Saturday, June 27, 2026







শরতের কাশফুল পর্ব-১৪+১৫

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহজাবীন
#পর্ব_১৪

🔞 ভায়োলেন্স এলার্ট 🔞

“পালাবি কোথায়? খোল দরজা! আজ তোদের সবাইকে সাফ করে দেব!”

লোকটার গর্জনে কেঁপে ওঠে শ্রেয়া ও মম। পরের মুহূর্তেই কাঁধ থেকে ব”ন্দুক নামিয়ে জানালার দিকে তাক করলো সে। ট্রিগারে চাপ দিল পরপর কয়েক বার।

প্রথম গুলিটা কাঁচে আঘাত করতেই ঝনঝনিয়ে কেঁপে উঠলো পুরো জানালার ফ্রেম। মাঝখানে গুলিবিদ্ধ স্থানে বড় এক গোলাকার ফাঁক সৃষ্টি হলো। কিন্তু দ্বিতীয় গুলিটা ছোড়ার পর চৌচির হয়ে আশেপাশে ছিটকে গেল কাঁচের টুকরো। তৃতীয়বার ট্রিগার চাপতেই, খোলা জানালা দিয়ে এসে সেটা আঘাত করলো টেবিলের উপর সাজানো ফুলদানিতে। কাচের ফুলদানিটা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে গেল নিমিষেই। চারদিকে ছিটকে পড়লো এর ভাঙ্গা অংশগুলো।
এলোপাথাড়ি গুলিতে দেয়ালের প্লাস্টার খসে পরেছে। ধুলো, গান পাউডার, আর ছোট ছোট কাচের কনা বাতাসে মিশে ঘরটাতে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।

মমর হাতের চামড়ায় কাঁচের সূক্ষ্ম টুকরো উড়ে এসে বিঁধেছে। ঠোঁট চেপে ব্যথাটা সহ্য করে নিল মেয়েটা। গুলি ছোঁড়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে শ্রেয়া তাকে টেনে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। দুজনেই মাটির সাথে শরীর মিশিয়ে পড়ে আছে। মাথার ওপর দিয়ে গুলি ছুটে যাচ্ছে। দেয়ালে, কাঠের ফার্নিচারে, কাঁচে আঘাত লেগে বিকট শব্দ তুলছে। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে বারুদের গন্ধে।

মমর বুকটা দ্রুত গতিতে ওঠানামা করছে। গুলির শব্দ থেমে সবকিছু শান্ত হতেই, নিজের বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনতে পায় সে। সন্দেহ দানা বাঁধে মনে। আদো কি আজ বেঁচে ফেরা হবে?

এক জোড়া ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল এরপর। ভাঙা জানালার ফ্রেম ধরে লোকটা লাফ দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। তার হাতে কালো রাইফেল, চেহারায় ক্রোধ। সদর দরজায় আবারো প্রচণ্ড শব্দে আঘাত হানছে লোকটার সাথীরা। দূর্বল দরজাটা ভেঙে পড়বে যেকোন সময়। বাইরের চিৎকার চেঁচামেচি, বন্দুকের শব্দ, ভাঙা কাঁচে বুটের আওয়াজ, সব একসাথে মিলে জানান দেয়, পালানোর পথ নেই। অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় মম শ্রেয়ার দিকে। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবে বাইরে থেকে আসা আলোর ঝলকানিতে মমর ছলছল করে ওঠা অসহায় দৃষ্টি নজরে আসে শ্রেয়ার। দুজন কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে একে অপরের আতঙ্কিত চোখের দিকে।
হঠাৎ একটা ছায়া সামনে এসে দাঁড়ালো। ভাঙা জানালা দিয়ে ঢোকা লোকটা! এক ঝটকায় মমর চুলের মুঠি চেপে ধরে ওকে দাঁড় করালো। ভয় ও ব্যথায় মমর মুখ থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসে। শ্রেয়া উঠতে গেলে, লোকটা সজোরে পা দিয়ে একটা লাথি মারে তার মুখে। ছিটকে পড়ে শ্রেয়া কাচভাঙ্গা মাটিতে। নাকমুখ ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসে তৎক্ষণাৎ।

লোকটা নির্মম শক্তিতে মমকে পেছনে টেনে খাটের উপর নিয়ে ফেলে। দুহাত দিয়ে লোকটার হাত খামচে ধরে আটকাতে চাইলেও লাভ হয়না। লোকটা মমর মাথা শক্ত করে চেপে ধরে বিছানায়। মেয়েটার নাকমুখ চাপা পড়ে বিছানার তুলতুলে ফোমে। শ্বাস আটকে আসে তার। পেছনে থাকা লোকটা মমর উপর শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে ওর নড়াচড়া বন্ধ করে দেয়। এক হাতে ওর মাথা চেপে ধরে রেখে অন্যহাতে মমর হাতদুটো চেপে ধরে আটকে দেয় বিছানায়। নিঃশ্বাস নিতে না পেরে দমবন্ধ হয়ে মরার পথে মম।

হঠাৎ লোকটার হাতের বাঁধন শিথিল হয়ে যায়। মমর উপর থেকে সরে যায় লোকটার ভার। ছাড়া পেয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে অন্যপাশে সরে যায় মম। বাইরে থেকে আসা আলোর ঝলকানিতে সে দেখে শ্রেয়া দাঁড়িয়ে আছে বিছানার পাশে। লোকটা তার থেকে কয়েক ইঞ্চি দুরত্বে মাত্র। একটা বড় কাঁচের টুকরো বিধে আছে লোকটার গলার একপাশে। শ্রেয়ার চোখদুটো লাল। বড় বড় চোখে সে তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে। লোকটা হাত বাড়িয়ে বন্দুকটা ওঠানোর চেষ্টা করে। মমর সাথে ধস্তাধস্তির সময় পরে গিয়েছিল সেটা। কিন্তু তার আগেই শ্রেয়া বন্দুকটা একপ্রকার ছিনিয়ে নেয়। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করে লোকটার মুখে। মুখ থুবড়ে পড়ে যায় লোকটা মাটিতে। যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে সেখানে।

মম আতঙ্কে জমে আছে। শ্রেয়ার অবস্থাও খুব একটা ব্যতিক্রম নয়। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার হাত এখনো কাঁপছে। সেখানে লেগে আছে লোকটার তাজা গরম রক্ত। জীবন বাঁচানো হাত দিয়ে আজ দ্বিতীয়বারের মত কোন মানুষের প্রাণ নিয়েছে সে। না, মানুষ না, অমানুষ! সেদিনও সে একটা অমানুষকে মেরেছিল, আর আজও রক্ত ঝরিয়েছে আরেকটা অমানুষের।

তার নিচে পড়ে থাকা অমানুষটা আর নড়ছে না। লোকটার নিথর শরীরটা থেকে গরম রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। শ্রেয়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ। কিন্তু সময় তাদের থেমে থাকার সুযোগ দিল না। বাড়ির সামনের দিক থেকে বিকট শব্দ ভেসে এলো। মেইন দরজাটা ভেঙে ফেলেছে লোকটার সাথীরা।

“আপু!”

অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো মমর মুখ থেকে। দরজা ভাঙার শব্দে স্তম্ভিত ফিরে পেল সে। শ্রেয়া তখনও স্থির হয়ে ছিল। ভারী বুটের শব্দ দ্রুত এগিয়ে আসছে করিডোর ধরে। মমের শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে সে শক্ত করে শ্রেয়ার হাত চেপে ধরে ঝাঁকি দেয়।

“আপু! আমাদের পালাতে হবে! চলো!!!”

সশব্দে জোরে একটা শ্বাস টেনে নেয় শ্রেয়া। বেরিয়ে আসে ঘোর থেকে। ততক্ষণে মম শ্রেয়ার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে এসেছে ভাঙ্গা জানালার ফ্রেমের কাছে। ফ্রেমে আটকে থাকা কাচের টুকরো বিধে যায় হাতে, তবে ওরা থামে না। সেই ব্যথাটা নিঃশব্দে গিলে ফেলে বেরিয়ে আসে বাড়ির বাইরে। পেছনে থেকে শুনতে পায় লোকগুলোর গলার আওয়াজ।

“ওরা পালাচ্ছে!”

“ধর ওদের! একটাও যেন পালাতে না পারে! সবকটাকে শেষ করে দে!”

“ফা*! লাশ পড়ে আছে এখানে!”

ভাঙা জানালার ফ্রেমে ইতোমধ্যে ওদের ছায়া দেখা যাচ্ছে। লোকগুলো থামে না। ওরাও আসছে পিছু পিছু। মম ও শ্রেয়া ছুটছে প্রাণপণে।

চারপাশটা এখন আর স্বর্গভূমি মনে হচ্ছে না।

ধোঁয়ার গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে নিরপরাধ, অসহায় মানব মানবীর আত্মচিৎকার, হাহাকার, ছাড়া পাবার আকুতি। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে আগুন জ্বলছে বিভিন্ন ভবনে। জ্বলে ওঠা কমলা আভা অন্ধকার ভেদ করে জানান দিচ্ছে তার বিধ্বংসী প্রবৃত্তির। হামলাকারীরা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। থেকে থেকে গুলির শব্দে কেঁপে উঠছে নিস্তব্ধ রাতের প্রহর।

মম আর শ্রেয়া দৌড়াচ্ছে। তাদের নিঃশ্বাস আটকে আসছে, হাত পা কাঁপছে, কিন্তু থামার সুযোগ নেই।
পেছনে মৃত্যু খুব কাছ থেকে ধাওয়া করছে তাদের। একে অপরের হাত খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে তারা। প্রায় হোঁচট খেতে খেতে ছুটছে তারা লেকের পাশের গাছগাছালি ঘেরা অন্ধকার পথ ধরে। একটা ফ্ল্যাশলাইটের আলো এসে পড়ে তাদের উপর। পেছন থেকে লোকগুলো ফ্ল্যাশলাইটের আলো ছুঁড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে মেয়ে দুটিকে।

“ওখানে! ধর!”

“পালিয়ে যাবি কোথায়!”

লোকটা কোনো সময় নষ্ট করে না। সরাসরি বন্দুক তোলে গুলি ছোঁড়ার উদ্দেশ্যে। শ্রেয়া ও মম থামে না। দৌড়াতে থাকে প্রাণপণে। গাছগাছালির ভেতর দিয়ে প্রাণপণে ছুটে চলে। সামনে খোলা জায়গা। একটা ভবন। আশপাশটা খালি। অন্ধকার হওয়ায় সেদিকে এখনো আসেনি হামলাকারীরা। ভবনটার পেছন দিকে গিয়ে লুকায় ওরা। কিন্তু লোকগুলো পিছু ছাড়েনা। একটা গুলি তাদের পাশের গাছে আঘাত করে আগুনের ফুলকির মতো স্পার্ক ছড়িয়ে দেয়। তারপর আরেকটা! মম অনুভব করে, কিছু একটা তার চুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। গুলির শব্দ বন্ধ হলে পেছনে ভারী বুটের শব্দ ধেয়ে আসতে থাকে তাদের দিকে। থেমে থাকলে চলবে না। যেকোন মুহুর্তে ধরা পরে যাবে। মমর হাত ধরে শ্রেয়া আবার ছুটতে শুরু করে। গাছগাছালি ঘেরা ঢালের মত জায়গা। মমর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতরটা জ্বালা করছে তার। পা দুটো অবশ হয়ে এসেছে প্রায়।

হঠাৎ ওরা থেমে যায়। সামনে এগোবার আর জায়গা নেই। বিশাল উঁচু দেয়াল সামনে। হাইব্রিডার্স জোনের ধূসর, ঠান্ডা, পাথরের তৈরি প্রাচীর। হিউম্যান জোনের সীমানা দেয়াল! শ্রেয়ার একবার মনে হলো এই দেয়াল টপকে ওপারে যেতে পারলে হয়ত বেঁচে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই আশাহত হলো সে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। দেয়ালটা এত উঁচু যে ওপরে ওঠা অসম্ভব। প্রায় পঁচিশ ফুট উচ্চতার বিশাল বড় এই দেয়াল ভেদ করে উপরে ওঠার চিন্তা বৃথা।

মম স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সামনের দেয়ালটির দিকে। পথ শেষ! এখন কি করবে? কোথায় পালাবে? পেছনে বুটের শব্দ আরও কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। শ্রেয়া হাঁপাতে হাঁপাতে পেছনে তাকায়। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে। নাক থেকে এখনো রক্ত বের হচ্ছে। ঠোঁটের পাশের কাটা জায়গাটা জ্বলছে খুব। গলার একপাশ জুড়ে চোয়ালসহ কালসিটে দাগ পড়ে গেছে। কপালের কোণে চামড়া কেটে ঝুলছে। হাতের বিভিন্ন জায়গায় কাঁচের ধারালো অংশের আঘাতে চামড়া ছুলে গেছে। তালু ফেটে টপটপ করে গড়িয়ে পরছে তাজা রক্ত। মম সেই হাতটাই চেপে ধরে রেখেছে। একটা গোঙানির মতো শব্দ বেরিয়ে আসে মমর মুখ থেকে। কান্না আটকে রাখতে পারছে না মেয়েটা আর।

সামনে দেয়াল, পেছনে শত্রু। আর মাঝখানে, দুজন অসহায় মানুষ, আটকা পড়ে আছে রাতের অন্ধকারে।

ভারী বুটের শব্দ এসে থামলো ঠিক তাদের সামনে। মমকে নিজের পেছনে ঠেলে সরিয়ে দেয় শ্রেয়া। চেষ্টা করে মেয়েটাকে আড়াল করে রাখার।

“প্লীজ!”

হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপা গলায় অনুরোধ করে শ্রেয়া। চারজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। বয়স ঠাহর করা মুশকিল। তবে সবাই তাকিয়ে আছে হিংস্র চোখে। যেমনটা শিকারি তাকিয়ে থাকে তার শিকারকে কোণঠাসা অবস্থায় পেয়ে। একজনের হাতে ছোট একটা শর্টগা”ন। একজন কাধে ঝুলিয়ে রেখেছে একটা রাইফেল। দুজনের হাতে তীক্ষ্ম ধারালো ছুরি। লম্বা ছুরির আঁকাবাকা ফলা চকচক করছে চাঁদের আলোতে।

“আমাদেরকে ছেড়ে দাও। আমরা কি ক্ষতি করেছি তোমাদের? কেন মারতে চাইছো?”

“ছেড়ে দেব? তোদের?”

ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো ওদের। খ্যাক খ্যাক শব্দ করে বিচ্চিরিভাবে হাসতে লাগলো আরেকজন।

“শয়তানের সহযোগী তোরা! ওদের হাতের খেলনা! তোরা তো বুঝিসও না। ওরা ধোঁকায় ফেলে ভোগ করছে তোদের!”

একদলা থু থু মাটিতে ফেলে ঘৃণা মেশানো রাগী স্বরে বললো গান হাতে দাঁড়ানো লোকটা।

“না, তোমরা ভুল করছো। আমরা কিছু করিনি। আমাদের ছেড়ে দাও, প্লীজ!”

বাঁচার আকুল ইচ্ছায় আবারো অনুরোধ করলো শ্রেয়া। চোখদুটো ছলছল করছে তার। পেছনে মম নীরবে চোখের পানি ফেলছে। এক হাতে মুখ চেপে ধরে রেখেছে, যাতে শব্দ বের না হয়।

“আমরা সব জানি! তোরা সবকয়টা বে”শ্যা। ঐ পশুগুলোর সাথে কি করে বেরাস, সব খবর আছে!”

“তোদের কারণে আমাদের মা বোনরাও উচ্ছন্নে যাচ্ছে! রাস্তায় নেমে ঐ কুত্তাদের পাবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে! ছিঃ! কি ন”গ্ন, জঘন্য খেলার সূচনা!”

“ওরাই সব নষ্টের মূল! ওই অর্ধমানবদের অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন তোদের মত মেয়েমানুষরা পথভ্রষ্ট হতে থাকবে। এমনিতেই মেয়েদের মাথায় বুদ্ধিসুদ্ধি নেই, তাই তদের কাবু করে দাস বানানো সবচেয়ে সহজ।”

“ভাই, এই মেয়েগুলোকে মারার আগে শুদ্ধ করে নিলে হয়না? বেশি সময় লাগবে না।”

গান হাতে দাঁড়ানো লোকটাকে উদ্দেশ্যে করে বললো পাশেরজন। শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে তাকে আপাদমস্তক দেখে নিল সে। সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট ছিল লালসা। ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠলো শ্রেয়ার। তার মনে হচ্ছে যেন একটা নোংরা কুকুর জিব্বা বের করে লালা ঝরাচ্ছে তার দিকে চেয়ে। শুদ্ধ করার মনে যে কি, সেটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না শ্রেয়ার।

“ভালো বলেছিস। অনেক দৌড়েছি ***গুলোর পেছনে। এত সহজে মারলে কি হয়!”

বলেই প্রশস্ত হাসলো গান হাতে দাঁড়ানো লোকটা। তার কথায় সন্তুষ্ট হয় পাশের দুই সাথী। হলদে দাঁত বের করে হেসে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে শুরু করে মেয়ে দুটোর দিকে। শ্রেয়ার মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সে অসহায় চোখে। কোথায় যাবে, কি করবে,কিছুই ভাবতে পারছে না সে। এমন অবস্থায় হুট করে পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা গাছের ডাল তুলে নেয় মম।

“খবরদার কাছে আসবি না!”

দুহাতে শুকনো খড়খড়ে ডালটা শক্ত করে চেপে উঁচু করে ধরে সে। সেটা দেখে আরেকপ্রস্থ হাসির রোল পরে গেল লোকগুলোর মাঝে।

“কাছে তো আমরা আসবো বেবী। আর তারপর তোমাকে আদরও করবো। চিন্তা করো না! ঐ পশুগুলোর চেয়ে বেশীই আরাম দেব তোমাকে। একবার সুযোগ তো দাও!”

বলেই আবারো হেসে উঠলো ওরা। মমর চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। এগিয়ে আসা লোকটাকে হাতের ডালটা উঁচিয়ে মারতে গেলে সে ধরে ফেলে সেটা। এক ঝটকায় মমর হাত থেকে টেনে ফেলে দেয় সরু ডালটা। ঝাঁকি খেয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে পরে যাওয়ার দশা মমর। পেছন থেকে শ্রেয়া জাপটে ধরে আগলে নেয় তাকে।

“প্লীজ! ছেড়ে দাও! যেতে দাও আমাদের!”

বৃথা জেনেও আরেকবার আকুতি মিনতি করে শ্রেয়া। কিন্তু সেটা কানে তোলেনা লোকগুলো।এগিয়ে এসে শক্ত একটা হাত শ্রেয়ার বাহু চেপে ধরে তাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। মম চিৎকার করে ওঠে। ওর হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধছে একটা লোক।

“ছাড়ো!”
এদিকে শ্রেয়ার উপর ঝাপিয়ে পড়েছে দুজন। শ্রেয়া লাথি মারার চেষ্টা করলো, কিন্তু আরেকজন তার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়ে শক্ত করে ওর মাথাটা বাড়ি মারলো গাছের শুকিয়ে যাওয়া কান্ডে।

“আপু!!!”

মম মরিয়া হয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। নখ বসিয়ে দিচ্ছে লোকটার হাতে, শরীর মোচড়াচ্ছে। কিন্তু কোন লাভ হলো না। লোকটা বিরক্ত হয়ে একটা গালি দিল তাকে। তারপর একটা ঘুষি এসে পড়লো তার মুখে। কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসে।

পাশেই শ্রেয়া লড়ছে এখনও। সে একজনের মুখে কনুই মেরে নাক ফাটিয়ে দেয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তার পেটে পরপর দু তিনটা লাথি বসিয়ে দেয়। এরপর তাকে সোজা করে তার পেটের উপর বসে পরে লোকটা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে শ্রেয়ার। বিন্দুমাত্র নড়চড় করার শক্তি পায়না সে। লোকটা আবারো শ্রেয়ার চুলের মুঠি ধরে ওর মুখটা উপরের দিকে টেনে তুলে। তীক্ষ্ম চুরির ফলা ওর গলায় ঠেকিয়ে বলে,

“চুপ করে শুয়ে থাক! আরেকবার নড়লে ছুরিটা সোজা গলায় ঢুকিয়ে দেব!”

নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে থাকে শ্রেয়া লোকটার দিকে। চাঁদের আলোতে চারপাশটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সে আলোতে লোকটার চোখে শ্রেয়া দেখে, শুধু নিষ্ঠুরতা।
অভ্যাসে পরিণত হওয়া নিষ্ঠুরতা! ভয়হীন, যুক্তিহীন, লাগামহীন নিষ্ঠুরতা!

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহজাবীন
#পর্ব_১৫

শ্রেয়া মাটিতে পড়ে আছে। ধুলো আর রক্তের কারণে চেহারা স্পষ্ট বোঝা দায়। লোকটা এখনো তার উপর চেপে বসে আছে। এক হাতে ধারালো ছুরিটা ঠেকিয়ে রেখেছে ঠিক তার গলার মসৃণ চামড়ায়। অন্য হাতের অবাধ্য বিচরণ এখন তার শরীরে। ছুরির ঠান্ডা ধার চামড়া ভেদ করে। এক ফোঁটা রক্ত ধীরে গড়িয়ে নামছে সেখান থেকে। অন্যদিকে মম মরিয়া হয়ে লড়ছে। হাত বাঁধা অবস্থায় ওকে উপুড় করে মাটিতে ফেলে হাঁটু দিয়ে ওর পিঠ চেপে আটকে রেখেছে আরেকজন। মম শরীর মোচড়াচ্ছে, লাথি মারছে, কিন্তু লোকটার শক্তির সামনে সব ব্যর্থ।

শ্রেয়া নড়ারও সাহস পাচ্ছে না। গলায় আটকে আছে এক গগনবিদারী হাহাকার। এতটুকু শক্তি অবশিষ্ট নেই তার শরীরে। এই কি তবে ছিল নিয়তি?
একবুক স্বপ্ন নিয়ে যে কিশোরী মেয়েটা চীনের মাটিতে পা রেখেছিল, এটাই কি তবে সেই স্বপ্নের মৃত্যু?
নরকের বিভীষিকা স্বচক্ষে দেখবে জেনেও যে অদম্য সাহস নিয়ে প্রবেশ করেছিল সাপের গুহায়, সেই সাহসের সমাপ্তি কি তবে এই?

চোখজোড়া জোর করে বন্ধ করে রাখে শ্রেয়া। কল্পনায় নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায় বাস্তবতা থেকে। ঠিক তখনই তার মুখে গরম তরলের ছিটকে পরার অনুভূতি পেয়ে চোখ মেলে পিটপিট করে তাকায় সে। আর চোখের সামনে যা দেখে, সেটা স্তব্ধ করে দেয় তাকে। শ্রেয়ার উপরে চেপে বসে থাকা লোকটা স্থির হয়ে আছে। চোখজোড়া নিষ্প্রাণ। দুই সেকেন্ড আগেও যে চোখে হিংস্রতা ছিল, সেখানে এখন শুধুই শূন্যতা। ঠোঁটের কোণে এখনো সেই লালসা ও ক্রোধের মিশ্র হাসিটা বিদ্যমান। তবে সেটাও স্থির, নিঃশেষ হয়ে গেছে আজীবনের জন্যে। আর তার কারণ লোকটার কপালের ঠিক মাঝ বরাবর ফুটে ওঠা ছোট্ট, কালো একটা ছিদ্র। সেটা বেয়ে গড়িয়ে পরছে গাঢ় লালচে কালো তরল।

সবকিছু যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেছে। শুধু হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে আসন্ন নির্মমতার গোপন সুর!

লোকটার নিথর শরীর ঢলে পড়ে শ্রেয়ার গায়ের উপর। স্তম্ভিত দশা থেকে কেঁপে ওঠে শ্রেয়া। কোনমতে দুহাতে প্রাণহীন লা”শটা ঠেলে সরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দূরে সরে আসে সে। জোরে জোরে টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছে মেয়েটা। চারপাশ স্তব্ধ। এতটা আচমকা, এতটা নিখুঁত মৃত্যু!
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেউ নড়তেও ভুলে যায়। মমকে চেপে ধরা লোকটার হাত ঢিলে হয়ে আসে। ওকে ছেড়ে দিয়ে নিজের অবশিষ্ট দুই জীবিত সাথীর দিকে তাকায় লোকটা। চেহারায় ফুটে উঠেছে অবিশ্বাস ও উদ্বিগ্নতা। একসাথে ঘুরে দাঁড়িয়ে চারপাশে নজর বুলাতে শুরু করে ওরা।

“কে?!”

মাটিতে অবহেলায় পরে যাওয়া ফ্ল্যাশলাইটটা তুলে নেয় দ্রুত। ফ্ল্যাশলাইটের আলো গাছের গায়ে, দেয়ালে, ছায়ার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে থাকে। কিন্তু কাউকেই দেখা যায় না। ধোঁয়ায় ভরে আছে চারপাশ। পোড়া বারুদের গন্ধ, মাটির সোঁদা গন্ধ আর রাতের কুয়াশা মিশে পুরো জায়গাটাকে অবাস্তব, অলৌকিক করে তুলেছে। ঠিক সেই ধোঁয়াশার ভেতর থেকেই আবির্ভাব হয় তার। অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটা ছায়া বেরিয়ে আসে। নিঃশব্দে পা ফেলে এগিয়ে আসে সে। পায়ের নীচে পরে থাকা শুকনো পাতা ও খড়কুটো গুলোও ধর্ম ভুলে স্তব্ধ হয়ে থাকে।
উচ্চতায় অস্বাভাবিকভাবে লম্বা, চওড়া কাঁধ, শক্ত গড়নের অবয়বটিকে স্পষ্ট দেখা না গেলেও, বোঝা যায় সেটি কোন সাধারণ মানুষের নয়। চলাফেরার মধ্যে এমন নিয়ন্ত্রিত ভারসাম্য রেখে অন্ধকারের সাথে মিশে থাকা এই অবয়বটি নিশ্চিত একজন হাইব্রিডার্সের।

দৃশ্যমান হওয়ার সাথে সাথেই হামলাকারীরা বন্দুক তুলে তাক করে ধরেছে তার দিকে।

“থামো! ওখানেই থেমে যাও!”

বন্দুকধারী লোকটা চিৎকার করে ওঠে।

অবয়বটি সঙ্গে সঙ্গে থামে না। সে একই গতিতে আরো কয়েক কদম সামনে এগিয়ে আসে। লোকগুলো ফ্ল্যাশলাইটের আলো ছোড়ে তার দিকে। নীল জিন্সের প্যান্ট ও কালো হুডিতে ঢাকা অবয়বটির মুখে তাক করে সেটা। ফ্ল্যাশলাইটের সাদা আলোতে জ্বলে উঠলো তার চোখের কালো মণি। বিদ্বেষহীন নির্লিপ্ত দৃষ্টি তার। বাদামি চুলগুলো পরিপাটি, সুবিন্যস্ত।

হামলাকারীদের চোখে প্রথমে বিভ্রান্তি, তারপর স্পষ্ট আতঙ্ক ফুটে ওঠে। শরীর শক্ত করে টানটান হয়ে দাঁড়ায় তারা। মম কাত হয়ে পরে আছে মাটিতে। আগন্তুক একজন হাইব্রিডার্স বুঝতে পারলেও, তাকে চিনতে পারে না সে। কিন্তু শ্রেয়ার বুকের ভেতরটা ধ্বক করে ওঠে। সে চিনতে পেরেছে ঠিকই।

এই সে, যাকে নিয়ে স্বর্গভূমিতে ফিসফিস করে কথা বলা হয়। নরক থেকে মুক্তি পাওয়া বিচ্ছিন্ন ও বিভ্রান্ত হাজার হাজার হাইব্রিডার্সদের পথ দেখিয়ে একত্রিত করা নায়ক। স্বর্গভূমিতে যার কথাই আইন, হাইব্রিডার্সদের লিডার ও HCO-এর প্রেসিডেন্ট,

ন্যায়।

তার চেহারায় কোনো রাগ নেই, নেই কোনো নাটকীয় অভিব্যক্তি। লক্ষণীয় শুধুই ঠান্ডা, ভয়ংকর স্থিরতা।

“হাইব্রিডার্স!…”

লোকগুলোর একজন দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে উঠলো। হাতের গানটা আরো শক্ত করে চেপে ধরে নিশানা নির্ধারিত রাখলো সে।

“অবশেষে! একটা তো বের হয়েছে গর্ত থেকে!”

“কতক্ষন আর লুকিয়ে থাকবে? আজ ওদের সবকয়টাকে পুঁতে রেখে যাবো এখানে।”

ওদের কথোপকথন নীরবে শোনে ন্যায়। বুকে দুহাত গুজে পাশে থাকা মোটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে আরাম করে দাঁড়ায় সে।

“দেখেছিস? একদম মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে।”

কুৎসিতভাবে হাসলো ফ্ল্যাশলাইট হাতে দাঁড়ানো লোকটা। তবে তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে উদ্বিগ্নতা। ন্যায়কে এত শান্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছে ওরা। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অস্বস্তি। সেটা ঢাকতে মাটিতে একদলা থু থু ফেলে সে আবারও বললো,

“কিন্তু ভেতরে তোরা সবাই জানোয়ার! পশুর চেয়েও অধম। পশুরা অন্তত হুকুম মেনে মনিবের ভক্তি করতে জানে। তোরা তো সেটাও জানিস না!”

“বাকিগুলো কোথায়? নাকি তোকে একা পাঠিয়েছে মরতে?”

“বাকিগুলো মনে হয়, ভয়ে গর্তে ঢুকে আছে। চিন্তা নেই, গর্তের ভেতরেই মেরে মাটি চাপা দিয়ে দেব তোদের!”

ন্যায় এবারও কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঐ অস্বাভাবিক রকমের শান্ত চোখগুলো স্থির থাকে লোকগুলোর উপর।
লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকায় একপলক।
তাদের গলায় জোর আছে, হাতে বন্দুকও আছে,
তবুও অদ্ভুতভাবে দূরে দাঁড়ানো শত্রুর শীতল, শান্ত দৃষ্টিতেই ঘাম ছুটে যাচ্ছে।

ন্যায়ের কানে লাগানো ছোট্ট ব্লুটুথ ডিভাইসটায় ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে। ঘোস্টের নিচু, নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠ।

“Everything’s ready.”

এক সেকেন্ড বিরতির পর ধীরে ধীরে গণনা শুরু হয়।

“Five…”

“Four…”

“Three…”

“Two…”

“One…”

“Now.”

শব্দটা কানে আসতেই ন্যায়ের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা ফিচেল হাসি ফুটে ওঠে। এই প্রথম নীরবতা ভেঙ্গে সে সরল শান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,

“আফসোস! তোমাদের কপালে এক মুঠো মাটিও জুটবে না।”

কথা শেষে মাথাটা সামান্য কাত করে তাকায় সে প্রাচীরের একদম কর্ণারের দিকে। লোকগুলোও অজান্তেই তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘুরে তাকায় সেদিকে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড ঘন কুয়াশা আর অন্ধকারে কিছুই স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।
কিন্তু তারপরই প্রাচীরের উপর অন্ধকার থেকে উঠে দাঁড়ায় একটা অবয়ব।
পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভারী কালো পোশাকে আবৃত, পায়ে কালো কমব্যাট বুট, মাথায় হেলমেট, হাতে কালো গ্লাভস। স্থির হয়ে দাঁড়ায় সে দেয়ালের উপর। তার পাশেই আড়াই ফুট দূরত্বে আরেকজন উঠে দাঁড়ায়। একই পোশাকে, একই ভঙ্গিমায়।

তারপর আরেকজন।

তার পাশে আবার আরেকজন।

একজন…
দুজন…
পাঁচজন…

মুহূর্তের মধ্যেই প্রাচীরের পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে একে একে উঠে দাঁড়াতে থাকে কালো অবয়বগুলো। চারদিক থেকে। যতদূর চোখ যায়, সীমানা জুড়ে উঠে দাঁড়ায় নীরব সৈন্যদল। প্রায় বিশ থেকে বাইশ জন হবে হয়ত। কেউ না কোন শব্দ করছে, না কোন কথা বলছে। শুধু নিখুঁত সমন্বয়ে তারা নিজেদের অবস্থান নিচ্ছে দেয়ালের উপর। পুরো জায়গাটাকে ঘিরে ফেলেছে তারা উপর থেকে।

হামলাকারীদের মুখের ভাব বদলে যায়। ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে তাদের চেহারা। কিছুক্ষণ আগেও যারা গর্জন করছিল, এখন তাদের চোখে প্রথমবারের মতো আতঙ্ক ফুটে ওঠে। কারণ এটা কোনো সাধারণ প্রতিরোধ নয়, বরং পরিকল্পিত, ছক কষে সাজানো। শিকারিরা হঠাৎ বুঝতে পারে, এবারে তাদের শিকার হবার সময় এসেছে। দেয়ালের উপর সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা কালো অবয়বগুলোর দিকে তাকিয়ে, দিশেহারা হয়ে পড়ে তারা। অ”স্ত্রগুলো এখন দিশাহীন, ট্রিগারে আঙুলের দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলেছে লোকগুলো।

চারপাশে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে, যেখানে নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দটাও জোরালো শোনাচ্ছে। ঠিক তখনই, সেই নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে আসে একটা শব্দ। মৃদু, কিন্তু গভীর এক হিংস্র গর্জন ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকা জুড়ে।
লোকগুলো চমকে তাকানোর আগেই দেয়ালের উপর থেকে একটা কালো ছায়া সোজা নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এত দ্রুত, যে মানুষের স্বাভাবিক চোখ সেটা অনুসরণ করতে অক্ষম।
শ্রেয়ার পাশে রা”ইফেল হাতে দাঁড়ানো লোকটার উপর ঝাপিয়ে পড়েছে ছায়াটা। হাড় ভাঙার বিকট শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় খোলা জায়গাটায়। মুখ থেকে আওয়াজ বের করার সুযোগটাও পায়না লোকটা।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লোকটার নিথর শরীরটা গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। রক্ত ছড়িয়ে লাল হয়ে ওঠে ঘাসে আবৃত জমিন।

সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে যে বাকিরা কয়েক মুহূর্ত বুঝতেই পারে না ঠিক কী হলো। শ্রেয়া টলতে টলতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তার শরীর কাঁপছে,
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রক্ত, ধুলো, ব্যথা, সব মিলিয়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে তার। কাঁপতে থাকা হাঁটুজোড়া শরীরের ভর বইতে অস্বীকৃতি জানায়। একদিকে হেলে পড়ে যাচ্ছিল সে। ঠিক তখনই, মাত্র রক্তের ফোয়ারা ছোটানো সেই কালো ইউনিফর্মের হাইব্রিডার্স এসে ধরে ফেলে তাকে। শক্ত দুটো হাত তাকে আগলে নেয় বুকের কাছে।

চোখ খুলে রাখা দায় হয়ে যাচ্ছে শ্রেয়ার। কিন্তু তবুও মুখ তুলে তাকায় সে। হেলমেটের আড়ালে ঢাকা মুখটা দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। সে জানে, কে আছে এই মুখোশের আড়ালে। ঠিক যেমন কঠিন খোলসের আড়ালে লুকিয়ে রাখা তার হৃদয়টাকে চেনে, ঠিক সেভাবেই চেনা তার এই স্পর্শটা। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও শ্রেয়ার অশান্ত হৃদয়টা শান্ত হয়ে আশ্রয় খুঁজে নেয় তার বুকে।

হয়ত শ্রেয়ার মনের ভাব বুঝতে পেরেই, হেলমেটটা খুলে রাখে আক্রোশ। কিছু বলে না সে। শুধু তাকে শক্ত করে ধরে রাখে বুকের মাঝে। শ্রেয়া দুর্বল হাতে তার গালটা স্পর্শ করতে চায়। কিন্তু ক্ষতবিক্ষত শরীরটা আর চলতে চাইছে না। হাতটা পরে যাবার আগেই আঁকড়ে ধরে আক্রোশ। টেনে এনে সেটা নিজের গালে ছোঁয়ায়। শ্রেয়া পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় কিছুক্ষন তার দিকে। চোখের কোনে জল জমেছে, ঠোঁটের অগ্রভাগে জমা আছে কিছু কথা। কিন্তু দুটোই অন্তর্নীল রয়ে যায়। শেষবারের মতো আক্রোশের দ্রুত ওঠানামা করতে থাকা হৃদপিণ্ডের শব্দ শোনে শ্রেয়া। তারপর আঁধারের সাথে লড়াই থামিয়ে দেয় সে।

জ্ঞান হারিয়েছে শ্রেয়া। সেটা বুঝতে পেরে আবারো এক হিংস্র গর্জন বেরিয়ে আসে আক্রোশের বুকের গভীর থেকে। তবে তাতে এবার ক্রোধের সাথে মিশে আছে ভয়, অসহায়ত্ব এবং বুকফাটা আর্তনাদ।

বাকি দুজন হামলাকারী এখন পুরোপুরি আতঙ্কিত। তাদের চোখ একবার যাচ্ছে দেয়ালের উপর, চারপাশে, আবার সামনে দাঁড়ানো ন্যায়ের দিকে। একে একে আরো কয়েকজন নেমে এসেছে নীচে। যেদিকেই তাকাচ্ছে, শুধু কালো পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা হাইব্রিডার্স। পালানোর পথ নেই। ঠিক কিছুক্ষন আগে যেমনটা ছিল না শ্রেয়া ও মমর। কত দ্রুত উল্টে গেছে দৃশ্য!
গান হাতে দাঁড়ানো লোকটা এবার মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে এসে মমকে টেনে তুলে দাঁড় করায় নিজের সামনে। তার বাহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গলা বরাবর হ্যান্ডগা’নটা ঠেকিয়ে দেয়।

“কেউ কাছে আসবে না! খবরদার! নইলে কিন্তু মেয়েটাকে শেষ করে দেব!”

গলা কাঁপছে লোকটার। আরেকজন দ্রুত পাশে এসে দাঁড়ায় তার সাথীর। এক হাতে ছুরি, আর অন্য হাতে মমর আরেক বাহু চেপে ধরে তাকায় সে চারদিকে। মমর গলা শুকিয়ে আছে। গলায় দেবে থাকা গানটার ধাতব স্পর্শে তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। এই দুঃস্বপ্ন কি আর শেষ হবে না?

লোকগুলো ধীরে ধীরে পেছাতে শুরু করে। সাথে টেনে নিয়ে যেতে থাকে মমকে। হঠাৎ ডানপাশের গাছের আড়াল থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে আসে। অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে, লোকগুলো কোন প্রতিক্রিয়া করার আগেই কালো পোশাকের এক হাইব্রিডার্স সরাসরি মমর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক ঝটকায় সে মমকে নিজের দিকে টেনে নেয়। শক্ত হাতে তার মাথা ও শরীর লুকিয়ে ফেলে নিজের বিশালকায় দেহের মাঝে। ব্যালেন্স হারিয়ে মমকে নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে সে। তবে নিজের শরীর দিয়ে আগলে রাখার কারণে ব্যথা পায়নি মম। শুধু আচমকা ঝাঁকি খেয়ে ভয়ে কুঁকড়ে যায় সে।

ঠিক একই সময়ে আরেকজন হাইব্রিডার্স ঝাপিয়ে পড়েছিল মমকে ধরে রাখা লোক দুটোর উপর। নিজের শ্বাস সামলে যতক্ষণে মমর হুশ হয়, ততক্ষণে সেই দুজনের অস্তিত্বও মুছে ফেলা হয়েছে পৃথিবী থেকে। সবকিছু ঘটে যায় এত দ্রুত, যে মম পরিস্থিতিও ঠিকমতো আঁচ করতে পারে না। তার মনে হচ্ছে, এখনো ঐ লোকগুলোই তাদের ধরে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে জড়িয়ে ধরে রাখা হাইব্রিডার্সের সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করে সে। হাতজোড়া ছাড়া পেতেই এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে সে সামনের ছেলেটাকে। ছেলেটা ওকে শান্ত করতে চাইলেও লাভ হয়না। জোরে জোরে চিৎকার করতে শুরু করে সে। অশ্রু জমে ঝাপসা হয়ে আসে চোখ দুটো। অঝোরে গড়িয়ে পরতে শুরু করে তারা। মমকে একহাতে আগলে কোনমতে হেলমেটটা খুলে ফেলে ছেলেটা।

“মোমো! মোমো, তাকাও আমার দিকে! আমি মুহূর্ত!”

বেশ কয়েকবার ডাকার পর একটু স্থির হয় মম। মুহূর্তের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর আবারো ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটা।

“মুহূর্ত!”

“হ্যাঁ, আমি।”

দুহাতে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মম। কান্নাভেজা কণ্ঠে অবুঝের মত প্রশ্ন করে,

“তুমি এসেছো?”

বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো মুহূর্তের। হ্যাঁ, এসেছে সে। কিন্তু যদি আরেকটু দেরি হয়ে যেত…

“এসেছি। একটু দেরি হয়ে গেছে।”

“ওরা! ঐ লোকগুলো….ওরা আমাদের তাড়া করছিল, জানো?”

“আর করবেনা। আমি আছি তো।”

বাঁধ ভাঙা অশ্রুরা থামার নাম নেয় না। বরং আরো অবাধ্য হয়ে পড়ে। মুহূর্তকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাদতে শুরু করে মম। কান্নার মাঝে হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে,

“তুমি… তুমি তো….ছিলে না। ওরা….ওরা…ভীষণ খারাপ! তুমি…তুমি….কেন…”

হেঁচকি উঠে গেছে মমর। কান্নার তোড়ে কথা বলতে পারছে না ঠিকমতো। মুহূর্তের মনে হচ্ছে যেন কেউ হাতুড়ি পেটা করছে তার হৃদপিন্ডটাকে। সে কি আসতে খুব বেশিই দেরি করে ফেললো? কিন্তু সে তো জানতোই না যে মোমোটা এখানে আছে। সে তো ভেবেছিল, মোমো হোস্টেলে বাকি মেয়েদের সাথে সুরক্ষিত। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে মুহূর্তের। একই সাথে মমর প্রতিটা কান্না সূক্ষ্ম সূচের ফলার মত বিধে তার বুকে। সেখান থেকে নিচু স্বরে একটা গরগর আওয়াজ বেরিয়ে আসে। কেঁপে ওঠে মম। তবে আরো শক্ত করে মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে রাখে মম। অন্যদিকে তাকে দুহাতে আগলে ধরে তার চুলে মুখ গুজে দেয় মুহূর্ত। শরীর কাপছে মমর। কান্নার বেগ কমেনি একটুও। মুহূর্ত ওকে থামানোর চেষ্টা করে না। শুধু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। আর ফিসফিস করে একবার বলে,

“আর কক্ষনো না মোমো। আর কোনদিন তোমাকে একা ছাড়বো না। কারো ভরসায় না! সবসময় থাকবো আমি। শেষ নিঃশ্বাস অবধি। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে। প্রমিজ!”

***

চলবে….

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ