#যে_অঙ্কে_ভুল_ছিলোনা
#ফৌজিয়া_তাহিয়া
শেষ পর্ব
সপ্তাহখানেক পর আমি ঢাকা চলে আসলাম আর সাথে বরিশাল রেখে আসলাম আমার মনটাকে। স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে জীবনে কম মেয়ের সাথে মিশি নি। তবে ও ছিলো অন্যরকম । একদম অন্যরকম। আপনাদের ভাষায় সৌন্দর্য এর যে সংজ্ঞা তাতে হয়তো ও তেমন একটা নয় সুন্দর নয় ,তবে আমার কাছে ওর থেকে আর কাউকেই এতো বেশি সুন্দর লাগেনি। সবথেকে বেশি সুন্দর ওর চোখ দুটো। তাই বলে ভাববেন না,হরিণী টানা টানা চোখ বোধহয়। তার চোখ দুটো ছিলো বিড়ালের মতো ছোট ছোট। শান্ত নদীর মতো দুখানা চোখ। বাম চোখের নিচে আবার ছোট্ট একটা লাল তিল। খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে তিলটুকু দেখা যায়না।
বাসায় এসে নিজেই নিজেকে বোঝালাম হয়তো মোহ। কিছুদিন না দেখলে কেটে যাবে। কিন্তু না। তাকে দেখার তৃষ্ণা,একটুখানি কন্ঠ শোনার ইচ্ছা আমার দিনকে দিন বেড়েই চললো। ছোট বোনকে গিয়ে বলি তোর কথা জিজ্ঞেস করছে প্রিমা,একই কথা বাবাকে বলি, মাকে বলি। উদ্দেশ্য তারা ফোন দিয়ে কথা বলুক। আমার উদ্দেশ্যে আমি সফল হই। বাবা মা আমার ফোন দিয়ে কথা বলে,আমি কল রেকর্ড অন করে রাখি, আবার কথা বলার সময় তাদের পাশে বসে থাকি, এমন ভান করি যেনো আমার ফোন ফেরত নিবো এজন্য বসে আছি,আসলে তো ঐ কিন্নড় কন্ঠটা শোনার জন্য বসে আছি আমি। অবসর সময়ে রেকর্ড করা কলগুলো বারবার শুনি। এভাবেই দিনকাল যায় আমার। বুঝলাম খালি মোহে আমি ডুবিনি। এই মেয়েকে ভালোবেসেও ফেলেছি। এনাকে ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।
আমার মা প্রিমাকে ভীষণ ভীষণ স্নেহ করতো। একদম নিজের মেয়ের মতো। আসলে ওর তো বাবা ছিলো না,তাই বোধহয় আলাদা টান কাজ করতো মায়ের। মায়ের এই দুর্বলতার কথা আমি জানতাম। সেই সুযোগ বুঝে মাকে গিয়ে ধরলাম। জানালাম এই মেয়েকে আমার লাগবেই লাগবে। কিন্তু আমার মা তো আমার মা ই। সে আমাকে জানালো প্রিমাকে বিয়ে করতে হলে তার যোগ্য হয়ে আসো। যে সে ছেলের কাছে আমি ওকে বিয়ে দিবো না। ততদিনে প্রিমা এইচএসসি পাশ করে ফেলছে।এডমিশনের জন্য সেই খাটাখাটনি করে পড়ছে। একবার ভাবছি জানাই আমার মনের কথা,পরে ভাবলাম না থাক।এই নাজুক সময়ে বেচারীকে ডিস্টার্ব করে লাভ নাই। আর যে সংস্কারী মেয়ে প্রেম ট্রেমে রাজি হবে বলেও মনে হয়না। মাঝখানে থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করে লাভ নেই। তাই চুপ রইলাম।
মাস্টার্সে ভর্তি হলাম ব্রাকে। সাথে চাকরির ও প্রিপারেশন নিচ্ছি। একেতো কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ড এর স্টুডেন্ট, তারওপর ভার্সিটিতে খুব একটা ভালো সাবজেক্ট নিয়ে পড়িনি। পড়ালেখায় ও প্রচুর ফাঁকিবাজি করছি। সিজির অবস্থা খুব ই খারাপ। তিন এর নিচে। চারিদিক থেকে হিমশিম খাচ্ছিলাম সব মিলিয়ে।
এর মধ্যে প্রিমার চবিতে হয়ে গেলো। আমার প্রেশার আরো বেড়ে গেলো। না জানি কার খপ্পরে পড়ে আমার আলাভোলা না হওয়া বউটা। তখন তো আমার সব শেষ।তাই বয়সে বড় ভাই সেজে ভং ধরে তাকে কয়কেদিন পর পর ই ফোন দিয়ে শাষণ করি। এসব প্রেম ভালোবাসা এখন না। যখন সময় হবে তখন আমরা নিজ দায়িত্বে ছেলে খুঁজে দিবো ইত্যাদি ইত্যাদি। ও হয়তো এক কথা বারবার শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছে। বড় ভাই দেখে কিছু বলতে পারেনা মুখের ওপর। আমি তার বিরক্তি বুঝি তারপরও তাকে বারবার ওয়ার্নিং দেই। আসল শিয়াল তো আমি নিজেই, তাকে তা আর জানাই না।
সরকারি চাকরির পেছনে দুবছর অনেক ঘুরছি পড়াশোনা কম করিনি। কিন্তু ঐ যে অতীতের পড়ালেখার অবস্থা খারাপ। এখন চেষ্টা করলেও সার্টিফিকেট দেখে বাদ করে দেয়। কপালেও নেই আবার মামা খালুর জোড় । আব্বু কয়েকবার বলেছিলো টাকা দিয়ে, কিন্তু মন থেকে সায় আসে নি। তাইতো ভাইভায় গিয়ে প্রায় সময় আউট হয়ে যাই। শেষে হাল ছেড়ে দেই। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ঢুকে পড়লাম।
প্রিমা তখন থার্ড ইয়ারে পড়ে। ওর ও বাসায় বিয়ের কথার চলছে। আম্মুকে গিয়ে আবার ধরলাম। আমার গত তিনবছরের একপাক্ষিক ভালোবাসা দ্বিপাক্ষিক করার প্রচেষ্টায় আরকি। আম্মু রাজি হলেন না। তার মতে, সরকারি চাকরি করা আরো ভালো ছেলের কাছে ঐ মেয়ে যেতে পারে,আমার মতো ভবগন্ডোয়ালাকে কেনো মেয়ে দিবে। নিজের মা ই যদি এই কথা বলে বাহিরের মানুষের কথা আর কি বলবো।
এখন মাঝেমধ্যে মনে হয় যদি একটা টাইম মেশিন থাকতো তাহলে অতীতে গিয়ে অনেক পড়াশোনা করতাম, একটুকু ও ফাঁকিবাজ করতাম না। নয়তো যেদিন দুপুরে প্রিমার সাথে দেখা হলো, ঐদিন দরজা খোলার সাথে সাথেই চোখ বুজে থাকতাম। কিছুতেই মায়ায় পরতাম না ঐ মেয়ের। কিন্তু আফসোস! এগুলো কিছুই সম্ভব না।
সত্যি কথা বলতে গত তিন বছরের একপাক্ষিক ভালোবাসায় আমি নিজেও কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সব ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। আম্মুকেও আর জ্বালাই না। রোজ আট’টা টু ছ’টা অফিস থেকে ফিরে এসে মুভি দেখি রাত তেরোটা পর্যন্ত। এরপর সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে আবার অফিস যাই। এভাবেই আমার দিনকাল যাচ্ছে। আব্বু মাঝেমাঝে বিয়ের কথা বলে,আমি এক কান দিয়ে ঢুকাই আরেক কান দিয়ে বের করে দেই। আমি সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি এবং ভেবে রেখেছি ওর বিয়ের আগে কখনোই বিয়ে করবো না।
মাস সাতেক পর গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সবাই তোড়জোড় করছে। আমাকেও বলেছিলো। আমি বলেছি ছুটি নাই। কারণ বাসার সকলে যাচ্ছে প্রিমার বিয়ের উদ্দেশ্যে। আমার শরীরে এতো কারেন্ট নেই যাকে এতোদিন ধরি ভালোবাসি, তার বিয়েতে গিয়েই আবার গরুর গোশত খেয়ে আসবো।
আমার সবথেকে বেশি অভিমান হচ্ছিলো মায়ের ওপর।সে তো সবকিছু জানে,জেনেও এটা কিভাবে করলো। মা ও আমাকে খুব বেশি সাধাসাধি করেনি যাবার জন্য কিন্তু বাবা অনেক বললেন। তারপর উপায়ান্তর না পেয়ে ছুটি নিয়ে বাড়িতে রওনা দিলাম। আমার ঊনত্রিশ বছরের জীবনে এবারের মতো আমি মন খারাপ করে কখনো বাড়িতে যাইনি। ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় বড় হয়েছি।তাই গ্রামের যাবার প্রতিবার ই ভীষণ উচ্ছাসিত থাকতাম।তবে এবার পারি না কেঁদে ফেলি টাইপ অবস্থায় ছিলাম।
মনে মনে ভেবেছি বিয়ের বাড়ির এতো মানুষের মধ্যে আমার খোঁজ আর কে ই বা রাখবে।বিয়ের দিন এক ফাঁকে অন্য কোথাও চলে যাবো।
তবে বাড়িতে পৌঁছানোর পর ঘটলো উল্টো ঘটনা। মনে হচ্ছিলো সবাই যেনো আমায় চোখে চোখে রাখছে। এক মুহুর্তের জন্য ও একা ছাড়ছে না কেউ। চাচাতো ফুফাতো ভাই বোনেরা এসে প্রিমার নানাবাড়ি চলে গেলো। আমায় কেউ একবার সাধেও নাই। অবশ্য সাধলেও যেতাম না।
দিন দুই পর পবিত্র শুক্রবার বিয়ে। সবাই অনকে ব্যস্ত কাজকর্ম নিয়ে। একমাত্র আমিই দুঃখ বিলাশ করতে ব্যস্ত। বিয়ের ঠিক একদিন আগে প্রিমাকে রাত সাড়ে এগারোটায় ফোন দিয়ে বসলাম। জানতে চাইলাম ও বিয়েতে খুশি কিনা। তার ভাষ্যমতে আল্লাহ যখন ভাগ্যে এখানে রেখেছে, অবশ্যই ভালো বুঝেই রেখেছে,তাই তার দ্বিমত নেই। বুঝলাম প্রিমাও রাজি এই বিয়েতে। এরমধ্যে একবারের জন্যও পুরুষ জেলাসি থেকে ওর বরের নাম , পরিচয় কারো কাছে জিজ্ঞেস করিনি। কারণ নিজেকে আমি চিনি। ঐ বেটার পরিচয় পেলে হয়তো হাত পা ভেঙ্গে দিয়েও আসতে পারি। এজন্য তার পরিচয় জানার রিস্ক নিলাম না।
পবিত্র শুক্রবার আব্বু একটা নতুন পাজামা পাঞ্জাবী নিয়ে আসলো বিবাহ বাড়ির পাশের মসজিদে যাবার উদ্দেশ্যে। অনেক গাইগুই করলাম না যাবার জন্য, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। শেষে ভাই বোনের সামনে আম্মুর হাতে দুটো থাপ্পড় খেয়ে, নিজের মানসম্মান নিলামে উঠিয়ে আমার না হওয়া ফুফাতো বউয়ের বিয়ে খেতে চলে গেলাম। বলে রাখি আমার গোষ্ঠীর আবার সকলে হুজুর টাইপ। এজন্য বিয়েতে তেলই ,মেন্দি অনুষ্ঠান এগুলা কিছু করতে দেয় না। বিয়ের সময় গিয়ে খালি মসজিদে গিয়ে বিয়ে পড়িয়ে বউ নিয়ে চলে আসে। এরপর যা অনুষ্ঠিত বিয়ের পর বরের বাড়িতে এসেই হয়।
মসজিদে যাবার পর প্রথম ঝটকাটা খেলাম তখন,যখন নামাজ পড়ার শেষ আমায় হুজুরের পাশে বরের আসনে বসতে বলা হলো। নাটক সিনেমা জীবনে বহুত দেখেছি।তাই বুঝতে পারলাম বিবাহ বোধহয় আমার সাথেই হবে।তাও মনে মনে একটু ভয় লাগছিলো , কি না হয়।এর মিনিট খানেক পর কাজী এসে বিয়ে পড়ানো শুরু করলো। চোঁখের পলকে আমার বিয়ে হয়ে গেলো। জীবনের প্রায় চারটা বছর যে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করেছি, আল্লাহর কাছে কেবল তাকে পাওয়ার দোয়াই করে গেছি সেই মানুষটির সাথেই আমার ২০২৬ এর বাইশে জুন বিয়ে হয়ে গেলো।
এরপরের গল্পটা সাদামাটা ভীষণ। আর পাঁচটা দশটা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ এ যেমন সংসার হয় আমাদের তেমনই সংসার হয়েছে। ধীরে ধীরে নিজেদেরকে জানলাম,চিনলাম। এবং বিয়ের পর আমি আরেকটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। প্রিমা কথা বলতে পারে। অনেক কথা। শুধু কথা বলেই ক্ষান্ত হয় না। কথার মাঝে মাঝেমধ্যেই খোঁচা দিতেও জানে। অবশ্য তার এই রুপটা কেবল আমার সামনেই প্রকাশ পায়। আগেই বলেছি আমি ভীষণ বাঁচাল,সাথে প্রিমার ভাষায় চাপাবাজ ও। আসলেও চাপাবাজ। পুরো গোষ্ঠীর মধ্যে আমায় কেউ কথায় চুপ করাতে পারে না। তবে এই একটি নারী যার সাথে আমি কথা বলে পারি না। তার কথার প্যাঁচ কাটতে গিয়ে নিজেই মগা হয়ে যাই প্রায় সময়। এই হেরে যাওয়ায় আমার কখনো দুঃখ হয় না। এছাড়া জীবনসঙ্গী হিসেবেও প্রিমা ভীষণ বুঝদার। আমার ব্যস্ততা, রাগ , ক্ষোভ সব কিছুই সে বুঝতো। আমি যখন অকারণে তার ওপর চড়াও হতাম সে চুপ করে শুনতো। অপেক্ষা করতো আমার রাগ কমার। পরে অবশ্য অনেক ঝাড়তো।আমি বুঝতে পারি সেদিনের সেই অঙ্কে যেমন কোনো ভুল ছিলো না তেমনি আমার সারা জীবনের সঙ্গী নির্বাচনেও কোনো ভুল ছিলো না।
চলবে।
