Saturday, June 27, 2026







শরতের কাশফুল পর্ব-১৩

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন

#পর্ব_১৩(১)

অন্ধকার নেমে এসেছে স্বর্গভূমির আকাশে। হোস্টেলের লবির বড় কাঁচের জানালাগুলোতে বাইরের অন্ধকার শুধু অস্পষ্ট ছায়া হয়ে ভেসে আছে। সময়টা চলছে খুব ধীরে। কোন তাড়াহুড়ো নেই। দেয়ালে টাঙ্গানো বড় ঘড়িটার টিকটক শব্দটা বড্ড শ্রবনকটু শোনাচ্ছে আজ।

মম ধীরে ধীরে চোখ খোলে। মস্তিষ্ক এখনো সচল হয়নি পুরোপুরি। ঘুমের ঘোরে আছে সে। প্রথমে কিছুই ঠহর করতে পারে না। স্মৃতির পাতায় ঝাপসা মনে হয় সবকিছু। তারপর ধীরে ধীরে তার মনে পরে। চোখের সামনে গরম লোহার শিক, আর উপর থেকে ধেয়ে আসা কয়লা!

সোফার উপর আধশোয়া অবস্থায় ছিল মম। দৃশ্যটা মনে পরতেই চট করে উঠে বসলো সে। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে শান্ত হলো মেয়েটা। চারপাশে কিছুটা কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে সে এখন। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, মনে নেই তার। লবির আলো কমিয়ে রাখা হয়েছে। নরম হলুদ আভা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। কাউকে দেখতে পেল না মম। রাত তেমন গভীর না হলেও, দিনভর দৌড়াদৌড়ি, হাসাহাসি, কোলাহলের পর ক্লান্ত সবাই।

চোখের সামনে হঠাৎ একটা পানিভর্তি গ্লাস ধরলো কেউ। চোখ তুলে উপর তাকিয়ে মম দেখলো, সামনে চেরী দাঁড়িয়ে আছে। চেরীর হাত থেকে গ্লাসটা নিল মম। ধীরে ধীরে দু ঢোক পানি পান করলো সে।

“এখন কেমন লাগছে?” মমর পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো চেরী।

“ভালো। ঠিক আছি।”

ছোট্ট করে উত্তর দিল মম। চেরী ওর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চেহারায় চিন্তার ছাপ। তবে কি ভাবছে সেটা বোঝা দায়। কিছুক্ষন পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে জিজ্ঞেস করলো,

“তোমার সাথে মুহূর্তের সম্পর্ক কেমন? কতদূর গড়িয়েছে? আমি তো তোমার গায়ে ওর গন্ধ পাইনি কখনও।”

চেরীর কথা শুনে থমকে গেল মম। তার কথার আগামাথা বা উদ্দেশ্য কোনটাই বোধগম্য হলো না। আমতা আমতা করে মম কপাল কুঁচকে বললো,

“আমি…মুহূর্ত…আমারা ভালো বন্ধু হয়ে গেছি বলতে পারো। হ্যাঁ, বন্ধু বলাই যায়।”

ভ্রুজোড়া কুচকে ওর দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো চেরী।

“একটা ছেলের সাথে আবার কিসের বন্ধুত্ব?”

এই প্রশ্নের উত্তর মাথায় এলো না মমর। ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করা কি মানা?

“আমি…আসলে…”

“তুমি কিছুদিন পর চলে যাবে স্বর্গভূমি থেকে। মুহূর্তের সাথে শুধু শুধু ঘনিষ্টতা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। তুমি তো চলে যাবে, কিন্তু ছেলেটাকে ভেঙে রেখে দিয়ে যাবে।”

কথা বলতে বলতেই উঠে চলে গেল চেরী। আর মম ললাটে ভাঁজ নিয়ে তাকিয়ে রইলো শুধু। একটু পর অবশ্য ফিরে এলো সে। একটা চাবি হাতে তার।

“চলো, তোমাকে ডক্টরের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।”

“আমার না আজকে তোমাদের সাথে থাকার কথা?”

“না, আমরা তোমাকে আর রাখবো না। তুমি ফিরে যাও।”

মম কিছুটা মর্মাহত হলো চেরীর রুক্ষ ব্যবহারে। সে বুঝতে পারলো না, যে হঠাৎ করে এরকম আচরণ কেন করছে তার সাথে চেরী। শুধুমাত্র সেই ছোট্ট দুর্ঘটনার কারণে? তার কারণে ওদের পার্টি নষ্ট হয়েছে বলেই কি এমন ব্যবহার? কিন্তু সে ইচ্ছে করে তো কিছু করেনি। সবটা হুট করে হয়ে গেছে।

“কি হলো? ওঠো!”

চেরী তাড়া দিয়ে উঠলো তাকে। মমর চোখ ভিজে এলো অপমানে। এভাবে তাকে নিজেদের মধ্যে জায়গা দিয়ে এখন তাড়িয়ে দেবার মানে কি? সে তো নিজে থেকে আসেনি, তবে? কথা না বাড়িয়ে উঠে দাড়ালো মম। চেরী এগিয়ে গেল দরজার দিকে। মমও চুপচাপ তাকে অনুসরণ করতে লাগলো। বাইরে পার্ক করা একটা জিপে চড়ে বসলো তারা।

জিপের ইঞ্জিনের মৃদু আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না এখন। রাতের ঠান্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। দিনের উষ্ণতা ও আলো পেছনে ফেলে এখন তাদের সামনে শুধুই অন্ধকার। মমকে নিয়ে স্বর্গভূমির দ্বিতীয় গেটের সামনে এসে পৌঁছায় চেরী। সন্ধ্যার পর এই গেট বাইপাস করার অনুমতি নেই হাইব্রিডার্স মেয়েদের। চেরী কোন তর্কে গেল না। চাইলে সে ঠিকই যেতে পারে অনুমতি নিয়ে। কিন্তু অনুমতি নিতে এখন আবার আক্রোশকে ফোন করার ইচ্ছে নেই তার। মমকে গেটেই নামিয়ে দিল সে। কিছুটা সংকোচ নিয়ে সে একবার শুধু জিজ্ঞেস করলো,

“একা হেঁটে যেতে পারবে তো? বেশিদূর না তো এখান থেকে। রাস্তা না চিনলে বল, দিয়ে আসি।”

মমর মাথা নেড়ে শক্ত কণ্ঠে বললো,

“না, তার দরকার নেই। অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি আজকের মত। বাকিটা পথ আমি একাই যেতে পারবো।”

চেরী আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। জিপ ঘুরিয়ে চলে গেল সে। সেদিকে তাকিয়ে রইলো মম যতক্ষণ দেখা যায়। গলাটা জ্বলছে তার। চোখ থেকে টুপ করে একটা অশ্রুকণা অবাধ্যতা দেখিয়ে গড়িয়ে পড়লো। মমর রাগ উঠলো নিজের উপরই। জোর করে এক হাতে চোখ মুছে সে হনহন করে হাঁটতে শুরু করলো শ্রেয়ার বাড়ির দিকে।

ভীষন রাগ হচ্ছে তার। চেরীর উপর, পাখির উপর, ঝিনুকের উপর, নিজের উপর! আচ্ছা, তার সাথেই কেন এমনটা হয়? কেন তাকেই ভাসমান খড়কুটোর মত এদিক ওদিক ভেসে বেড়াতে হচ্ছে? কেন তার পায়ের নীচে আঁকড়ে দাঁড়াবার মত একখন্ড শক্ত মাটি নেই? থাকলে তো আর এভাবে যখন তখন তাকে যেকেউ এসে অপমান করতে পারত না। নিজের একটা শক্ত আশ্রয় থাকলে কি আর তাকে এভাবে আপন করে, আবার ছুঁড়ে ফেলতে পারতো! না, কখনোই পারত না!

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হাঁটার গতি মন্থর হয়ে এলো মমর। ঠাণ্ডা বাতাস গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে তার। চুল উড়িয়ে ফিসফিস করে যেন কানে সান্ত্বনার বাণী আওড়াচ্ছে। হঠাৎ তার মনে একটা অজানা আশঙ্কা উকি দিল। মুহূর্ত! আচমকা ওর কথা জিজ্ঞেস করলো কেন চেরী। মুহূর্তের থেকে দূরেই বা থাকতে কেন বললো? কোনভাবে চেরী আবার মুহূর্তকে পছন্দ করে না তো? হ্যাঁ! এটাই হতে পারে। হয়ত সেজন্যেই মুহূর্তের সাথে তার বন্ধুত্ব করাটা মেনে নিতে পারেনি চেরী। সেজন্যেই তো তার সাথে এরকম ব্যবহারটা করলো!

কিন্তু মুহূর্তের সাথে তো মমর বিশেষ কোন সখ্যতা নেই, আছে কি? পরিস্থিতির কারণে তাদের দেখা। সে তো কখনও আগ বারিয়ে মুহূর্তের সাথে খাতির করতে যায়নি। মুহূর্তই তো ছুটে এসেছে তার কাছে। তবে তাদের বন্ধুত্বটাকে অন্য চোখে দেখার কি আছে?

ভাবতে ভাবতে মম এসে পৌঁছাল বাড়িতে। শ্রেয়া তখন একা একা কিচেনে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে কাজ করছিল। মমকে দেখে চমকে ওঠে সে।

“আরে! তুমি এসে গেছো? আমি তো ভাবলাম আজ হাইব্রিডার্স মেয়েদের হোস্টেলে থাকবে।”

মম আগেই ফোন করে ইনফর্ম করে দিয়েছিল শ্রেয়াকে যে সে বাড়ি ফিরবে না আজ। কিন্তু এখন এভাবে বিতাড়িত হয়ে এসে লজ্জায় পরে গেল মেয়েটা।

“না, আসলে, ঐ, ভালো লাগছিল না।”

“ঠিক আছে। ভালো সময় এসে পৌঁছেছ। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। ডিনার প্রায় রেডি।”

মম মাথা নেড়ে চলে গেল ফ্রেশ হতে। ফিরে এসে দেখলো শ্রেয়ার টেবিল গোছানো শেষ। খেতে বসে গেল দুজন। কিন্তু দুজনের মনেই হয়ত চলছিল অন্যকিছু। তাই পর্বটা চললো নীরবে।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে, কিচেনে সব গুছিয়ে রাখছিল ওরা। ঠিক তখনই শব্দ করে বেজে উঠলো এলার্ম। পুরো স্বর্গভূমি কেঁপে উঠলো সেই আওয়াজে। ভ্রু কুচকে জানালার কাছে গিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো শ্রেয়া। বাইরে উকি ঝুঁকি দিয়ে বুঝলো এলার্মটা সিকিউরিটি রুম থেকে ভেসে আসছে।

“এটা কিসের এলার্ম আপু?”

এলার্মটা কিসের বুঝতে পেরে শ্বাস থমকে এলো শ্রেয়ার।

“সিকিউরিটি ব্রিচ! হামলা হয়েছে!”

চলবে..

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_১৩(২)

“সিকিউরিটি ব্রিচ! হামলা হয়েছে!”

শ্রেয়ার কথা শেষ হবার আগেই জোরে একটা শব্দ শোনা যায় অদূরে। মৃদু কম্পন অনুভব করে ওরা পায়ের নীচে। শ্রেয়াকে ধরে নিজেকে পরে যাওয়া থেকে আটকায় মম। আর শ্রেয়া ধরে দরজার কেঁপে ওঠা কাঠের ফ্রেমটা। জানালার বাইরে ধরা পরে এক ভয়ংকর দৃশ্য। কাছাকাছিই একটা ভবনে গ্রে*নেড মারা হয়েছে। আগুন ও ধোয়ার স্ফুলিঙ্গ দেখা যাচ্ছে সেথায়। বিকট শব্দে চোখের পলকে ধ্বসে পড়লো ভবনটা।

“আপু!”

আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে মম শ্রেয়ার দিকে। বরফের মত জমে গেছে শ্রেয়া। আরো কয়েকটা গ্রে*নেডের শব্দ ভেসে আসছে দূর থেকে। ভয়ে কেঁপে উঠলো মম। চোখজোড়া বন্ধ করে জড়িয়ে ধরলো শ্রেয়াকে। শ্রেয়া ছুটে গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কাউকে কল করলো। কিন্তু পরপর কয়েকবার কলটা বেজে বন্ধ হয়ে গেল। রিসিভ করলো না কেউ। এদিকে একটু পরপর তীব্র শব্দে কেঁপে উঠছে রাতের অন্ধকার।

“মম, আমার কথা শোনো। সিকিউরিটি টিম নিশ্চয়ই আসবে আমাদের বাঁচাতে। ততক্ষণ আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বুঝতে পারছো?”

মম আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কোনমতে মাথা নাড়ে শুধু।

“গুড। আমাদের শান্ত থাকতে হবে। ঠিকাছে? আমরা সবার আগে বাড়ির সমস্ত আলো নিভিয়ে দেব। আলো জ্বালানো দেখলে ওরা এদিকেও হামলা করতে পারে।”

মম মাথা নেড়ে সায় জানালো। দুজনে মিলে ছোটাছুটি করে ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিল। তারপর বসার ঘরের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজেদের আড়াল করে বাইরের পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে শুরু করলো শ্রেয়া ও মম।

***

হুট করে ঘুমটা ভেঙে যায় মুহূর্তের। বিছানায় বসে দরদর করে ঘামছে সে। মাথাটা ঘোলা হয়ে আছে। ঝিম ধরে বসে থাকে সে। বুকের ভেতর হৃদপিন্ড নামক যন্ত্রটা অস্থির হয়ে উঠেছে। কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছে কিনা সেটা ঠিকঠাক মনে করতে পারে না। তবে কিছু একটা তো দেখেছে। কিছু একটা নিয়ে খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল সে ঘুমের মাঝে। আবছা আবছা কিছু দৃশ্য ভাসছে চোখের সামনে।

আগুন, ধোঁয়া, অন্ধকার!

কি ছিল সেটা বুঝতে পারছে না মুহূর্ত। বিছানা ছেড়ে উঠে সে এক গ্লাস পানি পান করে। পানির গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে, থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে সে। হৃদয়টা এখনো অস্থির হয়ে আছে। সরু চোখে তাকিয়ে নিজের অনুভুতিদের বোঝার চেষ্টা করে সে। মাথাটা এখনো ভার ভার লাগছে তার। বিরক্তিতে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে অস্ফুট গরগর শব্দ। সামনে থাকা কাচের জানালায় তার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে। আলো ও অন্ধকারের মিশেলে সেই প্রতিফল জ্বলে উঠছে কোন শিল্পীর আঁকা তৈলচিত্রের মত।

নিস্তব্ধ রজনীতে প্রচন্ড শব্দে কেঁপে ওঠে হোস্টেলের দরজাটা। সেদিকে চেয়ে ভ্রু জোড়ার মাঝে ভাঁজ ফেলে মুহূর্ত। এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলার আগেই নাকে ঠেকে আগন্তুকের রাগমিশ্রীত গন্ধ।

“স্বর্গভূমিতে হামলা হচ্ছে। দ্রুত রেডি হয়ে লবিতে এসো।”

যেতে যেতে প্রত্যেকটা দরজায় একইভাবে টোকা দিয়ে সবাইকে জাগাচ্ছে ছেলেটা। মুহূর্ত দ্রুত গায়ে শার্ট জড়িয়ে তৈরি হয়ে নীচে নেমে এলো। সবাই মোটামুটি জড়ো হয়েছে লবিতে। সবার মাঝেই চাপা ক্রোধের আগুন জ্বলছে। আক্রোশকে দেখা গেল একপাশে। মুহূর্ত এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে?”

“T-13 জোনের দিকের দেয়াল ভেঙে ঢুকেছে ওরা। গ্রে”নেড দিয়ে এলোপাথাড়ি হামলা করছে। এখন পর্যন্ত ওদের বিশটা ট্রাক ঢুকেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু আর্মি ট্যাংকও আছে। মানুষ মোট কতজন আন্দাজ করা যাচ্ছেনা। তবে সবাই আ”র্মড।”

“T-13 জোন তো মানুষদের এরিয়ায়।”

“হুম। হাইব্রিডার্স জোনে এখনো ঢুকতে পারেনি ওরা। আর্মি ট্যাংক দিয়ে গেট ভাঙার চেষ্টা করছে। গ্রে”নেড ছুঁড়ে ফেলছে উপর থেকে। মনে হয়না, বেশিক্ষণ ওদের আটকে রাখা যাবে।”

“মেইন গেটে যে আমাদের অফিসাররা ডিউটিতে ছিল?”

“কেউ নেই। HFT এর অফিসাররা আছে শুধু। আমাদের ভেতরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে ডিরেক্টর দেনিজ। মেইন গেটে টাইগার ছিল ডিউটিতে। ওর সাথে কোন যোগাযোগ করা যায়নি। জানিনা ওদিকের কি অবস্থা।”

মাথা নেড়ে জানালো আক্রোশ। মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে আছে তার। হিউম্যান জোনের ঠিকঠাক কোন খবর পাচ্ছে না তারা। না জানি কি অবস্থা!
মুহূর্তের ভেতরে অস্থিরতা বাড়ে। সোফার পাশে গিয়ে তার হাতলে বসে পরে সে।

“আমাদের জোনের গেটটা খুলে দিতে বলো। আসুক ভেতরে! তারপর খেলা দেখাচ্ছি মানুষগুলোকে।”

রাগে গজরাতে গজরাতে বলে ওঠে একজন। সহমত প্রকাশ করে আরো কয়েকটা ছেলে। নিজেদের মধ্যে কথা বলে ওদের শান্ত করার চেষ্টায় আছে কাউন্সিল মেম্বাররা। শুধু মুহূর্তই বসে আছে চুপ করে।

“আমরা যাইনি ওদের সমাজে। ওরা এসেছে!”

“ন্যায় কি বলেছে? কোথায় ও? দেনিজের কথা শুনে কি আমরা হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবো?”

“শান্ত হও সবাই। ন্যায় দেনিজের সাথে কন্ট্রোল রুমে আছে। আমাদের অপেক্ষা করতে বলেছে।”

“কিসের অপেক্ষা! যেতে দাও। আমাদের মারতে এসেছে? দেখি কত দম!”

বিশৃংখলা শুরু হয়ে যায় ছেলেদের মধ্যে। আক্রোশের মাথার একপাশ টনটন করছে। ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে সে। শ্রেয়া যে বিপদের মাঝে আছে, সেটা বুঝতে পেরে বুকটা কাপছে তার। কিন্তু কিছু করার নেই। নির্দেশ আছে, যেন হোস্টেলের বাইরে না যায় কেউ। বিশেষভাবে নির্মিত এই হোস্টেলগুলো। পুরো সিস্টেম যখন শাট ডাউন মুডে চলে যায়, তখন বিশেষ ধাতুর মোটা আবরণ ঢেকে দেয় প্রতিটি এনট্রেন্স। বো”ম মারলেও এই আবরণ ভেদ করে ভেতরে ঢোকা সম্ভব নয়।

“আর একটা আওয়াজ করলে তুলে আছাড় মারবো সবকয়টাকে!”

ছেলেদের গর্জে ওঠা প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে ছাপিয়ে শোনা যায় আক্রোশের হুশিয়ারি বার্তা। এক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো লবিতে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। দমে গিয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে সবাই। এতক্ষণ ভিড়কে শান্ত করার চেষ্টায় থাকা ছেলেগুলোর ঠোঁটে দেখা যায় বাঁকা হাসি। আক্রোশের আক্রোশের ব্যাপারে মোটামুটি সবার জানা। অন্যরা যেখানে রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ভুল করে বসে, আক্রোশ সেখানে নিজের রাগকে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেটাকে সঠিক জায়গায় কাজে লাগায়। হাইব্রিডার্স ছেলেদের ট্রেইনার সে। ওদের মাঝে ডিসিপ্লিন বজায় রাখে আক্রোশ। বড় বড় তেজী সুরমাদেরও রিংয়ে ধূলো খাইয়েছে সে। সেজন্যে ছেলেদের মাঝে আলাদা কদর আছে তার, আছে সম্মান। তার কথার উপরে মুখ খুলতে দুইবার ভালো করে ভেবে নেয় হাইব্রিডার্স ছেলেরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। শান্ত হয়ে গেল ভিড়।

“ধৈর্য্য ধরতে হবে আমাদের। আমি জানি, কঠিন। কিন্তু এখন এটাই করা প্রয়োজন। ধৈর্য্য ধরো, অপেক্ষা করো, কিন্তু তৈরি থেকো। যেকোন কিছুর জন্যে আমরা প্রস্তুত।”

গম্ভীর মুখে সবাইকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলে সরে গেল আক্রোশ। সবার মাঝে একটু আগে যে রাগ, ক্ষোভ, উত্তেজনা উপচে পড়ছিল, সেটা ভাটা পড়েছে এখন।

“আমি কিছু পপকর্ন ভেজে আনছি। খালি মুখে অপেক্ষা করতে ভালো লাগবে না।”

ফিসফিস করে বলে উঠে দাড়ালো একটা ছেলে। পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলো,

“তাহলে কেউ টিভিটা চালু করো। পপকর্ন যখন আছেই, একটা মুভি দেখি।”

“ভালো বুদ্ধি। এই পপকর্নের সাথে কিছু চিপস আর সোডাও নিয়ে এসো।”

যে যার মত জায়গা খুঁজে নিয়ে এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পরে। কেউ কেউ আবার ফিরে যায় নিজেদের রুমে। কয়েকজন আবার তেতো মুখে বসে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে।

“দ্বিতীয় গেট ভাঙ্গা এতটাও সহজ হবে না। কিন্তু বাইরে থেকে যে এলোপাথাড়ি গ্রে”নেড ছুঁড়ে ফেলছে, সেটা বিপদজনক।”

“মেয়েদের হোস্টেলের কি অবস্থা?”

“রেড এলার্ট জারি করার পর পুরো হোস্টেল শাট ডাউন করে দেওয়া হয়েছে। ভেতর থেকে না কেউ বাইরে যেতে পারবে, আর না কেউ বাইরে থেকে যেতে পারবে ভেতরে।”

মেয়েরা সুরক্ষিত আছে শুনে হালকা স্বস্তি পায় মুহূর্ত। মম তো সেখানেই আছে। তাহলে সেও সুরক্ষিতই থাকবে। আর এদিকে কিছু হলে তো খবর পাবেই।
কিন্তু তবুও মনটা খচখচ করছে তার। একবার মমর সাথে কথা বলে দেখবে?
ভাবনা চিন্তা শেষ করার আগেই, মমর নাম্বারে একটা কল করে বসে মুহূর্ত। রিংয়ের পর রিং হতে থাকলেও, ফোনটা ওপর পাশ থেকে রিসিভ করে না মম।

***

লেকের ধারে একটা বড় ট্রাক এসে থেমেছে। শ্রেয়ার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। অন্ধকার এখন অনেকটাই সয়ে গেছে চোখে। মমর অবয়বটা নজরে আসছে বাইরে থেকে আসা ঝাপসা আলোতে। শ্রেয়ার হাতটা আরো জোড়ে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়েছে সে। স্বর্গভূমির পুরো হিউম্যান জোনটা এখন পরিণত হয়েছে যু”দ্ধক্ষেত্রে। দূর থেকে ভেসে আসছে মানুষজনের ভয়ার্ত আত্মচিৎকার ও হাহাকার। গ্রে”নেড হামলায় আগুন জ্বলছে, ব্লিল্ডিং ধ্বসে পড়ছে, গার্ডরা আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার চেষ্টায় ম”রছে। থেকে থেকে ফায়ারিংয়ের শব্দ ভেসে আসছে।

এই আতঙ্ক ও বিশৃংখলার মাঝে অন্ধকার ঘরে চুপটি করে বসে ছিল ওরা দুজন। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে এসে থামা ট্রাক থেকে অস্ত্রহাতে বেরিয়ে আসে দশ বারোজন মানুষ। তিন চারজনের গ্রুপ করে প্রতিটা ঘরে ঘরে গিয়ে ওরা চেক করতে শুরু করেছে। যেখানে যাকে পাচ্ছে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনছে। আতঙ্কে চোখজোড়া টলমল করছে মমর। ভয়ার্ত কন্ঠে সে জিজ্ঞেস করলো,

“আপু! এখন? ওরা তো এদিকেই আসছে!”

ভয়ে শ্রেয়ার নিজেরও গলা শুকিয়ে আসছে। এদের হাতে ধরা পরলে আর রক্ষে নেই। এখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকার সুযোগ নেই আর। পালাতে হবে। কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? চারদিকে তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ওরা!

“মম, আমরা বাড়িতে লুকিয়ে থাকলে নিশ্চিত ধরা পরবো। আমাদের পালাতে হবে।”

“কিন্তু কোথায় যাবো আপু? চারদিকে তো আগুন জ্বলছে!”

“আগে বের হই এখান থেকে। চলো!”

শ্রেয়ার কথার মাঝেই কেউ বাড়ির মেইন দরজা ধরে জোরে ঝাঁকালো একবার। দম বন্ধ হয়ে এলো শ্রেয়ার। মমরও একই অবস্থা। হাত পা জমে এসেছে দুজনের। দ্বিতীয়বার দরজাটা জোরে ঝাঁকিয়ে উঠতেই, সচল হলো ওরা। শ্রেয়া বাড়ির পেছন দিকে এগিয়ে গেল মমকে নিয়ে। উদ্দেশ্য জানালা খুলে পালাবে। কিন্তু সেদিকে গিয়ে দেখলো বড় একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে জানালার কাছে। হাতে বড় নলওয়ালা বন্দুক। ভেতরে কারো উপস্থিতি টের পেল বন্দুকধারী আগন্তুক। কাঁধ থেকে বন্দুকটা নামিয়ে এনে তাক করলো জানালার দিকে। বিচ্ছিরি একটা গালি দিয়ে বলে উঠলো,

“পালাবি কোথায়? খোল দরজা! আজ তোদের সবাইকে সাফ করে দেব!”

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ