#যে_অঙ্কে_ভুল_ছিলোনা
#ফৌজিয়া_তাহিয়া
দাদা যেবার মারা যায় ঐবার আমি প্রিমাকে প্রথম দেখি।প্রিমা তখন সম্ভবত ক্লাস সেভেন অথবা এইটে পড়ে । আর আমি ভার্সিটিতে কেবল ভর্তি হয়েছি। আমার দাদা আর ওর নানি ছিলো ভাই বোন। প্রিমা নানাবাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করতো। দাদা মারা গেছেন। বংশের মধ্যে মুরব্বি বলতে আর বাকি রইলো প্রিমার নানি। তাই তার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে প্রিমার নানি বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখি প্রিমা অঙ্ক করছে। উৎপাদকে বিশ্লেষন।য়গিয়ে ওর পড়ার টেবিলের কাছেই বসলাম। আমি আবার একটু বাঁচাল প্রকৃতির ছেলে।তো নিজের মনের মধ্যের শয়তানি না লুকিয়ে প্রিমাকে বললাম তোমার অঙ্ক হয়নি। বেচারি এই একটু আগেই অঙ্ক করার নিয়ম শিখলো। আর আমি সিনিয়র। বলেছি যখন ঠিকই বলেছি। তাই ও অনেক খুঁজলো, কিন্তু ভুল ধরতে না পেরে খালি কাটাকাটি ই করতে লাগলো। আসলে আমি জানতাম না সত্যিই অঙ্ক ওর ভুল ছিলো নাকি ঠিক।আন্দাজেই বলছিলাম। কিন্তু অঙ্কটা ঠিক ছিলো। এ কথাটা প্রিমা আমায় বলেছিলো আরো অনেক বছর পর।প্রিমার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ এভাবেই।
এর পর কয়েকবছর পার হয়ে গেছে। দাদা নাই। তাই দাদাবাড়িও যাওয়া হয় না। অনার্স শেষ করলাম গতবছর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা চলে গেলাম। বেকার বসে বসে বাপের টাকায় অন্ন ধ্বংস করছি। আব্বু মাস্টার্সে ভর্তি হতে বলে, চাকরির পড়া পড়তে বলে,বিয়ে করাবে।আমি আলসেমি করে খাই দাই ঘুরি ফিরি। পড়াশোনা বিরক্ত লাগে। আম্মুর কাছে ঘ্যানঘ্যান করি আব্বুর কাছে থেকে টাকা এনে দিতে। গ্রামে চলে যাবো। এরপর গরুর একটা খামার দিবো। তারপর আমার সাথে গ্রামে যে মেয়ে থাকতে রাজি হবে তার সাথে বিয়ে করে সংসারী হবো । আম্মু আমায় জুতা নিয়া তাড়া করে।
এরমধ্যে একদিন প্রিমার মা ফোন দিলো আমাকে, উদ্দেশ্য প্রিমার জন্য একটা ম্যাথ টিচার খুঁজে দেওয়া। আমি ববিতে পড়েছি, চেনা জানা আছে। সব ছেলের কাছে তো আর মেয়ে দেয়া যায় না! এজন্য টিচার খুঁজে দেয়ার গুরুদায়িত্ব ঘরের ছেলের ওপর পড়লো। প্রিমা বরিশালের এক নামকরা কলেজে পড়ে। ততদিনে আমি প্রিমার চেহেরা টেহেরা ভুলে বসে আছি। বছর কয়েক আগে যে ওর সাথে শয়তানি করেছি তাও ভুলে গিয়েছি। যাইহোক ফুফু একটা দায়িত্ব দিলো। আমি বেকার মানুষ। তাই টিচার খোঁজার মিশনে নেমে পড়লাম। দিন কয়েকের মধ্যে যোগাড় ও করে ফেললাম। পড়া শুরু হলো।
এরমধ্যে আমার ছোট খালা গাড়ি এক্সিডেন্ট করলো।কোমড়ের হাড্ডিগুড্ডি ভেঙে গেছে। বরিশাল মেডিকেল এ ভর্তি করানো হলো। প্রিমার ফুফু ছিলো আবার ঐ হসপিটালের নার্স। আমার ছোট খালাকে নিয়ে যখন ভর্তি করানো হলো হসপিটালে আমার আর আব্বুর ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগছিলো। আসলে টাকা পয়সা তো ঐভাবে হাতে থাকে না। গোছাতে দেড়ি হলো। ততক্ষণে প্রিমার ফুফু মালিহা আন্টি তাদের ভর্তি টর্তি করিয়ে একদম সব গোছগাছ করে দিয়ে আসছে। ও হ্যাঁ প্রিমাও পড়াশোনা করতো ওর ফুফুর বাসায় থেকে।
এরপর দিন দুয়েক আমি আর আব্বু বন্ধু বান্ধবের বাসায় রাত কাটালাম। আব্বু ব্যবসায়ী মানুষ দুদিন পর চলে গেলো। আমি থেকে গেলাম ছোট খালার কাছে। ওনার একটাই মেয়ে। একা একা তো আর সব সামাল দিতে পারেনা। খালুর ও অফিস আছে। তাই খালুও চলে গেলো ভোলাতে।
ছোট খালা অসুস্থ, এজন্য প্রিমা তিন চারদিন পর খালামণিকে দেখতে আসলো হসপিটালে। তখন সেখানে আমি, খালামণি আর খালাতো বোন ছিলাম। প্রিমা আসলো মাস্ক পড়ে। সালাম দিলো। টুকটাক কথা বললো।আমি তখন পর্যন্ত স্বাভাবিক ই ছিলাম। প্রিমার জন্য আমার এক সেকেন্ডর জন্য কিছু অনুভব হয়নি। তবে ও যখন বাসায় যেতে রওনা দিলো,তখন রাত হয়ে গেছে। আমিও গেলাম এগিয়ে দিতে। সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় কথায় কথায় আমার সেই অঙ্কে ভুল ধরার কথা জানালো। আমি তো আমিই।সব ভুলে গেছি। শেষে ওকে চাপাবাজি করে বললাম,
‘আসলে অঙ্কটা আমি কিন্তু পারতাম। তোমায় যাস্ট একটু বাজিয়ে দেখলাম।’
ও শুধু হাসলো আর কথা বাড়ায়নি। অবশ্য সারাটা সময় কথা আমিই বেশি বলেছি। ও শুধু চুপ করে শুনছিলো।
এপরেরদিন প্রিমার ফুফুর বাসায় গেলাম গোসল করতে।এইখানে সেইখানে শুয়ে আমার শরীর শেষ। হসপিটালে ঠিকমতো গোসল করা যায় না। মালিহা আন্টি আগেও অনেকবার আসতে বলেছিলো। কিন্তু চেনাজানা নাই এজন্য আসতে সঙ্কোচ হচ্ছিলো। ভেবছি খালু ছুটি পেলে আমি চলে যাবো। দুটো দিনের ব্যাপার কেটে যাবে। কিন্তু ছুটি ম্যানেজৎ করতে পারে নি খালু। অগত্যা আমার ই থাকতে হবে। এজন্য আর গাইগুই না করে মালিহা আন্টির সাথে তাদের বাসায় আসলাম। আমি ঝটকাটা খেলাম তখন ই। প্রিমা এসে দরজা খুললো। খুব সম্ভবত একটু আগে গোসল করেছে। মুখে বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা, মাথায় গামছা জড়ানো তার ওপর অর্ধেক ওড়না টানা। খুব স্নিগ্ধ একটা মুখ। আমাকে দেখে হেসে সালাম দিলো। আমার তখন যেনো কি হলো। বুকের মধ্যে কেমন জানি একটা করে উঠলো। বুঝলাম কিছু একটা গড়বড় হয়েছে।
এরপর গোসল করলাম,খাওয়া দাওয়া সারলাম। প্রিমা আর আমার সামনে আসলো না। তারপর বিকেলে জম্পেশ এক ঘুম দেখালাম। ঘুমের মধ্যেও স্বপ্নে দেখলাম সেই স্নিগ্ধ মুখখানির হাসি। মালিহা আন্টির ডাকে ঘুম ভাঙলো। উঠে বসলাম। এর একটু পড়েই প্রিমা এসে বসলো বিছানার পাশে। উদ্দেশ্য আমায় সঙ্গ দেয়া। কিন্তু বেচারি নিজেই কথা বলে কম। আমায় কি সঙ্গ দেবে। তাই চুপচাপ বসে রইলো।আমিই কথা বলা শুরু করলাম। সেদিন বিকালে পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত কথা বললাম। মাঝে এসে মালিহা আন্টি যোগ দিলো। আবার রান্না করতে চলে গেলো।আর আমি প্রিমাকে গল্প বলছিলাম।
আমি কথা বলি বেশি ঠিক আছে। তবে এতো ও বেশি বলিনা ঐদিন যতো কথা বলছিলাম। ঐদিন এতো কথা বেশি বলার উদ্দেশ্য ছিলো প্রিমাকে একটু ফ্রি করা। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হয়নি। সে যে মাথা নিচু করে আমার কথা শুনছিলো আর মুচকি মুচকি হাসছিলো মাথা আর উঠাই নি। ওর মাথা নিচু দেখতে দেখতে আমার ই ঘাড় ব্যাথা হয়ে যাচ্ছিলো। আমি পাঁচশ শব্দ বললে ও হয়তো এক লাইন বলতো। আর বাকি সময় হু ,জ্বি ,আচ্ছা এ বলেই কাটাচ্ছিলো। আমার জীবনে এতো ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে আমি এই প্রথম দেখলাম। এরপরে অবশ্য বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে প্রিমার সাথে,কথাও বলেছি অনেক। ও বরাবর এর মতো চুপ ই ছিলো। সপ্তাহখানেক পর আমি ঢাকা চলে আসলাম আর সাথে বরিশাল রেখে আসলাম আমার মনটাকে।
চলবে …..
