেলে। কোন রকম ভাবে সেখান থেকে এসে অন্য জায়গায় দাঁড়িয়ে পরে। মেহরাম তা খেয়াল করেছে। তনুর মা আতিয়া দম ছাড়ছে না কোন ভাবেই, কাদতে কাদতে নাজেহাল অবস্থা। মেহরামের আম্মু আর চাচ্চু মানে তনুর বাব কোন রকমে বুঝাচ্ছে। মেহরাম এবার জোর করেই কিছুটা পানি খাইয়ে তার চাচি কে শান্ত করায়। কিছুক্ষন পরই মেহরাম আয়ুশের যাওয়ার দিকে তাকায়। তাদের বসিয়ে ভালো ভাবে বুঝিয়ে মেহরাম তাদের কাছ থেকে এসে পরে। আয়ুশ যেদিকে গিয়েছে সে দিকে যায়। কিন্তু পায় না। আরেকটু সামনে এগিয়ে আশে পাশে তাকায় মেহরাম। গেতেই দেখে আয়ুশ দুহাত ভাজ করে কাচের জানালা দিয়ে বাইরে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। মেহরাম ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। আয়ুশের পেছনে দাঁড়িয়ে মেহরাম এক প্রকার দোটানাতে পরে যায় যে আয়ুশকে ডাক দিবে কি দিবে না। তবুও এক সময় মেহরাম ডেকে ওঠে…

মেহরাম;; আয়ুশ!

মেহরামের ডাকে আয়ুশ চোখ মুখ মুছে পেছনে তাকায়।

আয়ুশ;; হুম বলো।

মেহরাম;; কি হয়েছে?

আয়ুশ;; না কিছু না।

মেহরাম;; মিথ্যা বলো না, আমি বুঝি। ডক্টর কি বলেছে?

আয়ুশ;; তনু ভালো আছে।

মেহরাম;; আয়ুশ ক্লিয়ারলি বলো প্লিজ এটা লুকানোর কোন কথা না, বেপার টা আমার বোনের প্লিজ বলো।

আয়ুশ;; মাথায় আঘাত পেয়েছে ভারি। সেলাই লেগেছে কিছু, আর রক্ত লেগেছে।

মেহরাম;; ব্লাড কোথায় পেলো তারা?

আয়ুশ;; একজন ডোনেট করেছে তার ব্লাড গ্রুপের সাথে তনুর ব্লাড গ্রুপ মিলে গিয়েছিলো। হাতে সময় কম ছিলো তাই দিয়ে দিয়েছে।

মেহরাম;; আর কি?

আয়ুশ;; এই টুকুই।

মেহরাম;; আয়ুশ মিথ্যে বলো না অযথা যা তুমি পারো না। হয়েছে কি তনুর??

আয়ুশ জানে মেহরাম কিছু বেপারে অনেক বেশি জেদি তাই বলে লাভ নেই। তাই সে তার হাতে থাকা রিপোর্ট কার্ড টা মেহরামকে দিয়ে দেয়। মেহরাম কপাল কুচকে আয়ুশের হাত থেকে রিপোর্ট কার্ড টা নেয়। দ্রুত গতিতে সেটা খুলে সারা টা একবার চোখ বুলায়। মেহরাম কতোক্ষণ রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা তুলে আয়ুশের দিকে তাকায়। আয়ুশ এতোক্ষণ মেহরামের দিকে এক নয়নে তাকিয়ে ছিলো। মেহরাম চোখ তুলে আয়ুশের দিকে তাকালেই আয়ুশ দেখে মেহরামের চোখ লাল হয়ে গিয়েছে একদম। টুপ করে দু ফোটা জল রিপোর্টের ওপর পরে যায়।

মেহরাম;; নননা আআয়ুশ ককি বলছে ডাক্তার এএএগুলো? এটা কি করে হহতে পারে?

আয়ুশ;; এটা সত্য।

মেহরাম;; ননা তনুর এমন হতেই পারে না। কখনো না রিপোর্ট হয়তো ভুল এসেছে আয়ুশ, আয়ুশ তুমি প্লিজ তুমি আরেকটা বার ভালোভাবে চেকাপ করাও না আয়ুশ আমার চাচি পাগল হয়ে যাবে। পুরো পরিবার ভেংে পরবে। আয়ুশ প্লিজ। (কেদে)

আয়ুশ;; আমার কিছুই করার নেই মেহরাম, এটাই সত্য। আমি তো এটাই ভেবে পাচ্ছি না যে আমি তনু কে কিভাবে এটা বলবো আর সবাইকেই বা কি করে বুঝাবো।

মেহরাম;; মানি না এই রিপোর্ট ভুয়া, আমি বিশ্বাসই করি না। তনু…

আয়ুশ;; ______________

মেহরাম একটা শকের ভেতর আছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো তাই সে ভেবে কুল পায় না। এখন বর্তমানে পুরো পরিবারে আয়ুশ & মেহরামই শুধু জানে তনুর বেপার টা। এর মধ্যে কেউ কিছুই জানতে পারে নি। আয়ুশ আর মেহরাম চলে যায়। গিয়েই দেখে সবার মুখে এখনো চিন্তা লেগে আছে। ধীরে ধীরে সময় গড়িয়ে রাত হয়। তবুও তনুর জ্ঞান ফিরে না। হস্পিটালে কাউকে না কাউকে থাকতে হবে। আয়ুশ আর মেহরাম সবাইকে জোর করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। রাতে শুধু মেহরাম আর আয়ুশ থেকে যায় হস্পিটালে৷ এর মধ্যে মেহরামের কাছে সোহেল অনেকবার ফোন করেছে তনুর বেপারে জানার জন্য। কিন্তু তনু তেমন একটা ভালো নেই দেখে সোহেল হস্পিটালে আসতে চায়। মেহরাম অনেক বার বারণ করে। বাসায় একা তার শাশুড়ী কে রেখে কি করে আসবে আর এখানে থাকার মতো মানুষ আছে আরো কতো কি বলে মেহরাম কিন্তু সোহেল জেদ করেই হস্পিটালে এসে পরে। সোহেল এসেই দেখে মেহরাম তনুর কেবিনের দরজা দিয়ে তাকিয়ে আছে, মুখ টা একদম মলিন হয়ে গিয়েছে। দেওয়ালের সাথে লাগিয়ে থাকা চেয়ার গুলোতে একজন ব্যাক্তি মাথায় দুহাত ঠেকিয়ে বসে আছে। মেহরাম হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখে সোহেল তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেহরাম দৌড়ে চলে যায় তার কাছে। সোহেল তাকে জড়িয়ে ধরে। আয়ুশ মাথা তুলে তাদের দিকে তাকায়। আবার সাথে সাথে মাথা নিচে নামিয়ে ফেলে। মেহরাম তো সোহেল কে ধরেই কেদে দিয়েছে।

সোহেল;; আহা মেহরু কাদে না সবকিছু তো ঠিক হয়ে যাবে। এভাবে তুমি কাদলে সেদিকে বাড়িতে কি করে সামলাবে। কাদে না।

সোহেল তার হাত দিয়ে মেহরামের চোখের পানি টা মুছে দেয়। সোহেল এবার মেহরাম কে ছেড়ে আয়ুশের কাছে যায়।

সোহেল;; আব.. আপনি হয়তো আয়ুশ তনুর হাসবেন্ড রাইট??

আয়ুশ মাথা তুলে সোহেলের দিকে তাকায়।

আয়ুশ;; জ্বি।

সোহেল আয়ুশের পিঠে হাল্কাভাবে চাপড় দিয়ে পাশে বসে তার।

সোহেল;; কিছু হবে না আল্লাহ সমস্যা দিয়েছেন উনিই আবার ঠিক করবেন। ভেংগে পড়বেন না একদম। তা নাহলে তনুর আরো বেশি কষ্ট হবে।

আয়ুশ;; জ্বি। আপনি কবে এসেছেন?

সোহেল;; আমি আসলে ১ সপ্তাহের জন্য বাইরে গিয়েছিলাম গতকাল এসেছি।

আয়ুশ;; হুম।

আয়ুশ আর সোহেল একে ওপরের সাথে কথা বলছে আর মেহরাম পায়চারি করেই যাচ্ছে। হুট করেই একজন ওয়ার্ডবয় এসে তাদের বলে…

ওয়ার্ডবয়;; পেসেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। মাত্র একজনই দেখা করতে পারবে। কে আসবে?

এই সময় তনুর সাথে তার হাসবেন্ডের দেখা করতে দেওয়া টাই উত্তম হবে তাই ভেবে মেহরাম চেয়েও কিছুই বললো না। কিন্তু আয়ুশ মেহরামের মনের অবস্থা টা বুঝতে পারলো। তাই আয়ুশ বলে ওঠে…

আয়ুশ;; মেহরাম!

মেহরাম;; হুম।

আয়ুশ;; তুমি যাও।

মেহরাম;; আম..আমি কি করে যাই?

আয়ুশ;; যাও তুমি দেখা করে এসো।

যাই হোক মেহরাম একবার সোহেলের দিকে তাকিয়ে চলে গেলো তনুর কেবিনে।
মেহরাম গিয়েই দেখে তনুর মুখে মাস্ক লাগানো, হাতের দুই জায়গায় সুই পুশ করে রেখেছে। গালে কিছুটা ব্যান্ডেজ করা, মাথায় করা। আধো আধো ভাবে তনু চোখ খুলছে। তনুর এই অবস্থা দেখেই মেহরামের বুকে কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। মেহরাম আস্তে আস্তে পা ফেলে তনুর দিকে যাচ্ছে। তনু হয়তো মেহরামকে দেখেছে তাই হাত টা হাল্কা ওপরে তুলে মেহরামের দিকে ইশারা করে। মেহরাম আর এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারে না ছুটে গিয়ে তনুর হাত ধরে ফেলে অঝোরে কেদে দেয়।

মেহরাম;; আমি কখনো ভাবি নি যে এমনও হবে, আমি জানি না কি বলবো কি করবো কিন্তু প্লিজ যাতে তোর কিছু না হয়। আমি পাগল হয়ে যাবো তোর কিছু হলে।

মেহরামের কথায় তনু সেভাবেই মুচকি হাসে।
মেহরাম তনুর হাত টা নিজের দুহাতের মাঝে এনে রেখেছে৷ তনু আস্তে হাত টা তুলে মেহরামের চোখের পানি মুছে দেয়। তারপর নিজের হাতের দু আঙুল দিয়ে মেহরামের ঠোঁটের দুপাশে ধরে সরু টান দেয়। যার মানে স্মাইল। এমন করা মেহরামই তনু কে শিখিয়েছিলো। মেহরামের মতে “যা কিছুই হোক দুনিয়া এদিক থেকে ওদিক হয়ে যাক কিন্তু মুখ থেকে যেন হাসি দূর না হয়। পান থেকে যেমন চুন খষে পরতে দেয় না তেমনই মুখ থেকে যেন হাসি খষে না পরে”। তনুর যখনই কোন বেপারে মন খারাপ থাকতো তখন মেহরাম এভাবে হাতের আঙুল দিয়ে তনুর ঠোঁটে ধরে স্মাইলের মতো করতো আর তনু হেসে দিতো। আজকে মেহরামকে এভাবে কাদতে দেখে তনু নিজেও তেমনই করলো। বেপার টা খেয়াল করতেই মেহরাম হেসে দেয়।

মেহরাম;; আসলেই তুই বদের হাড্ডি, হারামী একবার খালি ঠিক হ।

তনু তার মুখের মাস্ক খুলতে চাইলে মেহরাম তার হাত দিয়ে তনুর কে আটকিয়ে দেয়।

মেহরাম;; I swear, তোর যদি কিছু হয় তাহলে আমি তোকে মেরেই ফেলবো (কেদে)

তনু হাতের ইশারাতে মেহরাম কে কাছে ডাকে মেহরাম তনুর দিকে ঝুকে নিজের কান তনুর মুখের ওপর পাতে।

তনু;; এমনিতেই মরছি আর কতো মারবি!(ফিসফিস করে খুব আস্তে)

মেহরাম এবার হেসে দেয়। মেহরাম তনুর সাথে কথা বলছিলো তখনই একজন নার্স এসে মেহরাম কে বলে…

নার্স;; ম্যাম এখন পেসেন্টের রেস্ট নেবার সময়। আপনি যদি একটু বাইরে যেতেন তাহলে…!

মেহরাম;; জ্বি জ্বি অবশ্যই, তনু তুই রেস্ট নে কেমন আমি যাই হ্যাঁ। আর আমি, সোহেল, আয়ুশ সবাই এখানেই আছি।

মেহরাম তনুর মাথায় একটা চুমু খেয়ে চলে যায়। বাইরে বের হতেই আয়ুশ মাথা তুলে তার দিকে তাকায়। মেহরাম এবার বলে…

মেহরাম;; ভালো আছে তনু।

সোহেল;; আলহামদুলিল্লাহ।

মেহরাম গিয়ে সোহেলের পাশে বসে সোহেল এক হাতে মেহরামকে জড়িয়ে ধরে। আয়ুশ ফট করে উঠে সেখান থেকে চলে যায়। আয়ুশ এক হাতে চোখের জল মুছছে আর সামনে হাটছে। মেহরাম আয়ুশের দিকে তাকিয়ে আছে। সোহেলও দেখলো।

সোহেল;; নিজের বউয়ের এই অবস্থা কোন স্বামীই সহ্য করতে পারবে না তাই হয়তো চলে গিয়েছে।

মেহরাম;; হুম।

মেহরাম আবার ঠিক হয়ে তার জায়গায় বসে। সোহেলের কাধে মাথা রেখে দেয় আর সোহেল এক হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খায়। এভাবেই দিন যেতে থাকে আজ তিনদিন তনু হস্পিটালে এডমিট। এই তিনদিনে অনেক উন্নতি হয়েছে তনুর কন্ডিশনে। এখন খানিক সুস্থ সে। পুরো পরিবার এসে দেখে গেছে তনু কে। তবে তনুর মা না হতে পারার বেপার টা এখনো কেউ জানেনা শুধু আয়ুশ আর মেহরাম বাদে। আজ তনুর ব্যান্ডেজ খুলবে মাথার।
এখন মেহরাম আর আয়ুশ তনুর দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ুশ তনু কে খাইয়ে দিচ্ছে আর মেহরাম অনেক গল্প করছে তনুর সাথে। খানিক পর খাওয়া শেষ হলে আয়ুশ তনুর মুখ মুছে দিতে থাকে তখন ডাক্তার আসে কেবিনে।

ডাক্তার;; এখন কেমন ফিল হচ্ছে?

তনু;; ফাইন ডক্টর। (মুচকি হেসে)

ডাক্তার;; হুমমম।

ডাক্তার তনুর পাশে বসে। তনু সোজা হয়ে বসে আছে আর ডাক্তার ধীরে সুস্থে তনুর মাথার ব্যান্ডেজ খুলে দিতে থাকে। ঘা অনেক টাই সেরে উঠেছে শুধু কপালের সাইডে একটু যখম আছে। ডাক্তার তাতে মেডিসিন দিয়ে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়।

ডাক্তার;; আপনারা আগামীকাল উনাকে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন। হ্যাভ এ নাইস ডে।

এই বলেই ডাক্তার বের হয়ে পরে৷ তনু মুচকি হাসে আয়ুশ আর মেহরমের দিকে তাকিয়ে।।

মেহরাম;; তো তোরা থাক আমি এবার যাই বাইরে।

তনু;; আরে না কোথায় যাচ্ছিস, এখানে বোস।

মেহরাম;; বুঝিস না কেন, তোরা দুইজন থাক না একটু একা। আমি থেকে কি করবো আমি যাই।

মেহরাম বের হয়ে পরে। তনুর আটকিয়েও রাখতে পারে না ওকে। তনু আর আয়ুশ কথা বলছে কিন্তু মেহরান বাইরে এসে আগে বাড়িতে ফোন দেয়। সবার সাথেই কথা হয় তার। তনু কে বাড়িতে নিয়ে যাবার কথাও বলে। এবার মেহরামের চাচি আর পুরো বাড়িতে যেন একটু শান্তি আসে। তনুর শাশুড়ীও কেদে কেটে শেষ করেছে। তাদের সবার সাথেও অনেক কথা হয়, তারপর রেখে দেয়। মেহরাম এবার একটু তনুর কেবিনের দিকে যায়। দরজাতে থাকা গোল গ্লাসের ভেতরে দিয়ে তাদের দেখে। দেখে যে তনু আয়ুশের বুকে মাথা রেখে শুনে আছে। মেহরাম তা দেখে তৎক্ষণাৎ চোখ নিচে নামিয়ে ফেলে তারপর এসে পরে।

পরেরদিন তনুর মা বাবা, বড়োমা শাশুড়ী যায় হস্পিটালে। আয়ুশ আর মেহরাম তনুকে ধরে ধরে হস্পিটালের বাইরে আনে। তারপর গাড়িতে করে চলে যায়। বাসায় নেমে খুব আস্তে করে তনু পা ফেলে কেননা পায়েও ব্যাথা পেয়েছিলো। ধীরেধীরে হেটে ঘরের ভেতরে আসে। আয়ুশ তনুকে ধরে বিছানাতে শুইয়ে দেয়। তারপর চাদর টেনে দেয়। এতোক্ষণ তনুর সেই রিপোর্ট কার্ড টা মেহরামের কাছেই ছিলো তা সে আয়ুশের হাতে দিয়ে দেয়। আয়ুশে কার্বাডে খুব সাবধানে তা রেখে দেয়। কথা বার্তা বলে তনুর সাথে দেখা করে তনুর বাবা মা আর বড়োমা তাদের বাসায় চলে যায় আর মেহরাম তার শশুড় বাড়িতে চলে যায়। এভাবেই দিন যায় যেতে যেতে আরো এক সপ্তাহ পার হয়। তনু এখন অনেকটাই সুস্থ মাঝে মাঝে শুধু তীব্র মাথা ব্যাথা উঠে৷ একদিন আয়ুশ অফিসে যায় না ইচ্ছে করেই। গেতে নাকি তার মোটেও ভালো লাগছে না তাই আর যায় না। তনু রুম গোছাচ্ছিলো হঠাৎ আয়ুশের ফোন বেজে ওঠে কিন্তু সে তো ওয়াসরুমে। তনু তবুও ফোন টা নিয়ে আয়ুশকে দেয়। আয়ুশ একহাত বাড়িয়ে কোন রকমে ফোন টা নিয়ে নেয়। আয়ুশের বের হওয়ার সময় হয়ে গেছে। তনু এবার হাল্কা চিল্লিয়ে আয়ুশকে বলে ওঠে..

তনু;; এইই তোমার জন্য কোন শার্ট বের করবো?

আয়ুশ;; দেখো যেটা ভালো লাগে।

তনু;; আচ্ছা।

তনু কাবার্ডে হাত দিয়ে এক এক করে শার্ট উল্টিয়ে উল্টিয়ে দেখছিলো, কোন টাই ভালো লাগছিলো না। অবশেষে একটা কফি কালারের শার্ট তনুর হাতে বাধে। সে তা নিয়ে নেয়। কিন্তু শার্ট টা টান দিয়ে বের করার সময় কার্বাড থেকে একটা কালো ফাইল নিচে পরে। তনু হাল্কা ভ্রু কুচকে সেটার দিকে তাকায়। তারপর নিচে ঝুকে হাত তুলে নেয়। শার্ট টা হাত থেকে বিছানার ওপর রেখে ফাইল টার ভেতরে খুলে তনু। তনু খেয়াল করে যে সে যেই হস্পিটালে এডমিট ছিলো এটা সেই হস্পিটালেরই ফাইল। নামের জায়গায় তনু তার নিজের নাম দেখতে পায় ‘আশফিয়া তনু’। তনুর এবার কেমন যেন খটকা লাগে যে তারই রিপোর্ট অথচ সেই এতোদিন দেখি নি, আজব। তনু ধীরে ধীরে ফাইল টা আরো দেখে, ভালোভাবে ঘাটাঘাটি করে। আর ফাইনাল রেজাল্ট যখন তনু দেখে তার যেন মাথা টা কেমন চক্কর দিয়ে উঠলো। একটা কাচের গ্লাস যখন ভেংে একদম চুরচুর হয়ে যায়। এখন তনুরও ভেতরে থাকা মন টা একদম ভেংগে খানখান হয়ে গিয়েছে। তনুর গাল বেয়ে ঝড়ে পরছে অজস্র নোনাজল। ঠিক তখনই আয়ুশ ওয়াসরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে বাইরে এলো। বাইরে এসেই দেখে তনুর হাতে ফাইল। আয়ুশ তো বেশ ঘাবড়ে গেলো দেখে। আর তনু জোরে জোরে দম ফেলছে আর আয়ুশের দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে।





🍁চলবে~~

#তৈমাত্রিক
#লেখিকা; Tamanna Islam
#{বোনাস পার্ট 🥀}

🧚‍♀️
.
.
.
.

তনু হাতে তার রিপোর্ট কার্ড টা নিয়ে ছলছল চোখে আয়ুশের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আয়ুশ যে এখন কি বলবে তারই ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।

আয়ুশ;; ততনু..

তনু;; ____________

আয়ুশ;; ততনু আসললে…

তনু;; এটা তোমার কাছে ছিলো কিন্তু তুমি আমায় বলোনি!

আয়ুশ;; আমি..

তনু;; কেন বলোনি আমায়? (কিছুটা চিল্লিয়ে কেদে)

আয়ুশ;; কি বলতাম আমি, কিভাবে বলতাম আমি। আমি ভেবেছি তুমি এই শকটা সেড়েই উঠতে পারবে না তাই বলি নি।

তনু;; রোগ টা আমার, মা না হতে পারার অক্ষমতা টা আমার আর তুমি আমাকেই বলোনি। এতো বড়ো একটা কথা কিভাবে লুকাতে পারলে তুমি আমার কাছ থেকে?

আয়ুশ;; _______________

তনু;; আর কেকে জানে?

আয়ুশ;; কেউ জানে না। বাড়ির কেউ না।

তনু;; কিন্তু তুমি..

আয়ুশ;; মেহরাম জানে।

আয়ুশের এই কথায় তনু এবার বাকরুদ্ধই হয়ে গেলো। সে ভেবেছিলো আর কেউ জানুক বা না জানুক কিন্তু মেহরাম যদি জানে তাহলে তাকে বলবেই। কিন্তু না এই কথা টা মেহরাম পর্যন্ত তনুর কাছ থেকে লুকালো। এগুলো এখন তনু ভাবছে।

তনু;; মেহ..মেমেহররু জাজানতো এএটা।

আয়ুশ;; হ্যাঁ।

এবার তনুর হাত থেকে ফাইল টা নিচে পরে যায়। তনু ধপ করে সেখানেই ফ্লোরে বসে পরে। গাল বেয়ে ঝরে পরছে অশ্রুবিন্দু। আয়ুশ দ্রুত গিয়ে এক হাতে তনু কে ধরে ফেলে। তনু এক পলক আয়ুশের দিকে তাকিয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ঢুকরে কেদে উঠে। আয়ুশের ভাষা নেই সে এখন তনুকে কি বলে থামাবে বা কি বলেই শান্তনা দিবে তা সে জানে না।

তনু;; কেন, কেন এমন হলো আমার সাথেই। আমার কি দোষ ছিলো, সবারই তো জীবনের চাওয়া-পাওয়া থাকে তাই না। আমারও তো কত্তো স্বপ্ন ছিলো যে আমার একটা ছোট্ট পরিবার হবে, আমার কোল আলো করেও একটা ছোট প্রাণ আসবে। যে আমাকে মা ডাকবে, পুরো বাড়িকে মাতিয়ে রাখবে। কিন্তু মূহুর্তেই সব কিছু ভেংগে চুরমার হয়ে গেলো। সব শেষ সব। কখনো ভাবি নি আমার সাথে এমন হবে। কেন হলো ও আয়ুশ বলো না। আমার কি কখনো কোন বাচ্চা হবে না। আমি কখনো মা ডাক শুনতে পারবো না। কেন বেচে আছি আমি এখনো। তুমি কেন এটা আমার কাছ থেকে লুকালে, কাউকে কেন বলো নি। তুমি ভাবতে পারছো এই কথা টা যখন সবাই জানবে তখন সবার ওপর দিয়ে কি যাবে। তাদেরও তো কতো কল্পনা ছিলো তাই না, যে নিজের একমাত্র ছেলের ঘরের বাচ্চা হবে, কিন্তু আমার ভাগ্য এতো টাই খারাপ। আয়ুশ। (পাগলের মতো কেদে)

তনুর পাগলামো বাড়ছে তাই আয়ুশ কোন রকমে তনুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করায়। এভাবে তারা কতোক্ষণ ছিলো তার ঠিক নেই। কিন্তু এবার তনু উঠে পরে। নিজের চোখ মুখ ভালোভাবে মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।

তনু;; আয়ুশ।

আয়ুশ;; কি করছো তুমি?

তনু;; আমি নিচে যাচ্ছি।

আয়ুশ;; কিন্তু কেন?

তনু;; আয়ুশ আমি পারবো না এতো বড়ো একটা কথা পরিবারের সবার কাছ থেকে লুকাতে। আমি তাদের এক মিথ্যে আশায় আশাবাদী করতে পারবো না।

আয়ুশ;; কিন্তু তনু আমার কথা টা…

তনু উঠেই সোজা চলে যায় হলরুমে। আয়ুশ তাকে আটকানোর অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু তনু অনেক জেদি সে তার কথা না শুনেই দ্রুত নিচে নেমে পরে। নিচে নামতেই তনু দেখে তার শশুড়-শাশুড়ী, কণা সবাই একসাথেই বসে আছে। তনুকে এভাবে জলদি নিচে নামতে দেখে কণা বলে ওঠে…

কণা;; আরে ভাবী কি হলো, এভাবে তেড়ে নিচে নামছো কেন?

তনু;; মা-বাবা আপনাদের সাথে কিছু কথা ছিলো আমার। মানে সবার সাথেই আর কি।

লায়লা খাতুন(আয়ুশের মা);; হ্যাঁ মা বল না, কিন্তু তার আগে আয় খেতে আয়।

তনু;; মা বেপার টা আমাকে নিয়ে আর খুব বেশি সিরিয়াস।

মতিন আলম(আয়ুশের বাবা);; তনু মা হয়েছে কি বল তো?

তনু এগুলো বলছিলো ঠিক তখনই আয়ুশ ওপর থেকে নিচে নামে। নিচে নেমেই দেখে তনু দাঁড়িয়ে আছে আর সবাই অবাক নিয়ে তনুর দিকে তাকিয়ে আছে। তনু এবার গিয়ে বসে পরে৷ তার শশুড়-শাশুড়ী এবার বেশ চিন্তায় পরে গেলেন। কেননা যতো বড়োই কথা হোক না কেন তনু কখনোই এমন করে না কিছু নিয়ে। সবাই তনুর পাশে বসে পরে। কিন্তু আয়ুশ মুখে চিন্তার রেখে দাঁড়িয়ে আছে দূরে।

তনু;; মা-বাবা দেখুন আমি জানি যে আয়ুশ আপনাদের একমাত্র ছেলে। তো নিজের ছেলের ঘর থেকে প্রথম নাত-নাতনি আশা করা টা স্বাভাবিক। কিন্তু হয়তো সেই আশা আর পূরণ হবার নয়। আমিই পারব না।

লায়লা;; কি বলছো তনু এইসব। এগুলোর মানে কি?

তনু;; মা, মা আমি নিজেই এই কথা টা জানতাম না। আয়ুশ আমাকে বলেনি এই ভেবে যে আমার ওপর কি যাবে (আয়ুশের দিকে তাকিয়ে)। কিন্তু মা আমি আপনাদের সবাইকে এটা না বলে পারতাম না। মা, আমি কখনো মা হতে পারবো না।

তনুর এই কথায় সবাই চুপ মেরে গেলো। তনু যে এখন এসে সবাইকে এই কথা বলবে তা সবার ধারণারও বাইরে ছিলো। তনু ভেবেছে হয়তো এই কথা টা শোনার পর তনুর শাশুড়ী সোজা তাকে বাড়ি থেকে বা আয়ুশের জীবন থেকে বের হয়ে যেতে বলবে কিন্তু না তিনি তা করেন নি। আর আয়ুশও শুধু তনুর কথাই ভেবেছে তাকে কখনো কোন কটু কথা বলেনি। তনু তার মাথা নিচে নামিয়ে কেদেই যাচ্ছিলো হঠাৎ তার মাথায় কারো স্পর্শ অনুভব হতেই তনু মাথা তুলে তাকায়। দেখে যে তার শাশুড়ী তার মাথায় হাত দিয়ে রেখেছে তনু মাথা তুলে তার দিকে তাকালে দেখে তার শাশুড়ীর মুখে রাগের বদলে হাসি জ্বলছে। তনু তার শাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরে…

লায়লা;; না রে মা তুই কি ভেবেছিস তোকে আমরা এখন তুচ্ছ মনে করবো বা বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলবো পরিবার থেকে আলাদা করে দিবো। এমন হয় না মা। সব শাশুড়ীই তো আর এক হয় না। বাচ্চা দেওয়া মানেই যে পরিবার পূর্ণ আর না দিতে পারা মানেই যে অপূর্ণ তা না। সব শাশুড়ী রা এক হয় না। তোকে কি বলবো এই এক্সিডেন্ট টা যদি আমার নিজের মেয়ের সাথে হতো তাহলে। আমার নিজেরও তো একটা মেয়ে আছে নাকি। আল্লাহ না চাইলে কিছুই হয় না। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।

সবাই তনুর এই বেপারে কোন রিয়েকশনই করে না। উলটো তাকে বুঝ দেয়।


তনু আর আয়ুশ রুমে বসে আছে। আয়ুশ ল্যাপটপে কাজ করছে কিন্তু তনুর মধ্যে কোন হুশ নেই। সে এক মনে তাকিয়ে আছে। আসলে সে এখনো এটাই মেনে নিতে পারছে না যে সে কখনো কারো মা হতে পারবে না। তনু আয়ুশের দিকে তাকিয়ে দেখে সে নিজের মতো কাজ করছে। তনু হঠাৎ বলে উঠে…

তনু;; আমি একটু বাইরে যাবো।

আয়ুশ;; কোথায় যাবে? বলো আমায় আমি দিয়ে আসবো। (কাজ করতে করতেই)

তনু;; না তোমার কষ্ট করে যেতে হবে না। আমি একাই যেতে পারবো আর জলদি এসে পরবো। আমি যাই তুমি থাকো।

আয়ুশ;; ওকে।।

এই বলেই তনু বের হয়ে পরে। বাইরে এসেই রিকশা পেয়ে যায় তাতে করে উঠে চলে যায়। প্রায় বেশ খানিক সময় পর এসেও পরে। মূলত সে মেহরামের শশুড় বাড়িতে এসেছে। রিকশা থেকে নেমেই বাড়ির ভেতরে চলে যায় তনু। কলিং বেল বাজাতেই বাড়ির কাজের লোক এসে দরজা খুলে দেয়। তনু ভেতরে যায়, ভেতরে গেতেই দেখে মেহরামের শাশুড়ী বসে আছে। তিনি তনু কে দেখে হাসি মাখা মুখ নিয়ে কাছে আসেন।

কুসুম;; আরে তনু মা যে কেমন আছো? আর এভাবেই হুট করে এসে পরলে আগে বলতে আয়জোন করে রাখতাম।

তনু;; না খালামনি আমিও ঠিক করিনি যে এভাবে আসবো। কিন্তু এসে পরলাম। আসলে মেহরামের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম একটু।

কুসুম;; হ্যাঁ আমি ডেকে দিচ্ছি।

তনু;; না না খালামনি ওকে আর এখানে আসতে হবে না আমিই বরং ওর রুমে যাই। জিজু নেই তো আবার?

কুসুম;; হাহা, না নেই তুমি যাও।

তনু;; আচ্ছা।

তনু এই বলেই মেহরামের রুমে চলে গেলো। মেহরাম বসে বসে কাপড় ভাজ করছিলো তখনই হুট করেই তনু তার রুমে আসে। তনুকে দেখেই তো মেহরাম লাফিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। তনুও একই অবস্থা। দুই বোনই চিল্লিয়ে ছুটে গিয়ে একে ওপরকে জড়িয়ে ধরে। মেহরাম তো অনেক খুশি হয়েছে এভাবে তনুকে এখানে দেখে। দুজনেই হাসছিলো কিন্তু হাসার মাঝেই তনু হুহু করে কেদে দেয়। মেহরাম অবাক হয়ে গেলো। তনু কে নিজের কাছ থেকে ছাড়াতে চাইলে তনু যেন আরো শক্ত ভাবে মেহরামকে জড়িয়ে ধরে।

মেহরাম;; হলো কি তোর তনু এভাবে কেদে দিলি কেন? এই তনু!

তনু;; কি লাভ পেলি বল আমার থেকে বেপার টা লুকিয়ে।

মেহরাম;; মানে?

তনু;; আমি কখনো মা হতে পারবো না।

মেহরাম চকমে উঠে তনুর কথায়। তার মানে তনু পুরো বেপার টা জেনে গেছে।

মেহরাম;; তনু তুতুই!

তনু;; আমি জানি আমি সব জানি। আজকে আমার রিপোর্ট টা আমি পাই। আর কেউ বলুক বা না বলুক তুই তো বলতে পারতি মেহরু আমায়। কেন বলিস নি? (কেদে)

মেহরাম;; কারণ এটা যদি তখন তুই জানতি তাহলে হয়তো সেই আঘাত থেকে তুই বের হতেই পারতি না। কেননা তোর তখন কন্ডিশন টা বেশি ভালো ছিলো না তার ওপর এই কথা। এটা জানলে তুই নিজেই ঠিক থাকতে পারতি না। জানি তোর এখন খারাপ লাগছে যে আমি কেন তোকে আগে বলি নি। কিন্তু যা করেছি তা তোর ভালোর জন্য।

তনু;; কিন্তু বোন আমার ভালো আর হলো কই। কোথাও না কোথাও এক কমতি থেকেই গেলো।

তনু এই কথা বলে আবার কেদে মেহরাম কে জড়িয়ে ধরে। মেহরাম চুপ করে বসে আছে তনুর কে নিয়ে। এখন তনুর ওপর কি যাচ্ছে তা ভালোই বুঝতে পারছে সে। এক বেলা মেহরামের কাছে থেকে তনু চলে আসে। ধীরে ধীরে বেপার টা তনুর বাপের বাড়ির লোকজনদের জানানো হয়। তনুর বাবা মা একদম ভেংগে পরেছিলেন এই কথা শোনার পর। বলতে গেলে বাড়িতে একটা শোকের ছায়া নেমে পরেছিলো। তনু আগের মতো হাসতো না,কথা তো বলতো কিন্তু খুব আস্তে। একমাত্র মেহরাম তার সাথে থাকলেই একটু আকটু হাসতো তাছাড়া না। মনমরা হয়ে থাকতো। এর মধ্যে আয়ুশের সেই চাচি শাশুড়ী কোন রাস্তাই বাদ রাখে নি তনুকে কটুকথা শোনানোর। কিন্তু তনুর ননদ কণা আর শাশুড়ি একদম ইটের বদলে পাটকেল ছুড়ে দিয়েছেন। এক সময় তো আয়ুশের চাচির সাথে আয়ুশের মার ঝগড়ার মতোই লেগে গেলো। কিন্তু পরর্বতীতে বেপার টা নরমাল হয়। আয়ুশ এখন এই সব কিছু তেমন ভাবে না। অফিসে কাজ করে বাসায় আসে আবার বাসা থেকে অফিসে যায়। একদম নিজের মতো চলছে। তবে এরই মাঝে আয়ুশ আর মেহরাম অনেক বার একে ওপরের সম্মুখীন হয়েছে।
তনুর এই ঘটনার পর দেখতে দেখতেই আরো ২-৩ মাস কেটে যায়। তনু তার সেই এক্সিডেন্টের কথা টা প্রায় ভুলতে বসেছে। কিন্তু মাঝে মাঝেই রাতে ঘুম আসে না তনুর। এক অজানা ভয় কাজ করে মনের মাঝে। তার এই না পাবার ব্যার্থতা তাকে যেন ভেতরে ভেতরেই কোথাও কুড়ে কুড়ে খায়।

.

একদিন মেহরাম আর সোহেল ঘুমাচ্ছিলো কিন্তু ঘুমের মাঝেই সোহেলের দম বন্ধ হয়ে আসে। সে মেহরাম কে ডাকার অনেক চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। এক সময় বিছানার পাশে টেবিলের ওপর একটা কাচের গ্লাস ছিলো তা হাতিয়ে হাতিয়ে সোহেল ফেলে দেয়। শব্দে মেহরামের ঘুম ভেংগে যায়। জলদি উঠে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দেয়। উঠেই দেখে সোহেলের এই অবস্থা। দেখে সোহেল তার বুকে হাত দিয়ে রেখেছে। মেহরাম দ্রুত উঠে আস্তে ধীরে তাকে বসায়। তারপর পানি খাইয়ে দেয়। অতঃপর সে স্বাভাবিক হয়।

মেহরাম;; কি হলো আপনার, আপনি ঠিক আছেন তো?

সোহেল;; হ্যাঁ ঠিক আছি। আসলে জানি না কি হয়েছিলো। দম নিতে পারছিলাম না। শ্বাস আটকে গিয়েছিলো।

মেহরাম;; এবার ভালো লাগছে?

সোহেল;; হ্যাঁ। আব..সরি তোমার ঘুম নষ্ট করলাম।

মেহরাম;; আরে ধুর রাখুন তো। আপনার এই অবস্থা আর আমার ঘুম, বাদ দিন। আপনি ঘুমান আমি আছি।

সোহেল শুয়ে পরে। মেহরাম কিছুক্ষণ সোহেলের ওপর নজর রেখে সেও শুয়ে পরে। তবে মেহরাম এটাই ভেবে পাচ্ছে না যে সোহেল কে সে কখনো এমন করতে দেখে নি। হঠাৎ এমন হলো কেন। পরেরদিনই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে এই ভেবে মেহরাম ঘুমিয়ে পরে। তবে সেদিকে আয়ুশ তনুর দিকে তাকিয়ে দেখে সে ঘুম। আয়ুশ নিশ্বব্দে তার পাশ থেকে উঠে পরে করিডরে চলে যায়। করিডর টা অন্ধকার, লাইট জ্বালাতেই আয়ুশের চোখে পরে পাশে থাকা তার অতি পছন্দের গিটার টা। মেহরামের চেহারা যেন তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো। অনেক দিন না প্রায় অনেক বছর হলো গিটার বাজানো হয় না তার। কি করে বাজাবে যার জন্য বাজাতো সেই তো নেই। কেন যেন আয়ুশের খুব ইচ্ছে করলো গিটার টা একটু ছুইয়ে দেখতে। এটার প্রতিটা জায়গায় মেহরামের হাতের ছোয়া লেগে আছে। রকিং চেয়ারে গিয়ার টা নিয়ে আয়ুশ বসে পরে। মানুষ ভালোবাসে কিন্তু যখন তাকে পাওয়া সম্ভব হয়না তখন তাকে ভুলে যায় আর নতুন ধাচে জীবন শুরু করে। কিন্তু কই বিয়ের এতো বছর হয়ে গেলো আয়ুশ তো মেহরামকে ভুলে যেতে পারলো না। এখনো মনের কোনে ছোট্ট একটা জায়গাতে মেহরাম রয়েই গেছে। আচ্ছা সবারই কি এই আয়ুশের মতো অবস্থাই হয় যখন কেউ কাউকে হাজার চেয়েও পায় না। নাকি নতুন জীবনে নিজেকে আগের থেকেও অনেক ভালো মানিয়ে নেয় কোনটা?। তাই যদি হয় তাহলে আয়ুশ কেন পারে না এটা। তাহলে কি এটা ভালোবাসা না। নাকি তার থেকেও বেশি কিছু। কোন এক মহান ব্যাক্তি ভালোবাসায় পাগল হয়ে বলেছিলো যে “মায়া জিনিস টা মাদকদ্রব্যের থেকেও বেশি ভয়ানক, যখন খুব বাজে ভাবে কেউ কারো মায়ায় আটকে পরবে তখন বুঝবে”। এখন আয়ুশ বুঝছে যে সেই কথা গুলো নিতান্তই কোন ভুল প্রেক্ষাপটের ওপর বলা ছিলো না। ভিত্তিহীন ছিলো না। সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। এগুলো ভেবেই আয়ুশ ছাড়া গলায় গান ধরে… “ভালোবেসে ভুল করিনি, ভুল করেও ভালোবাসিনি”🖤।……..





🌿চলবে~~

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ